#প্রেম_শৃঙ্খলে_রুদ্ধ_রূপসী
পর্ব - ১৯
লেখিকা: সালসাবিল সারা
(কপি করা নিষেধ)
________________
“মেয়েটাই একটা কুফা,বুঝছো পুতুল! নাহয় আমার এই হাট্টাকাট্টা নাতিটা বিয়ের পরদিন এমন বিপদের মুখে পড়ত? আগে না বিয়ে ভাঙছিল ঐ মেয়ের? নিশ্চয় আল্লাহ সেই ছেলেরে বাঁচায় দিলো। আর সেই আপদ এসে পড়েছে আমাদের সোনার টুকরা বেঞ্জামিনের উপর।”
বয়স্ক সুরের মাঝে বিরাট তিক্ততা। কথার মাপে তেজ আর তিরস্কার। দরজা আধখোলা হয়ে থাকায় সেই সুর অনায়াসে শুনতে পায় নুসাইবা। আবেদা খাতুন গতকাল তাকে আদরে তুষ্ট করেছিল,আর এখন? নাতির উপর আঘাত আসলে সকাল হতে হতেই দোষ সব নাত বউয়ের!
নুসাইবা যেভাবে এসেছিল চুপচাপ, সেভাবেই চলে যাচ্ছে নিজের রুমে। মাথাটা এখনো ভার হয়ে আছে। গতরাতে লোকটা কখন তাকে রুমে এনেছিল,কখন কী হয়েছিল কিছুই জ্ঞানে নেই। অত্যধিক স্ট্রেস আর জ্বরের কারণে সব এলোমেলো। ঘুমের জন্যে ডাক্তার ইনজেকশন পুশ করছিল চোখ আধখোলা চোখে কেবল রেগে থাকা সেই পুরুষকে দেখলো। এরপর আর কিছুই মনে নেই। সকাল হলো কবে,এগারোটা বাজলো কবে কিছুই না,কিছুই না।
নুসাইবার মাথায় ভারী ভাব স্পষ্ট। সে মাথায় হাত চেপে ওভাবেই হেঁটে সিঁড়ি ভেঙে উপরে যাচ্ছে। লোকটার হাতের ক্ষত,পিঠের ক্ষত সব কি হয়েছে কিছুই জানেনা। ফোন করবে করবে সেটাতেও দ্বিধা। কেনো জানি লোকটার উপর এখনো কোনো অনুভূতির আভাস নেই। ঐযে মানবতার খাতিরে হয়তো মনটা আনচান করছে।
হাবিবার খোঁজ করলো না সে আর। দ্বিতীয় তলার বিশাল কাঁচের দেওয়াল দিয়ে দেখা যাচ্ছে গ্যারেজের গাড়ি সকল। রেড কালার মার্সিডিজ আছে,এরমানে ইয়ামিন বাসায়।
মেয়েটা হেলেদুলে রুমে গেলো। লোকটার গায়ের সুবাস পুরো রুম জুড়ে ছারখার। ভ্রু কুঁচকে নেয় সে। অদূরে থাকা সেলফোনের দিকে এক নজর তাকিয়ে আবার ব্যালকনিতে আসে। বিশাল একটা ব্যালকনি সাথে নানা সবুজ ছোট গাছের সমাহার। কয়েকটা ফুল গাছ আছে,যেটার গন্ধ কেবল ব্যালকনি অব্দি। ইজি চেয়ারে গা এলিয়ে দেয় নুসাইবা। বেঞ্জামিন কালকে চোট নিয়েও মেয়েটার খোঁজ করেছে,বিশাল বিপদ নিজের পিঠে নিয়েছে…এইসবের মানে কি দাঁড়ায়? তাদের বিয়ের রিজন কি?
যতদূর মনে আসছে,লোকটা তাকে কি “জান” ডেকেছিল? হয়তো…হয়তো না। লোকটার একটা মিহি হুমকিও কানে বাজছে তবে সঠিক ধারণা করতে পারছে না। অজ্ঞান তখনই হতে হলো তাকে! নিজের কপালে আলতো আঘাত করে হাতের উল্টো পিঠে।
পিঠ সে ইজি চেয়ারে ঘেঁষে বসে। বাহিরের আবহাওয়া তেমন ভালো নেই। গতরাতের মতো গুমোট। আচ্ছা গতরাতে কি ঝড় হয়েছিল?
বুঝার উপায়ন্তর নেই। বিশাল এই বড়লোক বাড়ির আঙিনায় না আছে কোনো পাতা না আছে কোনো পানির ফোঁটা। সার্ভেন্ট সকল তাদের কাজে টাইম টু টাইম মগ্ন।
নুসাইবা তার শাড়ির আঁচল তুলে নেয়। কিনারায় আঙুল ঘষে। আবেদা খাতুনের কথাগুলো কানে এখনো ভনভন করছে।
“আমি আপদ ঐ শয়তানের জীবনে? আমি? তাহলে সেই শয়তান লোকটা কেনো আমাকে বিয়ে করেছে জোর করে?”
নাক টেনে নিজের সাথে নিজে কথা বলে সে। হঠাৎই সেলফোন বেজে উঠলে নুসাইবা নড়ে উঠে। কলের মালিকের অনুমানে সবার প্রথমে শয়তান লোকটার কথায় মনে হলো। সে দ্রুত উঠে। পা টিপে রুমে গিয়ে ফোন হাতে নেয়।
সঠিক অনুমান। বেঞ্জামিনের নাম্বার। যদিও সেভ করা নেই। কিন্তু লাস্টে ৮৮০ দেখে বুঝতে পেরেছে।
ফোন রিসিভ করতেই লোকটার হাঁপানো অবস্থায় সুর ভেসে আসে। যে কন্ঠটা ছিল অত্যন্ত ঠান্ডা কিন্তু মানুষ খুনের মতো,
“ব্রেকফাস্ট করে মেডিসিন নিয়েছ?”
স্বাভাবিক একটা কথা! কিন্তু লোকটার সুর সেই কথাকে কেমন ভৌতিক চিন্তিত বানায়।
“আপনি কোথায়? রাতে বাড়ি আসেননি?”
নুসাইবা জিজ্ঞেস করতে না চেয়েও বলে ফেলে। পরে নিজের কপালে হাত চাপড়ে চোখ বন্ধ করে।
“এসেছিলাম। তোমার বুকে একটু ঘুমিয়েছি। চেস্টের নিচের দিকে কি চিহ্ন খুঁজে পাওনি?”
লোকটা আবারো বলে। একই ধাঁচ রেখে।
নুসাইবা শাড়ি খামচে নেয়। ঠোঁট জোড়া তিরতির করে। এমন বেহায়া! এইজন্যেই কি সেই অংশটা এমন জ্বলছিল? সে ভেবেছিল এটা আগের স্পর্শের জ্বলন!
“ছিঃ লম্পট! আমি অজ্ঞান ছিলাম,ঘুম ছিলাম। সেই অবস্থায় আমার সাথে খারাপ করে আমার ফায়দা…”
“আমার ওয়াইফ..আমি যা চাই তাই করতে পারি। আরো খারাপ অনেককিছু করবো…তখন আমার নাম কি দিবে? তোমার লম্পট প্রো ম্যাক্স?”
কিছুটা হাসির শব্দ ভেসে আসছে। বেঞ্জামিন হাসছে? লোকটা কোথায়? কেমন তার ক্ষতগুলো? মেয়েটা সেই লোকের হাসির বেড়াজালে আটকে। এমন জঘন্য কথাগুলো পুরো গায়ের কাঁটা তুলছে। কিন্তু নানীর বলা সকালের কথা আর সবকিছু মিলিয়ে নুসাইবা রেগে উঠে। চিৎকার করে বলে,
“আমার ধারে কাছে আসলেও আপনাকে আমি গলা চেপে ধরব।”
“আসছি আমি। আমার গলা চেপে ধরতে না পারলে,আমি তোমাকে আমার নিচে বিছানায় চেপে ধরব।”
বেঞ্জামিন বৃদ্ধাঙ্গুলে কপাল ঘষে। এই কথাবার্তা অন্যদের কাছে ডার্ক রোমান্টিক মনে হচ্ছে। অথচ লোকটা দাঁড়িয়ে আছে এমপির লাশের উপর। যার নিচের অংশ পোড়া। আর উপরের দিকের ক্ষতবিক্ষত দেহের শাস্তি বেঞ্জামিন নিজেই দিয়েছে। ঘাড়ের উপরে বেঞ্জামিনের নাম লেখা,যেটা সে তার পেন নাইফ দিয়ে ট্যাটু করেছে।
“বস…উনার জন্যে ছয় ফিটের ব্যবস্থা হয়েছে।”
ইথেন এসে বলে বেঞ্জামিনকে।
পাষাণ লোকের ঠোঁটে সিগারেট। হাতে মোবাইল। যেখানে ডিসপ্লেতে নুসাইবার ঘুমন্ত ছবি পাশে সে। একসাথে বিছানায়। ঘুমন্ত পরীর সাথে লেপ্টে বেঞ্জামিনের রুক্ষ কঠোর নেশালো চেহারা,যেটা মানব বিয়ের রাতে তুলেছিল নুসাইবা ঘুমানোর পর।
সেখানে আঙুল বুলিয়ে বেঞ্জামিন বলে উঠে,
“কারো বাজে ছায়াও পড়তে দিবো না আমার জানের উপর।”
পরপর রাশিয়ান ভাষায় সে ইথেনকে আওড়ায়,
“মিট গ্রেডার এ ফেলো মাদারফাকারকে।”
ইথেনের বুকে মোচড় দেয়। তিন বছর আগে এই মিট গ্রেডারে একজনকে ফেলতে দেখেছিল ইথেন। সাথে তার কি বমি! যদিও এখন তার মনটা যথেষ্ট শক্ত তবে রুহ কেমন নিশপিশ করছে।
তাও বসের নির্দেশনা….তাকে পালন তো করতেই হবে। সে গার্ডদের ইশারা করলে তারা এমপির লাশ তুলে নিয়ে যাচ্ছে। এমপি সালাহ, অন্তুর বাবা। যার ছেলেকে খুন করেছিল কিছুদিন আগে নুসাইবাকে প্রেমপত্র,বাজে নজর দেওয়ার কারণে। তার বাবাই সালাহ, গতকালের এমন হামলা করায়। কিন্তু,বেঞ্জামিন তো বেঞ্জামিন; পাতাল থেকে খুঁজে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করেছে তাকে। তার কাছে নূন্যতম অপরাধ মানেই ভয়ানক মৃত্যু। আর সেখানে নিজ বউয়ের উপর হামলার চেষ্টা মানে,দুনিয়ায় নরক দেখার সাধ মেটানো।
বেঞ্জামিন সেই হাউজ থেকে বের হয়। গাড়িতে উঠে। পাশে বসা ডাক্তার তার পানে চায়। হাফ হাতার টিশার্ট পড়নের কারণে বাহুতে ব্যান্ডেজ স্পষ্ট। গতরাতে গুলিটা ছুঁয়ে বেরিয়েছে তাই তেমন ক্ষতি হয়নি। কিন্তু সেই অদেখা পীড়াও যেনো ভয়ানকভাবে গিলে ফেলেছে এই কঠোর লোক। পিঠেও হালকা জখম হয়েছে তবে মারাত্মক নয়।
ডাক্তার তার ব্যান্ডেজ চেঞ্জ করে দেয় গাড়িতে বসা অবস্থায়। একটু দ্বিধা নিয়ে বলে,
“স্যার,আপনার মেডিসিন নেওয়াটা বেশ দরকার। নাহয় সাইড এফেক্ট হতে পারে। টাইমলি নিবেন।”
বেঞ্জামিন ডাক্তার নেহালেরর দিকে গাঢ় ভাবে তাকায়। ডাক্তার সাহেব ভয়েও চোখ মেলাতে পারেনা। লোকটা তাকে জবাব দেয়নি কিছু। কিন্তু আন্দাজ করা সেই দৃষ্টিতেই বুক কেঁপে উঠে। হাসপাতালের সামনে গাড়ি থামলে নেহাল পড়ে আলগোছে। শান্তির শ্বাস নেয়। যেনো বড় এক পিঞ্জর থেকে সে মুক্তি পেয়েছে। কালো রঙের ল্যান্ড ক্রুজার ধুমছে স্পিডে এগুচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে বুকে হাত রাখে ডাক্তার,
“বাপ্রে, এইলোকের সাথে বউ সংসার করবে কীভাবে?”
অথচ নেহাল জানেই না, বেঞ্জামিন নামক উন্মাদ লোকটা কেবল তার বউয়ের জন্যে ছারখার।
আকাশের রং কালো,কিছু সাদা মেঘ। হঠাৎ সাদা মেঘগুলো যেনো পুরো আকাশের সাথে মিশে এখন ধূসর হচ্ছে। বাহিরে ভালো ঠান্ডা বাতাস। মাতাল একটা শো শো শব্দ বাতাসের। নুসাইবা সোফায় বসলেও পিছনের জানালা খুলে রাখে। সেদিক থেকে এমন পরিবেশের দেখা পেলো মেয়েটা।
বাড়িতে অল্প আত্মীয় আছে। যারা লিভিংরুমে। আবেদা খাতুন ঠিক মেয়েটার পাশের সোফায় বসে। মুখটা যেনো বাংলার পাঁচ। নুসাইবা এত দিকে চোখ দেয় না। নিজের কোলের উপর রাখা মোবাইলে মন দেয়। অদিতি মেসেজ দিয়েছে। তাকেই সকল ঘটনা জানাচ্ছে।
“আমার নাতি কোথায়? টেলিফোন করছো? নাকি শুধু মোবাইল গুতানিতে আছো?”
সুরটা নিচু করে বলে প্রবীণ মহিলা।
নুসাইবা দৃষ্টি দেয় বৃদ্ধের পানে। পুতুলের চেহারার এই মহিলা। মোবাইল লক করে জানায়,
“জানিনা কোথায়। আমাকে বলেননি উনি।”
সে মিষ্টি হেসে জানায়। সকালের কথাটা ভোলার চেষ্টায় মেয়েটা। কারণ বৃদ্ধ মহিলারা এমন কথা বেশি টানে।
“কেমন বউ? শখে কি আমি পুতুলকে বলছিলাম এই বিয়েতে মত না দিতে? কিন্তু আমার কথা কেউ শুনলো না। আমার আমার নাতি এমন দস্যু মেয়েকে বিয়ে করেছে যে স্বামীর খোঁজ নেয় না। আমার জামশেদের মেয়েটা কি মিষ্টি,ওর সাথে কত সুন্দর লাগতো আমার নাতিকে।”
আবেদার কথায় নুসাইবা চমকে উঠে। কেনো জানি ব্যাপারটা তার মোটেও পছন্দ হলো না। রেগে যায় তার পুরো সত্তা। এত ভালো অপশন যখন ছিল তাহলে উনার নাতি কেনো বিয়ে করেছে নুসাইবাকে? তাও জোর করে?
নুসাইবা উনাকে কিছুই বললো না। নতুন বউ সে সাথে সত্যি বললে বিপদ, ঘোর বিপদ। অগত্যা সে উঠে গেলো সোফা থেকে।
কিছুটা দূরে গেলে সুন্দর একটা ঘরের ভেতরকার লন চোখে পড়ে। সেখানে অলিভিয়া আর হাবিবা দাঁড়িয়ে। মূলত তারা ডেকেছিল নুসাইবাকে সেখানে,কিন্তু মাথাব্যথা থাকায় সে সোফায় বসেছিল।
নুসাইবাকে দেখতে পেয়েই অলিভিয়া তাকে হাত ধরে এগিয়ে আনে,
“ভাবী! দেখো দেখো ভাইয়া আর ইয়ামিনের টিনেইজের ছবি।”
অলিভিয়া হাতের মোবাইল এগিয়ে দেয়। পাক্কা ইংরেজ দুইজন। বিশেষ করে বেঞ্জামিন তার চুলগুলো গোল্ডেন দেখাচ্ছে। নিশ্চয় তখন কালো চুলগুলো রং করেছিল। এখন তো আবার সেই কালো রঙের চুল এই কঠোর মানবের। ছবিতে বেঞ্জামিন গম্ভীর মুখে, বাস্কেটবল কোমরের সাথে চেপে দাঁড়িয়ে রইলো। সেই কালেও লোকের হাসি নেই কেনো!
নুসাইবা মনে মনে আওড়ায়,
“বজ্জাত।”
“উনাদের বন্ডিং বেশ ভালো ছিল মনে হচ্ছে।”
নুসাইবা কথা আগানোর জন্যে বলে।
“ভালো মানে! সেরা! বেঞ্জামিন ভাইয়ার জন্যে আমাদেরকে কেউ বুলি অব্দি করেনি। জানোই তো বিদেশে এমন বুলি কতটা ডেঞ্জারাস।”
অলিভিয়া হেসে জানায়।
“ওহ কেনো? ভাইয়া কি ফেমাস ছিল তখন?”
হাবিবা কৌতূহল হয়ে প্রশ্ন করে।
“ফেমাস! বেঞ্জামিন ভাইয়া ফেমাস হয়েছেই মারামারির দিক দিয়ে। ওর প্রথম বুলির জন্যে বেডে পড়েছিল তিনদিন। আমার ভাইকে এত কষ্ট দিয়েছিল ঐ বাস্টার্ডস। এরপর ভাইয়া সুস্থ হয়ে যে স্কুলে ফিরেছিল তাদের সকলের কারো হাত ভেঙেছিল তো কারো পা। সেইবার বেশ ঝামেলা হয়েছিল বাবা মায়ের। কেইস এন্ড সো অন। স্কুল চেঞ্জ করেছে।কিন্তু রেকর্ড তো থেকে যায়। এরপর থেকে স্কুলে,কলেজে,ভার্সিটিতে ভীতির নাম ছিল আরন বেঞ্জামিন। ভাইয়াদের একটা গ্যাং ছিল তখন “এবি টুয়েন্টি টু”। ওদের গ্যাং এখনো ফেমাস রাশিয়ায়। বাট এখন সবাই অনেক বিজি তাদের লাইফ নিয়ে। এই যা।”
কথাগুলো শুনতে শুনতে নুসাইবার শরীর হিম হয়ে আসে। বেঞ্জামিনের একটা ছবি পায় সে অলিভিয়ার মোবাইলে। এতক্ষণ ধরে সে ছবি নিয়েই নড়াচড়া করছিল। ছবিতে বেঞ্জামিন অলিভিয়াকে কোলে নিয়ে বসে। ইয়ামিন তার কাঁধে। পায়ে প্লাস্টার করা লোকটার। কিন্তু সবচেয়ে বেশি অবাক করার হলো,এই লোক হাসছে এখন। চোখজোড়া কেমন মিল বর্তমানের সাথে। এইযে লোকটা হাতে গোনা তার সামনে কয়েকবার হেসেছে,চোখ দুটো যেনো একই। শুধু এখনের চোখজোড়া প্রবল পরিপক্ক।
নুসাইবার খুব আগ্রহ হলো এই পাষাণ বালকের হাসির কারণ কী ছিল? সে মোবাইল অলিভিয়ার দিকে ফিরিয়ে জিজ্ঞাসা করে,
“উনি হাসছিল কেনো?”
“আমাদের একটা নতুন পেট ক্যাট এনেছিল বাবা,ওর নাম দিয়েছিলাম ক্যাটি। সেই ক্যাটি একদিন স্ট্রে ডগের আক্রমণের শিকার হয়। পাশে ছিলাম আমিই। আমাকে আর ক্যাটিকে বাঁচাতে বেঞ্জামিন ভাইয়া ওদের লাঠি দিয়ে তাড়া করে। কিন্তু পা মচকে রাস্তায় পড়ে গেলে ওর পায়ে ফ্র্যাকচার হয়। যেহুতু ও আমাদের বাঁচিয়েছিল তাই সেই মোমেন্টটা মা ছেলের বাহাদুরির চিহ্ন হিসেবে স্মৃতি তুলে রাখে। মা যখন ‘ব্রেভ বয় বেঞ্জামিন’ বলে,তখনি ভাইয়া হাহা করে হাসে। জানো এলবাম আর গ্যালারি ভর্তি ওর পিকচার্সে হাসিমাখা ছবি মাত্র কয়েকটা।”
অলিভিয়া কাহিনী বলতে পেরে ভীষণ মজায় আছে।
নুসাইবা প্রত্যুত্তরে কিছু বলতে যাবে তখন মেইড এসে জানায়,
“বেঞ্জামিন স্যার এসেছেন। আপনাকে খুঁজলেন।”
মেইড বলে চলে যায়। মেয়েটা মোবাইল দেয় অলিভিয়াকে। কিন্তু দাঁড়িয়ে রইলো লনে। ভেতরটা একটুও যেতে শায় দিচ্ছে না। গলা চেপে দেওয়ার সেই কথাটা মনে আসলো তার। নুসাইবা কপাল চাপড় দেয় আলতো করে। লোকটার যা উচ্চতা কখনো গলা চেপে ধরতে দিবে সহজে? জীবনেও না।
তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অলিভিয়া আর হাবিবা মুচকি হাসে। হাবিবা আদর করে বোনকে বলে,
“যাও যাও,আমরা মোটেও মনে করব না তুমি রোমান্স করতে যাচ্ছো।”
“এক্সেক্টলি।”
অলিভিয়া আর হাবিবা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে টিটকারী দেয় নুসাইবাকে।
মেয়েটার কান গরম হয়ে আসে। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে রয়। লজ্জায় মুখটা লাল হয়ে আসলেও মাথায় আবার তখন নানীর বলা কথা মনে আসে। মেজাজটা চটে যায় মুহূর্তে। তার হাট্টাকাট্টা নাতির সাথে বিয়ে করার কোনো শখ তো ছিল না।
মেয়েটা দ্রুত হাঁটতে থাকে এইবার। সিঁড়ি গলিয়ে উপরে উঠলে রুমে দেখতে পায় না সে বেঞ্জামিনকে। বিছানায় বসে সে নখ কাটে দাঁত দিয়ে। কিভাবে কথা শুরু করবে সেটা ভেবে কুল পাচ্ছে না।
তখনই ওয়াশরুমের দরজা খোলার শব্দ হয়। নুসাইবা আড় চোখে দেখে সেদিকে। তবে অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্য নজরে এলে তার মাথাটা পুরোই ঘুরে গেলো বেঞ্জামিনের পানে। লোকটার পরনে শর্টস,উদোম শরীর। এক বাহুতে ব্যান্ডেজ করা। চুলগুলো ভেজা। মনে হচ্ছে মাথায় পানি দিয়েছে। আর সেই পানিবিন্দু গুটিগুটি করে ঝলসে পড়ছে তার উন্মুক্ত সত্তায়।
নুসাইবা তিনবার পলক ফেলে এরপর চোখে হাত দিয়ে চিৎকার করে মৃদু,
“এমন অবস্থায় ঘুরছেন কেনো? এই রুমে অন্য এক মহিলা থাকে সেটা মাথায় নেই? বেলাজ!”
বেঞ্জামিন থামে। মেয়েটার সুরে মিষ্টি রাগ,কিঞ্চিৎ লজ্জা। বিছানার কিনারায় বসা তার ভোমরা। চুলগুলো উড়ছে বাহির থেকে আগত পবনে। মুখ ঢাকা হাতে চুড়ির রিনিঝিনি শব্দ। লোকটা তার সম্মুখে দাঁড়ায়। হাতের উপর নিজের হাত রেখে শুধায়,
“হাত সরাও,নাহয় যেটা পড়েছি সেটাও যাবে।”
“নাউজুবিল্লাহ…..”
নুসাইবা এক লাফে বিছানার উপর উঠে বসে। মুখ থেকে হাত সরিয়ে ফেলে দ্রুত। মানব তার সামনে। কি অমায়িক তার দেহের প্রতি খণ্ড। এত সুদর্শন লোকের কিনা এমন শরীর ভর্তি অহংকার আর তেজ!
পরক্ষণে বেঞ্জামিন তার পা চেপে নেয়। টেনে কাছে আনে। আলতো করে পর্যবেক্ষণ করে মেয়েটার পায়ের তালু,
“শুকিয়ে এসেছে। মেডিসিন মিস দিবে না।”
মেয়েটা অপলক চেয়ে রয় সেই সুঠাম মানবে। যার শরীরের অবস্থা সে একটাবার জিজ্ঞেস করলো না অথচ তার পায়ের ক্ষত নিয়ে লোকটা এখনো পড়ে আছে!
“আমার এত যত্ন নিতে হবে না আপনার। নিজের যত্ন নিন। আমি কুফা তাই আমার জন্যে আপনার এমন অবস্থা হয়েছে।”
নুসাইবা তার পা বটে নেয়। ভেতরটা নড়ছে। নিশ্চয় লোকটা তাকে এখন চিল্লিয়ে ভস্ম করবে!
নুসাইবার চেহারায় ক্রোধ সাথে এক চাপা কষ্ট! বেঞ্জামিনের বুকের হাল বেহাল। সে মেয়েটার সত্তা বিছানার সাথে আটকে নেয়। দুইদিকে দুইহাত দিয়ে বন্দি করে তাকে। কানের পাশে নাক ছুঁয়ে অত্যন্ত তেজি কন্ঠে বলে,
“তুমি আমার জন্যে কি আর তোমার জন্যে আমার কি অবস্থা উহু দুরবস্থা হয়,সেটা বুঝার জন্যে গায়ে খুব কম কাপড় আছে। নিড এনি প্রুফ?”
লোকটা তার বলিষ্ঠ হাতে কোমর জড়িয়ে ধরে। দুই সত্তা মিশে একাকার। ব্যান্ডেজ বাঁধা হাত ইতোমধ্যে মেয়েটার নরম পেটে হামলে পড়েছে। বেঞ্জামিন আরো বেশি চাপ দিয়ে বধূকে আগলে নিলে নুসাইবা বেঞ্জামিনের গলায় নিজের ছোট্ট
তালু ছুঁইয়ে গলায় প্রেস করার চেষ্টা করে,
“একদম ধরাধরি করবেন না। এইসব আর চলবে না আমি….”
বেঞ্জামিন এই যাত্রায় হাসে। কপালে হেলে পরে তার অগোছালো কয়েক গোছা চুল। বধূর ঘাড়ের চুল সরিয়ে সেথায় স্পর্শ করে মাতাল ঠোঁটের। পরপর দাঁত চোয়ালে নুসাইবা আর্তনাদ করে,
“আহহ.. রাক্ষস নাকি!”
“উ..উম…”
অস্ফুট এক গোঙানি ভেসে আসে সেই কঠোর লোকের কণ্ঠস্বরে। নুসাইবা বেঞ্জামিনের সেই গোঙানি শুনে তব্দ বনে। শরীর কেমন ঠান্ডা হয়ে যায় মুহূর্তে। সেইসময় এক তীব্র বজ্রপাতের সূচনায় রুমের ভেতরটা আরও আলোজ্জ্বল হয়। দৃষ্টি মিলে দুইজনের। বজ্রপাতের শব্দে সে কেঁপে উঠলে লোকটার বুকে আঁচড় দিয়ে থমকে যায়।
মেয়েটার চোখে ভীতি আর লোকটার দৃষ্টিতে মাতলামো। গলা শুকিয়ে আসে রমণীর। পরক্ষণে নুসাইবা সরে যেতে চায়। তবে তার পেলব কোমর দখল করে বেঞ্জামিন। তার হাতের স্পর্শ অত্যন্ত অবাধ্য। সে নুসাইবার আঁচল সরায়। আঙুল পেট থেকে উপরের দিকে বুলিয়ে দেয়,ফিচেল সুরে বলে উঠে,
“আজকে তোমায় জিতিয়ে দিলাম গলা চেপে ধরার খেলায়। পরের বার কিন্তু আমার নিচে নিয়েই দম নিবো,সত্যিকারের রাক্ষস হবো। শুধু ধরাধরি করবা না তখন নিচে নিয়ে রূপসী,তোমার মিহিসুরের আর্তনাদে অস্পষ্ট আমার নাম নিতে তোমাকে বাধ্য করবো।”
চলবে…….
কপি করা নিষেধ।
সবাই মন্তব্য করবে। অত্যন্ত ব্যস্ত আমি তাও একটা পর্ব দিলাম। সবাই মতামত জানাবেন। আজও রিভাইস দিইনি। তাই বানান ভুল হলে বলবেন।