ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি আসবে বলে বসন্ত এসেছে

১৯তম পর্ব

লেখক: জেরিন আক্তার নিপা

#তুমি_আসবে_বলে_বসন্ত_এসেছে '১৯'

#জেরিন_আক্তার_নিপা

পেখম নিঃশব্দে পা টিপেটিপে হেঁটে ভেতরে ঢুকেছে। ছোট কাকীকে সামনে পেয়ে গেলে জিজ্ঞেস করল,

-ছোট কাকী, পাপা কি বাড়িতে?

-হুম।

পেখম নিচু গলায় জানতে চাইল,

-পাপা কি অনেক রাগ করে আছে?

ছোট কাকী ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস চাপলেন। বললেন,

-তুমি তো জানো তোমার বাবা তোমার ও বাড়িতে যাওয়া পছন্দ করে না। তারপরও কেন যাও?

-দৃষ্টি জোর করে নিয়ে গিয়েছিল। এখন বলো, পাপা কি মা'কে কিছু বলেছে?

ভাই ভাবীর রুম থেকে ঝগড়ার শব্দ শুনলেও পেখমকে কিছু জানাল না। ভাই মেয়ের সামনে যতটা ভালো ভাবীর সামনে ততটাই নিকৃষ্ট। মেয়েকে এত ভালোবাসে। অথচ বউকে একটু সম্মান করতে পারে না। বাবার সম্পর্কে এসব কথা জানলেও হয়তো পেখম বিশ্বাস করবে না।

-এর পর থেকে ওবাড়িতে গেলে ভাইকে বলে যেও।

-পাপাকে না বলে আর যাব না।

পেখম বাবা-মা'র ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে গলা বাড়িয়ে উঁকি দিয়ে ভেতরটা দেখে নিল। মা অন্য দিকে ফিরে বসে আছে। বাবা ঘরে নেই। এমুহূর্তে কি ভেতরে যাওয়া শুভ হবে? বাবা থাকলেও একটা ভরসা ছিল। মা'র ফোঁপানোর শব্দ শুনে পেখম অবাক হয়ে তাকাল। মা কি কাঁদছে? পেখম নিঃশব্দ পায়ে ভেতরে এলো। সত্যিই মা কাঁদছে! মা'কে কাঁদতে দেখার মতো আশ্চর্য ঘটনা পেখম আজই প্রথম দেখেছে। কেন কাঁদছে মা?

-মা।

মেয়ের ডাক শুনে জেসমিন ত্বরিতে দু'হাতে চোখের পানি মুছে নিল। মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাসি হাসি মুখে জিজ্ঞেস করল,

-কখন এসেছিস?

চোখের পানি মুছে ফেললেও গলায় এখনও কান্নার রেশ লেগে আছে। পেখম বোকার মতো মা'র মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

-তুমি কাঁদছিলে কেন মা!

জেসমিন উঠে মেয়ের কাছে এসে শব্দ করে হেসে বলল,

-দূর পাগল! আমি কাঁদব কেন?

পেখমের মুখটা ছোট হয়ে গেছে। বাবা কি তার জন্য মা'কে বকেছে? বুজে আসা গলায় পেখম জিজ্ঞেস করল,

-পাপা কি তোমাকে বকেছে মা?

বিধ্বস্ত মনটাকে শক্ত করে মুখে হাসি রেখেই জেসমিন বলল,

-তোর পাপা কি ওইরকম মানুষ! সে কোনদিন আমাকে বকে?

পৃথিবীর সবথেকে বড় মিথ্যা কথাটি বলল জেসমিন। বাবার উপর থেকে মেয়ের বিশ্বাস তুলে দিতে চায় না। পেখমের কাছে তার বাবা কোন সুপারহিরো থেকে কম না। বাবাকে নিয়ে তার অনেক গর্ব। জেসমিন কীভাবে মেয়ের গর্ব ভেঙে দিবে? বাবা মাকে বকেনি শুনে পেখমের মুখে হাসি ফুটলো। আহ্লাদী গলায় সে বলল,

-আমি তো জানি পাপা তোমাকে কত ভালোবাসে। পাপা কোনদিনও তোমাকে কিছু বলে না। ভেবেছিলাম আজ আমার জন্য তোমাকে পাপার বকা খেতে হয়েছে। তাই অনেক মন খারাপ লাগছিল।

জেসমিন গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এমন বাবা পৃথিবীর সব সন্তানের হোক। কিন্তু এমন স্বামী যেন আল্লাহ কোন মেয়েকে না দেয়।

-তোমার চোখ লাল হয়ে আছে কেন?

