ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি আসবে বলে বসন্ত এসেছে

৬১তম পর্ব

লেখক: জেরিন আক্তার নিপা

#তুমি_আসবে_বলে_বসন্ত_এসেছে '৬১'

#জেরিন_আক্তার_নিপা

হঠাৎ ফোনের রিংটোনের শব্দে তাওয়াফ মাঝপথে থেমে গেল। পেখমও বন্ধ চোখের পাতা ঝট করে খুলে ফেলল। এবার দু'জনের চোখাচোখি হলে পেখম আর লজ্জা ধরে রাখতে পারল না। এই মুহূর্তে তার দৌড়ে তাওয়াফ ভাইয়ের চোখের সামনে থেকে পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে। এসময় কে কল দিয়েছে এটা ভেবে ভেবেই তাওয়াফ পকেট থেকে ফোন বের করে আনলো। স্ক্রিনে কনিকার নাম দেখে দাঁতে দাঁত চেপে কল রিসিভ করল। তাওয়াফ কিছু বলার আগেই ওপাশ থেকে কনিকা উচ্ছসিত গলায় বলতে লাগল,

-তীব্র শোন, সন্ধ্যায় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। তোদের নিয়ে ভীষণ কিউট একটা স্বপ্ন দেখেছি। কী স্বপ্ন দেখেছি জানিস? দেখেছি তুই বাবা হবি। পেখমকে নিয়ে তুই আমার কাছে এসেছিস। কিন্তু আমি তো গাইনী ডাক্তার না।

তাওয়াফের মেজাজ ঝট করে সপ্তাহ আকাশে চড়ে গেল। চাপা গলায় ধমক দিয়ে বলল,

-ফোন রাখ তুই।

কনিকা ফোনের ওপাশে বুঝতে পারল না তাওয়াফ কেন রেগে গেছে।

-কেন? স্বপ্নটা কি ভালো ছিল না? তুই রেগে যাচ্ছিস কেন?

তাওয়াফ চিবিয়ে চিবিয়ে বিড়বিড় করে বলল,

-আমার রোমান্সের মধ্যে বাধা সৃষ্টি করে স্বপ্নে আমাকে বাপ হতে দেখিস। কিছু না করে বাপ কি আমার বউকে বাতাস খাইয়ে হবো?

-কিরে কথা বলছিস না কেন?

-ফোন রাখ কনিকা।

কে কল দিয়েছে বোঝার জন্য পেখম এতক্ষণ তাওয়াফ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে ছিল। কনিকা নামটা শুনে কৌতূহল মিটল। তবে কনিকা নাছোড়বান্দা। সে কল কাটছে না। উল্টো কেন কেন করেই যাচ্ছে। তাওয়াফ নিজেই কল কেটে দিল। মুডের তেরোটা বাজিয়ে দিয়েছে এই মেয়ে। অসমাপ্ত কাজটা সমাপ্ত করার আর সুযোগ পেলো না। পেখম উঠে দাঁড়িয়ে পড়েছে। শহরে এগারোটা বারোটা সন্ধ্যা মনে হলেও গ্রামে আটটা বেজে যাওয়া মানেই মাঝরাত। এত রাতে নদীর ধারে বসে থাকা বিপদজনকও হতে পারে। পেখম বলল,

-বাড়ি চলুন।

তাওয়াফও আপত্তি করল না। পেখমকে নিয়ে বাড়ি ফিরে এলো। ইতিরা যে ঘরে আছে পেখম সেখানেই চলে গেল। তাওয়াফ একা দাঁড়িয়ে রইল। সে পেখমকে বলারই সুযোগ পেলো না। তবে আজ যা হতে যাচ্ছিল পেখম কিন্তু তাতে বাধা দেয়নি। এই মিষ্টি অনুভূতি কনিকার উপর তার রাগের পরিমাণকে ছাপিয়ে গেল।

পেখম ঘরে এসে লজ্জায় দু'হাতে মুখ ঢেকে ফেলল। তখন তার হুঁশ ছিল না। কিন্তু এখন ওসব কথা মনে করে লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে। কীরকম একটা অনুভূতি হচ্ছে পেখম নিজেও বুঝতে পারছে না।

-আজ একটা বর নেই বলে মাঝরাতে চন্দ্র বিলাস করতে যেতে পারি না। হাই আফসোস।

দৃষ্টি চোখ বন্ধ রেখেই কথাটা বলেছে। পেখম ঝট করে ওর দিকে ফিরে তাকাল। এই মেয়ে জেগে আছে? দৃষ্টি আকৃতিকে জড়িয়ে ধরে ঘুমানোর ভঙ্গিতে পড়ে আছে। আকৃতিও চোখ বন্ধ অবস্থায় বলল,

-সবার কপাল কি আর আমাদেরই পুনম রানীর মতো হয়?

তার মানে এরা দু'জনই জেগে আছে! পেখমের লজ্জার মাত্রা আরও বেড়ে গেল। সে শুয়ে পড়ে নাকেমুখে কাঁথা টেনে দিল। আকৃতি দৃষ্টি দু'জনই একসাথে হেসে উঠল।

****

ইলহাম রাতেই ঢাকা পৌঁছে গেছে। ভাই তাকে মিস প্রতিবাদীর ঠিকানা দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু রাত বারোটার বেশি বেজে যাওয়ার কারণে ইলহাম এখন প্রিয়ার সাথে দেখা করতে পারবে না। এত রাতে প্রিয়াকে বাড়ির বাইরে ডাকা ঠিক হবে না। আর সে ডাকলেও মিস প্রতিবাদী আসবে না এটা ইলহাম খুব ভালো করেই জানে। সকাল হওয়া পর্যন্ত ইলহাম গাড়িতে বসেই অপেক্ষা করবে। কিন্তু বিশ মিনিট গাড়িতে বসে থেকেই সে অস্থির হয়ে উঠল।

-না, এভাবে রাত কাটবে না। এখন মিস প্রতিবাদীকে দেখতে না পেলে সকাল হওয়ার আগেই আমি মরে যাব।

ইলহাম নতুন সিম নিয়েছে। আগের নম্বর তো মিস প্রতিবাদী ব্লক করে রেখেছে। ইলহাম নতুন নম্বর দিয়ে কল করল। প্রিয়া ঘুমিয়ে ছিল। কয়েকবার ফোন রিং হয়ে কেটে যাবার পর তার ঘুম ভেঙে গেল। এত রাতে কল করে কে তাকে বিরক্ত করছে? অচেনা নম্বর দেখে ধরবে না ভাবল। কিন্তু মানুষটা কল করেই যাচ্ছে। প্রিয়া কল তুলে বলল,

-হ্যালো, কে বলছেন?

-ইলহাম। আমি আপনার বাসার নিচে দাঁড়িয়ে আছি। আপনি এক্ষুনি নিচে আসবেন। তা নাহলে আমাকে উপরে এসে আন্টির সাথে কথা বলতে হবে।

কথাগুলো বলেই ইলহাম কল কেটে দিল। প্রিয়া থতমত খেয়ে বসে আছে। এই লোক কি পাগল? মা ঘুমিয়ে আছে। প্রিয়া মায়ের পাশ থেকে সাবধানে উঠে গেল। ওড়না মাথায় দিয়ে নিচে চলে এলো। ইলহাম গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। প্রিয়াকে দেখে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার ঠোঁটে হাসি দেখা দিয়েছে। প্রিয়া ইলহামের সামনে এসে রেগেমেগে বলল,

-এটা কোন ধরনের অসভ্যতা হ্যাঁ? মাঝরাতে হুমকি ধামকি দিয়ে আমাকে ডেকে আনার মানে কী?

ইলহাম দু'হাত বুকে ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে প্রিয়াকে দেখছে। এই কয়টা দিন মেয়েটাকে সে কত মিস করেছে তার প্রমাণ কীভাবে দিবে? ইলহাম জবাব না দিয়ে প্রিয়াকেই দেখে যাচ্ছে।

-কী হলো? কথা বলছেন না কেন? আর আপনি এখানে কবে এসেছেন? আপনার তো ইরিনের বিয়েতে থাকার কথা।

-আপনার জন্য থাকতে পারিনি। বোনের বিয়ে শেষ হবার আগেই চলে আসতে হয়েছে।

প্রিয়া কঠিন মুখে বলল,

-আমার জন্য! আমি কি আপনাকে আসতে বলেছি?

-মুখে বলেননি। তবে কাজকর্মে বুঝিয়েছেন।

প্রিয়ার চোখে রাগের সাথে তিরস্কারও দেখা দিল।

-বাজে কথা বলবেন না একদম।

মিস প্রতিবাদীকে রাগতে দেখে ইলহামের ভালো লাগছে। কতদিন মিস প্রতিবাদী তার উপর রাগে না? এই মেয়ের রাগ দেখার জন্য হলেও এই মেয়েকে তার জীবনে চাই।

-আপনি আমার সাথে যোগাযোগ বন্ধ না করলে আমি আজ আপনার সামনে এসে দাঁড়াতাম না৷ আপনি জানেন আপনার সাথে কথা না বলে আমার দিন কাটবে না। সেজন্যই তো নম্বর ব্লক করেছেন। যেন আমি আপনার কাছে ছুটে আসি।

প্রিয়া যথেষ্ট রেগে আছে। তার পক্ষে এর থেকে বেশি রাগ করা সম্ভব না। রাগে প্রিয়ার গাল লাল হতে দেখে ইলহাম মৃদু হাসল। এই মাঝরাতে বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে এই পাগল লোকের সাথে কথা বলার কোন মানেই হয় না। প্রিয়া ভেতরে চলে যাচ্ছে। ইলহামও তার সাথে হাঁটা ধরেছে। প্রিয়া দাঁড়িয়ে গিয়ে রাগী গলায় বলল,

-আপনি কোথায় যাচ্ছেন?

-শাশুড়ি মা'র সাথে দেখা করতে।

প্রিয়া চেঁচিয়ে বলল,

-কে আপনার শাশুড়ি মা?

ইলহাম প্রিয়াকে রেখেই এগিয়ে যেতে যেতে বলল,

-মিস প্রতিবাদীর মা।

প্রিয়া কোনভাবেই ইলহামকে ভেতরে আসা থেকে আটকাতে পারল না। এই লোক পাগল হয়ে গেছে। মাঝরাতে আন্টিকে ঘুম থেকে তুলে বিরক্ত করার জন্য ইলহাম দুঃখ প্রকাশ করল। তবে আজ সে ঘাবড়াল না। আর না কোনরূপ বাড়তি কথায় গেল। সরাসরি আন্টিকে বলল,

-আন্টি আমি আপনার মেয়েকে বিয়ে করতে চাই।

প্রিয়া ফোঁসে উঠে বলল,

-আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই না।

প্রিয়ার কথা শেষ হওয়ার আগেই মা বলল,

-কাল তোমার পরিবারকে নিয়ে এসো বাবা। বিয়ের কথা গুরুজনদের সাথে বলতে হয়।

মা এসব কী বলছে? প্রিয়া চেঁচিয়ে উঠে বলল,

-মা! আমি বিয়ে করব না। তুমি উনাকে না করে দাও।

প্রিয়া ইলহামের দিকে তাকিয়ে বলল,

-এই আপনার কি আত্মসম্মান নেই? আমি বলছি আপনাকে বিয়ে করব না তারপরও আপনি কোন সাহসে আমার মায়ের কাছে এই প্রস্তাব রেখেছেন?

মা তার দিকে শান্ত চোখে তাকিয়ে বলল,

-চুপ কর প্রিয়া। আমি তোকে বেয়াদব বানাইনি।

মায়ের এক কথাতেই প্রিয়া নিভে গেল। আন্টি রাজি। তার মানে মিস প্রতিবাদীকেও রাজি হতে হবে। ইলহাম জানে তার এমনটা করা ঠিক হচ্ছে না। কিন্তু ইলহাম এটাও জানে মিস প্রতিবাদীও তাকে ভালোবাসে। আর না বাসলেও বিয়ের পর বাসতে শুরু করবে।

****

বৌভাতের দিন তাওয়াফ পেখমের টিকির লাগালও পাচ্ছে না। গতকাল এই মেয়ে ছায়া হয়ে তার সাথে সাথে থাকলেও আজ দূরে দূরে থাকছে। তাওয়াফ অবশ্য এর কারণ ধরতে পেরেছে। তার হাসি পাচ্ছে। সামান্য একটা চুমু খেতে গিয়েই পুরো একটা দিন বউয়ের দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। এর থেকে বেশি কিছু করলে কয়দিন লুকিয়ে থাকবে কে জানে। ইরিনের শ্বশুরবাড়ি যেতে একটা খাল পেরিয়ে যেতে হয়। গাড়ি চলার রাস্তায় কাজ চলছে। নিচে দুইটা বাঁশ পেতে রাখা হয়েছে। হাতে ধরার জন্য পাশে আরেকটা বাঁশ। হলুদের দিন যখন এসেছিল তখন তাওয়াফ ভাই তার হাত ধরে পার করে দিয়েছিল। কিন্তু আজ পেখম তাওয়াফ ভাইয়ের সামনে যেতে পারছে না। ইরিন, আকৃতি সবাই পার হয়ে গেছে। পেখমও আল্লাহর নাম নিয়ে একা একাই পার হওয়ার জন্য পা বাড়াল। তখনই কেউ তার হাত ধরে ফেলল।

-পাকনামি করে একা কেন পার হচ্ছিস? পড়ে গেলে তখন কী করবি?

তাওয়াফ ভাইকে দেখে পেখমের বুকের ভেতর ধুকপুক শুরু হয়ে গেছে। গতরাতের কথা মনে পড়ে গাল লাল হচ্ছে। তাওয়াফ আজও পেখমের হাত ধরে সাবধানে জায়গাটা পার করিয়ে দিল। এপাড়ে এসেও পেখমের হাত ছাড়ল না। কড়া গলায় বলল,

-আবার যদি চোখের আড়াল হয়েছিস তাহলে খবর আছে তোর।

বৌভাতের পরের দিন ওরা ঢাকা ফিরে এসেছে। বাড়ি ফিরে আরেক সারপ্রাইজ পেলো। ইলহাম ভাই নাকি প্রিয়া আপুকে বিয়ে করবে। পেখম কতক্ষণ মুখ হা করে বসে থাকল। তাহলে ইলহাম ভাই সেদিন প্রিয়া আপুর কথাই বলেছিল। সে বোকা তাই বুঝেনি। তাওয়াফ ঘরে এসে পেখমকে এভাবে বসে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করল,

-কী হয়েছে?

-ইলহাম ভাই কি সত্যিই প্রিয়া আপুকে বিয়ে করবে?

ইলহাম হাত থেকে ঘড়ি খুলতে খুলতে বলল,

-হুম।

-ওরা কি দু'জন দু'জনকে ভালোবাসে?

তাওয়াফ ঘড়ি খুলে রেখে পেখমের দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

-ভালোবাসা কি তুই বুঝিস?

-কেন বুঝবো না?

তাওয়াফ মুচকি হেসে বলল,

-আমার তো মনে হয় না।

পেখম তাওয়াফের দিকে তাকিয়ে বোকার মতো প্রশ্ন করল,

-কেন মনে হয় না?

তাওয়াফ বিড়বিড় করে বলল,

-যার সাথে এক ঘরে থাকছিস তার ভালোবাসাই বুঝিস না। অন্যের ভালোবাসা কীভাবে বুঝবি?

চলবে

ফ্ল্যাপ;- নদী জানে শুদ্ধ শুধুমাত্র তার বোনের উপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তাকে বিয়ে করেছে। তবে এই তিক্ত সত্য জেনেও নদী শুদ্ধকে ছেড়ে যাবে না। তারও তো জেদ কম না। গাড়ল লোক নিজ ইচ্ছায় তাকে বিয়ে করেছে। এখন যা কিছুই হয়ে যাক সংসার সে করে দেখাবে। কাটা হয়ে এই লোকের গলায় বিঁধে থাকবে। ভণ্ড লোক না পারবে তাকে গিলতে, না পারবে গলায় আঙুল দিয়ে বমি করে ফেলে দিতে। সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দু'জন মানুষের জেদের বশের এই সংসার কতদিন টিকবে? তাদের সম্পর্কই বা কোন দিকে মোড় নিবে? শেষ পর্যন্ত কি একজন আরেকজনের মনে ভালোবাসা তৈরি করে নিতে পারবে?

"আমারো পরানো যাহা চায়"

https://link.boitoi.com.bd/4agz

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন