ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি আসবে বলে বসন্ত এসেছে

৩৩তম পর্ব

লেখক: জেরিন আক্তার নিপা

#তুমি_আসবে_বলে_বসন্ত_এসেছে '৩৩'

#জেরিন_আক্তার_নিপা

বিদেশি ক্লায়েন্টের সাথে তাওয়াফের মিটিং আছে। তাই সে সময় হওয়ার আগেই চলে এসেছে। ঢাকা শহরের জ্যামের কথা নতুন করে বলতে হয় না। লেট করে এলে ওদের সামনে বাজে ইমপ্রেশন পড়বে। বিদেশীরা বাঙালিদের মতো না। ওরা সময়ের ব্যাপারে অনেক গুরুত্বশীল। পরনের কোর্ট খুলে হাতে নিয়েছে। চোখে এখনও রোদচশমা। হোটেলের ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বাম হাতে পরা ঘড়িতে সময় দেখল। বাবাকে কল করে জেনে নেওয়া উচিত ওরা ইন্টারেস্ট দেখালে আজই ডিল ফাইনাল করে ফেলবে কি-না। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ তাওয়াফের পা থেমে গেল। পরিচিত এক মুখে দৃষ্টি আটকাল। রিসিপশনের সামনে দাঁড়ানো লোকটাকে চিনতে ভুল হলো না একটুও। পল্লব মির্জা। সম্পর্কে তার বাবার সৎ ভাই। লোকটা যে একা আসেনি এটা বুঝতে বাকি থাকল না। সাথের মহিলাকেও দেখল। উনাকে কোনদিক দিয়ে চাচী মনে হলো না। অথচ চাচার এক হাত ওই মহিলার কোমর পেঁচিয়ে রেখেছে। এতেই উনার সাথে মহিলার সম্পর্ক অনেকটা আন্দাজ করা যাচ্ছে। খুব সম্ভবত এটা তার নতুন চাচী। পুনমের নতুন মা! তাওয়াফ নিঃশব্দে হাসল। তাকে এখানে দেখলে চাচা নিশ্চয় ভূত দেখার থেকেও বেশি ভয় পাবেন। তাওয়াফ কি একটু কষ্ট করে এগিয়ে গিয়ে চাচাকে সালাম দিবে। তাকে দেখার পর চাচা জানের চেহারায় কী প্রতিক্রিয়া হয় ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করছে। ইচ্ছে থাকলেও তাওয়াফ নতুন চাচীর সাথে পরিচিত হতে পারল না। আজিজের কল এসেছে। তার ক্লায়েন্টরা পৌঁছে গেছে। তাওয়াফ চাচার কাছে না গিয়ে মিটিংয়ের স্থানে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। মিস্টার মির্জার প্রথম ওয়াইফের জন্য তার সামান্য সহানুভূতি কাজ করল। ওই বেচারি হয়তো জানেই না তার স্বামী বাড়ির বাইরে কী কী করে বেড়াচ্ছেন। মেয়ে বাবার অন্ধভক্ত। বাড়িতে ফিরে হয়তো বউয়ের সাথেও দু'একটা মিষ্টি কথা বলে আদর্শ স্বামী হওয়ার টাইটেল ধরে রাখেন। পেখমের মুখটা হঠাৎ চোখের সামনে ভাসল। বাবার প্রতি পেখমের অন্ধ বিশ্বাসের কথা মনে পড়তেই বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। একটু আগে সে যা দেখে এসেছে বাবার চরিত্রের এই দিকের কথা জানতে পারলে পৃথিবীর সব পুরুষের উপর থেকেই মেয়েটা বিশ্বাস হারিয়ে ফেলবে। এই বাপকেই পেখম তার লাইফের হিরো মনে করে। দুই বিয়ে করার কারণে সবসময় দাদা জনের প্রতি বিদ্বেষী মনোভাব পোষণ করেছে। যখন জানবে ওর বাপও একই পথের পথিক, সইতে পারবে না মেয়েটা।

*****

তাওয়াফ ডিল ফাইনাল করে ফেলেছে। এই ডিলটা তাদের কোম্পানির জন্য সুফল বয়ে আনবে আশা করছে। দীর্ঘ দুই ঘন্টার মিটিং শেষে তাওয়াফ যখন বেরিয়ে এলো তখন চাচা মির্জা এখানে থাকবে না এটাই স্বাভাবিক। হয়তো উনি এই হোটেলেই আছেন। বা চলে গেছেন। তাওয়াফ এখান থেকে সোজা অফিসে গেল। আজ শুধুমাত্র পেপার ওয়ার্ক হয়েছে। আসল কাজ এখন থেকেই শুরু হবে। তাওয়াফ অফিসেও স্টাফদের নিয়ে ছোটখাটো একটা মিটিং ডাকল। এই ডিলটা তাদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ সবাকে জানাল।

-আমার একার দ্বারা কোন কাজই সম্ভব হবে না। আপনারা যদি আমাকে সাহায্য না করেন তাহলে আমি কিছুই করতে পারব না। আমার শক্তি আপনারা। আপনারা আমাকে বিশ্বাস করলে, আমাকে সাপোর্ট করলে তবেই আমি এবং আমার কোম্পানি সাকসেস অর্জন করতে পারব।

তাওয়াফ তার শব্দ দ্বারা সবাইকে এতটা মোটিভেট করল যে সকলে কথা দিল, আজ থেকে জানপ্রাণ দিয়ে কাজ করবে। তাওয়াফ বলল,

-উঁহু। আমার কাছে সবার আগে আপনাদের হেল্থ, মেন্টাল পিস গুরুত্বপূর্ণ। শরীর, মন সুস্থ না থাকলে কোন আজই আশানুরূপ হবে না। আপনারা আগে নিজের খেয়াল রাখবেন। কেউ এতবেশি কাজ করবেন না যাতে অসুস্থ হয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। আজ থেকে আমার অফিসের প্রতিটা কর্মচারীদের জন্য মেডিক্যাল ট্রিটমেন্ট ফ্রি করে দেওয়া হলো। এই মাস থেকে আপনাদের বেতনও বাড়বে।

আজিজ অবাক হয়ে শুধু দেখছে এই অল্প বয়সে ছোট স্যার বিজনেসে কতটা পরিপক্ব। তাওয়াফ স্যার বড়ো স্যারকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছেন। উনার ভদ্র চালচলন, মার্জিত কথাবার্তা সবমিলিয়ে আলাদা এক ব্যক্তিত্ব। মন্ত্রবলে যেন উনি সবাইকে নিজের কথায় নিয়ে আসতে পারেন। কারো পক্ষে উনাকে না বলা সহজ হয় না।

****

কলিংবেল বাজছে। পেখম ভেবে পাচ্ছে না এই ভরসন্ধ্যায় কে এসেছে। বড়মা আজ চুলে চুবচুবে করে তেল দিয়ে দিয়েছে। এত সুন্দর চুল গুলোকে সে নাকি যত্ন করতে পারে না। পেখমের যেখানে লম্বা চুল পছন্দই না সেখানে যত্ন কেন করবে? পরিবারের কড়াকড়ি শাসন না থাকলে কবেই এই চুল কেটে কাঁধ সমান করে ফেলত। ছোট চুলের মেয়েদেরকে তার কাছে পুতুলের মতো লাগে। আফসোস বড়মা, মা, চাচীর বকা, মার খাওয়ার ভয়ে সে পুতুল সাজতে পারে না। এখনও কলিংবেল বেজে যাচ্ছে। দরজা খুলতে যাওয়ার আগে পেখম মাথায় ওড়না দিয়ে নিল। দরজা খুলে দিয়ে পেখম বাকরুদ্ধ। অবিশ্বাস্যে বড়ো বড়ো চোখ করে তাকিয়ে রইল।

মাথায় লাল ওড়না দেওয়ার কারণে পেখমকে বউদের মতো লাগছে। তাওয়াফ পলকহীন চোখে তাকিয়ে রইল। তার চোখের মুগ্ধতা পেখম না বুঝলেও অন্য মানুষ হলে অবশ্যই বুঝে যেত।

আজকে তাওয়াফ ভাই আসার কোন কথাই ছিল না। দাদী একবারও বলেনি তাওয়াফ ভাই আসবে। পেখম কি চোখে ভুল দেখছে? আজকাল তো সে আবার স্বপ্নেও তাওয়াফ ভাইকে দেখছে।

-আপনি এখানে!

কথাটায় বিস্ময়, প্রশ্ন দু’টোই ছিল। তাওয়াফ সহজ গলায় বলল,

-আমার দাদীর বাড়ি। আসতেই পারি।

-আসতে পারেন। কিন্তু... '

-আমাকে কি ভেতরে আসতে বলবি? নাকি বাইরে দাঁড় করিয়েই প্রশ্ন জবাব নিবি। সারাদিন মিটিংয়ে ছিলাম। ভীষণ টায়ার্ড লাগছে।

মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। ক্লান্তিতে চেহারার উজ্জ্বলতাও কমে গেছে। তবে সাদা শার্ট, কালো প্যান্টে হ্যান্ডসামও লাগছে। পেখমের ভীষণ মায়া লাগল। সে ব্যস্ত গলায় বলল,

-আমি কি আপনাকে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে বলেছি?

-বলিস নি। কিন্তু ভেতরেও তো যেতে দিচ্ছিস না। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছিস।

পেখম সাথে সাথে সরে গিয়ে বলল,

-এবার আসুন।

তাওয়াফ ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল,

-ধন্যবাদ।

আজকে তাওয়াফ ভাইকে অন্যরকম লাগছে। কেন লাগছে পেখম জানে না। তবে আজকের মতো তাওয়াফ ভাই কখনও তার সাথে এত সহজ ভাবে কথা বলেনি।

-দাদী কোথায় পুনম?

-মনে হয় ঘরে। দাদীকে ডাকব?

-না। আগে রুমে যাই। ফ্রেশ হয়ে নিজেই যাব।

-ঠিক আছে।

-আমার রুমটা কি ঠিকটাক আছে?

-আছে। আপনার রুমে কেউ যায় না।

-কেন?

-দাদী কাউকে যেতে দেয় না।

-তোকেও না?

তাওয়াফ সিঁড়ি দিয়ে উঠে যাচ্ছে। পেখমও ওর সাথে সাথে আসছে।

-না।

-আমি দাদীকে বলে যাব। এবার থেকে যেন তোকে আমার রুমে যেতে দেয়।

-আমি গিয়ে কী করব?

-আমার রুমটা গুছিয়ে রাখবি। তোর উপর দায়িত্ব দিলাম।

-আচ্ছা।

-বাকিরা কোথায়?

-ছোট চাচী আলাইয়া আলিশবাকে নিয়ে বাবার বাড়ি গেছে। বড়মা মনে হয় আজান ভাইয়ের কাছে। দাদী ঘরে। আর আমার মা কোথায় জানি না।

পেখমের সাথে কথা বলতে বলতে তাওয়াফ রুমে চলে এসেছে। রুমে এসে সবার আগে ফ্যান চালু করল। পেখমের হঠাৎ মনে পড়লে জানাল,

-ওয়ারড্রবে আপনার কাপড় আছে। বড়মা আনিয়ে রেখেছে।

তাওয়াফের ঠোঁটে হাসি দেখা গেল। বড়ো চাচী তাকে একটু বেশিই ভালোবাসে। পেখম মুগ্ধ চোখে তাওয়াফের দিকে তাকিয়ে রইল। পেখম তাকে দেখছে বুঝতে পেরেও তাওয়াফ বাধা দিল না।

-আমি শাওয়ার নিতে নিতে কফি বানিয়ে আনতে পারবি?

-পারব।

পেখম চলে যাওয়া ধরলে তাওয়াফ ডেকে দাঁড় করাল।

-পুনম।

-হুম।

-আমি কেমন কফি খাই জানিস?

পেখম হেসে জানাল,

-জানি। দুধ চিনি ছাড়া। একদম তেতো কফি।

-কীভাবে জানিস?

তাওয়াফের চোখে কৌতূহল দেখা দিল।

-বড়মাকে কতবার বানাতে দেখেছি। আমি সামনেই ছিলাম। তখন শিখে নিয়েছি।

তাওয়াফ হাসল। পেখম তার সম্পর্কে অনেক খোঁজ খবরই রাখে। বিষয়টা তাওয়াফের ভালো লাগল।

কফি বানিয়ে পেখম তাওয়াফের ঘরে যাওয়ার সময় মা'র সামনে পড়ল। জেসমিন মেয়েকে জিজ্ঞেস করল,

-হাতে কী তোর?

-কফি।

-কার জন্য?

-তাওয়াফ ভাই এসেছে। উনার জন্য।

জেসমিন আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল,

-কখন এসেছে? আমাকে ডাকলি না কেন?

-এসেই উনি রুমে চলে গেছেন। আমাকে কফির কথা বললেন।

তাওয়াফের আসার খবর সকলের কানে পৌঁছে গেছে। গোলাপ জান নাতির ঘরে ছুটে এলেন। তাওয়াফ তখন মাত্রই গোসল করে বেরিয়েছে। পরনে শুধু একটা ট্রাউজার। দাদীকে দেখে গা মুছতে মুছতে বলল,

-খবর পেয়ে গেছেন তাহলে?

-কখন আসছোস তুই? আমারে কেন ডাকলি না? তুই যে আসবি আমি তো জানতামই না।

-আমি জানিয়ে আসিনি তো দাদী।

-এইটাই ভালো করছোস। এত জানাজানির দরকার নাই। মন চাইছে দাদীরে দেখতে চইলা আসছোস।

তাওয়াফ টিশার্ট পরে নিল। চাচীরাও চলে এসেছে। পেখমকে দেখা গেল সবার পেছনে। তাওয়াফ জিজ্ঞেস করল,

-কফি এনেছিস?

-হুম।

তাওয়াফ পেখমের হাত থেকে কফি নিয়ে চুমুক দিল। দাদী তাকে নিয়ে বসার ঘরে চলে এসেছে। আজকে আলাইয়া আলিশবা বাড়িতে নেই। সেজন্য পরিবেশ অনেকটাই ঠান্ডা।

গোলাপ জান তাওয়াফের সাথে তটিনীর বিষয়ে কথা বলছে। মেয়েটা এখনও বাড়িতে আছে দেখে তাওয়াফ কৌতূহলী হয়েছিল। এই মেয়ে কার আত্মীয়?

-আর কইস না রে ভাই। ওই মাইয়া তোর বড়ো চাচার গাড়ির সামনে আইসা ধাক্কা খেয়ে স্মৃতিশক্তি হারাই ফেলছে। নামধাম কিচ্ছু মনে করতে পারে না। বাড়ি কই এইটাও কইতে পারে না। তাই উপায় না পাইয়া আমাদের বাড়িতেই থাকতে দিছি।

পেখমের এখানে বিশেষ কোন কাজ না থাকলেও সে নানা বাহানায় তাওয়াফের আশেপাশে ঘুরঘুর করেছে। তাওয়াফ বিষয়টা লক্ষ্য করলেও পেখমকে বুঝতে দিচ্ছে না। পেখমের এসব ছেলেমানুষি কাণ্ড দেখে তাওয়াফ ওই মেয়ের ব্যাপারে বেশি মাথা ঘামানোর সময় পেলো না। কফি শেষ করে তাওয়াফ পেখমকে ডাকল।

-পুনম।

পেখম সাথে সাথে ছুটে এলো। তাওয়াফের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,

-জি।

-এত ভালো কফি বানানো কার কাছ থেকে শিখেছিস?

তাওয়াফ ভাই কি তার প্রশংসা করল? সরাসরি করেনি। তবে এই কথার মানে তো এটাই দাঁড়ায় তার কফি বানানো ভালো হয়েছে। পেখম লজ্জায় রঙিন হলো। মৃদু সুরে বলল,

-শিখিনি তো। বড়মা বানাত তখন আমি দেখেছি।

পেখমের গালের লালিমা টুকু তাওয়াফের চোখ এড়াল না। গোলাপ জান অবশ্য এতকিছু খেয়াল করলেন না। তিনি টিটকারির সুরে বললেন,

-এই কাম চোরের হাতের কফি তোর ভালো লাগছে! যাক জীবনে একটা কাম তো ভালো করবার পারছে।

দাদী সবসময় তাওয়াফ ভাইয়ের সামনে তাকে অপমান করে। তাওয়াফ লক্ষ্য করল পেখমের মুখটা ছোট হয়ে গেছে। সে হেসে দাদীকে বলল,

-মায়ের পরে পুনমের হাতের কফিই আমি মুখে তুলতে পেরেছি দাদী।

এই প্রশংসা বাক্য টুকু শুনে পেখম ঝট করে একবার তাওয়াফের দিকে তাকাল। খুশিতে চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। চেষ্টা করেও তার খুশি লুকাতে পারছে না। পেখমের মনে হচ্ছে সে যেন আকাশে উড়ছে। হিটলার মির্জা দাদীর মুখ বন্ধ করিয়ে দিয়েছে।

চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন