#আশিক_আল_জিন
#পর্ব_২
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া
রুমানার চোখ ধীরে ধীরে খুলে গেল। অন্ধকার আর জ্বরে ঝাপসা হয়ে থাকা চোখটা ঘরের আলোয় ধীরে ধীরে স্থির হলো। রুস্তম আল রুহান তখনো পাশে বসে। চোখে চিন্তা, মুখে নরম আশ্বাসের রেখা। হঠাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে আশেপাশে তাকাতে লাগলো রুমানা। চোখে এক ধরনের আতঙ্ক আর অস্থিরতা। বিছানা থেকে উঠে বসার চেষ্টা করল সে।
রুস্তম এগিয়ে এসে শান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
“কী খুঁজছো রুমানা?”
রুমানা থেমে গেল। শ্বাস টেনে বলল,
“আমার মনে হচ্ছিল... আমি একটা বন্ধ ঘরে আটকে আছি। কোনো দরজা নেই, জানালা নেই। নিঃশ্বাস নিতে পারছিলাম না। জ্ঞান ফেরার পর বুঝতে চাইছিলাম, সত্যিই... আমি কোথাও আটকে নেই তো?”
রুস্তম হালকা মাথা নাড়লেন। তার কণ্ঠে স্নিগ্ধ দৃঢ়তা।
“তুমি এখন নিরাপদ। ভয় পেয়ো না। এখানে কেউ তোমার ক্ষতি করবে না। কিছু সময় দাও নিজেকে।”
রুমানা চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। তার কাঁধের কাপুনি ধীরে ধীরে থেমে এল।
রুস্তম কিছুক্ষণ নীরব থেকে আবার বললেন,
“রুমানা, তুমি এখনো আমাকে সব বলেনি।
তোমার চোখে যে ভয় আমি দেখেছি, সেটা সাধারণ কিছু নয়। আমি চিকিৎসক, আমার কাছে গোপন কিছু রাখবে না–এই বিশ্বাসেই তো এখানে এসেছো, তাই না?”
রুমানা একটুও চমকাল না। শুধু মুখ নিচু করে নিঃশব্দে মাথা নাড়ল। তার হাত দুটো একসাথে জড়ো করে বসে রইল বিছানার চাদরে।চোখের কোণ ভিজে যাচ্ছে তবুও সে কথা বলছে না।
_______________
সারাদিন পর বাড়িতে ফিরেছে আরিবা। পুরো নাম আরিবা আল রুহান, রুহান পরিবারের একমাত্র সন্তান। রূপে গুনে মেয়েটি অন্যন্য, কথা বলার ভঙ্গিতে যেন মধু নিঃসৃত হয়। মেয়েটি ভীষণ মিষ্টি স্বভাবের।
“ আম্মিজান? আম্মিজান? কোথায় আপনি? আমার খিদে পেয়েছে। “
বিশাল বাড়ির এদিক থেকে ওদিকে হেঁটে হেঁটে মা'কে খুঁজছে আরিবা। বয়স তার ষোল চলছে, কিছুদিন পর ষোল পেরিয়ে সতেরো বছরে পা দিবে।
“ রাজকন্যা আপনি কি মহোদয়াকে খুঁজছেন? “
গৃহপরিচারিকা হেলেনা, বয়স তার চল্লিশ পেরিয়েছে। স্বামী, সন্তান কেউ নেই। একা মানুষ রুহান পরিবারের সাথে থাকেন তিনি। আরিবাকে ভীষণ ভালোবাসবে তিনি। আর ভালোবেসে রাজকন্যা সম্বোধন করেন।
“ জি, আমি আম্মিজানকে খুঁজছি। আপনি কি উনাকে দেখেছেন?”
“ না, রাজকন্যা। আমি তো দেখিনি। “
“ ঠিক আছে হেলেনা। “
হেলানাকে রেখে আরিবা একা একাই সারা বাড়ি খুঁজতে লাগলো। মনটা তার একটু খারাপ আজ। আজকেও আরিবার বাবামায়ের বয়স নিয়ে কথা উঠেছিল বিদ্যাপীঠে। আরিবার বাবামায়ের যা বয়স তাতে আরিবার বয়স হিসেব করলে বলা যায়– ষাটোর্ধ বাবার ষোড়শী কন্যা! এতো বয়স করে কেন যে বাবা তাকে পৃথিবীর মুখ দেখালো সেসব ভাবতেও ইতস্তত লাগে তার। তবে বদমাশ ছেলেমেয়েদের জন্য না ভেবেও পারা যায় না।
___________
“ হ্যাঁ আমি একটা বিষয় লুকিয়ে গিয়েছি। যদি খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু মনে হয়নি তবে এখন মনে হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ। “
রুমানা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলল। রুস্তম গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছিল কথা।
“ হুম, বলো।”
“ আমি একজন লেখক, অল্পবিস্তর লেখালেখি করি। কাল্পনিক অস্তিত্ব নিয়ে লিখতে বেশ আগ্রহবোধ করি। সেভাবেই একদিন আশিক আল জিন নামে একটা গল্প লেখা শুরু করি। বলাবাহুল্য, গল্পে আমি হুবহু জিনের বিষয় লিখতে চাইনি। চেয়েছিলাম বাস্তব ও কল্পনার সংমিশ্রণে এক কাল্পনিক অস্তিত্ব ফুটিয়ে তুলতে। কিন্তু গল্পটা লিখতে লিখতে আমি অনুভব করি, আমি বাস্তবতা নিয়ে লিখছি। সত্যি সত্যি আমি জিনদের নিয়ে রিসার্চ করতে শুরু করি। এভাবে কিছুদিন চলার পর একদিন রাতে একটা স্বপ্ন দেখলাম। কালো কাপড়ে আবৃত এক যুবক আমাকে বলেছিল, আমি কি বিখ্যাত লেখক হতে চাই? আমি লেখক মানুষ, আর আমার চাওয়া এটাই যে আমার লেখা বিখ্যাত হোক। সেই স্বপ্নের ভেতরও আমি যুবককে তাই বলি। ফলশ্রুতিতে সে আমার থেকে একটা প্রতিশ্রুতি চেয়ে বসে, একটা চুক্তি! এবং সেটা হলো সে সব সময় বংশপরম্পরায় আমার এবং আমার ভবিষ্যত প্রজন্মের সাথে থাকবে। আমি কী বুঝে যেন তার চুক্তিতে রাজি হয়ে গেলাম। তারপর স্বপ্নটা ভেঙে গেলো। প্রথম প্রথম স্বপ্নটা নিয়ে ভাবলেও কয়েকদিন পর ভুলে গেলাম। কারণ আমার লেখা এখনও বিখ্যাত হয়নি। তাই সবটাই মনের ভুল ভেবেছিলাম। “
রুমানার কথায় রুস্তমের কপালে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। রুমানার চোখমুখ শুকিয়ে গেছে। ঝোঁকের বেশ কী ভুল করে বসেছে সে, সেসব ভেবেই কান্না পাচ্ছে তার।
“ তুমি নিজেই তাকে তোমার এবং তোমার পরবর্তী প্রজন্মের সাথে থাকার অনুমতি দিয়েছো রুমানা৷ এখানে আমার কিছু করার নেই। আর সে যা বলেছে তাই হবে, তোমার নামযশ অবধারিত। হয়তো সময় লাগবে। এখন এই অভিশপ্ত জীবন বহন করা ছাড়া তোমার কিছু করার নেই। “
রুস্তমের কথায় চোখ ছলছল করছে রুমানার। কী হবে এখন? মেয়েটা মুহুর্তে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। এরমধ্যেই রুমের দরজা খোলার আওয়াজে পেছন ফিরে তাকালেন রুস্তম আল রুহান।
“ আব্বাজান! “
আরিবাকে এই রুমে দেখে চমকালেন রুস্তম। মেয়েকে তিনি কখনো এসবের মাঝে রাখতে চাননা।
“ আরিবা তুমি এখন যাও, আমি একটু পর তোমার সাথে কথা বলবো। “
“ আম্মিজান কোথায়, আপনি কি জানেন? “
“ না। “
বাবার সা কথা বলতে বলতে রুমানার দিকে তাকাল আরিবা। সামনে বসে থাকা রুমানার কপালে অদ্ভুত একটা কালো জ্যোতি দেখা যাচ্ছে। আরিবা কৌতূহল মেটাতে রুমানার দিকে এগোল রুস্তমের চেহারা বদলে গেলো। রেগে বললেন তিনি,
“ আরিবা? তোমাকে যেতে বলেছি!”
আরিবা আঁতকে উঠল বাবার এমন আচরণে। রুমানার দিকে তাকিয়েই বলল সে,
“ আব্বাজান ক্ষমা করবেন। উনার কপালের মধ্যে কিন্তু একটা আছে, আমাকে স্পর্শ করতে দিন দয়া করে। আমি নিজেকে সামলাতে পারছি না। “
রুস্তম কিছু বোঝার আগেই আরিবা রুমানার কপালে হাত রাখলো। চমকাল রুমানাও। তার শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা অনুভূত হচ্ছে। আরিবার শরীর কেমন কাঁপছে। ঘটনার আকস্মিকতা বোঝার আগেই রুমানা ও আরিবা জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়লো ফ্লোরে। রুস্তম অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলো, একটা কালো অবয়ব আগুনে জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। আগুনে ও বাতাস দিয়ে তৈরি প্রাণী, আগুনেই ভৎস হয়ে গেলো – এটা কি বিস্ময়কর নয়?
________________
সন্ধ্যা তখন গভীর, আকাশ কালো আর ভারী।
দূরে বিজলির চমক খেলে যাচ্ছে সাদা পাথরের গম্বুজে, আলোর রেখা পড়ে পড়ে যেন বিশাল প্রাসাদটাকেই আলোকিত করছে কোনো প্রাচীন অভিশাপের জ্যোতিতে। বাতাসে পোড়া মাংস আর ছায়ার গন্ধেচারপাশ নিস্তব্ধ। সামনে প্রহরীরা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে, কিন্তু কেউ সাহস করে চোখ তুলে তাকাতে পারছে না। দুলফিকার এসে গেছে।
সে ঢুকলো ধীর অথচ নিশ্চিন্ত পায়ে। চুল এলোমেলো, চোখের নিচে ক্লান্তির ছায়া নয় বরং লুকানো উন্মাদনা। পোশাকে ধুলো আর খারাপ-জিনদের আগুনের চিহ্ন। তার চোখে এখনো লালচে ঝিলিক, যেন কিছু পুড়িয়ে আসার পর জ্বলছে আরও।
নুসাইর দুলফিকারকে রাজসভায় পাঠিয়ে দিয়ে নিজের কক্ষে চলে গিয়েছে।
দুলফিকারকে আসতে দেখে রাণী নূর আল জোহরা সামনের সিংহাসন থেকে উঠে দাঁড়ালেন।
চোখে বিস্ময়, কিন্তু ঠোঁটে একটুও হাসি নেই।
“দুলফিকার! তুমি কোথায় ছিলে এতক্ষণ?”
তার কণ্ঠে তীব্র চিন্তার কম্পন।
দুলফিকার মাথা ঘুরিয়ে তাকালেন।
তার ঠোঁটের কোণে একটা হালকা তাচ্ছিল্যের হাসি। সে বলল,
“আমি? একটু হাওয়া খেতে গিয়েছিলাম…”
মালিক আল জিন এবার আর সহ্য করলেন না।
তার গলার গর্জনে কক্ষের বাতাস থমকে উঠল।
“দুলফিকার! তুমি দিনের পর দিন সহ্যের সীমা অতিক্রম করছো। রাজপুত্র হয়ে এভাবে চলতে পারো না!”
কিন্তু দুলফিকার যেন শুনছেই না। সে মায়ের দিকে তাকিয়ে আরও ঠান্ডা গলায় বলল,
“আমি কক্ষে যাচ্ছি। আপনাদের বিচারসভা আমার সহ্য হচ্ছে না। এসবের জন্য নুসাইরকে ডাকুন, সে তো নিখুঁত ।”
কথা শেষ করেই পেছন ফিরে চলে গেলো। কোনো অনুমতির অপেক্ষা করলো না সে। তার পায়ের শব্দ মিলিয়ে গেল রাজপ্রাসাদের পাথরে। পেছনে সবাই মাথা নিচু করে বসে রইলো।
চলবে….
নোট- লিখতে গিয়ে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম, তাই লেট হলো। সপ্তাহখানেক ধরে জ্বর। আগামীকাল আম পরীক্ষা, এজন্য ছোটো করে এক পর্ব লিখলাম। আশা করি কেমন লেগেছে জানাবেন। আমার চতুর্থ বই হামিংবার্ডের প্রি-অর্ডার চলছে, চাইলে অর্ডার করতে পারেন।
আগের পর্ব https://www.facebook.com/100085130931546/posts/723165813864443/
পরের পর্ব https://www.facebook.com/100085130931546/posts/725500703630954/