দুই বছর পর, বেস্ট ফ্রেন্ডের বোনের পাশে বরবেশে নিজের স্বামীকে দেখে কিছুক্ষণের জন্য স্থির হয়ে যায় গুঞ্জন। একদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে সেখান থেকে অন্যদিকে চলে যায়। এটাই হয়তো তার ভাগ্যের লিখন ছিল।
সে দুর্বল হবে না। নিজেকে শক্ত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে গুঞ্জন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে ভেঙে পড়ছে। কালো হওয়া কি এই সমাজে অপরাধ? নাকি কালো হয়ে জন্ম নেওয়াটাই তার সবচেয়ে বড় ভুল? ভাবতেই গুঞ্জনের দু'চোখ ভিজে ওঠে।
গুঞ্জন একটি নিরিবিলি জায়গায় গিয়ে বসে। আকাশের দিকে তাকিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে চুপচাপ বসে থাকে। যেন নীরবতায় সে তার প্রভুর সঙ্গে কথোপকথন করছে, বুকভরা সব কষ্ট তাঁর কাছেই উজাড় করে দিচ্ছে।
ঠিক তখনই পেছন থেকে গুঞ্জনের বেস্ট ফ্রেন্ড এসে বলে,
কী রে গুঞ্জন, তুই এখানে কী করছিস? তোকে সারা বাড়ি খুঁজে এলাম, আর তুই এখানে একা বসে আছিস! চল, চল, ওদিকে বিয়ে পড়ানো শুরু হয়ে গেছে।
কথাটা শুনতেই গুঞ্জনের বুকের ভেতর যেন তীব্র ঝড় বয়ে যায়। নিজের স্বামীর বিয়ে নিজের চোখের সামনে হবে এমন দৃশ্য কোনো মেয়েই বা কীভাবে মেনে নিতে পারে?
যদিও সে জানত, রিয়াদ কোনোদিনই তার কাছে ফিরে আসবে না। তবুও এই দুই বছর বুকভরা আশা নিয়ে অপেক্ষা করে ছিল। হয়তো একদিন সে ফিরে আসবে, হয়তো নিজের ভুল বুঝতে পারবে, হয়তো একবার অন্তত তাকে নিজের স্ত্রী হিসেবে স্বীকার করবে।
কিন্তু রিয়াদ তার সেই সমস্ত আশাকে মিথ্যা প্রমাণ করে দিল। সে আর ফিরে এল না। বরং আজ থেকে সে সম্পূর্ণভাবে অন্য কারও হয়ে গেল।
কথাটা ভাবতেই গুঞ্জনের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। ঠোঁটের কোণে একফোঁটা তিক্ত হাসি ফুটে ওঠে, আর অজান্তেই তার বুক চিরে বেরিয়ে আসে এক দীর্ঘশ্বাস।
___
গুঞ্জন বিয়ের আসরে এসে এক কোণে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। দূর থেকে রিয়াদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠছে। আজ রিয়াদকে ভীষণ হাসিখুশি লাগছে। লাগবেই বা না কেন? সে তো আজ তার মনের মতো জীবনসঙ্গী পেয়েছে সুন্দরী, সুশ্রী, স্মার্ট; ঠিক যেমনটা সে চেয়েছিল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়ে যায়। গুঞ্জন শুধু নির্বাক দর্শকের মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখল। চাইলেও কিছুই করতে পারল না।
হঠাৎই রিয়াদের নজর গিয়ে পড়ল গুঞ্জনের ওপর। তাকে এখানে দেখে মুহূর্তেই চমকে উঠল সে।
গুঞ্জন এখানে কেন? আবার কোনো ঝামেলা করবে না তো?
এই চিন্তায় রিয়াদের অস্থিরতা বেড়ে গেল। সে হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে ইশিতার দিকে তাকিয়ে বলল,
আমি একটু আসছি।
ইশিতা মুচকি হেসে মাথা নাড়ল।
রিয়াদ সবার আড়ালে গুঞ্জনের হাত শক্ত করে ধরে টানতে টানতে একটি নির্জন জায়গায় নিয়ে এল। তারপর রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
তুমি এখানে কেন এসেছ? তোমার লজ্জা করে না, এই কালো চেহারা নিয়ে এখানে আসতে? নাকি আমার বিয়ের খবর শুনে ধেই ধেই করে ঝামেলা পাকাতে চলে এসেছ?
একটু থেমে সে আবার বলল,
শুনে রাখো, যদি কোনো রকম ঝামেলা করার চেষ্টা করো, তাহলে তোমাকে আমি ছেড়ে কথা বলব না।
গুঞ্জন কোনো উত্তর দিল না। শুধু একদৃষ্টিতে রিয়াদের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো, একজন মানুষ কতটা জঘন্য হলে আরেকজনকে এতটা অপমানজনক ভাষায় আঘাত করতে পারে!
রিয়াদ আবার বিদ্রূপের হাসি হেসে বলল,
তোমাকে তো ছেড়ে চলে এসেছি। আবার কেন ফিরে এসেছ? তোমার কুফা কাটিয়ে যখন একটু সুখের মুখ দেখতে শুরু করেছি, তখনই তুমি কালো ছায়ার মতো এসে হাজির হলে! নাকি আমি একটা সুন্দরী মেয়েকে বিয়ে করেছি, সেটা তোমার সহ্য হচ্ছে না? তাই এই কালো, কুৎসিত মুখটা দেখাতে চলে এসেছ?
এতক্ষণ গুঞ্জন সব অপমান নীরবে সহ্য করছিল। কিন্তু এবার যেন তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। রাগে তার সারা শরীর কাঁপতে লাগল। দাঁতে দাঁত চেপে সে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে রিয়াদের দিকে তাকিয়ে বলল
শেষ? নাকি অপমানের ঝুলিতে এখনও কিছু বাকি আছে?
রিয়াদ মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
গুঞ্জন তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে আবার বলল,
এতক্ষণ চুপ ছিলাম বলে ভেবো না, তোমার বলা প্রতিটি কথাই আমি মেনে নিয়েছি। চুপ ছিলাম শুধু এই ভেবে, আজ তোমার বিয়ের দিন। তোমার আনন্দের দিনে কোনো অশান্তি সৃষ্টি করতে চাইনি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তুমি আমাকে যা খুশি তাই বলবে আর আমি মাথা নিচু করে সব সহ্য করব।
এক পা এগিয়ে গিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
বারবার আমার গায়ের রঙ নিয়ে কথা বলছ! বলো তো, মানুষ কি তার গায়ের রঙ নিজে বেছে নিয়ে পৃথিবীতে আসে? নাকি আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে অপমান করাটাকেই তুমি নিজের শিক্ষার পরিচয় মনে করো?
গুঞ্জন আবার বলল,
তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গেছ, এতে আমার কষ্ট হয়েছে, ঠিক। কিন্তু আজ বুঝতে পারছি, তুমি চলে গিয়ে আমার কোনো ক্ষতি করোনি। বরং আল্লাহ আমাকে এমন একজন মানুষের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন, যে মানুষের চরিত্র নয়, শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য দেখতে জানে।
সে গভীর নিশ্বাস নিয়ে শান্ত গলায় বলল,
আর একটা কথা ভালো করে শুনে রাখো। আমি এখানে তোমার বিয়ে ভাঙতে আসিনি, তোমাকে ফিরে পেতেও আসিনি। আর আমি জানতাম না তুমি বিয়ে করছো,আমি শুধু আজ এখানে এসেছি আমার বান্ধবীর জন্য ।
রিয়াদ কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।
গুঞ্জন এবার চোখের কোণে জমে থাকা জলটুকু শক্ত হয়ে আটকে রেখে বলল,
তুমি বারবার আমাকে কালো, কুৎসিত বলছ। অথচ জানো? মানুষের আসল সৌন্দর্য গাঁয়ের রঙে নয়, চরিত্রে থাকে।তুমি হয়তো ভীষন সুন্দর কিন্তু তোমার কথাগুলো তোমাকে পৃথিবীর সবচেয়ে কুৎসিত মানুষ বানিয়ে দিয়েছে।
কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে সে শেষবারের মতো বলল,
ভয় পেও না। তোমার সংসার ভাঙার মতো এতটা সস্তা আমি নই। তোমাকে হারানোর কষ্ট একদিন ছিল, কিন্তু আজ তোমাকে দেখে শুধু একটা কথাই মনে হচ্ছে যে মানুষ আমাকে আমার গায়ের রঙ দিয়ে বিচার করেছে, তাকে হারিয়ে আমি কিছুই হারাইনি।
কথাগুলো বলেই গুঞ্জন মাথা উঁচু করে সেখান থেকে চলে যায়। আর রিয়াদ নির্বাক হয়ে তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
___
রাতে গুঞ্জন আকাশের পানে মুখ করে তাকিয়ে বলে ওঠে
কালো মেয়েরা কী এতোটাই ঘৃণিত যে তাদের সম্মান, অনুভূতি আর স্বপ্নের কোনো মূল্য নেই?
কেন তাদের দেখলেই শুরু হয় অবহেলা, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, ব্যঙ্গ আর অপমান? গায়ের রঙ কি একজন মানুষের চরিত্র, যোগ্যতা, ভালোবাসা বা মানবিকতার মাপকাঠি?
কালো বলেই কি একটি মেয়ের হাসির কোনো দাম নেই?
কালো বলেই কি তার স্বপ্নগুলো রঙহীন হয়ে যায়?
কেন সমাজ এখনো সৌন্দর্যের মাপকাঠিতে মানুষের মন নয়, গায়ের রঙকে বিচার করে?
যে মেয়েটা দিনের শেষে সবার মুখে হাসি ফোটায়, সেই মেয়েটাই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের রঙের জন্য নীরবে চোখের জল ফেলে।
তার অপরাধ শুধু একটাই সে ফর্সা নয়।
কেন কালো মেয়েদের বারবার শুনতে হয় আরেকটু ফর্সা হলে ভালো লাগত,।
কেন তাদের যোগ্যতা, মায়া, ভালোবাসা আর ব্যক্তিত্ব সবকিছু হারিয়ে যায় শুধু গায়ের রঙের কাছে?
রঙ তো সৃষ্টিকর্তার দান, তবুও মানুষ রঙ দিয়েই মানুষকে ছোট করে।
কিন্তু কেউ কি কখনো ভেবেছে, কালো মেঘই বৃষ্টি হয়ে পৃথিবীকে শান্তি দেয়, কালো মাটিই ফসল ফলায়, কালো রাতই হাজারো তারার সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তোলে।
তাহলে কালো মেয়েটাই কেন অবহেলার আরেক নাম হবে?
চলবে,,,
#প্রেমের গুঞ্জন
#পর্ব_১
#জান্নাত