ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি আসবে বলে বসন্ত এসেছে

১৪তম পর্ব

লেখক: জেরিন আক্তার নিপা

#তুমি_আসবে_বলে_বসন্ত_এসেছে '১৪'

#জেরিন_আক্তার_নিপা

দু'সপ্তাহ পর তাওয়াফ কনিকার কাছে ধরা দিয়েছে। কনিকা ওকে হাতের কাছে পেয়েই কতক্ষণ মেরে রাগ মিটিয়ে নিয়েছে। তবে এই পাটকাঠির মার তাওয়াফের চামড়ার উপর দিয়ে লেগে গেছে। তাওয়াফ আজ প্রথমবার আসেনি। এই রুমে আগেও বহুবার এসেছে। ঘন্টার পর ঘন্টা কেটেছে। রুমের দেয়াল, জালানা, পর্দা এসব দেখে দেখে বিরক্ত সে। কনিকা তাকে নির্দিষ্ট বেডে শুয়ে পড়তে বলল। তাওয়াফ জিজ্ঞেস করল,

-শোয়া কি জরুরি? বসে হবে না?

-না, হবে না।

-এভাবে শুয়ে শুয়ে কথা বলতে নিজেকে রোগী রোগী লাগে।

-তুই রোগীই। আমি তোর বন্ধু হওয়ার আগে তোর ডাক্তার ভুলে গেছিস?

তাওয়াফ হতাশ গলায় বলল,

-আমি ভুলতে চাইলেও তুই ভুলতে দিচ্ছিস কোথায়।

কনিকা তাওয়াফের কলেজ বা ভার্সিটির বন্ধু না। সে আসলেই তাওয়াফের ডাক্তার। পরিচয়টা প্রথমে পেশেন্ট হিসেবেই হয়েছিল। দীর্ঘ তিন বছরে ডাক্তার রোগীর সম্পর্ক থেকে এই মেয়ে এখন তার মানসিক শান্তির দুশমন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাকে না পেলে তার বাপকে কল করে কাঠি ভাঙে।

-শরীর মন সবকিছু রিলাক্স কর৷ বাইরের কোনরকম চিন্তাভাবনা মাথায় আসতে দিস না।

-হু।

-এখনও তুই ওই স্বপ্ন দেখিস?

-প্রতি রাতেই দেখি।

-ঘুমের সমস্যা হয়?

-স্লিপিং পিল নিতে হয়।

-রোজ নিস?

-উপায় কী? না নিলে ঘুম আসে না।

-রেগুলার স্লিপিং পিল নিলেও তো অন্য সমস্যা দেখা দিবে।

নিরামিষ টাইপের আলোচনায় তাওয়াফ বোর হচ্ছে।

-তুই আমাকে বোর করছিস।

কনিকা চোখ পাকিয়ে তাকাল। গালি দিতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিল।

-ঠিক আছে। তোর জন্য বিষয়টাকে ইন্টারেস্টিং বানিয়ে আজ থেকে আমরা তাহলে নতুন সেশন শুরু করব।

-নতুন পুরাতন বলে কোনকিছু আমার উপর এপ্লাই করা বাদ রেখেছিস?

-এবার সম্পূর্ণ অন্যরকম একটা প্রসেস ফলো করব।

-করে দেখ। তোর মনের কোন আশা অপূর্ণ থাকুক এটা আমি চাই না।

-তোকে এবার পার্সোনাল কিছু প্রশ্ন করব। সত্যি সত্যি উত্তর দিবি।

তাওয়াফ কপালে ভাঁজ ফেলে জানতে চাইল,

-আমার পার্সোনাল বলতে কিছু রেখেছিস তুই?

কনিকা দাঁত বের করে হাসল। বলল,

-তারপরও। এখন একটু ভেবে বল তোর জীবনে এমন কেউ কি আছে যার কথা মনে পড়লে তোর মনে মিষ্টি অনুভূতি খেলে যায়। এমন একজন মানুষ যাকে ভেবে তোর মুখে অজান্তেই হাসি চলে আসে।

ভাবাভাবি ছাড়াই তাওয়াফ স্পষ্ট জানাল,

-এমন কেউ নেই।

কনিকা সিরিয়াস মুখে বলল,

-সত্য বলবি কথা দিয়েছিস। ভেবে বল, এমন কেউ নেই?

কথায় আছে না ডাক্তার আর উকিলের কাছে কিছু লুকাতে নেই। লুকালে নিজেরই ক্ষতি। তাই তাওয়াফ মনের বিরুদ্ধে গিয়ে বলল,

-আছে হয়তো।

-হয়তো না। কনফার্ম কর আছে।

-আছে।

কনিকার চোখে চমক দেখা গেল। কৌতূহলী গলায় বলল,

-সে কে জানতে পারি?

-না। যতটুকু জানতে পেরেছিস এতেই খুশি থাক।

-আচ্ছা যা, বলতে হবে না সে কে। তাকে তোর কেন ভালো লাগে?

-কারণ খুঁজিনি কখনও।

কনিকা মুখ বাঁকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,

-আন রোমান্টিক শালা।

-কিছু বললি?

-না। ভালো লাগার কথা তাকে জানিয়েছিস?

-উঁহু

-কেন?

-জানাতে ইচ্ছে করে না।

কনিকা কপাল কুঁচকিয়ে অদ্ভুত চোখ করে বলল,

-এটা কেমন কথা!

-তুই কি এসব ফালতু কথা জানার জন্য আমার সময় নষ্ট করছিস?

কনিকা বোয়াল মাছের মতো মুখ খুলে নাটুকে ভঙ্গিতে বলল,

-ফালতু কথা! যাকে ভেবে তোর মুখে হাসি চলে আসে তাকে তুই ফালতু বলছিস!

-তাকে বলিনি। তোকে বলেছি।

-কুত্তা! আচ্ছা, সে আশেপাশে থাকলে তোর ভালো লাগে?

-লাগে। কনিকা আমার কিন্তু এখন বিরক্ত লাগছে।

-এত অধৈর্য কেন তুই। এখান থেকে বেরিয়ে তুই কোন কাজে যাবি বল আমাকে।

-তুই আমাকে সত্যিই বোর করছিস।

-তাহলে আরেকটু বোর হ। বোর হতে ক্ষতি কী?

-তোর কাজই মানুষকে বোর করা। তোর থেকে আর কি-ই বা আশা করা যায়!

-সেই মেয়ে কতটা সময় তোর আশে পাশে থাকে?

-খুব কম সময়।

-তুই চাইলে কি আরও বেশি সময় তার সাথে থাকতে পারবি না?

-সম্ভব না।

-কেন? চেষ্টা করে দেখ যদি সম্ভব হয়।

তাওয়াফ এবার ফ্রাস্টেড হয়ে বলল,

-কনি, আমার সমস্যা কারো কাছাকাছি না থাকা নিয়ে না। আমার সমস্যা রাতে আমার ঘুম হয় না। ঘুমানোর জন্য রোজ আমাকে স্লিপিং পিল নিতে হয়। কারো কাছে থাকলে নিশ্চয় আমার এই সমস্যা ঠিক হবে না। আর যদি হয়ও দিনের বেলা নাহয় আমি তার কাছাকাছি থাকলাম। কিন্তু তাকে তো রাতেও আমার সাথে থাকার জন্য নিয়ে আসতে পারব না।

তাওয়াফকে রেগে যেতে দেখেও কনিকা কেয়ার করল না। উল্টো হাসতে লাগল। তাওয়াফ উঠে যাচ্ছে। এসব ছাগলামি আর নিতে পারছে না। সম্ভব না।

-তুই এত তাড়াতাড়ি রেগে যাস কেন? রাগলে তোকে কত কিউট লাগে এটা কি তুই জানিস। একদম টমেটোর মত লাল হয়ে যাস।

-চোখের সামনে থেকে সর তুই। আজকেই শেষ দিন। আমি আর তোর এক্সপেরিমেন্টের সাবজেক্ট হব না। তুই সাইকিয়াট্রিস্ট না হয়ে রোমান্টিক গল্প উপন্যাস লিখা শুরু কর।

-আরে বোস। উঠছিস কেন? ঠিক আছে আর মজা করব না প্রমিজ।

-আমি আর তোর কোন কথা শুনছি না।

-তাওয়াফ প্লিজ। আর মজা করব না। তোর কসম।

এই চুইংগাম তাকে ছাড়বে না। তিনটা বছর ধরে ভুজুংভাজুংয়ের নামে তাকে নিয়ে খেলছে। সে যেন কনিকার খেলার কোন পুতুল হয়ে গেছে।

-ঘুম না আসা তোর মেইন সমস্যা না। তোর মেইন সমস্যা তুই একই স্বপ্ন গত পাঁচ বছর ধরে দেখে আসছিস। ওই স্বপ্ন দেখার পরই তুই আর ঘুমাতে পারিস না। তোর যেদিন ওই স্বপ্ন দেখাটা বন্ধ হয়ে যাবে সেদিনই তুই সুস্থ হয়ে যাবি। তবে চাইলেও তুই স্বপ্ন দেখা বন্ধ করতে পারবি না। তোর শরীর ওই দুর্ঘটনা থেকে মুভ অন করে গেলেও তোর ব্রেন এখনও মুভ অন করেনি। তুই যত ডাক্তারই দেখাস, যড মেডিসিনই খাস। কিছুতেই তোর সমস্যার সমাধান হবে না। কোনকিছু দিয়ে তোর ব্রেইনকে ডাইভার্ট করতে হবে। তোর মন মস্তিষ্কের মধ্যে ওই স্মৃতিটা গেঁথে আছে। তাই তুই ওই স্বপ্ন দেখা বন্ধ করতে পারিস না। কিন্তু চেষ্টা করলে ওই স্বপ্নের বদলে অন্য কোন স্বপ্ন তো দেখতেই পারবি, তাই না?

তাওয়াফ মনোযোগ দিয়ে কনিকার কথাগুলো শুনেছে। সে যাওয়ার জন্য উঠে পড়েছিল। কিন্তু এখন আবার বসল। প্রশ্ন করল,

-এমনটা সম্ভব?

-অবশ্যই সম্ভব।

-কীভাবে?

গাধা এবার লাইনে এসেছে। তাওয়াফের জীবনের একাকিত্ব কেটে গেলে ওর অর্ধেক সমস্যা এমনিতেই শেষ হয়ে যাবে। অনেকসময় একাকিত্ব মানুষের জন্য অভিশাপ হয়ে কাজ করে। ভালোবাসা দিয়ে পৃথিবী জয় করা গেলে, এই সমস্যা আর এমন কী! কনিকা হেসে বলল,

-তুই-ই বলেছিস এমন একটা মানুষ আছে যাকে ভেবে তোর মন খুশি হয়। তাকে ভাবতে তোর ভালো লাগে। এখন থেকে ঘুমানোর আগে তুই প্রতিদিন তাকে নিয়ে ভাববি। দেখবি তাকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে একদিন সে তোর স্বপ্নে চলে আসবে। সেদিন আর তুই ওই বিভীষিকাময় স্বপ্নটা দেখে ঘুম থেকে জেগে উঠবি না। বরং প্রিয় মানুষকে নিয়ে মিষ্টি একটা স্বপ্ন দেখে আরও ঘুমতে চাইবি, যেন স্বপ্নটা বেশি সময় ধরে দেখতে পারিস।

কনিকার থেকে ছাড়া পেয়ে তাওয়াফ গাড়ির কাছে এলে বাবার কল এলো। গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে বসে কল রিসিভ করল। সে কিছু বলার আগেই ওপাশ থেকে তৌকির মির্জা বললেন,

-কনিকার কাছে গিয়েছিলে?

-হুম। মাত্রই ছাড়া পেলাম।

-দুই সপ্তাহ কেন যাওনি?

বাবা যখন খুব বেশি ভালো মুডে থাকে তখন তাকে তুমি ডাকে। আবার তার কোন কাজ বাবার মনমতো হলেও তুমি ডাকে। কনিকার আছে আসায় বাবা খুশি হয়েছে।

-এখন কি বাড়ি ফিরবে?

-না। একটু কাজ আছে।

-ঠিক আছে। বেশি সময় বাইরে থেকো না। তোমার মা টেনশন করবে।

তাওয়াফ ভাবে, সে হয়তো খুব বড় কোন পূর্ণ করেছিল। যার কারণে আল্লাহ তাকে মির্জা সাহেবের ছেলে হিসেবে দুনিয়ায় পাঠিয়েছে। ছেলের জন্য এরকম বাড়াবাড়ি ভালোবাসা কোন বাপের মধ্যে দেখেনি সে। মির্জা সাহেব একাই পৃথিবীর সব বাবাদের টক্কর দিতে চান। তাওয়াফ গাড়ি স্টার্ট করল। সেদিন রাতেই খালাম্মাকে দেখতে যেতে চেয়েছিল। মাঝপথে ইলহামের মেসেজ পেয়ে ফিরে এসেছে। তারপর আকৃতিকে দেখতে এলো। ব্যস্ততার মধ্যে আর যেতে পারেনি। ফোনে অবশ্য খোঁজ নিয়েছে। তারপরও খালাম্মা নিশ্চয় তাকে দেখতে চাচ্ছে।

তাওয়াফের গাড়ি একটা অ্যাপার্টমেন্টের সামনে এসে থামল। লিফট না থাকায় সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে যাচ্ছে। তিনতলার সিঁড়িতে এক লোক তার সাথে ধাক্কা খেলো। তাওয়াফ লোকটাকে চিনতে পেরেছে। এই অ্যাপার্টমেন্টের মালিক। লোকটা কি তিনতলায় এসেছিল? তিন মাসের ভাড়া এডভান্স দিয়ে রেখেছে সে, ভাড়া চাইতে নিশ্চয় আসেনি। লোকটা তাকে দেখে ভয় পেয়েছে বোঝাই যাচ্ছে। সেজন্যই তাড়াহুড়ায় নেমে গেল। তাওয়াফ চিন্তিত মুখে ডোরবেল চাপল।

ডোরবেলের শব্দ শুনে প্রিয়া ভাবল বদমায়েশ লোকটা হয়তো আবার এসেছে। মাথায় জেদ চেপে গেল তার।

-এই লোককে আজ শিক্ষা দিয়ে ছাড়ব।

আমেনা জানেন তার মেয়ের মাথা কতটা গরম। রাগের মাথায় লোকটাকে চড় থাপ্পড়ও মেরে বসতে পারে। বাড়িতে দুইটা মেয়ে মানুষ। কোন পুরুষ নেই। এই মুহূর্তে ফ্ল্যাট মালিকের সাথে ঝামেলায় জড়ানো ঠিক হবে না। সবাই জানবে দোষ ওই লোকেরই। তারপরও সবাই ওই লোকের পক্ষ হয়েই কথা বলবে। তা নাহলে যে বাসা ছাড়তে হবে।

-খারাপ মানুষের সাথে লাগার দরকার নেই মা। তুই কল করে তাওয়াফকে আসতে বল। ও এসে সব ঠিক করে দিবে।

-এই হারামজাদা বুড়ো খাটাশকে আমি একাই সোজা করতে পারব মা।

মা তাকে দরজা খুলতে মানা করলেও প্রিয়া শুনল না। অগ্নিমূর্তি ধারণ করে দরজা খুলে দিয়েই চেঁচিয়ে উঠল।

-আপনি আবার...

সামনে তাওয়াফকে দাঁড়ানো দেখে প্রিয়া থেমে গেল। তাওয়াফ তীক্ষ্ণ, অনুসন্ধানী চোখে প্রিয়াকে দেখে নিয়ে জিজ্ঞেস করল,

-ওই লোক কি তোমাদের এখানে এসেছিল?

তাওয়াফ ভাইকে দেখে প্রিয়া ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকাল। মনে মনে সে ভয় পায়নি এটা বলবে না। কিন্তু মা'র সামনে ভয় প্রকাশ করেনি। এখন তাওয়াফ ভাইকে দেখে তার মনের সব ভয় কেটে গেল। মনে হলো তার মাথার উপরও কারো হাত আছে। প্রিয়ার জলে টলমলে চোখের দিকে তাকিয়ে তাওয়াফের চেহারার ভাব কঠিন হলো। গলায় কাঠিন্য নিয়ে বলল,

-ওই লোক কি প্রায়ই এসে তোমাদের বিরক্ত করে?

চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন