#তুমি_আসবে_বলে_বসন্ত_এসেছে '৬৩'
#জেরিন_আক্তার_নিপা
তটিনীর হঠাৎ চলে যাওয়া নিয়ে সবাই চিন্তিত হয়ে পড়েছে। মেয়েটার কি স্মৃতিশক্তি ফিরে এসেছে? স্মৃতিশক্তি ফিরলে কি তাদের ভুলে যাবে? তটিনীর জন্য সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছে নাজমা। জেসমিন তাকে বোঝাচ্ছে।
-তুমি এত চিন্তা কেন করছো ভাবী? মেয়েটা হয়তো ওর পরিবারের কাছে ফিরে গেছে।
-আমরা তো জানি না মেয়েটা কোথায় গেছে। যদি জানতাম পরিবারের কাছে ফিরে গেছে তাহলে চিন্তা করতাম না।
আজান মাকে বলতে পারছে না। না, সে আসলে বলতে চাচ্ছে না। আজান নিজেও তটিনীকে খুঁজে বের করতে চায়। এই মেয়েকে তার মুখোমুখি দাঁড়াতেই হবে। একটা চিঠি লিখে চলে গেলেই হলো নাকি? আজান তার পুলিশ বন্ধুকে বিষয়টা জানিয়েছে। সে বলেছে চব্বিশ ঘণ্টা গেলে থানায় মিসিং ডায়েরি করাতে। মেয়েটাকে খুঁজে বের করতে যদি পুলিশের সাহায্য নিতে হয় আজান সেটাও নিবে। তার বন্ধু তটিনীর একটা ছবিও ওকে দিতে বলেছে। কিন্তু আজানের কাছে মেয়েটার কোন ছবি নেই। আজান কতক্ষণ কপাল চেপে ধরে বসে থাকার পর তার মনে পড়ল, তটিনী তো ইরিনের বিয়েতে গিয়েছিল। ওখানে গিয়ে নিশ্চয় পেখম দৃষ্টিদের সাথে ছবি তুলেছে। আজান পেখমকে কল করল। রিং হচ্ছে কিন্তু পেখম কল তুলছে না।
এদিকে পেখম আজানের কল দেখেও ইচ্ছে করেই তুলছে না। ওই বাড়ির কারোর সাথে সে কথা বলতে চায় না। উপায় না পেয়ে আজান দৃষ্টিকে কল করল। দৃষ্টি অবশ্য সাথে সাথেই কল তুলেছে।
-আজান ভাই নাকি! ভুলে কল দিয়ে ফেলেছ? তোমার বোন তো একজনই। পেখম রানী।
আজান ওসব কথায় গেল না। ব্যস্ত গলায় সে জিজ্ঞেস করল,
-তোরা ইরিনের বিয়েতে গিয়ে ছবি তুলেছিলি?
-ছবি তুলে গ্যালারি ভরে ফেলেছি। কিন্তু তুমি তো আমাদের সাথে ছবি তুলোনি।
-ফুলও তোদের সাথে ছবি তুলেছে?
দৃষ্টির একটু সন্দেহ হলো। আজান ভাই ফুলের ছবি দিয়ে কী করবে?
-হ্যাঁ তুলেছে।
-আমাকে ওর কয়েকটা ছবি দে।
দৃষ্টি এবার বুঝলো। হাসি চেপে বলল,
-ফুলের ছবি দিয়ে তুমি কী করবে?
আজান না লুকিয়ে বলল,
-ফুল কোথাও চলে গেছে। না মানে, হারিয়ে গেছে।
কথাটা শুনে দৃষ্টি চেঁচিয়ে উঠল,
-কী বলো! ফুল সত্যি সত্যি হারিয়ে গেছে? কখন? কীভাবে?
-কখন, কীভাবে, কোথায় হারিয়েছে এসব জানতে চাস? নাকি ওকে খুঁজে পেতে চাস?
-খুঁজে পেতে চাই।
-তাহলে ছবি দে।
দৃষ্টি আর কথা বাড়াল না। হোয়াটসঅ্যাপে তটিনীর অনেকগুলো ছবি পাঠিয়ে দিল। ছবি পাঠিয়েই দৃষ্টি পেখমের ঘরে ছুটলো। পেখম যখন জানল তটিনী হারিয়ে গেছে তখন সে নিজেই আজানকে কল করল।
****
প্রিয়া রিকশার অপেক্ষায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। তখনই তার সামনে ইলহামের গাড়ি থামল। প্রিয়ার বিরক্তির শেষ রইল না। ইলহাম গাড়ি থেকে নামার আগেই প্রিয়া হাঁটা ধরল। ইলহাম পেছন থেকে দৌড়ে এসে প্রিয়ার সাথে দাঁড়াল। প্রিয়া রাগী গলায় বলল,
-পথ ছাড়ুন।
-ছাড়ব। যদি তুমি আমার সাথে আসো।
প্রিয়া কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে। এই লোক আপনি থেকে তুমিতে নেমে এসেছে।
-আমি আপনার সাথে যাব না।
-তাহলে আমিও পথ ছাড়ব না।
-আমি কিন্তু চেঁচাব।
-আমিও মানুষকে বলব তুমি আমার বউ।
-উফ অসহ্য।
ইলহাম হেসে বলল,
-এই অসহ্য বান্দাকেই সারাজীবন সহ্য করতে হবে।
এই লোক শুধু অসহ্যই না ঘাড়ত্যাড়াও। প্রিয়া গাড়িতে এসে বসলে ইলহাম নিজের সিট বেল্ট লাগিয়ে প্রিয়ার সিট বেল্টও লাগিয়ে দিয়ে বলল,
-তুমি আমার উপর এত কেন রেগে আছো?
-আপনি জানেন না কেন রেগে আছি?
-জানি। কিন্তু তোমার রাগের যুক্তিক কারণ খুঁজে পাচ্ছি না। আমি তোমাকে ভালোবাসি। তুমিও মনে মনে আমাকে ভালোবাসো। আমাদের পরিবারও আমাদের ভালোবাসা মেনে নিয়েছে। তোমার হাতের আঙুলে আমার নামের আংটি উঠেছে। তারপরও তুমি কেন আমার সাথে এরকম আচরণ করছো? আমাদের মধ্যে আসলে সমস্যাটা কী?
সত্যিই তো। এই প্রশ্নের উত্তর কি তার নিজের কাছেও আছে? কেন সে এই লোকের সাথে খারাপ ব্যাবহার করছে? সে তো লোকটাকে ভালোবাসে। তার ভয় ছিল ইলহামের বাবা মা মানবে না৷ কিন্তু উনারা তো খুব সহজেই মেনে নিয়েছেন। তাহলে সে কেন মানতে পারছে না? প্রিয়া একটু নরম হলো। জিজ্ঞেস করল,
-এখন আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?
ইলহাম নিঃশব্দে হাসল। গাড়ি ঘোরাতে ঘোরাতে বলল,
-ডেটে।
প্রিয়া চোখ বড় বড় করে ইলহামের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল,
-আপনার ডিউটি নেই?
-হবু বউয়ের সাথে একান্তে সময় কাটানোর জন্য ছুটি নিয়েছি।
-আপনি জানতেন আমি আপনার সাথে যাব?
ইলহাম চোখ টিপ দিয়ে বলল,
-যাচ্ছ তো।
****
পেখম তার মা'র সাথে কথা বলে না। মা কল দিলেও ধরে না। অবশেষে উপায় না পেয়ে জেসমিন তাওয়াফের ফোনে কল দিয়ে মেয়ের সাথে কথা বলিয়ে দিতে বলেছে। তাওয়াফ পেখমের দিকে ফোন বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
-কথা বল।
পেখম তাওয়াফের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
-কে?
-কথা বলে দেখ কে।
-না, আপনি আগে বলুন।
এই মেয়ের জেদের সাথে পেরে না উঠে তাওয়াফ জানাল। পেখম চোখমুখ শক্ত করে বলল,
-আপনার শাশুড়ির সাথে আপনিই কথা বলুন। আমি কারো সাথে কথা বলতে পারব না।
-পেখম ছেলেমানুষি জেদ বাদ দিয়ে মেজো মা'র সাথে কথা বল।
তাওয়াফ ভাই শুধু তার জেদ দেখছে। তার কষ্ট কি দেখতে পারছে না? মা কে ওই লোকটার কাছে ফিরে গেছে? পেখম এবার কেঁদে ফেলল।
-আপনিও আমাকে বুঝেন না। আমার মা-ও আমাকে বুঝেনি। কেউ আমাকে বুঝে না। সবাই শুধু আমার জেদ দেখে। আমার কষ্ট কেউ দেখে না।
পেখম দু'হাতে মুখ চেপে ধরে কাঁদছে। তাওয়াফ ছোট্ট একটা দম ফেলল। পেখম তুলে দাঁড় করাল। মুখের উপর থেকে হাত সরিয়ে চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল,
-তোকে আমি বুঝি না?
পেখম অশ্রুসজল চোখে তাওয়াফের দিকে তাকিয়ে অভিমানী সুরে বলল,
-বুঝেন না-ই তো।
তাওয়াফ পেখমের মাথা নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে ধরে বলল,
-তুই সবকিছু কঠিন করে নিচ্ছিস। একটু সহজ ভাবে নে তাহলেই তোর অর্ধেক কষ্ট কমে যাবে।
পেখম নাক টেনে বলল,
-কীভাবে সহজভাবে নিব?
-তুই আমার কাছে আছিস৷ আমি তোর কাছে আছি। তারপর কে কার কাছে থাকল এসব দেখে তোর কাজ কী?
-আমার বাবা আমার মাকে ধোঁকা দিয়েছে। দ্বিতীয় বিয়ে করেছে। তারপরও মাকে আমি ওই লোকের সাথে থাকতে দিব?
-স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক এমন একটা সম্পর্ক চাইলেও এই সম্পর্ক সহজে ভেঙে দেওয়া যায় না। মানুষের অনেক দোষগুণ থাকে৷ কেউ কেউ সম্পর্ক ভেঙে দিতে পারলেও অধিকাংশ নারীরাই সেসব মেনে নিয়ে সংসার করে যায়। মেজোমা যদি তোর বাবার সাথে থাকতে চায় আমরা কি জোর করে উনাকে নিয়ে আসতে পারব? আমাদের দাদাও তো দুই বিয়ে করেছিল। আমার দাদী কি দাদাকে ছেড়ে দিতে পেরেছে?
-পুরুষ মানুষ এমন কেন তাওয়াফ ভাই? এরা দুই বিয়ে কেন করে? এক নারীকে ভালোবেসে কেন তার সাথে জীবন কাটাতে পারে না?
তাওয়াফ হাসল। হেসে বলল,
-তোর স্বামী কিন্তু পারবে। এক নারীকে নিয়েই তার জীবন কেটে যাবে।
****
ইলহামের বিয়ের আগে নূর জাহান আকৃতির বিয়ে দিতে চান। আকৃতি ইলহামের বড়৷ ঘরে বিবাহযোগ্য বড় মেয়েকে রেখে ছোট ছেলের বিয়ে করালে লোকে নানান কথা বলবে৷ এই কথা আকৃতির কানে এলে সে নিজেকে ঘরবন্দী করে নিল। এখন কি সে তার ভাইয়ের খুশির মাঝে বাধা হচ্ছে? সে কালো, দেখতে ভালো না এসব তো তার দোষ হতে পারে না। মানুষ কেন শারীরিক সৌন্দর্যকে এত প্রাধান্য দেয়? আকৃতি কষ্ট পেলেও কখনোই কাউকে বুঝতে দেয় না। এবারও দিল না। কয়েকদিন পর ঠিকই তাকে দেখতে মানুষ এলো। রিজেক্ট হবে জেনেও আকৃতি প্রতিবারের মতো পাত্র পক্ষের সামনে গেল। পাত্র পক্ষের তাকে পছন্দ হয়েছে। ছেলের বয়স একটু বেশি। তাতে কী? ছেলের ভালো চাকরির কাছে বয়স চাপা পড়ে গেল। তাওয়াফের এই পাত্র পছন্দ হয়নি। লোকটা আকৃতির থেকে অনেক বড়। তাওয়াফ বাবা মাকে জানিয়ে দিয়েছে এখানে বিয়ে হবে না। বাবা মা-ও ছেলের কথার উপর গেল না। সবাইকে অবাক করে দিয়ে আকৃতি জানাল, পাত্রকে তার পছন্দ হয়েছে। সে এখানেই বিয়ে করবে।
তাওয়াফ নিজের সিদ্ধান্ত জানিয়ে বলল,
-তোর পছন্দ হলেও আমার হয়নি। তাই এখানে বিয়ে হবে না।
আকৃতি কখনও ভাইয়ের সাথে কথা উল্টায় না৷ তবে আজ উলটাল।
-কেন পছন্দ হয়নি তোমার? তোমার বোনকেও তো দেখতে হবে। সে তো আর বিশ্ব সুন্দরী না যে তুমি তার জন্য রাজপুত্র খুঁজে আনবে।
বোনের কথা শুনে তাওয়াফ শান্ত কন্ঠে বলল,
-আমি আমার বোনের জন্য রাজপুত্রই খুঁজে আনব।
আকৃতি এবার ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেলল। কাঁদতে কাঁদতে বলল,
-অসুন্দর মানুষের জন্য কখনও রাজপুত্ররা আসে না। তোমার বোনদের মতো মানুষদের কেউ পছন্দ করে না। যদি করেও সেটাকেও তারা করুণা হিসেবেই দেখায়।
আকৃতি কারো দিকে তাকাল না। কারো কথা শুনলো না। ছুটে উপরে চলে গেল। রুমে এসে দরজা বন্ধ করে কান্নায় ভেঙে পড়ল।
পেখম তাওয়াফের মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারল বোনের জন্য মানুষটা কতটা কষ্ট পাচ্ছে। পেখমের খুব ইচ্ছে করছিল তাওয়াফ ভাইকে জড়িয়ে ধরে বলতে, সব ঠিক হয়ে যাবে তাওয়াফ ভাই। আমি জানি আপনি আকৃতি আপুর জন্য রাজপুত্রই খুঁজে আনবেন।
ইলহামও বুঝতে পেরেছে তার বিয়ের জন্যই দাদী আকৃতি আপুর বিয়ে দিতে এত তাড়া করছে। ইলহাম দাদীকে সহ সবাইকে রাগ দেখিয়ে বলল,
-আমার বিয়ের জন্য যদি তোমরা তাড়াহুড়ো করে আকৃতি আপুর বিয়ে যার তার সাথে দিতে চাও তাহলে আমি জীবনে বিয়েই করব না। থাকো তোমরা তোমাদের সমাজ নিয়ে। তোমাদের জন্য ভাই হয়ে আমি বোনের কষ্টের কারণ হচ্ছি।
ইলহাম রাগ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।
চলবে
ঈদ উপলক্ষে প্রমো কোড (HAMBA10) ব্যবহার করে ১০% ছাড়ে ই-বুক গুলো পড়তে পারবেন।
আমারো পরানো যাহা চায়
https://link.boitoi.com.bd/4agz
প্রিয়তী
https://link.boitoi.com.bd/fbKq
মেঘে রোদে কাছাকাছি
https://link.boitoi.com.bd/BHed
সুখপাখি
https://link.boitoi.com.bd/TfUq
পথে হলো দেখা
https://link.boitoi.com.bd/CYTN