#তুমি_আসবে_বলে_বসন্ত_এসেছে '২০'
#জেরিন_আক্তার_নিপা
প্রিয়া সিঁড়ি দিয়ে উঠার সময় খুব বেশি শব্দ করল না। কারো যদি ডিস্টার্ব হয়। ছাদে পা রাখা মাত্রই বিশ্রী একটা গন্ধ এসে নাকে লাগল। গন্ধটা সিগারেটের চিনতে ভুল হলো না। তার মানে আগে থেকেই ছাদে কেউ আছে।
ছাদে দ্বিতীয় কারো উপস্থিতি টের পেয়ে ইলহাম সিগারেট নিচে ফেলে পা দিয়ে মাড়িয়ে দিল। আকৃতি আপু দশটার আগেই ঘুমিয়ে পড়ে। দৃষ্টি ভয়ে কখনও রাতে একা ছাদে আসে না। যেহেতু নূপুরের শব্দ শুনেছে তার মানে ভাইও না।
প্রিয়া যেরকম নিঃশব্দে এসেছে। তেমনই নিঃশব্দে চলে যেতেও চেয়েছিল। কিন্তু তার আগেই লোকটা বলে উঠল,
-আপনি চাইলে ছাদে থাকতে পারেন। আমি এখনই চলে যাব।
যেহেতু লোকটা তাকে দেখেই ফেলেছে এখন চলে যাওয়ার আর কোন মানে নেই। লাইট না থাকলেও চাঁদের আলোয় ছাদটা অন্ধকার লাগছে না। সবকিছু পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। প্রিয়া লোকটার থেকে অনেকটা দূরত্ব রেখে ছাদের রেলিঙের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। শীতল বাতাস বইছে। আকাশে অসংখ্য তারা টিমটিম করে জ্বলছে। চাঁদটাও কত বড় লাগছে! এত বড় চাঁদ প্রিয়া আগে কখনও দেখেনি। প্রিয়া চাঁদ দেখতে দেখতে ইলহামের উপস্থিতি ভুলে গিয়েছে। কিন্তু ইলহাম মেয়েটাকেই দেখছে।
-আপনার কি কোন যমজ বোন আছে?
প্রশ্নটা কি তাকে করেছে? প্রিয়া লোকটার দিকে তাকিয়ে অনিশ্চিত গলায় জিজ্ঞেস করল,
-আমাকে কিছু বলেছেন?
-জি। আপনার কি কোন যমজ বোন আছে?
-না তো।
-ওহ। না মানে সেদিন হাসপাতালে ঠিক আপনার মতোই একজনকে দেখেছিলাম তো। ভাই ভাবলাম আপনারা হয়তো যমজ বোন।
লোকটা কি তার সাথে ইয়ার্কি করছে? সেদিন ধন্যবাদ দিতে দিল না। অথচ আজ ফালতু কথা বলছে।
-আমার মতোই একজন না, আপনি আমাকেই দেখেছেন।
ইলহাম অবাক হওয়ার ভান করে বলল,
-তাই নাকি! ওটা আপনিই ছিলেন?
লোকটার ওভার অ্যাক্টিং দেখে প্রিয়া গলায় বিরক্তি নিয়ে বলল,
-আপনার কি চোখে সমস্যা আছে?
-চোখ ঠিকই আছে। তবে হাসপাতালের ওই প্রতিবাদী মেয়েটার সাথে আপনাকে কিছুতেই মেলাতে পারছিলাম না। তাই কিছুটা কনফিউজড ছিলাম। আমার পরিবার অবশ্য এখনও এটাই ভাবে, আপনি হয়তো কথা বলতে জানেন না।
প্রিয়া লোকটার কথার অর্থ বুঝতে পেরেছে। হাসপাতালে তার ব্যবহার একরকম ছিল। এখানে এসে তার ব্যবহার অন্যরকম। সে সবাইকে বোকা বানাচ্ছে এই কথাটাই সরাসরি না বলে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলেছে।
ইলহাম চলে যাবে বলেছিল। তারপরও না গিয়ে বাহানায় কথা বলার চেষ্টা করছে। কতবড় ছ্যাঁচড়া লোক! মেয়েটা মনে মনে এসব ভুল ধারণা তৈরি করার আগে ইলহাম ছাদ থেকে চলে যাওয়া ধরল।
এই লোক তাকে ঠেস দিয়ে কথা বলে চলে যাবে প্রিয়া কিছুই বলবে না!
-সিগারেট খাওয়ার জন্য আপনাকে প্রতিদিন ছাদে আসতে হয়? না মানে জেনে রাখা ভালো। আপনি যে সময়ে সিগারেট খেতে ছাদে আসেন, ওই সময়টাতে আমি ছাদে আসা এভয়েড করব। আমাকে দেখে আপনি লজ্জা পান এটা আমি চাই না। অন্য কেউ চলে এলে সে ব্যাপারে অবশ্য আমার কিছু বলার থাকবে না। তবে আমি কাউকে বলব না, আপনি লুকিয়ে সিগারেট খাওয়ার জন্য ছাদটাকে সুরক্ষিত জায়গা ভাবেন। আমার আবার মানুষের ব্যাপারে এত মাথা ব্যথা নেই। ডাক্তার হয়েও যদি আপনি না বুঝেন 'স্মোকিং ইজ ইঞ্জুরিয়াস টু হেলথ' তাহলে সাধারণ মানুষ হয়ে আমি আর আপনাকে কী জ্ঞান দিব?
ইলহাম যেতে যেতে দাঁড়িয়ে পড়েছে। মুচকি হাসল সে। মিস প্রতিবাদী নিজের আসল রুপে ফিরে এসেছে। ফিরে তাকিয়ে সে বলল,
-আপনার এই রুপ কি শুধু আমার সামনেই প্রকাশ পায়, মিস প্রতিবাদী?
****
ঘুম ভেঙে গেলেও পেখম এখনও বিছানা ছাড়েনি। অলস ভঙ্গিতে শুয়ে আছে। আজ কলেজে যেতে ইচ্ছে করছে না। কলেজ যাও, ক্লাস করো, বাড়ি ফিরো, রাতে আবার কলেজের পড়া পড়ো। রোজ রোজ একই জিনিস ভালো লাগে না। তাই পেখম ঠিক করেছে সে আজ কলেজে যাবে না। ফুপুদের বাসায় যাবে আজ। কাল যেহেতু ছুটি আছে আজ ফুপুর ওখানেই থেকে যাবে। এটা ভেবে মা'র শত ডাকাডাকির পরেও পেখম উঠল না। জেসমিন মেয়েকে ডাকতে ডাকতে বিরক্ত হয়ে চলে গেল। কলেজে গেলে যাবে না গেলে নাই। তার কী? পেখম বিছানার এপাশ থেকে ওপাশে গড়াগড়ি করে, ফোন নিয়ে ফেসবুকিং করে কলেজের সময় পেরিয়ে গেলে নিচে নেমে এলো। অনেক ক্ষিধে পেয়েছে। ডাইনিংয়ে এসে বাবাকে দেখে পেখমের পা থেমে গেল। হায় আল্লাহ! পাপা নিশ্চয় তাকে কলেজে না যাওয়ার জন্য বকবে। পেখমকে দেখেই গোলাপ জান টেনে টেনে বললেন,
-ওইযে তোর রাজকন্যা আসছে। লেখাপড়া বাদ দিয়ে মেয়ে মানুষ যে দশটা পর্যন্ত ঘুমায় এইরকম আর দেখি নাই।
পল্লব মির্জা মেয়ের দিকে তাকালেন। পেখমের চোখমুখে বাবার বকা খাওয়ার আতঙ্ক। মায়ের কথার উত্তরে পল্লব মির্জা বললেন,
-প্রতিদিন কলেজে যেতে হবে এমন কোন কথা নেই। এক দুই দিন ছুটি নেওয়াই যায়।
বাবার আশকারা পেয়ে পেখমের চেহারা থেকে আতঙ্ক কেটে গিয়ে মিষ্টি হাসি খেলে গেল। পল্লব মির্জা মেয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে হেসে বললেন,
-এসো মামণি। বাবা মেয়ে আজ একসাথে খাব।
জেসমিন ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলল। সন্তানকে এত বেশিও আদর দিতে নেই যাতে সন্তানই নষ্ট হয়ে যায়। মেয়েকে শাসন করার বদলে তার ঠিক ভুল সব কাজকে সমর্থন করে। বাবা মেয়ের মাঝে জেসমিন কিছু বলতে গেলেই তার নিজের বাপের বাড়ি নিয়ে কথা শুনতে হয়। তাই এখন সে কিছু বলেই না।
গোলাপ জান বাবা মেয়ের গদগদ ভালোবাসা দেখে বললেন,
-এখন তোর কাছে আছে দেখে এগারোটায় ঘুম থেকে উঠলেও সমস্যা নাই। তুই বাপ তুই কিছু কইবি না। কিন্তু বিয়ের পর কী দশা হবে?
পেখম কঠিন চোখে দাদীর দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকাল। বুড়ীটা সত্যিই তার সুখ দেখতে পারে না। পল্লব মির্জা গম্ভীর মুখে বললেন,
-আমার মেয়েকে আমি বিয়েই দেব না।
পেখমের ঠোঁটে লেগে থাকা হাসি আরও চওড়া হলো। গোলাপ জান ত্যক্ত মুখে বললেন,
-বিয়ে না দিলে সারাজীবন ঘরে খুঁটি করে রাখবি?
-বিয়ে যদি দিতেই হয় তাহলে ঘরজামাই নিয়ে আসব। আমার দশটা পাঁচটা মেয়ে না। এক মেয়েকে আমি নিজের থেকে দূর করে থাকতে পারব নাকি!
পেখম বাবাকে নিয়ে গর্ব করে ভেঙানোর সুরে দাদীকে বলল,
-শুনেছ তো বুড়ী? শান্তি হয়েছে এবার। আমার পাপা পৃথিবীর বেস্ট পাপা।
জেসমিন মেয়েকে নিয়ে স্বামীর এসব আদিখ্যেতা দেখতে না পেরে রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে বলল,
-মেয়ে তার কাছে রাজকন্যা। অথচ যে এই মেয়েকে পৃথিবীতে এনেছে তাকে চারকের মূল্যও দেয় না। একটা বার এটা ভাবে না, মেয়ের জন্য হলেও ভালো হয়ে যাই। এই ভয় নেই, আমার কর্মফল যদি আমার মেয়েকে ভোগ করতে হয়।
পল্লব মির্জা ব্রেডে জেলি মাখিয়ে মেয়ের মুখে তুলে দিলেন। পেখমের পেট ভরে গেছে। তাই বলল,
-পাপা আর খেতে পারব না।
-এটা শেষ করো।
-পেট ভরে গেছে তো।
গোলাপ জান কথার মাঝে টিপনি কেটে বললেন,
-আরও খা। তোর পেট ভরলেও তোরে খাওয়াইয়া তোর বাপের পেট ভরে নাই।
-পাপা আমাকে আদর করে দেখে তোমার কি হিংসা হয়? তোমার ছেলে অথচ তোমার থেকে আমাকে বেশি ভালোবাসে।
-দুই দিনের মেহমান তুই। তোরে আমি হিংসা করমু! এই বাড়িতে কয়দিন থাকবি তুই?
পেখম বাবার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে নাকি গলায় বলল,
-পাপা তোমার মায়ের সমস্যা কী? আমার খুশি কেন দেখতে পারে না? সবসময় শুধু আমাকে বাড়ি থেকে তাড়ানোর কথা বলে।
দাদী নাতনির খুনসুটি ঝগড়া দেখে পল্লব মির্জা হাসেন। মা পেখমকে ক্ষেপাতে এসব বলে। পেখমও না বুঝে ক্ষেপে যায়। হাসি মজা খুনসুটি হয়ে গেলে পল্লব মির্জা সিরিয়াস কথায় এলেন।
-মামণি, তোমাকে আমি ওই বাড়িতে যেতে নিষেধ করেছি। তারপরও তুমি কাল ওবাড়িতে গিয়েছ। তুমি কি আমার কথা অমান্য করবে? পাপার কথার মূল্য নেই তোমার কাছে?
পেখম মুখ ছোট করে ফেলে মিনমিনে গলায় বলল,
-আর যাব না পাপা।
-বাবা হয়ে আমি কি তোমার খারাপ চাইব বলো? ওবাড়ির মানুষদের তুমি যেমন ভাবো ওরা কিন্তু তেমন না। তাই আমি চাই না তুমি ওদের সাথে কোনরকম সম্পর্ক রাখো।
পেখম অসহায় চোখে বাবার দিকে দেখল। বাবা কেন এমন বলে? ওবাড়ির সবাই অনেক ভালো। সবাই তাকে অনেক ভালোবাসে। আগে তাওয়াফ ভাইকে ভয় পেত। তখন তো সেই ভয়ও কমে গেছে। তারপরও বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
-ঠিক আছে। আমি আর কখনও ওবাড়িতে যাব না।
-সত্যিই যাবে না তো?
-হুম।
-আমাকে প্রমিজ করো তুমি যাবে না।
-প্রমিজ।
বাবার কথায় পেখমের মন খারাপ হয়ে গেলে সে আর ফুপুর বাড়ি গেল না। মন খারাপ নিয়েই আজান ভাইয়ের ঘরে চলে এলো। আজান হুইলচেয়ার ঠেলে ব্যালকনিতে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। পেখমকে ঘরে ঢুকতে দেখে ব্যালকনির সামনে থেকে ফিরে এলো। কোন কারণে পেখমের মন খারাপ বুঝতে পেরে জিজ্ঞেস করল,
-পেখম রানীর কী হয়েছে? চাঁদনি রাতে অমাবস্যা নেমে এসেছে কেন?
-পাপা এমন কেন আজান ভাই?
বাড়ির মানুষেরা যা-ই করুক পেখম সব অভিযোগ আজান ভাইয়ের কাছে এসে বলবে। পেখম কি মনে করে সে সবাইকে শাসন করতে পারবে?
-পাপা একদম ঠিক করছে না।
-কাকা কী করেছে শুনি।
পেখম আজানের পেছনে এসে দাঁড়াল। হুইলচেয়ার ঠেলে নিতে নিতে বলল,
-চলো ব্যালকনিতে যাই।
ব্যালকনিতে এসে আজান আবার জিজ্ঞেস করল,
-নতুন করে আবার কী সমস্যা দেখা দিয়েছে?
-আমার জীবনে সমস্যাই সমস্যা আজান ভাই। পাপা চায় না আমি বড় দাদীদের ওখানে যাই।
পেখম একটা টুল টেনে আজান ভাইয়ের সামনে বসেছে। আজান হেসে বলল,
-এ আর নতুন কী? কাকা ওবাড়ির কাউকে পছন্দ করে না।
-কেন করে না? ওদের উপর পাপার কিসের রাগ? উল্টো তো ওদের রাগ আমাদের উপর থাকা উচিত। দাদাজান দ্বিতীয় বিয়ে করে অন্যায় তো তাদের সাথে করেছে।
পেখম খুব সিরিয়াস মুখে কথাগুলো বলেছে। আজান পাগলি মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে সামান্য হাসল।
-তুই সবসময় বড় দাদীর পক্ষে, তাই না?
-হুম।
-এই কথা আমাদের দাদী জানলে তোকে বাড়ি থেকে বের করে দিবে।
-এহহ। এটা কি দাদীর বাড়ি নাকি?
-দাদীর স্বামীর বাড়ি।
পেখম চোখ উলটিয়ে মুখ ভেঙাল। আজান হাসতে হাসতে বলল,
-কাকা তোকে ও বাড়িতে যেতে না করেছে। তোর হাত-পা তো আর বেঁধে রাখেনি। কলেজ থেকে চলে যাবি। বা ফ্রেন্ডের বাড়ি যাওয়ার কথা বলেও যেতে পারবি। দুনিয়াতে আরও কত আজুহাত আছে।
পেখম গম্ভীর মুখে বলল,
-হাত পা-ই তো বেঁধে রেখেছে। পাপাকে প্রমিজ করেছি যাব না। এখন যদি যাই তাহলে প্রমিজ ভাঙার পাপ হবে না?
চলবে