ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের গুঞ্জন

২৭তম পর্ব

লেখক: জান্নাত

#প্রেমের_ গুঞ্জন

#পর্ব_২৭

#জান্নাত

প্রেমের বাবা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন ছেলের পানে। চোখের সামনে নিজের ছেলেকে এভাবে ভেঙে পড়তে দেখে বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল তাঁর। একটা মেয়ের জন্য তাঁর ছেলে এভাবে নিজেকে ভেঙে ফেলবে এটা তিনি কখনো কল্পনাও করেননি।

প্রেমের অশ্রুসিক্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে তাঁর বুকটা ভারী হয়ে এলো। ছেলের কান্না যে তাঁর কিছুতেই সহ্য হচ্ছে না। একজন বাবা হয়ে সন্তানের কষ্ট চোখের সামনে দেখেও নীরব থাকা যে কতটা কঠিন, তা আজ যেন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন তিনি।

তবুও মুখে কোনো কথা ফুটল না।

নীরবে চোখ ফিরিয়ে নিলেন তিনি। তারপর ধীর পায়ে সেখান থেকে চলে গেলেন।

প্রেম অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বাবার চলে যাওয়ার পানে। বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্টটা যেন আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেল।

বাবার পায়ের শব্দ ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে গেল, অথচ প্রেমের চোখের জল থামে না।

প্রেমের মা ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন ছেলের কাছে। ছেলের বিধ্বস্ত মুখটা দেখেই মায়ের বুকটা হাহাকার করে উঠল। কতটা কষ্ট পেলে একটা মানুষ এভাবে ভেঙে পড়ে সন্তানের চোখের জল যেন তারই বুকের ভেতর রক্তক্ষরণ ঘটায়।

তিনি নীরবে ছেলের পাশে বসে মাথায় স্নেহের পরশ বুলিয়ে দিলেন। কণ্ঠে মিশে রইল মায়ের অগাধ মমতা আর সান্ত্বনার কোমলতা।

এভাবে ভেঙে পড়িস না বাবা। সব ঠিক হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখ। মনে রাখিস, তিনি কাউকে নিরাশ করেন না। হয়তো আজ তোর চোখে শুধু অন্ধকার দেখাচ্ছে, কিন্তু আল্লাহ নিশ্চয়ই তোর জন্য এর চেয়েও সুন্দর কোনো পথ রেখে দিয়েছেন।

মায়ের কথাগুলো শুনে প্রেম চোখ মুছে নেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করল। তবুও বুকের ভেতরের হাহাকার যেন কিছুতেই থামল না।

মা আবারও ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। যেন সেই স্পর্শটুকুর মধ্যেই ছেলের সমস্ত দুঃখ নিজের করে নিতে চাইছেন তিনি।

ভরসা রাখ বাবা... কখনো কখনো অপেক্ষার শেষেই তো সবচেয়ে সুন্দর প্রাপ্তিটা এসে ধরা দেয়।

__

রাতের নীরবতা যেন চারপাশটাকে আরও গভীর করে তুলেছে। জানালার পাল্লা খুলে গুঞ্জন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে অন্ধকার আকাশের পানে। দূর আকাশে মিটমিট করে জ্বলছে দু-একটি তারা, অথচ তার বুকের ভেতরটা যেন আজ অন্ধকারে ডুবে আছে।

হঠাৎ ভীষণ মনে পড়ল বাবা-মাকে। মনে পড়ল মায়ের স্নেহমাখা মুখ, বাবার মায়াভরা চোখ, আর ছোট্ট ভাইটার দুষ্টুমিভরা মুখটা। কতদিন হলো তাদের দেখেনি! সময় যেন আপন গতিতে ছুটে চলেছে, অথচ তার কাছে প্রতিটা দিনই কেটেছে একেকটা দীর্ঘ অপেক্ষার মতো।

মনটা কেমন করে উঠল।

কালই বাড়ি যাবে সে। বাবা-মায়ের কাছে কয়েকটা দিন থাকবে। মায়ের আঁচলে মুখ লুকিয়ে মনের সমস্ত ক্লান্তি ভুলে যাবে, বাবার পাশে বসে নির্ভার হয়ে কিছুটা সময় কাটাবে। ছোট্ট ভাইটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে হয়তো জমে থাকা অভিমানটুকুও মুছে ফেলবে।

প্রেমের কথা আর ভাবতে চায় না গুঞ্জন।

অনেক ভেবেছে, অনেক কেঁদেছে। শেষমেশ বুঝে গেছে প্রেমকে হয়তো তার ভাগ্যে লেখা হয়নি। কিছু মানুষকে যতটা আপন করে চাওয়া যায়, ততটা আপন করে পাওয়া যায় না। কিছু ভালোবাসা বুকের গভীরে বেঁচে থাকে, অথচ জীবনের গল্পে তাদের কোনো ঠিকানা হয় না।

তাই এবার সবকিছু আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছে সে।

তার জীবনের পথ কোনদিকে যাবে, কে তার সঙ্গী হবে, আর কোন স্বপ্নগুলো পূর্ণ হবে এসব নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন নেই তার। আল্লাহ তার জন্য যে সিদ্ধান্ত রাখবেন, সেটাই নিশ্চয়ই তার জন্য মঙ্গলজনক। হয়তো আজ সে বুঝতে পারছে না, কিন্তু একদিন নিশ্চয়ই বুঝবে আল্লাহর সিদ্ধান্তের চেয়ে সুন্দর সিদ্ধান্ত আর হয় না।

গুঞ্জন আকাশের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল।

বুকের গভীর থেকে বেরিয়ে এলো একটি দীর্ঘশ্বাস।

সেই দীর্ঘশ্বাসে মিশে রইল অপূর্ণ ভালোবাসা, প্রিয় মানুষটাকে হারানোর ব্যথা আর আপনজনদের কাছে ফিরে যাওয়ার একটুখানি শান্তির আকাঙ্ক্ষা।

অন্ধকার রাতটা নীরবে সাক্ষী হয়ে রইল তার নিঃশব্দ বিদায়ের

প্রেমের কাছ থেকে, তার অপূর্ণ স্বপ্নগুলোর কাছ থেকে।।

প্রেম আজ ভার্সিটিতে এসেছে শুধু একজনের জন্য তার গুঞ্জনের জন্য।

ক্লাসে যাওয়ার কোনো তাড়া নেই, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ারও ইচ্ছে নেই। তার সমস্ত মনোযোগ আটকে আছে ভার্সিটির প্রধান ফটকের দিকে। বারবার সেদিকেই চোখ চলে যাচ্ছে, যেন সেই পথ ধরেই তার তীব্রময়ী এসে হাজির হবে।

কিন্তু সময় গড়িয়ে যাচ্ছে...

গেট দিয়ে একের পর এক শিক্ষার্থী প্রবেশ করছে, অথচ গুঞ্জনের দেখা নেই।

প্রেম অস্থির হয়ে উঠল। একবার ঘড়ির দিকে তাকায়, আবার তাকায় গেটের দিকে। মনে হচ্ছে, অপেক্ষার প্রতিটা মুহূর্ত যেন তার বুকের ওপর ভারী পাথর হয়ে চেপে বসছে।

কোথায় তুমি, গুঞ্জন?

মনের অজান্তেই কথাটা বেরিয়ে এলো তার ঠোঁট থেকে।

আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরও যখন গুঞ্জনের কোনো দেখা মিলল না, প্রেম আর নিজেকে স্থির রাখতে পারল না। অস্থির পায়ে এদিক-সেদিক হাঁটতে লাগল সে। বুকের ভেতর কেমন একটা অজানা শঙ্কা ধীরে ধীরে বাসা বাঁধছে।

চোখের কোণে জমে উঠে অশ্রুকনা।

ঠিক তখনই হঠাৎ তার চোখে পড়ল সাজিয়া।মেয়েটা একাই গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকছে।

প্রেমের দৃষ্টি মুহূর্তেই আটকে গেল তার ওপর।

কিন্তু...গুঞ্জন কোথায়?

প্রতিদিন তো সাজিয়ার পাশে গুঞ্জনকেও দেখা যায়। আজ কেন নেই?

প্রেমের বুকের বাঁ পাশটা আচমকাই ধক করে উঠল।

মনের ভেতর অজানা এক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল।

আমার তীব্রময়ী কোথায়?

চোখের সামনে যেন মুহূর্তেই হাজারটা আশঙ্কা ভেসে উঠল। গুঞ্জন কি অসুস্থ? কোনো বিপদ হয়নি তো? নাকি

ভাবনাটা শেষ করার আগেই বুকটা কেঁপে উঠল তার।

না, না... তার তীব্রময়ীর কিছু হতে পারে না।

প্রেম ছুটে গেল সাজিয়ার দিকে। কাঁপা কণ্ঠে প্রশ্ন করে

গুঞ্জন কোথায়?

সাজিয়া অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল প্রেমের মুখের দিকে। কিছুক্ষণ যেন তার কণ্ঠে কোনো ভাষা খুঁজে পেল না। অবশেষে বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসটাকে সামলে ধীর, ভারী কণ্ঠে বলল

গুঞ্জন… গ্রামে চলে গেছে।

কথাটা যেন মুহূর্তেই প্রেমের চারপাশের সমস্ত শব্দ স্তব্ধ করে দিল।

প্রেম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। তারপর হঠাৎ করেই দু’পা পিছিয়ে গেল। বাঁ হাতটা ধীরে ধীরে বুকের বাঁ পাশে চেপে ধরল সে। চোখের দৃষ্টি কেমন শূন্য হয়ে এসেছে।

কাঁপা ঠোঁটে অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করে বলল

চলে গেছে?

আমাকে ছেড়ে চলে গেছে গুঞ্জন?

কথাগুলো বলতে গিয়েই তার কণ্ঠ ভেঙে গেল।

যে ছেলেটা এতক্ষণ গুঞ্জনকে এক ঝলক দেখার আশায় ব্যাকুল হয়ে ছিল, সেই ছেলেটাই এবার গুঞ্জনহীন পৃথিবীটার সামনে দাঁড়িয়ে অসহায় হয়ে পড়ল।

প্রেম আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াতে পারল না। টালমাটাল পায়ে ধীরে ধীরে ভার্সিটি থেকে বেরিয়ে গেল। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন তার বুকের ওপর জমে থাকা ভারকে আরও ভারী করে তুলছে।

মুখে একই কথা বারবার ফিরে আসছে

চলে গেছে… আমাকে ছেড়ে চলে গেছে…

সাজিয়া নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল তার চলে যাওয়ার পথের দিকে।

প্রেমের এই ভেঙে পড়া তাকে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে। নিজের অজান্তেই চোখের কোণে জল জমে উঠল তার।

কতটা ভালোবাসলে একজন মানুষ এভাবে ভেঙে পড়ে?

আর কতটা অসহায় হলে ভালোবাসার মানুষটাকে হারানোর পর তার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না?

সাজিয়া ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে নিল।প্রেমের জন্য তারও ভীষণ কষ্ট হচ্ছে।

কিন্তু কিছু কিছু কষ্ট থাকে, যার সামনে দাঁড়িয়ে থেকেও মানুষ অসহায় দর্শক ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না।

দুই দিন হলো গুঞ্জন বাড়িতে ফিরেছে।

মেয়েকে হঠাৎ নিজেদের সামনে দেখে প্রথম মুহূর্তে যেন বিশ্বাসই করতে পারেননি তার মা-বাবা। আবেগ সামলাতে না পেরে দু’জনেই কিছুক্ষণ পরম মমতায় মেয়েটাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে রেখেছিলেন।

মায়ের বুকের উষ্ণতায় গুঞ্জনও সেদিন নিজেকে আবার ছোট্ট সেই মেয়েটার মতো মনে করেছিল।

আর অয়ন?

সে তো বোনকে কাছে পেয়ে একেবারেই পিছু ছাড়েনি। গুঞ্জন যেখানে যায়, অয়নও সেখানেই। যেন এতদিনের দূরত্বের প্রতিটা মুহূর্ত একসঙ্গে পুষিয়ে নিতে চাইছে। সারাক্ষণ বোনের পাশে বসে থাকা, টুকটাক গল্প করা কিংবা অকারণে বিরক্ত করা সবকিছুতেই তার আলাদা এক আনন্দ।

দুই দিন পর বিকেলের হালকা রোদে উঠোনে মায়ের পাশে বসে গল্প করছিল গুঞ্জন। চারপাশে হালকা বাতাস, গাছের পাতায় পাতায় মৃদু শব্দ। পরিচিত এই পরিবেশটা যেন তার অস্থির মনটাকে একটু একটু করে শান্ত করে দিচ্ছিল।

মায়ের কোনো এক কথায় হেসে উঠেছিল সে।

ঠিক তখনই

গুঞ্জন!

অচেনা এক কণ্ঠস্বর ভেসে এলো উঠোনের বাইরে থেকে।

হাসিটা মুহূর্তেই থেমে গেল।গুঞ্জন ধীরে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে তাকাল সেদিকে।আর তাকানো মাত্রইচমকে উঠল সে।

চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। ঠোঁটের কোণের হাসিটুকু মিলিয়ে গিয়ে সেখানে জমল অবিশ্বাস।

সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার দিকে গুঞ্জন পলকহীন চোখে তাকিয়ে রইল।

চলবে,,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন