ফন্ট সাইজ:
থিম:
আশিক আল জিন

৭ম পর্ব

লেখক: তাসমিয়া তাসনিন প্রিয়া

#আশিক_আল_জিন

#পর্ব_৭

#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া

ঘরের ভেতর আচমকাই যেন হাওয়া বদলে গেলো। শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডার হালকা শিহরণ নেমে এলো। অজান্তেই শরীরটা টানটান হয়ে উঠল আরিবার। সে ধীরে চোখ বন্ধ করল,

গভীর এক, দুই, তিনবার লম্বা নিঃশ্বাস ছাড়ল।

আরিবার ভেতরের সতর্কতা ক্রমে তীক্ষ্ণ হয়ে উঠছে। তার শ্বাসের শব্দও যেন কানে বাজছে স্পষ্ট হয়ে। মুহূর্তের ভেতরেই সে বুঝল,এটা সেই দুপুরের মতো নয়। এবারের উপস্থিতি… অনেক কাছের, অনেক গভীর।

নুসাইর আরিবার হাবভাব পর্যবেক্ষণ করছিলো এতক্ষণ । মেয়েটি যেন তার উপস্থিতি টের পেয়ে গেছে। কিন্তু সেটা কীভাবে সম্ভব? নুসাইর আরিবার দিকে এগোতে চেয়েও এগোলো না।

বিছানার কাছে এসে কিছুটা দূরেই দাঁড়িয়ে রইল।

তার কালো পোশাকের ভাঁজে সন্ধ্যার মতো রহস্য জমে আছে।

সে ধীরে হাত তুলল, কিন্তু মাঝপথেই থেমে গেল।

মানুষকে ছোঁয়া, বিশেষ করে মেয়েদের, তার জন্য যেন অদৃশ্য কোনো নিষেধাজ্ঞা। আরিবার সরাসরি কিছু দেখতে না পেলেও, তার চেতনা যেন সেই অদৃশ্য হাতের উষ্ণতা অনুভব করল। তবে আরিবা ভাবতে লাগলো সে যদি কথা বলে তবে সামনে থাকা অস্তিত্বটি মিলিয়ে যাবে। কিছুক্ষণ এভাবেই কাটলো। আরিবা কথা বলেই ফেলল এবার।

“ কে আছো এখানে? সামনে এসো। আমি তোমাকে দেখতে চাই। “

নুসাইর মিলিয়ে গেল না। চমকাল আরিবার অদ্ভুত আচরণে। এই মেয়ে কোনোভাবেই সাধারণ মানুষ হতে পারে না।

“ সামনে এসো! এখানে কে আছো?”

নুসাইর আরিবার প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারলোনা। বরং এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে

বিছানার পাশে মেঝেতে আস্তে করে রেখে দিলো এক ক্ষুদ্র স্ফটিকের টুকরো, যা নিজের আলোয় নীলাভ হয়ে জ্বলছে। এটার মাধ্যমে আরিবা নুসাইরকে জানতে পারবে।

বাতাস হঠাৎ ঘন হয়ে গেল, আলো ঢেউ খেলল,

আর নুসাইরের অবয়ব ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল অদৃশ্যতার গহ্বরে।

সব শান্ত হয়ে এলে আরিবা আশেপাশে নজর বুলাতে লাগলো। তার দৃষ্টি গেল মেঝের দিকে–

সেখানে, নীল আলোয় ঝিকিমিকি করছে সেই স্ফটিক। আরিবার আঙুলের ডগা স্ফটিকের ঠান্ডা ছোঁয়া ছুঁতেই তার শরীরের ভেতর দিয়ে কেমন যেন বিদ্যুতের মতো এক তরঙ্গ বয়ে গেল। মুহূর্তের জন্য শ্বাস আটকে গেল তার। চোখের সামনে ভেসে উঠল কিছু অস্পষ্ট ছবি– অদ্ভুত নীল আকাশ, অগ্নি-রঙা মরুভূমি, আর তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক ছায়ামূর্তি… যার চোখ যেন আকাশের সবচেয়ে গভীর রাতকেও হার মানায়।

সে ভড়কে গিয়ে স্ফটিকটা হাত থেকে ফেলে দিলো। মেঝেতে পড়েই পাথরটা একবার কাঁপল,

তারপর আবার নরম আলো ছড়াতে লাগল।

আরিবার বুক ধকধক করছে। তার মাথার ভেতরে কারও গলার প্রতিধ্বনি। শব্দগুলো যেন দূর আকাশ থেকে ভেসে আসছে, তবু পরিষ্কার।

"আমি তোমায় বেছে নিয়েছি…"

“কে?”

অজান্তেই ফিসফিস করে উঠল আরিবা।

কিন্তু কোনো উত্তর নেই। শুধু হাওয়ার ভেতর সেই গন্ধ যেটা দুপুরে অদৃশ্য উপস্থিতির সময়ও পেয়েছিল সে, গভীর, মাদকতা মেশানো, কিন্তু ভেতরে কোথাও এক অজানা বিপদের আভাস।

সে জানে, এটা কোনো কাকতালীয় ব্যাপার নয়। নিশ্চয়ই অদ্ভুত কিছু ঘটতে চলেছে তার সাথে।

বাইরে হালকা বৃষ্টি শুরু হয়েছে। জানালায় টুপটাপ শব্দ পড়ছে। আরিবার মনে হলো, এখন ঘুমানো দরকার। আগামীকাল হয়তো বাবা-মা আসবেন।

_________

জিন রাজ্যের আকাশে রাতের তারার মেলা। অদ্ভুত সেই তারা! পৃথিবীর তারার মতো নয়।

মিনারের চূড়াগুলোয় চাঁদের আলো পড়ছে,

মনে হচ্ছে যেন সেগুলো আকাশ থেকে ঝুলে আছে। চাঁদের আলোয় যেন আগুনের শিখা জ্বলছে। কিন্তু নুসাইরের চোখে এসবের কোনো মানে নেই। তার ভেতরটা এখন এক অদ্ভুত ঝড়ের মধ্যে ডুবে আছে। প্রাসাদের বাইরে একা বসে আছে নুসাইর।

রাজ্য, সিংহাসন, ক্ষমতা– এসব নিয়েই আজ বাবা কথা বললেন। কিন্তু তার মন পড়ে আছে একেবারে অন্য কোথাও। এক মানবী মেয়ে, যার চোখে যেন অদ্ভুত এক টান… যেন সে নিজেও জানে না, কতটা গভীরে নুসাইরের ভেতরে ঢুকে পড়েছে।

সে জানে, জিনদের পৃথিবীতে যাওয়া খুব সহজ নয়। নিয়ম আছে, শাস্তি আছে।

তবুও আজ রাতে কিছু একটা তাকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে সেখানে। হয়তো এটা তার নিজের ইচ্ছে নয়, বরং ভাগ্যের লেখা, যেটা সে নিজেও পড়তে পারছে না।

“ নুসাইর? কী হয়েছে তোমার? এমনভাবে বসে আছো কেন? “

আচমকা দুলফিকারের কণ্ঠস্বর শুনে কিছুটা নড়েচড়ে উঠল নুসাইর।

“ দুলফিকার! তুমি এখন, এখানে? “

“ ভাই, আমার আমি তো তোমার মতো নিয়মনীতি অনুসরণ করে এখানে-সেখানে যাই না কখনো। আমার যখন যেখানে খুশি যাই, যা ইচ্ছে করি। “

নুসাইর চুপ করে রইলো। দুলফিকারের আচরণ বরাবরই এমন। নুসাইরের মন খারাপ, বুঝতে পেরে দুলফিকারও তার পাশে বসলো। নুসাইর দুলফিকারের দিকে তাকাল একবার, তারপর আকাশের পানে দৃষ্টি ছড়িয়ে দিলো।

“ দুলফিকার? তোমার কাছে দায়িত্ব আগে না-কি নিজের চাওয়া-পাওয়া, ভালোবাসা আগে?”

নুসাইর জানে দুলফিকার কেমন উত্তর দিতে পারে তবুও সে নিজের মনকে শান্ত করার জন্য ভাইয়ের কাছে এমন প্রশ্ন করে বসলো। দুলফিকার নিজের চুলগুলো পেছনের দিকে ঠেলতে ঠেলতে বলল,

“ আমার কাছে আগে নিজের সুখ তারপর বাকিসব। জানোই তো তুমি, আমি স্বার্থপর, বেয়াদব, জেদি, মনমতো চলার ব্যক্তি। “

নুসাইর এক মুহূর্তের জন্য মাথা নেড়ে সমর্থন জানাল। মনে মনে নিজের অনুভূতি বিচার করতে থাকলো। ভালোবাসার কথা ভাবতেই অল্প সময়ে দুলফিকারের মনে এক অচেনা স্পন্দন ভেসে এলো। আরিবা। তার নাম মনে পড়লেই হৃৎস্পন্দন দ্রুত হয়ে যায়, চোখের সামনে যেন তার মৃদু হাসি ভেসে ওঠে। আরিবার সেই কোমলতা, সাহস আর অদ্ভুত আকর্ষণ– সবকিছুই দুলফিকারের মনে গভীরভাবে ছাপ ফেলেছে। দুই ভাই পাশাপাশি বসে আছে , অথচ তাদের মনে একই নারীর জন্য বিভিন্ন অনুভূতি জেগেছে। নুসাইর ও দুলফিকারকে কোন পথে নিয়ে যাবে এই অনুভূতি? কী হবে তাদের সাথে?

সকালটা ভীষণ শান্ত। হালকা রোদ পড়ে জানালার কাঁচে, আর হালকা হাওয়া ভেসে আনছে ঘরের ভিতরে ফুলের সুগন্ধি। আরিবা নিশ্চিত ছিলো না বাবা-মা আসবে কি না। হোস্টেলের ঘর একদম শান্ত, বাইরে শিক্ষার্থীদের ছোটখাটো আওয়াজ ভেসে আসে। আরিবার মন ভরে আছে আশঙ্কা আর উত্তেজনা, বাবা-মা এখানে এসে কি সত্যিই তাকে দেখবেন? সে জানে, তারা আসতে পারে, আবার নাও আসতে পারে।

হঠাৎ হোস্টেলের দরজার দিকে হালকা আওয়াজ পড়ল। আরিবার চোখ বড় হয়ে গেল। বুকটা হঠাৎ দ্রুত ধক-ধক করতে লাগল। সে জানতো, এটি সম্ভবত… বাবা-মা। কিন্তু মন এক মুহূর্তের জন্যও বিশ্বাস করতে পারছে না।

“ কে হতে পারে?” সে নিজেকে বলল, তবে কণ্ঠ বের হলো না। কেবল চোখ দিয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। দরজা খুলতে খুলতে ধীরে ধীরে ঢুকে এলো পরিচিত সেই দু’টি মুখ– মা ও বাবা। সালমার চোখে সেই মমতাময়ী হাসি, রুস্তমোর হাতে নিরাপদ ছোঁয়া। আরিবার বুক যেন এক মুহূর্তে হালকা হয়ে গেল।

“ কেমন আছো আরিবা?”

সালমা আরিবাকে বুকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করলেন। রুস্তম আরিবার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।

“ আলহামদুলিল্লাহ, আপনারা কেমন আছেন? “

“ তোমাকে দেখতে এসেছি, এখন আমরা ভালো আছি। “

রুস্তম বললেন।

“ আপনারা নাস্তা করে এসেছেন? “

আরিবার প্রশ্নে সালমা বললেন ,

“ খাবার নিয়ে এসেছি। আমরা একসাথে খাবো এখন। “

“ ঠিক আছে, আম্মিজান ।”

মায়ের কাছ থেকে সরে গিয়ে বাবাকে আলিঙ্গন করলো আরিবা। বাবা-মা বিছানার একপাশে গিয়ে বসলো। সালমা বাড়ি থেকে আনা কিছু খাবার টেবিলে রাখলেন। আর রুস্তম আরিবার পাশে বসে তার নতুন হোস্টেলের পরিবেশ সম্পর্কে গল্প করতে লাগলেন। আরিবা মন দিয়ে বাবার সাথে গল্প করছে।

হঠাৎ বিছানায় রাখা কালো গোলাপটার দিকে নজর পড়তেই চমকে উঠলেন রুস্তম।

“ আরিবা! ওই গোলাপটা কোথায় পেলে তুমি? “

আরিবা কিছুটা ইতস্ততভাবে বলল,

“ আমি জানি না আব্বাজান। বিছানায় ছিলো, আমার কাছে। “

স্বামীর হাবভাব দেখে সালমা যা বোঝার বুঝে গেছেন।

“ কী হয়েছে? “

সালমার দিকে গম্ভীর হয়ে তাকালেন রুস্তম। বসা থেকে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। বাবার এমন আচরণের কারণ আরিবা বুঝতে পারছে না।

“ আমি কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে আসছি, আরিবার সবকিছু গুছিয়ে নাও। আমরা ওকে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছি। “

বাবার এমন সিন্ধান্তে মনে মনে বেশ খুশি হলেও চমকাল আরিবা। সালমার মধ্যে কোনো ভাবের পরিবর্তন দেখা গেলোনা। সে হয়তো রুস্তমের আচার-আচরণে আগেই এমনকিছু ভেবে রেখেছিলেন।

“ ঠিক আছে। “

রুস্তম ফুলটা হাতে নিয়েই কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন। আরিবা তার মায়ের দিকে কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সালমা বললেন,

“ আপাতত কোনো প্রশ্ন করিওনা। বাড়িতে যাই, তারপর কথা হবে। চলো জিনিসপত্র গুছিয়ে নেবো। “

আরিবা বাধ্য মেয়র মতো মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। সালমা ও আরিবা মিলে সবকিছু বাড়ি নেওয়ার জন্য গোছগাছ করতে শুরু করলো।

চলবে

দুটো গল্প একসাথে লিখতে হিমসিম খাচ্ছেলি, ভাই। ভালো লাগে না। যাইহোক, আমার চতুর্থ বই হামিংবার্ড অর্ডার করেছেন তো? বইটি কিন্তু সাইকো, রোমান্টিক, টক্সিক নায়ককে নিয়ে লেখা। 🌚

আগের পর্ব https://www.facebook.com/100085130931546/posts/728599059987785/

পরের পর্ব https://www.facebook.com/100085130931546/posts/731011633079861/

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন