#আশিক_আল_জিন
#পর্ব_১৫
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া
উদভ্রান্ত পাখির মতো আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে আরিবা। কী করছে, কোথায় যাচ্ছে নিজেই যেন জানে না। প্রকৃতিতে তখন ভয়ংকর তাণ্ডব শুরু হয়েছে। দমকা হাওয়ার দাপটে চারপাশের গাছপালা উপড়ে পড়ছে, বিদ্যুৎ চমকে পাহাড় ধসে পড়ছে, তীব্র বৃষ্টিতে পৃথিবী যেন ডুবে যাচ্ছে।
হঠাৎই ঝড়-বৃষ্টির গর্জন ভেদ করে সামনে ভেসে উঠলো এক নীলাভ রশ্মি। অচেনা আলোতে মুহূর্তের জন্য থমকে গেলো আরিবা। নীলচে রশ্মি ধীরে ধীরে রূপ নিলো এক সুঠাম দেহের ছায়ায়। রূপান্তরের শেষ মুহূর্তে প্রকাশ পেলো এক ভ্যাম্পায়ারের ভয়ার্ত অবয়ব।
তার শরীর ফ্যাকাশে, চোখদুটো টকটকে লাল আগুনের মতো জ্বলছে। ঠোঁটের দু’পাশ দিয়ে বেরিয়ে আছে সূচালো দুটি শ্বদন্ত, যেগুলো যেন যেকোনো মুহূর্তে রক্তের স্বাদ নিতে চাইছে। কালো আলখেল্লার ঘেরাটোপে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ভ্যাম্পায়ার আর কেউ নয়– রোদ্দুর।
তাকে দেখে আরিবার মুখে কোনো ভাবান্তর হলো না। ঝড়ের মতোই স্থির দাঁড়িয়ে রইলো সে। রোদ্দুর ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এল, যেন অশান্ত প্রকৃতির মাঝেই দু’জনার মধ্যে জন্ম নিচ্ছে নতুন এক সংঘাতের সূচনা।
“আরিবা? কী করছো তুমি? হুঁশে ফেরো!”
রোদ্দুর উদ্বিগ্ন স্বরে চিৎকার করে উঠলো, দু’হাতে আরিবার কাঁধ ঝাঁকিয়ে।
কিন্তু আরিবা নির্বিকার, তার চোখে যেন অন্য এক জগতের অগ্নিশিখা জ্বলছে। কোনো জবাব না দিয়ে সে শুধু এক আঙুল উঁচিয়ে রোদ্দুরের দিকে ইশারা করলো। মুহূর্তেই এক অদৃশ্য শক্তি রোদ্দুরকে ছিটকে দূরে ফেলে দিলো।
রক্তিম চোখে দাঁড়িয়ে, কণ্ঠে আকুতি মিশিয়ে রোদ্দুর আবারও বলল,
“আরিবা! আমি তোমার আপনজন… আমার কথা শোনো! তুমি শান্ত হও। তোমাকে তোমার শক্তি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তুমি সাধারণ কেউ নও– তুমি ভ্যালেরিনা! আমার ছোটো চাচ্চুর একমাত্র কন্যা তুমি। বুঝতে পারছো, আরিবা?”
কিন্তু তার কোনো কথাই যেন কানেই পৌঁছাচ্ছে না। আরিবা তাণ্ডব চালিয়েই যাচ্ছে। বজ্রপাত তার নির্দেশে আকাশ ছিঁড়ে নামছে, মাটিতে আগুন জ্বলছে, আকাশ থেকে অগ্নিঘোলা নেমে আসছে। প্রতিটি শ্বাসে তার শক্তি যেন আরও ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে। চারদিকে মৃত্যুভয়ের ছায়া ঘনিয়ে আসছে, যেন এক অপ্রতিরোধ্য দুর্যোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে সে।
আরিবাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে দুলফিকার। চারদিক চষে বেড়ালেও মেয়েটার কোনো চিহ্ন মিললো না। একদিকে উদ্বেগ, অন্যদিকে রাগ মেজাজ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে তার। চোখে আগুনের ঝিলিক, প্রতিটি শ্বাসে ক্রোধের চাপা ধ্বনি।
বারবার চারপাশে নজর বুলিয়েও যখন কিছুই দেখতে পেল না, বিরক্তি চরমে পৌঁছলো। ঠোঁট চেপে ধরলো সে।
“কোথায় গেলে তুমি, প্রেমিকা?”
শেষমেশ দুলফিকার চোখ বন্ধ করলো। ভালোভাবেই জানে, পৃথিবীর মানুষের খোঁজে নিজের শক্তি ব্যবহার করা জিন রাজ্যের কঠোর নিয়ম ভঙ্গের শামিল। কিন্তু নিয়মের ভয় তার নেই। আরিবা বিপদে আছে– এটাই একমাত্র সত্য।
নিয়ম ভেঙে মনসংযোগ করতেই, হঠাৎ চোখের সামনে ভেসে উঠলো এক ভয়ংকর দৃশ্য। আরিবা– তার প্রেয়সী, অথচ এখন এক দানবীয় রূপে। বজ্রপাত, আগুন আর তাণ্ডবে পৃথিবীর ভারসাম্য কেঁপে উঠছে। এমন চলতে থাকলে শুধু এই গ্রহ নয়, অন্য গ্রহগুলোতেও ধ্বংস নেমে আসবে।
দুলফিকারের বুকটা মুহূর্তেই ধক করে উঠলো।
“না…! এভাবে চলতে দিলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।”
আর এক মুহূর্ত দেরি না করে, হাতে এক চপেটাঘাতের মতো তুড়ি মেরে স্থানান্তরের জাদু করলো সে। সেকেন্ডের ভেতর ঝড়-বৃষ্টির ভেতর দিয়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে আরিবার সামনে গিয়ে উপস্থিত হলো দুলফিকার।
রোদ্দুর আরিবাকে শান্ত করার জন্য তার সব শক্তি জোগাচ্ছে, কিন্তু আরিবার ওপর নিয়ন্ত্রণ করা তার পক্ষে অসম্ভব। সে যতই চেষ্টা করুক, আরিবা তাণ্ডব চালাচ্ছে। দুলফিকার কোনো মুহূর্ত চিন্তাও না করে হঠাৎ আরিবাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো। মুহূর্তেই আরিবার শরীর থেকে প্রচণ্ড তাপ বের হতে লাগলো। তবুও দুলফিকার ছাড়লো না। শক্ত করে নিজের দিকে টেনে দাঁড় করালো তাকে।
“প্রেমিকা? আমার চোখের দিকে দেখো।”
তার কণ্ঠ কোমল, কিন্তু অটল।
আরিবা অস্থির হয়ে তাকালো, বুকের ধাক্কা নিয়ন্ত্রণের বাইরে। দুলফিকার ধীরে ধীরে দুই হাতে আরিবার গালে হাত রেখে চোখে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে রইলো।
“আরিবা? শুধু আমার দিকে তাকাও।”
আরিবা এক মুহূর্তের জন্য তাকাল, তবে চোখে এখনো অশান্তি। দুলফিকার আরিবার ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। মুহুর্তের জন্য সবকিছু ভুলে, সে আরিবার ঠোঁটের সুধা পান করতে ব্যস্ত হয়ে গেল।
আরিবা হঠাৎ শান্ত হয়ে গেল, যেন দুলফিকারের উষ্ণ স্পর্শ তার ভিতর থেকে সব অশান্তি বের করে দিয়েছে। সে অবচেতনভাবে দুলফিকারের গলায় জড়িয়ে ধরলো, আর ফিরেও নিজে সাড়া দিতে লাগলো।
রোদ্দুর দূরে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখে রাগে হাত মুঠো করে ফেললো। আরিবার সবকিছুর ওপর শুধু তার অধিকার থাকা সত্ত্বেও, সেই জিন রাজপুত্র কীভাবে এত সহজে তাকে দমিয়ে দিতে পারলো, এতে সে ব্যথিত।
হুট করেই আরিবার শরীরটা কেমন নেতিয়ে পড়লো। ভ্যালেরিনা রূপ অদৃশ্য হয়ে সাধারণ মানুষের রূপে ফিরে এলো সে। দুলফিকার আরিবাকে বুকে জড়িয়ে ধরে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। রোদ্দুরকে কাছে এগিয়ে আসতে দেখে দুলফিকার গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“ আরিবাকে সামলানো সবার পক্ষে সম্ভব নয়। যেখানে শক্তি কাজ করে না সেখানে ভালোবাসাই প্রধান অস্ত্র। শক্তি দিয়ে হয়তো আমিও ওকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারতাম না তবে ভালোবাসা? এটা দিয়ে পারবো, আজ আগামীকাল সব সময়। “
রোদ্দুর ক্রুর হাসলো।
“ কীসের ভালোবাসা? আরিবা যখন তোমার প্রজাতির প্রকৃত সত্যি জানবে তখন, তোমাকে নিজ হাতেই শাস্তি দেবে। ধ্বংস করে দিবে তোমার রাজ্য ও তোমার পিতাকে। “
ভ্রু কুঁচকে ফেলল দুলফিকার। আরিবাকে কোলে তুলে নিলো সে।
“ কোন সত্য?”
“ যে সত্যি সহস্র বছর পুরনো। তুমি আরিবার থেকে দূরে থেকো। আরিবার জন্য আমি আছি। “
দুলফিকার মুচকি হাসল।
“ পুরো মহাবিশ্ব ধ্বংস হয়ে গেলেও আমি আরিবার থেকে দূরে সরছি না, রোদ্দুর। বিদায়। “
রোদ্দুর কিছু বলার আগেই দুলফিকার আরিবাকে নিয়ে উধাও হয়ে গেলো। পেছনে পড়ে রইলো রোদ্দুর ও তার অসন্তুষ্টি।
বিশাল সোনালী স্তম্ভে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাজা মালিক আল-জিন। তার চোখ রক্তাভ, চেহারায় তীব্র ক্রোধ। চারদিকে সেনাপতি আর উপদেষ্টারা দাঁড়িয়ে আছে, সবাই ফিসফিস করছে।
“ শোনো শোনো, রাজপুত্র দুলফিকার নাকি পৃথিবীর কোনো মানবীকে ভালোবাসছে…!”
“ অসম্ভব! এটা যদি সত্যি হয়, তবে পুরো জিন জাতির জন্য লজ্জা!”
“ মানুষের সাথে সম্পর্কে থাকা মানেই আমাদের নিয়ম ভাঙা…”
গুঞ্জনে ভরে গেছে দরবার।
মালিক গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“ চুপ করো সবাই! আমি জানতে চাই, এ খবর কতটা সত্য?”
সেনাপতি মাথা নিচু করল।
“ মহারাজ, আমি স্বচক্ষে কিছু দেখিনি। তবে চারদিকে একই গুঞ্জন। রাজপুত্রের আচরণে অদ্ভুত পরিবর্তন এসেছে। সে রাজকীয় কাজ এড়িয়ে যায়, আর হঠাৎ হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে পৃথিবীতে যায়। এমনকি নুসাইর রাজপুত্রও জানে কিছু।”
রাজা এবার চোখ সরু করলেন।
“ নুসাইর?”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নুসাইর কপালে ঘাম নিয়ে এগিয়ে এল।
“ আব্বাজান… আমি… আমি ভাইকে বিশ্বাস করি। ওর যদি কোনো গোপন বিষয় থাকে, তার মানে তার যথেষ্ট কারণও আছে। আমি কিছু দেখিনি।“
রাজা মালিক টেবিলে ঘুষি মারলেন, গর্জে উঠলেন
“ তুমিও আমার চোখে ধুলো দিচ্ছ নুসাইর? আমি স্পষ্ট দেখছি, দুলফিকার বদলে গেছে। একজন মানবী ওর হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু মনে রেখো, এই রাজ্যে মানুষের জন্য কোনো জায়গা নেই! যদি সে সত্যিই এমন কিছু করে থাকে, তবে নিজের হাতে আমি শাস্তি দেব!”
দরবার জুড়ে নিস্তব্ধতা নেমে এলো। সবাই ভয়ে কেঁপে উঠল। নুসাইর গোপনে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। আরিবাকে দেখেনি কয়েকদিন হলো। মনটা যেন কিছুতেই বাঁধা মানতে চাইছে না আর৷ নুসাইর কখনো ভাবেনি সে বাবার কাছে এভাবে কোনোকিছু লুকাবে। অথচ তাই করেছে সে। ভাইয়ের ভালোবাসা ও নিজের ভালোবাসার জন্য সত্যি জেনেও চুপ করে থেকেছে সে।
অন্ধকার আকাশ ধীরে ধীরে শান্ত হচ্ছে। তীব্র ঝড়-বৃষ্টির পর চারদিক নিস্তব্ধ। রাতের বুকে মৃদু শীতলতা নেমে এসেছে। ঠিক সেই সময়, লুবনিন শহরের রাস্তায় ভেসে চলেছে দুলফিকার। তার বাহুতে জ্ঞানহারা আরিবা। চোখ বন্ধ, ঠোঁট ফ্যাকাশে, শরীর ক্লান্তিতে অবশ।
দুলফিকারের চোখে কঠিন দৃঢ়তা, তবুও ভেতরে কোথাও অদ্ভুত শঙ্কা।
“ তুমি কতটা ভয়ংকর হতে পারো, প্রেমিকা… আবার কতটা নিরীহ! তোমাকে সামলানো এখন আমার দায়িত্ব।”
আকাশে মেঘ জমে আছে, তবে বৃষ্টি থেমে গেছে অনেকক্ষণ আগেই। আরিবার বাড়িতে। আলো জ্বলছে এখনও
ঘরের ভেতরে রুস্তম আর সালমা অস্থির পায়চারি করছে। মেয়েকে হারিয়ে ফেলার আতঙ্কে তাদের বুক হাহাকার করছে, তবে মনে একটা ভরসা আছে, দুলফিকার।
সালমা চোখ মুছতে মুছতে বলল,
“ রুস্তম, ওই জিন রাজপুত্র কি আসলেই কথা রাখবে? যদি না ফেরায় আরিবা? যদি…?”
রুস্তম দৃঢ় গলায় বলল,
“ না সালমা। ওর চোখের চাহনি মনে আছে তো? দুলফিকার কোনো সাধারণ কেউ নয়। সে রাজপুত্র, আর রাজপুত্ররা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে না।”
ঠিক তখনই হঠাৎ বাতাস কাঁপতে লাগল। দরজা না খোলাতেই হালকা নীল আলো ঝলসে উঠল। মুহূর্ত পর ঘরের ভেতরে দাঁড়িয়ে গেলো দুলফিকার, বাহুতে নিস্তেজ আরিবা।
“ আরিবা!”
সালমা ছুটে এসে মেয়েকে বুকের ভেতর টেনে নিলো। চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে তার।
রুস্তম স্থির দৃষ্টিতে দুলফিকারের দিকে তাকাল।
“ তুমি সত্যিই ফিরিয়ে এনেছো ওকে…”
দুলফিকার ক্লান্ত চোখে তাকালো তাদের দিকে।
“ আমি বলেছিলাম, ফিরিয়ে আনব। তবে… আপনার আরিবাকে হয়তো আর বেশিদিন আড়াল করে রাখা যাবে না। ওর শক্তি জেগে উঠছে। যদি নিজেকে সামলাতে না পারে তখন কী হবে জানি না আমি। ”
সালমা কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“ কিন্তু তুমি কে! জিন রাজ্যের রাজপুত্র? “
দুলফিকার কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল,
“ হ্যাঁ আমি দুলফিকার, জিন রাজ্যের রাজপুত্র। কিন্তু আরিবা! আরিবা কে? কী ওর পরিচয়! “
রুস্তম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“ আরিবা কোনো মানুষ নয়। সে দুই জগতের সংমিশ্রণ… এক বিরল অস্তিত্ব, যাকে ভ্যালেরিনা বলা হয়। ওর শক্তি কতটা এবং কোন ধরণের সেসব এখনও জানি না।”
সালমা আরিবার পাশে বসে আছে। দুলফিকার বলল,
“ আমি খোঁজ নেবো এই বিষয়। “
রুস্তম গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“ ঠিক আছে। কিন্তি তুমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলে, আজ রাখলে। আরিবাকে তুমিই সামলাতে পেরেছো। কিন্তু দুলফিকার… যদি আমাদের মেয়ের জীবনে তুমি না থাকো? যদি সে নিয়ন্ত্রণ হারায়?”
দুলফিকার গভীর চোখে তাকাল রুস্তমের দিকে।
“ যতদিন আমি আছি, আরিবা কখনো একা নয়। ও আমার… প্রেমিকা। ওকে আমি সামলাবো, যেভাবেই হোক।”
সালমা অবাক হয়ে দু’জনের কথোপকথন শুনছিল। তার বুক কেঁপে উঠল, তবু আর কিছু বলল না। একজন জিন তাদের মেয়ের প্রেমিক!
দুলফিকার ধীরে ধীরে পিছু হটল। বের হওয়ার আগে শেষবারের মতো আরিবার মুখের দিকে তাকাল। শান্ত, ঘুমন্ত, যেন পৃথিবীর কোনো ঝড়ই তাকে ছুঁতে পারবে না।
“ এখন বিশ্রাম নিতে দিন ওকে। আবার দেখা হবে। আগামীকাল আসবো আমি। “
রুস্তম মাথা নাড়লেন কেবল। সালমা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। এক মৃদু আলোয় মিলিয়ে গেলো দুলফিকার
অন্ধকারে মোড়ানো বিশাল প্রাসাদ, যার চারপাশে ধূসর মেঘের স্তর জমে আছে। দূর থেকে মনে হয়, যেন মৃত্যুর ছায়া ভেসে বেড়াচ্ছে চারদিকে। এটাই ভ্যাম্পায়ারদের রাজ্য।
রোদ্দুর প্রবল রাগ আর ক্ষোভ নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। তার কালো আলখেল্লা বৃষ্টিতে ভিজে গাঢ় হয়ে উঠেছে। চোখগুলো টকটকে লাল হয়ে আছে, যেন আগুন জ্বলছে ভেতরে।
প্রাসাদের সিংহাসন কক্ষে বসে আছেন তার বাবা– ভিরন আর পাশে মা ভ্যালিসা। তারা দুজনেই ঠাণ্ডা চোখে তাকালেন ছেলের দিকে।
“ কোথায় ছিলে এতক্ষণ?”
কড়া গলায় প্রশ্ন করলেন ভিরন।
রোদ্দুর গভীর নিঃশ্বাস নিলো, তারপর গম্ভীর স্বরে বলল,
“ বাবা, মা… আমি যার খোঁজে ছিলাম এতদিন, তাকে পেয়ে গেছি। আরিবা… বেঁচে আছে।”
ভ্যালিসা চমকে উঠলেন।
“ কী বলছো তুমি? আরিবা তো…”
“ না মা।”
রোদ্দুর বাধাঁ দিলো,
“ও মারা যায়নি। আমি নিজ চোখে দেখেছি। আগুন, বজ্রপাত সবকিছু ওর নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু…”
রোদ্দুরের চোখে এবার ঘৃণার ঝিলিক ফুটে উঠল।
“ কিন্তু ওকে নিজের কব্জায় নিয়েছে এক জিন রাজপুত্র–দুলফিকার! সে ওকে নিজের প্রেমিকা বলে পরিচয় দিচ্ছে।”
ভিরনের চোখ রক্তাভ হয়ে উঠলো। সিংহাসন থেকে উঠে দাঁড়ালেন তিনি।
“ এক জিন রাজপুত্র? সাহস হলো তার আমাদের রক্তের উত্তরাধিকারীর ওপর হাত তোলার!”
ভ্যালিসা ফিসফিস করে বললেন,
“ আরিবা… চাচার মেয়ে । ও যখন ছোট্ট ছিল, তখনই চাচা আর চাচি দুজনেই মারা গেল। আমি ভেবেছিলাম ও নেই, হারিয়ে গেছে পৃথিবীতে। অথচ এতদিন ধরে ও বেঁচে ছিল!”
রোদ্দুর দাঁত চেপে বলল,
“ হ্যাঁ মা, আর এখন সে আমাদের কাছে ফিরে আসার পরিবর্তে জিন রাজপুত্রের বাহুতে আশ্রয় নিচ্ছে। আমি আর সহ্য করব না। আরিবার শক্তি জিন রাজ্য ধ্বংশ করার জন্য, তাদেরকে শক্তি দেওয়ার জন্য নয়। ”
ভিরন গর্জে উঠলেন,
“ যুদ্ধ হবে! ভ্যাম্পায়ার রক্ত কারো দাস হবে না। আরিবা আমাদের বংশের গৌরব, আমাদের শক্তি। ওকে ফিরিয়ে আনতেই হবে, যেভাবেই হোক!”
প্রাসাদের ভেতর হাহাকার করে উঠল বাদুড়ের ডানার শব্দ। ভ্যাম্পায়ার সৈন্যরা দূরে দাঁড়িয়ে শুনছিলো প্রতিটি কথা। তারা জানলো,যে মেয়ে হারিয়ে গেছে ভেবেছিল, সে-ই এখন তাদের ভবিষ্যৎ রানি হতে পারে।
রোদ্দুর ঠাণ্ডা হেসে বলল,
“ বাবা, এবার আমাকে অনুমতি দিন। আমি ওকে ফিরিয়ে আনব। দুলফিকারকে মাটিতে পুড়িয়ে ছাই করে দেব।”
ভিরন গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“ যাও, রোদ্দুর। তবে মনে রেখো, এ লড়াই শুধু এক মেয়েকে ফিরিয়ে আনার জন্য নয়। এ লড়াই ভ্যাম্পায়ার আর জিনদের মধ্যে আসন্ন যুদ্ধের প্রথম স্ফুলিঙ্গ।”
______________
সকালের আলো জানালা ভেদ করে ঘরে ঢুকছে। পাখিদের ডাক ভেসে আসছে দূর থেকে। হঠাৎ করেই আরিবার চোখ ধীরে ধীরে খুলে গেলো। মাথাটা ভারি লাগছে, যেন গভীর ঘুম থেকে ফিরল।
প্রথমেই দেখলো, মা সালমা তার মাথার পাশে বসে আছে, চোখ ভেজা। পাশে রুস্তমও স্থিরভাবে তাকিয়ে আছে।
“ মা?” কাঁপা কণ্ঠে ডাক দিলো আরিবা।
সালমা তাড়াহুড়ো করে তার হাত ধরে ফেলল,
“ আমার মেয়ে… এখন কেমন আছো? কোনো কষ্ট হচ্ছে?”
আরিবা হতভম্ব হয়ে চারদিকে তাকাল। কিছু স্মৃতি টুকরো টুকরো হয়ে ফিরে আসছে– ঝড়, আগুন, রোদ্দুর, আর… দুলফিকার। হঠাৎই বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেলো।
“ আমি… আমি তো…” কথাগুলো আটকে গেলো গলায়।
চলবে….
জিন ও মানুষের নিষিদ্ধ প্রেম নিয়ে লেখা ই-বুক " আশিকা জিন শীঘ্রই আসবে বইটই এপসে। ওখানে শুধু দুলফিকার ও আরিবা থাকবে আর ভৌতিক রোমান্স! 🌚
আগের পর্ব https://www.facebook.com/100085130931546/posts/737719112409113/
পরের অংশ https://www.facebook.com/100085130931546/posts/740851922095832/