ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের গুঞ্জন

২য় পর্ব

লেখক: জান্নাত

#প্রেমের _গুঞ্জন

#পর্ব_২

#জান্নাত

গুঞ্জনের চোখ বেয়ে টপটপ করে দুই ফোঁটা নোনাজল গড়িয়ে পড়ল। ঠিক তখনই তার কাঁধে কারও স্নেহভরা হাতের স্পর্শ অনুভব করল সে। পেছনে ফিরে তাকাতেই দেখল তার মা, আয়শা বেগম।

মাকে দেখামাত্র আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না গুঞ্জন। ঝাঁপিয়ে পড়ে মাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।

কাঁদতে কাঁদতেই বলল,মাগো, আমি আর পারছি না মা। এত কষ্ট আর সহ্য হচ্ছে না। মানুষের অপমান, তিরস্কার আর অবহেলা কিছুই আর নিতে পারছি না। মা, আমি কেন সুন্দর হলাম না? আমি যদি একটু সুন্দর হতাম, তাহলে আজ আমার স্বামী অন্য কারও হয়ে যেত না। নিজের চোখের সামনে নিজের স্বামীর বিয়ে দেখতে হতো না আমাকে। মা, আমি যদি আরেকটু সুন্দর হতাম, তাহলে হয়তো আমিও একটা সুন্দর সংসার পেতাম। এভাবে তোমাদের বোঝা হয়ে বেঁচে থাকতে হতো না আমার।

গুঞ্জনের প্রতিটি কথা যেন আয়শা বেগমের বুক চিরে তীরের মতো বিঁধছিল। কোনো মা-ই কি সন্তানের এমন বুকভাঙা আর্তনাদ সহ্য করতে পারেন? পারেন না। তাই মেয়ের অসহনীয় কষ্ট দেখে তাঁর নিজের চোখও অশ্রুতে ভরে উঠল। নোনাজল গড়িয়ে পড়তে লাগল গাল বেয়ে।

তিনি স্নেহভরে গুঞ্জনের মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত কণ্ঠে বললেন,

মা, কখনো নিজের রূপ নিয়ে আফসোস করবি না। আল্লাহ কাউকে যেমন সৃষ্টি করেন, তার মধ্যেই সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে। মানুষের আসল সৌন্দর্য গাঁয়ের রঙে নয়, তার চরিত্রে, তার ব্যবহারে, তার মনুষ্যত্বে।

একটা কথা মনে রাখিস, যে মানুষ শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য দেখে ভালোবাসে, সে কখনো সত্যিকারের ভালোবাসতে জানে না। তার ভালোবাসা ক্ষণস্থায়ী। আর যে মানুষ মনকে ভালোবাসে, সে সারাজীবন আগলে রাখে।

তুই নিজেকে কেন দোষ দিচ্ছিস, মা? তোর কোনো অপরাধ ছিল না। অপরাধ ছিল তাদের, যারা তোর নিঃস্বার্থ ভালোবাসার মূল্য বুঝতে পারেনি। যে মানুষ তোকে হারিয়ে অন্য কাউকে বেছে নিতে পেরেছে, সে কোনোদিনই তোর ভালোবাসার যোগ্য ছিল না।

আজ হয়তো তুই ভাবছিস সব শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু বিশ্বাস কর, আল্লাহ কখনো কারও প্রাপ্য কেড়ে নেন না। কখনো কখনো তিনি কিছু মানুষকে আমাদের জীবন থেকে সরিয়ে দেন, যেন ভবিষ্যতে আমাদের জন্য আরও সুন্দর কিছু লিখে রাখতে পারেন।

তাই চোখের জল মুছে ফেল, মা। তুই কারও বোঝা নয়। তুই আমার গর্ব, আমার সাহস। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখ। যে মেয়েটা এত কষ্ট সহ্য করেও কাউকে অভিশাপ দেয়নি, তার জন্য নিশ্চয়ই আল্লাহ এমন একজন মানুষকে রেখেছেন, যে তোর চোখের প্রতিটি অশ্রুবিন্দুর মূল্য দেবে।

মায়ের কথাগুলো শুনে গুঞ্জন আবারও তাঁকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। বুকের ভেতরের যন্ত্রণাটা এখনও কমেনি, কিন্তু মায়ের স্নেহমাখা কথাগুলো যেন তার ভাঙা মনটাকে একটু হলেও শান্ত হতে শেখাল।

গুঞ্জন কিছুক্ষণ নীরবে মায়ের বুকে মাথা রেখে কাঁদল। তারপর ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নিল। চোখের জল মুছে গভীর একটা শ্বাস ফেলল। মনে হচ্ছিল, বুকের ভেতরে জমে থাকা ভারী পাথরটা এখনও রয়ে গেছে, তবে মায়ের কথাগুলো তাকে আবার বাঁচার সাহস জোগাচ্ছে।

আয়শা বেগম মেয়ের মুখটা দুই হাতে তুলে ধরে বললেন,

শোন মা, জীবনে কখনো নিজেকে ছোট ভাববি না। মানুষ তোকে কী বলল, কীভাবে দেখল, সেটা বড় কথা নয়। তুই নিজেকে কীভাবে দেখিস, সেটাই সবচেয়ে বড় বিষয়। মনে রাখিস, যে মেয়ের আত্মসম্মান আছে, তাকে কেউ কখনো সত্যিকারের হারাতে পারে না।

গুঞ্জন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল,

কিন্তু মা... আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে, আমার সবকিছু শেষ হয়ে গেছে।

আয়শা বেগম মৃদু হেসে বললেন,

না মা, কিছুই শেষ হয়নি। বরং আজ থেকেই তোর নতুন জীবন শুরু হবে। যে মানুষ তোকে অবহেলা করেছে, তার জন্য সারাজীবন কাঁদতে নেই। একদিন সে-ই বুঝবে, কী অমূল্য রত্ন সে নিজের হাতেই হারিয়েছে। আর সেদিন তুই তার দিকে ফিরে তাকানোরও প্রয়োজন বোধ করবি না।

তিনি গুঞ্জনের কপালে আলতো করে চুমু এঁকে আবার বললেন,

আল্লাহ কখনো তাঁর বান্দার চোখের পানি বৃথা যেতে দেন না। আজ তুই কাঁদছিস, ঠিকই। কিন্তু বিশ্বাস কর, এই কান্নার বদলে একদিন তিনি তোকে এমন হাসি উপহার দেবেন, যা কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। তাই নিজের ভরসা হারাবি না। তোর রবের ওপর ভরসা রাখ।

মায়ের কথাগুলো গুঞ্জনের হৃদয়ে অদ্ভুত এক শক্তির সঞ্চার করল। সে চোখের শেষ অশ্রুবিন্দুটুকু মুছে নিল। তারপর মনে মনে একটি প্রতিজ্ঞা করল

আজ থেকে আমি আর নিজের রূপের জন্য কাঁদব না। যারা আমাকে আমার গায়ের রঙের জন্য অপমান করেছে, তাদের সামনে একদিন নিজের যোগ্যতা দিয়েই মাথা উঁচু করে দাঁড়াব। আমার পরিচয় আমার রূপ নয়, আমার আত্মসম্মান, আমার চরিত্র আর আমার সাফল্য।

মেয়ের চোখে সেই দৃঢ়তার ঝলক দেখে আয়শা বেগমের ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। তিনি মনে মনে মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন,

হে আল্লাহ, আমার মেয়ের জীবনে যত কষ্ট লিখে রেখেছেন, এবার তার বদলে একটু সুখ লিখে দিন। ওর ভাঙা হৃদয়টা আপনার রহমতে জোড়া লাগিয়ে দিন।

মা-মেয়ে দু'জন একে অপরকে জড়িয়ে ধরে নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। তাদের চোখে তখনও অশ্রু, কিন্তু সেই অশ্রুর আড়ালে ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছিল এক নতুন ভোরের অপেক্ষা।

___

গুঞ্জনের বয়স যখন মাত্র সতেরো, রিয়াদের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। অভাবের সংসারে বড় হওয়া মেয়েটির জন্য ভালো সম্বন্ধ পেয়ে বাবা-মা আর দেরি করেননি। গ্রামের নিয়ম মেনেই অল্প বয়সে তাকে বিদায় দেওয়া হয়।

কিন্তু বিয়ের এক মাসের মধ্যেই শুরু হয় অবহেলা আর অপমান। শ্যামবর্ণ গায়ের রঙ নিয়ে রিয়াদ প্রায়ই তাকে ‘কালো’ বলে কটাক্ষ করত। কারণ, নিজের ইচ্ছায় নয়,মায়ের জোরেই তাকে বিয়ে করতে হয়েছিল।

তবু গুঞ্জন সব সহ্য করে সংসারটা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিল। ভেবেছিল, একদিন হয়তো রিয়াদ তাকে মেনে নেবে। কিন্তু একদিন সে একটি চিঠি লিখে হঠাৎ উধাও হয়ে যায়।

এরপরও গুঞ্জন আরও দুই মাস শ্বশুরবাড়িতে অপেক্ষা করে। শ্বশুরবাড়ির মানুষের কাছে সে হয়ে উঠেছিল বোঝা। অপমান, তিরস্কার আর কটু কথার ভারে দম বন্ধ হয়ে আসত তার। শেষ পর্যন্ত বাবা-মা আর মেয়ের কষ্ট সহ্য করতে না পেরে তাকে নিজেদের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন।

এরপর গুঞ্জন আবার বই হাতে তুলে নেয়। ছোট ছোট বাচ্চাদের পড়িয়ে নিজের পড়াশোনার খরচ চালাতে থাকে। বাইরে থেকে সবাই তাকে স্বাভাবিক দেখলেও, গভীর রাতে বালিশ ভিজিয়ে কান্না করাই যেন তার নিত্যদিনের অভ্যাস হয়ে দাঁড়ায়।

কিন্তু সে আশা ছিল মরীচিকা। রিয়াদ আর ফেরেনি; বরং অন্য এক সুন্দরীর প্রেমে পড়েছিল। আর গুঞ্জন শিখেছিল, সব প্রতীক্ষার শেষ মিলনে হয় না।

গুঞ্জন জানত না, যার ফেরার অপেক্ষায় প্রতিটি সকাল শুরু করছে, প্রতিটি রাত চোখের জলে শেষ করছে, সে মানুষটা আর কোনোদিনই তার জীবনে ফিরে আসবে না।

দিন কেটে যায়, মাস পেরিয়ে যায়। তবুও গুঞ্জন প্রতিদিন দরজার দিকে তাকিয়ে থাকত। বাড়ির সামনে কোনো পায়ের শব্দ শুনলেই বুকটা ধক করে উঠত। মনে হতো, এই বুঝি রিয়াদ ফিরে এসেছে। কিন্তু প্রতিবারই তার অপেক্ষা ভেঙে চুরমার হয়ে যেত।

তবুও সে আশা ছাড়েনি। বুকের গভীরে একফোঁটা বিশ্বাস বাঁচিয়ে রেখেছিল একদিন হয়তো রিয়াদ ফিরে আসবে, নিজের ভুল বুঝতে পারবে, তাকে নিজের করে নিয়ে যাবে।

কিন্তু নিয়তি তার জন্য অন্য গল্প লিখে রেখেছিল।

রিয়াদ আর কখনো ফিরে আসেনি। কারণ, সে তখন অন্য এক রূপসীর প্রেমে ডুবে নতুন স্বপ্ন বুনতে ব্যস্ত। আর এদিকে গুঞ্জন নিজের ভাঙা স্বপ্নের ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন একটু একটু করে বাঁচতে শিখছিল।

সে জানত না, যে মানুষটার জন্য সে নিজের সবটুকু ভালোবাসা উজাড় করে দিয়েছিল, সেই মানুষটাই একদিন তার জীবনের সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতার নাম হয়ে থাকবে।

অপেক্ষা বড় নিষ্ঠুর। কিছু অপেক্ষা মানুষকে তার প্রিয়জনের কাছে পৌঁছে দেয়, আর কিছু অপেক্ষা মানুষকে সারাজীবনের জন্য নিঃস্ব করে দেয়। গুঞ্জনের অপেক্ষাটাও ছিল ঠিক তেমনই যার শেষ ছিল না, ছিল শুধু বুকভরা দীর্ঘশ্বাস আর না-ফেরা এক মানুষের স্মৃতি।

সবকিছু ভেবে গুঞ্জন একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। যেন সেই দীর্ঘশ্বাসের সাথেই জীবনের সমস্ত বিষাদ, অপমান আর বিষাক্ত স্মৃতিগুলোকে বুক থেকে ঝেড়ে ফেলতে চাইছে। কতদিন আর অতীতকে আঁকড়ে ধরে বাঁচবে? কতদিন আর নিজের ভাগ্যকে দোষ দিয়ে চোখের জল ফেলবে? না, আর নয়।

সে সিদ্ধান্ত নিল আজ থেকে আর অতীতের অপেক্ষায় থাকবে না। ফিরে তাকাবে না সেই মানুষগুলোর দিকে, যারা তাকে অবহেলা করেছে, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছে, তার গায়ের রঙ নিয়ে কটু কথা বলেছে, তার আত্মসম্মানকে বারবার ভেঙে চুরমার করেছে। যে সম্পর্ক তাকে শুধু কষ্টই দিয়েছে, সেই সম্পর্কের শিকল বয়ে বেড়ানোর কোনো অর্থ নেই।

গুঞ্জন ধীরে ধীরে চোখের কোণের জল মুছে ফেলল। তারপর আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,

আমি আর ভাঙব না। আমি আর কারও করুণা নিয়ে বাঁচব না। এবার আমি নিজের পরিচয়ে বাঁচব, নিজের স্বপ্নকে সত্যি করব।

সেই মুহূর্তেই যেন তার ভেতরে নতুন এক শক্তির জন্ম হলো। যে মেয়েটি এতদিন অপমান সহ্য করে মাথা নিচু করে বেঁচে ছিল, আজ সে-ই মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর শপথ নিল। জীবনে সফলতা অর্জন করাই হবে এখন তার একমাত্র লক্ষ্য। সে নিজেকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যাবে, যেখানে পৌঁছে আর কাউকে নিজের মূল্য প্রমাণ করতে হবে না। তার সফলতাই একদিন নীরবে জবাব দেবে সব অপমানের, সব অবহেলার।

একদিন ঠিকই সময় বদলাবে। যারা একসময় তাকে দেখে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, তারাই একদিন বিস্মিত চোখে তাকিয়ে থাকবে। যারা বলেছিল, এই মেয়েটাকে দিয়ে কিছুই হবে না,তারাই একদিন তার সাফল্যের গল্প অন্যদের শুনিয়ে বেড়াবে। কিন্তু সেদিন গুঞ্জনের মনে কোনো প্রতিশোধ থাকবে না, থাকবে শুধু আত্মতৃপ্তির এক শান্ত হাসি।

কারণ, মানুষকে হারিয়ে নয় নিজেকে গড়েই জীবনের সবচেয়ে বড় জয় অর্জন করা যায়।

নতুন সূর্যের আলো যেমন অন্ধকার ভেদ করে পৃথিবীকে আলোকিত করে, ঠিক তেমনি গুঞ্জনও নিজের জীবনের অন্ধকার সরিয়ে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করবে। আর সেই অধ্যায়ে থাকবে না কোনো অপমানের কান্না, থাকবে শুধু আত্মবিশ্বাস, পরিশ্রম আর নিজের অস্তিত্বকে নতুন করে প্রমাণ করার অদম্য ইচ্ছাশক্তি।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন