ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি আসবে বলে বসন্ত এসেছে

৭০তম পর্ব

লেখক: জেরিন আক্তার নিপা

#তুমি_আসবে_বলে_বসন্ত_এসেছে '৭০'

#জেরিন_আক্তার_নিপা

মানুষ গুলোর মুখে একসাথে সুখ আর বিষাদের ছায়া ফোটে উঠেছে। একদিকে নতুন বউকে ঘরে তোলার আনন্দ, অন্যদিকে নিজের মেয়েকে বিদায় দেওয়ার ভারাক্রান্ত অনুভূতি। দুটোই একসাথে কাঁপিয়ে দিচ্ছে সবার মন। আকৃতি মাকে ধরে খুব কাঁদল। তবে আজ পেখম, দৃষ্টি কাঁদছে না। কারণ তারা জানে আপু আজ তার ভালোবাসার মানুষকে পেয়েছে। সেটা বুঝেই হয়তো তাদের চোখে জল আসেনি। কিন্তু বুকটা ঠিকই ভার হয়ে আছে। ইলহাম নিজেও কতক্ষণ আকৃতিকে নানা কথা বলে হাসানোর চেষ্টা করল। একসাথে দুই বিয়ের আনন্দে ভুলেই গিয়েছিল বোনটা যে অন্যের বাড়ি চলে যাবে। তাওয়াফ অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছে। তার চোখের পানি কাউকে দেখাতে চাচ্ছে না। বোনকে গাড়িতে তুলে দিতে গিয়ে বারবার চোখের কোণ মুছছে সে। আকৃতি ভাইকে ধরেও অনেকক্ষণ কাঁদল। তাওয়াফ ভাঙা গলায় বলল,

-কাঁদছিস কেন পাগল? তোর ভাই সবসময় তোর মাথার উপর ছায়া হয়ে থাকবে। তুই শুধু প্রয়োজনের সময় তোর ভাইকে একটু জানাস।

বরের গাড়ি ছেড়ে দিলে পেখম এসে তাওয়াফের পাশে দাঁড়াল। আলতো করে তাওয়াফের হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে নিল।

এক মেয়েকে বিদায় দিয়ে আরেক মেয়েকে ঘরে তোলার তৈয়ারি চলছে। পেখমের পরিবার এখান থেকেই চলে যাবে। তারা আর তাওয়াফদের বাড়িতে যাবে না। মা দাদী সবাইকে বিদায় দিয়ে পেখমরা প্রিয়াকে নিয়ে বাড়ি চলে এলো। বাড়ি এলে কী হবে? ইলহাম নিজের বউয়ের কাছে যাওয়া তো দূর তার রুমের আশপাশ দিয়েও যেতে পারছে না। সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে ড্রয়িংরুমেই বসে রইল। তাওয়াফ রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে ইলহামের পাশে এসে বসল। ইলহাম ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

-তুমি ভাই সবদিক দিয়ে বেঁচে গেছো। বিয়ে যে কী প্যারা নিজে করে বুঝতে পারছি।

তাওয়াফ হাসল। মনে মনে বলল, এই প্যারা আমাকেও ছাড়বে না রে। বউয়ের শখ পূরণ করতে দ্বিতীয় বার আমাকে বেল তলায় যেতে হবে।

দৃষ্টি এসে বলল,

-ইলহাম ভাই চলো।

ইলহাম আগের মতোই শুয়ে থেকে বলল,

-কষ্ট লাগছে। পারব না।

দৃষ্টি ইলহামের হাত ধরে টেনে তুলতে তুলতে বলল,

-ঢং কোরো না তো। তোমার ঢং দেখার সময় নেই।

ঘরের সামনে দুই ডাকাত ফিতা বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। ইলহাম ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,

-এসব কী?

পেখম কেঁচি হাতে দাঁড়িয়ে বলল,

-এই ফিতা কেটে তোমাকে ভেতরে যেতে হবে।

-কেঁচি দে কাটি।

দৃষ্টি বলল,

-উঁহু। এত সহজে তো হবে না। টাকা বের করো আগে।

ইলহাম আকাশ থেকে পড়ে বলল,

-কিসের টাকা!

পেখম দু-হাত কোমরে রেখে বলল,

-কিসের টাকা মানে? গেটে এক টাকাও দিয়েছ?

-গেটে টাকা কেন দিব? আর তোরা নিজেরাও তো বরযাত্রী।

-তখন ছিলাম। কিন্তু এখন আমরা প্রিয়া আপুর বোন। বোনেরা গেট আটকায়, বরের হাত ধোয়ায়, জুতা চুরি করে। তুমি তো সবকিছু থেকে বেঁচে গেলে। তাই এখন টাকা দিতে হবে।

ইলহাম শুধু নিজের পল্টিবাজ দুই বোনকে দেখছে। এরা মানুষ! না, এরা হলো গিরগিটি।

-কত টাকা চাস?

পেখম দৃষ্টি দু'জনের চোখ চকচক করে উঠল। দু'জন একসাথে বলল,

-দশ।

-দশ টাকা?

-হাজার।

ইলহাম চেঁচিয়ে উঠে বলল,

-ওরে ডাকাতের ঘরের ডাকাতরা। নিজের ঘরে যেতে এখন তোদেরকে আমার দশ হাজার টাকা দিতে হবে!

-দু'জনকে দশ হাজার না। একজনকে দশ হাজার করে দু'জনকে বিশ।

ইলহাম হতভম্ব হয়ে কতক্ষণ এদের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,

-পাগল আমি? খেয়েদেয়ে তো কাজ নেই আমার। যা ভাগ এখান থেকে। দশ দশ করে বিশ! টেকা তো গাছে ধরে।

দৃষ্টি মুখ বাঁকিয়ে বলল,

-ছি ইলহাম ভাই, ছি! তুমি এত কিপ্টা! তোমার কি টাকার অভাব আছে?

-না অভাব নেই আমার টাকায় ছিনিমিনি খেলে।

পেখম বলল,

-খেলেই তো। তুমি ডাক্তার মানুষ।

-ওরে বোকার ছাওয়েরা ডাক্তারদের তোরা যতটা ধনী মনে করিস আমি এখনও ততটা ধনী হতে পারিনি। তুই কেন আমার সাথে এমন করছিস বোন? তোর জামাইয়ের তো আমার থেকেও বেশি টাকাপয়সা আছে। তুই আগে ওগুলো খেয়ে শেষ কর না।

পেখম টেনে টেনে সুর করে বলল,

-জামাইয়ের টাকা খরচ করতে মায়া লাগে গো।

-আর ভাইয়ের সাথে ডাকাতি করতে মায়া লাগে না?

দৃষ্টি বিরক্ত হয়ে বলল,

-দূর এত কথা না বলে দিয়ে দিলেই তো পারো।

পেখম প্রিয়াকে ডেকে বলল,

-নতুন ভাবী তুমি তোমার কিপ্টা জামাইকে কিছু বলো।

প্রিয়া ভেতর থেকে বলল,

-ওগো ওরা যা চাইছে দিয়ে দাও না।

ইলহাম এক ওগো ডাকেই গলে পানি হয়ে গেল। ক্যাশ না পেলেও কার্ড হাতিয়ে নিল। দৃষ্টির আর শরীর চলছে না।

-আমি ঘরে যাই বোন। ঘুম না দিলে আমাকে আর পাওয়া যাবে না।

পেখমও রুমে চলে এসেছে। ক্লান্তিতে তারও শরীর ভেঙে আসছে। পেখম ঘরে ঢোকা মাত্রই তাওয়াফ পেছনে থেকে দরজা বন্ধ করে দিল। শব্দ পেয়ে পেখম চমকে তাকাল। এই অসভ্য লোকের কথা তো তার মনেই ছিল না। আজ সারাদিন তাওয়াফ ভাইকে প্রচুর জ্বালিয়েছে। খুব বুঝতে পারছে এই লোক এখন শোধ নেবে। তাওয়াফ ভাইকে তার দিকে এগিয়ে আসতে দেখে পেখম তাড়াহুড়ো করে ওয়াশরুমে ঢুকে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু তার আগেই তাওয়াফ এগিয়ে এসে পেখমের হাত ধরে ফেলল। পেখমকে কাছে টেনে এনে হাত পেছনের দিকে নিয়ে কোমরের সাথে চেপে ধরল। পেখম তাওয়াফের চোখের দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলল,

-তাওয়াফ ভাই,,,

-বরকে ভাই ডেকে পাপ কামাই করিস না।

পেখমের বুক জোরে জোরে ধুকপুক করছে। তাওয়াফ ভাইয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারল না সে। পেখমের মুখের উপর চলে আসা বেবি হেয়ার গুলো সরিয়ে দিয়ে ওর কানের কাছে মুখ এনে ঘোর লাগানো ক্ষীণ গলায় ফিসফিস করে বলল,

-আজ অনুমতি দিবি পুনম?

পেখমের বক্ষপিঞ্জর কেঁপে উঠল।হৃদপিণ্ড ধড়াম ধড়াম করে বাড়ি খাচ্ছে। তাওয়াফ অবশ্য অনুমতির অপেক্ষা করেনি। পেখমের কানের লতিতে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়েছে সে। পেখম এই লোককে বাধা দেওয়ার শক্তি হারিয়ে ফেলছে। সে নিজেও তাওয়াফ ভাইয়ের অনুরোধে সাড়া দিতে চাচ্ছে। তাওয়াফ ভাইয়ের প্রতিটা ছোঁয়া তাকে পাগল করে দিচ্ছে। পেখমের পা কাঁপছে। সে দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে তাওয়াফের উপর ভর ছেড়ে দিল। তাওয়াফ পেখমকে কোলে তুলে নিয়ে পেখমের চোখের দিকে তাকাল। পেখমের চোখের ভাষা বুঝতে পেরে তাওয়াফ মুচকি হাসল।

পেখম লজ্জা পেয়ে তাওয়াফের গলা জড়িয়ে ধরল। যা হচ্ছে হতে দিবে সে। তাওয়াফ পেখমের কানে কানে বলল,

-আজকে আপনার লজ্জারা পালানোর পথ খুঁজবে মিসেস তাওয়াফ।

পেখম লজ্জা পেয়ে তাওয়াফের বুকে মুখ লুকালো। তাওয়াফ পেখমকে বেডে এনে বসিয়ে দিয়েছে। পেখমের কপালে গভীরভাবে চুমু খেলো। মানুষটার ঠোঁটের উষ্ণ স্পর্শে পেখমের নিঃশ্বাস আটকে এলো। হাত-পা থরথর করে কাঁপছে। অস্ফুটস্বরে সে ডাকল,

-তাওয়াফ ভাই!

-আজ বাধা দিস না প্লিজ।

পেখম ঘনঘন নিঃশ্বাস নিচ্ছে। তাওয়াফ ভাই আজ থামবে না সে-ও বুঝতে পারছে। তবে তার যে ভীষণ ভয় লাগছে। মনে হচ্ছে এক্ষুনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে। তাওয়াফ পেখমের খুব কাছাকাছি চলে এলে পেখম চোখ বন্ধ করে নিল। তাওয়াফ ঠোঁট কামড়ে হেসে পেখমের চোখের পাতায় চুমু খেলো। চোখের পাতা থেকে নাকের ডগায় আলতো করে কামড় বসাক। পেখম খিঁচে চোখ বুঁজে আছে। এই মেয়ে কি এভাবেই থাকবে? তাকাবে না তার দিকে! তাওয়াফ ধীরে ধীরে পেখমের তিরতির করে কাঁপতে থাকা ঠোঁট জোড়ার দিকে এগোচ্ছে। এমন সময় নিচে থেকে পেখমের বড় আব্বুর গলা শোনা গেল। বড় আব্বুর গলা পেয়েই পেখম চোখ খুলে তড়াক করে উঠে বসল। চঞ্চল চোখজোড়া তাওয়াফের মুখের দিকে স্থির হলো। তাওয়াফ নিজেও স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। হারিশ মির্জার গলার সাথে সাথে এবার তাওয়াফের বাবার গলাও শোনা গেল।

-পেখম। পেখম মা নিচে আয়।

তার বাবা চাচাদের টাইমিং এর উপর তাওয়াফের হাততালি দিতে ইচ্ছে করছে। পেখম তাওয়াফকে রেখেই উঠে পড়ল। ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগেও একবার ফিরে তাওয়াফকে দেখল। তাওয়াফ নিজের কপালের উপর হাসছে। পেখম বড় আব্বুকে দেখে সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে নামছে।

-এত রাতে তুমি কেন এসেছ বড় আব্বু? বাড়িতে কি কারো কিছু হয়েছে?

হারিশ মির্জা পেখমের মাথায় হাত রেখে ধীর গলায় বলল,

-তোর বাবা হাসপাতালে মা।

বাবার উপর পেখমের পাহাড় সমান অভিমান। কিন্তু বাবা হাসপাতালে শুনে সব অভিমান ভুলে গিয়ে কেঁদে উঠল,

-আমার পাপার কী হয়েছে বড় আব্বু?

-ডাক্তার বলেছে তেমন কিছু হয়নি।

-তুমি মিথ্যা বলছো। সত্যি করে বলো আমার পাপার কী হয়েছে। বলো বড় আব্বু।

-তোর বাবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে।

পেখম ডুকরে কেঁদে উঠল। কেঁদে কেঁদেই বলল,

-তুমি আমাকে পাপার কাছে নিয়ে চলো বড় আব্বু। আমি আমার পাপাকে দেখব।

তাওয়াফ ভাইকে বলে যাওয়ার কথা পেখমের মাথাতেও এলো না। সে বড় আব্বুর সাথে চলে গেল। তাওয়াফ নিচে এসে জানতে পারল তার শ্বশুর হার্ট অ্যাটাক করে হাসপাতালে ভর্তি। দুঃখের চোটে মনে মনে হাসল সে। বাবা তাকে হাসপাতালে যাওয়ার কথা বললে তাওয়াফ বলল,

-শ্বশুর আব্বা এখনও বেঁচে আছে। আমাকে চোখের সামনে দেখলে সেটাও থাকবে না। হার্ট অ্যাটাক আরেকটা হয়ে যাবে।

হাসপাতালে এসে বাবাকে দেখার জন্য পেখম পাগল হয়ে গেছে। কিন্তু ডাক্তাররা এখন কারো সাথেই দেখা করতে দিচ্ছে না। পেখমের মা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠল।

-আমার জন্য এসব হয়েছে। আকৃতি ইলহামের বিয়েতে যায়নি বলে আমি তোর বাবাকে অনেক কথা শুনিয়েছি। তখন থেকেই মনে হয় বুকে ব্যথা শুরু হয়েছে। আমাকে বলেনি।

পেখম মাকে সান্ত্বনা দিতে পারছে না। নিজেও কাঁদছে সে। রাতেই তাওয়াফের বাবা চাচা হাসপাতালে এসেছেন। বাবা চাচা এলেও তাওয়াফ ভাই আসেনি দেখে পেখমের মন ভেঙে গেল। তাওয়াফ ভাই কি তার উপর রাগ করে আসেনি? তাওয়াফ রাতে না এলেও পরের দিন সকালে ঠিকই এসেছে। পেখম মানুষটার দিকে তাকাতে পারল না। তাওয়াফ পেখমের কাছে এসে বলল,

-এখন বাড়ি চল পরে আবার আসিস।

পেখম ঠোঁট ভেঙে কেঁদে উঠে বলল,

-আপনি আমার উপর রাগ করেছেন তাই না?

বোঝাই যাচ্ছে এই মেয়ে রাতে একফোঁটাও ঘুমায়নি। চোখ লাল হয়ে আছে। তাওয়াফ পেখমকে টেনে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল,

-না। তোর বাবা অসুস্থ। আমি নিজেই তোকে নিয়ে আসতাম।

-আমি আপনাকে না বলেই চলে এসেছি। আপনি রাগ করেননি?

-তখন একটু করেছিলাম। কিন্তু এখন তোর কান্না দেখে রাগ উড়ে গেছে।

-আমার পাপা ঠিক হয়ে যাবে তো তাওয়াফ ভাই?

তাওয়াফ এখনও বুঝতে পারছে না পল্লব মির্জা সত্যিই অসুস্থ কি-না। শ্বশুরের সম্পর্কে এরকম ধারণা রাখা ঠিক না। তবে তার মনে হচ্ছে এটা শ্বশুর মশাইয়ের প্ল্যানেরই একটা অংশ। তারপরও পেখমের মাথায় হাত রেখে বলল,

-ইন-শা-আল্লাহ ঠিক হয়ে যাবে।

তাওয়াফ পেখমকে বাড়ি নিয়ে যাবে সেসময় জানা গেল পল্লব মির্জার জ্ঞান ফিরেছে। এটা শুনেই পেখম বাবার সাথে দেখা করতে চলে গেল। তাওয়াফ ফোঁস করে দম ফেলল। তার মন একশো পার্সেন্ট গ্যারান্টি দিয়ে বলছে মেয়েকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য এটা শ্বশুর আব্বার চাল। এখন দেখা যাক তার ধারণা কতটা সঠিক হয়।

চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন