#তুমি_আসবে_বলে_বসন্ত_এসেছে '১১'
#জেরিন_আক্তার_নিপা
-আপনাকে তো বলেছি এটা অ্যাক্সিডেন্ট কেস। পুলিশ আসার আগে আমরা কিছুই করতে পারব না।
লোকটার কথা শুনে প্রিয়ার রোদে লাল হয়ে যাওয়া মুখটা আরও রক্তিম বর্ণ ধারণ করল। রাগে গলার রগ ফোলে উঠেছে। তীক্ষ্ণ, কর্কশ কন্ঠে সে বলল,
-পুলিশ আসার আগেই লোকটা মারা গেলে তখনও আপনারা এই কথাই বলবেন!
-আমাদের হাসপাতালের নিয়ম এটা। অ্যাক্সিডেন্ট কেসের অনেক ঝামেলা আছে। আপনি বুঝবেন না।
-আমি বুঝতে চাইও না। আর আমি আপনার সাথে কেন কথা বলছি? আপনাদের ডক্টর কোথায়? উনার সাথে কথা বলতে চাই আমি।
লোকটা চোখে মুখে বিরক্তি ফুটিয়ে প্রিয়াকে দেখল। এর আগেও এমন অনেক অ্যাক্সিডেন্ট কেস এসেছে। পুলিশ রিপোর্ট করা ছাড়া চিকিৎসা করলে তখন পুলিশই ঝামেলা করে। অনেক সময় রোগীর কোন আত্মীয় পাওয়া যায় না।
-কোথায় আপনাদের ডক্টর?
লোকটা বিরস মুখে প্রিয়ার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
-আপনি লোকটার কী হোন? আপনার বাবা? বাড়ির মানুষ না এলে আপনার কথায় আমরা কিছু করতে পারব না।
এদের খামখেয়ালি আচরণ দেখে প্রিয়া হতবাক হয়ে যাচ্ছে। চিকিৎসা বিহীন মানুষ মারা যাচ্ছে এরা তাকে জিজ্ঞেস করছে পেশেন্ট কে হয়? ভার্সিটি যাওয়ার পথে তার চোখের সামনে একটা মোটরবাইক লোকটাকে ধাক্কা দিয়ে চলে গেছে। কয়েকজন বাইক ওয়ালার পিছু করেছিল। তবে ধরতে পেরেছে কি-না সে জানে না। চোখের সামনে বুড়ো লোকটাকে রক্তে ভিজে, রাস্তায় পড়ে কাতরাতে দেখে প্রিয়া নিজেকে ঠিক রাখতে পারেনি। ওখানে উপস্থিত কয়েক জনের সাহায্য নিয়ে কোনরকমে লোকটাকে সিএনজিতে তুলে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে। কিন্তু এখানে নিয়ে এলেও লাভটা কী হলো? এরা তো লোকটার চিকিৎসাই শুরু করছে না।
ইলহাম তখন হসপিটালে ঢুকছিল। তার জয়েনিং এর খুব বেশি সময় হয়নি। ডাক্তারকে আসতে দেখে একজন কর্মচারী প্রিয়াকে চুপিচুপি জানাল,
-উনি এই হাসপাতালের নতুন ডাক্তার। উনার কাছে যান। ভীষণ ভালো মানুষ। আপনাকে সাহায্য করতে পারে।
ভালো মানুষ না ছাই। এরা সব কয়টা ডাক্তার নামে কসাই বসে আছে। টাকাই এদের কাছে সবকিছু। প্রিয়া তক্ষুনি দ্রুত পায়ে লোকটার দিকে এগিয়ে গেল। ইলহাম কিছু বুঝে উঠার আগেই একটা মেয়ে এসে তার সামনে দাঁড়াল। চোখেমুখে তীব্র আক্রোশ ও ঘৃণা নিয়ে বলতে লাগল,
-আপনাদের হসপিটালের কীরকম নিয়ম এটা? রোগী মারা গেলেও আপনারা কিছু করবেন না? পুলিশ আসার আগে মানুষটা মারা গেলে এর দায়ভার আপনারা নেবেন? একটা মানুষের জীবনের আপনাদের কাছে কোন মূল্য নেই! মানুষটার যদি পৃথিবীতে কেউ না-ও থাকে, তাহলে কি তার বাঁচার অধিকার নেই? ডাক্তার না হয়ে আপনাদের কসাই হওয়া উচিত ছিল।
ইলহাম অদ্ভুত চোখে মেয়েটাকে দেখছে। ঘটনা না জানলেও আন্দাজ করতে পারছে। মেয়েটা ঠোঁট কামড়ে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করছে। ইলহাম এগিয়ে গেল। নার্সকে জিজ্ঞেস করল,
-পেশেন্টকে কখন নিয়ে আসা হয়েছে?
-দশ পনেরো মিনিট হবে স্যার।
-এই দশ পনেরো মিনিট আপনারা কেন অপেক্ষা করেছেন?
নার্সটা কাচুমাচু মুখ করে বলল,
-অ্যাক্সিডেন্ট কেস স্যার।
-তো? আপনাদের কাজ মানুষের জীবন বাঁচানো। পেশেন্ট যে-ই হোক তার জীবনের মূল কোনকিছুর থেকে বেশি নয়। পেশেন্টকে ভেতরে নিয়ে গিয়ে এক্ষুনি চিকিৎসা শুরু করুন।
-কিন্তু স্যার।
-আমার কথা শুনুন মিস মিতা। পরে যা হবে আমি দেখে নিব।
ইলহাম বলার পরই পেশেন্টকে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
প্রিয়া কাছ থেকে সবটা শুনেছে। কৃতজ্ঞ চোখে লোকটাকে দেখতে থাকল। রাগের মাথায় লোকটাকে অনেক কথা শুনিয়ে ফেলেছে। যা করা একদমই উচিত হয়নি। প্রিয়া ক্ষমা চাওয়ার জন্য এলেও ইলহাম মেয়েটাকে কোনকিছু বলার সুযোগ না দিয়ে চলে গেল। প্রিয়া ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
-খাড়ুস ডাক্তার!
যতক্ষণ লোকটার বাড়ির লোকেরা না এসে পৌঁছেছে ততক্ষণ পর্যন্ত প্রিয়া হাসপাতালেই বসে ছিল। কিছুটা সময় পরই লোকটার দুই ছেলে এসেছে। তাদের বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে আসার জন্য প্রিয়ার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। ছেলেরা যেহেতু এসে গেছে এবার প্রিয়া যেতে পারবে। তার জামাকাপড়ে রক্ত লেগে শুকিয়ে গেছে। এ অবস্থায় বাড়ি ফিরলে তাকে দেখে মা নিশ্চয় হার্ট অ্যাটাক করবে। প্রিয়া হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে পড়ল। ব্যাগের ভেতর ফোন বাজছে। রোদের কারণে চোখে দেখতে পারছে না। একটা গাছের ছায়ায় গিয়ে ব্যাগ থেকে ফোন বের করল। যে মানুষটা কল দিয়েছে তার নাম দেখে মুখে সামান্য হাসি ফুটে উঠল,
-হ্যালো, আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া।
-কোথায় তুমি? আজ ভার্সিটি যাওনি? ড্রাইভার তোমাকে নিতে গিয়েছিল।
****
তাওয়াফ ছেলে এবং ছেলের পরিবার সম্পর্কে খোঁজ খবর নিয়েছে। তেমন কোন সমস্যা চোখে পড়েনি। ওরা আকৃতিকে দেখতে আসার জন্য খুব জোড়াজুড়ি করছে। বাবার সাথে কথা বলে তাওয়াফ জানাল,
-ওদেরকে তাহলে বাড়িতে আসতে বলো।
তৌকির মির্জা ছেলের কথা শুনে বললেন,
-ঠিক আছে। তাহলে কালই আসতে বলি, কেমন?
-হুম।
***
পেখম বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে ল্যাপটপে কোরিয়ান ড্রামা দেখছে। আজকাল রোমান্টিক ড্রামা মুভি দেখে দেখে তারও একটা প্রেম করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু আফসোস ওই রনি গাধা ছাড়া আজ পর্যন্ত কেউ তাকে প্রপোজ করেনি। বাড়ির সবাই তাকে সুন্দরী বলে। তবে ছেলেদের চোখে কি সে সুন্দরী না? সুন্দরী হলে নিশ্চয় কলেজ থেকে বাড়ি পর্যন্ত ছেলেদের লাইন লাগত। ড্রামা দেখতে আর ভালো লাগছে না। নায়ক নায়িকার ভালোবাসা দেখে হিংসে হচ্ছে। তাই ল্যাপটপ বন্ধ করে নিচে চলে এলো। নিচে এসেই একটা গুড নিউজ শুনতে পেলো। আকৃতি আপুকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে। কাল তাদের আবার ওই বাড়িতে যেতে হবে। মির্জা বাড়িতে আজ পর্যন্ত একটা বিয়েও হয়নি। এটাই হবে দু'বাড়ির প্রথম বিয়ে। খুশিতে পেখমের নাচতে ইচ্ছে করল। আকৃতি আপুর বিয়েতে কী কী শপিং করবে এখন থেকেই লিস্ট করতে লাগল।
-মা আকৃতি আপুর বিয়েতে আমি কিন্তু অনেক শপিং করব। তুমি কিন্তু কিছু বলতে পারবে না।
পেখমের নাচানাচি দেখে গোলাপ জান মুখ বাঁকিয়ে বললেন,
-আকৃতির আগে তোর বিয়ে দেওয়া উচিত। আজকাল তোর নাচানাচি অনেক বাইড়া গেছে।
আজান ভাইয়ের কথামতো পেখম আজ রাগল না। দাদীর গলা নকল করে বলল,
-দেও বিয়ে না করেছে কে? আকৃতি আপুর বিয়েতে তো হালকাপাতলা শপিং করব। নিজেদের বিয়েতে পুরো শপিংমল কিনে নিয়ে আসব।
গোলাপ জান ছেলের বউকে বলতে লাগলেন,
-দেখছো বউ, দেখছো। কীরকম বেলাজ্জা মেয়ে পেটে ধরছো।
পেখম ভেংচি কেটে বলল,
-আমার লজ্জা তুমি ভেঙেছ বুড়ী। সব দোষ তোমার।
******
মির্জা বাড়ি সকলেই আজ ভীষণ ব্যস্ত। কারোর দুদণ্ড দাঁড়াবার সময় নেই। ছোট বড় মিলিয়ে ছেলের বাড়ি থেকে মোট ছয়জন লোক আসবে। তবে আয়োজন দেখে কেউ বলবে না এসব ছয়জন লোকের জন্য করা হচ্ছে। বারোজন এলেও খেয়ে শেষ করতে পারবে না। দৃষ্টিকে সবাই সারাজীবন অলস উপাধি দিয়ে এলেও আজ তাকেও কাজ করতে হচ্ছে। রানির কাজ মা তাকে ধরিয়ে দিয়েছে। নিজের মা'ই যদি মেয়ের সুখ দেখতে না পারে তাহলে কি সে কোনদিন সুখী হতে পারবে? কোথায় মা বলবে, আমার মেয়ের কোন কাজ করতে হবে না। সেখানে বলে, হাত-পা নাড়িয়ে কাজকর্ম করে খা। বসে থেকে তো হাতে পায়ে জং ফেলে দিয়েছিস। জিনিসপত্র মোছামুছির কাজ কি তার? রানিটা মস্ত ফাঁকিবাজ হয়েছে। নাহলে প্রতিদিন মোছামুছির পরও এত ধুলো কোত্থেকে জমেছে। রানি পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টির দুরবস্থা দেখে মিটিমিটি হাসছে।
-আফা আপনে যে এই ছোড কাম পারেন না। জামাই বাড়িত গিয়া দুনিয়ার কাম কেমনে করবেন?
দৃষ্টি আগুন চোখে রানির দিকে তাকিয়ে ধমক দিয়ে বলল,
-চোখের সামনে থেকে দূর হ। নইলে উস্টা খাবি।
আকৃতি দোতলায় দাঁড়িয়ে সবার ব্যস্ততা দেখছে। তার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে এসবে খুশি হতে পারছে না। কলিংবেল বেজে উঠল। রানি গিয়ে দরজা খুলেছে। পেখম হুড়মুড়িয়ে ভেতরে ঢুকেই হৈচৈ শুরু করে দিল।
-ইয়ে, আমরা এসে পড়েছি।
আজ শুধু পেখম আলাইয়া আলিশবা এসেছে। ইরিন আসেনি। দৃষ্টি পেখমের কাছে এসে ময়লা কাপড়টা ধরিয়ে দিয়ে বলল,
-এত দেরি করে এসেছিস কেন? নে এখন সময় নষ্ট না করে তাড়াতাড়ি কাজে লেগে পড়।
নোংরা ন্যাকড়াটা দৃষ্টির মুখে মারতে ইচ্ছে করলেও এই ইচ্ছেকে বাস্তবায়ন করল না।
-কাজ করবি তুই। তোদের বাড়ি। আমি তো মেহমান এসেছি।
পেখমের কথা শেষ হওয়ার আগেই নূর জাহানের গলা শোনা গেল।
-কে মেহমান? তুই নিজেকে এই বাড়ির মেহমান মনে করিস!
পেখম জিভ কামড়ে দাদীর দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসল।
-দৃষ্টি আমাকে কাজ করতে বলছে তাই মজা করেছি দাদী। আমি তো এই বাড়িরই মেয়ে। এটা আমার এক নম্বর বাড়ি।
***
পেখম দৃষ্টি দু'জন মিলে আকৃতি আপুকে সাজিয়ে দিল। সাজানো শেষ করে আপুর দিকে তাকিয়ে পেখম মুগ্ধ গলায় বলল,
-আপুকে যা সুন্দর লাগছে! দুলাভাই আজকেই আপুকে বিয়ে করে নিয়ে যেতে চাইবে।
দৃষ্টি ভাব নিয়ে বলল,
-দেখতে হবে না বোনটা কার!
পেখম মুখ বাঁকিয়ে বলল,
-তোর বোন না। তুই তো একটা শাঁকচুন্নি।
ছেলের বাড়ির লোকেরা এখনও এসে পৌছায়নি। তবে কাছাকাছি চলে এসেছে। মেহমান এসেছে কি-না দেখার জন্য পেখম দোতলা থেকে নিচে উঁকি দিয়েছে। তখনই তার চোখ সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত দাদাজানের জেরক্স কপির উপর পড়লে অপলক চেয়েই রইল। পাঞ্জাবির দু-হাত ভাজ করে কনুইয়ের কাছে তুলে রেখেছে। বাম হাতের আঙুলের সাহায্যে চুল গুলোকে পেছনে ঠেলে দিচ্ছে। পেখম ভেবে পেলো না সাদা রঙটা এই হিটলার মির্জাকে কীভাবে এতটা মানিয়ে গেল! হঠাৎ তাওয়াফ উপরের দিকে তাকালে পেখমের সাথে চোখাচোখি হয়ে গেল। পেখম দিন দুনিয়া ভুলে তাওয়াফ ভাইকে দেখছিল। এবার তাওয়াফ ভাইও তাকে দেখে ফেললে ঝট করে বসে পড়ল। তাওয়াফ ভাই কি তাকে ওরকম হাবলার মতো তাকিয়ে থাকতে দেখে ফেলেছে? পেখমের বুকের ভেতর ধুকধুক শুরু হয়ে গেল।
-তোর কি মরার শখ হয়েছে রে পেখম? হিটলার মির্জাকে কেন দেখছিলি!
পেখম আর উঠে দাঁড়াল না। বসে বসেই হামাগুড়ি দিয়ে আকৃতি আপুর রুমের সামনে চলে এলো। তার তাকানোতে পেখম যে ওরকম ভাবে বসে পড়েছে দৃশ্যটা তাওয়াফও দেখেছে। একা একাই মুচকি হাসছে সে। আশেপাশে কেউ ছিল না। যার কারণে অনেকটা সময় হাসিটা ঠোঁটে রয়ে গেছে।
চলবে
এত সুন্দর টাইপো করেছে Maksuda Ratna আপু🤍