-আমার মনে হয় চোখ উঠেছে। তুই আমার চোখের দিকে এত বেশি তাকাস না। তাহলে তোরও চোখ উঠবে।

চোখ ওঠার যন্ত্রণা কতটুকু পেখম খুব ভালো করেই জানে। দুই বার তার চোখ উঠেছে। চোখ লাল হয়ে যেমন পানি পড়ে তেমন ব্যথাও!

বিকেলটা পেখম আজান ভাইয়ের ঘরে কাটাল। আজান ভাইয়ের গিটার নিয়ে কতক্ষণ আনতাজেই টুংটাং শব্দ করল। আজানের বই পড়ায় ডিস্টার্ব হলে সে বলল,

-ওটা রাখ পেখম।

পেখম গিটার বাজাতে বাজাতেই বলল,

-কেন? তোমার জিনিস আমি ধরতে পারব না?

-পারবি। কিন্তু তুই আমার কান খারাপ করছিস।

-শেখার চেষ্টা করছি। তুমি তো গিটার বাজাতে পারো।

-তুই নিজে নিজে শিখতে পারবি না। তাই বলছি রেখে দে।

-তাহলে তুমি একটু শেখাও।

আজান বই থেকে মুখ তুলে পেখমের দিকে চাইল। বই বন্ধ করে রেখে জিজ্ঞেস করল,

-কেন যন্ত্রণা করছিস?

পেখম তখনও গিটারে টুংটাং করছে। ঠোঁট ফুলিয়ে সে বলল,

-ওই বাড়িতে কত মানুষ। আমাদের বাড়িতে কেউ নেই।

আজান কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,

-কেউ নেই মানে কি? আলাইয়া আছে আলিশবা আছে। আমরা সবাই আছি।

এই কথা শুনে পেখম গিটার কোলের উপর রাখল। ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,

-আলাইয়া আলিশবা কি আমার বয়সী?

-তোর বয়সী পোলাপান এখন কই থেকে ধরে আনব!

-ওই বাড়িতে আছে।

আজান বুঝতে পারছে পেখমের আজ ওই বাড়িতে থাকার ইচ্ছে ছিল। কাকা গাড়ি পাঠিয়েছে বলেই ইচ্ছের বিরুদ্ধে চলে আসতে হয়েছে। এসেছে ঠিকই এখন বাড়িতে মন লাগছে না।

-তোমার ঘরে এলেও তুমি বিরক্ত হও। আমি তাহলে কোথায় যাব? আমার সময় কীভাবে কাটবে?

আজান ছোট বোনটার মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। কলেজে পড়ে অথচ এখনও বাচ্চা স্বভাব যায়নি।

-আগে তো তুই ওই বাড়িতে যেতে চাইতি না। এখন তোর ওই বাড়ির জন্য এত মন পুড়ছে কেন?

আজান ভাইয়ের প্রশ্ন শুনে পেখমের চেহারা শক্ত হয়ে গেল। ভাইয়া কোথায় তাকে একটু সান্ত্বনা দিবে, তা না করে উল্টো প্রশ্ন করছে। ওখানে নতুন ওই মেয়েটাকে নিয়ে কি সবাই আহ্লাদ করছে? এটা ভেবেই তার মন খারাপ। পেখম বিছানার উপর গিটার নামিয়ে রেখে ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। আজান অবাক গলায় জিজ্ঞেস করল,

-কী হয়েছে?

-চলে যাচ্ছি। আর আসব না তোমার ঘরে। আর বিরক্ত করব না। তুমি মনের খুশিতে বই পড়ো।

***

রাতে তাওয়াফ খালাম্মার খোঁজ নিতে এলে প্রিয়া তাকে জিজ্ঞেস করল,

-ভাইয়া আমি কি একটু ছাদে যেতে পারি?

তাওয়াফ ফোনে সময় দেখে বলল,

-এখন যাবে?

-হুম। সারাক্ষণ রুমে বসে থাকতে ভালো লাগে না।

-ঠিক আছে যাও। দৃষ্টিকে ডেকে দেই?

-না না। আমি একাই যাব। একা আমি ভয় পাব না। আমার কোনকিছুর ভয় নেই।

তাওয়াফ মৃদু হেয়ে অনুমতি দিল। অনুমতি পেয়ে প্রিয়া খুশি হয়েছে। তাওয়াফ প্রিয়াকে নিজের বোনের মতোই স্নেহ করে। কিন্তু প্রিয়া মনে হয় তাকে সেভাবে আপন ভাবতে পারে না। ভাবতে না পারারও কারণ আছে। তার জন্যই তো প্রিয়া নিজের ভাইকে হারিয়েছে। তাওয়াফ দীর্ঘশ্বাস গোপন করে বলল,

-শোনো প্রিয়া, এই বাড়িটাকে তুমি নিজের মনে করতে না পারলেও এবাড়িতে কোথাও যাওয়ার জন্য তোমার কারোর থেকেই পারমিশন নিতে হবে না। আমাকেও বলে যেতে হবে না। তোমার যখন মন চাইবে তুমি ছাদে যেতে পারো। কেউ তোমাকে প্রশ্ন করবে না।

প্রিয়া সামান্য মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

-আর কাল থেকে ভার্সিটি যাবে। এখানে আসার পর থেকে একদিনও যাও নি। যা-ই হয়ে যাক পড়াশোনা কামাই করা চলবে না। বুঝেছ? পড়াশোনা করে তোমাকে অনেকদূর যেতে হবে। নিজের ক্যারিয়ার গড়তে হবে।

টলমল চোখে প্রিয়া তাওয়াফের দিকে তাকিয়ে রুদ্ধ কন্ঠে বলল,

-আপনার শেষের কথাটা ভাইয়ার কথার সাথে মিলে গেছে। ভাইয়াও এই কথাই বলত। আমাকে নিয়ে ভাইয়ার অনেক স্বপ্ন ছিল। আমার স্বপ্নের থেকেও ওর স্বপ্ন বেশি বড় ছিল।

তাওয়াফ আদুরে ভঙ্গিতে আলতো করে প্রিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,

-ছাদে বেশি দেরি করিও না।

তাওয়াফ ওই ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। নিজের রুমে ফিরে এসে দুই তিন ড্রয়ার খুঁজেও তার মেডিসিন পেলো না। মাথার ভেতর সেই পুরোনো স্মৃতি গুলো আবার নাড়া দিয়ে উঠেছে। বুক ধড়ফড় করছে। তাওয়াফ ঘামতে শুধু করেছে। মাথা ঘোরার কারণে চোখের সামনে জিনিস গুলো ঝাপসা দেখছে। নিঃশ্বাস নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ছে। তাওয়াফ তন্নতন্ন করে সবগুলো ড্রয়ার খুঁজে ফেলল। কোথায় রেখেছিল কৌটোটা? তাওয়াফের দু-হাত থরথর করে কাঁপতে শুধু করেছে। বুঝতে পারছে তার প্যানিক অ্যাটাক শুরু হয়েছে। তাওয়াফ যতটা সম্ভব নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে। তার জীবনের সবথেকে ভালো ভালো জিনিস গুলো ভাবতে শুরু করেছে। তখনই পেখমের মুখ চোখের সামনে ভেসে উঠল। পেখমের হাসি, ওর রাগ করা। চোরা চোখে তার দিকে তাকানো। পেখমের কথা ভাবতে ভাবতে তাওয়াফ আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। মেঝেতেই বসে পড়েছিল সে।

তাওয়াফের ফোন বাজছে। বড়ো বড়ো করে দম নিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক করছে। অসহ্যকর ফোনটা বেজেই চলেছে। তাওয়াফ ফোন হাতে নিয়ে দেখল, কনিকা! এর টাইমিং এর প্রশংসা করতেই হয়। ইচ্ছে না থাকলেও কথা বলতে হবে। নাহলে দ্বিতীয় কলটা তার বাবার কাছে যাবে।

-হ্যালো। বল।

ওপাশ থেকে কনিকা উচ্ছ্বসিত কন্ঠে জানাল,

-হ্যাঁ বলে দিয়েছি।

তাওয়াফ বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করল,

-কিসের হ্যাঁ?

-বিয়ের জন্য হ্যাঁ বলে দিয়েছি গাধা।

কথাটা জেনে তাওয়াফ খুশি হলো। সংসারী হয়ে গেলে এবার অন্তত তার জানের পিছু ছাড়বে।

-কংগ্রাচুলেশনস। নতুন জীবনের জন্য দোয়া ও শুভকামনা।

কনিকা হঠাৎ থেমে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,

-তীব্র তুই ঠিক আছিস? তোর কথা এমন শোনাচ্ছে কেন?

এই মেয়ে তার না বলাতেও কীভাবে সব বুঝে যায়? জাদুমন্ত্র জানা আছে নাকি! তাওয়াফ একটু আগের ঘটনাটা লুকিয়ে গিয়ে বলল,

-ফোনে সবার কন্ঠই অন্যরকম শোনায়। জানিস তোর কন্ঠ এখন কার মতো শোনাচ্ছে? আবর্জনার স্তূপে বসে কা কা করে কালো রঙের পাখি গুলোকে চিনিস? তোর কন্ঠ ঠিক তাদের মতো মিষ্টি শোনাচ্ছে।

কনিকা রেগে গিয়ে বলল,

-কুত্তা রে! তুই কোনদিনও মানুষ হবি না। আমি কাক হলে তুই একটা শকুন।

চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন