#খান_সাহেব
#সুমাইয়া_জাহান
#পর্ব_39 ✦ প্রথমাংশ ✦
ঘড়িতে ভোর পাঁচটা। বাইরের হালকা আলো ঘরের পর্দা ভেদ করে সুমুর মুখে পড়ছে। জানালার ফাঁক গলে হালকা আলো পড়ছে বিছানার একপাশে। সাদা পর্দার নরম দোলা, আর এক মধুর নীরবতা ঘিরে আছে রুমটা। সুমুর চোখ খুলতেই খেয়াল হলো, পাশটা খালি।
সে আধো ঘুমে চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে বসল। সাদা চাদরটা কোমর পর্যন্ত টেনে নিয়ে আলতো করে ডাকল,
“খান সাহেব?”
শেরাজ টাওয়েল ঘাড়ে ঝুলিয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে এলো। ওড়নায় মুখ ঢেকে আধো ঘুম চোখে ওয়াশরুমের দিকে তাকাল সুমু। শেরাজ একটা মিষ্টি হাসি উপহার দিয়ে বলল,
“গুড মনিং! সুইটহার্ট।”
“গুড মনিং! আজ আপনি এত ভোরে উঠে গেলেন? তাও আমার আগে?”
“হুম! আমি ভোরেই ঘুম থেকে উঠি। বিয়ের পর একটু নিয়মগুলো চেঞ্জ হয়েছিল। নামাজ পড়বেনা, সুইটহার্ট? উঠে, অযু করে এসো।” শেরাজের গলায় প্রশান্তি, কিন্তু কন্ঠে গম্ভীরতার সাথে আদেশ।
সুমু মুচকি হেসে উঠে দাঁড়াল।
“আপনি এত গম্ভীর হলে, ভয় লাগে।”
শেরাজ কাছে এসে সুমুর কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,
“সৃষ্টিকর্তার সামনে ভয় থাকা ভালো, তবে আমার সামনে না। আমি তো তোমার দোয়া হয়েই এসেছি। আমি তোমার জন্য ভয়ের কিছু না।”
সুমু মুচকি হেসে ওয়াশরুমে চলে গেল। ওযু করে এসে দুজনে একসাথে নামাজে দাঁড়াল। নামাজ শেষ করে রোজকারের মতো দুজন দুজনের জন্য মোনাজাতে দোয়া করল। শেরাজ সুমুকে কাছে টেনে কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,
“এই রকম সকাল আমি সারাজীবন চাই। শুধু তুমি, আমি আর নামাজের সিজদার মাটি।”
সুমু আলতো হেসে আস্তে করে বলল,
“আপনি থাকলে প্রতিটা সকালই ইবাদতের মতো পবিত্র লাগে, খান সাহেব।”
দুজনের মুচকি হেসে জায়নামাজ ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সুমু জায়নামাজ ভাঁজ করে রেখে, আবার চাদর মুড়িয়ে বিছানায় ঢুকে পড়ল। শেরাজ জিম-ম্যাট বের করে ফ্লোরে ব্যায়াম শুরু করল। সুমু আলতো হেসে বলল,
“জিম সেন্টারে যান না কেন এখন? আর প্রতিদিন ওয়ার্কআউট করতে কেমন লাগে আপনার? আপনি এতো হ্যান্ডসাম। তাছাড়া এখন তো আপনার বিয়ে হয়ে গেছে। এখন এতো ফিট থেকে লাভ কি আপনার?”
পুশ আপ করতে করতে শেরাজ বলল,
“আপনার জন্যই তো শরীর ঠিক রাখতে হয়, মিসেস খান। আর তাছাড়া, ফিট থাকা ভালো। ফিট থাকলে রোমান্স করে মজা আছে। এখন ফিট থাকলে বুড়ো বয়সে কাজে লাগবে। আমি বুড়ো হয়ে গেলেও, আমার রোমান্সের থেকে রক্ষা পাবেন না আপনি।”
সুমু ঘুম জড়ানো গলায় বলল,
“তখন আপনি এতো এনার্জি পাবেন না।”
“পাবো সুইটাহার্ট। আগে বুড়ো হই, তারপর দেখবা বুড়ো বয়সে আমার রোমান্স দেখে তোমার আমাকে পঁচিশ বছর বয়সী তাগড়া যুবক মনে হবে।”
“সকাল সকাল লজ্জায় ফেলবেন না।”
কথাটা বলে সুমু চাদর মুড়ি দিল। শেরাজ আলতো হেসে ওয়ার্কআউটে মন দিল।
•
চায়ের কাপ, দুটো পেস্ট্রি, এক প্লেট কাটা ফল আর খেজুরের সাথে মধু সুমুর সামনে রাখা। সুমুর ব্রেকফাস্ট আজ শেরাজ নিজের হাতে বানিয়েছে। এই নিয়ে অনন্যা খাতুন অনেক রাগারাগি করেছে। শেরাজ সবটা সামলে নিয়েছে। সকলে ব্রেকফাস্ট করে যার যার রুমে চলে গেছে। শুধু শেরাজ আর সুমুই এখনো ব্রেকফাস্ট করেনি। শেরাজ আরিয়ানের সামনে সুমুকে পরতে দিবেনা বলে, ব্যস্ততার অযুহাত দেখিয়ে সুমুকে নিয়ে নিজের রুমে ছিল। সে চায়না সকাল সকাল বাসার মধ্যে কোনো ঝামেলা হোক।
সুমু ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে খাবারের দিকে।
শেরাজ এক চামচ মধু তুলে সোজা সুমুর ঠোঁটে ছোঁয়ায়।
“মধু তো এমনিতেই আছে এখানে।”
সুমু হালকা কেঁশে বলল
“কি করছেন এইসব? কিচেনে অনেকে আছে।”
“বাড়ির সকল সার্ভেন্টরা অলরেডি জেনে গেছে যে, তাদের রাগি, গম্ভীর মেজো সাহেব বর্তমানে তাদের মেজো খান সাহেবরা প্রেমে ডুবে যাওয়া মানুষ।”
“খান সাহেব!”
“বলো সুইটহার্ট!”
সুমু আরও একবার খাবারের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,
“চা বানাতে আপনি তো বেশ পারদর্শী।”
“তুমি যেদিন আমার জীবনে এসেছো, তখন থেকেই আমি সব শিখে নিয়েছি। তুমিই তো আমার মুগ্ধতার ইবাদত, তাই তোমাকে নিজের কাছে একটা পুতুলের মতো করে যত্ন করে রাখার জন্য ইউটিউব দেখে সব ব্রেনের ভেতরে সেট করে নিয়েছি।”
“আপনি এমন করলে আমার সকালটা আর নরমাল সকাল থাকবে না। সবকিছু উপন্যাসের গল্পের মতো হয়ে যাবে।”
শেরাজ এক হাতে কাপ এগিয়ে দিল, অন্য হাতে সুমুর আঙুল ধরে রেখে বলল,
“তুমি আমার গল্পের প্রথম শব্দ। যতদিন যাবে নতুন বাক্য তৈরী হয়ে যাবে, নতুন কবিতা হয়ে যাবে। যার প্রতিটি শব্দে শুধু থাকবে তুমি, আর আমি।”
“বাহ! আপনি তো দেখছি কবিদের মতো কথা বলছেন।”
“নিজের ভালোবাসা তোমার সামনে উপস্থাপন করলাম, আর তুমি কবি বানিয়ে দিলে?”
সুমু আলতো হাসল। প্রসঙ্গ পাল্টে বলল,
“আজ অফিস যাবেন না?”
“না, সানকে বাসায় আসতে বলেছি। আজ আমার সবগুলো ফ্রেন্ড আমার বাড়িতে আসবে। ওদের সাথে আড্ডা দিবো। আর সন্ধ্যায় তো জানোই আমার নিউ শপের ওপেনিং আছে।”
“হুম! রাহিন ভাইয়ার সাথে এখনো ভালো করে কথা হলো না।”
“আগে ব্রেকফাস্ট শেষ করো, তারপর সবাইকে গার্ডেনে ডেকে পাঠাচ্ছি।”
•
গার্ডেনে সোফায় বসে আছে শেরাজ। তার মুখোমুখি বসে আছে স্যান্ডি। হালকা রোদ, হালকা ঠান্ডা হাওয়া আর সেন্টার টেবিলের ওপর রাখা ধোঁয়া ওড়ানো কফির কাপ। শেরাজ কাজ করছে ল্যাপটপে। পুরোপুরি মনোযোগ স্ক্রিনে। কাজের ফাঁকে শেরাজ কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলল,
“স্যান্ডি, এখন আর শুধু ক্লোথিং ব্র্যান্ড না। এস.কে ফ্যাশান এখন একটা স্টেটমেন্ট। আমরা শুধু পোশাক বানাই না, আমরা পরিচয় বানাই। এখন সময় ভিজিবিলিটি বাড়ানোর। এটা এখন একটা স্টাইল বা পরিচয়ের ভাষা। যেই ব্যাক্তিই এস.কে ফ্যাশান পরে, সে নিজেই একটা স্টেটমেন্ট হয়ে দাঁড়ায়। আলাদা করে চিনিয়ে দেয় নিজেকে।”
“অ্যাগ্রি, স্যার! আমি ভাবছি ‘হেরিটেজ মিটস মডার্ন’ থিম নিয়ে চলতি সিজনের ক্যাম্পেইন প্ল্যান করি। পুরনো জামদানি প্যাটার্নের ওপর ওয়েস্টার্ন কাট স্মার্ট, ক্ল্যাসি, আর ইউনিক। ওয়েট আপনাকে আমি ব্যাখা করে বলছি।”
স্যান্ডি কফির কাপে একটা ছোট চুমুক দিয়ে আবারও বলল,
“আমি চাইছি এই সিজনের ক্যাম্পেইনের জন্য এমন একটা থিম নিতে যেটাতে পুরনো ঐতিহ্য আর আধুনিকতা একসাথে মিশে থাকবে। আমার ভাবনা হচ্ছে, পুরনো জামদানি ডিজাইন থাকবে, কিন্তু জামাগুলোর কাটিং বা ডিজাইন হবে ওয়েস্টার্ন স্টাইলের। যেমন ধরুন, ব্লেজার বা ট্রেঞ্চ-কোট টাইপ কাট, বা ওয়েস্টার্ন স্টাইলের ড্রেস, কিন্তু ফেব্রিক আর প্যাটার্ন হবে একদম দেশি, যেমন জামদানি। আর ফ্যাশনটা হবে, স্মার্ট (আধুনিক লুক), ক্ল্যাসি (রুচিশীল), ইউনিক (সবচেয়ে আলাদা)। এই মিলনটাই হচ্ছে ‘‘হেরিটেজ মিটস মডার্ন’ থিমের মূল আইডিয়া। মানে, পুরনো ঐতিহ্য প্লাস আধুনিক স্টাইল সমান নতুন ট্রেন্ড।”
শেরাজ চোখ সরু করল। তার গলার স্বরটা নেমে এলো নিচু তালে।
“আমাদের অডিয়েন্স কারা জানো? শুধু ধনী, পার্টি-গোয়িং ক্লাস না। আমি এমন কিছু চাই, যেটা ইউনিক, চোখে পরার মতো, কিন্তু, অ্যাফোর্ডেবল। জানো কেন? কারণ আমি চাই, একজন আর্ট কলেজের স্টুডেন্টও যেন সেটা গর্ব করে পরতে পারে। আবার, একজন কর্পোরেট এক্সিকিউটিভও সেটা কনফিডেন্সে ক্যারি করতে পারে।”
“তাহলে মাস মার্কেটিং এর সাথে টার্গেটেড লাইনে যাই? দুইটা লাইন ‘এস.কে লাক্স’ আর ‘এস.কে কোর’।”
“এক্স্যাক্টলি! ‘এস.কে লাক্স’ হবে লিমিটেড কালেকশন। ‘এস.কে’ হবে রোজকার ব্যবহার উপযোগী, স্টাইলিশ অথচ মিনিমাল। একজাম্পল, ‘এস.কে লাক্স’ হবে এক্সক্লুসিভ, লিমিটেড কালেকশন। যেটা প্রিমিয়াম ক্লায়েন্টদের জন্য। ডিজাইনে থাকবে একটা লাক্সারিয়াস টাচ, হয়তো সিল্ক, হ্যান্ডওয়ার্ক, বা ইউনিক কার্ট। দামও একটু বেশি হবে, কারণ এটা স্পেশাল ইভেন্ট বা ওকেশনের জন্য। আর ‘এস.কে কোর’ হবে রোজকার ব্যবহারের জন্য। অফিস, ইউনিভার্সিটি, বা ক্যাজুয়াল আউটিং। ডিজাইন হবে মিনিমাল, তবে ট্রেন্ডি আর স্টাইলিশ। দামটাও থাকবে অ্যাফোর্ডেবল রেঞ্জে, যাতে সবাই কিনতে পারে। এখন যেটা দরকার, সেটা হলো সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য একটা নতুন ফেস। যেটা ব্র্যান্ডের দুইটা লাইনকেই রিপ্রেজেন্ট করতে পারবে। মানে, ‘এস.কে লাক্স’ এর জন্য তার মাঝে থাকতে হবে এক্সক্লুসিভ গ্ল্যামার, এলিগ্যান্স। ‘এস.কে কোর’ এর জন্য থাকতে হবে ন্যাচারাল চার্ম, রিলেটেবল পার্সোনালিটি। একজন মডেল না, বরং ব্র্যান্ড আইকন, যাকে দেখে ফলোয়াররা ভাববে, আমি যেমন, সেও তেমন বা আমি ওর মতো হতে চাই।”
স্যান্ডি একটু হেসে বলল,
“ম্যামকে সামনে আনার কথা ভাবছেন না তো?”
“সে তো আমার ব্র্যান্ডের রুহ। কিন্তু ও ক্যামেরার সামনে স্বচ্ছন্দ না। আমি চাই ওকে নিয়ে একটা বিহাইন্ড দ্য-সিনস ডকুমেন্টারি বানাই ‘দ্য সোল অফ এস.কে’। যেমন, ‘রুহ’ মানে ‘আত্মা’। অর্থাৎ এস.কে ব্র্যান্ডটা কেবল বাইরের ডিজাইন না। তার ভেতরে যে গভীরতা, ভালোবাসা, যত্ন, সবকিছুই সুমু। সে সামনে না থাকলেও, সে সবকিছুর মূল হবে। কিন্তু, সুমু যেহেতু ইন্ট্রোভার্ট টাইপ, স্পটলাইট পছন্দ করে না, তাই ওর উপস্থিতি নীরব, কিন্তু অনেক গভীর। তাই প্ল্যান, একটা বিহাইন্ড দ্য-সিনস ডকুমেন্টারি বানাব। নাম হবে ‘দ্য সোল অফ এস.কে’। এই ডকুমেন্টারিটা কীভাবে করবে শোনো? কনসেপ্ট, ছোট একটা ফিল্ম বা ভিডিও। ক্যামেরা সুমুর পেছনে থাকবে, কিন্তু ওর ছোঁয়া, ওর নীরব নেতৃত্ব সব ফুটে উঠবে। যেমন, সুমু কাপড় ছুঁয়ে দেখছে, ডিজাইন ঠিক করছে, হালকা হাসছে, কিন্তু ক্যামেরার দিকে তাকাচ্ছে না। আমার ভয়েসওভার হবে, ‘ওর ছোঁয়া ছাড়া কিছু পূর্ণ হয় না। সে সামনেই থাকে, শুধু আলোটা নিজের করে না।’ এইভাবে করলে, মানুষ বলবে, আহা! এটাই তো ভালোবাসা। এটাই তো সত্যিকারের ব্র্যান্ড। তাহলে কি বুঝলে সান?
এস.কে মানেই তখন হবে একটি অনুভব, একটি গল্প। সুমু হয়ে উঠবে “দ্য আনসিন স্টার’, আর সেটাই ব্র্যান্ডের বিশেষত্ব।”
“কিন্তু, স্যার সোশ্যাল মিডিয়াতে কীভাবে ব্যবহার করব?”
“ট্রেলার রিল দাও, ‘কামিং সুন, দ্য আনসিন স্টোরি অফ এসকে’। হ্যাশট্যাগ ‘দ্য সোল অফ এস.কে’। আমার কথার কোটেশন, ‘সব মুখ আলো চায় না, কিছু মুখ শুধু আলো ছড়িয়ে দেয়। এস.কে-এর প্রতিটি ছাঁটেই তার ছোঁয়া’।”
থামলো শেরাজ। কফির কাপে চুমুক দিয়ে আবারও বলল,
“আরও একটা দারুণ আইডিয়া, ডকুমেন্টারির পরেই শুরু করো, ‘সুমু এডিট’ মানে, সুমুর পছন্দের কালেকশন। এস.কে লাক্স আর এস.কে কোর-এর মধ্যে যা সে নিজে বেছে নেবে।”
স্যান্ডি হালকা গম্ভীর হয়ে বললো,
“পাওয়ারফুল আইডিয়া, স্যার। মানুষ দেখবে শুধু কাপড় না, জীবনের গল্প। ইমোশনস বেচলে ইমপ্যাক্ট আসে।”
“হুম রাইট! যখন পণ্যের সঙ্গে আবেগ জুড়ে দেওয়া হয়, তখন সেটার প্রভাব অনেক বেশি হয়। ব্র্যান্ড তখন আর শুধু ব্র্যান্ড থাকে না, সেটা হয়ে ওঠে একটা অনুভূতি।”
“ঠিক বলেছেন, স্যার।”
“একটা কাজ করো, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে দুইটা লাইন প্রেজেন্টেশন রেডি করো। মডেল লিস্ট, অর্থাৎ কোন কোন মডেল কোন পোশাক পরবে, তাদের নাম ও লুক। ফ্যাব্রিক কস্টিং, কাপড়ের ধরন, সাপ্লায়ার, ও খরচের হিসাব। বিজনেস প্রজেকশন, দুইটা লাইন থেকে কী পরিমাণ লাভ আশা করা যায়, মার্কেট ট্রেন্ড অনুযায়ী। আর এস.কে ফ্যাশন এর নতুন ট্যাগলাইন ঠিক করো। ‘ওর্ন উইথ প্রাইড’ ঠিক আছে?”
“ডান। লেটস মেক এসকে নট জাস্ট আ ব্র্যান্ড... বাট আ মুভমেন্ট।”
শেরাজ হালকা হাসল। ঠিক তখনই ছোট্ট একজোড়া পা চুপচাপ পেছন থেকে এগিয়ে এসে বলল,
“তুমি আমাল জন্য নিউ থেলনা আনোনি?”
শেরাজ চমকে তাকিয়ে দেখল, ফিরোজা মুখ ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। স্যান্ডি আলতো হাসল। শেরাজ ফিরোজাকে কাছে টেনে এনে কোলের ওপর বসিয়ে অসহায় কন্ঠে বলল,
“ওহ মাই লাভ! আমি তো ভুলে গেছি।”
ফিরোজা গলা নিচু করে বলল,
“তুমি তেবল নিউ ফ্রেন্ডের তথা ভাবো। আমাল কথা এতন আল ভাবোনা।”
“লাভ, আমি তো সব সময় তোমার কথাই ভাবি।”
“তুমি তত্যি বলত, ভাইয়া?”
“হ্যাঁ। তুমি তো আমার ছোট্ট রাজকন্যা।”
ফিরোজা একটু হেসে ফেললো। সে লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে বলল,
“তুমি আমাল ভাইয়া। তুমি নিউ ফ্রেন্ডের থেকেও আমাতে বেতি ভানোবাতবা। আমাল মতো কনে তাউতে ভানোবাতবা না।”
শেরাজ তার ছোট্ট হাত দুটো ধরে বলল,
“না, বাসব না। তোমার মতো করে আমি কাউকে ভালোবাসব না, লাভ।”
ফিরোজা এবার খুশি হয়ে বলল,
“তাহনে, আমাল জন্য একটা পিংতি কিতি আনবে তাল?”
“ওকে লাভ। তোমার কথা আমি আর ভুলব না, মাই লাভ। কথা দিলাম, কাল তোমার জন্য একটা পিংকি কিটি আনব।”
“আল নিউ ফ্রেন্ডকে বলবা, সে যেন তোমাল থেকে বেতি আমাতে আদল করে।”
শেরাজ হেসে বলল,
“তোমার কথাই তো শেষ কথা প্রিন্সেস।”
ফিরোজা খুশি হয়ে হাততালি দিল। শেরাজ ফিরোজার গালে ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,
“এখন আমি একটু কাজ করছি। তুমি তোমার নিউ ফ্রেন্ডের কাছে যাও।”
ফিরোজা কোল থেকে নেমে বাড়ির ভেতর দৌড়ে চলে গেল। তখনই শেরাজের সব ফ্রেন্ডরা এসে হাজির হলো। আইয়ুব নাজমিনের সাথে ফোনে কথা বলতে বলতে একটু সাইডে গিয়ে দাঁড়াল।
আইয়ুব হেসে বলল,
“এই সকালটা পুরো তোমার মতো।”
নাজমিন চমকে, কিন্তু ঠোঁটে হাসি রেখে বলল,
“আপনি কি সবসময় এভাবে কথা বলেন? না শুধু আমার সাথে কথা বললেই কবি হয়ে যান?”
“তোমার কন্ঠ শুনলেই কবিতা লিখতে ইচ্ছে করে, ব্রাউন গার্ল।”
নাজমিন কিছুটা লজ্জা পেয়ে বলল,
“আপনি আমাকে এই নামে ডাকেন কেন?”
“কারণ তোমার চোখের রঙ, তোমার ত্বকের ছায়া, তোমার অভিমান, সব একসাথে একটা গল্প বলে। একটা গভীর, রঙিন গল্প।”
“আপনি শুধু কথা দিয়েই মানুষকে মুগ্ধ করেন? নাকি কাজেও সেইরকম?”
“আমি সবকিছুতেই পারদর্শী। বলো তুমি আমাকে কেমন দেখতে চাও?”
“আমি শুধু এটা চাই, আপনি কখনো বদলে যাবেন না।”
“আমি যদি বদলাই, তাহলে ওই আকাশটা গোলাপি হয়ে যাবে। তুমি তো জানো, আমি ব্রাউন গার্লের সব কথা রাখি।”
“আপনি এতো চাপা কীভাবে মারেন? আকাশের রং গোলাপি আপনি বদলে গেলেও হবেনা। যতসব ফালতু কথা।”
“এই ছাম্মাক ছালো, আমি কোনো চাপা মারিনি। সব সত্যি বলছি।”
“আপনি আবার আমাকে ছাম্মাক ছালো বললেন? আপনি একা ছাগল। আমি আপনাকে ভুল করে এতক্ষণ ফিল্মি প্রেমিক ভাবছিলাম।”
“এই তুমি কি বললে? আমি ছাগলের বাচ্চা? তবুও তুমি এই ছাগলের বাচ্চাটার প্রেমে পড়েছো।”
“আপনার প্রেমে পড়ে তো পেট খারাপের মতো অবস্থা। পচা গু খাইলেও বোধহয় কারো পেটের এতো খারাপ অবস্থা হবেনা।”
আইয়ুব নাটকীয় ভাবে বুক চেপে ধরে বলল,
“আহা, প্রেমে পাগল আইয়ুবের এত বড় অপমান। ভালোবাসা টয়লেটে ফ্লাশ করে দিলে তো? কাজটা ঠিক করলেনা।”
“হুম হয়েছে যান তো। সবসময় উল্টাপাল্টা লজিক দিয়ে কথা বলেন।”
কথাটা বলে নাজমিন কল কেটে দিল। পেছন থেকে আইয়ুবের সব কথাশুনে সারবাজরা হাসিতে ফেঁটে পড়ল। রাহিন চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে মুখ টিপে হেসে বলল,
“ভাই, আইয়ুবরে দেখলি? পুরা নিব্বাদের মতো প্রেম করে বেড়াচ্ছে। এইসব নাটক তো আমি কলেজে দেখতাম।”
নিহাল বলল,
“আহা, আইয়ুব ভাইয়ের প্রেম এখন পিওর স্ন্যাকস! ব্রাউন গার্লরে দেখে সে কবি হয়ে গেছে। পুরাই এস.কের মতো।”
শেরাজ চোখ সরু করে, ঠোঁটে চাপা হাসি নিয়ে বলল,
“আইয়ুবের টপিকের মধ্যে হেডলাইনে আমার নাম উঠলো কেনো?”
সারবাজ হাসতে হাসতে বলল,
“তুই আইয়ুবরের প্রেম আলাপ শুনেছিস। আল্লাহ গো, আমি হাসতে হাসতেই মারা যাবো।”
শেরাজ চোখ মেরে বলল,
“ওরে প্রেম করতে দে। ব্রাউন গার্লকে কাঁদালে, আইয়ুব আবার রেগে যাবে।” সে হালকা হেসে আবারও আইয়ুবকে বলল, “তোর প্রেম আলাপ ভালো ছিল। কিন্তু সাবধানে করবি। আমি হেডমাস্টার! যখন তখন তোর প্রেমের বারোটা বাজিয়ে দিব।”
আইয়ুব মুখ ভেঙিয়ে বলল,
“তুই হেডমাস্টার হলে, আমি হলাম ক্লাসের মনিটর।”
সকলে একসাথে হেসে উঠল। এমন সময় রিয়াজ এসে বলল,
“আমি বলেই দিচ্ছি, ভাবিজি আজ থেকে আমার পার্টনার।”
সবাই থমকে তাকাল। শেরাজ চোখ তুলে তাকিয়ে ঠোঁটে বাঁকা হাসি রেখে বলল,
“রিয়াজ, তোর এই সিদ্ধান্ত কি ফাইনাল?”
“হ্যাঁ। তুমি তো সব সময় রাগ করো। ভাবিজিকে আমি একটুও কাঁদতে দেব না।”
“তাই নাকি! আমি রাগ করি বলেই তুই আমার সুইটহার্টকে নিয়ে নিতে এসেছিস?”
নিহাল বলল,
“এখনকার ছোটরা ডেঞ্জারাস। বড়রা যত কিছুই করে, ওরা এক লাইনে এগিয়ে দাবী করে।”
সারবাজ হেসে বলল,
“তবে এখন থেকে সুমুর নাম হবে রিয়াজা জাহান।”
শেরাজ গম্ভীর গলায় বলল,
“সবাই চুপ। আমার সুইটহার্টকে নিয়ে কেউ রসিকতা করবি না। বিশেষ করে আমার প্রতিদ্বন্দ্বি রিয়াজ।”
রিয়াজ হাত তুলে বলল,
“ঘোষণা করছি! আমি রিয়াজ খান, এইমাত্র সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, আজ থেকে ভাবিজি আমার পার্টনার। ওনাকে কেউ আর শেরাজ খানের স্ত্রী বলবে না।”
“রিয়াজ, একটু সামনে আয় ভাই। আমি তোকে একটু আদর করি।”
রিয়াজ হেসে বলল,
“তোমার আদর আমার লাগবেনা। ভাবিজি আমার কিউট পার্টনার। তার আদর আমার লাগবে। আমি কাল রাতেই টিকটকে ঘোষণা দিয়েছি, অলরেডি আমার ৫০০ ফলোয়ার।”
নিহাল বলল,
“ভাইরে ভাই! এই যে বলেছিলাম না, টিকটক একটা বিপদ।”
আইয়ুব হেসে বলল,
“বাহ! রোমান্টিক রিয়াজ।”
সারবাজ রিয়াজের টিকটক একাউন্ট চেক করে বলল,
“রিয়াজের টিকটক বায়ো দেখ সবাই,‘শেরাজ ব্রোকে হারিয়ে আমি জিতেছি’।”
শেরাজ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“বাচ্চা ছেলে ভেবেছিলাম। এখন দেখি প্রেমিক হয়ে গেছে। এইসব কোথা থেকে শিখছে ও?”
শাহরুখ পেছন থেকে বলল,
“ভাই, আমার কাছে একটা ডিভোর্স ফর্ম আছে। চাইলে দিয়ে দিই, এখনই ভাবিজি রিয়াজের নামে ট্রান্সফার হয়ে যাক।”
রাহিন হেসে বলল,
“শেরাজ ভার্সাস রিয়াজ — সিজন ওয়ান শুরু হয়ে গেছে।”
“আমি পার্টনার বলেছি মানেই পার্টনার। আজ থেকে আমি ভাবিজির হিরো, রিয়াজ খান।
শেরাজ উঠৈ রিয়াজকে ধাওয়া করল। রিয়াজ দৌড়ে পালালো। বাকিরা একসাথে আট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।
•
সামিয়া, নাজমিন আর শাহরুখ ড্রয়িংরুমে বসে টিভি দেখছে। আজ শাহরুখ বাড়িতেই আছে। ফারিয়া এলো শেখ বাড়িতে। গিয়ে বসল সামিয়া আর নাজমিনের পাশে। শাহরুখকে দেখে বলল,
“ভাইয়া, তোমার সাথে একটা সিরিয়াস কথা আছে।”
শাহরুখ না শোনার ভান করে বসে রইল। ফারিয়া কাঁধের ওড়না ঠিক করে আবারও বলল,
“তুমি না, একদম অসহ্য! আমি একটা সিরিয়াস কথা বলতে চাইছি, আর তুমি শুনছ না।”
শাহরুখ না তাকিয়ে বলল,
“তোর সিরিয়াস কথাও কার্টুনের মতো শোনায়, কী করি বল তো?”
“তুমি জানো একটা মেয়ে তোমাকে অনেক পছন্দ করে?”
“হুম, জানি। পাশের বাসার সুন্দরী মেয়েটা তো বলেছিল, আমি নাকি খুব হ্যান্ডসাম।”
“কিহ! তুমি পাশের বাসার মেয়েদের সাথে কথা বলো? আর আমি যে তোমাকে সিরিয়াসলি ভালোবাসি, তুমি বুঝোই না।”
শাহরুখ এবার তাকাল, একটু স্মিত হেসে বলল,
“ভালোবাসা শুধু বললেই হয় না, প্রমাণ লাগে।”
“তোমাকে রোজ সহ্য করি, এটাই সবচেয়ে বড় প্রমাণ।”
শাহরুখ হাসতে হাসতে বলল,
“তবে আর কী? তোর এই সাহসিকতার জন্য একটা পুরস্কার দেওয়া উচিত। শাহরুখ সহ্য করার পুরস্কার।”
“একদিন আমি যদি সত্যি চলে যাব। তখন বুঝবা।”
শাহরুখের চোখে একটু গভীরতা, কিন্তু মুখে ব্যঙ্গ করে বলল,
“তুই গেলে আমি কাঁদব না, বরং পকোড়া ভেজে পার্টি করব।”
নাজমিন আর সামিয়া নিরব দর্শকের মতো দুজনের কথা শুনছে। ফারিয়া নরম গলায় বলল,
“একটা কথা বলব, ভাইয়া?”
শাহরুখ না তাকিয়েই বলল,
“তুই আবার কী নতুন নাটক শুরু করবি?”
ফারিয়া হালকা অভিমান নিয়ে বলল,
“তুমি তো জানো না, আমার ভেতরে কত কথা জমে থাকে।”
শাহরুখ কিঞ্চিত বিরক্ত হয়ে বলল,
“আবার যদি সেই ভালোবাসার সংলাপ শুরু করিস, তাহলে আমি কিন্তু উঠে চলে যাব।”
ফারিয়া কষ্ট চেপে বলল,
“কেন? ভালোবাসলে বলতে নেই?”
“তুই বুঝিস না, তাই বলিস। আমি এসব ভালোবাসা-টাসা বিশ্বাস করি না। মাথা খারাপ করে দিবি একদিন তুই আমার।”
ফারিয়ার চোখে পানি এলো।
“আমি তো বেশি কিছু চাইনা। শুধু তোমাকে একটু ভালোবাসি। এইটুকুও সহ্য হয় না তোমার?”
“না হয়না। যা তো, ডাস্টবিনের মধ্যে গিয়ে মর।”
ফারিয়া রেগে বলল,
“ভাইয়া তুমি নিজেই তো গু মাখা ডাস্টবিনের মতো, সব সময় বাজে কথা বলো। তাহলে তোমার মধ্যেই মরি?”
“আর তুই কী? পচা নর্দমার ওপর লাফ দেওয়া ব্যাঙ।”
“তুমি আমাকে ব্যাঙ বললে, তুমি নিজে হইলা সেপটিক ট্যাঙ্ক। মুখ খুললেই গন্ধ বের হয়।”
“ভাইরে! এই মেয়েটা তো পুরাই গু বোমা। ছুঁইলেই বিস্ফোরণ।”
ফারিয়া ভেংচি কেটে বলল,
“আমি গু বোমা হলে, তুমি হলে গু প্যারা। কারো গায়ে লাগলেই প্যারা শুরু হয়।”
“তোরে একদিন বস্তায় ভরে আসলেই ডাস্টবিনে ফেলে দিবো। লিখে রাখ।”
সামিয়া হেসে বলল,
“ভুলে যেও না ভাইয়া, ফারিয়া আপু তোমার লাইফে সেই বিশেষ গু, যেটা কোনোভাবেই কাটে না।”
শাহরুখ হেসে বলল,
“ও একটা পাগল। পুরাই নর্দমার রাজকুমারী।”
“আর তুমি, গু-র রাজপুত্র ভাইয়া।”
“এই যা তো। নোংরা মেয়ে একটা।”
ফারিয়া, সামিয়া আর নাজমিনকে চোখ মেরে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“ভাইয়া! আজকে কেমন জানি লাগতেছে তোমাকে, যেন হট কেক।”
শাহরুখ হকচকিয়ে বলল,
“তুই আবার কিরকম গাঁজাখুরি কথা বলিস? আমি কেক নাকি? তোর ব্রেইনে গু ঢুকছে?”
ফারিয়া মুচকি হেসে বলল,
“গু না ভাইয়া, প্রেম! তোমারে দেখলেই প্রেম করতে ইচ্ছা করে। গায়ে পড়তে ইচ্ছা করে।”
শাহরুখ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“গায়ে পড়তে ইচ্ছা করে মানে? তুই হয়েছিস একটা নোংরা ময়লা? নর্দমা থেকে উঠে এসেছিস?”
“তুমি নর্দমা আমাকে বললা? নিজেকে দেখো আগে। টয়লেটে পড়ে থাকা পঁচা সাবানের মতো মুখ।”
“তুই তো গু দিয়ে বানানো মানুষ। প্রেমের নাম করে শুধু বাজে পঁচা কথা।”
ফারিয়া আবারও ভেংচি কেটে বলল,
“আমি গু হলে তুমি হইলা সেই টয়লেটের ফ্ল্যাশ, যেটা চাপ দিলেও কিছু নামেনা।”
শাহরুখ ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“আর তুই সেই ডাস্টবিন, যার মুখ খোলা থাকলে পুরো মহল্লায় দুর্গন্ধ ছড়ায়।”
“তুমি হ্যান্ডসাম মনে করো নিজেকে? আয়নার সামনে দাঁড়ালে তো তোমার চেহারা দেখে আয়না নিজেই অক্কা পাবে।”
শাহরুখ ঘাড় কাত করে বলল,
“তোর মুখ খোলামাত্রই চারপাশে সবকিছু থামে যায়। রাস্তায় প্রতিটি মোড়ে মোড়ে লিখে দেওয়া উচিত, সতর্ক থাকুন, ফারিয়া পঁচা কথা বলব এখন। সকলে মুখে মাস্ক বা রুমাল চেপে ধরুন।”
“তোমার মুখ দেখলেই মনে হয়, কেউ হাড়ি ভর্তি বৃষ্টি-ভেজা পচা কাকরোল ছুঁড়ে মেরেছে।”
“তুই আসলেই একটা নর্দমার রাজকন্যা। একদম ডাস্টবিনের দুঃখিনী পরী।”
“আর তুমি সেই টয়লেটের দরজা, যেটা সব সময় খোলা থাকে আর কেউ ঢুকতে চায় না।”
শাহরুখ সেন্টার টেবিলের ওপর রাখা ফলের ঝুড়ি থেকে আপেল তুলে নিল। ফারিয়া নাক ধরে বলল,
“তুমি আপেলটা ছোঁয়া মাত্রই, আপেলটা থেকে এমন গন্ধ দিচ্ছে, মনে হচ্ছে কোনো পিচ্চি বাচ্চা আপেলটার ওপর টয়লেট করে গেছে।”
শাহরুখ ঠান্ডা গলায় বলল,
“তোর মুখ খুললে গন্ধ আসে, আপেল থেকে না। তুই মুখ খুলেছিস, তাই গন্ধ পেয়েছিস।”
নাজমিন হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেয়ে বলল,
“আহা রে, ফারিয়া আপু! তোমাকে আর ভাইয়াকে দেখলে মনে হয় পচা ডাস্টবিনে প্রেম।”
সামিয়া বলল,
“ওদের দুজনকে নিয়ে নেটফ্লিক্স সিরিজ বানাইলে নাম হইতো—’গুতে ভেজা হৃদয়’।”
ফারিয়া কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলল,
“তুমি আমাকে নিয়ে এমন বাজে কথা বলো কেন ভাইয়া? আমি তোমাকে মন থেকে ভালোবাসি। তুমি জানো না আমার হৃদয়ের দরজা সবসময়ে তোমার জন্য খোলা।”
শাহরুখ কপাল কুঁচকে বলল,
“ওটা তোর হৃদয়ের দরজা খোলা না, ওটা নর্দমার ঢাকনা ছাড়া স্ল্যাব।”
ফারিয়া অভিমান করে হাত বুকে রেখে বলল,
“তুমি বুঝবা না। ভালোবাসা মানে শুধু লাল গোলাপ না, কখনো কখনো পঁচা আলুর মধ্যে থেকেও ভালোবাসা জন্মায়।”
নাজমিন বলল,
“ফারিয়া আপু! সেই ভালোবাসা মানে, টয়লেটে পানি না থাকা অবস্থায় ঢুকে পড়া।”
সামিয়া বলল,
“বা রে! এতো গভীর প্রেম? ভাইয়া তোমাকে পাত্তা না দিলেও, তুমি তারে দিয়েছো পাতলা প্রেমের দুঃস্বপ্ন।”
শাহরুখ রেগে বলল,
“আচ্ছা তোরা থামবি? না হলে আমি তোদের তিনজনকে একসাথে মেরে পঁচা খিচুড়ি বানায় ফেলব।”
ফারিয়া লাজুক মুখ করে বলল,
“তুমি ছাড়া আমি কিছুইনা, ভাইয়া। কিন্তু তুমি এমন কেনো? আমার ভালোবাসা কি নর্দমা?”
“না! তোর ভালোবাসা নর্দমা না। পুরাই ডাস্টবিন।”
সামিয়া হেসে বলল,
“ভাইয়া ঠিকই বলছে, ফারিয়া আপু। তুমি মাঝে মাঝে এমন ভালোবাসা দাও, যেটা কিনা রান্না ঘরের নিচে আটকে থাকা পঁচা মুরগির মতো গন্ধ দেয়। একটু রোমান্টিক হতে পারোনা?”
ফারিয়া কপাল কুঁচকে বলল,
“সামিয়া! তুই আমার না ভাইয়ার টিমে?”
নাজমিন হাসতে হাসতে বলল,
“আরেহ! আমরা তো দর্শক, কখনো তোমার টিমে, কখনো শাহরুখ ভাইয়ার টিমে।”
সামিয়া বলল,
“আমি তো শুধু ভাবি, এই দুইজনের বিয়ের রাতে ঝগড়ার শব্দ শুনে প্রতিবেশীরা পুলিশ ডাকবে।”
সামিয়ার কথা শুনে নাজমিন বলল,
“ওদের হানিমুন হবে গুলিস্তান ডাস্টবিন ট্যুর।”
শাহরুখ মুখ ভেঙিয়ে বলল,
“ওকে কে বিয়ে করবে? পচা নর্দমা একটা।”
ফারিয়া শাহরুখের কথা পাত্তা না দিয়ে একটু রোমান্টিক হয়ে বলল,
“ভাইয়া, তোমার জন্য চা করে আনি? এক কাপ ভালোবাসা। গু দিয়ে না, চিনি দিয়ে বানাব।”
“তোর এই ভালোবাসা মানে হইলো সেই পাতলা টয়লেট। একবার নামলে আর উঠার উপায় নাই।”
ফারিয়া নাক ফুলিয়ে, ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“তুমি না, সবকিছু টয়লেট দিয়ে বোঝো। আমি তো হৃদয়ের গভীর থেকে বলছি।”
“তোর হৃদয়ের গভীর মানে সেই সেপটিক ট্যাংকের তলা, যেইখানে ভালোবাসা গেলেই হজম হয়ে যায়।”
ফারিয়া চোখ গরম করে বলল,
“তুমি না একটা অন্ধ গাধা। আমার ভালোবাসা যদি টয়লেট হয়, তুমি তো সেই কমোড যার ফ্ল্যাশ কাজ করে না।”
“এইটা কি প্রেম না নর্দমা প্রেম। আমার তো মনে হয়, তুই প্রেমের নামে আমায় পচা পেঁয়াজ ভাজা দিস।”
ফারিয়া দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“তুমি আমার প্রেম বোঝোনা, কারণ তোমার ব্রেনেই গু ভরা। প্রেম বুঝতে হলে আগে ফ্রেশ হও।”
শাহরুখ চিৎকার করে বলল,
“তুই চুপ কর! তোর প্রেমে ঢুকলে মন নয়, পেট খারাপ হবে। পাতলা প্রেম দিয়া আমার ভুঁড়ি ফুলে যাবে।”
ফারিয়া চোখ ছোট করে রোমান্টিকসুরে বলল,
“ভাইয়া, জানো? আমি না স্বপ্নে তোমাকে দেখেছি। আমরা দুইজন হাত ধরে ঘুরতেছি বৃষ্টির মধ্যে, রোমান্টিক না?”
“ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখা ভালো।”
“তুমি না কিছুই বুঝো না? তুমি আমার হৃদয়ের নোংরা ঝাড়ুদার।”
“আরে ধুর! তোর হৃদয়ে নোংরা। ওটা তো পুরা নর্দমার সেপটিক ট্যাংক। আমি গু পরিস্কার করতে আসিনি।”
“তুমি ছাড়া আর কে পরিষ্কার করবে? তুমি তো আবর্জনার রাজপুত্র।”
সাইডে বসে থাকা সামিয়া ফিসফিস করে নাজমিনকে বলল,
“এই দুইজনরে প্রেম করতে দিলেই দেশজুড়ে দুর্গন্ধ ছড়াবে রে ভাই।”
নাজমিন হাসল। ওদের দুজনের ঝগড়া যেন আরও বড় আকারে লাগবে এবার। সামিয়া আর নাজমিনের হাসতে হাসতে মরে যাবার মতো অবস্থা। তারা না পারছে সহ্য করতে আর না পারছে দুজনকে থামাতে।
•
ঘড়িতে সময় বিকাল ছয়টা। সুমু বেলকনিতে দাঁড়িয়ে সবগুলো ফুল গাছে পানি দিচ্ছি। শেরাজ সারবাজের ঘরে গেছে নিউ শপ ওপেনিং নিয়ে আলোচনা করতে। সুমু খুব যত্নসহকারে ফুল গাছগুলোর যত্ন নিচ্ছে। হঠাৎ রোজা চুপচাপ সুমুর পেছনে এসে দাঁড়াল। হাতে কফির কাপ, ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি, চোখে সেই অতল ঈর্ষা। সে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে সুমুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোমাকে দেখে বোঝা যায় না যে, তুমি এই রকম জায়গায় ফিট করো না।”
সুমু চমকে ওঠে পেছনে তাকায়। রোজা আবারও বলল,
“এই সো-কলড ‘স্মার্টনেস’ আর ‘সিম্পল লুক’ হয়তো এস.কের এখন ভালো লাগছে, কিন্তু ক্লাসি টেস্ট মানে তো শুধু মুখ নয়, মাইন্ডও তো লাগে, তাই না?”
সুমু এবার একটু ফ্যাকাসে মুখে তাকাল। তার চোখে ব্যথা। কিন্তু মুখে একটা শান্ত হাসি এনে বলল,
“মানুষের চোখে না ফিট হলেও, হৃদয়ের জায়গাটা কিন্তু অনেক বড়। তাতে সবাই ফিট হতে পারে না, রোজা আপু। আমার মতে, মানুষের চোখে ফিট সবাই হতে পারে, কিন্তু হৃদয়ে কয়জন ফিট হতে পারে?”
রোজা তাচ্ছিল্য করে হাসি দিয়ে বলল,
“প্রথমদিন তোমাকে এস.কের পাশে দেখে ভেবেছিলাম, তুমি খুব সহজ-সরল, এই বাড়িতে দু'দিনও টিকতে পারবেনা। কিন্তু এখন তো দেখছি, দিব্যি নিজের মতো করে সব জায়গায় চলাফেরা করো।”
সুমু এক মুহূর্ত চুপ। ঠোঁটের কোণায় হালকা হাসি রেখে বলল,
“সময় মানুষকে বদলায়, রোজা আপু।”
রোজা হেসে ওঠে, কণ্ঠে ব্যঙ্গ ঝরে পড়ে।
“বদলায় হয়তো। কিন্তু কিছু মানুষ যতই বদলাক, তাদের রুচি আর আসল জায়গা বদলায় না। কারো দয়া আর সহানুভূতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ভালোবাসা কতদূর যাবে, জানো তো?”
সুমুর মুখে স্থিরতা। সে ধীরে বলল,
“ভালোবাসা যদি সহানুভূতি হয়, তবে ঈর্ষা কি আত্মমর্যাদার চিহ্ন?”
রোজা থমকালো। সে বেলকনিতে থাকা ফুলগাছগুলো দিকে তাকিয়ে বলল,
“এই ফুলগুলো যেমনই সুন্দর, তেমনি তুচ্ছ। একদিন শুকিয়ে যাবে। ঠিক তোমার মতো।”
“আপনি ফুলকে তুচ্ছ বললেন, মানে নিজের রুচির পরিচয় দিলেন। মানুষ যা বোঝে, তা নিয়েই তো কথা বলে।”
রোজা ব্যঙ্গ করে হাসল।
“তুমি আসলে নিজের জায়গাটা ভুলে গেছো। এই খান ম্যানশনের আলো, হঠাৎ এসে তোমার চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছে, বুঝতে পারছো না তুমি এখানে একজন ভিজিটর মাত্র।”
সুমু এবার রোজার মুখোমুখি দাঁড়াল।
“আপনার কথায় একটা জিনিস বুঝলাম, আপনি নিজের জায়গা নিয়ে খুব অনিশ্চিত। তাই অন্যের আত্মবিশ্বাসে এত ভয় পান।”
রোজার মুখ রাগে লাল হয়ে উঠল। সুমু আবারও বলল,
“আমি এখানে কোনো আলো কাড়তে আসিনি, রোজা আপু। আলো জ্বলে, যেখানে ভালোবাসা থাকে। সেটা কেউ নিজে না জ্বালালে, কারো কাছ থেকে ধারেও পাওয়া যায় না।”
রোজা এবার একদম নীরব। গলার কাছে যেন কিছু আটকে গেল। সুমু আবার নিজের কাজে মন দিয়ে বলল,
“আমার কথায় কষ্ট পাবেন না। আপনি এখানে এসেছেন আমাকে অপমান করে, ছোট করে কথা বলতে। আপনার কথা আগুনের শিখার মতো উত্তপ্ত। আমি শুধু সেই উত্তপ্ত শিখার তেজ বাড়ানোর জন্য কেরোসিন ঢেলেছি।”
রোজা কিছু বলতে নিবে, তখনই পেছন থেকে অনন্যা খাতুন বললেন,
“তুই এইখানে? আর আমি তোকে সারা বাড়ি খুঁজছি।”
কথাটা বলে অনন্যা খাতুন শেরাজের রুমটা একবার পরখ করে বললেন,
“আমার রোজাকে দেখো, কেমন গর্ব হয় ওকে দেখে। আমার বংশের রক্ত ও। শেরাজের জন্য এমন একটা মেয়েই দরকার ছিল। একটা কোরিয়ান-আফগানি-ওমানি মেয়ের মধ্যে যেমন শালীনতা আর গ্ল্যামার দুই-ই থাকে। সব আমার রোজার মধ্যে আছে।”
রোজা আলতো হাসল। অননা খাতুন আবারও বললেন,
“কিন্তু আমার কপাল দেখো, কোথাকার একটা মেয়ে, আমার ঘরের বউ হয়ে বসে আছে। কে জানে কেমন রক্ত। ওদের দেশে তো সবকিছুই একটু বেশি সহজ মনে হয়। এত সহজে বিয়ে হয়? এত সহজে বউ হওয়া যায়?”
সুমু চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। রোজা বাঁকা হেসে বলল,
“ও একবারও ভাবল না, এস.কের পাশে ওকে মানায় কি’না।
“আরে বড়লোক ছেলে দেখলে কার মাথা ঠিক থাকে বল?”
“তোমার রক্ত, তোমার গর্ব– সবই তোমার জায়গায় ঠিক আছে, মম। কিন্তু একটা কথা মনে রাখো, যার হাত আমি নিজের হাতে ধরে নিয়ে এসেছি, তার মানে আমি পুরো পৃথিবীর সামনে বলতে পারব, ও আমার জন্য বেস্ট। তুই হয়তো বউ পছন্দ করো রক্ত দেখে, আমি করি হৃদয় দেখে।”
ঘরে পিনপতন নীরবতা। শেরাজ এগিয়ে এসে সুমুর পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
“সুমু আমার স্ত্রী। আমার দায়িত্ব ওর সম্মান রক্ষা করা। তুমি যদি তাকে এই পরিবারের একজন ভাবতে না পারো, তাহলে ভাবার দরকার নেই। কিন্তু আমি আগেও বলেছি, ওর অপমান আমি সহ্য করব না। আর রোজা তুই, তোর মতো ফালতু মেয়ে আমার পাশে দাঁড়ানোরও যোগ্যতা রাখেনা। আমি চাইলে তোর করা অপমানের উত্তর দিতে পারতাম। কিন্তু তোর সাথে কথা বলতে আমার রুচিতে বাঁধে।”
অনন্যা খাতুন রাগে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে রোজার হাত ধরে রুম ত্যাগ করলেন। শেরাজ সুমুকে নিজের দিকে ঘোরাল।
“তোমাকে কতোবার বলেছি, কেউ অপমান করলে চুপ করে না থাকতে।”
“উনি আপনার মা। আমি ওনার সাথে বেয়াদবি করতে পারব না। এতে ওনার সম্মান নষ্ট হবে।”
“এইটা বেয়াদবি না। আর কেউ যদি তার সম্মান নিজে ধরে রাখতে না পারে, তাহলে তোমার কোনো দায়ভার নেই সে সম্মান ধরে রাখার। উনি আমার মম বলে, উনি যা তা বলবেন আর তুমি সহ্য করে যাবে?”
সুমু প্রসঙ্গ পাল্টে বলল,
“আপনি না কাজের কথা বলতে গেলেন?”
শেরাজ তাচ্ছিল্য করে হাসি দিয়ে বলল,
“টপিক চেঞ্জ করতে চাইছো? গুড, ভেরি গুড! রিয়াজ আমাকে বলেছে, মমের এই ঘরে আসার কথা। আর তাই আমি দেখতে এলাম, তোমার প্রতি আমার মমের ভালোবাসা।”
সুমু আর কোনো কথা বলল না। শেরাজ মৃদুস্বরে বলল,
“রেডি হয়ে নাও, আমাদের বেরোতে হবে।”
কথাটা বলে রুম ত্যাগ করল শেরাজ। সুমু কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বোরকা পরে রেডি হয়ে নিল। তারপর সকলে মিলে বেরিয়ে পড়ল শেরাজের নিউ শপের উদ্দেশ্যে।
•
গাড়ি এসে থামল শপের সামনে। সকলে মেনে দাঁড়াল। একটু পরেই ওপেনিং হবে। শেরাজ সুমুকে তার সাথে যেতে বলল। সুমু আলতো হেসে বলল,
“আপনার সবকিছুই আমার, তাই আলাদাভাবে আমাকে যেতে হবেনা। আপনি শুরু করুন। আমি সর্বদা আপনার পাশে আছি।”
শেরাজ আর জোর করল না। সে আলতো হেসে বলল,
“ওকে, তাহলে তুমি আর ইশিতা রিয়াজদের সাথে থাকো। ওপেনিং হয়ে গেলে আমি এসে তোমাদের ভেতরে নিয়ে যাব।”
সুমু মাথা নাড়ল। শেরাজ মুচকি হেসে চলে গেল। সুমু দেখছে তার খান সাহেবকে। কতটা সুদর্শন লোকটা, পরনে আজ কালো পাঞ্জাবি, চোখেমুখে কতো খুশি। সুমুর তাকিয়ে থাকার মাঝে উল্লাসের শব্দশুনে ধ্যান ভাঙলো তার। শেরাজ কাচি দিয়ে নীল রঙের ফিতা কেটে ভেতরে ঢুকল। সকলে হাততালি দিয়ে ভেতরে ঢুকল।
সুমু মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে তার খান সাহেবের দিকে। শেরাজ এগিয়ে এলো সুমুর কাছে। সে ফিরোজাকে কোলে তুলে নিয়ে একহাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“চলো সুইটহার্ট!”
সুমু শেরাজের হাতের ওপর হাত রাখল। ধীর পায়ে এগিয়ে চললো তার খান সাহেবের সাথে। রিয়াজ, ইশিতারা ভেতরে চলে গেছে। শেরাজ ভেতরে পা রাখতেই ফিরোজা কোল থেকে নেমে গেল।
চলবে..?
#খান_সাহেব
#সুমাইয়া_জাহান
#পর্ব_39 ✦ বর্ধিতাংশ ✦
অনুষ্ঠান শেষে গেস্টরা সকলে বিদায় নিচ্ছে। সুমু ঘুরে ঘুরে শপটা দেখছে। ‘আফগান মিনি মাট’-এর এক কোণে রাখা হ্যান্ডক্রাফটেড আফগান চকলেট। ঝিনুকের মত বক্সে সাজানো, হালকা বাদাম, কেশর, খেজুর মেশানো। সুমুর চোখ চকচক করে উঠল। সে মুখে হাসি টেনে বলল,
“এই চকলেটগুলো আমার। সে একটানা পাঁচটা গিফট বক্স চকলেট হাতে তুলে নিল।”
তখনই পেছনে শেরাজ এসে দাঁড়াল।
“এইটা কি আমার দোকান লুট?”
সুমু বড় বড় চোখ করে সামনে তাকাল। তারপর পেছন ঘুরে দাঁড়িয়ে শেরাজের দিকে তাকিয়ে দাঁত কেলিয়ে হেসে বলল,
“আমি তো আপনার বউ, তাই এটা আমার অধিকার।”
শেরাজ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“হ্যান্ডক্রাফটেড গিফট বক্স চকলেট’ এগুলোর প্রাইজ ৫ থেকে ৮ ওমানি রিয়াল, মানে বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ১,৪০০ থেকে ২,৩০০ টাকা। তাহলে তুমি নিয়েছো মোট ৫ বক্স। তাহলে টোটাল প্রাইজ ৪০ ওএমআর। বাংলাদেশী টাকায় ১১,৪০০ টাকা। দাও, ৪০ রিয়াল দাও।”
সুমু নাটক করে চোখ বড় বড় করে বলল,
“আপনি তো বলেছিলেন, আপনার যা সব আমার। তাহলে এখন এই শপ আর এই চকলেট আমার।”
শেরাজ ঠোঁটে হালকা হাসি রেখে বলল,
“টাকা না দিলে এই চকলেট পাবেনা।”
সুমু এক টুকরো চকলেট ছিঁড়ে তার মুখে ঠেসে দিল।
“রসিদ লিখে রাখুন, ভালোবাসার দামে বিক্রি হয়েছে।”
শেরাজ চুপ করে তাকিয়ে রইল ওর দিকে। সুমু শেরাজের পা থেকে মাথা পযর্ন্ত পরখ করে বলল,
“চকলেটের দাম চাই আপনার?”
“হ্যাঁ!”
“ঠিক আছে, তাহলে এখনই দিচ্ছি।”
সুমু এক ঝটকায় শেরাজের প্যান্টের পকেট থেকে ওয়ালেট বের করল। শেরাজ চোখ বড় করে তাকিয়ে বলল,
“এই! তুমি আমার ওয়ালেট…”
সুমু পাত্তা না দিয়ে ওয়ালেটের ভেতর থেকে কার্ড টেনে বের করে, একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা স্যান্ডি ডাকল।
“সান ভাইয়া!”
স্যান্ডি এগিয়ে এলো। চোখ মেঝের দিকে রেখে বলল,
“ইয়েস ম্যাম!”
“এই কার্ডটা রাখুন। ওনার চকলেটের দাম যা হয়েছে কেটে নিন।”
স্যান্ডি হেসে ফেললো। শেরাজ হাসি লুকিয়ে বলল,
“তুমি কি জানো, আমি এখন বললে এই শপের ক্যামেরা ফুটেজ সরাসরি আমার শাশুড়ি আম্মুকে পাঠাতে পারি?”
সুমু এক টুকরো চকলেট মুখে পুরে ফিসফিস করে বলল,
“আম্মু বলবে, মেয়ে আমার ঠিক জায়গাতেই বিয়ে হয়েছে।”
শেরাজ চোখ সরিয়ে নিল, কিন্তু মুখের হাসিটা লুকোতে পারল না। তবুও কোনোমতে হাসি লুকিয়ে বলল,
“এই বাটপারি কার থেকে শিখলে, সুইটহার্ট?”
সুমু আবারও চকলেটের টুকরো মুখে পুরে শেরাজকে পা থেকে মাথা পযর্ন্ত পরখ করল। শেরাজ দাঁড়িয়ে, দুই হাত বুকের ওপর ভাঁজ করা, চোখে এফবিআই স্পেশাল অ্যাজেন্টের ভঙ্গি। সুমু আলতো হেসে বলল,
“চকলেট তো আপনারই দোকানের।”
“তো? এই দোকান এখন প্রেমের নয়, প্রফিটের জায়গা।”
সুমু নাটকীয় ভঙ্গিতে মুখে হাত দিয়ে বলল,
“বাঁচাও! এমন অমানবিক স্বামী পেয়ে আমি সর্বস্বান্ত।”
শেরাজ স্যান্ডিকে ইশরা করল চলে যেতে। স্যান্ডি চলে গেল। সুমু চকলেট মুখে দিয়ে গুনগুন করছে। শেরাজ ধীর পায়ে এগিয়ে এলো। চোখে সেই পরিচিত আগুনের এক ঝলক। সে সুমুর একদম সামনে দাঁড়িয়ে নরম গলায় বলল,
“চকলেটের দাম টাকা নয়, সুইটহার্ট।”
সুমু কপট ভয় পেয়ে বলল,
“তাহলে কি?”
শেরাজ হালকা হেসে চোখ নিচু করে ফিসফিস করে বলল,
“তোমার লিপস।”
সুমু চকলেট খাওয়া বাদ দিয়ে চোখ বড় করে তাকাল।
“কি বললেন?”
শেরাজ আর কোনো শব্দ না করে সুমুর হাত ধরে সাইউে নিয়ে গেল। তারপর ধীরে পায়ে সুমুর কাছে গিয়ে মুখটা সুমুর একেবারে কাছাকাছি নিয়ে বলল,
“তুমি যা চকলেট নিয়েছো, তার দাম অনুযায়ী আমি তোমাকে এখন পাঁচটা লং ডিপ চুমু খাব।”
সুমু ফিসফিস করে বলল,
“পাঁটচা নিয়েছি।”
শেরাজ চোখ ছোট করে, ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল,
“তাহলে আজ রাতটা লম্বা হবে, সুইটহার্ট।”
কথাটা বলে শেরাজের ঠোঁট ছুঁয়ে যায় সুমুর কপালে, তারপর গাল, তারপর...
সুমু হঠাৎ মুখ ঘুরিয়ে বলল,
“একটা চুমুর মধ্যে এত ইন্টারেস্টt? বিকাশ করে দিতাম, বললেই হতো।”
শেরাজ হেসে ফেলে, তারপর ধরা গলায় বলল,
“আজ রাতটা ভয়ংকর হবে।”
কথাটা বলে শেরাজ সুমুর ওষ্ঠ নিজের ওষ্ঠের আয়ত্বে নিল। কিছুক্ষণ বাদে সরে দাঁড়াল শেরাজ। সুমু লজ্জা পেয়ে ইশিতাদের কাছে চলে গেল। সুমু চলে যেতেই শেরাজের চারপাশ ঘিরে ফেলে তার পুরো গ্যাঙ্গ। সকলে ঠোঁট টিপে হাসছে। শেরাজ ভ্রু কুঁচকে তাকাল আইয়ুবদের দিকে। প্রথমে মুখ গম্ভীর করে আইয়ুব বলল,
“এস.কে একটা কথা বলি? তুই কি এখন রোমান্সে নাকি কো-অপারেটিভ প্রজেক্টে ঢুকেছিস? মানে ভাই, রোমান্সে এমনভাবে সিরিয়াস হয়ে গেছিস, যেন কোনো অফিস প্রজেক্টে ঢুকে গেছিস। রোমান্সকে খুব পেশাদারভাবে নিয়েছিস। যখন তখন যেখানে সেখানে শুরু করিস।”
রিসান যোগ দিল আইয়ুবের সাথে,
“পাঁচটা চকলেটের দাম পাঁচটা ডিপ চুমু? এই রেট যদি বাজারে ছড়ায়, তোর প্রেমের আইপিও-তে লাইনে দাঁড়াবে সবাই। তুই ভাবতে পারছিস এস.কে এই রেট যদি সবাই জানতে পারে, তাহলে দুনিয়া সব চকলেট পাগলি, চকলেট ব্যবসায়ীদের সাথে প্রেম করতে চাইবে। তখন মনে হবে, প্রেমটা একটা ব্যবসা বা শেয়ার বাজার।”
নিহাল গলা নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আমি বুঝতে পারছিনা, চকলেটটা খেল কে? ভাবিজি নাকি এস.কে? এস.কের চোখ দেখে মনে হচ্ছিল, ও বলতে চাইছে, সুমু তুমি আমার চকলেট ফ্যাক্টরি, আর আমি তোমার ট্যাক্স অফিস।”
সারবাজ হাত কানে দিয়ে অভিনয় করে বলল,
“আল্লাহ! প্রেম কি মিষ্টি, কি গরম। আমি ডায়াবেটিসের মানুষ। ওদের এই প্রেম এত মিষ্টি, এত গরম, যে কারো দেখলেই ডায়াবেটিস হয়ে যাবে। আমার সহ্য হচ্ছেনা এত রোমান্স।”
অমিত মেঝেতে কিছু খুঁজতে খুঁজতে বলল,
“আমি খুঁজছি, আমাদের রাগি, নিরামিষ এস.কে মেঝেতে গলে পড়ে গেছে কি’না।”
আরবাজ ভ্রু কুঁচকে বলে বলল,
“তবে ভাই, আমি তোমাদের দুজনের রোমান্স দেখে ভয়ে আছি। হঠাৎ করে একদিন দেখব, ‘শেরাজ অ্যান্ড সুমাইয়া ওয়েডিং কর্পোরেশন লিমিটেড!’ওদের প্রেম যেন একটা প্রতিষ্ঠানে রূপ নিচ্ছে। যেটা খুব তাড়াতাড়ি এই ‘আফগানি মিনি মার্ট- এর মতো ওপেন করবে আমাদের এস.কে ব্রো।”
সাইফ হাসতে হাসতে বলল,
“ভাই, তুই অফিশিয়ালি প্রেমে ব্যাংক্রাপ্ট।”
শেরাজ দাঁড়িয়ে আছে গম্ভীর মুখে। সে চোখ ছোট করে বলল,
“তোদের সবার মধ্যে একটা কথা কমন. তোরা কেউ প্রেমে সাকসেসফুল না। শুধু আমিই একমাত্র প্রেমে শেয়ারহোল্ডার।”
সবাই একসাথে হুংকার দিল,
“খান সাহেবের তো লাভ শেয়ার বাজারে বুম।”
শেরাজ হেসে মাথা নেড়ে বলল,
“এখন থেকে তোদের চকলেট কিনতে হলে…”
সকলে মিলে একসাথে বলল,
“কী?”
“তোদের সকলের প্রথমে প্রেমের পারমিশন লাগবে। আর আমার পারমিশন আমার একমাত্র লাইসেন্স, আমার সুইটহার্ট।”
আইয়ুব দুই হাত কোমরে রেখে বলল,
“ভাই, আজ তো দেখলাম চকলেটের বিল শোধ হলো, লাভকার্ডে। তাই বলছি, আমি তোকে একটা চুমু খাই, তুই আমাকেও চকলেট দে।”
ফাহিম সিরিয়াস মুখ করে বলল,
“বিকাশ-এর চেয়ে চুমুতে ট্রানজ্যাকশন ফাস্টার লাগে? প্রেমে টাকা লাগেনা, চুমু দিলেই সব হয়ে যায় এত ফাস্ট। তাহলে, আমরাও তোকে একটা করে চুমু দিচ্ছি। আমাদের কেও চকলেট দে।”
রাহিন গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
“বাহ! কার্ড সোয়াইপ করতেই সুমু সোয়াইপ করল তোর হৃদয়।”
শেরাজ ভ্রু কুঁচকালো।
“সুমু না তোর বোন?”
“সেটা তুই মেনেছিস কখনো?”
শেরাজ আর কোনো কথা বলল না। এবার সারবাজ মেঝেতে কিছু খুঁজতে খুঁজতে বলল,
“এইখানে কারো লজ্জা নামের জিনিস পড়ে আছে। শেরাজের ছিল মনে হয়।”
রাহিন শেরাজের কাঁধে হাত রেখে বলল,
“ভাই, তুই তো এতদিন কুল ছিলি, এখন দেখি ফুল ডেইরী মিল্ক।”
আরবাজ বুদ্ধিমান ভঙ্গিতে চশমা তুলে বলল,
“আজকের শিক্ষণীয় কথা, প্রেম করলে টাকার দরকার নাই, শুধু একটা কার্ড, একটা চকলেটের বিজনেস আর একটা কিউট বউ লাগবে।”
রিয়াদ হেসে বলল,
“ভাই, একটা চকলেটের দাম যদি একটা চুমু হয়, তাহলে আমি এস.কে-কে রোজ চুমু খেতে রাজি আছি। কিন্তু, আপাতত আমি ডায়েটে আছি।”
শেরাজ সবার দিকে তাকিয়ে চোখ ছোট করে বলল,
“তোরা সবাই এখনই শপ ছেড়ে বের হ। আমি আজ থেকে শপে ‘ফ্রেন্ড-বর্জিত শপ’ সাইনবোর্ড ঝুলাব।”
সারবাজ হেসে বলল,
“ভাই, আমরা যাব ঠিকই, কিন্তু একটা কথা…”
সবাই একসাথে চিৎকার করে বলল,
“খান সাহেব, চকলেট দিলে কিস ফ্রি।”
শেরাজ হাসল। ঠিক তখনই পাশ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল। নিহাল হতাশ কন্ঠে বলল,
“আহ! এমন একটা বউ থাকলে আমিও ওয়ালেট লুট হতে দিতাম খুশি মনে।”
রিসান বলল,
“ভাবি তো ভাবি না, একদম চকলেট কুইন।”
আইয়ুব বলল,
“ভাইরে, আমরা তো শুধু এটিএম এর পিন জানি, কারো হৃদয়ের পিন তো জানিনা।”
সারবাজ আফসোস করে বলল,
“এইসব দেখে মনটা একদম ‘সিঙ্গেল ভিক্টিম সাপোর্ট গ্রুপ’ খুলতে ইচ্ছা করছে।”
অমিত হঠাৎ হু হু করে কাঁদার ভান করে বলল,
“আমার তো বিয়ের বয়স পার হয়ে গেল, এখানো বউ তো দূরে থাক একটা গার্লফ্রেন্ড ও জুটল না কপালে।”
আরবাজ বলল,
“আমাদের জন্য প্রেম মানে নেটফ্লিক্স আর নুডলস। আমার বউ তো আমাকে পাত্তাই দেয়না।”
নিহাল একদম দুঃখী মুখ করে বলল,
“ভাই, আমরা কি মানুষ না? আমাদের প্রেম কবে আসবে উবার করে?”
শেরাজ একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ল। সে এক গ্লাস পানি খেয়ে বলল,
“তোরা সবাই মিলে একটা কাজ কর। আমার শপের সামনেই একটা ‘“সিঙ্গল পিপল জোন’ বানিয়ে নিস। এক কাপ চা, আর এক কাপ আফসোস ফ্রি।”
রাহিন বলল,
“ভাই, তুই এখন পাক্কা প্রেমিক। আমাদের আর মানুষই ভাবিস না।”
তারপর সবাই একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়ে বলল,
“শেরাজ খান, প্রেমের ডাকাত, সিঙ্গেলদের দুশমন।”
শেরাজ সবাইকে বের করে দিল শপ থেকে। তারপর সুমুদের নিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হলো।
•
আবহাওয়ার অবস্থা আজ ভালো না। সন্ধ্যা থেকে মেঘ জমেছে আকাশে। ত্রিশ মিনিটের মধ্যে বাড়ির সামনে এসে পৌঁছাল শেরাজরা। সুমুরা গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াতেই শেরাজের ফোনে কল এলো। সুমুদের বাড়ির ভেতরে যেতে বলে শেরাজ কল রিসিভ করার জন্য সাইডে চলে গেল। সুমু রুমে এসে বোরকা চেঞ্জ করে নিল। আজ তার পরনে সাদা শাড়ি। আয়নার একবার নিজেকে দেখে নিল সে। শেরাজ রুমে এলো। সুমুকে একবার দেখে বলল,
“আমার একটা মিটিং পড়ে গেছে। এক্ষুনি যেতে হবে।”
“এখন মিটিং?”
“হ্যাঁ! নিউ শপ তো, সেই বিষয়ে মিটিং।”
“ওহ আচ্ছা! ঠিক আছে যান।”
শেরাজ আলমারি থেকে ফর্মাল ড্রেস বের করে রেডি হয়ে নিল।
“কখন ফিরবেন?”
“চিন্তা করোনা। তাড়াতাড়ি চলে আসব।”
শেরাজ সুমুর কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে বেরিয়ে গেল। সুমু শেরাজের চলে যাবার দিকে তাকিয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
•
রাত এগারোটা পঁয়তাল্লিশ। করিডরে একা দাঁড়িয়ে শেরাজের অপেক্ষায় সুমু। শেরাজ এখনও ফেরেনি। সুমু একা দাঁড়িয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে স্ক্রল করছে। আরিয়ান রুম থেকে বের হতেই সুমুকে দেখতে পেল। ঠোঁটে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে সুমুর পাশে এসে দাঁড়াল। আরিয়ান নীরবে, নিঃশ্বাস ফেলেই যেন ভয় জাগাতে চাইল।
“এমন করে একা একা দাঁড়াতে নেই, সুমু। এই বাড়িতে সবাই ভালো মানুষ না। কেউ কেউ খুব বেশি মনোযোগী ও হয়ে যায়, যেমন আমি।”
সুমু চমকে পাশে তাকাল। আরিয়ানকে দেখে সে কোনো কথা না বলে রুমের দিকে অগ্রসর হতেই, আরিয়ান সামনে এসে সুমুর পথ আটকে দাঁড়িয়ে বলল,
“চলে যাচ্ছো কেনো? একটু কথা বলো। আমি সত্যি খুব মনযোগী তোমার প্রতি।”
সুমু কপাল কুঁচকে স্থির গলায় বলল,
“আপনার এই মনোযোগ খুব অস্বস্তিকর, আরিয়ান ভাইয়া।”
আরিয়ান হেসে একটু ঝুঁকে বলল,
“উফফ! ভাইয়া? জোরে লাগল ডিয়ার। তোমার গলার কাঁপুনি, চোখের রাগ, সব দেখে ফেলেছি। কিন্তু বিশ্বাস করো, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি চাইলে খারাপ হতে পারতাম। এখনও পারি। কিন্তু হব না।”
সুমু এক ধাপ পিছিয়ে গেল।
“আপনি হয়তো অভ্যস্ত, আপনাকে সবাই সহ্য করে নেয়। কিন্তু আমি করব না। আমি ‘না” বলতে জানি। আর আপনি কী পারেন না পারেন, সেটা প্রমাণ করার দরকার নেই। আমি ভয় পাই না, আমি ঘৃণা করি।”
আরিয়ান ঠোঁটের কোণে ঠান্ডা হাসি।
“ঘৃণা” মজার জিনিস। অনেক ভালোবাসার শুরু হয় সেখান থেকেই, জানো তো? এমনকি তোমার খান সাহেবের মতো পুরুষও একদিন…” একটু থামল আরিয়ান। চোখে অদ্ভূত আগুন আর ঠোঁটে অদ্ভূত হাসি টেনে বলল, “ভুল করতেই পারে।”
সুমু এবার একেবারে কাছে এগিয়ে এলো। তার চোখে আগুন।
“আপনি নিজের সীমা না জানলে, আমি তা শিখিয়ে দিতে জানি। আপনি যাকে দুর্বল ভাবছেন, সে যদি কখনো ভয় না পেয়ে দাঁড়িয়ে যায়, আপনার মুখেই থুথু ফেলবে একদিন।”
“থুথু? ইন্টারেস্টিং! তুমি জানো, তোমার মতো তেজি, আত্মসম্মানী মেয়ে সবসময়ই আমার প্রিয়। কারণ ওদের ভেতরে কী চলছে, তা জানার জন্য সময় দিতে হয়। আর আমি সময় দিতে ভালোবাসি।”
সুমু কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে একধরনের সতর্কতা।
“আপনি হয়তো সময় দিতে ভালোবাসেন, কিন্তু সবাই সময় নিতে চায়না, আরিয়ান ভাইয়া।”
আরিয়ান ঠোঁট টিপে হাসল।
“তোমার চোখে ওই ভয় মিশ্রিত আত্মবিশ্বাসটা খুব ভালো লাগে, সুমু। কে জানে, তুমি যদি এস.কে’র না হতে, তাহলে হয়তো আমি…”
সুমু আবারও এক ধাপ পিছিয়ে গেল। এবার তার চোখে কাঁটার মতো তীক্ষ্ণতা।
“আপনি ‘হয়তো’ দিয়ে শুরু করেছেন, আর আমি ‘না’ দিয়ে শেষ করছি। আমার চারপাশে জায়গা কম, আর আমার চারপাশে সম্মান ছাড়া কারও জায়গা হয় না।”
আরিয়ান একটু থমকে হেসে বলল,
“তোমার মতো সোজা মেয়ে খুব কম দেখেছি। খেয়াল রেখো, এমন সোজা পথে হাঁটলে কেউ না কেউ টেনে ধরবেই।”
সুমু ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“যারা টেনে ধরে, তাদের হাতই বেশি ভাঙে। আর হ্যাঁ, আমার পথে আলোর ছায়া নিয়ে খেলতে আসবেন না, অন্ধকারে হারিয়ে যাবেন।”
“অন্ধকার যদি হয় তোমার ভেতরের, তাহলে আমি লক্ষ কোটিবার হারিয়ে যেতে রাজি আছি।”
“সামনে থেকে সরে দাঁড়ান। আমাকে যেতে দিন।”
“আরে থাকো না। ভালোই তো লাগছে। তাছাড়া, তোমার হাজব্যান্ড এখনো আসেনি।”
সুমুর রাগে গা জ্বলছে। আরিয়ানের চোখে লোভ স্পষ্ট। সে বাঁকা হেসে বলল,
“তুমি জানো যখন প্রথম তোমাকে দেখি, মনে হয়েছিল, এই মেয়েটা আমার। উফফ! কি অদ্ভুত সুন্দর ফিলিংস। কিন্তু, তুমি তো ভুল মানুষকে ভালোবেসে ফেলেছ। শেরাজ তো কেবল রাগ করতে জানে, মায়া দিতে নয়। তুমি চাইলে আমি তোমায় এমন জীবন দিতে পারি। যেখানে শুধু ভালোবাসা থাকবে, রাগ নয়, ভয় নয়।”
“আপনি একটা ভুল করেছেন। আপনি যাকে দুর্বল ভেবেছেন, সে একজন স্ত্রী। যার নামের পাশে ‘শেরাজ খান’ জুড়ে আছে। আর যার হৃদয়ের পাশে রাগ নয়, আগুন জ্বলছে।”
“শেরাজের নাম নিয়ে তোমার এত অহংকার? শেরাজের ভালোবাসা নিয়ে তোমার এত গর্ব? তাহলে এতো রাতে তুমি একা কেনো, সুমু? ওইরকম একটা রাগী লোকের থেকে তো কেউ ভালোবাসা পায় না, পায় শুধু শাসন। তুমি হাসো, কিন্তু আমি জানি, তুমি আসলে একা।”
“খান সাহেব আমাকে যে সম্মান আর ভালোবাসা দেয়, সেটা আপনি কোনোদিন কাউকে দিতে পারবেন না।”
আরিয়ান ঘন নিঃশ্বাস ছাড়ল।
“তুমি জানো, যদি আমি চাই এক রাতেই তোমার পুরো পৃথিবীটা পাল্টে দিতে পারি। তোমার ওই তথাকথিত শেরাজ তোমায় সময় দেয় না। ফুফুমনি তোমাকে কত অপমান করে। তুমি শুধু একটাবার ‘হ্যাঁ’ বলো, সব বদলে যাবে সুমু। আমি তোমাকে অনেক ভালো রাখব। দুনিয়ার সব সুখ তোমার পায়ের কাছে এনে ফেলব।”
“আপনি যতটা নিচে নামতে চান, নামুন। কিন্তু মনে রাখবেন, একটা মেয়ের সম্মান ভাঙতে গেলে, আপনাকে প্রথমে নিজের বিবেক পুড়িয়ে ফেলতে হবে। আর রইল, সুখের কথা? আমার খান সাহেবের সামান্য উপস্থিতিতে আমি যে সুখ পায়, সেই সুখের কাছে দুনিয়ার সব সুখ তুচ্ছ।”
আরিয়ান ধীরে- ধীরে ওর দিকে এগোলো।
“ভেবো না, আমি ভয় পাই তোমার স্বামীকে। সে শুধু চিৎকার করতে পারে। আর আমি কাজ করি, নীরবে।”
সুমু পিছিয়ে গেল। পেছতে পেছতে দেওয়ালের সাথে পিঠ ঠেকে গেল তার। আরিয়ান দাঁড়িয়ে পড়ল। একটু উচ্চস্বরে হেসে বলল,
“তুমি যদি এতটা ‘স্মার্ট’ আর আত্মসম্মানী না হতে, তাহলে অনেক কিছু বদলে যেত, সুমু। এস.কে কী এমন দেখল তোমার মধ্যে আমি জানি না, তবে আমি বেশ ভালোভাবেই অনেক কিছু দেখতে পাচ্ছি।”
সুমু দৃঢ় গলায় বলল,
“আপনি দেখার অধিকার রাখেন না।”
“তবুও দেখছি। আর মজার ব্যাপার, তুমি তো কখনও থামাওনি আমাকে। একা থাকো, চোখে চোখ রাখো, চুপচাপ শুনে যাও।”
সুমু এবার এক ধাপ কাছে এগিয়ে এলো। গলায় ভয়ানক শীতলতা। রাগে নাকের পাটা ফুলে ফুলে উঠছে।
“শুনুন, আপনি ভুল ভেবে ফেলেছেন। আমি আপনার বন্ধু না, আপনাকে সহ্য করার বাধ্যতাও আমার নেই। ভুলে যাবেন না, আমি আপনার ভাইয়ের বউ। এই সম্পর্কের ওজন আপনি বোঝেন না। তাই বলছি, সম্মান দিয়ে কথা বলুন। আরেকবার এমন ইঙ্গিতপূর্ণ বাজে কথা বললে, আমি নিজে গিয়ে খান সাহেবকে সব বলব। তখন কী হবে, সেটা ভাবার সময়ও পাবেন না আপনি। আর চুপ থাকা মানে মেনে নেওয়া না। কখনও কখনও চুপ থাকা মানে শুধরানো জন্য একটা সুযোগ দেওয়া।”
আরিয়ান ব্যঙ্গ করে হাসল। সুমু আবারও বলল,
“আপনি ‘আরিয়ান ভাইয়া’, কিন্তু সেটা ঠিক ততদিন পযর্ন্ত, যতদিন পর্যন্ত আপনি আপনার সম্মান ধরে রাখতে পারবেন। আর না পারলে আপনি শুধু ‘একটা নাম’ হয়ে থাকবেন, যেটা আমি শুধুমাত্র ঘৃণা করে উচ্চারণ করব।”
আরিয়ান বাঁকা হাসল। তার ঠোঁটে কুৎসিত হাসি। সে ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“এই চুলের গন্ধ, এই নিঃশ্বাস, এস.কে জন্যই সব? একটু বাঁচিয়ে রাখো আমার জন্য?”
সুমু একটুও ভয় না পেয়ে বলল,
“আপনি কী বলছেন বুঝতে পারছি, আর সেটাই আপনাকে ঘৃণা করার জন্য যথেষ্ট।”
আরিয়ান মাথা ঝুঁকিয়ে, গলায় বিষ নিয়ে বলল,
“তুমি ভীষণ সুন্দর, সুমু। আমি অনেক মেয়ে দেখেছি, কিন্তু তোমার চোখে ভয় নেই, আর তাতেই নেশা চড়ে, জানো?”
সুমু ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“আপনি নেশা বলেন আর অসভ্যতা, দুটোরই নাম একটাই– আমার ক্ষেত্রে এসব নোংরামি।”
“তুমি বুঝতে চাইছ না আমাকে। এস.কে থাকলে পারতে কী এভাবে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে?”
“খান সাহেব থাকলে আপনি এই জায়গায় থাকার সাহস করতেন না। এখন আমি একা আছি, আর আমি নিজের সম্মান রক্ষা করতে জানি। আপনার মতো নিচ মনোবৃত্তির মানুষদের জন্য আমার ভয় নেই, আছে ঘৃণা।”
আরিয়ান থেমে গেল। মুহূর্তের জন্য যেন সুমুর চোখে ভয় না দেখতে পেয়ে তার ভেতরের দম্ভটাও কেঁপে ওঠল। সুমু আবারও বলল,
“আরেকবার এমন আচরণ করলে, আমি চুপ করে আরেকটি মুহূর্তও থাকব না। ভদ্রভাবে দূরে থাকুন, না হলে আমার প্রতিবাদ হবে এতটাই ভয়ংকর, আপনি আয়নায় নিজের মুখ দেখতে পারবেন না।”
আরিয়ানের নজর সুমুর পা থেকে শুরু করে বুকে এসে থামল। ঠোঁটের কোণে বিকৃত হাসি নিয়ে বলল,
“তোমার চোখে আগুন, কিন্তু শরীরটা? সেটা তো আগুনে পোড়ানোর জন্য না। ছুঁয়ে দেখার জন্য। তোমার আচরণে মায়া আছে। আর এই হোয়াইট শাড়িতে তোমাকে তো জাস্ট…”
সুমু চোখে বিস্ফোরণ। সে গলা স্বাভাবিক রেখেই বলল,
“আপনার মতো লোকের হাতের ছোঁয়ায় মেয়ে মানুষ পুড়ে ছাই হয় না, বরং সেই হাতই পুড়ে ছারখার হয়ে যায়। আপনি মেয়েদের শরীর বোঝেন, আত্মা বোঝেন না।”
“তুমি বলো, তুমি আমার ভাইয়ের বউ। কিন্তু তোমার চোখে তো অন্য ভাষা দেখি। এস.কে বুঝে না, আমি বুঝি। এমন রূপ, কেউ চাপা দিয়ে রাখতে পারে?”
“আপনার মতো পঁচা মন যার থাকে, সে সাদা কাপড়েও কালি খোঁজে। আপনি যা ভাবছেন, সেটা হলো আপনার কল্পনা, নয়তো বিকৃত লালসা। আর একটা কথা মনে রাখবেন, আমার ইজ্জত আর সম্মান, আপনার মতো লোকের খেলনা না।”
“তোমার ঠোঁট এত সুন্দর। অধিকার থাকলে অন্যভাবে চুপ করাতাম।”
সুমু চোখে ঘৃণার আগুন।
“আপনার চোখে সম্মান নেই, তাই মুখেও নেই। আমার ঠোঁট আপনি কল্পনাতে রাখলেও তো আপনার কলিজা ছিঁড়ে বের করে আনবে আমার খান সাহেব। আর আপনি বাস্তবে ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখেন? নিজের নোংরা মানসিকতার পরিচয় দেওয়া বন্ধ করুন। আমি শুধু মুখে প্রতিবাদ করিনা, দরকার হলে হাতও ব্যবহার করি। কিন্তু আফসোস, আপনার মতো নোংরা লোককে চড় মারার জন্য স্পর্শ করলে আমার হাত নোংরা হবে।”
“এই ভয় দেখিয়ে কী হবে, সুমু? তোমার ‘না’ এর মধ্যেও আমি ‘হ্যাঁ’ শুনতে পাই। তুমি যতই রাগ করো, ততই তোমাকে নিজের করে পেতে ইচ্ছে করে।”
সুমু এবার সম্পূর্ণ শান্ত। সে ঠান্ডা আগুনের মতো করে বলল,
“আপনার কল্পনায় আমি আগুন। বাস্তবে আমি আগ্নেয়গিরি। আপনার স্পর্শতো দূরে থাক, আপনার ছায়াও যদি আমার ওপর পরে, তাহলে আপনি নিজেই পুড়ে ছাই হয়ে যাবেন। আর হ্যাঁ, আমি আবারও বলছি, আমি আপনার ভাইয়ের স্ত্রী। এই পরিচয়েই মাথা উঁচু করে বাঁচি, আর আপনাকে ঘৃণা করে দেখি। এখন সরে যান।”
আরিয়ান ঠোঁটে একরাশ নোংরা হাসি নিয়ে বলল,
“যেতে তো তোমাকে দিব না। তুমি জানো সুমু, আমার কল্পনায় তোমাকে সাদা শাড়িতে দেখলে মনে হয় তুমি স্বর্গের রূপ। শরীরটা তুলোর মতোই নরম, স্পর্শের জন্যে চিৎকার করে আমার মন।”
“আপনার জিভ পঁচে গেছে। তাই হয়তো রূপ দেখে নয়, শরীর দেখে মুগ্ধ হন। আপনি নারী দেখেন না, দেখেন কেবল ভোগের বস্তু।”
“তোমার ঠোঁট এত সরু, তবুও কথায় এত বিষ। কিন্তু এই বিষও যদি আমার ত্বকে মিশে যায়, আমি দুঃখ করব না।”
“আপনি যতই বিষ পানি করতে চাননা কেনো? আমি আগুনের ফুলকি। আমার শরীর, আমার সম্মান স্পর্শের বাইরে। আর আপনার মতো মানুষদের জন্য তো নয়-ই।”
“তুমি কি জানো, ভয় দেখাতে গিয়ে তুমি আরও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে যাচ্ছো? তুমি যত রেগে যাচ্ছো, আমার ততটাই ইচ্ছে করছে তোমাকে…”
সুমু কঠিন গলায় বলল,
“আপনার ইচ্ছে একটা ঘৃণার গল্প। আপনি ভাবেন, আমার চোখের ভয় বা আগুন আপনাকে শক্তি দেবে। তাহলে আপনি ভুল ভাবছেন। আমি আপনার মতো পুরুষদের মুখে থুথু দিতে জানি।”
“এস.কের নাম নিয়ে বাঁচবে না, সুমু। ও তোমার শরীরকে এই আরিয়ান চৌধুরীর ছোঁয়া থেকে দূরে রাখতে পারবেনা।”
সুমু ঘৃণাভরা গলায় বলল,
“আপনি যা ভাবছেন তা স্বপ্নেও হবে না। আপনি যতটা নিচুতে আছেন, আমি ততটাই উঁচুতে। আপনি আমার ‘না’ বোঝেন না, তাইনা?”
আরিয়ান ঠোঁট কামড়ে বিকৃত হাসি হেসে বলল,
“তোমার এই চোখে জেদ আছে ঠিকই, কিন্তু আমি জানি মনের ভেতর একটা খালি জায়গা আছে, যেটা এস.কে পূরণ করতে পারেনি।”
সুমু ধীরে ধীরে এক’পা সামনে এগিয়ে এলো। চোখে আগুন, ঠোঁট কঠিনভাবে চেপে ধরা। কণ্ঠ নরম কিন্তু প্রতিটি শব্দ ছুরির মতো ধারালো,
“আপনার মতো নোংরা, নিচু মানসিকতার মানুষের সাথে কথা বলাটাই রুচিতে বাঁধে। মুখে থেকে যে গন্ধটা বেরোচ্ছে, তা শুধু ঘৃণা নয়, আপনার চরিত্রের দুর্গন্ধ। আপনার মতো লোকদের জন্য আমার কাছে আছে শুধু ঘৃণা। আর আমি এমন একজনের স্ত্রী, যার ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মানেই সম্মানের আশ্রয়। আপনি সেই ছায়ার ধারে আসার যোগ্যও নন। তাই নিজের জায়গা চিনে কথা বলুন।”
আরিয়ান হাসল। সুমু আবারও বলল,
“আপনি আমাকে স্পর্শ করার স্বপ্ন দেখার আগে আয়নায় গিয়ে নিজের চোখ দেখুন। সেখানে আপনার প্রতি আমার ঘৃণা দেখতে পারবেন। আজ থেকে আমার কাছে আপনি একটা ধিক্কারের নাম, আর কিছু না।”
আরিয়ান আবারও এগিয়ে আসতে গেলেই, সুমু আরিয়ানের মেইন পয়েন্টে হাঁটু দিয়ে মারল। ব্যথা জায়গায় হাত রেখে আরিয়ান চোখমুখ কুঁচকে কোমর বাঁকিয়ে ঝুকে পড়ল। এই সুযোগে সুমু দৌড়ে রুমে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা লক করে দিল।
•
নাজমিনের ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে আইয়ুবের নামটা ভেসে উঠল। নাজমিন কল রিসিভ করে ঘুমচোখে বলল,
“আপনি কি চান? আমি কি এই রাতের বেলায় না ঘুমিয়ে এখন আপনার ফালতু কথা শুনব?”
আইয়ুব হেসে বলল,
“তুমি তো আমার ব্রাউন গার্ল। আমার ওপর রাগ করে আছো?”
“না! ফোন রাখুন, ঘুমাব।”
“তুমি রাগ করলে বেশি কিউট লাগো।”
“প্রেম সকালে করব, এখন ঘুমাই।”
“না! এখন প্রেম করার সময় তুমি জানো না? রাত গভীর হলে প্রেম করতে হয়।”
“উফফ! ঘুমান তো। হুদাই বাজে কথা বলে, আমার মাথা ব্যথা বানাইয়েন না।”
“ভালোবাসা মানেই তো মাথা ব্যথার ঔষধ খাওয়া, আর তুমি তো আমার ছাম্মাক ছালো, একটা মিষ্টি দুষ্টু ব্যথা।”
“আপনাকে আমি ছেড়ে দিব একদিন। হুদাই প্যারা, ভালো লাগেনা।”
“ছাড়লেও তুমি থাকবে আমার ওয়াইফাই কানেকশনের মতো। না থাকলেও নাম দেখা যায়।”
নাজমিনের মেজাজ গরম হলো। সে কল কেটে দিয়ে ফোন বন্ধ করে আবারও শুয়ে পড়ল।
•
বাহিরে বৃষ্টি পড়ছে। একটার দিকে বাড়ি ফিরল শেরাজ। সুমু মন খারাপ করে শুয়ে আছে। শেরাজ ফ্রেশ হবার জন্য ওয়াশরুমে যেতে গিয়েও ফিরে এলো। সুমুর পাশে বসে সুমুর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
“কি হয়েছে? কেউ কিছু বলেছে?”
“না!”
শেরাজের বিশ্বাস হলোনা সুমুর কথা। সে উঠে দাঁড়াতেই সুমু হাত টেনে ধরে বলল,
“কোথায় যাচ্ছেন?”
“সিসিটিভি ফুটেজ চেক করতে।”
সুমু ভয় পেয়ে গেল। সে চায় না এই মাঝরাতে কোনো ঝামেলা হোক। সে শেরাজের হাত টেনে ধরে বলল,
“বাসার জন্য মন খারাপ। সবাইকে অনেক মিস করছি।”
শেরাজ বসল সুমুর পাশে। সুমু জড়িয়ে ধরল তাকে। চোখ ভিজে উঠল সুমু। কান্নাজড়িত গলায় বলল,
“আমার খুব বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছা করছে।”
শেরাজ একবার জানালা দিয়ে বাহিরের দিকে তাকাল। সুমুর মন খারাপ বলে আর না করল না। ড্রয়ারে একটা পকেটে ঢুকিয়ে রেখে এসে ফর্মাল ড্রেসেই সুমুকে নিয়ে ছাদের উদ্দেশ্যে রুম থেকে বের হলো। আরিয়ান পানি নিয়ে উপরে ওঠার সময় ওদের দুজনকে দেখে দাঁড়িয়ে পড়ল।
•
বৃষ্টি পড়ছে। ছাদের চারদিকে জমে আছে নীরবতা আর বৃষ্টির শব্দ। সাদা শাড়িতে ভিজে সুমু দাঁড়িয়ে আছে ছাদের এক কোণে। তার ভেজা চুল, চোখের নিচে পানির রেখা, আর ভেজা আঁচলের আড়ালে এক অপার্থিব সৌন্দর্য।
শেরাজ ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। সাদা শার্টের হাতা গুটিয়ে রাখা, চুলে বৃষ্টির জল। এক হাঁটুমুড়ে সে বসল সুমুর পায়ের কাছে। সুমুর পা নিজের উরুর ওপর তুলে নিল। পকেট থেকে নুপুর বের করে আলতো হাতে সুমুর পায়ে পরিয়ে দিল। সে একটু ঝুঁকে সুমুর পায়ের ওপর ঠোঁট ছোঁয়াল। শেরাজ হঠাৎ এমন নরম স্পর্শে মৃদু কেঁপে উঠল সুমু। শেরাজ মুখ তুলে তাকাতেই পা নামিয়ে নিল সে। শেরাজ আবারও তাকাল সুমুর পায়ের দিকে। এমন সময় ছাদের দরজার এসে দাঁড়াল আরিয়ান। তার হাতে ফোন। সে তাকিয়ে আছে সুমুর দিকে। শেরাজ আর সুমুকে এমন অবস্থায় দেখে রাগ জ্বলে উঠল আরিয়ানের মস্তিষ্ক। সে সুমুদের কাছে যাবার জন্য পা বাড়াতে গিয়েও থমকে গেল। রাগে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে স্থান ত্যাগ করল।
শেরাজ ছাদের দরজার দিকে তাঁকিয়ে বাঁকা হাসল। সে সুমুর দিকে তাকিয়ে নেশালো কন্ঠে বলল,
“তোমায় কেউ দেখতে পাবেনা, সুইটহার্ট। এই ছাদ, এই রাত, এই বৃষ্টি আর শুধু আমি আর তুমি।”
সুমু বৃষ্টি ভেজা ঠোঁটে বলল,
“ছাদের মধ্যে এইসব কি শুরু করেছেন? আমার পায়ের সামনে বসে আছেন। কেউ দেখতে পেলে আমাকে খারাপ ভাববে। বলবে স্বামীকে পায়ের কাছে বসিয়ে রেখেছি।”
শেরাজ ধীরে সুমুর পায়ে হাত রাখল।
“তোমার গলায় ওই চেইনটা আমার স্পর্শ চাই, কারো চোখ না।”
সে উঠে দাঁড়িয়ে সুমুর গলায় থাকা ডায়মন্ডের চেইন খুলে নিল। তারপর কানের দুল, হাতের ব্রেসলেট একে একে খুলতে থাকে সে। শেরাজের শীতল হাতের প্রতিটা স্পর্শে যেন সুমুর সময় থেমে যায়। বৃষ্টির ভেজা শাড়ির নিচে সুমুর সারা দেহ কাঁপছে, ভালোবাসায়, লজ্জায়, আর তার খান সাহেবের অনিবার্য টানেই। বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একমাত্র পুরুষটাই তার জগৎ ‘শেরাজ খান।’ যে তার অলঙ্কার নয়, আত্মা খোঁজে ব্যাকুল। সুমুর হৃদয়জুড়ে এখন শুধুই একটাই শব্দ ‘খান সাহেব।’ তার সমস্ত সত্তা ভিজে গেছে, শুধু বৃষ্টিতে না, শেরাজের চাহনিতে। ভেজা শাড়ির ফাঁকে বুকের নিচে কাঁপছে লাজ আর একরাশ না বলা আকাঙ্ক্ষায়।
শেরাজ ঘোর লাগা চোখে তাকাল সুমুর দিকে। শেরাজ চোখে বৃষ্টি নেই, ছিল না কোনোদিন, থাকতো শুধু আগুন। আর সেই আগুন এখন জ্বলছে তার মনের ভিতর, আর সুমুর ভেজা অবয়বের প্রতিটা রেখায়। সে মুখ এগিয়ে নিয়ে সুমুর কানে ফিসফিস করে বলল,
“তুমি জানো না সুইটহার্ট, এই সাদা শাড়িটা ঠিক কতটা অন্যায় করছে আমার সঙ্গে। তুমি জানো না, তোমার এই ভেজা কাঁপুনি আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে।”
তার হাতটা ধীরে ধীরে উঠে যায় সুমুর কাঁধে। আঁচলটা একটুখানি সরালেই, সুমুর নিঃশ্বাস থমকে যায়।
“খান সাহেব, না প্লিজ…”
শেরাজ সুমুকে ভয় দেখিয়ে আলতো হাসল। শেরাজের হাসিমাখা ঠোঁট ছুঁয়ে যায় সুমুর কপাল, তারপর গালের কোণে, আর একটুখানি নামতেই, সুমু চোখ বন্ধ করে ফেলল। তার হৃদয়ের মধ্যে তখন একটা যুদ্ধ। লজ্জা বনাম আকাঙ্ক্ষা। তবু সে নিজেকে সরায় না। সে চোখ বন্ধ রেখে বলল,
“আপনি আমায় এমন করে স্পর্শ করলে, আমি এলোমেলো হয়ে যায়।”
শেরাজ আবারও সুমুর কপালের ঠিক মাঝখানে একটা চুমু এঁকে দিয়ে বলল,
“তোমাকে এলোমেলো দেখতে চাই। আমার এলোমেলো স্পর্শ থেকে বাঁচতে তোমায় পালাতে দেখতে চাই। তোমায় শুধু ছুঁতে চাই, প্রতিটা লজ্জা পেরিয়ে, তোমার আত্মা পর্যন্ত পৌঁছাতে চাই।”
হঠাৎ একটা বিদ্যুত চমকালো। সুমু শিহরিত হলো, কিন্তু তাতেও শেরাজের স্পর্শ থেমে গেল না। বরং সে সুমুকে নিজের বুকের মধ্যে লুকিয়ে ফেলল। শেরাজ আবারও সুমুর কাঁধে হাত রাখল। তার চোখে আজ রাগ নেই। আছে শুধু তৃষ্ণা, যেটা কোনো জল মেটাতে পারে না। হঠাৎ, এক ঝটকায় সে সুমুকে কোলে তুলে নিল। সুমুর ভয় রুদ্ধ হয়ে শেরাজের বুকে চাপা পড়ল।
“খান সাহেব, আশেপাশের বাসা থেকে কেউ দেখবে।”
“দেখুক না! জানুক সবাই, তোমার স্বামী শুধু তোমাকেই চায়। তোমার প্রতিটা নিঃশ্বাস, প্রতিটা কাঁপুনির অধিকার আমার।”
বৃষ্টির মধ্য দিয়ে সে ধীরে ধীরে হেঁটে গেল। ভেজা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো। তার প্রতিটা পদক্ষেপে যেন সে তার মালিকানা দাবী করছে সুমুর প্রতি। সুমু আজ চুপ। তার হাত কাঁপতে কাঁপতে শেরাজের ঘাড় জড়িয়ে ধরল। তার অশান্ত বুকে শেরাজের বুকের সঙ্গে বুক লেগে আছে। তার মনে হচ্ছে, তার ছোট দেহটা ঢেকে আছে তার খান সাহেবের বুকের ছায়ায়। শাড়ির কাপড়ের আর কোনো অস্তিত্ব যেন নেই।
দরজা খুলে তারা ঢুকে পড়ল বেডরুমে। শেরাজ সুমুকে বিছানায় রাখল না। সে সুমুকে দাঁড় করিয়ে দিল জানালার সামনে। জানালার কাচ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে জলরাশি। চারদিকে এক অদ্ভুত নীরবতা, শুধু বৃষ্টির শব্দে যেন এক সুর বেজে চলেছে।
সাদা শাড়িটা গায়ে লেগে আছে সুমুর। চুল থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। সে ধীরে ধীরে সুমুর চুলের ভেজা গোছা একপাশে সরিয়ে দিল।
“তুমি জানো, এই ঘাড়ে আমার ঠোঁট কখনো থেমে থাকতে পারে না।”
সে ঠোঁট ছোঁয়ায় সুমুর গলায়। গলা বেয়ে তার ঠোঁটের স্পর্শ নেমে যায় কাঁধ ছুঁয়ে পিঠের মাঝ বরাবর। সুমুর নিশ্বাস যেন থেমে গেল।
“খান সাহেব, আমি দূর্বল হয়ে যাচ্ছি।”
শেরাজ সুমুর হাত ধরে দেয়ালে মিশিয়ে দিল।
“দূর্বল হয়ে যাও, সুইটহার্ট। দূর্বল হয়ে যাও, যেন আমি তোমার প্রতিটা দূর্বলতাকে নিজের করে নিতে পারি।”
তার হাত এবার ধীরে ধীরে সুমুর শাড়ির আঁচল খুলে দিল। না! কোনো তাড়াহুড়ো নয়, শুধু ভালোবাসায় মোড়া গতিতে। সুমুর শরীর থেকে খুলে নেওয়া অলংকারগুলো পকেট থেকে বের করে মেঝেতে ফেলে দিল শেরাজ। সুমু চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। তার শরীরটা কাঁপছে, কিন্তু সে সরছে না। শেরাজ তার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল,
“তোমার শরীর না, সুইটহার্ট। আমি তোমার আত্মাকে ছুঁতে চাই।”
সুমু ফিসফিস করে বলল,
“আমার আত্মা অনেক আগেই পুরোপুরি আপনার হয়ে গেছে।”
শেরাজ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। সুমুর ভেজা চুলের ফাঁকে, চোখেমুখে ছিল অদ্ভুত এক শান্তি, অথচ ভেতরটা যেন ঝড়ো সমুদ্র। শেরাজ মৃদু গলায় বলল,
“তুমি জানো? এই বৃষ্টি, আমাকে তোমার কথা মনে করায়। সেই প্রথম দেখা, প্রথম স্পর্শ।”
সুমু চোখ নামিয়ে ফেলল। বৃষ্টি যেন আরও জোরে পড়তে লাগল। শেরাজ ধীরে ধীরে তার মুখের দিকে এগিয়ে গেল।
“তুমি কি জানো, আমি কতটা ভয় পাই? যদি কোনোদিন তোমায় হারিয়ে ফেলি?”
সুমু কাঁপা গলায় বলল,
“সৃষ্টিকর্তা না চাইলে আপনি আমায় হারাবেন না। আমি আছি, সব সময়, সব বৃষ্টিতে, সব নির্জনে, শুধু আপনার জন্য।”
হঠাৎ করে শেরাজ রুমে হিটার অন করল। বাহির থেকে আসা আলো নরম হয়ে এসেছে। চারপাশে যেন এক ঘোর লেগে আছে। সুমুর ঠোঁট কাঁপছে। শেরাজ তার ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,
“তোমার ঠোঁট কাঁপছে, সুইটহার্ট। ‘খান সাহেব’ বলে ডাকো তো একবার।”
সুমু লাজুক হেসে বলল,
“খান সাহেব!”
শেরাজ তার ঠোঁটে আবারও আলতো ছোঁয়া দিল। তারপর একে অপরের আলিঙ্গনে হারিয়ে গেল। কিছু সময় যেতেই শেরাজ সুমুকে দিয়ে ছেড়ে বলল,
“আই ব্যাডলি নিউ ইউ, সুইটহার্ট।”
শেরাজের কণ্ঠটা যেন বর্ষার মাঝরাতে ঠান্ডা হয়ে যাওয়া কফির মতো গাঢ় ও মায়াময়। কথাটা বলার সময় শরাজের চোখ আটকায় সুমুর চোখে। সেই চোখে ছিল একধরনের তৃষ্ণা, এক গভীর চাহনি, যা কোনো ভাষায় বলা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়। শেরাজের বলা কথার মাঝে ওদের দুজনের নিঃশ্বাস মিলিয়ে গেল। শেরাজ এক হাতে সুমুর গাল স্পর্শ করল, তার ঠোঁটের ডগায় ছুঁয়ে দিল একরাশ আগুন চোখে ছিল তৃষ্ণা, যাতে মিশে আছে প্রেমের অদ্ভুত কোমলতা।
বৃষ্টির শব্দের মাঝে নিঃশব্দ দুজনের ওষ্ঠের ছোঁয়া চলল দীর্ঘ সময়, যেন সময় থেমে গেছে। সুমুর হৃদস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছে, শেরাজের স্পর্শে তার সারা শরীরে বৃষ্টির মতোই ঠান্ডা অথচ জ্বলন্ত আবেশের অনুভূতি হচ্ছে।
ঘরটা অন্ধকার। শুধু জানালার বাইরে বিদ্যুতের আলোয় মাঝে মাঝে ঝলকে উঠছে তাদের মিলন।
শেরাজ ধীরে ধীরে বলল,
“তুমি জানো, এই বৃষ্টিভেজা রাতটা আমি শুধু তোমার জন্য রেখে দিতে চাই। চুপিচুপি, শুধুই আমাদের ভালোবাসার জন্য।”
সুমু কোনো উত্তর দিল না। তার ঠোঁটজোড়া অস্বাভাবিক মাত্রায় কাঁপছে। চোখের পাতায় জমে আছে ভিজে অনুভব, বৃষ্টির নয়, শুধু শেরাজের ছোঁয়ার। শেরাজ ধীরে ধীরে তার মুখের আরও কাছে এসে বলল,
“তোমার শরীরের এই ভেজা ঘ্রাণ, এই কাঁপুনি, আমাকে পাগল করে দিচ্ছে, সুইটহার্ট। আমি যদি এখন নিজেকে আটকে রাখি, তবে সে আমি হবো না। সে হবে কেবল এক সমাজভীরু শেরাজ।”
সুমুর চোখে একধরনের নীরব আগুন। সে জানে, কিছু বলতে গেলেই সব ভেঙে পড়বে। তবু সে বলেল,
“আপনি আমার দিকে এমন করে তাকাবেন না, খান সাহেব। আমার আজ আবারও নতুন করে লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে।”
শেরাজের ঠোঁট ছুঁয়ে যায় এবার তার গলার ঠিক নিচে, যেখানে শাড়ির আঁচল আর জল একসাথে মেখে রেখেছে তৃষ্ণা।
“তোমার লজ্জা, আমার শান্তি।”
তার হাতটা এবার নামল সুমুর কোমরে। সুমু আবারও কেঁপে উঠল। শেরাজ হেসে ফেলল। সেই হাসি কোনো পাপের নয়, ছিল এক ধরনের প্রেমের দুঃসাহস, এক ভালোবাসার অধিকার।
“সৃষ্টিকর্তা তোমায় আমার কপালে লিখেছে, সুইটহার্ট। তুমিই কেবল আমার হক।”
তাদের মাঝখানে তখন শুধু একটুখানি দূরত্ব। জানালার বাইরের ঝড় বাড়ছে, আর ঘরের ভিতরে দুজন মানুষের মনের ভেতরের ঝড় বাড়ছে। আচমকা সুমু শেরাজকে জড়িয়ে ধরল।
শেরাজ তখন আর থামল না। সে সুমুকে কোলে তুলে নিল। বৃষ্টির শব্দে হারিয়ে গেল শাড়ির ভেজা ঘ্রাণ আর নিঃশ্বাসের তীব্রতা। শেরাজ ধীরে পায়ে সুমুকে বিছানায় বসিয়ে দিল। সুমুর ভেজা শাড়ি তখন তার গায়ের সাথে লেপটে আছে, আর চোখে জমে আছে এক স্বপ্নপূরণ দৃষ্টি।
“আপনি কি জানেন, আমি ভয় পাই এই মুহূর্তগুলোকে?”
“কেনো?” শেরাজ তার কপালে চুমু এঁকে দিয়ে জিজ্ঞেস করল।
“কারণ আপনি যখন এতটা কাছে থাকেন, তখন আমি নিজেকে আর নিজের মধ্যে রাখতে পারি না।”
শেরাজ একহাতে সুমুর চিবুক তুলে ধরে, সুমুর চোখে গভীরভাবে তাকিয়ে মৃদুস্বরে গেয়ে উঠল,
“এক দিল হে,
এক জান হে,
দোনো তুজপে কুরবান হে!
এক মে হু,
এক ইমান হে,
দোনো তুজপে কুরবান হে!”
গান থামিয়ে সে মুচকি হেসে বলল,
“আজ রাতে, এই বৃষ্টির সুরে, আমি তোমায় নিজ হাতে গড়ে নিতে চাই। একদম আমার মতো।”
কথাটা বলে টেবিল থেকে ফোনটা নিল। তারপর ফোনে প্লে করল “জিন্দেগী ছে চুরাকে” গানটা। ফোনটা জায়গার মতো রেখে সে আবারও সুমুর কাছে এলো। শেরাজের ঠোঁট এবার নামছে সুমুর গলার নিচে, তারপর বিউটিবোনে। তার প্রতিটা ওষ্ঠের ছোঁয়া যেন একেকটা ফুল হয়ে খসে পড়ছে সুমুর ত্বকে।
সুমুর শরীরের ভেতরটা কাঁপছে। সে শিহরিত, সে নিঃশ্বাস হারিয়ে ফেলছে। শেরাজ তার কানে আবারও ফিসফিসিয়ে বলল,
“তোমার ভেজা শরীর, এই কাঁপুনি, আমার সত্তার ভেতরে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। আমি তোমার ভিতরে ঢুকে যেতে চাই। শুধু শরীরে না, আত্মায়, নিঃশ্বাসে আর হৃদয়ের গভীরে।”
বিছানার চাদরে তাদের ছায়া গলে গেল, বৃষ্টির শব্দে হারিয়ে গেল সুমুর শেষ লাজের আওয়াজ। সুমু ঢাকা পড়ে গেল শেরাজের বলিষ্ঠ দেহের আড়ালে, যেন প্রেমের গোপন পত্র খুলে পড়ছে, অক্ষরে অক্ষরে। সুমুর হৃদয়ে তখন শুধু একটাই শব্দ,
“খান সাহেব, খান সাহেব, খান সাহেব!”
চোখে চোখ, ঠোঁটে ঠোঁট রেখে তারা হারিয়ে গেল এক প্রেমের মহাসাগরে। যেখানে ভাষা নেই, লজ্জা নেই। শুধু ছোঁয়া আছে, ভালোবাসা আছে। এই রাতে আবারও তারা শুধু দেহ নয়, একটা আত্মা হয়ে মিশে গেল। এই রাতে আরও একবার কোনো শরীরের খেলা ছিল না, ছিল আত্মার এক গভীর, নিঃশব্দ অগ্নিস্নান। বাইরে তখনও বৃষ্টি ঝরছে। কিন্তু, রুমের ভিতরে দুজন মানুষের নিঃশ্বাসের পাল্লা সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে ভারি হচ্ছে।
চলবে..?