#তুমি_আসবে_বলে_বসন্ত_এসেছে '১০'
#জেরিন_আক্তার_নিপা
কলেজে এসে পড়েছে। দৃষ্টি আর পেখম ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে সতর্ক দৃষ্টি ফেলে আশেপাশে দেখছে। দু'জনই আজ অবাক হলো। পেখম বলার আগে দৃষ্টি বলে উঠল,
-তোর মজনুকে দেখি আজ দেখা যাচ্ছে না। আজকে তোকে বিরক্ত করা থেকে অফ নিয়েছে নাকি?
পেখম রাগী চোখে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
-আমার মজনু? তোর মজনু শালি। বেশি কথা বললে ওই কুত্তার সাথেই তোর বিয়ে দিয়ে দেব।
-দিস। কিন্তু আজকে কি হারামজাদা কলেজে আসেনি?
-আমি কী জানি? আমাকে কেন জিজ্ঞেস করছিস?
দোতলায় নিজেদের ক্লাসে যাওয়ার সময় বারান্দার শেষ মাথায় রনিকে দেখা গেল। পেখমকে আসতে দেখেও রনি ওর কাছে এসে অন্যান্য দিনের মতো অসভ্যতা করল না। আজকে পেখমকে দেখেও ইগনোর করে চলে গেল।
-কিরে এটা কী হলো! শালা তোকে দেখে অমন করে পালিয়ে গেল কেন?
পেখমও বুঝতে পারছে না। পালিয়ে যাক বা জাহান্নামে যাক তার কিছু যায় আসে না। কিন্তু কুকুরের লেজ হঠাৎ করে সোজা হয়ে গেল কীভাবে?
-একটা জিনিস লক্ষ্য করেছিস পেখম?
-কোন জিনিস?
-রনির মুখে মারের দাগ ছিল। হারামজাদা নতুন কোন ক্রাইম করে এসেছে নাকি?
-ক্রাইম করুক যা মন চায় তাই করুক। আমার পিছু ছেড়ে দিলেই আলহামদুলিল্লাহ। জীবন অতিষ্ট করে রেখে দিয়েছে।
রনির পেছনে ওর বন্ধুরাও এসেছে। ওসামা জিজ্ঞেস করল,
-ভাবীকে দেখেও তুই চলে এলি যে!
রনি জবাবে বলল,
-কে তোর ভাবী?
ওসামা সহ বাকি দু'জনও বিস্মিত চোখে তাকাল। কিবরিয়া বলল,
-কে ভাবী মানে? পেখম ভাবী।
-পেখমকে আমি বিয়ে করেছি? ওকে কেন ভাবী ডাকবি তোরা?
-তুই-ই না পেখমকে ভাবী ডাকতে বলেছিস।
রনির কথা শুনে তার তিনজন বন্ধুই হতবুদ্ধি হয়ে চেয়ে রইল। ছয়টা মাস ধরে মেয়েটার জীবনে আজাব নামিয়ে দিয়েছিল এখন বলছে, বিয়ে করেছি ভাবী কেন ডাকবি?
-তুই পেখমকে পছন্দ করিস না!
-না। ওই মেয়েকে তোরা আর ভাবী ডাকবি না। বাকিদেরও বলে দিবি কেউ যেন পেখমকে বিরক্ত না করে।
-তোর হঠাৎ কী হয়ে গেল রনি? এমন ভীতুর মতো কথা বলছিস কেন? আর তোর মুখে এসব কিয়ের দাগ? কে মেরেছে তোকে?
-এক মিনিট। তোর চেহারার এই অবস্থার জন্য কোনভাবে পেখম দায়ী নয় তো? ওর বাবা তোকে মেরেছে? শুনেছি ভীষণ রগচটা লোক।
ওটা পেখমের বাবা না। বাবা হলে বয়স্ক হতো। রনি ছেলেটাকে ঠিক চিনতে পারেনি। আগে কোনদিনও দেখেছে বলেও মনে হয় না। দু'দিন আগে সকালে হুট করেই তার সামনে এসে দাঁড়াল। চোখ থেকে সানগ্লাস খুলে তার নাম জিজ্ঞেস করল। ছেলেটার পোশাকআশাক কথাবার্তা ভদ্র লেগেছে বলেই রনি উত্তর দিয়েছে। তার কলেজের নাম, কোন ইয়ারে পড়ে এটা জেনেই আচমকা মুখে ঘুসি বসিয়ে দিল। এক ঘুসি খেয়েই রনি মাটিতে পড়ে গেল। ছেলেটা তার উপর ঝুঁকে কতক্ষণ মন খুশি মতো মারল। ওরকম হাড্ডা গাড্ডা লোকের সাথে রনি কিছুতেই পেরে উঠল না। প্রতিরোধ করারও সুযোগও সে পায়নি। নাক মুখ দিয়ে রক্ত চলে এলে ছেলেটা তাকে ছেড়ে দিল। রনি তখনও জানে না এই লোক তাকে কেন মারছে। রক্তের দলা থুকে ফেলে রনি দু-হাত জোর করে ভীত শঙ্কিত হয়ে বলতে লাগল,
-ভাই, ভাই আর মারবেন না। আমাকে কেন মারছেন ভাই? কী অপরাধ করেছি আমি?
তার কথা শুনে ছেলেটাকে নিচের ঠোঁট কামড়ে বাঁ হাতে কপাল ডলতে দেখে রনি আরও ভয় পেয়ে গেল। দ্বিতীয় বার মার খাওয়ার আগে নিজের জীবন বাঁচানোর তাগিদে কাতরাতে লাগল।
-ভাই আমার কথাটা তো শুনুন। আমার অন্যায়টা কী বলুন। আমি নিজেকে শুধরে নিব।
তার এই কথা শুনে ছেলেটা হেসেছে। জবাবে বলেছে,
-তোর বোনের নাম আদিবা না? ক্লাস টেন এ পড়ে।
নিজের বোনের নাম শুনে রনি ভড়কে গিয়ে উপরনিচ মাথা দুলিয়ে তাড়াহুড়োয় বলল,
-জি ভাই।
-তোর বোন স্কুলে যায়। এখন স্কুলের কোন ছেলে যদি তোর বোনকে বিরক্ত করতে করতে এমন পর্যায়ে নিয়ে যায় তোর বোন আর স্কুলেই যেতে চাইবে না তখন ভাই হিসেবে ওই ছেলেটাকে তুই কী করবি? মারবি, নাকি বুকে টেনে নিয়ে কোলাকুলি করবি?
রনি তখনও বুঝতে পারছে না। মার খেয়ে বেচারার অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে। লোকটা জবাবের জন্য তার দিকে তাকিয়ে আছে দেখে কাঁদো কাঁদো মুখে রনি বলল,
-মারব ভাই। মারব।
-বোনের ভাই হিসেবে পুরুষের মতো কথা বলেছিস। তাহলে তুই কেন কারো বাড়ির মেয়েকে বিরক্ত করিস? তোর কি মনে হয় ওই মেয়ের বাড়িতে কেউ নেই? তোকে কেউ মারতে পারবে না?
রনি এবার বুঝতে পারছে। এটা নিশ্চয় পেখমের ভাই।
-আজকের পর থেকে তোকে যদি পেখমের আশেপাশেও দেখা যায় তাহলে বুঝে নিবি সেদিনই তোর জীবনের শেষ দিন। তোর বাপ কত বড় নেতা আমার জানা আছে। মির্জাদের সাথে লাগার আগে তোর বাপের থেকে জেনে নিস তার এত ক্ষমতা আছে কি-না।
ওই ঘটনা মনে পড়লেই রনির ব্যথা গুলো তাজা হয়ে উঠে। এমন মার সে এই জন্মে খায়নি। ওসামা, জুনায়েদ, কিবরিয়া সবটা শুনে ওরাও চিন্তায় পড়ে গেল। ওসামা বলল,
-পেখমদের পরিবার অনেক বড়লোক এটা আমিও শুনেছি। কিন্তু পেখম সেরকম দেখায় না।
কিবরিয়া বলল,
-পেখমের বাবা না হলে ওর ভাই না তো?
ওসামা বলল,
-ভাই কোত্থেকে আসবে? পেখম তার বাবা মা'র একমাত্র মেয়ে।
-কাজিন টাজিন হতে পারে।
-হতে পারে। ওর এক কাজিন কয়দিন আগেই কানাডা থেকে ফিরেছে।
জুনায়েদ ঝামেলা ভয় পায়। রনিকে সাবধান করে দিয়ে সে বলল,
-তুই ভাই এবার পেখমের পিছু ছেড়ে দে। ছয়টা মাস মেয়েটাকে কম বিরক্ত করিসনি। আমি এটা ভেবে অবাক হচ্ছি পেখম এতদিন কেন সহ্য করেছে? আরও আগেই কেন তোর সুতা কেটে দেয়নি।
স্যার কী পড়াচ্ছে পেখমের মাথায় কিছুই ঢুকছে না। সে পড়া বোঝার চেষ্টাও করছে না। দৃষ্টির সাথে ফিসফিস করে কথা বলছে,
-এই চমৎকার কীভাবে হলো!
-যেভাবেই হোক তোর এতকিছু ভেবে কাজ কী? তোকে বিরক্ত করা ছেড়ে দিলেই তো হয়েছে নাকি?
-হুম। কিন্তু কুত্তার লেজ কার দ্বারা সোজা হয়েছে জানার কৌতূহল তো জাগেই।
-পেখম, দৃষ্টি দু'জনই দাঁড়াও। বাকি ক্লাস তোমরা দাঁড়িয়েই করবে।
স্যারের ফ্যাসফ্যাসে গলায় কথাটা শুনে দৃষ্টি আগুন চোখে পেখমের দিকে তাকাল। দোষ না করেও তাকে শাস্তি পেতে হবে। পেখমের অবশ্য দাঁড়িয়ে ক্লাস করতেও অসুবিধা নেই। বসে থেকে কোমর ব্যথা হয়ে গেছিল।
***
সকালে ব্রেকফাস্টটা সবাই একসাথে করে। দুপুরে পুরুষেরা কেউ বাড়িতে থাকে না। রাতে খাবার টেবিলে আবার একসাথে হয়। নূর জাহান নিয়ম করে দিয়েছেন। যত অফিস আদালতই থাকুক সকালে এবং রাতে ছেলেদের তিনি খাবার টেবিলে চান। খেতে বসে বাইরের কোন কথা বলা যাবে না। কথা বলতেই হলে নিজেদের কথা বলবে। তাওয়াফ দাদীর পাশের চেয়ারে বসতে বসতে বলল,
-ইলহাম কোথায়?
পেছন থেকে ইলহামের জবাব এলো।
-এইযে আমি চলে এসেছি।
সবাই এসে বসে গেলে দৃষ্টির বাবা আজহার মির্জা কথাটা তুললেন।
-ভাইজান, আকৃতির জন্য একটা সম্বন্ধ এসেছে। সম্বন্ধটা যে এনেছে তাকে আমি চিনি। ছেলে, ছেলের পরিবার সবই ভালো।
মুখে ভাত তুলতে গিয়ে আকৃতির হাত থেমে গেল। চকিতে সে বাবার দিকে তাকাল। তৌকির মির্জা মাকে দেখলেন। নূর জাহান বললেন,
-ছেলে কী করে?
-পারিবারিক ব্যবসা দেখাশোনা করে।
-ছেলে দেখেছিস তুই?
-সরাসরি না দেখলেও ছবি দেখেছি। ছেলে ভালো।
নূর জাহান বড় ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন,
-তুই কী বলিস?
তৌকির মির্জা মেয়ের দিকে দেখলেন। আকৃতি মুখ নিচু করে বসে আছে। তিনি গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মেয়েরা কেন এত তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যায়। আজহার মির্জা ভরসা দিল,
-ওদের সম্পর্কে আমি খোঁজ খবর নিয়েছি ভাইজান। আমাদের আকৃতির জন্য উপযোগ্য ছেলে।
নূর জাহান বললেন,
-দেখ তোরা যা ভালো মনে করিস। নাতনিকে বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা না থাকলেও মেয়ে মানুষ হয়েছে, কতদিন নিজের কাছে রাখতে পারব? একদিন না একদিন পরের ঘরে যেতেই হবে।
ছেলের বউয়ের কী মতামত জানতে জিজ্ঞেস করলেন,
-তুমি কী বলো বৌমা?
মেয়ের বিয়ের কথা উঠলেই তাহমিনার বুক ফাঁকা লাগে।
-আমি আর কী বলব। ওর বাবা যা ঠিক করে।
তৌকির মির্জা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ছেলের সাথে পরামর্শ করে নিলেন।
-তুই কী বলিস তাওয়াফ। ওদের আসতে বলা উচিত?
তাওয়াফের উপর সবার ভরসা আছে। ওর কোন সিদ্ধান্তই ভুল হয় না। তাওয়াফ খেতে খেতে বলল,
-এখনই বাড়িতে তোলা ঠিক হবে না। চাচ্চু তুমি আমাকে ছেলের বায়োডাটা দিও। আমি আরও খোঁজ খবর নিয়ে তারপর জানাব।
বাড়ির মেয়েদের বিয়ের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো আজহার মির্জাও চান না। যত বেশি খোঁজ খবর নেওয়া যায় ততই ভালো। আজকাল মানুষকে বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে উঠেছে। তিনি বললেন,
-ঠিক আছে।
তৌকির মির্জা জানেন বোনের জন্য তাওয়াফ যা সিদ্ধান্ত নিবে সেটাই বেস্ট হবে। রাতে তাওয়াফ বোনের ঘরে এসেছে। ভাইকে দেখে আকৃতি হাসার চেষ্টা করল। তাওয়াফ ভেতরে ঢুকে জিজ্ঞেস করল,
-ঘুমাসনি এখনও?
-ঘুমাবো। তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। জানতাম তুমি আসবে।
তাওয়াফ হাসল। ছোট বোনটাকে সে ভীষণ ভালোবাসে। বোনের বিষয়ে সে কোন কম্প্রোমাইজ করতে রাজি না।
-খাবার টেবিলে কী কথা হয়েছে তুই তো শুনেছিস। এখন বল তোর মতামত কী।
-আমার মতামত সবসময় তোমার সিদ্ধান্তের সাথেই যাবে ভাইয়া।
তাওয়াফ বোনের পাশে গিয়ে বসল। কাঁধে হাত রেখে দুই ভাইবোন দুলতে দুলতে বলল,
-খোঁজ খবর নিয়ে সব ঠিক থাকলে তবেই ওদের বাড়িতে তুলব। নাহলে বাইরে থেকেই বাদ।
আকৃতি ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,
-আমি জানি ভাইয়া।
তাওয়াফ বোনের মায়াভরা মুখটার দিকে কতক্ষণ তাকিয়ে থেকে কপালে চুমু খেয়ে বলল,
-টেনশন করিস না। ঘুমিয়ে পড়।
-হুম।
তাওয়াফ নিজের রুমে আসতে আসতে পকেটে হাত দিলে একটা কাগজ হাতে এলো। অজান্তেই সে একটু হাসল। জিনিসটা পেয়ে এতক্ষণে নিশ্চয় পাগল হয়ে গেছে। রুমে এসে রিসিটটা মুড়িয়ে ডাস্টবিনে ফেলে দিল। এটা কারো চোখে পড়লে নানান প্রশ্ন শুনতে হবে।
চলবে