#প্রেমের _গুঞ্জন
#পর্ব_২৬
#জান্নাত
হঠাৎ করেই প্রেমের মায়ের দৃষ্টি গিয়ে আটকে গেল সদর দরজার দিকে।
সেখানে দাঁড়িয়ে আছে গুঞ্জন।মেয়েটার মুখটা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে আছে, চোখ দুটো স্থির, অথচ সেই স্থির চোখের গভীরে যেন জমে আছে হাজারো প্রশ্ন, অভিমান আর ভাঙাচোরা অনুভূতির ঝড়। সে যেন নিজের অস্তিত্বটুকুও ভুলে গেছে। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে নিথর হয়ে সবকিছু শুনে যাচ্ছে।
গুঞ্জনকে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে প্রেমের মায়ের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। অজান্তেই একটু জোরে তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে এলো
গুঞ্জন!
মায়ের মুখে উচ্চারিত নামটা যেন প্রেমের বুকের ভেতর বজ্রপাতের মতো আঘাত করল।
এতক্ষণ বাবার কথায় শক্ত থাকার চেষ্টা করছিল প্রেম। কিন্তু গুঞ্জন নামটা কানে আসতেই তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
তাহলে?গুঞ্জন কি সবটা শুনে ফেলেছে?
ওর বাবার বলা প্রতিটা কথা? ওকে নিয়ে বাবার সেই কঠিন সিদ্ধান্ত? গুঞ্জনকে মেনে না নেওয়ার কথা?
প্রশ্নগুলো একের পর এক মনের মধ্যে আছড়ে পড়তে লাগল।
গুঞ্জনকে হারানোর ভয়টা মুহূর্তেই কয়েকগুণ তীব্র হয়ে উঠল প্রেমের মধ্যে। যে ভয়টা এতক্ষণ বুকের এক কোণে লুকিয়ে ছিল, এবার সেটাই যেন তার সমস্ত অস্তিত্ব গ্রাস করে নিল।
প্রেম ধীরে ধীরে চোখ তুলল।কাঁপা দৃষ্টিতে তাকাল সদর দরজার দিকে।
আর পরক্ষণেই তার বুকটা যেন থমকে গেল।গুঞ্জন সত্যিই দাঁড়িয়ে আছে সেখানে।
কোনো কথা নেই। কোনো অভিযোগ নেই। এমনকি চোখে কোনো রাগও নেই।
শুধু অদ্ভুত এক শূন্যতা।যে শূন্যতা প্রেমের কাছে রাগের থেকেও ভয়ংকর।
গুঞ্জনের চোখ দুটো ছলছল করছে। ঠোঁট দুটো শক্ত করে চেপে রেখেছে, যেন একটু নড়লেই কান্না বেরিয়ে আসবে। তার দৃষ্টি একবার প্রেমের দিকে স্থির।
পরক্ষণেই প্রেমের বুক ফেটে একটা চাপা কান্না বেরিয়ে এলো।
গুঞ্জন...
কণ্ঠটা এতটাই ভাঙা ছিল যে নিজের কণ্ঠস্বর নিজেই চিনতে পারল না প্রেম।
তার আর বুঝতে বাকি রইল না গুঞ্জন সবটা শুনে ফেলেছে।
মুহূর্তেই মাথার ভেতরটা যেন ঝিমঝিম করে উঠল।
সে জানে গুঞ্জন এমনিতেই তার প্রতি কঠোর। কতবার যে নিজের অনুভূতিগুলো লুকিয়ে তার কাছ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করেছে মেয়েটা! কত অভিমান জমে আছে তার মনে!
আর আজ...আজ সেই মেয়েটাই শুনে ফেলেছে তার বাবার মুখে বলা কথাগুলো।
প্রেমের মনে হলো, এবার হয়তো গুঞ্জন তার দিকে আর কোনোদিন ফিরেও তাকাবে না।
এই একটা চিন্তাই তার বুকের ভেতর অসহ্য যন্ত্রণা শুরু করে দিল।
সে গুঞ্জনের দিকে এক পা এগিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু পা যেন মাটির সঙ্গে আটকে গেছে।
কী বলবে সে?কীভাবে বোঝাবে?
কীভাবে বলবে, পৃথিবীর সবাই তাকে ছেড়ে গেলেও সে গুঞ্জনকে ছাড়তে পারবে না?
প্রেমের চোখ বেয়ে টুপটুপ করে পানি পড়তে লাগল।
প্রেম কাঁপা কাঁপা গলায় বলে
গুঞ্জন, তুমি...
কোনো উত্তর এলো না।
গুঞ্জন শুধু তাকিয়ে রইল তার দিকে।
সেই দৃষ্টিতে এমন কিছু ছিল, যা প্রেমকে ভেতর থেকে টুকরো টুকরো করে দিচ্ছিল।
প্রেম আবারও কাঁপা গলায় বলল
গুঞ্জন ত,তুমি বাবার কথায় কিছু মনে কর
কথাটা শেষ করার আগেই গুঞ্জন ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে নিল।
তার চোখের কোণ থেকে একটা অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ল।
সেই অশ্রুবিন্দুটা যেন প্রেমের বুকের ওপর গিয়ে পড়ল।
প্রেম আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
এক পা এগিয়ে গিয়ে অসহায় কণ্ঠে বলল
আমার ওপর রাগ করো, অভিমান করো... যত খুশি শাস্তি দাও। কিন্তু প্লিজ, আমার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না। তোমাকে হারানোর ভয়টা আমি সহ্য করতে পারি না, গুঞ্জন।
কথাগুলো বলতে বলতে প্রেমের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এলো।
জানে না এই মুহূর্তের পর তাদের সম্পর্কটা কোন দিকে যাবে।
শুধু এটুকুই জানে
গুঞ্জনকে হারানোর কথা ভাবলেই তার বুকের ভেতরটা যেন কেউ মুঠো করে চেপে ধরে।
প্রেম বুঝতে পারছে ভালোবাসার মানুষকে হারানোর ভয় কতটা ভয়ংকর হতে পারে।
গুঞ্জন শুধু কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
ভালো থাকবেন, প্রেম।
কথাটা বলেই আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না গুঞ্জন। চোখের পানি আড়াল করতে করতে দৌড়ে চলে গেল সে।
ভালো থাকবেন মাত্র দুটি শব্দ। অথচ শব্দ দুটো যেন এসে প্রেমের বুক চিরে সরাসরি হৃদপিণ্ডে আঘাত করল। বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন ফাঁকা হয়ে গেল তার। গুঞ্জনের চলে যাওয়া পা দুটো যেন তার সমস্ত শক্তি কেড়ে নিল।তাহলে কি সত্যিই সে গুঞ্জনকে হারিয়ে ফেলল?
যে মেয়েটাকে নিজের অজান্তেই জীবনের প্রতিটি নিঃশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলেছে, আজ সেই মেয়েটাই তাকে বিদায় দিয়ে চলে গেল!
প্রেম আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। দুর্বল পায়ে কয়েক কদম এগিয়ে হঠাৎ হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল মাটিতে। মাথাটা নিচু হয়ে গেল। বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্টটা যেন কোনোভাবেই বের হতে চাইছে না, অথচ চোখের পানি বাধা মানছে না।
প্রেমের মা দূর থেকে ছেলের এমন অবস্থা দেখে আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। ছুটে এসে ছেলের পাশে বসে পড়লেন।
প্রেম!
মায়ের কণ্ঠ শুনেই যেন এতক্ষণ ধরে নিজেকে শক্ত করে রাখা বাঁধটা ভেঙে গেল।
পরম অসহায়ের মতো প্রেম মাকে জড়িয়ে ধরল। মায়ের বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল সে।
মা... আমি ওকে হারাতে চাই না। আমি গুঞ্জনকে হারাতে পারব না মা।
কথাগুলো বলতে বলতে তার গলা ভেঙে যাচ্ছিল।
আমি জানি না কখন ও আমার জীবনের এতটা জুড়ে চলে এসেছে। জানি না কখন ওকে ছাড়া একটা মুহূর্তও কল্পনা করতে পারি না। কিন্তু আজ... আজ ও আমাকে বলল, ‘ভালো থাকবেন’! মা, এই কথাটার মানে কী? ও কি আমাকে ছেড়ে চলে গেল?
প্রেমের মা ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। কিন্তু তার নিজের চোখও ততক্ষণে অশ্রুসিক্ত।
প্রেম আরও শক্ত করে মাকে আঁকড়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
একটু থেমে ভাঙা গলায় আবার বলল,
মা, আমি ওকে ভালোবাসি। ভীষণ ভালোবাসি। আমি ওকে হারিয়ে ফেললে আমি আর বাঁচতে পারবোনা।
প্রেমের কণ্ঠে এবার আতঙ্ক স্পষ্ট।
মা, তুমি গুঞ্জনকে ফিরিয়ে দাও। প্লিজ মা... ওকে বলো আমাকে ছেড়ে যেন না যায়।
মায়ের বুকের ওপর মাথা রেখে প্রেম ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
আজ প্রথমবার প্রেমের মা দেখলেন, তার কঠিন, জেদি ছেলেটা ভালোবাসার কাছে কতটা অসহায়।
প্রেম এবার বাবার দিকে এগিয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই বাবার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল সে। দু’হাত দিয়ে বাবার পা আঁকড়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।
বাবা… ও বাবা…!
কথাগুলো বলতে গিয়ে তার কণ্ঠ বারবার কেঁপে উঠছে। চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে অবিরত। এতটা অসহায় প্রেমকে হয়তো তার বাবা কোনোদিন দেখেননি।
ছোটবেলা থেকে তোমার কাছে যা চেয়েছি, বাবা, তুমি কখনো আমাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দাওনি। আমার মুখে চাওয়ার আগেই তুমি আমার সব আবদার পূরণ করেছো। তাহলে আজ কেন আমার একটা চাওয়া তুমি ফিরিয়ে দিচ্ছো? আজ কেন আমার কষ্টটা বুঝতে চাইছো না?
প্রেম বাবার পা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল।
বাবারা কি কখনো সন্তানের কষ্ট দেখতে পারে, বাবা? বাবারা তো সন্তানের চোখের পানি সহ্য করতে পারে না। তাহলে তুমি আজ এতটা নিষ্ঠুর হচ্ছো কেন? তোমার এই ছেলেটার প্রতি এতটা কঠোর হয়ো না বাবা। আমি তোমার কাছে টাকা-পয়সা, বাড়ি-গাড়ি কিছুই চাইছি না… শুধু গুঞ্জনকে চাইছি।
কথাটা বলতে গিয়েই প্রেমের গলা ভেঙে গেল।
আমি গুঞ্জনকে ভালোবাসি বাবা। ওকে ছাড়া আমি সত্যিই বাঁচতে পারব না। তুমি যদি ওকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নাও, তাহলে হয়তো আমার শরীরটা বেঁচে থাকবে, কিন্তু ভেতর থেকে আমি প্রতিদিন একটু একটু করে মরে যাব।
প্রেম কাঁদতে কাঁদতে বাবার পায়ে মাথা ঠেকাল।
বাবা, তোমার কাছে হাতজোড় করে বলছি… আমাকে আমার ভালোবাসাটা কেড়ে নিও না। তুমি চাইলে আমাকে শাস্তি দাও, আমার ওপর রাগ করো, আমাকে বকো… কিন্তু গুঞ্জনকে আমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিও না।
কিছুক্ষণ থেমে কান্নাভেজা চোখে বাবার দিকে তাকাল প্রেম।
গুঞ্জন আমার শুধু ভালোবাসা নয় বাবা… ও আমার বেঁচে থাকার কারণ হয়ে গেছে। ওকে ছাড়া আমি কীভাবে থাকব বলো? সকালে ঘুম থেকে উঠে যাকে খুঁজি, রাতে ঘুমানোর আগে যার কথা মনে পড়ে, যার হাসিতে আমার পৃথিবীটা পূর্ণ হয়ে যায়।সেই মানুষটাকেই যদি আমার কাছ থেকে কেড়ে নাও, তাহলে এই জীবনটা নিয়ে আমি কী করব?
বাবার পা আঁকড়ে ধরে প্রেম ফুঁপিয়ে উঠল
বাবা, তুমি তো আমার বাবা… আমার পৃথিবীর সবচেয়ে আপন মানুষ। তুমি যদি আমার ভালোবাসাটুকুও না বোঝো, তাহলে আমি কার কাছে যাব? কার কাছে হাত পাতব? তুমি না বলো না বাবা… প্লিজ। আমাকে গুঞ্জনকে নিয়ে বাঁচতে দাও।
শেষ কথাটা বলতে বলতে প্রেমের চোখের পানি বাবার পায়ের ওপর টুপটুপ করে পড়তে লাগল।
আমি তোমার অবাধ্য হতে চাই না বাবা… কিন্তু গুঞ্জনকে ছেড়ে দিতেও পারব না। আমাকে এমন একটা পথের সামনে দাঁড় করিয়ে দিও না, যেখানে একদিকে আমার বাবা আর অন্যদিকে আমার ভালোবাসা… কারণ বাবা, আমি দু’জনের কাউকেই হারাতে চাই না।
চলবে,,,,