ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেম শৃঙ্খলে রুদ্ধ রূপসী

১২তম পর্ব

লেখক: সালসাবিল সারা

#প্রেম_শৃঙ্খলে_রুদ্ধ_রূপসী

পর্ব - ১২

লেখিকা: সালসাবিল সারা

(কপি করা নিষেধ)

_________________

“আমাকে কোল থেকে নামান বলছি!আপনার কোনো সারপ্রাইজ আমার দরকার নেই। আপনি একটা অসভ্য,লম্পট মিস্টার বেঞ্জামিন।আমাকে নামান প্লিজ!”

নুসাইবা সরাসরি বেঞ্জামিনের চোখের দিকে তাকায়। লোকটা তার মুখে আঙুল দিয়ে কেমন গভীর একটা স্পর্শ করে! ইস দুনিয়া ঘুরছে তার।মেয়েটার চোখে ভয়,ক্রোধ। অথচ সামনের লোকটা কিছু বলছে না। অনড়। তার চোখ,মারাত্মক এক চুম্বক যেনো। নুসাইবা সেই চোখের দিকে তাকালে আরো ঘৃণিত অনুভব করে। বেঞ্জামিন এখনো তার উন্মুক্ত কোমরে হাত চেপে রইলো।

“এইযে মিস্টার বেঞ্জামিন! আমাকে নিচে নামান বলছি। আপনার মতো লোক চরিত্রহীন হবে সেটা আমি ভাবতে পারছি না। আপনাকে আমি ভালো লোক ভেবেছিলাম…”

কথাটা শেষ করতে পারেনি মেয়েটা। এরপূর্বে একটা ঝাঁঝালো স্প্রে তার মুখে হামলে পড়ে।

বেঞ্জামিন এতক্ষণ মেয়েটাকে দৃষ্টি দিয়ে বশ করে পকেট থেকে স্প্রের ছোট বোতলটা বের করে। নুসাইবা ওভাবে কথা বলতে বলতে ঝুঁকে যায়। মাথা ঠেকায় লোকটার প্রশস্ত কাঁধের উপর।লোকটা রুঢ় হাসে। মেয়েটার গায়ে আঁচল ঠিক করে দেয়।

পিঠে আলতো হাত বুলিয়ে বিল্ডিংয়ের দিকে হাঁটতে থাকে,

“তুমি যে কোন ম্যানিপুলেটরের হাতে পড়েছো আমার সাইবা! তুমি ভেবেছো কিভাবে আমি অতিদ্রুত আমার এই রূপ তোমাকে দেখাবো? ভুলে দেখেছো ঠিক আছে, ভুলিয়ে দিবো। কিন্তু যেদিন আমার ইচ্ছাকৃত এই রূপটা দেখবে তুমি,সেদিন তোমাকে কিছুই ভুলিয়ে দিবো না। বরং অনুভব করাবো,তোমার প্রেমিক কতোটা ভয়ানক সত্তা,যার ভয়ঙ্কর কোনো ছায়া তোমার জন্যে নয় অথচ সে নিজেই এক অগ্নির ফোয়ারা হবে যদি তুমি আমার কথা না শুনো বা আমার অবাধ্য হও।”

তার আওড়ানো রাশিয়ান বাক্যগুলো জঙ্গলে প্রতিধ্বনিত হয়। বেঞ্জামিন তাকে কাঁধে তুলেই হাঁটতে থাকে।

পথে মোবাইল চোখে পড়লে মেয়েটার,সেটাও তুলে নেয়।

সে হাঁটা অবস্থায় ইথেনকে ফোন করে ইমার্জেন্সী একটা কাজের নির্দেশ দেয়।

বিল্ডিংয়ের ভেতরে যখন প্রবেশ করে বেঞ্জামিন মেয়েটাকে নিয়ে তখন এলেক্স জঙ্গলের দিকে দৌড়ে যাচ্ছিল। তাকে দেখতে পেয়ে সে থামে,

“বস,কোনো এভিডেন্স মুছতে হবে?”

“ইয়েস।জঙ্গলের দিকে গেইটে ফলস্ ওয়াল কার্ড লাগাও,এইখানের দরজাগুলোর সামনে বিশাল পেইন্টিং এনে দাও। কিছুই যেন আগের সাথে বাস্তবিক না লাগে।”

বেঞ্জামিন একটু দাঁড়িয়ে মেয়েটাকে কাঁধে ঝুলিয়েই জানায়।

নুসাইবা বেখবর তার কাঁধে লেপ্টে রয়। বেঞ্জামিন খুব সাবধানে তার পিঠের দিকে হাত ছোঁয়ায়। বিশাল সোফার মাঝে তাকে শুইয়ে দেয় আলগোছে। স্প্রের সময়সীমা বিশ মিনিট। এই স্প্রেটা ইথেন তাকে দেয় তার ইশারায়, যখন বেঞ্জামিন জঙ্গলের দিকে যাচ্ছিল নুসাইবার পিছু পিছু।

সেন্ট্রাল এসির কারণে পুরো লিভিং এরিয়ায় হিম হাওয়ার ছড়াছড়ি। বেঞ্জামিন তার কোট মেয়েটার গায়ের উপর দেয়। শাড়িতে তার প্রেয়সী মারাত্মক আদুরে। ঝুঁকে নাক ঘষে সে রমণীর কপালে।চোখ যায় নুসাইবার অধরে।মেয়েটার ঠোঁটের দিকে লিপস্টিক লেপ্টে আছে। বেঞ্জামিন তার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে। টিস্যু দিয়ে সাবধানে সেইসব পরিষ্কার করে একদম নিখুঁতভাবে। বুঝার জো নেই,এই ঠোঁটের উপর বেঞ্জামিন নিজের আঙুলে ইচ্ছে মতো ছুঁয়েছে। একটা ভারী ফ্লাওয়ার ভাস সে ভাঙ্গে সোফার পাশে।পরক্ষণে সে মেয়েটার পায়ের কাছে বসে। জুতা জোড়াতে পায়ের আঙুল ছিলে একদম কাহিল।

লোকটার ভ্রু কুঁচকে আসে। একটু ছুঁয়ে দিতে চায় সেখানে। সেই আঘাতে লোকটা মেডিসিন লাগানোর জন্য উন্মাদ। কিন্তু না! এখন করা যাবে না।

“ভাসের ভাঙ্গা অংশে ফেইক ব্লাড লাগাও অল্প।”

লোকটার আদেশে দোয়াদ কাজে লেগে পড়ে। তারপর তারা তিনজনই কাজ শেষে সোফা থেকে দূরে লিভিংরুমের কিনারায় দাঁড়িয়ে রয়।ফিসফিস করে।

বেঞ্জামিন নুসাইবার অজ্ঞানরূপে তাকিয়েই থাকে তার পাজোড়া কোলে তুলে। সময় গুণে মেয়েটার জ্ঞান ফেরার। হঠাৎই মেয়েটার চোখ পিটপিট করতে নিলে বেঞ্জামিন দ্রুত উঠে পড়ে।

অন্য সোফায় বসে পায়ের উপর পা তুলে। ভাব এমন সে মোবাইলে ব্যস্ত।

বেঞ্জামিনের কঠোর ভঙ্গিমা,তার হাতের রক্ত,সেই কলমের মতো ছুরি,জঙ্গলে তাদের ছোটাছুটি,লোকটা তার কাছে আসা,ভয়ানকভাবে ঠোঁট ছুঁয়ে দেওয়া,লোকটা তাকে কোলে নিয়ে কোমরে স্পর্শ করা সবটা তার স্মৃতিতে ভেসে আসলে নুসাইবার বুকটা ধ্বক করে উঠে।

সে চিৎকার করে উঠে “আমাকে নিচে নামান,বেঞ্জামিন স্যার” বলে।

ধীরে চোখ খুলে যখন সে নিজেকে আবিষ্কার করে সোফার উপরে। তার এলোমেলো শাড়িটা কাঁধের ঠিক জায়গায় আছে। সে গায়ের উপর কোট দেখে ভড়কে যায়। দ্রুত পা নামাতে নিলে শুনতে পায় অত্যন্ত গম্ভীর কন্ঠস্বর,

“ধীরে। পা আরো কাটবে…”(অনুবাদ)

লোকটার ইংরেজিতে বলা কথাগুলো শুনে মেয়েটা স্তব্ধ হয়ে যায়।

বেঞ্জামিন নামক লোকটা অতিদূরে অন্য সোফায় বসে। মোবাইলের দিকে তাকিয়ে। যেনো নুসাইবা এক্সিস্ট করে না।

নুসাইবার নাকের পাঠা ফুলে উঠে। সে পা নামাতেই ফ্লাওয়ার ভ্যাসের ভাঙ্গা কাঁচের টুকরোতে পা লেগে ঝনঝন শব্দ হয়। মেয়েটা বসা থেকে উঠে না। বুঝার চেষ্টায় ঘটনা কি হলো?

“হঠাৎ এখানে আসার কারণ?”

বেঞ্জামিন এইবার সরাসরি তাকায় নুসাইবার পানে। মেয়েটা কোট আরো আঁকড়ে নেয় গায়ের সাথে। চোখে পানি টলটল করছে,

“আপনি আমাকে সেভাবে ছুঁয়েছেন কেনো? আপনাকে এই অধিকার…”

“ইথেন? ম্যাডামকে সিসিটিভি দেখাও।”

বেঞ্জামিন প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে জানায়। পেছনদিকে ফিরে। ঠোঁটে ঝাঁঝালো হাসি,অথচ নুসাইবা জানেই না,তার জন্যে ফেক সিসিটিভি ফুটেজ রেডি করিয়েছে এই মনস্টার। এআই দিয়ে।

নুসাইবার পেলব আঙুল ভারী আইপ্যাড আঁকড়ে ধরে। সেখানে সিসিটিভিতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে নুসাইবা একাই প্রবেশ করে ঘরে। লিভিং এরিয়ায় হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যায়।ফ্লাওয়ার ভাস তার শরীরের সাথে লেগে ভেঙে পড়ে মেঝেতে যেটাতে সে পায়ে চোট পায়। পরপর সেখানে বাহিরের দিক থেকে ইথেনরা তিনজন আসে। আর বেঞ্জামিন নামে দ্বিতীয় তলা থেকে। হালকা ঝাপসা হলেও ঘটনা সেটাকে সত্যি বলছে। সে আর দেখে না। তাহলে এতসব ঘটনা মেয়েটা কল্পনা করেছে অজ্ঞান থেকে?হ্যাঁ। এটাই তো!

নুসাইবা মাথায় হাত চেপে বসে। ইথেন আইপ্যাড নেয়। সে পুনরায় আগের স্থানে গিয়ে দাঁড়ায়।

“সো মিস সাইবা, আবোল তাবোল স্বপ্ন দেখা শেষ হলে বলুন কেনো এসেছেন?”

বেঞ্জামিন তার দিকে ফিরে। লম্বা এই মানবের শরীরে কালো শার্টটা আঁটসাঁট লেগে রইল। ফর্সা তার চোয়াল, দাড়িহীন। দেখতে মারাত্মক। কিন্তু নুসাইবা বড্ড লজ্জায় পড়েছে।

সে হাত জোড় করে লোকটাকে বলে উঠে,

“স্যার,আইএম রিয়েলী রিয়েলী সরি। আমি আপনাকে ভুল বুঝেছি,আমার দেখা উল্টাপাল্টা স্বপ্নের জন্যে।”

“আপনি অজ্ঞান হওয়ার জন্যে এইখানে এসেছিলনে?”

বেঞ্জামিন তাকে তাচ্ছিল্যের সুরে প্রশ্ন করে। লোকটার ভারী কন্ঠে সেই কথা ভীষণ অপমানজনক। নুসাইবা মাথা নুইয়ে ফেলে। ধীর সুরে আওড়ায়,

“আমি বিশেষ কারণে এসেছিলাম স্যার।”

“পাঁচ মিনিট সময় দিলাম। বলুন।”

কাঠকাঠ কথা। বাড়তি কোনো আলোচনা নেই। আর এই লোককে নিয়ে কিনা নুসাইবা কি জঘন্য একটা দিবাস্বপ্ন দেখলো অজ্ঞান হয়ে।

“আসলে ইয়ামিন ভাইয়া আমার বোন হাবিবাকে পছন্দ করে। ইয়ামিন ভাইয়া চাচ্ছে দ্রুত বিয়েটা হোক। কিন্তু আন্টি কি মেনে নিবে এটা? আমারও এখনো বিয়ে হয়নি,আর আপনি বড় ছেলে উনার। তাই আপনি যদি আন্টিকে রাজি করাতেন…হাবিবা আর ইয়ামিন ভাইয়া একে অপরকে খুব ভালবাসে। খুব।”

নুসাইবা ইতস্তত হয়ে বলে।

“এটা বলার জন্যে একা আপনি এই বাসায় এসেছেন? ইমপ্রেসিভ! তবে এটা আমার দেখার বিষয় না। ফ্যামিলি দেখবে। আপনি এখন আসতে পারেন।”

বেঞ্জামিন তার কথায় উত্তর দেয়। নুসাইবা বেশ অপমান অনুভব করে। তার বুকটা উত্তাল হয়,এতটা অপমান লোকটা কিভাবে করেছে? এতটা অহংকারী এই লোক!

তার উপর লোকটার সাথেই সে আজ ভীষণ বেয়াদবি করেছে। ঘামান্ডি এই মানব তাকে চাকরিচ্যুত না করলেই হয়।

আসলে মেয়েটা বোকামি করেছে এই শয়তানের কাছে এসে। তারচেয়ে বরং পুতুল আরো বেশি মর্যাদা দিয়ে তার কথা শুনতো।

“সরি স্যার,আমার কোনো কথায় কষ্ট পেলে আমি আপনার কাছে…”

“জাস্ট লিভ!”

বেঞ্জামিন অনেকটা রাগী সুরে আওড়ায়। নুসাইবার হৃদয় তখনি খানখান হয়ে যায়। সে নাক টেনে বাঁক ফিরলে মনে আসে তার মোবাইলের কথা।তার ভাষ্যমতে…. স্বপ্নের অতসব ভাবতে ভাবতে মেয়েটা মোবাইল সোফায় দেখতে পায়। হাত বাড়িয়ে সেটা নিয়ে দ্রুত পায়ে হাঁটতে নিলে বুঝে পায়ের অবস্থা বেগতিক।

সে খুঁড়িয়ে হাঁটার সময় বেঞ্জামিন খুব দৃঢ় লক্ষ্য করে। হাত মুঠ হয়ে আসে তার।

অতঃপর নুসাইবাকে অতিক্রম করে সে দ্রুত হেঁটে। যাওয়ার সময় ইথেনকে বলে,

“টেক দা মেডিসিন কিট বক্স।”

ইথেন মাথা নেড়ে সায় দেয়।

বেঞ্জামিন আগেই বসে গাড়িতে। নুসাইবা তার বাড়ির দিকে যেতে নিলে দেখতে পায় বাড়িতে তালা দেওয়া। তার মানে হাবিবা চলে গিয়েছে? সে মোবাইল ওন করলে দেখে হাবিবার অহরহ মেসেজ,ফোনকল।

“আপু আমি ইয়ামিনের সাথে যাচ্ছি। তুমি চলে এসো। চাচু গাড়ি পাঠিয়েছে তোমার জন্যে।”

নুসাইবা দেখতে পায় তাদের গেইটের অন্যদিকে একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে। সেখানে যেতে নিলে বেঞ্জামিন জানালার কাঁচ নামিয়ে তাকে বলে উঠে,

“গাড়িতে উঠুন।”

“থ্যাংক ইউ স্যার,কিন্তু চাচু আমার জন্যে গাড়ি পাঠিয়েছেন।”

“যেটা বলেছি সেটা করবেন? নাকি আমি পরিস্থিতি আরো বেগতিক করবো?”

তার দেওয়া হুমকির অনেক কারণ খুঁজে বের করে নুসাইবা মুহূর্তেই। কোন পরিস্থিতির কথা বলছে লোকটা? তার চাকরি,তার বোনের বিয়ে নাকি অন্যকিছু? একটাও যদি হেরফের হয় মেয়েটার শক্ত মেরুদন্ড ভেঙে যাবে। আলগোছে সে ছন্নছাড়া বনে। লোকটার কথামতো গাড়িতে উঠে।

“থ্যাংক…থ্যাংক ইউ স্যার।”

সে কথাটা বলে ঠোঁট চেপে অন্যদিকে ফিরে।

“ম্যাম,এটা নিন।”

ইথেন তাকে মেডিসিন কিট বক্স এগিয়ে দিলে নুসাইবা বিনা বাক্যে সেটা এগিয়ে নেয়। ধীরে আঙুলের চারিদিকে মলম লাগায়। যদিও অত্যন্ত জ্বলছে কিন্তু পাশে বসা লোকটার জন্যে একটুও নড়লো না। নীরবে দুইফোঁটা অশ্রু ঝরায়। ওয়ান্টাইম ব্যান্ডেজ দেয় সে আঙুলের চারিদিকে,যেনো জুতা পরলে আর ব্যথা না লাগে।

গাড়ি চলছে নিজের তালে। বেঞ্জামিন সিটে হেলান দিয়ে মেয়েটার পানে চেয়ে রয়। পিঠ অল্প দেখা যাচ্ছে মেয়েটার চুল সরে যাওয়ায়। লোকটার শরীর উষ্ণ হয়ে আসে। ইচ্ছে করলো আঙুল একটু উঁকিঝুঁকি দিক সেই সফেদ পিঠে। ঠোঁটের স্পর্শে মাতাল করুক মেয়েটাকে!

“তোমাকে অতি শীঘ্রই আমার কাছে নিয়ে আসবো সাইবা।তখন তুমি চাইলেও এইভাবে মুখ ফিরিয়ে বসে থাকতে পারবে না। বেঞ্জামিন তোমাকে তার দিক ছাড়া বাকি দিকে ফিরে দেখা নিষিদ্ধ করবে আজীবন।”

অধর বাঁকা করে লোকটা। তার সৃষ্ট সেই উন্মাদ সত্তা শরীরে শিহরণ জাগায়। গালে হাত ঘষে সে। মেয়েটার পানে স্নিগ্ধতায় মজে।

______________

অনুষ্ঠানের রমরমা আজ অত্যন্ত। বিশেষ করে বেঞ্জামিনের বিজনেস পার্টনার সকল নানান দেশ থেকে রিসিপশনে এসেছে। বেশ জমজমাট এই অনুষ্ঠানে একেকজনের খোঁজ পাওয়া দুষ্কর। নুসাইবা খাওয়া দাওয়া শেষ করে ফ্যামিলির সাথে। হাবিবা পুরোটা সময় বড্ড চিন্তায় থেকেছে। এখনো মেয়েটা বোনের হাত ধরে দাঁড়িয়ে। চোখ জোড়া ভিজে ভিজে আসছে। নুসাইবা তাকে কোনো সংবাদ দিতে পারেনি বেঞ্জামিনের সাথে আলাপের। সেটা ধরে নিয়ে হাবিবা আরো চিন্তিত,তাদের বিয়েটা হয়তো মেনে নিবে না। আসলেই তো মেনে নেওয়ার কিছু নেই। কোথায় তারা আর কোথায় পুতুলের ফ্যামিলি!

কেনো বাবার অবস্থা এত খারাপ হলো? আগের অবস্থায় থাকলে তাদের পরিবারেরও বেশ প্রকট থাকতো!

“দেখ হাবি,এতটা ভেঙে পড়িস না। পুতুল আন্টিকে জানালে উনি এই ব্যাপারে রাজি হবেন আমার বিশ্বাস। উনি অত্যন্ত ভালো মহিলা।”

নুসাইবা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টায়।

তখনি ফোন বাজে হাবিবার। সে ইয়ামিনের ফোন পেয়ে একটু আড়ালে যায়। নুসাইবা বেশ ঘাবড়ে। সে বুঝতে পারছে না কি জানাবে ইয়ামিন! ঐ ঘামান্ডি লোকটা কি একটুও দয়াবান হতে পারে না? ভাইয়ের ব্যাপারে মাকে বলতে পারে না?

ভাবতে ভাবতেই লোকটার অবয়ব তার নজরে আসে। হাতে কোল্ড ড্রিংকসের গ্লাস ভাব একশোতে হাজার। মুখে আজীবনের মতো গাম্ভীর্যতা। দৃষ্টি হেরফের হয় না। কারো দিকেই তো তাকাতে দেখে না। আর সে কিনা এই লোককে নিয়ে কি বাজে স্বপ্ন! না দুঃস্বপ্ন দেখেছে! লোকটা জানলে তাকে বিনা কথায় চাকরি থেকে বের করবে। আর অপমানের কথা নাই বা বলুক!

নুসাইবা নজর ফেরালে তার দিকে নজর ঘুরে আসে বেঞ্জামিনের। যে মেয়েটাকে সদা লক্ষ্য করছে আড়চোখে,সরাসরি,খুবই বাজে ভাবে,গভীর ভাবে। যার একটা দৃষ্টিও মেয়েটা বুঝতে পারলো না।

লোকটার মাথায় জঙ্গলের সেই দৃশ্য ঘুরপাক খাচ্ছে। যখন মেয়েটার এলোমেলো অবয়ব তার সাথেই লেপ্টে ছিল। বুকের স্পন্দন বাড়ে। গ্লাস ছুঁয়ে দেয় সেই জায়গায়।

আরো গভীর করে তার দৃষ্টি মেয়েটার জন্যে। তার ভীতু নজর,কোমরের বাঁক,চুলের বাহার,সফেদ হাত জোড়া খুন করছে বেঞ্জামিনকে তেমনভাবে দাঁড়ানো অবস্থায়ই,

“কাছে এসেও ধরা না দিয়ে জ্বালাচ্ছো আমাকে,রূপসী? ডোন্ট ওয়ারি…তোমাকে জ্বালানোর হাজারটা থেরাপি রেডি করছি আমি। শুধু একবার আমার হও,জোরপূর্বক বা খুশি মনে..তুমি তো আমার হবেই।”

___________________

“ইয়ামিন জানিয়েছে উনি উনার মায়ের সাথে কথা বলবেন আজ। ভাইয়াকে জানিয়েছেন,ভাইয়ার কোনো আপত্তি নেই বললেন।উনি তখন অনেক ভয়ে ছিলেন উনার ফ্যামিলি বিশেষ করে উনার ভাই মানবে কিনা। তবে এখন উনার ভাই এক কথায় রাজি হয়েছে বললেন।কিন্তু আমাদের বাসায়! ওরা কি মানবে?”

হাবিবা কথাটা বলেই মাটিতে বসে পড়লো। কান্নায় সে অস্থির। নুসাইবা নিজ কানে বিশ্বাস করতে পারলো কিনা বুঝলো না। যে লোক তাকে অপমান করে তাচ্ছিল্য করে তার কথাটা ফেলনা ভেবে উড়িয়ে দিলো। আর সেই লোক কিনা ভাইয়ের কথায় একবারে হ্যাঁ জানিয়েছে!

নুসাইবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

“আমি তো নিতান্তই একটা কর্মচারী উনার জন্যে।”

সে কথাটা ভেবে বোনকে জড়িয়ে ধরে। মাথায় চুমু দেয়,

“আমার হাবি দুনিয়ার সব সুখ পাক এটাই দোয়া করি। মা,বাবাও রাজি হবে আমার বিশ্বাস।”

হাবিবা জড়িয়ে ধরে বোনকে।

অনুষ্ঠানের ভরা মানুষজন তাদের মতো ব্যস্ত। আর এদিকে দুইবোন আহ্লাদ করছে তাদের খুশিতে।

দেখা গেলো অনুষ্ঠানের শেষের দিকে যখন কেবল পরিবারের মানুষজন রয়ে গেলো, তখনই ইয়ামিন মাকে টেনে নিয়ে একপাশে বিয়ের কথাটা জানায়।

পুতুল বাঙালি মেয়েকে ছেলের বৌমা হিসেবে পাবে সেটা ভাবতে গিয়ে মুহূর্তে রাজি হয়ে যায়। আর সেখানে উপস্থিত সকলের সামনেই হেনা আর ইয়াসিনকে বলে উঠে,

“আমি আমার আত্মীয়তা আরেকটু গাঢ় করতে চাই,হেনা আপা।”

হেনা হাসে। মহিলা তার আত্মীয়ের চেয়ে বান্ধবী বেশি। সে পুতুলের কাঁধে হাত রেখে আওড়ায়,

“বলুন তবে।”

“আপনার ছোট মেয়েকে আমার ছোট ছেলের জন্যে চাচ্ছি আমি।”

পুতুলের কথায় হেনার মুখে আঁধার নেমে আসে। বড় মেয়ের বিয়ে পাকা হওয়ার কথা থেকে শুরু করে বিয়ে ভাঙার কথা সব একে একে মনে আসে। তার মাথা ভার হয়। নুসাইবা মায়ের দিক লক্ষ্য করে মাকে আঁকড়ে নেয়,

“মা তুমি ঠিক আছো?”

হেনা নিজেকে শক্ত করে বেশ। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলে,

“আমার বড় মেয়ের আগে ছোট মেয়ের বিয়ে কখনো দিবো না,আপা।আগে আমার বড় মেয়েটাকে সুখে দেখার জন্যে আমি ছটফট করছি।”

“মা প্লিজ! চুপ থাকো তুমি।আমি কোনো বিয়ে করব না এখন।তুমি হাবির কথা ভাবো।”

নুসাইবা মাকে বুঝানোর চেষ্টায়।

আরো কিছু বলতে চায় সে কিন্তু সামনে বেঞ্জামিনকে দেখতে পেয়ে চুপ করে গেলো। গলায় যেনো কেউ কাঁটাতাঁর বেঁধেছে। লোকটাকে দেখলে এত অস্থিরতা লাগে।মাকে সে শক্তভাবে বুকে টেনে নেয়।

পুতুলও হেনাকে বুঝাচ্ছে। আজিমা,নাজিম,ইয়াসিন সবাই হেনার জন্যে নানান বিষয় তুলে ধরছে হাবিবাকে ইয়ামিনের সাথে বিয়ে দেওয়ার ব্যাপারটা নিয়ে।

এরমাঝে হঠাৎ লাবিবা বলে উঠে,

“ছোট মা তুমি এত অস্থির হচ্ছো কেনো? নুসাইবা আপু যা ভালো মেয়ে ওর জন্যে হাবাগোবা কেউ একজন আসবে। তবে এইবার বিয়ে দেওয়ার জন্যে রেডি হওয়ার আগে দেখে নিও,লোকটা অলয়ের মতো দুশ্চরিত্র যেনো না হয়,অন্তত শেষ মুহূর্তে তোমার মেয়ের বিয়েটা আবার না ভাঙে।”

লাবিবার সেই কথা নিয়ে হেনা আরো বেশি ক্ষেপে যায়। জামিন এসে তাকে থাপ্পড় দেয়,

“বেয়াদপ কোথাকার। কোথায় কি বলতে হয় জানিস না যখন,তখন চুপ থাকতে পারিস না?”

“আমার বড় মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার আগে আমি ছোট মেয়ের বিয়ে দিব না পুতুল আপা। আমার মেয়েটা…অনেক কষ্ট পেয়েছে।”

হেনা বলে উঠলে নুসাইবা তার চাপা রাগ এখন ধীর সুরে বের করে,

“মা যথেষ্ট হয়েছে! আমি কোনো দুখী মেয়ে না যে আমার জন্যে ছোট বোনের বিয়ে হবে না! আমি ভালো আছি আমার লাইফ নিয়ে। তুমি হাবির বিয়ের কথা বলো। আমার লাইফের চিন্তা আমি করছি। আমার লাইফ আমি আগে গুছিয়ে নিই,বাকিটা পরে হবে। আর হ্যাঁ তুই লাবিবা…তোর আর ঐ আহাম্মকের বিষয় নিয়ে আমি ফ্যামিলির সামনে কিছুই বলছি না। ফের যদি এইসব কথা বা ঐ কুলাঙ্গাগারের কথা বলেছিস আই স্যয়ার,তোর দাঁত ফেলবো থাপড়িয়ে।”

নুসাইবা হাত মুঠ করে নেয়। রাগ কমানোর চেষ্টায় সে। মায়ের পাশ থেকে উঠে সে পিলারের দিকে এগিয়ে যায়। একটু একা থাকলে ভালো লাগবে। চিৎকার চেঁচামেচি তার অপছন্দের। বুকটা ফেটে যাচ্ছে যন্ত্রণায়।যদিও সে লাবিবাকে চিৎকার করে কিছু বলেনি তাও সে অশান্তিতে। মেয়েটা শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।অজানা ক্রোধে তার চোখ ভারী হয়ে আসে। নেমে যায় অশ্রুর বাঁধ।

বেঞ্জামিন মেয়েটার এই ক্রোধে মত্ত চেহারায় আরো হন্য হয়ে উঠে। সে পুতুল থেকে শুনেছিল হেনার এমন পরিস্থিতির ঘটনা। অলয় একটা কিট যার ঘটনা বেঞ্জামিন জানে।তার প্রেয়সীকে কষ্ট দেওয়ার কারণে তাকে সে এক্সিডেন্ট করিয়ে এক পা ছিনিয়ে নিয়েছে। যেটা কেউই জানেনা,অথচ নিজের সাইকোপ্যাথের বৈশিষ্ট্যের কারণে বেঞ্জামিন তার প্রেয়সীর চোখে এককালে কান্না আনা লোককেও ছাড়ল না।

নুসাইবার দিকে দৃষ্টি দেয় বেঞ্জামিন।মেয়েটার এমন নরম আদুরে ক্রোধের হাসফাঁস দেখে সে নীরবে ঠোঁট ভিজিয়ে নেয় জিহ্বা দিয়ে,

“দ্যাটস মাই গার্ল। বেঞ্জামিনের মেজাজের আগুনের ফোয়ারায়,তোমার নরম মেজাজের একটু তো তাপ থাকা দরকার। ভেরি ইমপ্রেসিভ…মাই সাই….বা।”

বেঞ্জামিন সেদিকে হেঁটে যায় যেদিকে নুসাইবা দাঁড়িয়ে রয়।

সে আলগোছে নুসাইবার পেছনে দাঁড়ায়। স্পষ্ট দেখছে মেয়েটা কেঁপে উঠছে কান্নার কারণে। এতটুকু জীবনে কম কষ্ট সহ্য করছে না সে!

“ডোন্ট ক্রাই সাইবা। একবার আমাকে কাছে টেনে নাও,কোলে তুলে নিয়ে তোমার সব যন্ত্রণা আমি প্রাণভরে শুষে নিবো।”

লোকটা গালে হাত ঘষে ভাবে। ইচ্ছে করছে মেয়েটার সব কান্না সে নিজেই আদরে পুষিয়ে নিক।

নুসাইবা হাতের আদলে চোখ মুছতে নিলে শুনতে পায় পরিচিত দাম্ভিক সুর,

“ফ্যাচফ্যাচ না কেঁদে আপনাদের ম্যালো ড্রামা শেষ করুন জলদি। কালকে শোরুমে আর্লি চলে আসবেন।হিউজ কাজ বাকি রেখেছেন।”

মেয়েটা পেছনে ফিরে। লোকটা তার সন্নিকটে দাঁড়িয়ে।

“সরি স্যার। যাচ্ছি।”

কথাটা বলে সে চোখ মুছে নেয়। চোখটা বারবার ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। ঘামান্ডি এই লোকের জন্যে সে কি কান্নাও করতে পারবে না?

সে ত্রস্ত পায়ে এগুতে নিলে শাড়িতে পা প্যাঁচিয়ে পড়তে নিলে বেঞ্জামিন তার বাহু চেপে ধরে।হাত টান দিয়ে সোজা করে দাঁড় করায়। নুসাইবা শাড়ির আঁচল খামচে নেয় দ্রুত। লোকটা তাকে আবারো বাঁচালো!

দৃষ্টি মিলে দুজনার। নুসাইবা ঘোলা দৃষ্টিতে এই লোকের শক্ত চোয়াল দেখে হিমশিম। বুকটা শুকিয়ে আসে। লোকটার উচ্চতায় তাকালে তার মাথাটা ভার হয়। বিশাল এই লোক বারবার তাকে কিভাবে যেনো সামলে নেয়।

বেঞ্জামিনকে “ধন্যবাদ” দেওয়ার জন্যে মুখ খুলতে নিলে বেঞ্জামিন তার দিকে হালকা ঝুঁকে তাকে অত্যন্ত নিচু গভীর কন্ঠে বলে উঠে,

““স্ট্রেঞ্জ মিস সাইবা…আমার গায়ে কি নেশালো কোনো দ্রব্য থাকে, যে আপনি আমার আশেপাশে থাকলে অজ্ঞান হোন নাহয় পা পিছলে পড়েন! হুহ!”

চলবে……

কপি করা নিষেধ।

কেমন হচ্ছে গল্প অবশ্যই জানাবেন।

হেহেহে যারা ভেবেছো আজকে কিছু একটা হবে ওদের বিয়ের…তাদেরকে সমবেদনা। কেমন দিলাম হু!

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন