#তুমি_আসবে_বলে_বসন্ত_এসেছে '১৩'
#জেরিন_আক্তার_নিপা
লোকগুলো চলে যাওয়ার পর তাওয়াফ বাড়ি ফিরেছে। বাড়ির পরিবেশ থমথমে। মেহমান আসার আগে সবার মুখে খুশির যে একটা ঝলক ছিল মেহমান চলে যাওয়ার পর তা বিষাদে রুপ নিয়েছে। নূর জাহান চার ছেলেকে নিয়ে বসে আছে। তাওয়াফ বাবা চাচাদের কাছে না গিয়ে ইলহামকে জিজ্ঞেস করল,
-কী নিয়ে আলোচনা চলছে?
ইলহাম দাদীদের আলোচনার টপিক জানে। কিন্তু ভাইকে সে বলতে চাচ্ছে না। প্রশ্ন করেও উত্তর না পেয়ে তাওয়াফের মেজাজ খারাপ হচ্ছে।
-জানিস কিছু?
আর যা-ই হোক ইলহাম ভাইয়ের সাথে মিথ্যা বলতে পারবে না। ইতস্তত সুরে ইলহাম ঘটনাটা জানাল।
-আপুকে নিচে নিয়ে এলে তখন পুনম, দৃষ্টিও এসেছিল। ওরা এখান থেকে বেরিয়ে গাড়িতে থাকতেই জানিয়েছে, পেখমকে ওদের পছন্দ হয়েছে।
কথাটা শুনে তাওয়াফের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠার সাথে সাথে দু-হাত মুঠো বদ্ধ হয়ে এল। দাঁতে দাঁত চেপে রাগ নিয়ন্ত্রণ করল। ইলহাম ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে কৈফিয়তের সুরে বলল,
-পুনমের কোন দোষ নেই। ওই বোকা তো এই কথা শুনে কেঁদেকেটে অস্থির করে ফেলছে।
চিন করে তাওয়াফের মাথায় কিছু একটা উঠে গেল। কপালের দুই পাশের শিরা ধপধপ করছে। চোখের দৃষ্টিতে ক্রোধ। ইলহাম ভয় পেয়ে গেল। ভাই কি পেখমকেই বকবে? কিড়মিড় করে তাওয়াফ উচ্চারণ করল,
-পুনমকে এই কথা কে জানিয়েছে?
-কেউ জানায়নি। মেজো মা দৃষ্টিকে বকছিল কেন ওরা নিচে এসেছে। তখন কথায় কথায় মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেছে।
তাওয়াফ ইলহামকে কিছুই বলল না। তাওয়াফ ইলহামকে একসাথে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তৌকির মির্জা ডাকলেন।
-তাওয়াফ এদিকে আয়।
বাবা তাকে ডাকলেও তাওয়াফ সেদিকে না গিয়ে সোজা দোতলায় উঠে এলো।
পেখম বালিশে মুখে গুঁজে অঝোর নয়নে কেঁদে যাচ্ছে। তার জন্য আকৃতি আপুর খুশি নষ্ট হয়েছে। তার জন্য মেজো মা দৃষ্টিকে বকেছে। সবাই হয়তো তাকেই দোষী ভাবছে। আকৃতি পেখমকে বোঝাতে বোঝাতে ক্লান্ত। তারপরও পেখমের কান্না থামছে না।
-ওরে বোন রে, আমাকে ওরা পছন্দ করেনি এজন্য আমি আরও খুশি হয়েছি। তুই তাহলে কেন কাঁদছিস?
পেখম নাকের জলে চোখের চোখে আপুর দিকে তাকাল। ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল,
-আমি জানি তুমিও আমার উপর রাগ করেছ। মুখে মুখে আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছ।
আকৃতি হাসবে নাকি কাঁদবে বুঝতে পারছে না। দৃষ্টি আর নিতে পারছে না। এই ছিঁচ-কাদুনিকে একটা লাথি দিতে মন চাচ্ছে। এর কান্নার আওয়াজে মাথা ব্যথা উঠে গেছে।
-আল্লাহর দোহাই পেখম এবার অন্তত চুপ কর। ছেলের পরিবারকে কারোরই পছন্দ হয়নি। আপুর বিয়ে এখানে কখনোই হতো না।
পেখম কারো কোন কথা কানে নিচ্ছে না। সে মুখ অন্য পাশে ঘুরিয়ে চোখের পানি দিয়ে বালিশ ভেজাচ্ছে। আকৃতি অসহায় মুখে তাকিয়ে দৃষ্টিকে জিজ্ঞেস করল,
-একে কীভাবে শান্ত করব?
তখনই দরজায় টোকা পড়ল। দরজার দিকে তাকিয়ে আকৃতি ভাইকে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। মনে মনে ভাবল, যাক এবার ভাইকে ভয় পেয়ে হলেও পেখম কান্না থামাবে। তাওয়াফ নিজেকে একদম শান্ত করে ঘরে ঢুকল। রাগের রেশ মাত্র তার চেহারায় নেই। সহজ গলায় জিজ্ঞেস করল,
-কী হচ্ছে এখানে?
তাওয়াফ ভাইয়ের গলা পেয়ে পেখমের কলিজা কেঁপে উঠল। বাকিরা কেউ কিছু না বললেও তাওয়াফ ভাই একটা থাপ্পড় হলেও দিবে।
-কী ড্রামা চলছে এখানে? কে কাঁদছে?
দৃষ্টি আগেভাগে জানিয়ে দিল,
-আমি, আকৃতি আপু কিন্তু কাঁদছি না।
পেখম হুড়মুড়িয়ে উঠে বসে দ্রুত হাতে চোখ মুছতে লাগল। আকৃতি ঠোঁট টিপে হাসছে। দৃষ্টি বিড়বিড় করে বলল,
-তোর জন্য তাওয়াফ ভাই-ই ঠিক আছে।
তাওয়াফ এমন ভাব করল যেন সে এতক্ষণ পেখমকে দেখেনি। মাত্রই পেখমকে দেখেছে। পেখমের উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করল,
-কী হয়েছে তোর?
এতক্ষণ কেঁদেকেটে নাম মুখ লাল করে ফেললেও তাওয়াফ ভাইয়ের সামনে মিথ্যা বলতে হলো। চোখের পাপড়িতে এখনও পানি জমে আছে। গাল ভেজা। তিরতির করে কাঁপা ঠোঁটে পেখম বলল,
-কিছুই হয়নি।
কথাটা বলার সময়ও গলা কেঁপে উঠেছে। মোলায়েম দৃষ্টিতে তাওয়াফ মেয়েটাকে দেখছে। অশ্রুসিক্ত চোখ জোড়া তার দিকে তাকাতে চেয়েও ইতস্তত করছে। তাওয়াফ কঠিন হলো না। সব জায়গায় কঠোরতা চলে না।
-কাঁদছিস কেন তুই?
তাওয়াফ এতটাই নরম গলায় কথা বলছে যে বাকিরা অবাক হলো। বিশেষ করে ইলহাম। সে ভেবেছিল ভাই পেখমকে শাসন করবে।
পেখম মাথা নুইয়ে ফেলে থুতনি বুকের সাথে মিশিয়ে জবাব দিল,
-কাঁদছি না।
-আমার চোখ আছে। এবং দু'টো চোখই কাজ করে। তোকে কেউ কিছু বলেছে?
পেখম নাক টেনে মাথা নাড়িয়ে 'উঁহু' বলল।
-তাহলে কেন কাঁদছিস?
পেখম কী জবাব দিবে ভেবে পেলো না। তাই নীরব থাকল।
-তুই কি নিজেকে অপরাধী ভাবছিস পুনম? তোর নিজেকে অপরাধী ভাবার কোন কারণ নেই। ওই মানুষ গুলো আকৃতির জন্য সঠিক ছিল না। তুই হচ্ছিস ওদের অজুহাত। তুই না থাকলেও অন্য কোন কারণ দেখিয়ে ওরা পিছিয়ে যেত। আমি জানি আকৃতি কিছুই মনে করেনি। তুই শুধু শুধু নিজেকে দোষী ভেবে কষ্ট পাচ্ছিস।
তাওয়াফ বোনের দিকে তাকিয়ে বলল,
-এমন ছেলের কাছে আমি আমার বোনের বিয়ে দেব না যে গায়ের রং দিয়ে মানুষ বিচার করে। আমার বোনের মন কতটা সুন্দর এটা শুধু তারাই দেখতে পারবে যাদের কাছেও এমনই একটা সুন্দর মন আছে। আকৃতির জন্য আমি ওরকম সুন্দর মনের একটা ছেলেই খুঁজে আনব। হীরে খুঁজতে গেলে এক দুইটা কয়লা হাতে আসবেই। এরজন্য মন খারাপ করা বা নিজেকে ছোট ভাবার কোন প্রয়োজন নেই।
আকৃতি ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসল। এই হাসি তার মন থেকে এসেছে। ভাইয়ের বলা প্রতিটা শব্দ আকৃতি বিশ্বাস করে। পেখমও অবাক চোখে তাওয়াফ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। মানুষটা তাকে ভুল না বুঝে উল্টো তার ভুুল ভাঙাচ্ছে! তাকে না বকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। তাওয়াফ ভাইয়ের এই রুপের সাথে পরিচিত হয়ে উনার প্রতি পেখমের ভয় আজ অনেকটা কমে গেল। তাওয়াফ আরও নরম করে বলল,
-তুই কান্না করে সবার মন খারাপ করে দিচ্ছিস। তোর জানামতে তুই কি কোন ভুল করেছিস?
পেখম দু'পাশে মাথা নেড়ে 'না' জানাল। তাওয়াফ দু-হাত পাঞ্জাবির পকেটে ঢুকিয়ে বলল,
-ভুল করিসনি তাহলে কেন কাঁদছিস? মানুষ তখন কাঁদে যখন সে ভুল করে। ভুল না করে কখনও কাঁদে না।
পেখমের কান্না তাওয়াফ ঘরে আসার পরই থেমে গিয়েছিল। আকৃতি পেখমের শুকনো মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
-এবার তাহলে একটু হেসে দেখা। মুখ গোমড়া করে থাকলে তোকে তেঁতুল গাছের পেত্নী লাগে।
পেখম ফোঁস করে হেসে দিল। ওর হাসি দেখে আকৃতি, দৃষ্টির মনে স্বস্তি ফিরেছে। মুখে হাসি নিয়েই পেখম তাওয়াফ ভাইয়ের দিকে তাকাল। হিটলার মির্জাকে সে যতটা হৃদয়হীন ভাবে হিটলার মির্জা আসলে ততটাও নির্দয় না।
বিকালে পেখমদের চলে যাওয়ার কথা থাকলেও সে গেল না। বাড়িতে জানিয়ে দিয়েছে কাল সকালে ফিরবে। বাড়ির গুমোট বাঁধা পরিবেশ সহজ হয়ে গেছে। চাচীরা যে যেমন পারছে লোক গুলোর বদনাম করছে। রানি নূর জাহানের পা টিপে দিতে দিতে মানুষ গুলোকে গালি দিচ্ছে।
-গোলামের পুতেরা আপারে কী অপছন্দ করব? আমার নিজেরই তো ওই বান্দরের বাচ্চারে একটুও পছন্দ হয় নাই। নিজের চেহারা কোনদিন আয়নায় দেখছে? আইছে আমার আপার খুঁত ধরতে!
রানি নিজে নিজেই কতক্ষণ গালাগালি করার পর গোপন কথা বলার মতো ফিসফিস করে বলল,
-দাদী এই বাড়ির পোলা মাইয়াদের বিয়ায় মনে কয় কেউ বান মাইরা থইছে।
নূর জাহান চোখ না খুলেই জিজ্ঞেস করলেন,
-বান মারা আবার কী জিনিস?
-শত্রুতা কইরা যুবতী পোলা মাইয়াগো বিয়া বন্ধ করার লইগা বান মারে। আমি গরীব মানুষ। মানুষের বাড়িতে কাম কইরা ভাত খাই। আমার বিয়ার বান মইরা থইছে। আপনেরা তো কত বড়লোক। আপনাগো শত্রুও থাকব বেশি। আপনে অনুমতি দিলে আমাগো গেরামে কবিরাজ চাচারে কইয়া বড় আপার লাইগা তাবিজ বানাই আনমু। ইসপেশাল তাবিজ দিব। পনেরো দিনেই আপার বিয়া লাইগা যাইব।
ইলহাম কফির মগ হাতে দাদীর থেকে একটু দূরে বসতে বসতে বলল,
-তোমার কবিরাজ চাচা তোমাকে তাবিজ দেয়নি রানি?
রানি হতাশ মুখে ছোট ভাইজানের দিকে তাকাল। ইলহামের কফি খাওয়া শেষ। সে একটু এগিয়ে মগটা সামনের টেবিলে রেখে বলল,
-তোমার বিয়ে হয়েছে? কবিরাজ চাচার তাবিজ তোমার জন্য পনেরো দিনে বর খুঁজে আনতে পারেনি?
রানির মুখ নিভে যাওয়া দেখে ইলহাম হাসল। রানি মনে মনে ছোট ভাইজানকে খারাপ রকম দুইটা গালি দিয়ে বলল, বেশি বুঝে। বিদেশ থেইকা পন্ডিত আইছে। যতই লেখাপড়া করেন আপনে কবিরাজ চাচার থেইকা বড় ডাক্তার হয়ে গেছেন না। রানি মুখ মোচড় দিয়ে দাদীর পা টিপতে লাগল।
ক্যারাম খেলায় কে জিতে প্রতিযোগিতা চলছে। ইমানই বারবার জিতে যাচ্ছে। ইমানের সাথে পেখম, দৃষ্টি, আকৃতি কেউ পেরে উঠছে না। খেলার মাঝেও পেখম কয়েকবার তাওয়াফ ভাইয়ের রুমের দিকে দেখেছে। রুমের দরজা মেশানো। তবে তাওয়াফ ভাই ভেতরেই আছে সে জানে। যে তাওয়াফ ভাই সামনে থাকলে অস্বস্তিতে পেখম জমে যেত, আজ তার চোখ সে-ই তাওয়াফ ভাইকেই খুঁজছে। সবাই এখানে তাওয়াফ ভাই রুমে কী করে? পেখম আজ পর্যন্ত কোনদিন তাওয়াফ ভাইয়ের রুমে যায়নি। তিনতলায় যখন থাকত তখন ওই রুমে অনেকবার গিয়েছে। পেখমকে অন্যমনস্ক দেখে দৃষ্টি বলল,
-আজ তোর মন কোথায় পেখম? খেলায় মন নেই বলেই বারবার হারছিস।
পেখমের সত্যিই আজ খেলায় মন নেই। তাওয়াফ ভাইকে এতদিন সে ভুল বুঝে এসেছে। তাওয়াফ ভাই এতটাও খারাপ না। হ্যাঁ, একটু বেশিই রাগী।
চলবে
যারা ভেবেছিলেন তাওয়াফ পেখমকে বকবে তাদের জন্য এক চামচ সমবেদনা 🥱