#প্রেম_শৃঙ্খলে_রুদ্ধ_রূপসী
পর্ব - ১০
লেখিকা: সালসাবিল সারা
(কপি করা নিষেধ)
_________________
“ না না স্যার,আপনি লম্পট,চরিত্রহীন…”
কথাটা বলতে গিয়ে মেয়েটা থেমে যায়। বেঞ্জামিনের সরু দৃষ্টি তার দিকে। লোকটার ব্রাউন আইস,যেনো তার সত্তায় প্রথম নজর দিলো,আর মেয়েটা কেঁপে উঠে। সে অজান্তেই এক পা পেছায়। না, লোকটার চোখে কোনো লালসা বা হেয় নেই। নজর তার বড্ড সূক্ষ্ম, ঈগলের মতো ধূর্ত। সেই নজর পরখ করে নুসাইবা যেনো কথা বলতেই ভুলে গেলো।
লোকটা কি লম্পট, চরিত্রহীনের বাংলা জানে? নাকি না জেনেই! কিংবা জেনেই তাকে অপমান করেছে মানে করে চাকরি থেকে বের করে দেয়!
এই মুহূর্তে চাকরি চলে গেলে নুসাইবা একেবারে দিগ্বিদিক হারিয়ে ফেলবে।
“স্যার,আপনি চরিত্রহীন,লম্পট কিভাবে..এটা বাংলা খা..”
“মিস সাইবা,আপনি এখন আসতে পারেন।”
লোকটার দৃষ্টি তখন টেবিলে রাখা ফাইলের দিকে।
নুসাইবা ভাবে তার চাকরি শেষ! আঁখিতে জল জমে। কিন্তু পড়তে দেয় না। মেয়েটা ভারী শক্ত করে তার সত্তা। তারপরও হাত জোড় করে লোকটাকে বলে উঠে,
“স্যার আমি সরি,সত্যি সরি। আমার ভুল হয়েছে আপনাকে উল্টাপাল্টা কথা বলে।”
“স্টপ দিস ড্রামাস। আপনি কাজে মন দেন। গেট লস্ট।”
বেঞ্জামিন ফাইলে তাকিয়ে উত্তর দেয়।
নুসাইবার অপমানে মুখটা এতটুকু হয়ে যায়। তার জোড় করে রাখা হাত দ্রুত সোজা করে। খামচে ধরে কামিজের অংশ। তার মানে চাকরি যায়নি তার! সে মুহূর্তে হেসে উঠতে চাইলেও “গেট লস্ট” শুনে হাসিটা আকাশে উড়ে যায়। ঘামান্ডি লোকের থেকে ভালো কথা বের হওয়ার প্রশ্ন আসে না।
সে আবারো “সরি” বলে বেরিয়ে যায়। কিন্তু কেবিনের সামনে দাঁড়ালেই তার হুট করে হাসি আসে,
“সামহাও এই রাশিয়ান ঘামান্ডি লম্পট আর চরিত্রহীনকে বাংলায় কোনো ভালো শব্দ মনে করেনি তো!”
কথাটা ভেবে সে মুখে হাত দিয়ে কিছুক্ষণ হাসে। তারপর নিজেই মাথা দুইদিকে দুলিয়ে আপনাআপনি বলে উঠে,
“উফ,যা ইচ্ছা ভাবুক শয়তান লোকটা। আমাকে ঝটকি দেয়! হাউ ঘামান্ডি হি ইজ!”
মেয়েটা মুখে ভেংচি কাটে বেঞ্জামিনের অফিসের দরজার সামনে। পরে নিজের কেবিনে গিয়ে দেখতে পায় পাশের কাঁচের দেওয়ালে লোকটা পর্দা দিয়ে রাখলো। অর্থাৎ, নুসাইবার দিক থেকে লোকটাকে দেখা যাচ্ছে না।
সে আর ভাবলো না কিছু। মাঝে মাঝে এমন করে বেঞ্জামিন। মাথার কাপড় ঠিকভাবে সেট করে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। যাক, চাকরিটা তার বেঁচে গেলো। এখন থেকে লোকটাকে কিছু বলার আগে একশোবার ভাবা লাগবে তার।
অন্যদিকে বেঞ্জামিন মেয়েটার সব কীর্তি সিসিটিভিতে দেখে। তার অধর বাঁকা হয়ে আসে,যাকে বলে স্মার্ক। অর্থাৎ ঠাট্টারূপ হাসি। লোকটা এইভাবেও হাসতে জানে! মনস্টারের এই রূপ দেখলে আন্ডারওয়ার্ল্ডে বাকিরা সত্যি মূর্ছা যেতো।
বেঞ্জামিন মেয়েটার দেওয়া এপোলজি লেটার আবার পড়ে,আবার পড়ে, আবার! পরে সেই “সরি” লেখার উপরে অধর ছোঁয়ায়। আবেশে ভাঁজ করে পকেটে রাখে।
মোবাইলে মেয়েটার ছবিতে আঙুল বুলিয়ে অত্যন্ত নেশালো শব্দে আওড়ায়,
“ইউ কুড’হ্যাভ কিসড মি রূপসী ইনস্টেন্ড অফ হ্যান্ডিং মি এপলজি লেটার!”
পরক্ষণে সে চিঠি বুকের পাশে চেপে ধরে। চেয়ারে গা এলিয়ে দেয়,
“আহ,মাই সাইবা….।”
লোকটা পর্দা সরায়। নুসাইবা মনোযোগ দিয়ে কাজ করছে স্কেচ বুকে। পর্দা সরেছে বুঝলেও নুসাইবা সেদিকে ফিরেনি। এই লোকের সাথে আর কখনো বাড়তি কথায় জড়ানো যাবে না। মেয়েটা কাজ করে মন দিয়ে আর তার আশিক বাঁকা দৃষ্টিতে তার সত্তা গিলে খায়।
বেঞ্জামিনের দুনিয়ায় মেয়েটাকে নিয়ে অনুভূতির ফোয়ারা তিল তিল করে বাড়ছে। কমছে ধৈর্য। না জানে সে কবে মেয়েটাকে উঠিয়ে গুম করে তার রাজ্যে!
_________________
ইয়াসিনকে হাসপাতালে রাখতে হবে আরো কিছুদিন। নুসাইবা শোরুম থেকে হাসপাতালে গিয়েছিল। বাবাকে কেবিনে শিফট করেছে আজ দুইদিন। মেয়েটা অত্যন্ত খুশি তাই। ইয়াসিন মেয়ের হাসিমুখ দেখে স্বস্তি পায়। মেয়েটাকে দেখে ক্লান্ত লাগছে। চোখটা কেমন ভারী হয়ে আছে। সে একহাত তুললে নুসাইবা আরো এগিয়ে যায় বাবার দিকে,
“কিছু লাগবে,বাবা?”
ইয়াসিন কাঁপা হাতে মাথা ছুঁয়ে দেয় মেয়ের। আবেগে চোখে জল জমে। সেটা অদেখা নুসাইবার। কারণ বাবারা কষ্ট লুকাতে উস্তাদ।
“লাগবে না।তোমাকে একটু আদর করছি।”
ইয়াসিন মুচকি হাসলে মেয়েটা আরো এগিয়ে যায় বাবার দিকে। ইয়াসিন মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়,
“খুব কষ্ট হচ্ছে তাই না?”
“কষ্ট? কিসের কষ্ট?”
নুসাইবা বাবার হাত ধরে।
“এইযে তুমি একা হাতে সংসার সামলাচ্ছো,বাবা এইখানে পড়ে আছি। ব্যাপারটা আমি মেনে নিতে পারছি না। চাচু থেকে সাহায্য নাও?”
নুসাইবা বাবার কথায় হাসতে চেষ্টা করে। হাসেও সে। বাবার কাঁধে মাথা রেখে বলে,
“কখনো না! আমি আছি তো। আমি দিব্যি আরাম পাচ্ছি তোমাকে রেস্ট করাতে পেরে। সেই আজীবন তো নেতা হয়ে দৌড়াদৌড়ি করেছো। এখন আরাম করো। বড় মেয়ে আছে তোমার।”
“সুস্থ হয়ে নিই জলদি,এরপর বাবা আবার সব বোঝা তুলে নিবে।”
ইয়াসিন হাসে।
“কিন্তু রাজনীতিতে না, বাবা। কখনো না। আমরা সাধারণভাবে বেঁচে থাকবো,অন্তত কোনো শত্রু তো থাকবে না। সেগুলো পরের বিষয়। আপাতত রেস্ট করো। এখনের মতো তোমার সোনার সংসারকে তোমার বড় মেয়ে সামলাচ্ছে।”
মেয়েটা বাবাকে শান্ত করার চেষ্টায়।
ইয়াসিন এখনও আবেগ ধরে রাখে। কিন্তু চক্ষু তার ছলছল। বাবাদের কাঁদতে নেই সন্তানের সামনে। নাহলে তারা যতোটা না দূর্বল তার চেয়ে বেশি দূর্বল হয়ে পড়ে।
সন্ধ্যার কিছুটা শেষের দিকে নুসাইবা বাবাকে বিদায় দিয়ে বেরিয়ে আসে। ইয়াসিন চিন্তা করছিল মেয়েটা কিভাবে ফিরবে সেই নিয়ে। কিন্তু হাবিবা আসবে কলেজ থেকে সেটা জানিয়ে মেয়েটা বাবাকে চিন্তামুক্ত করে। যেটা ছিল মিথ্যে। বাবাকে চিন্তায় না রাখার জন্যে মিথ্যে বলা। ভেতরে ভেতরে সে নিজেই শঙ্কিত। চাচাকে ফোন দিয়ে গাড়ি পাঠানোর কথা একবার ভাবলো। পরে মাথায় আসে,আজকে তারা সবাই ব্যস্ত। নতুন পরিবারের সবাই আসবে আজ সেখানে। নুসাইবাও এখন সেখানে যাবে।
হাসপাতাল থেকে চাচার বাসার দুরত্ব বেশ ভালো। লিফটে চড়ে নিচে নামলে গেইটের সামনে পৌঁছালে সে অবাক হয়।
এলেক্স দাঁড়িয়ে,সাথে অফিসের গাড়ি। নুসাইবা তাকে উপেক্ষা করে অন্যদিকে যেতে নিলে এলেক্স তাকে ডেকে উঠে,
“ম্যাডাম?কোথায় যাচ্ছেন? গাড়ি এইদিকে।”
নুসাইবা থামে তার কথায়। এলেক্স ততক্ষণে এগিয়ে আসে তার দিকে। বেশ ফরমাল ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে বলে,
“ম্যাম?”
“অফিস আওয়ার শেষ। আমি এখন কই যাবো না যাবো সেটা একান্তই আমার পার্সোনাল বিষয় নয় কি? অফিসের গাড়ি কি আমার পার্সোনাল গাড়ি যে যেখানে ইচ্ছা সেখানে এই গাড়ি চড়ে যাবো?”
নুসাইবা বিরক্ত হয়। স্বাভাবিক বিরক্ত হওয়া। সে তো গাড়িকে অপেক্ষা করতে বলেনি। আর এইসব জানলে বেঞ্জামিন যদি তার চাকরি নিয়ে নেয়? নুসাইবা চিন্তিত সাথে ভীত। তাও মুখ শক্ত।
“ম্যাম,আপনি কোথায় যাবেন? নামিয়ে দিচ্ছি। আপনার বাসায় নামালেই আমার দায়িত্ব শেষ হবে।”
শেষের কথাটা বিড়বিড় করে বলে সে। তার ঘাড়ে যে এক লোক বন্দুক দিয়ে এই মেয়ের দায়িত্ব দিয়েছে সেই কথা তো সামনের মেয়েটাকে বলা যাবে না! বেঞ্জামিন জীবিত রেখে তার কলিজা বের করবে। এলেক্স গলা পরিষ্কার করে।
“আমি চাচার বাসায় যাব। আমার ফ্যামিলি আজ ওখানে। অর্থাৎ এখন আমাকে আমার মতো যেতে দিন।”
নুসাইবা যেতে নিলে এলেক্স আবার বলে উঠে,
“তাহলে ঐখানে নামিয়ে দিই। আপনার ফ্যামিলি আছে, সমস্যা নেই। আমারও গন্তব্য সেখানে।”
নুসাইবা এইবার রেগে যায়। কিন্তু বৃষ্টির তোপে সেই রাগ গিলে ফেলে। অলরেডি কয়েকটা লোকের বাজে দৃষ্টির জন্যে সে বারবার মাথার কাপড় ঠিক করছে। অতঃপর আর তর্ক না করে উঠে সে গাড়িতে।
গাড়ি চলতে নিলে মেয়েটা সিটে হেলান দেয়। বিড়বিড় করে আওড়ায়,
“আমি কেনো ভুলে যাই, এই আহাম্মক মানুষটা ঘামান্ডি লোকটার এসিস্ট্যান্ট। সবাই ওখানে গেলে এই মানুষটাও তো যাবে! যাক ভালো হলো,নিরাপদে যেতে পারবো চাচার বাসায়। ”
ভাবলেশহীন নুসাইবা সবকিছু স্বাভাবিক ভাবে নেয়। কিন্তু সে একটুও আঁচ করতে পারে না,তার জন্যে বেঞ্জামিন নামক মনস্টার লোকটার নেশা কতটা প্রখর,কতটা উন্মাদ!
_______________
নাজিমের বাড়িতে বাহিরের লাইটগুলো জ্বলজ্বল করছে। এক উৎসবমুখর পরিবেশ। আজ দুপুরে ফালাক দেশে এসেছে। আবার আজকেই তার বিয়ের তারিখ ঠিক হবে। সব মিলিয়ে ব্যাপারটা এলাহী কান্ড। যদিও নাজিম ইয়াসিন সুস্থ হওয়ার পর বিয়ের ডেট রাখবে। কিন্তু,ফালাক চাচ্ছে আজই পাকা কথা হোক।
নুসাইবা হাবিবা থেকে সব শর্টকাট শুনেছিল। শোরুমে থাকায় সে এয়ারপোর্ট যেতে পারেনি বাকিদের সাথে।
গাড়ি থেকে নেমে নুসাইবা ধীরে হাঁটে। হাবিবা তার জন্যে এক্সট্রা কাপড় বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছে এইখানে। বোনেরা সকলে মিলে তৈরি হবে। সে দুয়ারে পা রাখতেই হঠাৎ একটা লম্বা অবয়ব দেখে পা থামিয়ে ফেলে। একটুর জন্যেই ধাক্কা লাগতো! নুসাইবা ব্যাগ চেপে ধরে। দৃষ্টি তুললে ফালাককে দেখতে পায়। এক চিলতে হাসি ঠোঁটে বিচরণ করে মুহূর্তে,
“ফালাক ভাই! কেমন আছো তুমি? আল্লাহ দুই বছর পর তোমাকে দেখলাম।”
“ভালো।তুই কেমন আছিস!”
ফালাক হেসে উত্তর দেয়। চাচাতো বোন হলেও তার নিজের বোনেদের মতো নুসাইবাদের আদর করেছে ফালাক।
“হ্যাঁ ভালো।”
নুসাইবা কিছুটা হাসে।
“শুনলাম তুই বেঞ্জামিন ভাইয়ার শোরুমে ডিজাইনার হিসেবে আছিস। ঠিক যাচ্ছে সব?”
“হ্যাঁ। ওখানে আছি। ভালোই যাচ্ছে সব।”
ফালাক আরো কিছু বলতে চেয়েছে,কিন্তু নুসাইবা হাবিবাকে দেখতে পেয়ে তাড়া দেয়। সে একটুও তৈরি না। খুব এক্সস্টেড লাগছে তার। পাঁচ মিনিট রেস্ট নিয়ে আজকের জন্যে রেডি হতে হবে। সে ভাইকে হেসেই বলে উঠে,
“ভাইয়া তোমার সাথে গল্প তো হবেই। আমি গিয়ে তৈরি হয়ে নিই। লেইট হয়েছে অনেক।”
“হ্যাঁ অফকোর্স। যা যা। ওরা হাফ এন আওয়ার এর মধ্যে আসবে।”
ফালাকের জবাবে সে দ্রুত পাশ কাটিয়ে চলে যায়।
ভালই মেহমান এসেছে বাড়িতে। ফালাকের মামা, মামীরা,খালারা…সবাই মিলে এক উৎসব লেগেছে যেনো!
নুসাইবা অল্প আলাপ করে চাচীর সাথে দেখা করে। চাচী আজিমা তাকে দেখেই জড়িয়ে ধরে,
“ইস আমার মেয়েটা! শুকিয়ে কি হলো! সময় করে একদম আসতে পারিস না? কতদিন পর এসেছিস জানিস?”
“হ্যাঁ চাচীমা। কি করবো বলো,শরীরটা সায় দেয় না। শোরুমে কাজের চাপও থাকে।”
“বুঝেছি মা। যা যা উপরে গিয়ে রেডি হয়ে যা। লাবিবা আর জামিন অপেক্ষা করছিল তোর জন্যে। আর আমি খাবারও পাঠাচ্ছি উপরে।”
চাচীর কথায় নুসাইবা হেসে বিদায় নেয়। দুইতলায় উঠলে কাঙ্খিত কক্ষে পৌঁছালে হাবিবা তার জামা বের করে রেখেছে বিছানায়। জামিন এসে জড়িয়ে ধরে,
“আল্লাহ কতদিন পর আমার হুরপরীর দেখা পেয়েছি!”
“আপু…কেমন আছো তুমি?জিব্রান কোথায়?”
মেয়েটা বোনকে আঁকড়ে নেয়।
“জিব্রান ওর বাবার সাথে সেলুনে গিয়েছে। ছেলেটার চুল একদম কাটতে দিচ্ছিল না এইখানে। এরপর তোর ভাইয়া ধরে নিয়ে গেল। যা যা রেডি হয়ে যা।অনেক গল্প বাকি তোর সাথে।”
জামিন বলে উঠলে নুসাইবা তার কাপড় নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে এগুলে তার অন্য চাচাতো বোন লাবিবা ওয়াশরুম থেকে বেরোয়।
তাকে দেখে ভ্রু কুঁচকে আসে নুসাইবার। তাও ঠোঁটে হাসি টেনে রাখে। লাবিবাই আগ বাড়িয়ে বলে,
“গড! তুমি এত লেইট করেছো?”
“হাসপাতাল গিয়েছিলাম।”
“আদর্শ মেয়ে হাহ? এমন আদর্শ হও যে মানুষ তোমাকে ব্যাক ডেটেড বলে।”
শেষের কথাটা ফিসফিস করে আওড়ায় সে।
লাবিবা কি মিন করেছে সেটা বুঝেছে নুসাইবা। ওয়েস্টার্ন পড়েনা দেখে অলয় এককালে লাবিবার সাথে সমালোচনা করে,লাবিবাকে রেস্টুরেন্টে গভীর ছুঁয়ে এই কথাটা বলেছিল। যেটা অলয়ের দুশ্চরিত্র প্রমাণ হওয়ার সময় ভেসে আসে। লাবিবাকে তখন থেকে ছোট বোন হিসেবে কম জানে সে। চরিত্র খারাপ তার। প্রচুর। কারণ সেদিন অলয়কে লাবিবা নিজেই সায় দিয়ে চুম্বনে লিপ্ত হয়েছিল,এমন ভিডিও দেখিয়েছে তাকে জামিন।যেটা হাবিবাও জানে।
নুসাইবার অতীতের কিছু ভাবে না। কারণ অনুভূতিরা শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়েছিল এক কুলাঙ্গারের জন্যে। যেটার কোনো ঘটনা তার মনেও রাখেনি। আল্লাহ কতটা পছন্দ করলে এমন বান্দার হাত থেকে নুসাইবাকে রক্ষা করেছে! মেয়েটা আল্লাহ্ এর দরবারে শুকরিয়া করে রোজ।
মেয়েটা ভালো করে হাতমুখ ধুয়ে বেরিয়ে আসে। এইযে মুখে পানি লেগে আছে তার এটাই তার প্রধান প্রসাধনী।
সৌন্দর্যের মালকিন। খয়েরী রঙের ফুল হাতা পাকিস্তানি সুতির কামিজ পড়ে।খোলা চুল,আর ঠোঁটে মলিন করে লিপস্টিক দেয়।মাথায় কাপড় টানে সে দ্রুত। নিচে থেকে তখন খবর এসেছে,মেহমান গাড়ি থেকে নামছে।
লাবিবা তখন রুমে আসে।হাতে ফুলের তোড়া। আর কিছু চকলেট।
তার পড়নে খুবই টাইট,পেট অব্দি একটা টপস সাথে লং জিন্স।দেখতে দৃষ্টিকটু লাগছে।
“এই জলদি নামো। ওদেরকে ফুল, চকলেট দিতে হবে তো!”
বলে সে চলে যায়।
“এই বেয়াদব এত বলার পরও কাপড় চেঞ্জ করেনি। লাগছে কেমন দেখতে!”
জামিন রেগে বলে।
“বাদ দাও। চলো নিচে যাই।”
নুসাইবা জামিনের সাথে নিচে নেমে হাঁটতে থাকে।
ঘরের মেইন দরজায় বাকি কাজিনরা দাঁড়িয়ে। নুসাইবা আর জামিন একপাশে দাঁড়ায়। তারা ফুল,চকলেট কিছুই নেয়নি। নুসাইবার অস্বস্তি লাগে এইসব,তাই জামিনও সিদ্ধান্ত নিলো তারা এমনিতেই দাঁড়াবে।
একে একে সবাই ঢুকে বরণ হয়। নুসাইবা পুতুলের মতো দেখতে অলিভিয়ার সামনে গিয়ে নার্ভাস হয়ে পড়ে। মেয়েটা দেখতে তার মায়ের মতো। অত্যন্ত রূপবতী।
অলিভিয়াকে নিয়ে জামিন ভেতরে যেতে উদ্যত। তখন জিব্রান এসে পেট জড়িয়ে ধরে নুসাইবার,
“খাম্মি, হাউ আর ইউ?”
“জিব্রান! আমার বাবাটা…কেমন আছো? আমি ভালো।”
জিব্রান আর তার বাবা মেহমানদের জন্যে বাহিরে দাঁড়িয়ে ছিল।
“আমি সুপার ভালো।”
মেয়েটা আরো কথা বলতে উদ্যত হয়। কিন্তু হঠাৎই
“স্টপ দিস বিহেভিয়ার।”
এমন বাক্য শুনে সে চমকে উঠে। প্রথমে ভাবে বেঞ্জামিন আসবে না। কিন্তু তার কন্ঠ শুনে মেয়েটা দরজার দিকে নজর দেয়। শক্ত করে চেপে ধরে জিব্রানের হাত।
লাবিবা একা দাঁড়িয়ে ফুল নিয়ে। একটু আগেই মেয়েটা দরজার বাহিরে ছিল। বেঞ্জামিন প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে সটান দাঁড়িয়ে।
মনে হচ্ছে লাবিবা তাকে ফুল নিতে জোর করছে।
সে ইংরেজিতেই বেশ মোলায়েম সুরে বেঞ্জামিনকে ফুল নিতে আহ্বান করে,
“প্লিজ ফুলটা নিন। নিন না…আপনি কিন্তু সুপার হট।”
“স্টপ! আই’ল স্ল্যাপ ইউ হার্ডলি,স্টুপিড।”
তার এমন উচ্চ কথায় কেঁপে উঠে নুসাইবা।জিব্রানকে জড়িয়ে ধরে।
লাবিবা নুসাইবার দিকে তাকিয়ে লজ্জায়, অপমানে দৌড়ায়।
বেঞ্জামিন ভেতরের দিকে এগিয়ে আসতে নিলে মেয়েটাকে দেখে থমকে উঠে। নুসাইবা তার চিৎকারে তখনো বুকের ধুকধুক গুনতে ব্যস্ত। এমন জোরে নতুন আত্মীয়কে কে বকে?
“আর ইউ ওকে, সাইবা?”
বেঞ্জামিন অত্যন্ত ধীর এমন মাতাল সুরে জিজ্ঞাসা করে।
“ইয়ে..ইয়েস স্যার…ভেতরে আসুন।”
কথাটা বলেই সে এক সেকেন্ড দাঁড়ায়নি। জিব্রানের হাত ধরে ভেতরের দিকে হাঁটতে থাকে।
বেঞ্জামিন তার কদমের সাথে তাল মিলিয়ে চলে। চোখে তখনো মেয়েটার ভীত দৃষ্টি,ঠোঁটের কাপন। হালকা রঙের লিপস্টিকে আবৃত ঠোঁট দুটোর দৃশ্য হট্টগোল করছে। হাঁটতে হাঁটতেই সে একটা গভীর সিন অনুমান করলো। অন্তর তার নিজেকেই বলে উঠে,
“ইচ্ছে করছে দেওয়ালের সাথে চেপে তোমার জুসি লিপ্স আমার লিপ্স দিয়ে আটকে দিই।”
অথচ তার গম্ভীর সুদর্শন মুখের আবেশে বাকিরা
প্রশংসায় কানাকানি করছে। তার আগমনে গমগম করতে থাকা ড্রয়িং রুম কেমন চুপসে গেলো।
পুতুল বড় ছেলের নামেই বলছিল এতক্ষণ।তার বড় ছেলে একটু গম্ভীর, কম কথা বলে,বেশ রাগী।
সত্যি সেটা। বাকি আত্মীয়রা সবাই বেঞ্জামিনের অ্যাটিটিউড নিয়ে প্রশংসা না করে পারলো না। একদম কঠোর সুদর্শন ভাবের পুরুষ যাকে বলে।
সবাই ভালো আলোচনায় মত্ত। হেনার অবস্থা, নুসাইবার অবস্থা সবটা আজিমা গল্পে গল্পে আওড়ায়। পুতুল আড়চোখে দেখে পিলারের সাথে হেলান দেওয়া একটা লক্ষ্মী মেয়ের অবয়ব। সে একটা ছোট বাচ্চার সাথে টুকটুক করে কথা বলছে। মিটিমিটি হাসছে। বাড়তি কোনো আলোচনায় নেই যেনো।
পুতুল খুব পছন্দ করে মেয়েটাকে। দৃষ্টি মিললে তাদের হাতের ইশারায় ডাকে।
নুসাইবার হাত শীতল হয়ে আসে।তাকে কেনো ডাকবে ভদ্র মহিলা?
নুসাইবা জিব্রানকে নিয়ে সাথে যায়। পুতুল হাত ধরে তাকে নিজের পাশে বসায়,
“ভালো আছো,আম্মু?”
এত আন্তরিকতা,এত মোলায়েম সুরের ডাক। উনি ঘামান্ডি লোকটাকে জন্ম দিয়েছেন সত্যি!
“আলহামদুলিল্লাহ্। আপনি আন্টি!”
নুসাইবা ভয়ে ভয়ে আওড়ায়।
পুতুল কিছু বলার আগেই হেনা আসে সেখানে। এসেই বলে উঠে,
“এটা আমার বড় মেয়ে নুসাইবা ইয়াসিন জামান। ওর হাজব্যান্ড ফিনল্যান্ড আছে বর্তমানে। নাম অলয়।”
নুসাইবা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে যেনো! মা কেনো এইসব বলছে? যেটা সম্পূর্ণ মিথ্যে,মায়ের ভ্রম!
“মা! এইসব কেনো বল…”
“হেনা আপা,এইসব মিথ্যে। আপনার মাথার ভুলভাল চিন্তা। আপনার মেয়ের বিয়ে ভেঙেছে। বিয়ে হয়নি। সে অবিবাহিত। আমার বিশ্বাস আপনার রাজকুমারীর জন্যে একজন রাজ কুমার আসবে যে আপনার মেয়েকে রাণীর মতো করে রাখবে।”
পুতুলের এমন হিপটোনাইজ শব্দে,কাতর ভরা কন্ঠে হেনার বেরিয়ে আসা চিৎকার সব গলায় আটকে পড়ে। সে যেন পুতুলের দৃষ্টিতে হারিয়ে যায়।
পুতুল তাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে আবার বলে,
“আপনি একজন সুস্থ মা। আপনার মেয়ের ভবিষ্যৎ অনেক সুন্দর হবে, সে অবশ্যই বিবাহিত হবে। অতি জলদি হবে। আমার বিশ্বাস।”
নুসাইবা দাঁড়িয়ে যায়। তার চোখে পানির আভাস। গালে হাত দিয়ে সে টালমাটাল হয়। আজিমা তখন তার কাঁধ চেপে নেয়,
“পুতুল আপা অনেক বড় সাইকোলজিস্ট ছিলেন বিয়ের আগে। বিয়ের পর হাজব্যান্ডের নিষেধাজ্ঞায় কাজ ছেড়েছেন। তার সেই ট্যালেন্টের জন্যে এখনো রাশিয়ায় বেশ কয়েকজন ধনীর স্ত্রী তার সাথে এমন আলাপ করে। হেনা ঠিক হয়ে যাবে। তুই দেখিস।”
নুসাইবা নীরবে চোখের জল ফেলে। ওষুধের চেয়েও যেনো হেনার কাছে পুতুলের কথাগুলো ম্যাজিকের মতো কাজ করছে। সাইকোলজিস্টদের এই স্পেশাল পাওয়ার যেনো পুতুলের মাঝে সবই দিয়েছেন সৃষ্টিকর্তা।
ইতিমধ্যে হেনা অতীত ভুলতে শুরু করে। পুতুল এই জিনিসটা ভালো করে মাথায় সেট করিয়ে দেয়,তার বড় মেয়ে অবিবাহিত। এটা কেবল প্রথম ধাপ।
তাদের মধ্যে কথা চলতেই থাকে। হেনাও কেমন কাবু হয়ে যাচ্ছে পুতুলের দিকে।
চারিদিকে প্রোফেশনাল গার্ডস পাহারা দিচ্ছে।অল্পসংখ্যক কিন্তু অস্ত্রধারী।তাদের মধ্যে নুসাইবা ইথেন আর দোয়াদকে দেখেছিল ডাইনিংয়ের কোণায় কোণায়।
পুরুষরা সব লিভিং রুমে। ফালাক,ইয়ামিন,অলিভিয়া,হাবিবা আর লাবিবা ছাদে।
নুসাইবা আর জামিন নিচেই হেনাদের সাথে। কিছুক্ষণ পর বেঞ্জামিন লিভিংরুম থেকে বেরিয়ে আবার সাথে সাথেই নুসাইবার সাথে দৃষ্টি মিললে ভেতরে চলে যায়।
লোকটা মেয়েটাকে নিয়ে অস্থির। অনেকক্ষণ দেখেনি যে! পরে মেয়েদের দেখা পেয়ে স্বস্তি পায়।
ফালাকরা নেমে এলে আংটিবদল হয় তাদের।গার্ড ঘেরাও করেছিল তখন চারিদিক।জমজমাট আলোচনার পর বিয়ের দিনক্ষণ সবই নির্ধারণ করা শেষ। দুইমাস পরেই বিয়ের দিন ধার্য হয়েছে। আগামী সপ্তাহে সবাই মিলে বেঞ্জামিনদের বাংলোতে যাওয়ার দাওয়াত।
হেনা কাউন্সিলিংয়ের পর ঘুমিয়ে পড়ে ভেতরের রুমের সোফায়ই।
পুতুল নুসাইবাকে জানায় কাল সন্ধ্যায় যেনো হেনাকে নিয়ে কাউন্সিলিংয়ের জন্যে বাংলোতে যায়। মায়ের ইমপ্রুভমেন্ট দেখে দোটানায় ভুগতে থাকা নুসাইবা রাজি হয়। যদিও সে প্রথমে ইতস্তত করে কিন্তু পুতুল খুবই জোর করে আর আজিমা এবং জামিনও ইশারা দেয় রাজি হওয়ার।
_____________
হাসি ঠাট্টায় ব্যস্ত সবাই..গ্রুপ ছবি তোলার জন্যে সবাই একজোট হচ্ছে। ডাক পড়লে নুসাইবা সরে আসে মায়ের নিকট থেকে।এগিয়ে যায় দৃঢ় পায়ে। সবার মাঝে একদম আলাদা তার বস, যে কোনো কিছুতে নেই। শুধু সটান দাঁড়িয়ে মোবাইলে ব্যস্ত। নুসাইবা অন্যদিকে দাঁড়াতে নিলে পুতুল তাকে ডেকে উঠে,
“মা তুমি এইদিকে আসো।”
সে পুতুলের ডাকে পা বাড়ায়। এরমাঝে ভিড়ে লাবিবা তাকে পা দিয়ে হালকা আঘাত করে।
নুসাইবা হুড়মুড়িয়ে পড়তে নিলে তার কাঁধ চেপে ধরে বেঞ্জামিন। মেয়েটার পায়ে চাপ লেগে বেশ ব্যথা হয়।
“হোয়াট হ্যাপেন্ড, মিস সাইবা? আর ইউ হার্ট?”
বেঞ্জামিন তার কাঁধ স্পর্শ করে আবেশে। মেয়েটার শরীর মোলায়েম। অত্যন্ত মোলায়েম।
হঠাৎ প্রেয়সীর এমন হেয়ালিপনায় লোকটার কপালের রগ ফুলে উঠে ক্রোধে।
“কিছুনা, স্যার। আইএম ফাইন। থ্যাংক ইউ।”
প্রেয়সী সোজা হয়ে দাঁড়ায়। বেঞ্জামিন তার কাঁধ ছেড়ে দেয় আলগোছে। লাবিবা মুখ কুঁচকে নেয়। কেনো জানি তার নুসাইবার এমন নরম স্বভাব,অতি ভালো রূপ সহ্য হয় না।আর এই সুদর্শন লোকটা,তার বস হওয়ায় হয়তো কিছুটা কথা বলে,তার কর্মচারী যে মেয়েটা। নাহয় লাবিবাকে তো চড় দিবে বলেছিল!
“কিসের স্যার? এটা কি ওয়ার্কিং প্লেস? ভাইয়া ডাকবে।”
পুতুল তার মুখে হাত রেখে বলে উঠে।
“আচ্ছা,আন্টি। ভাইয়া বলবো।”
নুসাইবা মুচকি হাসে।
ছবি তোলার জন্যে সবাই প্রস্তুত। নুসাইবার ঠিক পিছে সেই লম্বা মানব…আরন বেঞ্জামিন। পাশে পুতুল। লোকটার সুঘ্রাণ নাকে এসে লাগছে। হঠাৎই তার ঘাড়ে গাঢ় নিঃশ্বাসের ছাপ পড়ে।ভঙ্গিমা এমন যে লোকটা মাথা নিচু করে মোবাইলে দেখছে কিছু।
কিন্তু মেয়েটা মাথা বাঁকা করলেই শরীর হিম হয়ে আসে। পেছন থেকে বেঞ্জামিন নামক লোকটার হিসহিস নিশ্চুপ শব্দ ভাসে অত্যন্ত গভীরভাবে,
“ভাইয়া? হাহ? ট্রাই কলিং মি ভাইয়া ওয়ান্স এন্ড আইল শো ইউ এ থাউজ্যান্ড রিজনস নেভার টু কল মি দ্যাট এগেইন,মিস নুসাইবা..সাই.. বাহ।”
চলবে…..
কপি করা নিষেধ।
কেমন কাছে ওদের অবশ্যই জানাবেন। সবাই আমার সাথে থাকবেন, গল্পে কমেন্ট করবেন,রিয়েক্ট দিবেন বেশি। আমার ওদের নিয়ে অনেক স্বপ্ন,এই উপন্যাসটা অনেক রোমান্টিক বড় করার। কষ্ট করি লিখি,তাই কষ্টের মূল্য দিও লাইক কমেন্ট করে।