#তুমি_আসবে_বলে_বসন্ত_এসেছে '৬৪'
#জেরিন_আক্তার_নিপা
তাওয়াফ সত্যিই তার বোনের জন্য রাজপুত্র খুঁজে এনেছে। এতদিন তারা আকৃতির জন্য যেরকম পাত্র চেয়েছিল সাব্বিরের মধ্যে সেসব গুণ আছে। ছেলেটা ভালো পজিশনের একটা জব করে। পরিবারও ভালো। সবথেকে বড়ো কথা সাব্বির নিজেই আকৃতিকে পছন্দ করেছে। তাওয়াফ অনেক খোঁজ খবর নিয়েই সাব্বিরকে তার বাবা মাকে নিয়ে আজ আসতে বলেছে। আকৃতি এই প্রথম বার কোন পাত্রের সামনে যাওয়ার জন্য না করে দিয়েছিল। সেজেগুজে মানুষের সামনে গিয়ে বসতে তার আর ভালো লাগে না। দিনশেষে সেই রিজেকশনই তো মিলবে। এই কথা শুনে তাওয়াফ নিজে এসে আকৃতিকে বুঝিয়েছে। তারপর আকৃতি রাজি হয়েছে।
পেখম তাওয়াফের পাঞ্জাবি বের করে দিল। তাওয়াফ পাঞ্জাবি নিতে নিতে পেখমের দিকে তাকিয়ে বলল,
-পড়াশোনা কি শেষ করে ফেলেছিস? তোকে তো কলেজে যেতে দেখি না।
পেখম গোমড়া মুখে বলল,
-আজ যাইনি।
তাওয়াফ পাঞ্জাবি পরতে পরতে বলল,
-আমি তো তোকে ইরিনের বিয়ে থেকে ফিরে আসার পর একদিনও কলেজে যেতে দেখিনি।
পেখম মুখে কিছু না বললেও মনে মনে বলল, আমার আর পড়াশোনা করতে ভালো লাগে না। ভালো ছাত্রী থেকে হঠাৎ খারাপ ছাত্রী হয়ে যেতে ইচ্ছে করছে। পড়াশোনা ছেড়ে ছুঁড়ে সংসার করতে মন চায়। তাওয়াফ শাসনের সুরে বলল,
-কাল থেকে একদিনও যেন তোকে কলেজ মিস দিতে না দেখি। এবারই এইচএসসি দিবি মনে আছে তো?
তাওয়াফ ভাই যখন পড়াশোনা নিয়ে জ্ঞান দেয় তখন পেখমের কাছে মানুষটাকে অসহ্য লাগে। আগেও এমন করত। দেখা হলেই পড়াশোনা নিয়ে জ্ঞান দিত। এখনও এমন করে। পেখম বেখেয়ালে বলে ফেলল,
-আমি যদি পরীক্ষায় ফেল করি।
তাওয়াফ শীতল চোখে কতক্ষণ পেখমের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
-ফেল করলে রিকশা ওয়ালার সাথে বিয়ে দিয়ে দেব।
তাওয়াফ ঘর থেকে চলে গেলেও কথাটা শুনে পেখম মুখ হা করে বসে আছে। কী বলে গেল এই লোক? পরীক্ষায় ফেল করলে নিজের বউকে রিকশা ওয়ালার সাথে বিয়ে দিয়ে দিবে!
সাব্বিরের পরিবার আকৃতিকে দেখে পছন্দ করেছে। আজই তারা আংটি পরিয়ে রেখে যেতে চায়। তাওয়াফরা আগেই খোঁজ খবর নিয়ে রেখেছে তাই তারাও আপত্তি জানাল না। সাব্বিরের মা আকৃতির হাতে আংটি পরিয়ে দিল।
আকৃতি আপুর বিয়ে ঠিক হওয়ার খুশিতে দৃষ্টি নাচানাচি শুরু করে দিলেও পেখমকে ঠান্ডা মেরে থাকতে দেখে বলল,
-তুই খুশি হোসনি?
-হয়েছি।
-তাহলে মুখটাকে এমন পেঁচার মতো বানিয়ে রেখেছিস কেন?
পেখম কীভাবে এই গাধীকে বলবে, তার বর বলেছে সে পরীক্ষায় ফেল করলে তাকে রিকশা ওয়ালার সাথে বিয়ে দিয়ে দিবে। তাওয়াফ ভাইয়ের হাসিখুশি মুখের দিকে তাকিয়ে পেখম মুখ মোচড় দিল। বিড়বিড় করে বলল,
-শয়তান লোক।
*****
তটিনীর কোন খোঁজই পাওয়া যাচ্ছে না। মেয়েটা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। আজান তটিনীর লেখা চিঠিটা হাতে নিয়ে বসে আছে। চিঠির লেখাগুলো কতবার পড়ে ফেলেছে হিসেব নেই৷ আজানের সেই পুলিশ বন্ধু কল দিয়েছে।
-দোস্ত আমি প্রতিটা থানায় ওই মেয়ের ছবি পাঠিয়ে দিয়েছি। আশা রাখতে পারিস দুই তিন দিনের ভেতরেই মেয়েটার খোঁজ পাওয়া যাবে।
আজান বন্ধুর কথায় স্বস্তি পায়। তার বন্ধু জানতে চায়,
-মেয়েটাকে খুঁজে বের করার জন্য তুই এতটা মরিয়া হয়ে উঠেছিস। বন্ধু হয়ে আমি জিজ্ঞেস করতেই পারি তুই মেয়ে তোর কে হয়?
আজান হাতে ধরা চিঠিটার দিকে তাকিয়ে ছোট্ট একটা দম ফেলে বলে,
-ওই মেয়ে না বলে ভাবী ডাক।
-বলিস কী শালা! এইটা আমাদের ভাবী!
-হুম।
-আগে বলবি না শালা। এখন তো ছাঁকনি দিয়ে ফেকে হলেও ভাবীকে খুঁজে বের করতে হবে।
*****
ডান হাতের অনামিকা আঙুলে স্বর্ণের আংটিটা জ্বলজ্বল করছে। সেদিকে তাকিয়ে থেকে আকৃতি হু হু করে কেঁদে উঠল। আকৃতির কান্না দেখে সবাই ভাবল বিয়ে ঠিক হয়ে যাওয়ায় হয়তো মেয়েটা কাঁদছে। মেহমানরা চলে গেলে তাওয়াফও বেরিয়েছিল। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে সে দেখল সবাই আকৃতির ঘরে। আকৃতি তখনও কেঁদেই যাচ্ছে। তাওয়াফকে দেখে পেখম অসহায় মুখে বলল,
-আকৃতি আপু দুপুর থেকে কেঁদে যাচ্ছে। কিছুতেই কান্না থামছে না। আপনি কিছু করুন না তাওয়াফ ভাই।
বোনের কান্না দেখে তাওয়াফের বুকের ভেতর ভাংচুর শুরু হয়ে গেল। বিয়ে ঠিক হয়েছে আকৃতি কি শুধু এজন্য কাঁদছে? কিন্তু ওর কান্নার ধরণ তো এটা বলছে না। আকৃতির চেহারায় প্রিয় কোন মানুষকে হারানোর বেদনা দেখতে পাচ্ছে তাওয়াফ। সে বোনের সাথে একা কথা বলবে বলে ঘর থেকে সবাইকে বের করে দিল। আকৃতি ভাইয়ের দিকে তাকাচ্ছে না। হেঁচকি তুলে তখনও কেঁদেই যাচ্ছে। তাওয়াফ বোনের পাশে বসল। নরম গলায় জিজ্ঞেস করল,
-কেন কাঁদছিস আকৃতি?
আকৃতির কান্নার বেগ আরও বাড়ল।
-আমাকে বলবি না? ভাইকে না তুই সবার থেকে বেশি বিশ্বাস করিস। ভরসা নেই আমার উপর?
আকৃতি ফোঁপাতে ফোঁপাতে ভাইয়ের দিকে তাকাল। ভাইকেই বলতে পারবে সে। অন্য কাউকে না।
-এই বিয়েতে কি তুই খুশি না? তোর জীবনে অন্য কেউ আছে? আমাকে বল তুই। যে বিয়েতে তুই খুশি না ওই বিয়ে আমি কোন অবস্থাতেই হতে দেব না। সমাজ কী বলল তার পরোয়া তোর ভাই করে না। তোর খুশি আমার কাছে সবার উপরে।
-আমি এখন বিয়ে করতে চাই না ভাইয়া।
-করতে হবেও না। তুই যা বলবি তা-ই হবে।
-সত্যি বলছো?
-বিশ্বাস নেই আমার উপর?
-আছে।
তাওয়াফ আকৃতির মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
-আমাকে শুধু একটা কথা বল তুই কেন বিয়ে করতে চাস না। আমি তোকে চাপ দিচ্ছি না। কিন্তু ভাইয়ের সাথে তো তুই সব শেয়ার করিস তাই না!
আকৃতি ফোলে যাওয়া লাল চোখে ভাইয়ের দিকে তাকাল। ফোঁপাতে ফোঁপাতেই বলল,
-একটা ছেলে৷ আমার সাথেই পড়ত। ও আমাকে পছন্দ করত। কিন্তু আমি ওকে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম।
-কেন? ছেলেটাকে তোর পছন্দ না?
-আমি কাউকে পছন্দ করতে ভয় পাই।
-এটা কেমন পাগলামি কথা। ভয় কেন পাবি?
-আমি তো অন্যান্য মেয়েদের মতো সুন্দর না। আমি দেখতে ভালো না, কালো, সবসময় অসুস্থ থাকি। আমাকে কেউ কেন পছন্দ করবে?
তাওয়াফ বোনের দুই হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিল।
-বুকের ভেতর তোর যে মনটা আছে, মানুষ তোকে তোর ওই মনের জন্য পছন্দ করবে। আমার বোনের মতো সুন্দর মনের অধিকারী কয়জন হতে পেরেছে? তুই আমাকে ওই ছেলের নাম বল। ঠিকানা আমি বের করে নিব।
আকৃতি অবাক নয়নে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
-ঠিকানা বের করে তুমি কী করবে?
-ছেলেটাকে জানাব সে কতটা ভাগ্যবান। কারণ আমার বোনও তাকে পছন্দ করে।
-না ভাইয়া।
-না কেন? ওই ছেলেকে তুই পছন্দ করিস না?
-করি। কিন্তু ওরা আমাদের সমান না ভাইয়া। আমাদের পরিবারের সাথে ওদের পরিবার,,,
আকৃতিকে কথা শেষ করতে না দিয়ে তাওয়াফ এবার একটু শক্ত গলায় বলল,
-আর একটা কথাও না। অনেক বড় হয়ে গেছিস, না! এখন যা করার তোর ভাই বুঝে নিবে। ওই ছেলে যদি সত্যিকারেই তোকে ভালোবাসে তাহলে আমি তার অবস্থান দেখব না। কারোর অনুমতির অপেক্ষাও করব না।আমি নিজে তোকে ওই ছেলের হাতে তুলে দেব।
তাওয়াফ ঘর থেকে বেরিয়ে এলে সবাই জিজ্ঞেস করতে লাগল আকৃতি কী বলেছে। তাওয়াফ কারো প্রশ্নের জবাব না দিয়ে ঘরে চলে এলো। পেখমও পেছন পেছন দৌড়ে এসেছে। দরজার সামনে থেকেই বলল,
-আকৃতি আপু কী বলেছে?
তাওয়াফ ঘাড় ঘুরিয়ে পেখমের দিকে তাকাল। পেখম এসে তাওয়াফের পেছনে দাঁড়িয়েছে।
-আকৃতি আপু কি বিয়ে করবে না?
-করবে।
-তাহলে এত কেন কাঁদছে?
-তোর বিয়েতে তুই কাঁদিসনি বলে কি বাকিরাও কাঁদবে না?
পেখম মুখ বাঁকাল। এই লোক এক কথা নিয়ে আর কত তাকে খোঁটা দিবে? বিয়েতে না কেঁদে সে যেন অপরাধ করে ফেলেছে। এই খোঁটা আর সহ্য করা যাচ্ছে না। পেখম বলল,
-আপনি আবার আমাকে বিয়ে করুন তখন দেখবেন আমি কত কাঁদতে পারি। কেঁদেকেটে আমার চোখের পানি দিয়ে যদি বন্যা না বানিয়ে ফেলেছি তাহলে আমার নামও পেখম না।
তাওয়াফ পেখমকে রাগতে দেখে ঠোঁট কামড়ে হাসল।
-তোর নাম তো পুনম। পেখম কে?
দূর অসহ্য! পেখম রাগ করে আর কোন কথাই বলল না। তাওয়াফ একটু আগেই এসেছে। এখন আবার বেরোচ্ছে দেখে পেখম জিজ্ঞেস করল,
-আবার বেরোচ্ছেন?
-হুম।
-একটু আগেই তো এসেছেন। এখন আবার কোথায় যাবেন?
পেখমের এই বউ রুপে অধিকার খাটানো দেখে তাওয়াফ মনে মনে এনজয় করে।
-তুই কি চাস আমি বউয়ের আঁচল ধরে সারাদিন ঘরে বসে থাকি?
লোকটা ইদানিং সোজা কথা বলা যেন ভুলেই গেছে। সব কথার ত্যাড়া উত্তর দিবে।
-আপনার বউ শাড়ি পরে না। আঁচল পাবেন কোথায়?
তাওয়াফ দুই কদম এগিয়ে পেখমের অনেকটা কাছাকাছি এসে বলল,
-কেন পরিস না? স্বামীকে আঁচলে বেঁধে রাখতে চাস না?
পেখম কেমন যেন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। আর কোন কথাই মুখ দিয়ে বের করতে পারল না।
চলবে