ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেম শৃঙ্খলে রুদ্ধ রূপসী

১১তম পর্ব

লেখক: সালসাবিল সারা

#প্রেম_শৃঙ্খলে_রুদ্ধ_রূপসী

পর্ব - ১১

লেখিকা: সালসাবিল সারা

(কপি করা নিষেধ)

________________

“আমার খেয়ে পড়ে কাজ নেই ঐ নাকের ডগায় অহংকার নিয়ে ঘুরতে থাকা লোককে আমি ভাইয়া ডাকবো! ঘামান্ডি লোকটার সমস্যা কি বুঝতে পারি না। উনার মা বলেছিল উনাকে ভাইয়া ডাকতে,মুখের উপর তো না করতে পারি না!তাই তো হ্যাঁ বলেছিলাম নাহয় উনাকে কে ডাকে ভাইয়া ফাইয়া! অফিসের বস তাই ভাইয়া ডাকা যাবে না,ইস অহংকারে পা মাটিতে পড়ে না তার! ফাজিল লোক।”

নুসাইবার গায়ে রাগের জ্বলন। গতরাত থেকেই তার অহেতুক রাগ বাড়ছে বেঞ্জামিনের কথার ভিত্তিতে। লোকটাকে সে বস হিসেবে মানে,বস হিসেবেই দেখে। কিন্তু সেজন্যে আত্মীয়ের বেলায় তাকে বস বস বলে ডাকবে নাকি! কিছুই ডাকবে না। কালকে লোকটার নিঃশ্বাস তার ঘাড়ে পড়েছে ভাবলেই পেটে অস্থির অনুভূতি হয়। গায়ের অনুভূতি শিরশির করে।

সে গুছানো ব্যাগটা খামঁচে নেয়। তারপর বেঞ্জামিনের অপমানের কথাগুলো কানে ভাসলে আবারো ভ্রু কুঁচকে যায় তার,

“ লোকটার দিকে আর কখনো চোখ তুলেই তাকাবো না আমি। অসহ্যকর। ইস কি অহংকার উনার! এই অহংকার কিন্তু পতনের মূল… রাশিয়ান সাদা ভাল্লুক একটা।”

নুসাইবা মাথায় কাপড় ঠিক করে। আয়নায় নিজেকে পরখ করে রুম থেকে বেরুনোর সময় ফের ভাবে,

“ওহ,উনার তো পতন নেই। টাকার সমুদ্র যে আছে। এই দুনিয়ায় যার টাকা বেশি সেই রাজা। আর আরন বেঞ্জামিন অহংকারের রাজা।”

নিচে নামতে থাকে সে দ্রুত। অফিসের গাড়ি আসতে আর সময় বাকি পাঁচ মিনিট। পেটে ক্ষিদেও প্রচুর। কালকে রাতে যে ডিনার করলো,সকাল এখন নয়টা বাজে কিছুই খায়নি।

ডাইনিংয়ে গিয়ে মেয়েটা স্তব্দ বনে। এক হাত মুখে পৌঁছে আপনাআপনি। হেনা টেবিলে নাস্তা রাখছে। হেল্পিং হ্যান্ড তাকে সাহায্য করছে কেবল।

নুসাইবাকে দেখে মহিলা তাড়া দেয়,

“ওখানে কি? জলদি আয়,গাড়ি আসবে অফিসের।”

“তুমি কেনো করছো….. জামিলা তুমি মাকে…”

“আমি সব পারি বুঝেছিস! আয় আয় জলদি খেতে বস।”

নুসাইবা মায়ের কথায় চেয়ার টেনে বসে। হাবিবাও আসে তখন। মাকে জড়িয়ে ধরে আহ্লাদ করে। নুসাইবা হাসে কেবল।

নার্স মাকে ইনসুলিন দিলে তারা চারজন একসাথে নাস্তা করে।

যাবতীয় সব খরচ নুসাইবা বহন করছে। তার স্যালারিতে সব ভালোই কভার হচ্ছে সাথে একটা এমাউন্ট ব্যাংকে থাকছে। এইসব দিক দিয়ে সে বেঞ্জামিনের প্রতি কৃতজ্ঞ হলেও কাল বুঝেছে লোকটা কি পরিমাণ অহংকারী!

“হ্যাঁ রে তুই অফিস থেকে সন্ধ্যায় আসলে আমাকে নিয়ে যাবি পুতুল আপাদের বাসায়?”

হেনা জিজ্ঞাসা করে পরোটা মুখে দিয়ে।

“নিয়ে যাবো। আন্টি কয়েকবার করে তো বলেছে তোমাকে যেনো নিয়ে যাই’ই যাই।”

নুসাইবা বেখেয়ালি জবাব দেয়। পুতুল কিভাবে মাকে বশ করেছে এতটা প্রফেশনালি, সেটা চোখে না দেখলে হয়তো কেউ বিশ্বাস করতো না। অথচ তার মা গতকাল সকালেও কেমন পাগল পাগল বকছিল!

আসলে মাইন্ড গেম খেলার পাওয়ার যারা জানে,তাদের জন্যে দুনিয়া অত্যন্ত সহজ আর আরামের।

বাহিরে তখন গাড়ির হর্ন বাজলে নুসাইবার টনক নড়ে। সে পরোটা মুখে দিয়েই হতদন্ত ছুটে। যেতে যেতে মাকে জানায়,

“আমি ফোন দিলে রেডি হয়ে নিও।আসার সাথে সাথেই বেরুব।”

“দৌড়াস না। সাবধানে যা।”

মায়ের কথায় মেয়েটা পেছনে ফিরে মুচকি হাসে। কতদিন, কত মাস পর মায়ের এমন বাক্য শুনেছে সে! আবোলতাবোল কথা ছাড়া সেই আগের মতো যত্ন। মেয়েটার চোখে পানি জমে। মায়ের জন্যে আশায় ছেড়ে দিয়েছিল। কেবল মেডিসিনের জন্যে মা আরো বেশি যেনো পাগলামি করতো। অথচ গতরাত থেকে কোনো মেডিসিন খাচ্ছে না। নার্স কেবল তার বেসিক যত্ন নেওয়ার জন্যে রইলো। কারণ নুসাইবা চায় না,নার্সের যে রুটিন খাওয়া দাওয়ায় মা মেইনটেইন করতো,সেটা বাদ পড়ুক।

তাদের ছোট গেইটের সামনে গাড়ি দাঁড় করানো। নুসাইবা হেঁটে যায় সেদিকে। তবে উঠতে নিলে বুঝতে পারে কেউ নেই ড্রাইভিং সিটে। যদিও গাড়ির দরজা খোলা। তবে সে উঠলো না। দাঁড়িয়ে রইলো। তখনই সামনের বিল্ডিংয়ের কুকুরের ঘেউঘেউ শব্দে সে বুকে হাত রাখে।

এরমাঝে হঠাৎ একটা কুকুর বেরিয়ে আসে বাহির থেকে। নুসাইবা হুঁশ বুদ্ধি হারিয়ে ফেলে যেনো। কুকুরটা সেখানে দাঁড়িয়ে ঘেউঘেউ করে আবার। কিন্তু আক্রমণ করলো না।

নুসাইবা জলদি গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে বসে। একদম পাশ কেটে আরো দূরে অন্য দরজার সাথে মাথা ঠেকিয়ে রাখে।

বাহির থেকে শুনতে পায় কিছু কন্ঠ। একটা কন্ঠ তার পরিচিত। ভারী সেই গম্ভীর একটা কন্ঠই তো তাকে জ্বালাতন করে,অহংকার দেখায়!

“স্ট্রম,গো ইনসাইড। ইথেন কন্ট্রোল হিম।”

তারপর একটা পদধ্বনি। আর গাড়ির দরজা খোলার শব্দ। নুসাইবা সোজা হয়ে বসে। তার রুহ এখনো উড়ে যাচ্ছে এমন ভাব।

সে বেঞ্জামিনকে দরজা খুলে ভেতরে বসতে দেখে আতকে উঠে। লোকটা তার পাশেই বসে। একদম সটান। যেনো দেখলো না নুসাইবা এই গাড়িতে আছে।

মেয়েটা হতদন্ত। গাড়ির ভেতরটা পরখ করে দেখতে পায় এটা আগের গাড়িটা না। অন্য এক গাড়ি। এই লোকের গাড়ি! একবার উঠেছিল,তখনকার ডিজাইন। এটাই!

সে লজ্জা পায় ভীষণ।

“সরি স্যার। আমি ভুলে উঠেছি এই গাড়িতে। নেমে যাচ্ছি।”

বলেই সে নামতে নিলে বেঞ্জামিন ঘাড় ঘুরিয়ে তার দিকে তাকায়। এই চোখের চাহনী,গভীর দৃষ্টি,লোকটার আকর্ষণীয় অবয়ব সবটা মিলে যেনো নুসাইবা কল্পনা করতেও ভুলে গেলো।

“এলেক্স,গাড়ি চালু করো।”

বেঞ্জামিনের বলা রাশিয়ান কথায় মেয়েটা হতভম্ভ। লোকটা কি বলছে? কিছুই বুঝল না। পর মুহূর্তে গাড়ি স্টার্টের শব্দে বুঝলো লোকটা গাড়ি স্টার্ট করতে বলেছে।

“স্যার, সরি স্যার। আমি নেমে যাবো গাড়ি থেকে। আমাকে চাকরিচ্যুত করবেন না। ভুলে এই গাড়িতে উঠেছি। মিস্টার এলেক্স গাড়ি থামান। আমি রিক্সায় যাবো।”

তার এই কথায় কারো কিছু যায় আসলো না। এলেক্স শুধু মোলায়েম সুরে,

“সরি ম্যাডাম” বললো।

আর কিছুই না।

বেঞ্জামিনের সাথে পাশাপাশি একই সিটে বসে থেকে মেয়েটার দম বন্ধ হয়ে আসে। আগে ড্রাইভিং সিটের পাশে বসায় তাদের মাঝে হ্যান্ড ব্রেক ছিল। কিন্তু এখন,তারা দুইজন একই সিটে!

নুসাইবা আর নড়চড় করে না। একদম শক্ত হয়ে থাকে। বেঞ্জামিন মোবাইলে রাশিয়ান ভাষায় কিসব বলছে। তার কিছুই বুঝলো না মেয়েটা। কেবল দরজার সাথে লেপ্টে রইলো।

লোকটা তার কথার একটা জবাব না দিয়ে আবারও পরিচয় দিলো,ভারী অহংকারী এই আরন বেঞ্জামিন। কিন্তু সে বুঝল না,লোকটা তাদের ঘরের সামনের বিল্ডিংয়ে কি করছিল?

সামহাও,লোকটা সেই বাড়িতে উঠেনি তো! ঐ যে রাতে যে লোকটা কুকুর দুইটা নিয়ে বসে থাকে সেই লোকটা কি উনি?

নুসাইবা সেই প্রশ্ন আর পেটে রাখতে পারলো না। মাথা নিচু করে ফিসফিস করে প্রশ্ন করে,

“স্যার আপনি কি সামনের বিল্ডিংটা কিনেছেন? সেখানেই থাকেন?রাতে কুকুর দুটোকে নিয়ে বসে ছিলেন, সেই লোক কি আপনি?”

“আপনার প্রশ্নের জবাব দেওয়াটা প্রয়োজন মনে করছি না।”

বেঞ্জামিন তার মোবাইলের দিকে তাকিয়ে জবাব দেয়।

নুসাইবা জবাবটা মোটেও আশা করেনি। এতটা ঘামন্ডি,অহংকারী একটা লোক কিভাবে হয়! নিজেকে আবারো গালাগাল করে সে মনে মনে। লোকটার সাথে বাড়তি কথা বলা ভীষণ পাপ।

রমণী সোজা হয়ে বসে। মাথাটা জানালার দিকে ফেরানো।

অথচ তার প্রেমিক পুরুষ! সে তো মোবাইলেই তার প্রেয়সীকে দেখে হয়রান। পাশে যে লাজুকলতার মতো মেয়েটা মুচড়ে বসে আছে।বেঞ্জামিন হাসে কিছুটা। মেয়েটাকে রাগাতে ভালই লাগে। অভিমান করলে তার চোখ দুটো ছোট হয়ে আসে। দেখতে অস্থির। বেঞ্জামিন একটু নড়ে। নুসাইবা সেটা পরখ করে আরো হেলে যায় দরজার সাথে।

“সামান্য কথায় এত অভিমান! আর যখন আমার দেওয়া প্রস্তাবে রাজি হবে না তারপর আমার সবচেয়ে খারাপ রূপটা দেখবে,তখন কি করবে তুমি রূপসী?”

মনে মনে আওড়ায় মনস্টার।

সেই কথার উত্তর নেই। কারণ প্রশ্নটা যে করেছে উত্তরটা তারই সৃষ্টি।

একই গাড়িতে দুইজন কিন্তু নিশ্চুপ। একজন ভাবছে লোকটা এমন ঘাড়ত্যাড়া কেন! আরেকজন ভাবছে তার রূপসীকে কতরূপে নিজের সাথে মুড়ে নিবে আদরে!

________________

বেঞ্জামিন কয়েক সপ্তাহ ধরে রাশিয়ায় ছিল। সেখানে আওয়ার্ড ফাংশন হলো,তার বিজনেসের আরো কাজে নিমগ্ন ছিল সে। নুসাইবা বেঞ্জামিনের পরিবারের সাথে বসে সেই ফাংশান দেখে। অহংকারী সেই লোক যখন স্টেজে উঠে এওয়ার্ড নিচ্ছিল তখন মানুষের করতালির শেষ ছিল না। লোকটা একটুও হাসেনি। বরং গম্ভীর মাধুর্য কন্ঠে যখন বক্তৃতা দেয় সবাই একদম চুপ! আর শেষে দাঁড়িয়ে তাকে সংবর্ধনা জানায়।

লোকটার হাবভাব দেখে মানুষ ইমপ্রেস হবে ঠিকই। কিন্তু নুসাইবা জানে লোকটা কতো ইগোস্টিক।

রাশিয়ায় থাকা অবস্থায় নুসাইবা তার নির্দেশে বাসা থেকেই স্কেচ ডিজাইনের কাজ করেছে। আর কোথাও যাওয়ার হলে অফিসের গাড়িটা থাকতো। এমনকি এলেক্স বসের নির্দেশে তাদের সামনের বিল্ডিংয়ে ছিল যেটা কিনেছে বেঞ্জামিন।

লোকটা ফিরেছে আজ দেশে। নুসাইবা তাদের বাংলোতে। বিশাল এই বাংলোতে মানুষ হারিয়ে যাওয়ার সম্ভবনা আছে যদি সে নতুন হয়।

এই কয়েক সপ্তাহে পুতুলের কাউন্সিলিংয়ের কারণে হেনা একদম সুস্থ। যার ধন্যবাদ দিতেই আজ নুসাইবা তাদের বাংলোতে আসে পুতুল আর অলিভিয়ার জন্যে গিফট নিয়ে।

গিফট হিসেবে সে তার নিজের করা ডিজাইনের দুইটা শাড়ি এনেছে।

যেটা পেয়ে পুতুল মহাখুশি। যদিও পুতুল নুসাইবাকে একটু বেশি আদর করে,সেই কারণ হিসেবে মেয়েটাকে তার আত্মীয়ের জন্যে চায়। নিজের ছেলে দুটো কখনো বাঙালি মেয়ে বিয়ে করবে কিনা এই ভেবে অস্থির। তবে বেঞ্জামিন যদি এই পরীর মতো মেয়েটাকে বিয়ে করত!

মেয়েটাকে সামনে বসিয়েই এতসব কথা ভেবে ফেললো পুতুল।

অথচ সে জানে না,তার ছেলে যদি এইসব কিছু জানে মেয়েটাকে ভেঙে চুড়ে নিজের খাঁচায় বন্দী করে তালা ঝুলাবে।

_______________

ইয়াসিন হাসপাতাল থেকে ছুটি পেয়ে একটা ছোট ব্যবসা করার তাড়নায়। রাজনীতি সে পরিবারের জন্যে একেবারে ছেড়েছে। বড় মেয়ের দায়িত্ব পালন, সংসারকে আগলে রাখা সবকিছুতে নুসাইবার জন্যে বাবার গর্বের শেষ নেই। তাই মেয়ে যা বলে সেটাই গ্রহণ করেছেন তিনি।

আপাতত চেষ্টায় ছোট এই বিজনেসের হাত ধরে সেটাকে বড় করা।

ফালাকের বিয়ের দিন ঘনিয়ে আসে খুবই দ্রুত। বিয়েটাও ধুমধাম করে শেষ হয়। প্রেস,মিডিয়া,দেশী বিদেশী মানুষের আগমন এই যেনো এলাহী কান্ড ছিল।

বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে পরদিনই তথা আজ রিসিপশান। নুসাইবা শোরুম থেকে ছুটি নিয়েছিল দুইদিনের। আজকের বিশাল বড় এই অনুষ্ঠানে নুসাইবা শাড়ি পড়বে বলে ঠিক করে। সবাই শাড়ি পড়ছে। চুলগুলো স্ট্রেইট করে খুলে রাখে সে। শাড়িটাও পড়া শেষ অলমোস্ট। নিজেকে আয়নায় পরখ করে মুচকি হাসে। কমলা রঙের শাড়ির উপর সাদা পাথরের কাজ। ঠোঁটে গাঢ় রঙের লিপস্টিক। চোখে হালকা সাজ। ব্যস,এতেই মেয়েটার সাজ পরিপূর্ণ।

হাবিবা তৈরি হয়েছে কিনা এটা যাচাই করতে গেলে সে দরজায় নক করে। অনেকক্ষণ কড়া নাড়ানোর পরও

দরজা না খুললে মেয়েটা ঘাবড়ে উঠে।

কয়েকবার আবার নক করলে দরজা খুলে হাবিবা।

মেয়েটার চোখ নাক ফুলে অস্থির। নুসাইবা তার গালে হাত রাখে,দরজা বন্ধ করে,

“হাবি? কি হয়েছে?”

“আপু…আমি একটা ভুল করেছি আপু…”

“কি? কি ভুল! আমাকে বল।”

নুসাইবা বোনকে বসায় খাটে। নিজে দাঁড়িয়ে জড়িয়ে ধরে মেয়েটার মাথা।

“আপু আমি পুতুল আন্টির ছেলে ইয়ামিনকে ভালোবাসি। সেও। কিন্তু,সে চাচ্ছে আমাকে বিয়ে করতে। জলদি। আমি তো ছোট এখনো। আর তোমার বিয়েও হয়নি। আমি মানা করায়,উনি আমাকে অনেক কিছু বলেছেন। আমি উনাকে সত্যি ভালবাসি,খুব খুব ভালোবাসি।”

কলেজ পড়ুয়া বোনের এমন কথায় নুসাইবার পুরো শরীর কেঁপে উঠে। সে কিভাবে কি বলবে ভেবে পায় না। সবার আগে ভেসে আসে বেঞ্জামিনের চেহারা। লোকটা শুনলে এই সম্পর্ক কখনো হতে দিবে না। কারণ কোথায় তারা,আর কোথায় বেঞ্জামিনদের পরিবার! আগে যদিও অবস্থা ভালো ছিল। এখন তো বাবা মাত্র সব শুরু করছে। তাহলে কিভাবে কি হবে?

“এইসব কি? কখন হয়েছে এগুলো? উনি সিরিয়াস তোকে নিয়ে?”

নুসাইবা তার কান্না থামানোর চেষ্টায়।

“হ্যাঁ। ঐযে বলেছিলাম আমার ফ্রেন্ডের রাশিয়ান বয়ফ্রেন্ড দেশে আসবে। ইয়ামিনের ফ্রেন্ড ঐ ছেলেটা। তারা রেস্টুরেন্টে দেখা করে। আমিও ছিলাম। ইয়ামিনের সাথে তখনই আমার প্রথম দেখা। সে প্রথমে আমাকে ভালোবাসে,আমার প্রেমে পড়ে। আমি পরে। কিন্তু এখন উনাকেই আমি বেশি ভালোবাসি। আপু আই ওয়ান্ট হিম। কিন্তু,কিভাবে কি হবে কিছুই বুঝছি না আমি। উনি বলেছেন আধা ঘণ্টায় যেনো উনাকে জবাব দিই। নাহয় উনি যেভাবে বিয়েটা করবে সেটা কারো পছন্দ হবে না।”

বোনের কথায় নুসাইবার চোখ ভিজে আসে।

“দেখি কান্না করে না। আমি আছি তো নাকি? আমার আগে তোর বিয়ে হলে কোনো সমস্যা নেই। আমি মিস্টার বেঞ্জামিনের সাথে কথা বলব। আজকেই। এরপর দেখবি,আপু সব ঠিক করে ফেলবে। তুই ইয়ামিনের সাথে কথা বল। জানিয়ে দে,বিয়েটা হবে তোদের।”

নুসাইবা তাকে শান্ত করিয়ে বেরিয়ে আসে।

হেনা গতরাত থেকেই চাচার বাসায় বাবার সাথে। তারা কোনোভাবে আসতে দেয়নি উনাদের।

নুসাইবার অফিস আর হাবিবার কলেজ থাকায় তারা বাড়ি ফিরেছিল।

হাবিবার কথা শুনে মেয়েটা একদম ভেঙে পড়ে। বেঞ্জামিন যে কাজ ব্যতীত তার সাথে বাড়তি কোনো কথা বলে না,সেখানে মেয়েটা কিভাবে তার বোনের বিয়ের কথা বলবে…তারই ভাইয়ের সাথে?

মাথাটা টনটন করে উঠে মেয়েটার।

সে দ্রুত রুমে আসে।এলেক্সকে ফোন করে। বেঞ্জামিনের খোঁজ নেয়।

“ম্যাম বস সামনের বিল্ডিংয়ে। কিন্তু কেনো? উনি একটু বিজি আছেন। কোনো সমস্যা? স্যারকে জানাবো?”

মেয়েটা আর কথা শুনে না। সে হাবিবার রুমে গিয়ে তাকে জানায়,

“তুই অপেক্ষা কর। আমি আসছি। ইয়ামিনকে জানিয়ে দিস তোদের বিয়ে হবে শীঘ্রই। এর জন্যে আমার যা করার আমিই সব করবো।”

“কোথায় যাচ্ছো? অনুষ্ঠানে যাবে না?”

হাবিবা হাত ধরে বোনের।

“যাবো। আমি আসছি বললাম তো তোকে। দেরী হলে ইয়ামিনকে এসে তোকে নিয়ে যেতে বলবি তাও একা বের হবি না বাসা থেকে।”

নুসাইবা আর দাঁড়ায় না। সে দ্রুত কদমে ছুটতে থাকে। হিল পড়ায় পায়ে চাপ লাগছে। কিন্তু তাও থেমে নেই। সামনের বিল্ডিংয়ে গার্ড তাকে দেখতে পেয়ে বিনা বাক্যে গেট খুলে। সে ধুপধাপ করে এগিয়ে যাচ্ছে। এই প্রথম দোতলা এই বাড়িতে আসা।

এইখানে বেঞ্জামিন কাজে আসে। থাকে না। থাকে সে বাংলোতে। কোনদিকে যাবে কিছুই বুঝছে না মেয়েটা। বাহিরে গার্ড থাকলেও ভেতরে একদম ফাঁকা। উপরে যাওয়ার চিন্তা করলেও সেদিকে গেলো না। হাঁটতে থাকলো লন ধরে। যেটার শেষ প্রান্ত এই বিশাল বাড়ির দিকে। সে কয়েকটা কক্ষ দেখতে পেলো। আর এরপর বিশাল জঙ্গলের রাস্তা। যদিও চারিদিকে দেওয়াল আর গেইট আছে। সেদিকে রক্ষী নেই।

এই যাত্রায় তার শরীর হিম হয়ে আসে। সে “বেঞ্জামিন স্যার” বলে দুইবার ডাকে।

হঠাৎই দরজার আড়ালে কিছু শব্দ হয়। অন্য এক রুম থেকে একজন রক্তাক্ত অবস্থায় বেরিয়ে আসে। হামাগুড়ি দেয়।সেটা দেখে নুসাইবা চিৎকার করে ভয়ে।

তারচেয়েও বেশি অবাক হয় পেছনে থাকা লোকটাকে দেখে। আরন বেঞ্জামিন। যার শার্টে রক্তের দাগ। হাতে কলম আকৃতির কোনো ছুরি।

মেয়েটার মাথা ঝিমঝিম করে উঠে। সামনের বেঞ্জামিনকে সে চিনেই না। সুদর্শন সেই লোকের মুখে কোনো মনুষত্বের ছাপ নেই। কেবল এক হিংস্র জানোয়ার ! একটা মনস্টার!

নিচে থাকা লোকটা তার দিকে এগিয়ে এসে তার পায়ে হাত রাখলে বেঞ্জামিন পা দিয়ে তার গলায় চেপে ধরে নুসাইবার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,

“এইখানে কি, সা…ই…বা?”

“আপনি…আপনি…আপনি কি মানুষ আদৌ!”

নুসাইবা চিৎকার করে। তার গলাটা ভেঙে যাবে এমন অবস্থা। বেঞ্জামিন এই যাত্রায় খুব রেগে উঠে। ইথেন আর দোয়াদ তার পিছে। এলেক্স বাহিরে গিয়েছিল বেঞ্জামিনের কাজে।

“লক কর এটাকে ফ্রিজিং রুমে।”

রাশিয়ান ভাষায় কথাটা বলে বেঞ্জামিন তার হাতে লিকুইড ঢালে হাত পরিষ্কারের জন্যে।

“আইএম নট মানুষ বাট দা লাভার মনস্টার ফর ইউ।”

তার সেই মৌহ কন্ঠে কি ভয়ানক এক খবর! নুসাইবার গা শিউরে উঠে। সে শাড়ি খিঁচে ধরে। সাত পাঁচ না ভেবে পেছনে তাকায় একবার আবার বেঞ্জামি নের দিকে। পরক্ষণে মেয়েটা জঙ্গলের দিকে দৌড়ানো শুরু করে। হিলের কারণে তার পায়ের চোট বেড়ে যায়।

পিছনে বেঞ্জামিন যে স্থির চোখে দেখছে তার পাখি,তার খাঁচার বাহিরে উড়ে যাওয়ার চেষ্টায়!

তারপর! তারপর! বেঞ্জামিন নিজেই দৌড়ানো শুরু করে তার ছোট পক্ষীর পিছনে। নুসাইবা জঙ্গলের গভীরে দৌড়ায় এলোমেলো। সহজে জঙ্গলে যাওয়া গেলো,কারণ ছোট গেইট খোলা ছিল। এইসব লাশ টুকরো করে জঙ্গলের গহীনে জানোয়ারদের দেওয়া হয়,তাই।

দৌড়ানো নুসাইবা কেঁদে অস্থির। এতদিন কার অফিসে ছিল সে! যে একটা শয়তান? লোকটা কিভাবে এমন করে অন্যকে আঘাত করতে পারে!

পিছে শুকনো পাতার উপরে ধপধপ পদধ্বনি শুনতে পেয়ে মেয়েটা আরো কুকিয়ে উঠে। লোকটা কে? এত ধনী হওয়ার পাশাপাশি সে কি কোনো গুপ্ত সোর্সের সাথে যুক্ত!

মেয়েটা আর ভাবতে পারে না। পা ছিঁড়ে আসে তার।

পেছনে বেঞ্জামিন একটু ধীরেই দৌড়াচ্ছে তার পক্ষীকে জ্বালাতন করার সুবাদে। মেয়েটা শাড়ি পরে দৌড়াচ্ছে,চুলগুলো উড়ছে। দেখতে মারাত্মক। শাড়ির আবরণ ছুটে তার উন্মুক্ত কোমরটাও নজরে বিদ্ধ হচ্ছে।

“দৌড়াও আমার রূপসী। তুমি যেখানেই পৌঁছাবে সেখানের গন্তব্যেই পাবে আমাকে। আরন বেঞ্জামিনকে।”

লোকটার শব্দ জঙ্গলে প্রতিধ্বনিত হয়। তার কথায় গা শিউরে উঠে। কি বলছে এই মানব! তার রূপসী? আপনি থেকে সরাসরি তুমি! তাও এমন হৃদয় খুবলে নেওয়ার মতো কথাবার্তা? হু ইজ হি?

কিছুক্ষণ নীরবতা পরপর আবার ভেসে আসে লোকটার কন্ঠ,

“রান মাই কিটেন। আরেকটু দৌড়াও। এরপর এইযে গাছের সাথে লেপ্টে তোমাকে শাস্তি হিসেবে একটা কড়া চুমু নিবো।”

সেই বাক্যগুলো তীরের মতো ছারখার করে রমণীকে। ভয়ে সে অসাড়। নুসাইবা আর পারে না দৌড়াতে। সে একটা গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে।

হাতের খালি ভাব সে এখন পরখ করে।সাথে মোবাইল এনেছিল। দৌড়ানোর সময় কোথায় পড়েছে সেটা জানে না। শরীরটা বড্ড কাঁপছে তার।

বেঞ্জামিন দূর থেকে দেখে মেয়েটার লুকিয়ে থাকা সত্তা।

সে হুইসেল বাজায় খুবই সেডাকটিভ সুরে। নুসাইবা শাড়ি খামচে ধরে। এক হাতে কান চেপে ধরে। পায়ের অবস্থা খুবই শোচনীয়।পা ছিলে রক্ত বেরুচ্ছে।

“বেঞ্জামিন থেকে পালানোর পথ নেই, সাইবা। হি ইজ অলোয়েস ওয়াচিং ইউ!”

কথাটা বলেই হঠাৎ বেঞ্জামিন তার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে। নুসাইবা ভয়ে এক হয়ে গাছ আঁকড়ে ধরে।

জঙ্গলের আঁধারের মাঝে দূরে দূরে অবস্থানরত সোডিয়াম লাইটের ছড়ক বিদ্যমান। সেই আলোতে বেঞ্জামিনের ফর্সা অবয়ব স্পষ্ট। নুসাইবা গাছের গোড়ায় বসে আর লোকটা তার সামনে দাঁড়িয়ে। বেঞ্জামিনকে দেখতে পেয়ে নুসাইবা মাথা নিচু করে ফেলে। ফুপিয়ে কেঁদে উঠে,

“আমাকে যেতে দিন। আপনি কে আসলে!”

“আমি যেতে দিবো তোমাকে? তোমাকে?”

বেঞ্জামিন তার সামনে বসে হাঁটু ভেঙে। আঙুল নিজের দিকে তাক করে।

মেয়েটার ভয়ার্ত অবয়ব দেখে বেঞ্জামিন তার চুলে আঙুল বুলায়,

“কেঁদো না। শান্ত হও।”

বেঞ্জামিন তার মাথায় হাত বুলাতে চাইলে নুসাইবা সরে যায়,

“ডোন্ট টাচ মি ইউ বাস্টার্ড!”

ধাক্কা দেয় নুসাইবা তাকে। সেই হাত আঁকড়ে ধরে বেঞ্জামিন। তার নিয়ন্ত্রণে থাকা মেজাজ এখন এই নিয়ন্ত্রণে নেই। তার সামনের পক্ষীর সামনে সেই প্রেমিক সত্তা নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। ভয়ানক ক্রোধ মেয়েটার কথায় তার শরীরে কিলবিল করছে।

বেঞ্জামিন হাত টেনে তার বুকে ছিটকে নেয় নুসাইবাকে। মেয়েটা তার সাথে লেগে থাকাকে ধিক্কার জানালে বেঞ্জামিন তাকে সেভাবে চেপে ধরে দাঁড়িয়ে যায়। খুবই বিশ্রী ভাবে নুসাইবার সত্তা তার সাথে লেপ্টে নেয় গাঢ় ভাবে। শাড়ীটা এলোমেলো হয়।কাঁধ হেলে ব্লাউজ খসে পড়ে।সফেদ কাঁধ জ্বলজ্বল করে।

“এমন ব্যবস্থা করবো রূপসী,তোমাকে টাচ করার জন্যে এই বাস্টার্ডের কোনো অনুমতি লাগবে না। যখন ইচ্ছা,যেভাবে ইচ্ছা আইল টাচ ইউ।”

দুইজনের মুখ একদম সামনাসামনি। বেঞ্জামিনের দৃষ্টিতে ক্রোধ,মাতলামো আর নুসাইবার দৃষ্টিতে ভয়,ঘৃণা, লাঞ্ছনা।

“ছাড়ুন আমাকে। আমি সবাইকে জানাবো আপনি কত ভয়ানক একটা লোক। আমাকে যেতে দিন!”

মেয়েটার তুচ্ছতায় বেঞ্জামিন হাসে রূঢ়ভাবে। নুসাইবার শরীর বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে যায় বেঞ্জামিনকে প্রথমবার হাসতে দেখে। লোকটা অপার্থিব সুদর্শন। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ানক। সে গলা ভিজিয়ে নেয়। ঠকঠক করে ভেতরে।

লোকটার পুরু ভ্রু। দৃষ্টি পরিষ্কার। ঠোঁটে এক রহস্যের হাসি! নুসাইবা চোখ বুঁজে নেয়। লোকটাকে দেখলে যেনো এখনি দৃষ্টি ভস্ম হবে তার।

“আমার নাম শুনলেই সবাই ভয়ে কাঁপে আর সেখানে আমি ভয়ানক এটা সকলের কাছে জানানোর কিছু নেই। এভরিওয়ান নোস, আরন বেঞ্জামিন কি পরিমাণ রুথলেস,মাই কিটেন।”

বেঞ্জামিন নামক লোকটা মাথা আরো কাছাকাছি নেয় তার। ঠোঁট দুই জোড়ার মাঝে দুরত্ব কয়েক ইঞ্চি! লোকটার নিঃশ্বাস সুমিষ্ট। লোকটার কথায় মেয়েটার অন্তর শুকিয়ে আসে। এমন হৃদয়হীন এক লোকের এত দাপট বিশ্বজুড়ে,তাকে কে কন্ট্রোল করবে!

অথচ নুসাইবা জানেই না,লোকটার সব দুর্বলতা কেবল তাকে ঘিরেই!

নুসাইবা আর তাকাতে পারে না লোকটার দিকে।মানবের স্পর্শ বুঝতে পারছে। লোকটার হাত ঠিক তার উন্মুক্ত কোমরে। সে বিরক্ত দেখায়,নড়ে বেশ। মাথা ঘোরাতে নিলে বেঞ্জামিন তার গাল চেপে ধরে। মেয়েটার ঠোঁটে আঙুল ঘষে খুবই গভীরভাবে। বৃদ্ধাঙ্গুল তার মুখে দাবিয়ে দেয়,

“বেঞ্জামিন নামক শিকলে বন্দী তুমি রূপসী। না আছে তোমার পালানোর পথ আর না আছে আমাকে গ্রহণ না করার কোনো অপশন। বি রেডি ফর মাই নেক্সট সারপ্রাইজ, মাই রূপসী…মাই সাইবা।”

চলবে…….

কপি করা নিষেধ।

সবার মতামত জানাবেন কিন্তু। আর বেঞ্জামিনের পাগলামির ডোজ আরো বাড়াবো সামনে। হেহেহে। শুধু আমাকে সবাই কমেন্টে জানাবে তোমাদের কেমন লাগছে বেঞ্জামিনের সাইকো পাগলামি!

যেহুতু এটা রোমান্টিক ক্যাটাগরির উপন্যাস। তাই প্রত্যেক পর্বে রোমান্সের বর্ণনা থাকবে। জেনেশুনেই পড়বেন।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন