#আশিক_আল_জিন
#পর্ব_৬
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া
“ আরিবা? এই আরিবা? আর কতক্ষণ ঘুমিয়ে থাকবে? রাত হয়ে গেছে। খাওয়াদাওয়া তো করবে না-কি? “
হাবিবার ডাকাডাকি শুনে আরিবার ঘুম ধীরে ধীরে পাতলা হচ্ছে। তবে পুরোপুরি ঘুম ভাঙছে না। হাবিবা হাল ছেড়ে দেওয়ার মেয়ে নয়। সে পাশের টেবিলের ওপর থেকে পানিভর্তি গ্লাসটা হাতে নিলো । সেখান থেকে অল্পকিছু পানি হাতে নিয়ে আরিবার চোখেমুখে ছিটিয়ে দিলো। অল্পকিছু সময় পর চোখ মেলে তাকাল আরিবা। শরীরের ক্লান্ত ভাবটা এখন আর নেই। সোজা হয়ে বসলো সে। হাবিবাও পাশে বসলো এবার।
“ রাত হয়ে গেছে! এতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলাম?”
অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো আরিবা। হাবিবা মুচকি হাসল।
“ জি মহারাণী। “
“ কোথা থেকে যে এতো ঘুম জড়ো হলো চোখে, বুঝতে পারছি না। মনে হচ্ছিল…… “
আরিবা কথা থামিয়ে দিলো। কারো উপস্থিতি অনুভব করেছিলো সে, কিন্তু এটা কাউকে বলা ঠিক হবে কি-না বুঝতে পারছে না।
“ কী মনে হচ্ছিল,আরিবা?”
“ কিছু না। তুমি বসো, আমি একটু হাতমুখ ধুয়ে আসি৷ ভালো লাগবে। “
আরিবা বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। হাতের ভেতর থেকে কালো গোলাপটা তখন বিছানায় পড়ে রইলো। আরিবা আড়চোখে তাকিয়ে দেখল সেটা। হাবিবা ফুলটা হাতে নিয়ে বলল,
“ কালো গোলাপ! সুন্দর তো। “
আরিবা কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না। এই ফুল এলো কোথা থেকে?
“ হুম। থাকো তুমি, আসছি আমি। “
হাবিবা ঘর থেকে বেরিয়ে গোসলঘরের দিকে এগোল। সেখানে গিয়েই চোখেমুখে পানি দিতে হবে। যেতে যেতে আরিবার মন গভীর ভাবনায় ডুবলো। আজকের ঘুমটা মোটেও স্বাভাবিক ছিল না। আর ঘুমের মধ্যে ওরকম উত্তেজনাকর স্পর্শগুলো? আরিবার শরীরে কাটা দিচ্ছে। স্পর্শগুলো যেন জীবন্ত এখনও, আরিবাকে প্রভাবিত করছে। কিন্তু আচমকাই ভয় পেয়ে গেলো সে। কোনো অশরীরী নয়তো? কোনোভাবে তার বাবার পেছনে পড়ে থাকা কোনো খারাপ শক্তি তার কাছে এলো না তো! আনমনে হাঁটতে হাঁটতে গোসলঘরে গেলো সে। চোখেমুখে পানি দিলো। তার অনুমতি ব্যতীত এভাবে ছুঁয়ে দেওয়া প্রাণীটি নিশ্চয়ই ভালো নয়। কিন্তু ফুলটা? ফুল দেওয়া তো ভালো বিষয়। কিন্তু ফুলের রঙটাই কালো আর কালো মানে নেতিবাচক প্রভাব। আরিবার কিশোরী মন ভাবনা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।
_____________
শয়নকক্ষে দুই ছেলেকে ডেকে পাঠিয়েছেন মালিক আল জিন। নুসাইর যথাসময় কক্ষে উপস্থিত হলেও দুলফিকার এখনও আসেনি। অবশ্য দুলফিকারের কাছে এরচেয়ে বেশি কিছু আশাও করে না কেউ।
“ ঠিক এই কারণেই দুলফিকারের ওপর রাগ হয় আমার। কতটা কাণ্ডজ্ঞানহীন একজন জিন, সে৷ “
হতাশাজনক ভঙ্গিতে বললেন মালিক আল জিন। নুসাইর বাবার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
