ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেম শৃঙ্খলে রুদ্ধ রূপসী

২০তম পর্ব

লেখক: সালসাবিল সারা

#প্রেম_শৃঙ্খলে_রুদ্ধ_রূপসী

পর্ব - ২০

লেখিকা: সালসাবিল সারা

(কপি করা নিষেধ)

_________________

“এই ঘামান্ডি লোকটাকে কি প্রশ্ন করবো? কিছু বললেই তো চেপে ধরে তার ঠোঁট দিয়ে, গলায় দাগ বসায় বেহায়াটা। মাঝে মাঝে মনে হয় লোকটা আমাকে বিয়ে করার পিছে একটা ক্রোধের কাহিনী আছে। কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয় বিয়ের কারণ ঠিক উল্টো। পাষাণ মানুষকে বোঝা আমার পক্ষে অসম্ভব।”

নুসাইবা নিজের ভারী হাতের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো ভাবতে থাকে। তাদের বিয়ের দিন অতিবাহিত হয় মাস খানেকের মতো। অথচ বিয়ের কারণটা এখনো পাষণ্ড লোকের মুখ থেকে জানতে পারল না। বিষয়টা নিয়ে কথা বললেই লোকটার ঠোঁটের, হাতের অবাধ্য স্পর্শের হামলার শিকার হয়। চেয়েও বাঁধা দিতে পারে না।

কেমন জোরালো সেই স্পর্শ! ভাবলেও গায়ে কাটা দেয়। বাদবাকি ঘুমানোর সময় তো লোকটা তার গায়ে হাত না দিয়েই যেনো ঘুমাতে পারে না। নুসাইবার হাতের উপরেই বেঞ্জামিনের মাথা রাখা আলতো করে। এক হাতে মেয়েটার উন্মুক্ত কোমর জড়িয়ে।

মানব কেমন বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। চুলগুলো কিছু এলোমেলো। নাকটা সরু। চোখের পাপড়ি অত্যন্ত ঘন। গাঢ় নিশ্বাস বুঝাচ্ছে লোকটা নিশ্চিন্তের একটা ঘুমে মগ্ন। এই মুহূর্তে লোকটাকে বড্ড শান্ত দেখাচ্ছে। বুকের মাঝে ধুকধুক একটা শব্দ কানে আসছে নিভৃতে। নুসাইবা আরেকটু ঝুঁকে। লোকটার চেহারার নকশা নজরকাড়া। এখনকার অত্যন্ত চুপচাপ মানব যে একটা দানব,যে তাকে জোর করে বিয়ে করেছে,কেনো করেছে সেটাই মাথায় আসে না। লোকটার যা স্ট্যাটাস, নুসাইবার চেয়েও দামি মেয়ে তার জীবনে আসা খুব মামুলি একটা ব্যাপার ছিল।

কিন্তু….এখন সবটাই অন্যরকম। রাগী,বদমায়েশ মানবের বউ নুসাইবা। সত্যি বলতে একমাস যাবত লোকটার সাথে লেপ্টে ঘুমানো তার অভ্যাসে রূপান্তর হয়েছে। সে গায়ের সাথে না লাগা অব্দি,লোকটা তাকে চেপে ধরা না অব্দি ঘুম আসে না। তাই,যত রাত হোক; বেঞ্জামিন এলেই মেয়েটা ঘুমায়। তবে স্বীকার করতে চায় না মেয়েটা কিছুই। কেমন নিজেকে পাথর করে রাখতে চায়। অথচ নিজেই জানেনা,লোকটা তার সবচেয়ে খারাপ মোহতে পরিণত হচ্ছে।

নুসাইবা পলক ফেলে। একটা অবাধ্য হাত আচনক তার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে চাইলেও সে হাত গুটিয়ে ফেলে। অন্য হাত ভার হয়ে আসে। সে হাতটা নাড়াতে চেয়েও পারে না। লোকটা অসম্ভব ভারী।

নুসাইবা কিছুটা উঠে বসতে চায়। তবে,শক্তি কুলায় না। সে ওভাবেই আধ বসা হলে,বেঞ্জামিন তাকে টেনে নেয়। মেয়েটার বুকের মাঝে মুখ ডুবিয়ে “উম” শব্দ করে।

কেঁপে উঠে নুসাইবা। অন্য হাতে লোকটার ঘাড় চেপে ধরে,

“সরুন, সরুন। সাতসকালে কি শুরু করেছেন?লম্পট কোথাকার!”

বেঞ্জামিন তার কথায় সরলো না। বরং “লম্পট” কথাটা শুনে সেটার মতোই কাজ করলো। দন্ত স্পর্শ করে মেয়েটার সত্তায়। সেখানেই মুখ গুঁজে জানায়,

“এখন একটা পারফেক্ট লম্পটের মতো কাজ করেছি।”

কিড়মিড় করে উঠে নুসাইবা। ঘাড়ে চিমটি দেয় সজোরে। লোকটা সরে না। পূর্বের জায়গায় আবার অনুভব করে সেই অবাধ্য স্পর্শ! এইবার চোখে জল জমে তার। চামড়া উঠিয়ে নিয়েছে নাকি?

“আমার হাতটা ভেঙে যাচ্ছে। এতবড় একটা লোকের মাথার ভার কিভাবে নিবো?”

“পুরো শরীরের ভার যখন পড়বে তোমার উপর,তখন তোমার কান্নারত মুখটা দেখে তো আমি সব সীমার লঙ্ঘন পেরিয়ে যাবো, সাই….বাহ।”

বেঞ্জামিন মাথা তুলে। মেয়েটাকে দেখে। লাল হয়ে আছে তার চোখ। ইস,সামান্য কামড়ে এমন নাজেহাল হলে কিভাবে হয়! মেয়েটাকে যে তার পুরো সত্তার পাগলামি সামলাতে হবে। কিভাবে কি করবে তখন পুচকি মেয়েটা! হ্যাঁ,তার তুলনায় নুসাইবা তো পুচকি।

“আপনার দ্বারাই এমন আজাইরা আলাপ করা সম্ভব। দিবাস্বপ্ন দেখা ভালো,কিন্তু এতটা না।”

“আমার স্বপ্নে তুমি পারো সবটা। কি কি পারো সেইসব কি দেখাবো প্র্যাক্টিকাল?”

বেঞ্জামিন উঠে বসে। সে নুসাইবার দিকে গম্ভীর দৃষ্টি দিলে মেয়েটার শরীর হিম হয়ে আসে। লোকটার নজর অত্যন্ত অশালীন। নুসাইবা বেঞ্জামিনের চোখে বালিশ দিয়ে ঢেকে বিছানা থেকে দৌড়ে ওয়াশরুমে যায়। যেতে যেতে আওড়ায়,

“ছি! একটা মানুষ কিভাবে এমন বেহায়া হয়?”

বাথরুমে ঢুকেই সে দরজা বন্ধ করে। লোকটার উদোম শরীরের ছবি তৎক্ষণাৎ ভেসে বেড়ায় দৃষ্টিতে। ইস! আয়নাতে নিজের সত্তা দেখলে মেয়েটা কেঁপে উঠে। পাতলা একটা নাইটি পড়নে সে। যদিও উপরে কোটি আছে। তার গলার নিচে দুইটা লাল চিহ্ন স্পষ্ট। রুক্ষ,সুদর্শন মানবের স্ত্রী সে,এটাই তার নির্দেশনা হিসেবে ভেসে উঠে।

মেয়েটা আয়নায় নিজের এহেন লজ্জাশীল মুখ দেখে অত্যন্ত ভড়কে যায়। পরক্ষণে নিজ মুখ হাত দিয়ে ঢাকে,

“অশ্লীল লোকটার জন্যে আমার মাথায়ও কিসব ঘুরছে!”

সকাল থেকেই প্রচুর ঝড় তুফান। বাংলোর চারিদিকে গাছপালা পরিবেশকে আরও উন্মত্ত করে তুলেছে। নুসাইবা লনের দিকে এসে থেমে যায়। নিচে সকলে নাস্তা করতে উদ্যত। বেঞ্জামিন গিয়েছে নাকি সে জানেনা,ওয়াশরুম থেকে বেরিয়েই লোকটাকে দেখেনি নুসাইবা। সেও এখন নিচে যাচ্ছিল। কিন্তু এমন বৃষ্টি বাদল দেখে মনটা সেখানেই স্থির হয়ে যায়। মেয়েটা বৃষ্টিপ্রেমী। ছোটবেলা থেকে বৃষ্টির একটু স্পর্শ পেতে কেমন মরিয়া হয়ে থাকতো। থাই গ্লাসে গড়িয়ে পড়া পানিতে সে হাত রাখে। ছুঁতে পারছে না সেই বাদলের ধারা তবে অজান্তেই মুখে হাসি ফুটে উঠে।

গুনগুনিয়ে গানের সুর তুলে,

“বাদলের ধারায় মন হারায়… ছুটতে চায় এই মন তোমার ইশারায়,মাতাল করো আমায় স্পর্শে তোমার,ভিজিয়ে দাও সকল সত্তা আমার।”

ঠান্ডা পরিবেশ আর চুপচাপ লন। গানের সুর অত্যন্ত মন মাতানো। মেয়েটার পেছনের পিলারে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো বেঞ্জামিন। মেয়েটার কণ্ঠের টানে সিঁড়ির দিক থেকে সে এই জায়গায় আসলো। মেয়েটার এমন বিলাসী রূপ তার মাতলামোকে বাড়িয়ে দেয়। শাড়ির আঁচল উড়ছে অনায়াসে। পিঠ সমান চুল দুলছে। মেয়েটার সুবাস স্পষ্ট নাকে জ্বালাতন করছে পাষাণ লোকটার। অথচ হুট করেই ভ্রু কুঁচকে আসে বেঞ্জামিনের। মেয়েটার কোমরের দিকের শাড়ির পিন খুলেছে বোধহয়। সেথায় পরিষ্কার মেয়েটার কোমর। সেখানে থাকা একটা লাল তিল যেটার পাশে বেঞ্জামিনের নখের আঁচড়।

হাঁটতে হাঁটতে মেয়েটার দিকে এগিয়ে যায় সে। থমথমে পরিবেশে বৃষ্টির রোনাদলে পরিষ্কার শোনা যায় লোকটার অবাধ্য কন্ঠ,

“রুমে নিয়ে শাড়ি পুরোটা খুলবো?”

হচকিয়ে উঠে নুসাইবা। বৃষ্টির জন্যে বের হওয়া অজানা সুর গলাতেই আটকে রইলো। শরীরের কাঁপন চোখে লাগছে। পেছনে ফিরতে পারে না। এরপূর্বে লোকটার দানবীয় অস্তিত্ব তাকে গ্লাসের সাথে আটকে নেয়। তবে শরীর লেপ্টে যায় লোকটার হাতের সাথে।

“ছাড়ুন! ঘরের মধ্যে এমন বেহায়াপনা করবেন না। আপনার মান সম্মান নেই। আমার আছে।”

“তোমার জন্যে আমার বেহায়াপনা কোথাও কমবে না। শাড়ির পিন খোলা কেনো? তোমার বেয়ার স্কিন,সেনসিটিভ পার্ট আমার দৃষ্টি ছাড়া অন্যকারো ভুল দৃষ্টিতে পড়লেও তাকে আমি হত্যা করবো।”

মেয়েটার বুকে শব্দ হয় দৃঢ়। চোখের পাতা নড়ে। শেষ কথাটা নিশ্চয় মনগড়া কথা। ঐযে উপন্যাসের খলনায়কেরা যেমনটা ঢোপ দেয় আরকি! অথচ সে জানেনা,তার স্বামী মেয়েটার জন্যে এক বদ্ধ উন্মাদ। যার জন্যে অন্যকে হত্যা করতেও কয়েক সেকেন্ড সময়ের ব্যাপার।

নুসাইবা সরতে চায়। কিন্তু বেঞ্জামিন দেয় না। মেয়েটা বুঝলো উত্তর না দিলে ছুটি নেই। তাই সে ইতস্তত হয়ে জানায়,

“খুলেছে হয়তো। লাগাচ্ছি।”

“রুম থেকে বেরুনোর আগেই সব দেখেশুনে বের হবে, সাইবা।”

বেঞ্জামিনের গভীর কন্ঠ। অত্যন্ত গম্ভীর সেই সুর। গায়ের লোমকূপ অব্দি শিহরণ বয়ে আনে।

“হুম।”

মেয়েটা ছোট করে জানায়। কোমর হাতড়ে পিন সেট করে। বেঞ্জামিন সেইদিকে নজর দিয়ে সব ঠিকঠাক বুঝে বধূর কপালের কিনারায় ওষ্ঠ স্পর্শ করে,

“ব্রেকফাস্ট করে নাও,বেলা হচ্ছে।”

বেঞ্জামিন পিছন ফিরে হেঁটে যাওয়ার জন্যে উদ্যত। কিন্তু তখনই শুনতে পায় একটা চিকন মাতোয়ারা কন্ঠ,

“আপনি..আপনি খেয়েছেন?”

বিয়ের এতটা সময় পর মেয়েটার মুখে প্রথমবার প্রশ্নটা শুনে বেঞ্জামিনের অধর বাঁকা হয়ে আসে। সে পিছন ফিরলো না। কারণ মুহূর্তটা এমন,মেয়েটাকে গ্লাসের সাথে আটকে তার উত্তপ্ত অধরে অধর শুষে নেওয়ার মতো। তবে নিজেকে এমন করে উপস্থাপন করবে না বেঞ্জামিন। তার ঘুঘু নিজ থেকেই তাকে ধরা দিবে,অতি জলদি। মনস্টারের বিশ্বাস এটা।

“না।”

হিম শিথিল এক বাক্য। যেটার মানে অনেককিছু বুঝায়। এটাতে কি ক্রোধ ছিল? নাকি কোনো ধ্বংসের সুর। এতটুকু বলে হনহন করে হাঁটতে থাকে। শব্দ হয় সু-হিলের। প্রত্যেকটা পদক্ষেপে নুসাইবার মনের মাঝে প্রশ্নের ঝড় উঠে। কিন্তু লম্বাটে সেই মানবের দাঁড়ানোর জোর কই? সে তো অনায়াসে হেঁটে চোখের সামনে থেকে মিশিয়ে গেলো।

নুসাইবা গায়ের উপর শাড়ি টেনে দেয়। বৃষ্টির রিনিঝিনি নৃত্য দেখে কিছুক্ষণ সময় পার করলেও পেটের ডাকে নিচে যায় ডাইনিংয়ে। হাবিবা তখন খেয়ে উঠেছে। পুতুল নুসাইবাকে দেখে বলে উঠল,

“ছেলেটা কিছু না খেয়ে চলে যায়। ইচ্ছে করলে খেতে বসে নাহয় না। কিশোরকাল থেকেই এমন। ছেলেটা আমার এমন গম্ভীর। কখন খাবে কোথায় খাবে কিজানি! খেয়ে নাও আম্মু।”

পুতুল নিজেও খাবারে মন দেয়।

“জ্বি।”

নুসাইবা ছোট্ট করে জবাব দেয়।

“ইয়ামিন ভাইয়া কোথায়?”

নুসাইবা মুখে প্রশ্নটা করলেও ভাবছে বেঞ্জামিনের কথা। লোকটা সে খায় না খায় সবসময় খবর নেয়। কিন্তু নিজের বেলা কোনো খোঁজ থাকে না। এমন পালোয়ান শরীর বাহিরে কি খাইয়ে বানিয়েছে আল্লাহ্ জানে। একসাথে বসে খেলে সমস্যা বা কিসে? নুসাইবার কি বেঞ্জামিনকে বলা উচিত ছিল খেয়ে বেরুনোর কথা?

“উনি সকালেই বেরিয়েছেন। সেনিয়ন ফাইভ স্টারের কাজ শুরু হবে আজকে থেকে। সেখানেই গিয়েছেন।”

হাবিবা হেসে জানায়।

নুসাইবা কেবল মাথা নাড়ায়। নাস্তাটা নানান ভাবনার মাঝেই শেষ করে।

বেলা বাড়লে বৃষ্টি বাড়ে। এই বৃষ্টিটা স্বাভাবিক না। দুনিয়া ভেঙে আসার উপক্রম। নুসাইবা কেনো জানি আজ মনকে শান্ত রাখতে পারছে না। সে কিছুক্ষণ হাঁটছে তো বসছে। হাবিবা তার সাথেই আছে রুমে। দুইজন মিলে টুকটাক কথা বলছে,হাসছে। যদিও নুসাইবার মন কিসের জন্য আনচান করছে সে জানেনা। সে বুঝছে না। সকাল থেকেই যেনো মনটা তার কু ডাকছে। এরমাঝে হাবিবা তাকে বলে উঠে,

“আপু,বারান্দা দিয়ে বৃষ্টিতে ভিজি। চলো নাহয় ছাদে যাই!”

“যাবি?”

নুসাইবা মুখে হাসির রেখা টেনে আওড়ায়।

“যাওয়ার জন্যই তো বললাম।”

“ছাদে না তবে পুলের দিকে যাওয়া যাক।”

মেয়েটা উঠে দাঁড়ায়।

“ওকে।”

দুইবোন দ্রুতই পৌঁছে পুলের দিকে। পুলের পানি ইতিমধ্যে টইটুম্বুর বৃষ্টির পানিতে। উপরের খোলা ছাদে থেকে পানির ধারা সেটাতে পূর্ণ হয়েছে। বজ্রপাত হলেও ভয় নেই। কারণ এইদিকে বিশাল কাঁচ দ্বারা ঘেরাও দেওয়া। নির্দিষ্ট গার্ড সব অন্যদিকে। জায়গাটাতে আসা নিষিদ্ধ তাদের।

নুসাইবা পুলের কাছে পৌঁছালে তার সত্তায় ঝপঝপিয়ে পড়তে থাকে বৃষ্টির রোনাদল। দুইহাত তুলে সে পানি দিয়ে মুখে আয়েশ করে। হাবিবা পুলে নামে। সেখান থেকে পানি ছিটিয়ে মারলে খিলখিল করে হাসে দুইবোন।

খুনসুটিতে মাতানো তাদের মুর্হুতে মেইড এসে হাবিবাকে জানায়,

“ইয়ামিন স্যার এসেছেন।”

অতঃপর হাবিবা তড়িঘড়ি করে বাথরোব গায়ে টেনে এগিয়ে যায় মেইডের পিছনে।

নুসাইবা পুলেই বসে রয়। বৃষ্টির মাতোয়ারা আর ঠান্ডা পানিতে ডুবন্ত তার সত্তা,যেনো এক অন্য দুনিয়ায় হাজির। তবে মাথা থেকে কঠোর লোকটার ভাবনা যাচ্ছেই না। আর সবচেয়ে বড় কথা ঘামান্ডি লোকটা তাকে বিয়ে করার কারণটা এখনো মস্তিষ্কে দাপিয়ে বেড়ায়।

সোফার উপর রাখা মোবাইলটা রিং হয় নুসাইবার। ভেজা সত্তা নিয়েই সে মোবাইলের দিকে এগিয়ে যায়।

মায়ের ফোনকল ভেসে বেড়াচ্ছে। সে ফোন রিসিভ করে মায়ের খবরাখবর নেওয়ার পূর্বেই ভেসে আসে মায়ের কান্নারত কন্ঠস্বর,

“তোর আব্বা আমাকে একটু আগে ফোন করেছিল। ফোপাচ্ছিল অনেক,আমাকে বলেছে মাফ করে দিতে। বেঞ্জামিনের সাথে দেখা করার কথা ছিল,কি ব্যাপারে জানিনা। তবে এখন কোনো ফোন ধরছে না।আমার খুব চিন্তা হচ্ছে। তুই একটু দেখ…মা।”

কথাগুলোতে কেমন আর্তনাদ। নুসাইবার রুহ ধড়ফড় করে। তার বুকে ব্যথা হয়। সে বুঝতে পারলো না কি করবে। ওভাবে দৌড়ানো শুরু করে। মাকে শুধু এতটুকু বলে,

“আমি দেখছি। হাবিবাকে বলো না কিছু।”

ব্যস। কথা নেই কিছু নেই। ভেজা শরীরে এই ঝুম বৃষ্টিতে বেরিয়ে যায় সে। পুলের দিকে দরজা দিয়ে সহজে সবার দৃষ্টির অগোচরে গ্যারেজ খুঁজে নেয়। গ্যারেজে দাঁড়ানো কয়েকটা গাড়ির মাঝে একটা গাড়িতে উঠে যায়।

বাবার কি হয়েছে? লোকটা…সেই বেঞ্জামিন নামক শয়তান লোকটা বাবার ক্ষতি করেছে? হ্যাঁ,তাকে কষ্ট দেওয়ার জন্যই তো লোকটার এত আয়োজন।

লোকেশন অন করে বাবার লোকেশন দেখার ট্রাই করে। ড্রাইভারকে আবোলতাবোল অনেক কিছু বলে। শেষমেশ বেঞ্জামিনের লোকেশন খুঁজে পায়। জেনারেল লিমিটেড হাসপাতাল!

হাসপাতাল! নুসাইবা এলোমেলো করে লোকেশন বলে ড্রাইভারকে। সেইভাবেই গাড়ি ছুটতে থাকে।

হঠাৎই পেছন থেকে অন্য গাড়ির শো শো শব্দ। সেই কালো গাড়ি নুসাইবাদের গাড়ির পাশাপাশি এলে জানালার গ্লাস খুলে মাথা বের করে ইথেন।ড্রাইভারকে বলে,

“বাংলোতে ব্যাক করো গাড়ি।”

“নাহ। নাহ। নাহ।আমি হাসপাতালে যাবো। দূরে যান আপনি। নাহয়…নাহয়…”

কথাটা বলে সে আশেপাশে কিছু খুঁজে। ড্রাইভারের পাশে স্ট্যান্ডে রাখা রিভলবার টেনে নেয়। সেটা তাক করে ড্রাইভারের দিকে,

“গাড়ি থামবে তো আপনার খুলি উড়বে।”

ড্রাইভারের গায়ে দিয়ে ঘাম বেরিয়ে পড়ে। অত বৃষ্টিতে গাড়ির চাকা হুমড়ি খেয়ে পড়ছে বারংবার। আর পিছে ম্যাডামের রক্তাক্ত চক্ষু!

ইথেন মাথা ঢুকিয়ে ফেলে গাড়িতে। ফোন করে সাথে সাথে তাদের বসকে,

“বস, ম্যাম শুট করতে চাচ্ছে। আমরা প্রায় চলে এসেছি লোকেশনে।”

কথাটা বলতে বলতেই কল ডিসকানেক্টেড দেখায়। নেটওয়ার্ক ইস্যু।

“জলদি গাড়ি চালান। নাহয়…”

মেয়েটা হুদাই রিভলবার নিয়ে নড়াচড়া করে। ড্রাইভার ভয় পেয়ে গতি বাড়ায়।

ইথেন ড্রাইভারের এলোমেলো ড্রাইভিং দেখে চোখ বুঁজে। বসকে ফোন দিতে চাইলেও নেটওয়ার্ক এরোর দেখাচ্ছে। সে স্টিয়ারিংয়ে হাত থাপড়ে বলে উঠে,

“ফাকিং বুলশিট! বস,আজকে দুনিয়া জ্বালিয়ে দিবে মনে হচ্ছে।”

তার বলা রাশিয়ান চিন্তিত সুর গাড়িতে উপস্থিত দুই বাঙালি গার্ড না বুঝলেও অনুমান করে খারাপ কিছুর ইঙ্গিত বুঝাচ্ছে।

হাসপাতালের সামনে গাড়ি থামার আগেই কিছুটা দূরে তাদের গাড়ির সামনে বেঞ্জামিনের গাড়িটা স্পষ্ট। বাড়ির গাড়ি দেখে দ্রুত ড্রাইভিং থামিয়ে সে গাড়ি থেকে নেমে পড়ে। নুসাইবা তাকে দেখে তড়িঘড়ি করে নামে গাড়ি থেকে। হাতের রিভলবার উল্টো দিকে করে প্যাঁচিয়ে রইলো। বডিগার্ডস চারিদিকে গোল করে দাঁড়ায় পেছন দিক ফিরে। একটা বেষ্টনীর মতো তৈরি করেছে। সবার দৃষ্টি অন্যদিকে, সতর্কে।

মেয়েটার ভেজা সত্তা দেখেই কপালের রগ ফুলে উঠে বেঞ্জামিনের। সে দূর থেকেই চিল্লিয়ে বলে,

“গাড়িতে উঠো এখনই। সাইবা,ডোন্ট ক্রস ইওর লিমিট!”

“লিমিট? কিসের লিমিট? আপনি কি ভেবেছেন আমার বাবাকে হাসপাতালে ভর্তি করাবেন ক্ষতি করে আর আমি জানবো না? আপনি একটা শয়তান। আচ্ছা কি ক্ষতি করেছি আমি আপনার? আমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্যই আমার বাবাকে আপনি কি করেছেন? বলুন? কি করেছেন?”

বেঞ্জামিন মেয়েটার সামনে পৌঁছায়।লোকটার সুদর্শন দৃষ্টি যা আজ সকালে তার প্রতি চাহিদায়,মাতালতায় পূর্ণ ছিল সেথায় এখন কেবল ক্রোধ আর ঈর্ষা!

মেয়েটা তাকে গুলি তাক করে সোজাসুজি। সেই গতবারের মতো, উল্টো। বেঞ্জামিন তার হাত থেকে রিভলবার নিয়ে ফেলে সহজেই। নিজের হাতে নেওয়া কোট দিয়ে অনায়াসে ঢেকে দেয় মেয়েটার শরীর। হাঁটু অব্দি ঝুলছে কোট। বধূর গাল চেপে অত্যন্ত নিম্ন কন্ঠে মাদক নামিয়ে শুধায়,

“এক চড়ে সব পাগলামি বের করব। বৃষ্টিতে ভিজে নায়িকা সাজা হচ্ছে? আমার সামনেই তোমার *ক্সী রূপ থাকবে। বাড়াবাড়ি করলে কিন্তু আজই আমার নিচে পিষ্ট করছি তোমাকে। তোমার কোনো কিছুই আমি শুনবো না।”

তার সেইসব কথায় নুসাইবা রেগে হন্য হয়ে কলার চেপে ধরে বেঞ্জামিনের,

“আমার কেয়ার করি না আমি। বলুন,আমার বাবাকে কি করেছেন? কেনো আমার সাথে এমন করছেন আপনি? আমাকে কতটুকু কষ্ট দিলে আপনি শান্তি পাবেন? আমাকে কষ্ট দিন কিন্তু বাবাকে কেনো? হুয়াই?”

লোকটার যা ক্রোধ ছিল সেইসব এখন মাথার উপর টগবগ করছে। মেয়েটার মুখে বৃষ্টির ঝাপটা পড়লেও সেটা আকর্ষিত করলো না বেঞ্জামিনকে। বরংচ প্রিয়তমার নরম হাতজোড়া তার কলার ধরতে বেগ পাচ্ছে কিন্তু মেয়েটা তাও অগ্নিরূপ ধরে রাখায় বেঞ্জামিন তার কোমর খামচে ধরে। মিশিয়ে নেয় নিজের সাথে বিশ্রীভাবে। দুইজনের শরীর পিষ্ট হচ্ছে দুইজনায়। তাদের দৃষ্টি মিললে বেঞ্জামিন গগণবিধারক চিৎকার করে বলে উঠে,

“ আজ থেকে ফ্যামিলির মুখ দেখা ছাড়া সংসার করা শিখবে তুমি। তোমাকে সতর্ক করেছিলাম,কিন্তু নিজের ধ্বংস নিজে টেনেছো তুমি।”

সেভাবেই মেয়েটাকে কাঁধে তুলে নেয় বেঞ্জামিন। দুইপা এলোমেলো করে ছুঁড়ছে নুসাইবা। বেঞ্জামিন এখনো রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়েছে তার সখের বধূ কলার চেপে ধরায়।

বৃষ্টিতে দুইজনেই ভিজে একাকার। নুসাইবা গলার জোর দিয়ে কাঁদছে। হাতপা দিয়ে আঘাত করছে লোকটাকে। কিন্তু দেখলো না লোকটার হাতের তালু থেকে উপরের অংশে ডোরাকাটা কেটে যাওয়া,সেথায় বহমান লৌহের ছাপ।

“আমাকে বিয়ে করেছেন আমার ডানা ভাঙার জন্যে? এটাই রিজন? কিন্তু কী এমন ক্ষতি করেছি আমি আপনার? আমার সাথে আপনার এত শত্রুতা কিসের?”

বেঞ্জামিন মেয়েটাকে আর একটা কথায় বললো না। উরুতে চেপে ধরে রইলো মেয়েটার ছোট্ট শরীর। ভেজা তাদের দুইজনের অস্তিত্ব সিট ভিজিয়ে দিচ্ছে। বধূর গায়ের কোট ঠিক করে দেয় সে। নুসাইবা ধড়ফড় করতেই থাকলো। কতটা অবাধ্য হলে নুসাইবা বেঞ্জামিনের বিগড়ে যাওয়া মেজাজের তীক্ষ্ণতা পরিমাপ করতে পারছে না,এটা নুসাইবার নিজেরই অজানা।

ইথেন বেঞ্জামিনের জানালার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল দরজা বন্ধ করে। বেঞ্জামিন তাকে ঠান্ডা কন্ঠে নির্দেশনা দেয়,

“ প্রাইভেট জেট রেডি করতে বলো। আমি বাংলাদেশ থেকে লিভ করছি আর্জেন্ট।”

নুসাইবা তার সেই কথা শুনে আর্তনাদ করে। কেঁদে উঠে সশব্দে। কিন্তু মেয়েটাকে উঠতে দেয়নি বেঞ্জামিন। রক্ত ঝরা হাতেই স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে গাড়ি নিয়ে দাপিয়ে বেড়ায়।

শুনতে পায় তার বধূর করুণ আহাজারি,

“না না আমি আপনার সাথে কোথাও যাবো না। আপনি একটা শয়তান। আমার বাবাকে কীভাবে কষ্ট দিয়েছেন আপনি? আমাকে ছাড়ুন! আমি বাবাকে দেখব।”

বেঞ্জামিন তাকে ছাড়ল না বরং অন্যহাতে বিশ্রীভাবে ছুঁয়ে দেয় মেয়েটার ব্লাউজের ফাঁকের নিষিদ্ধ অংশে।

নুসাইবা উঠতে চায়,চেঁচামেচি করছে কিন্তু বেঞ্জামিন তাকে নড়তেই দিলো না। সিটে হেলান দিয়ে ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে হাস্কি কন্ঠে আওড়ায়,

“যা যা তোমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে করতে চাইনি, আজকে থেকে সেইসবই করবো তোমার সাথে। আমি জানোয়ার,শয়তান! দেখাবো এইসবের আসল রূপ তোমাকে। আর এখন,আরেকটু চেঁচামেচি করলে ড্রাইভিং করা অবস্থায় তোমার সত্তায় আমার সিল দিয়ে নাম লিখিয়ে দিবো। ডেমো দেখতে চাইলে চিৎকার করো। আমি রেডি।”

লোকটার এমন ভয়ানক হুমকির সাথে হাতের জোরালো স্পর্শে কুঁকড়ে উঠে নুসাইবা। গলা দিয়ে গমগমিয়ে আহাজারি বের হতে চাইলেও মুখে হাত চেপে ধরে সে। জঘন্য লোকের জঘন্য কথাবার্তা!

চলবে…….

কপি করা নিষেধ। পরের পর্ব দ্রুত দিবো। সবাই মতামত জানাবেন কেমন হচ্ছে উপন্যাস।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন