#তুমি_আসবে_বলে_বসন্ত_এসেছে '৭৩'
#জেরিন_আক্তার_নিপা
আজান তটিনী কবুল বলার মুহূর্তে তাওয়াফ পেখম হাজির হলো। ইলহাম ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। তাওয়াফ তা দেখেও দেখছে না। প্রিয়া ইলহামের হাতে চিমটি কেটে বলল,
-এরকম ভ্যাবলার মতো হাসছেন কেন?
-আনন্দে হাসছি গো বউ।
-আপনার মতো পাগল মানুষের তো আনন্দই আনন্দ। তা হঠাৎ এত আনন্দিত হওয়ার কারণ কী?
-চাচা ডাক শুনবো গো বউ। এই ধরো আঙুলে গুনে আর নয় কিংবা দশ মাস পরেই তুমি চাচী হয়ে যাবে।
প্রিয়া চোখ বড়ো করে বলল,
-মানে!
সে পেখমের দিকে তাকাল। পেখম কি প্রেগন্যান্ট? মুহূর্তেই প্রিয়া এই খবর প্রচার করে দিল। আকৃতির কানে কানে বললে আকৃতি চেঁচিয়ে উঠল। ওর চেঁচানো শুনে সবাই তার দিকে তাকালে খুশিতে হুঁশ হারিয়ে ফেলে সকলের সামনেই বলে উঠল,
-কিহ! সত্যিই আমি ফুপু হবো?
আকৃতির পাশে প্রিয়া ছিল৷ সকলে প্রিয়ার দিকে তাকালে প্রিয়া আগেই বলে উঠল,
-আমি না পেখম।
ব্যস, কথাটা প্রিয়ার মুখ দিয়ে বের হতে দেরি হয়েছে কিন্তু সকলের বিশ্বাস করতে দেরি হয়নি। মা চাচীরা সবাই এসে পেখমকে জড়িয়ে ধরে কপালে, গালে চুমু খেতে লাগল। পেখম বোকার মতো তাওয়াফের মুখের দিকে তাকাচ্ছে। তাওয়াফ নিজেও হতভম্ব। কী হচ্ছে সে নিজেও বুঝতে পারছে না। গোলাপ জান তাওয়াফের গাল টেনে বলল,
-বাপ হইবা গো নাতজামাই। মুখে হাসি নাই কেন?
বাপ! কে বাপ হবে? তাওয়াফ কটমট চোখে ইলহামের দিকে তাকাল। এত বড় গণ্ডগোল বেঁধে যাবে ইলহাম নিজেও ভাবেনি। ভাইয়ের ভস্ম করা দৃষ্টি থেকে বাঁচতে সে বউয়ের পেছনে লুকিয়ে পড়ল। বিড়বিড় করে বলল,
-আমার বউটাকে বুদ্ধিমতী ভেবেছিলাম। কিন্তু মেয়ে মানুষ তো মেয়ে মানুষই। ভাই এখন আমাকে কাঁচা চিবিয়ে খাবে।
পেখমকে নিয়ে সবাই এতটাই মেতে উঠেছে যে পেখম বলার সুযোগটাই পাচ্ছে, এরকম কিছুই হয়নি। তোমরা সবাই ভুল ভাবছ।
এতক্ষণে খবর তাদের বাড়িতেও পৌঁছে গেছে। বাবা চাচার কল এসেছে। দাদা হওয়ার আনন্দে ভদ্রলোকেরা মিষ্টির দোকান পর্যন্ত চলে গেছে। তাওয়াফ হতাশ দম ফেলে মনে মনে বলল,
-না জানি এই ভুল বোঝাবুঝি কতদূর পর্যন্ত ছড়ায়!
তাওয়াফের সাথে পেখমের চোখাচোখি হলে পেখম চোখের ইশারায় জিজ্ঞেস করল,
-এসব কী হচ্ছে তাওয়াফ ভাই?
তাওয়াফও চোখের ইশারাতেই বেঝাল,
-আমি বাবা হচ্ছি। তুই মা হচ্ছিস।
পল্লব মির্জা যখন এ খবর জানতে পারলেন তখন তিনি স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। মেয়েকে তাওয়াফের থেকে আলাদা করতে হার্ট অ্যাটাকের নাটক সাজালেন। অথচ এখন জানতে পারছেন তিনি নানা হবেন। পল্লব মির্জা এই ধাক্কাই কাটিয়ে উঠতে পারছেন না।
পেখম চিন্তিত মুখে ঘরজুড়ে পায়চারি করছে। তাদের বাড়ির মানুষ গুলো সব পাগল হয়ে গেছে। তাওয়াফ ভাইও কেন কিছু বলল না? উনি তো বলতে পারতেন এসব সত্য না।
তাওয়াফ ইলহামের ক্লাস নিয়ে ঘরে ফিরেছে। গাধাটাকে আচ্ছা মতো দিয়েছে কয়টা। পেখম তাওয়াফকে দেখেই কাছে ছুটে গেল।
-এসব কী হচ্ছে তাওয়াফ ভাই? আপনি কেন কিছু বলেননি?
তাওয়াফ পাঞ্জাবি খুলতে খুলতে স্বাভাবিক গলায় বলল,
-কী বলব?
-কী বলব মানে? বলবেন এটা সত্যি না।
-বললেও আমার কথা কেউ শুনত বলে তোর মনে হয়?
পেখম বিছানায় বসে পড়ল। এত টেনশন আর নেওয়া যাচ্ছে না। সবাই ভুল বুঝতে। তাওয়াফ পেখমের পাশে বসে বলল,
-কয়েকটা দিন যেতে দে। এদের আগ্রহ কিছুটা কমুক। তখন নাহয় জানানো যাবে।
পেখম তাওয়াফের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
-আজই বলে দিলে ভালো হতো৷ সবাই কত প্ল্যান করে ফেলছে। পরে জানলে কষ্ট পাবে।
তাওয়াফ কতক্ষণ পেখমের চিন্তিত মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে নিজেও গম্ভীর হয়ে বলল,
-তাহলে সবাই যা ভাবছে তাদেরকে ভাবতে দে। কারো ভুল ভাঙাতে হবে না।
পেখম অবাক চোখে চেয়ে বলল,
-ভুল ভাঙাতে হবে না?
-না। তাদের ভুল ধারণা যদি সত্যি হয়ে যায় তাহলেই তো ঝামেলা মিটে যাবে।
পেখম বোকার মতো জিজ্ঞেস করল,
-কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব?
বউয়ের নির্বুদ্ধিতা দেখে তাওয়াফ শব্দ করে হেসে উঠল। পেখম এখনও বুঝতে পারছে না সে কী বলে ফেলেছে। তাওয়াফ পেখমের অনেকটা কাছে এসে কানে কানে কিছু বলল। এতেই পেখমের চোখ কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসার জোগাড়। চিংড়ি মাছের মতো লাফিয়ে উঠে দূরে সরে গিয়ে রাগী চোখে তাকিয়ে আছে বলল,
-ছি! আপনি এত অসভ্য।
তাওয়াফের হাসি আগের থেকেও বেড়ে গেল। পেখম রাগ করলেও মানুষটাকে এভাবে হাসতে দেখে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল। তাওয়াফ হাসতে হাসতেই বলল,
-এতদিন অসভ্য হওয়ার সুযোগ পাইনি। আজ যখন পেয়েছি, আমার অসভ্য রূপের পুরোটাই তোকে দেখিয়ে দিব।
______
গোলাপ জান ভেবেছিলেন নাতিনাতনি গুলো কয়েকটা দিন তার বাড়িতে থাকবে। কিন্তু তা আর হলো কই? আকৃতির শাশুড়ি অসুস্থ। তাই তাকে চলে যেতে হবে। দৃষ্টির কলেজ খোলা। বইপত্র সব বাড়িতে। ইলহাম তো সারাদিন হাসপাতালেই থাকে। প্রিয়ার থার্ড ইয়ারের টেস্ট পরীক্ষা চলছে। গোলাপ জানকে মন খারাপ করতে দেখে তাওয়াফ দাদীকে কথা দিল,
-অফিসের পর আমি আপনার কাছে আসব দাদী।
গোলাপ জান মিটিমিটি হেসে বললেন,
-তা তো আসবাই। তোমার বউ তো এইখানেই থাকব।
বুড়ী চাচীদের সামনেও তাকে লজ্জা দিচ্ছে। তাওয়াফ ভাবল অফিসে যাওয়ার আগে একবার শ্বশুরের সাথে দেখা করে নেওয়া যাক। পেখমের প্রেগ্ন্যাসির ব্যাপারটা সবাই ভুল বুঝেছে। তাওয়াফ চাইলেই তখন সবার ভুল ভাঙিয়ে দিতে পারত। কিন্তু সে শ্বশুরকে জব্দ করতে ইচ্ছে করেই কিছু বলেনি।
তাওয়াফকে দেখেই পল্লব মির্জা চেহারা কঠিন করে ফেললেন। তাওয়াফ হাসি মুখে জিজ্ঞেস করল,
-কেমন আছেন শ্বশুর আব্বা? অবশ্য আপনার এখন ভালো থাকারই কথা। নানা হচ্ছেন শুনেছেন নিশ্চয়।
পল্লব মির্জা প্রচন্ড রাগে বাক শূন্য হয়ে পড়লেন। চোখ দিয়ে আগুন ঝড়ালেও মুখে কিছুই বললেন না। ঘরে কেউ নেই। তাওয়াফ বলল,
-অসুস্থতার নাটক এবার বন্ধ করতে পারেন। মেয়েকে আটকে রাখার জন্যই তো নাটক সাজিয়ে ছিলেন।
পল্লব মির্জা দাঁত কিড়মিড় করে বললেন,
-তুই আমার চোখের সামনে থেকে যা।
-তা তো যাবোই। অফিস আছে আমার। আপনার মতো ভং ধরে বিছানায় পড়ে থাকার কপাল কি আর আমার আছে?
পল্লব মির্জা হাত মুঠি বদ্ধ করে ফেলেছেন দেখে তাওয়াফ শ্বশুরকে আর ঘাঁটাল না। এমনিতেই অনেক জব্দ হয়েছে। তাওয়াফ উঠে দাঁড়াল। বলল,
-আপনার মেয়েকে রেখে যাচ্ছি। নয় দশ মাস পর আমার মেয়ে সমেত নিয়ে যাব।
পল্লব মির্জা হুংকার ছেড়ে বললেন,
-আমি তোকে দেখে নিব হারামজাদা।
তাওয়াফ শ্বশুরের আড়ালে ঠোঁট চেপে হাসল। যেতে যেতে বলল,
-আমার বউয়ের খেয়াল রাখবেন শ্বশুর আব্বা। এসময় একটু বেশি বেশি খেয়াল রাখা প্রয়োজন। আপনি নিজের মেয়েকে অবহেলা করলেও আমি কিন্তু আমার বউ বাচ্চার অনাদর সহ্য করব না।
শ্বশুরকে চটিয়ে দিয়ে তাওয়াফ চলে গেল। এতদিন কেন তার মাথায় এই বুদ্ধিটা আসেনি। শ্বশুরকে জব্দ করার জন্য এর থেকে ভালো কিছু হতেই পারত না।
_______
পেখম আজ কলেজে যাওয়ার জন্য বেরোলে দাদী চোখমুখ কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
-কই যাস তুই?
পেখম স্বাভাবিক ভাবেই বলল,
-কলেজে যাই৷ আর কই যাব?
-এহন আবার কিয়ের পড়ালেখা তোর? চুপচাপ বাড়িত বইয়া থাক। দুই দিন পর পোলাপান পড়াইবি।
তাওয়াফ ভাই যে তাকে এটা কোন ঝামেলায় ফেলে দিয়ে গেল! এই বাচ্চার কথা বলে বলে তার কান ঝালাপালা করে দিচ্ছে সবাই। একটু ছোটাছুটি করলেই মা'র ধমক খেতে হয়৷ চাচীরা ঘন্টায় ঘন্টায় জোর করে এটাসেটা খাওয়াতেই থাকে। সবথেকে বেশি টর্চার তো দাদী করছে। পেখম কীভাবে বোঝাবে তার পেটে কোন বাচ্চা টাচ্চা নেই।
-এহনও খাড়াইয়া আছোস কেন? ঘরে যা।
-একমাসও সময় নেই দাদী। আমার টেস্ট পরীক্ষা। এখন কলেজে না গেলে নির্ঘাত ফেল করব। এমনিতেই এবছর আমার রংঢং করেই কেটেছে।
গোলাপ জান কঠিন চোখে পেখমের দিকে তাকিয়ে ধমক দিতে গিয়েও দিলেন না।
-ওই খবিশ তোর কাছে পড়ালেখা বড়ো নাকি নিজের পোলাপান বড়?
পেখম বিরক্ত হয়ে বলল,
-পোলাপান পোলাপান করো না তো দাদী।
গোলাপ জান আগুন চোখে তাকিয়ে ছেলের বউকে ডাকতে লাগলেন,
-বউ, ও বউ। এইডা কী মাইয়া পেটে ধরছো গো মা? তোমার মাইয়া কী কয় শুইনা যাও আইসা।
পেখম তার মা দাদী সবার উপর বিরক্ত হয়ে ঘরে এসে তাওয়াফকে কল করল। প্রথমবার তাওয়াফ কল না তুললেও একটু পর নিজেই কল করল।
-আমার ময়না পাখির বাচ্চাটা বরকে মিস করছে?
পেখম ঝাঁঝাল গলায় বলল,
-রাখেন আপনার ময়না পাখির বাচ্চা। আমাকে ফাঁসিয়ে দিয়ে গিয়ে নিজে তো ফূর্তিতে আছেন।
তাওয়াফ বউয়ের রাগ বুঝতে পেরে হাসল।
-শ্বশুরবাড়ির লোকজন কি আমার বউয়ের খুব বেশি সেবাযত্ন করে ফেলছে?
পেখম রাগটাগ ভুলে অসহায় গলায় বলল,
-এসব আর ভালো লাগছে না আমার। আপনি সবাইকে সত্যিটা বলে দিন। দাদী আমাকে কলেজে যেতে দিচ্ছে না। আমার সামনে পরীক্ষা।
তাওয়াফ বুঝতে পারল বউকে সত্যিই ঝামেলায় ফাঁসিয়ে দিয়েছে সে। তার থেকে বড় কথা দুই পরিবারকে ঠকানো হচ্ছে। এরা সবাই তো মন থেকেই করছে। না, তার অন্তত এতটা ছেলেমানুষি করা ঠিক হয়নি। তাওয়াফ বিড়বিড় করে বলল,
-সব দোষ শ্বশুর মির্জার। দাদার ছাওয়ালকে জব্দ করতে গিয়ে নিজের ছাওয়াল নিয়ে মিথ্যা বলতে হচ্ছে। উপরওয়ালা ক্ষমা করো।
চলবে