“ এভাবে বলবেন না, বাবা। দুলফিকার চলে আসবে। “
“ এসে গেছি আমি। কিছু দরকার থাকলে বলুন, নয়তো ঘুমোতে যাবো। “
দুলফিকারের আগমনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল নুসাইর। তবে তার এমন বেয়াদবির কারণে মালিক আল জিন রাগান্বিত হয়ে গেলেন।
“ তুমি দিনদিন মাত্রাতিরিক্ত বেয়াদব হয়ে যাচ্ছো, দুলফিকার। দরকার আছে বলেই তোমাকে ডাকা হয়েছে, খোশগল্প করতে নয়। “
দুলফিকার ভাবলেশহীনভাবে একটা সোফায় বসলো গিয়ে।
“ শুনে ভালো লাগলো। “
বিরক্তিতে অন্য দিকে তাকালেন মালিক৷ নুসাইর পরিস্থিতি ঠিক করতে বলল,
“ বাবা আপনি বলুন, কোনো সমস্যা হয়েছে কি?”
দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন জিন রাজা।
“ তোমরা নিশ্চয়ই জানো জিন রাজ্যের নিয়মের কথা? নিয়ম অনুযায়ী পুত্র যোগ্য হলে তাকে সিংহাসনে বসাতে হয়। তোমরা দু'জনেই বড়ো হয়েছো। বৃদ্ধি, শক্তি, সৌন্দর্য সবদিকেই তোমরা যোগ্য হয়ে উঠেছো এখন। কিন্তু তোমাদের মধ্যে থেকে কাকে ভবিষ্যত রাজা হিসেবে নির্ধারণ করবো সেটাই বুঝতে পারছি না। এখন তোমাদের মতামত আশা করছি। “
দুলফিকারের ঠোঁটের কোণে বিদ্রুপের হাসি ফুটল। বলল,
“ নুসাইর আপনার যোগ্য পুত্র। তাকেই সিংহাসনে বসাতে পারেন। এসব দায়িত্বের বোঝা আমার মতো বেয়াদবের পক্ষে সামলানো সময় না। “
“ আহ দুলফিকার! কী হচ্ছে? “
দুলফিকার অন্য দিকে দৃষ্টিপাত করলো। সত্যি সত্যি এসব আলোচনা ভালো লাগে না তার। রাজ্য, ক্ষমতা নিয়ে তার কোনো আগ্রহ নেই। নিজের ইচ্ছে মতো বেঁচে থাকার মধ্যেই তার সব সুখ নিহিত আছে।
“ বাবা আমাদের কিছু বলার নেই। আপনি আমাদের থেকে অধিক বিচক্ষণ জিন। তাই আপনিই সিন্ধান্ত নিন। “
লম্বা নিঃশ্বাস ছাড়লেন মালিক। নুসাইরের থেকে এমনটাই আশা করেছিলো সে।
“ বেশ। তোমরা এখন এসো। আগামী তিনমাসের মধ্যে আমি আমার সিন্ধান্ত জানাবো। “
নুসাইর দুলফিকারকে ইশারা করে বসা থেকে উঠতে বলল। দুলফিকার উঠে দাঁড়াল, ভাইয়ের পাশে।
“ ঠিক আছে, বাবা। “
দুই ভাই আলাদা ছন্দে কক্ষত্যাগ করলো। মালিক আল জিন বিছানায় শরীর এলিয়ে দিলেন। নূর আল জোহরা জরুরি কাজে তার পিতৃগৃহে গেছেন। ফিরবেন দু'দিন পর।
_____
জিন রাজ্যের বিকেল নেমে এসেছে ধীরে ধীরে। আকাশজুড়ে গাঢ় কমলা আর সোনালি রঙের ঢেউ খেলছে, যেন কারও হাতে আঁকা এক অলৌকিক ছবি। দূরের পাহাড়গুলো সেই আলোয় জ্বলজ্বল করছে, চূড়াগুলো রুপালি আভায় ভিজে আছে। রাজপ্রাসাদের নীল পাথরের মিনারগুলো সূর্যের শেষ আলোয় দীপ্তি ছড়াচ্ছে, মনে হচ্ছে যেন সেগুলো আকাশের অংশ হয়ে গেছে।
চারপাশে এক অদ্ভুত প্রশান্তি, তবে তার মাঝেও প্রাণের স্রোত বয়ে চলেছে। হাওয়ায় ভেসে থাকা বাজারের দোকানগুলো থেকে মশলা, সুগন্ধি আর অচেনা নীল রঙা ফলের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। নদীর জলে বিকেলের আলো পড়তেই তা তরল রূপোর মতো ঝলমল করে উঠল, আর পানির উপর ভেসে বেড়াচ্ছে অসংখ্য আলোককণা, যেন নদীটা নিজেই তারা ছড়িয়ে দিয়েছে।
প্রাসাদের বাগানে মৃদু হাওয়া বইছে, সঙ্গে উড়িয়ে নিয়ে আসছে ফুলের পাপড়ি। সেই পাপড়িগুলো হাওয়ার স্রোতে ভেসে গিয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে অস্তরাঙা আকাশে।
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে নুসাইর। তার মন পড়ে আছে আরিবার দিকে। মেয়েটিকে ভালো করে দেখতে পর্যন্ত পারেনি– এমনটা মনে হচ্ছে তার। কিছুতেই যেন শান্তি পাচ্ছে না নুসাইর। আরিবার সাথে দেখা করলে কেমন হয়– ভেবে দ্বিধায় পড়ে গেলো সে। বিনা কারণে পৃথিবীতে যাওয়া কি উচিত হবে? কক্ষের ভেতর পায়চারি শুরু করেছে নুসাইর। তার অস্থির চিত্ত তাকে স্থির থাকতে দিচ্ছে না। একজন মানবীর জন্য কেন তার জন্য এই অদ্ভুত আকুলতা? এই অকারণ ব্যাকুলতা? সময়ের হিসেব হারিয়ে ফেলল নুসাইর। অবশেষে নিজের মনকে আর বেঁধে রাখতে পারল না। একটা দৃঢ় শ্বাস নিয়ে কক্ষের দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে গেলো সে।
_____
রাতে তেমন কিছুই খায়নি আরিবা।
এখানে আসার পর থেকেই তার খাওয়াদাওয়া কমে গেছে। বাড়ির খাবারের মতো খাবার কি আর কোথাও মেলে? নাহ,মেলে না। মায়ের হাতের রান্না তো শুধু স্বাদের জন্য নয়, তার ভেতরে মেশানো থাকে মমতার উষ্ণতা, যা আর কোনো জায়গায় পাওয়া যায় না।
“আরিবা, হাঁটতে যাবে?”
হাবিবা ও মারিয়া এসে বিছানায় শোয়া আরিবার পাশে বসলো।
“এখন?” আরিবা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ। ” হাবিবা হেসে জবাব দিলো।
“না, তোমরা যাও। আমার ঘুম পাচ্ছে।”
কণ্ঠে ক্লান্তি মেশানো একরকম অনাগ্রহ।
হাবিবা ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল,
“ঠিক আছে ঘুমকুমারী। ঘুমাও তুমি, আমরা এলাম।”
আরিবা শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
ওরা কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলো।
এখানে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য আলাদা ঘরের ব্যবস্থা আছে। তবে চাইলে কেউ অন্য কারও সঙ্গে ঘর ভাগ করে থাকতে পারে। কিন্তু আরিবা…
একা থাকতেই যেন অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
আগামীকাল সাপ্তাহিক ছুটির দিন।
অজানা এক অনুভূতি আরিবার মনকে বলে দিচ্ছে কাল বাবা-মা আসবেন। তাদের ওপর অভিমান কম নয় তার। এই হোস্টেলে পাঠানোর জন্য মন ভরে রাগ করেছে, নিজের ঘর, নিজের মানুষ, নিজের শহর থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য কষ্ট জমেছে বুকের ভেতর।
তবুও বাবা-মা তো বাবা-মাই। অভিমানের দেয়াল যত উঁচুই হোক,তার ওপাশে তাদের জন্য টানটা আরও গভীর হয়ে জমে থাকে।
রাতের নীরবতায় হঠাৎই মনে হলো
যদি সত্যি কাল তারা আসে? মায়ের মুখের সেই শান্ত মমতার হাসিটা দেখলে,বাবার হাতের সেই নিরাপদ ছোঁয়াটা পেলে, তাহলেই কি বুকের ভারটা একটু হালকা হবে?
অদৃশ্য এক দরজা যেন বাতাস কেটে খুলে গেলো।
শব্দ নেই, কিন্তু হালকা নীল আলোয় ঢেউ খেলে গেল ঘরের ভেতর। সেই আলো ভেদ করে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো নুসাইরের অবয়ব।
তার কালো পোশাকের প্রান্তে হাওয়ার হালকা খেলা, চোখে গভীরতা, যেন হাজার বছরের রহস্য জমে আছে তাতে।
এক পা, দু’পা… নরম মেঝেতে নিঃশব্দ পদক্ষেপে সে ঘরে প্রবেশ করল। চারপাশে একবার তাকাল– সবকিছু শান্ত, স্থির, প্রায় নিঃশ্বাসহীন। তার দৃষ্টি গিয়ে থামল বিছানায় শুয়ে থাকা আরিবার ওপর।
তার মুখে এক স্বপ্নিল প্রশান্তি। নুসাইরের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল এক মৃদু হাসি।
আরিবা– সদ্য ফোঁটা লাল টুকটুকে এক গোলাপ,
যাকে ছুঁতে ইচ্ছে হয়, তবুও ভয়ে হাত কাঁপে…
ঘরের ভেতর আচমকাই যেন হাওয়া বদলে গেলো। শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডার হালকা শিহরণ নেমে এলো। অজান্তেই শরীরটা টানটান হয়ে উঠল আরিবার। সে ধীরে চোখ বন্ধ করল,
গভীর এক, দুই, তিনবার লম্বা নিঃশ্বাস ছাড়ল।
শান্ত থাকার চেষ্টা, অথচ ভেতরে ভেতরে সতর্কতা বাড়ছে প্রতিটি মুহূর্তে। দুপুরবেলায় যখন সেই অদৃশ্য শক্তি এসেছিল, তখন হয়তো পুরোটা টের পায়নি সে। কিন্তু এখন… এখন তার প্রতিটি ইন্দ্রিয় যেন বলে দিচ্ছে– এখানে কেউ আছে।
চোখ-মুখ শক্ত করে ফেলল আরিবা। হৃদস্পন্দন ধীরে হলেও তীক্ষ্ণ, তার ভেতরের অদ্ভুত ক্ষমতা যেন সক্রিয় হয়ে উঠছে। সে মনোযোগ গেঁথে দিল চারপাশের অদৃশ্য শূন্যতায়, গভীরভাবে অনুভব করতে চাইলো… কে এসেছে এখানে!
চলবে…..
আগের পর্ব https://www.facebook.com/100085130931546/posts/727777253403299/
পরের পর্ব https://www.facebook.com/100085130931546/posts/729577216556636/
আমার নতুন ই-বুক #আমার_সুপারস্টার ক্রয় করুন মাত্র ২৭ টাকায়। অবশ্যই প্রোমো কোড ব্যবহার করতে হবে। ই-বুকটিতে ইরোটিক রোমান্স আছে।
📌 লিংক – https://link.boitoi.com.bd/n1A1
📌যেভাবে বইটই থেকে ই-বুক ক্রয় করবেন:
https://youtube.com/shorts/6NjaAveyh6A?feature=share