#আশিক_আল_জিন
#পর্ব_৪
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া
মেঘে ঢাকা রাত। আকাশজুড়ে বিজলির ঝলকানি। দূরে অরণ্যের কিনারায় হঠাৎ যেন বাতাস জমে উঠলো। বাতাসের ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে ফুটে উঠলো এক আলোকবৃত্ত,যেন জলের উপর নাচছে রূপালি আগুন। প্রথমে এগিয়ে এল নুসাইর– গাঢ় নীল কফতান, রুপালি নকশায় জড়ানো। চোখে শান্ত দৃঢ়তা তার।
তার পেছনে দুলফিকার– কালো,সোনালি লম্বা জামা, কাঁধে রক্তিম শাল, চোখে অদ্ভুত এক আগুনের ঝিলিক। সবশেষে সুলতানা– সাদা পোশাকে, লম্বা চুলে নীল ফিতার বাঁধন, মুখে শিশুসুলভ উচ্ছ্বাস।
তিনজনেই আলো-বৃত্ত পেরিয়ে পা রাখলো ভেজা মাটিতে। বাতাসে ভেসে এলো মাটির গন্ধ, গাছের পাতার শব্দ আর দূরের কোনো পাখির ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ। সুলতানা বিস্ময়ে চারপাশ দেখতে লাগলো, নুসাইর ধীরে শ্বাস নিল, আর দুলফিকার কেবল একপাশের অন্ধকারে তাকিয়ে রইলো। সকাল হতে বেশি বাকি নেই। অন্ধকার ফুরিয়ে ভোরের আগমন অতি নিকটে।
“ ভাইজান… এখানে কি এখন রাত?”
তিনজন ধীরপায়ে এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। নুসাইর বলল,
“ ফজরের পরের মুহুর্ত এখন। আযান হয়েছে কিছুক্ষণ আগে। অন্ধকার কেটে গিয়ে সূর্যের আলো দেখা যাবে কিছুক্ষণ পর। “
দুলফিকার বলল,
“ সুলতানা তুমি নুসাইরের সাথে ঘোরাঘুরি করো। আমি একা ঘুরতে চাই। “
“ দুলফিকার কোনো মানুষের ক্ষতি করবে না তুমি। “
নুসাইরের কথায় কপাল কুঁচকে ফেলল দুলফিকার। সুলতানা ভয়ে ভয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দুলফিকার ভাই আগেই বলেছিলেন, নুসাইর যেন তাকে এমন বিধিনিষেধ না আরোপ করে।
“ তুমি আমার বড়ো ভাই হওয়ার চেষ্টা না করলেই ভালো হয় নুসাইর। ভালোবেসে ভাই ডাকি মাঝে মধ্যে, তাই বলে তুমি আমার বড়ো হয়ে যাওনি। সমবয়সী আমরা, জ্ঞান কম কম দাও। “
দুলফিকার আর নুসাইরকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সেখান থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল। সুলতানা নুসাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। নুসাইর মৃদু হেসে বোনের হাত ধরে সামনে এগোতে লাগলো।
“ মন খারাপ করতে হবে না। জানোই তো দুলফিকার কেমন! সময়মতো চলে আসবে। “
“ ভাইয়া যে কেন এমন রাগী, বুঝি না। “
শব্দ করে হেসে উঠল নুসাইর। সুলতানা ভ্রু কুঁচকে ফেলল।
“ বুঝতে হবে না। তুমি চলো। সামনে কলেজ আছে। কিছুক্ষণ পরেই সেখানে অনেক মেয়েদের দেখতে পাবে। “
“ সত্যি? অনেকগুলো মানুষ? ভাইজান তারাও কি আমাদের মতো দেখতে? “
“ তারা আমাদের মতো না। তাদের চেহারার মধ্যে আমাদের মতো ভয়াবহতা নেই। “
“ আমাদের চেহারা ভয়াবহ? “
অবিশ্বাসের সুরে জিজ্ঞেস করলো সুলতানা। নুসাইর হেসে বলল,
“ মানুষকে দেখলেই বুঝতে পারবে, আমাদের চেহারা তাদের তুলনায় অন্য রকম। “
“ আমরা তো সুন্দর চেহারাও ধারণ করতে পারি। তাহলে পৃথিবীতে এসেও এমন ভয়াবহ রূপে কেন আছি? “
নুসাইর মুচকি হাসল। চোখের পলকে দুই ভাইবোনের রূপ বদলে গেলো। নুসাইরের উচ্চ কাঁধ আর শক্তিশালী গড়নের সঙ্গে মিলেমিশে গেলো দোর্দণ্ডমান সৌন্দর্য। তার কালো-গভীর চোখ দুটো যেন রাতে জ্বলন্ত তারার মতো, মুখে অল্প হাসি যার ভেতর লুকিয়ে আছে হাজারো রহস্য। সাদা কটন শার্ট আর কালো প্যান্ট পরে সে যেন একজন পরিপাটি তরুণ, রাজকীয় গম্ভীরতা মিশে আছে তার চলনে।
সুলতানা একটু ছোটখাটো। তার দীর্ঘ, চকচকে কালো চুল ধীরে ধীরে ঢলে পড়েছে কাঁধে, গায়ের সঙ্গে মানানসই হালকা গোলাপি রঙের ফুল দিয়ে সজ্জিত সাদা সালোয়ার-কামিজে সে যেন এক মিষ্টি, কোমল রাজকুমারী। চোখগুলো ভরা তার মায়াময় শীতলতা আর হাসিটা এক ধরণের চঞ্চল শৈশবের উচ্ছ্বাস বহন করে। নিজেদের এমন সৌন্দর্য দেখে সুলতানা খিলখিল করে হেসে উঠল।
“ এখন দেখো, সুন্দর চেহারা হয়েছে? “
“ হ্যাঁ ভাইজান। এবার চলুন। “
ভাইয়ের সাথে তালে তালে এগোতে থাকলো সুলতানা।
ভোরের হালকা আলো জানালার ফাঁক গলে ঘরে ঢুকছে। পাখির ডাক আর দূরের আজানের সুরে আরিবার ঘুম ভাঙল। নতুন বিছানা, নতুন ঘর– সবকিছুই এখনো অপরিচিত লাগছে তার কাছে। আবাসিকের করিডোরে মেয়েদের হাসি-ফিসফিসানি শোনা যাচ্ছে, কেউ ইতিমধ্যেই বাথরুমের দিকে ছুটছে, কেউবা আয়নার সামনে চুল আঁচড়াচ্ছে।
আরিবা ধীরে ধীরে উঠে বসলো, চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিলো। নিজের ছোট্ট আলমারির ওপর রাখা কাপড়-চোপড় গুছানো, পাশে রাখা বইগুলো গত রাতেই সাজিয়ে রেখেছিল সে। আজকের দিনটা কেমন কাটবে ভাবতে ভাবতে মনে পড়ল বাবার মুখটা, বিদায়ের সময় মায়ের চোখের জল। বুকের ভেতর হালকা শূন্যতা অনুভব করলেও নিজেকে শক্ত করল আরিবা।
জানালার বাইরে রোদ একটু একটু করে উঁকি দিচ্ছে। দূরে কলেজের মাঠে কয়েকজন মেয়ে হাঁটাহাঁটি করছে। আরিবা ধীরে ধীরে চাদর সরিয়ে উঠল, নতুন জীবনের প্রথম সকালকে সামনে নিয়ে। আড়মোড়া ভেঙে শোয়া থেকে উঠে বসলো সে। ধীরপায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে দরজার বাইরে গিয়ে দাঁড়াল আরিবা।
“ আরিবা? শুভ সকাল। “
ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মরিয়ম এগিয়ে এলো। আরিবার সহপাঠী মরিয়ম ইসলাম।
“ শুভ সকাল, মরিয়ম। “
“ প্রথম প্রথম একটু-আধটু কষ্ট হবে আরিবা। তারপর দেখবে সবকিছু ভালো লাগবে। চলো হাতমুখ ধুয়ে নাস্তা করে নিবে। “
মরিয়মের কথায় মুচকি হাসল আরিবা। দু'জনে হাতমুখ ধোয়ার উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট জায়গার দিকে এগোল।
হাওয়ায় ভেসে চলছে দুলফিকার। ভোরের আলো ফুটেছে। চারদিকে কত মানুষ, পাখপাখালি। আচমকা দুলফিকারের নজর গেলো ছাদে দাঁড়িয়ে থাকা রুমানার দিকে। রুমানার শরীর থেকে অদ্ভুত সুঘ্রাণ আসছে। তবে আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো, সেই ঘ্রাণ একদমই সহ্য করতে পারছে না দুলফিকার। মেজাজ বিগড়ে যাচ্ছে দুলফিকারের। সে শূন্যে ভেসে ভেসে রুমানাকে পর্যবেক্ষণ করতে থাকলো। মেয়েটা সুন্দরী, লম্বা চুল, চমৎকার শারীরিক গঠন। দুলফিকার মুচকি হাসল। রুমানার দিকে এগোল। ছাদে পা স্পর্শ করতেই মৃদু ধাক্কা অনুভব করলো দুলফিকার। তবুও সে রুমানার দিকে এগোল। তবে বেশিদূর যেতে পারলোনা। কোনো অদৃশ্য শক্তি রুমানার চারপাশে যেন সুরক্ষাকবচ সৃষ্টি করে রেখেছে। দুলফিকার অনেক চেষ্টা করেও যখন ব্যর্থ হলো তখন রাগে দিকবিদিকশুন্য হয়ে ছাদের একপাশে আগুন নিক্ষেপ করলো। ফলশ্রুতিতে ভয়ে চেচিয়ে উঠলো রুমানা। দুলফিকার আর দাঁড়ালো না সেখানে। স্থান ত্যাগ করলো।
“ কী হয়েছে রুমানা?”
মেয়ের চিৎকার শুনে সকাল সকাল ছাদে এসে চমকালেন ফাইজা ফাইরুজ। এভাবে আগুন জ্বলতে দেখে রুমানাকে জড়িয়ে ধরলেন তিনি।
“ ভয় পেও না। কিছু হয়নি। চলো মা, কক্ষে চলো। আমি আজই তোমার বাবাকে বলে হুজুর ডাকতে বলবো।”
রুমানা ভয়ে আর টুঁশব্দ না করে মায়ের সাথে ছাদ থেকে নেমে গেলো।
কলেজের মাঠে ঘুরে ঘুরে সবকিছু দেখছে সুলতানা ও নুসাইর। এমন সময় দুলফিকার এসে হাজির হলো তাদের সামনে। তাকে দেখেই ভ্রু কুঁচকে ফেলল নুসাইর। দুলফিকারের হাবভাবে বোঝাই যাচ্ছে সে রেগে আছে। তবে ভাইবোনের এমন মানব রূপ দেখে কিছুটা রাগ প্রশমিত হলো তার। নিজেও চমৎকার একজন পুরুষের রূপ ধারণ করলো।
“ কেমন লাগছে আমাকে, নুসাইর?”
“ সুদর্শন যুবক। তা সুদর্শন যুবকের মেজাজ বিগড়ে গিয়েছিল কেন?”
“ পরে বলবো। এখানে কী দেখছো তোমরা? আমি তো ফাঁকা মাঠ ছাড়া কিছু দেখছি না। “
সুলতানা মুচকি হাসল। কাছের একটা গাছের দিকে ইশারা করে বলল,
“ আমি গাছের পরিচিতি জানছি ভাইয়া। “
“ গাছ সাথে নিয়ে যাওয়ার বায়না ধরো না, আবার। “
দুলফিকার কথাটা বলে অন্য দিকে এগোল। নুসাইর ও সুলতানা আবারও গাছের বিষয় কথা বলতে লাগলো। বোনের জন্য নুসাইরকে এখন গাছেরও বর্ননা দিতে হচ্ছে।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আনাগোনা বৃদ্ধি পেয়েছে। আরিবা মন খারাপ, তাই সবগুলো ক্লাস না করেই কলেজ থেকে বেরিয়ে এসেছে সে। কলেজ থেকে হোস্টেলের দূরত্ব বেশি না। মিনিট পাঁচেক লাগে, তবে ধীরপায়ে এগোলে তারচে বেশি সময় লাগে। আচমকা কলেজের মাঠের পাশে একটা গাছের আড়ালে কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চমকাল আরিবা। কৌতুহল মেটাতে সেদিকে এগোল।
এদিকে একজন মানুষকে নিজেদের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে চমকাল নুসাইর ও সুলতানা। মেয়েটির অর্থাৎ আরিবার দৃষ্টিভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে সে যেন গাছের আড়ালে কাউকে দেখতে পেয়েছে।
“ ভাইজান? ওই মানুষটি আমাদের দিকে আসছে কেন? সে কি আমাদের দেখতে পাচ্ছে?”
প্রশ্নটা যে নুসাইরের মনে আসেনি সেটাও না। কিন্তু মানুষের পক্ষে তাদেরকে দেখা অসম্ভব। নুসাইর আরিবার দিকে গভীর মনোযোগ দিয়ে তাকাল। মুহুর্তেই যেন তার হৃৎস্পন্দন থমকে গেলো। এই মানবীর চোখ যেন শীতল জলধারা। সেই শীতলতা গ্রাস করছে তাকে। নুসাইর আরিবার দিকে ওভাবে তাকিয়ে আছে দেখে সুলতানা আবারও বলল,
“ ভাইজান? মেয়েটি তো আমাদের সামনে এসে দাঁড়াল! “
আরিবা আশেপাশে, সামনে সব জায়গায় তাকিয়েও কাউকে দেখতে পাচ্ছে না। অথচ একটু আগেই মনে হচ্ছিল এখানে কেউ ছিল। নুসাইর এবার স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল। মেয়েটি তাদেরকে দেখতে পায়নি তাহলে। মুচকি হাসল সে। আরিবা তাদের সামনে দাঁড়িয়ে অথচ, বুঝতেও পারছে না কিছু।
“ চিন্তা করো না, সুলতানা। সে আমাদের দেখতে পাচ্ছে না। “
সুলতানা হাসল খানিক। পৃথিবীর মানুষকে এতো কাছাকাছি আগে দেখেনি সে। তাই ভালো করে দেখছে। অন্য দিকে, নুসাইর নিজের অনুভূতি নিয়ে ভাবনায় মশগুল হয়ে গেছে। এই মেয়েটি কে? তাকে দেখে হৃদয় এমন কম্পিত হলো কেন? এক মানবীর জন্য এমন অনুভব হওয়া আশ্চর্যজনক ব্যাপার।
আরিবা শেষবারের মতো আশেপাশে তাকাল কিন্তু কিছু দেখতে না পেয়ে আবারও নিজের গন্তব্যে এগোলো।
চলবে ....
মাথা ব্যথা ছাড়ছে না আমায়৷ মাইগ্রেন! 💔💔
আগের পর্ব https://www.facebook.com/100085130931546/posts/725500703630954/
পরের পর্ব https://www.facebook.com/100085130931546/posts/727777253403299/