ফন্ট সাইজ:
থিম:
খান সাহেব

৪০তম পর্ব

লেখক: সুমাইয়া জাহান

#খান_সাহেব

#সুমাইয়া_জাহান

#পর্ব_40

সাদা চাদরটার ওপর ভেজা ভেজা শরীর জড়িয়ে সুমু তার খান সাহেবের বুকে ওপর পড়ে আছে। বালিশের পাশে এলোমেলো চুল, অধর জোড়া একটু ফুলে আছে, চোখদুটো যেন আরও গাঢ় ভালোবাসার কালি মেখে নিয়েছে। তার গালটা শেরাজের কাঁধে ছুঁয়ে আছে। গলা জুড়ে একটা শান্ত শ্বাস। শেরাজ এক হাতে সুমুর পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে ধীর, গভীর আর কোমলভাবে। আরেক হাতে সাদা চাদরটায় মোড়ানো সুমুর কোমরটা আগলে রেখেছে এমনভাবে, যেন দুনিয়ার সব ঝড় থেকেও আগলে রাখবে। ঘরের ভেতর যেন সময় থেমে আছে। জানালার বাইরের মিষ্টি, নরম আলো যেন আলোয় ভরিয়ে দিয়েছে তাদের হৃদয়ে।

সুমু চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। হঠাৎ তার মনে পড়ল কাল রাতের কথা। সে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেনি। তার শরীর, মন, আত্মা সবটাই তখন তার খান সাহেবের দখলে ছিল। এখনও আছে সবকিছু তার খান সাহেবের দখলে। বন্দি করে রেখেছে তাকে ভালোবাসার কারাগারে। কালরাতের কথা ভেবে চোখ বন্ধ করেই মুচকি হাসল সুমু। কাঁপা কাঁপা গলায় ফিসফিস করে বলল,

“খান সাহেব!”

শেরাজ ঠোঁট নামিয়ে নিল সুমুর কপালে।

“হুম, সুইটহার্ট!”

“আপনি শুধু আমার?”

খুব ছোট একটা কথা, কিন্তু তার ভেতরটায় ঝড়। শেরাজ এক মুহূর্ত থেমে গেল। চাদরের নিচে থাকা তার হাত উঠে আসে সুমুর কাঁধে। চোখ নামিয়ে দেখে এই সেই মেয়েটা, যেই মেয়েটা একটা সময় তাকে দেখলেই ভয়ে কাঁপতো। আজ সেই মেয়ে তার বুকের ভেতর ঘুমিয়ে।

“এত ভালোবাসা দেবার পরেও তোমার মনে হয় আমি অন‍্যকারো? আমি শুধু তোমারই সুইটহার্ট।” শেরাজের কণ্ঠে নিঃশব্দ শপথ।

সুমুর চোখজোড়া চিকচিক করে উঠল, সে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে দিল শেরাজের বুকের মাঝখানে। অতীত মনে পড়ল সুমুর। একটা ভারি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল সে। তার নিঃশ্বাস লেগে যায় বাতাসে। সে শেরাজের দিকে তাকিয়ে মুখ তুলে বলল,

“আপনি আমার শেষ প্রার্থনা।”

শেরাজ আবারও ফিসফিস করে বলল,

“তুমি জানো না, কাল রাতে তোমার ওই ভেজা শাড়িটা আমাকে কতটা পাগল করে তুলেছিল। আমি শুধু তোমাকে শুধু ছুঁয়ে ক্ষান্ত হয়নি, আমি তোমার ভেতরে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম।”

“আমি জানিনা বলছেন? আপনার গাগলামি ঝড় আমার ওপর দিয়ে গিয়েছে। আমি হাড়ে হাড়ে টেঁর পেয়েছি আপনার পাগলামির ফল। ইভেন এখনো পাচ্ছি।”

শেরাজ আলতো হেসে বলল,

“তুমি ভিজে ছিলে, কিন্তু তবুও আগুনের মতো ছিলে। তোমার স্পর্শে আমি জ্বলে উঠেছিলাম।”

সুমু চোখ বন্ধ করে ফেলল। তার ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু কোনো শব্দ বেরোয় না। সে শুধু অনুভব করছে, একটা হাত তার মুখ ছুঁয়ে নিচে নামছে, আরেকটা হাত তার কোমর জড়িয়ে ধরেছে। শেরাজ সুমুর কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল, তারপর ধীরে ধীরে ঠোঁট নামে সুমুর চোখের পাতায়, গালের কোণে, চিবুকের নিচে। শেরাজের মতিগতি সুমুর কাছে সন্দেহের লাগে। শেরাজ কোনো কিছু বোঝার আগে সুমু কামড় বসায় শেরাজের বুকে। আচমকা আক্রমণে শেরাজ সুমুকে ছেড়ে দেয়। শেরাজের হাত থেকে ছাড়া পেতেই, সুমু শরীরে সাদা চাদর পেঁচানো অবস্থায় বেড থেকে নেমে ওয়াশরুমে চলে গেল।

•

সকালের নাস্তা করে রুমে এলো সুমু। শেরাজ অফিসের জন‍্য রেডি হয়ে নিল। সে সুমুর জন‍্য মেডিসিন এনে সুমুর হাতে দিয়ে বলল,

“সবগুলো মেডিসিন খেয়ে নিবে। আর শোনো, দু’ঘন্টার জন‍্য অফিসে যাচ্ছি। একটা ইম্পর্টেন্ট কাজ আছে। আজ ফ্রাইডে। বাসায় এসে জুম্মা পড়তে যাব। তুমি নিজের খেয়াল রেখো, আসছি।”

শেরাজ সুমুর কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল। সুমু কিছুক্ষণ শেরাজের যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ ফোনে কল আসায় ফোনের দিকে তাকাল সে। কল রিসিভ করে কানে ধরে বলল,

“বলো ইশিতা!”

“ভাইয়া কী চলে গেছে সুমু?”

“হ‍্যাঁ, মাত্রই।”

“তুমি একটু আমার রুমে আসতে পারবে?”

“আরবাজ ভাইয়া রুমে নেই?”

“না! ও গার্ডেনে।”

“ওকে, আসছি।”

কল কাটল সুমু। এতক্ষণ হাতে নিয়ে বসে থাকা মেডিসিনগুলো বেড সাইড টেবিলের ওপর রাখতে গিয়ে সব নিচে পড়ে গেল। সুমু ব‍্যাপারটা পাত্তা না দিয়ে বেরিয়ে গেল রুম থেকে।

•

সব সম্পর্কের শুরু হয় এক অদ্ভুত অনূভুতি দিয়ে। ইশিতা আর আরবাজের গল্পটাও ঠিক তেমনই। বন্ধুত্ব থেকে ভালোবাসা, আবার সেই ভালোবাসা থেকেই গড়ে ওঠা এক অদৃশ্য বন্ধন। ইশিতা, শহুরে এক মেয়ে। সে প্রাণবন্ত, যুক্তিবাদী আর নিজের মনের কথা বলতে জানে। আরবাজ, বরং একটু চুপচাপ, ভেতরে গাঢ় সমুদ্রের মতো গভীর। সে মুখে বলে না, চোখে বলে। তাদের ভালোবাসায় ছিল না সিনেমার মতো রঙিন কল্পনা। ছিল বাস্তবতা, ঝগড়া, মান-অভিমান, কিন্তু তবুও ছিল এক গভীর টান। আরবাজ কখনও ইশিতার গায়ে রাগ ঝাড়ে না। কিন্তু চুপ হয়ে যায়। আর ইশিতা সেটাই বুঝে ফেলে।

“তুমি চুপ কেন?”

“কারণ তুমি বলো, আমি শুনি…”

এই এক লাইনে ইশিতা বোঝে, তার জায়গা কোথায়। সে জানে, তার জায়গা আরবাজের মনের একেবারে ভেতরটায়। বিয়ের পর সম্পর্কটা বদলায়নি, বরং গভীর হয়েছে। রাতে চায়ের কাপ ভাগ করে নেওয়া, আর সকালে ছোট ছোট ঝগড়ার মাঝে লুকিয়ে থাকে ভালোবাসার চোরাস্রোত। ইশিতা গুছিয়ে রাখে আরবাজের শার্ট, আর আরবাজ গুছিয়ে রাখে ইশিতার মুড। কোন দিন সে কফি খাবে, কোন দিন শুধু জড়িয়েই থাকতে চাইবে, একে অপরের সম্পর্কে এসব সব জানে তারা। তারা জানে, নিখুঁত কিছু হয় না, তবে একে অপরকে নিখুঁতভাবে ভালোবাসা যায়। তাদের ভালোবাসা কখনও জোরে বলা হয়নি, কিন্তু প্রতিটা অভ্যাসে জড়িয়ে আছে সে কথা। বৃষ্টির দিনে ইশিতা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকলে, আরবাজ বুঝে নেয় ওর হাতে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা দিতে হবে। আরবাজ যখন অফিস থেকে ফিরে দরজা বন্ধ করে একটু বেশিই দীর্ঘশ্বাস ফেলে, ইশিতা গায়ে একটা নরম চাদর জড়িয়ে দেয়। তারপর কিছু না বলে, কেবল পাশে বসে থাকে। এ এক নিঃশব্দ ভালোবাসা। তাদের মাঝে 'ভালোবাসি' কথাটা অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছে। কারণ তা তারা চোখে, ছোঁয়ায়, আর প্রতিদিনের ছোট ছোট খেয়ালে বলে ফেলে। রাতের আঁধারে, একে অপরের পাশে চুপচাপ, নিঃশব্দে শুয়ে থাকা হয় তাদের। আবার যখন ইশিতা প্রশ্ন করে, “ভবিষ্যতে যদি ঝড় আসে, আপনি হাত ছাড়বেন না’তো?” আরবাজ তখন বলে না কিছু, শুধু তার হাতটা আরও একটু শক্ত করে ধরে। কারণ ভালোবাসা তো শব্দের অপেক্ষায় থাকে না। ভালোবাসা থাকে ওদের মতো এক কাপ চায়ের ভাগে, চুপ করে পাশে বসে থাকা রাতে, কিংবা এক নিঃশ্বাস দীর্ঘ নীরবতায়। আর এভাবেই, চুপিচুপি, প্রতিদিন নতুন করে তারা বাঁধা পড়ে ভালোবাসার বন্ধনে।

বেলকনিতে দাঁড়িয়ে গার্ডেনে ফিরোজাদের সাথে দুষ্টুমি করতে থাকা আরবাজের দিকে তাকিয়ে এসব ভাবছে, ইশিতা। এমন সুমু দরজার নক করল। সুমু ঠোঁটে মুচকি হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইশিতা রুমে এসে বলল,

“নক করছো কেনো সুমু? নিজের বোন প্লাস বন্ধুর রুমে আসতে নক করতে হবে কেনো?”

সুমু রুমে ঢুকে বলল,

“আমার বোন প্লাস বন্ধুটা তো আর এই রুমে একা থাকেনা, তাইনা?”

ইশিতা আলতো হেসে বলল,

“আমাকে একটু সাজিয়ে দিবে সুমু?”

“সাজিয়ে দিবো মানে? কোথাও যাচ্ছো নাকি?”

“হুম! কেনো তুমি জানোনা? ভাইয়া কিছু বলেনি?”

সুমু একটু ভাবুক হয়ে বলল,

“কই না'তো?”

“তাহলে শোনো! এই বাড়ির ছেলেরা তো খুব বিজি থাকে। তাই তারা সপ্তাহে একটা দিন মানে, প্রতি শুক্রবার তাদের বউকে নিয়ে ঘুরতে বের হয়। আর এই নিয়মটা কে বানিয়েছিল জানো?”

“কে?”

“বড়বাবা মানে তোমার শশুর। শুনেছি যখন উনি সেনাবাহিনীতে ছিলেন, তখন তো বড়মামনিকে একদমই সময় দিতে পারতেন না। এরপর যখন তারা ওমানে চলে এলো, তখন নাকি দুই ভাই মিলে প্রতি শুক্রবার আমার শাশুড়ি আর তোমার শাশুড়িকে নিয়ে ঘুরতে বের হতো।”

“বাহ! দারুন প্রেম ছিল তো তাদের।”

“তা তো অবশ্যই! কিন্তু তোমাকে ভাইয়া সত্যি কিছু বলেনি?”

“না! শুধু বলেছে, আজ তাড়াতাড়ি বাড়িতে ফিরে আসবে।”

“তাহলে তো হলোই!”

“কিন্তু তোমরা এখন কোথায় যাওয়ার প্ল‍্যান করেছ?”

“জানিনা, ও জানে। আমাকে কিছু বলেনি। জানো, আমি বোরকা পরে যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ও বলল, শাড়ি পরতে।”

“ঠিকি তো বলেছে। ভাইয়া তার এই মিষ্টি বউটাকে একদিন তো নিজের মনে মতো সাজে দেখতে চাইতেই পারে।”

“হুম! তবে তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে, কাল একটু বেশি ভালোবেসেছে ভাইয়া।”

সুমু লজ্জায় মুখ নামিয়ে ফেলল। ইশিতা সুমুর চিবুক ছুঁয়ে চুমু খেয়ে বলল,

“এসো আমাকে সাজিয়ে দিবে।”

সুমু মুচকি হাসল। সে ইশিতাকে হালকা নীল রঙের একটা শাড়ি সুন্দর করে পরিয়ে দিয়ে হিজাব পিন করে দিল। মুখে হালকা প্রসাধনীর ছোঁয়া আর ঠোঁটে হালকা গোলাপী লিপস্টিক দিল। ইশিতাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নজর কাটানোর জন‍্য ইশিতার কানের পাশে কাজল লাগিয়ে দিয়ে বলল,

“মাশাআল্লাহ! কি অপূর্ব দেখতে লাগছে তোমাকে।”

ইশিতা আলতো হাসল। এমন সময় দরজায় নক পড়ল। সুমু তাকিয়ে দেখল আরবাজ অন‍্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সুমু ইশিতার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,

“আমি এখন আসি।”

কথাটা বলে চলে গেল সুমু। সুমু যেতেই আরবাজ রুমে ঢুকল। সে অপলকভাবে ইশিতার দিকে তাকিয়ে রইল।

ইশিতাকে আজ একেবারে অন্য রকম লাগছে। সাদামাটা সাজ, তবুও যেন চোখ সরানো যায় না। মায়াবী মুখ আর সাথে ঠোঁটে একচিলতে হাসি। আরবাজ যেন থমকে গেল। তার সময় যেন থেমে গেল।

“তুমি সবসময় এইরকম ভাবে থাকোনা কেনো?”

হঠাৎ নিজের অজান্তেই কথাটা বেরিয়ে এলো আরবাজের মুখ থেকে। ইশিতা মুচকি হেসে বলল,

“কি বললেন?”

আরবাজ মাথা চুলকে বলল,

“মানে এই সাজটায় তোমাকে অন‍্যরকম লাগছে। অসম্ভব সুন্দর লাগছে।”

ইশিতার গাল লাল হয়ে উঠল। আরবাজ তখনো তাকিয়ে আছে। তার চোখে একরাশ বিস্ময় আর প্রশংসা, যেন এতদিন ধরে কাউকে নতুন করে চিনছে।

আরবাজকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ইশিতা বলল,

“আপনি কী শুধু তাকিয়েই থাকবেন, নাকি যাবেন?

ধ‍্যান ভাঙলো আরবাজের। সে আবারও মাথা চুলকে আলতো হেসে বলল,

“চলো!”

দুজনে একসাথে বেরিয়ে গেল পুরো দিন সকলের থেকে একটু দূরে গিয়ে নিজেদের মতো করে কাটানোর জন‍্য।

•

ঘড়ির কাঁটা থেমে গেছে যেন। পাতালপুরীর বিলাসবহুল রুমে একটা অশুভ নিস্তব্ধতা। সেখানে যেন মৃত্যুপুরী নেমে এসেছে।

“হোয়্যার ইজ হি? কোথায় গেল আমার লোকটা?”

এক গর্জন, এক বিষাক্ত চিৎকার ছিন্নভিন্ন করে দিল সেই নিস্তব্ধতা। মানবটির চোখে রক্তজবার মতো রঙ, মুখে হিংস্র বিকৃতি। সে এক ধাক্কায় উল্টে দিল সামনে থাকা মার্বেলের টেবিল। কাচ ভেঙে ছিটকে পড়ল মেঝেতে, ঝর্ণার মতো ছড়িয়ে পড়ল গ্লাসের টুকরো।

“তাকে খুঁজে বের করো, এখনই, এই মুহূর্তে। এস.কে কোথায় নিয়ে গেছে তাকে?”

একটা চেয়ারের হাতলে ঘুষি মারল এমন জোরে, কাঠ কট করে ভেঙে গেল। কেউ সাহস করে কিছু বলছে না। তার চারপাশে থাকা বডিগার্ডরা ভাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। একজন কাঁপতে কাঁপতে বলল,

“ব…বস, হয়ত সে পালিয়েছে…”

“চুপ!”

সে রক্তচক্ষু নিয়ে লোকটির গলা চেপে ধরল।

“তুই তোর মুখে ওর নাম আনবি না। ও আমার শিকার ছিল, আর তুই? একটা ভয় পেয়ে বেঁচে থাকা কুকুর। কোনো কাজের না তোরা।”

লোকটা হাঁপাতে লাগল, চোখে জল, শরীর কাঁপছে। কিন্তু মানবটি তাকে ছাড়ল না।

“সবাই তো ভয় পায় আমাকে। তাহলে ওই এস.কে কেনো পায়না?

তার নিঃশ্বাসে পাগলামির গন্ধ। রাগ নয়, পিশাচের উল্লাস। রুমের ভেতরে থাকা সবাই নিঃশব্দ, যেন নিঃশ্বাসও নিতে ভয় পায় তারা।

মানবটি আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজেকে দেখে ফিসফিস করে বলল,

“তোমরা ভাবছো আমি পাগল? না… আমি হচ্ছি ভয়। আমি হচ্ছি ওদের জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন। অ্যান্ড নেক্সট টাইম। নো মিসটেকস। নো মার্সি।”.

একজন কাঁপতে কাঁপতে বলল,

“বস! আমার কাছে পাক্কা খবর আছে, শেরাজ খান, আমাদের লোকটাকে তুলে নিয়ে গেছে।”

“ডাম্মিট! তোরা এক একটা অপদার্থ চেয়ে চেয়ে দেখেছিস?”

একটি গ্লাস ফুলফোর্সে ছিটকে গেল দেয়ালের দিকে। চিৎকারে কেঁপে উঠল পুরো ফ্লোর। আলো জ্বলছে লাল শেডে। দেয়ালের গা বেয়ে বয়ে যাচ্ছে শ্যাডো এক অচেনা মানুষের। যার চোখে এখন পশুতা।

“মেয়েটাকে গুলি করার কথা ছিল। পার্টির মাঝে, ঠিক যখন আলো নিভল তখন কী থেকে কি হয়ে গেল। মেয়েটা বেঁচে গেল।”

নিজের চুলে হাত চালিয়ে ছিঁড়ে ফেলার মতো করে গর্জে উঠল সে,

"শেরাজ খান"

হাতের ঘড়িটা খুলে ছুঁড়ে মারল দরজার দিকে। ভেতরে কাচ ভাঙার আওয়াজ, বাইরে নীরব আতঙ্ক। তার কণ্ঠে হঠাৎ এক অদ্ভুত ঠান্ডা হাসি উঠল।

“তাহলে এবার আগুনটা নিজেই জ্বালাবো…”

দেয়ালের পাশের ক্যাবিনেট খুলে বের করল একটা রক্ত লাল কেস। ভেতরে স্নাইপার।

“ইনাফ গেমস। নেক্সট টাইম, আই ওয়োন্ট মিস। নেক্সট টাইম… শিল সি ডেথ থ্রু মাই আইজ।”

কাচের জানালায় নিজের ছায়া দেখে এক ঝাঁকুনি দিয়ে চিৎকার করল সে। নিজের হাতের তালুতে ছুরি চেঁপে ধরে বলল,

“বাঁচবেনা ওই মেয়েটা। শেরাজ খানের দূর্বলতা। আমি নিজের হাতে শেরাজকে ভেঙে গুড়িয়ে দিব। এমনভাবে ভাঙব, আর কোনদিনও উঠে দাঁড়াতে পারবে না।”

রুমের মেঝেতে গড়িয়ে পড়ল এক রক্তমাখা ছুরি। অন্ধকারে বাতাস ভারি হয়ে উঠল বারুদের গন্ধ। মানবটি রক্তাক্ত অবস্থায় বসে রইল। তার চোখে আগুন, যেন ধ্বংস করে দিতে চায় সবকিছু।

•

ঘড়িতে তখন এগারোটা। সুমু রুমে একা বসে আছে। তার মনে একটাই ভাবনা, আজ সে সবার জন্য পায়েস রান্না করবে। বিশেষ করে তার খান সাহেবের জন‍্য। যে ভাবনা সেই কাজ। সে নিচে নেমে এলো ধীর পায়ে, শুভ্র রঙের আনারকলি পরা, চোখে একরাশ প্রশান্তি। ড্রয়িংরুম একেবারে নিস্তব্ধ। সুমু কিচেনের দিকে পা বাড়াতেই হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়ালেন অনন্যা খাতুন। চোখে শীতল দৃষ্টি, ঠোঁটে কঠিন প্রশ্ন।

“কোথায় যাচ্ছো?”

সুমু এক মুহূর্ত থেমে গিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল,

“পায়েস রান্না করব সবার জন‍্য।”

অনন্যা খাতুনের মুখে বিরক্তির ছায়া।

“এই বাড়ির নতুন বউদের রান্নাঘরে ঢোকা বারণ, তুমি এটা জানো না?”

সুমুর চোখে একটু হতবাক ভাব। সে আস্তে বলল,

“জানি। তবুও আমি রান্না করব।”

“তুমি শোনোনি কী বললাম?” অনন্যা খাতুন কড়া গলায় বলে উঠলেন।

সুমুর মুখে কাঁপন নেই, শুধু গলার স্বরটা আরও কোমল হয়ে উঠল।

“আপনি আমার শাশুড়ি, আপনার কথার অসম্মান করিনি কখনো। তবে এই রান্না ভালোবাসা থেকে। যদি অপরাধ হয়, আমি ক্ষমা চাই। কিন্তু এই রান্না আমি করবোই।”

অনন্যা খাতুন থম মেরে গেলেন। সুমু পেছনে না তাকিয়ে সোজা রান্নাঘরে ঢুকে গেল। চুলার আগুন জ্বলে উঠল। দুধে চাল পড়ল। এলাচ, দারচিনি... ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ল বাড়ি জুড়ে।

•

বারোটার দিকে বাড়ির গেট খুলে ভিতরে ঢুকল শেরাজের ব্ল‍্যাক রোলস-রয়েস। পরনে ফর্মাল পোশাক, কিন্তু চোখেমুখে জুম্মার দিনের পবিত্রতা। গাড়ির চাবি হাতে ঘোরাতে ঘোরাতে সোজা উপরের রুমের দিকে রওনা দিল সে।

সুমু শাওয়ার নিয়ে চুলটা ভিজে রেখেই বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। হালকা রোদের আলো তার মুখে পড়ে যেন মোহময়ী একটা আবেশ তৈরি করেছে। চোখে প্রশান্তি, ঠোঁটে একটুখানি হাসি। রুমে ঢুকল শেরাজ। সুমুকে দেখে কয়েক সেকেন্ড থেমে গেল। টাওয়েল নিয়ে এসে ধীরে ধীরে পেছন থেকে এক হাতে সুমুর ভেজা চুলে হালকা টান দিল।

“এই ভেজা ভেজা রাজকুমারীটা কে?”

সুমু ভ্রু কুঁচকে তাকাল।

“খান সাহেব! চুলে টান দিবেন না।”

শেরাজ সুমুর চুল মুছতে মুছতে হেসে বলল,

“তোমাকে না জ্বালালে আমার ভালো লাগেনা।”

সে সুমুর নাকে হালকা একটা চিমটি কেটে দিল। সুমু একটু খুশি, একটু রাগী গলায় বলল,

“আপনি কী ছেলেমানুষ নাকি?”

শেরাজ হেসে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,

“তোমার সামনে আমি সব ভুলে যাই।”

কথাটা বলে সে সুমুর চুল মুছে দিয়ে বলল,

“থাকো, শাওয়ার নিয়ে নামাজ পড়তে যাবো।”

শেরাজ ড্রেস চেঞ্জ করে টাওয়েল নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। বেলকনিতে দাঁড়িয়ে থাকা সুমু মুচকি হেসে বলল,

“ছেলে মানুষটা খান সাহেব।”

•

বিকেলের নরম রোদটা জানালার পর্দা ভেদ করে ঘরে ঢুকছিল। হালকা সোনালি আলোয় ঘরটা ঠিক যেন একটা স্বপ্নের মতো লাগছিল। শেরাজ তখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে। হাতে কফির কাপ। সে সুমুর দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বলল,

“সুইটহার্ট, রেডি হয়ে নাও। আজ তোমায় নিয়ে সমুদ্র দেখতে যাব। শুধু তুমি আর আমি। আমাদের বিকেলটা আজ একটু আলাদা হোক, হ্যাঁ?”

সুমু বেডের ওপর থেকে ফোন এনে শেরাজের চোখ সামনে একটা একটা ভিডিও প্লে করে বলল,

“আমি এই ভিডিওটা বানাতে চাই।”

শেরাজ হালকা হাসল।

“ওকে ফাইন। আইয়ুবদের আসতে বলি তাহলে? ভিডিও মেক করা হয়ে গেলে ওরা চলে যাবে।”

সুমু লাজুক হেসে ঝটপট রেডি হয়ে নিল। একটা পার্পেল রঙের চুড়িদার পরে, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক দিয়ে, চুলগুলো খোলা রেখে দিল। শেরাজ এতেই যেন চোখ সরাতে পারছিল না তার থেকে। সুমু শেরাজের সামনে গিয়ে মুচকি হেসে তুড়ি মেরে বলল,

“দেখবেন পরে, আগে চলুন।”

শেরাজ আলতো হাসল। সুমু চোখ পল্লব ঝাপটাল। শেরাজ তার কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়ে দুজনে একসাথে হাত ধরে বাড়ি থেকে বের হলো।

•

রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে সকলে। আইয়ুবরা তিনটা গাড়ি নিয়ে এসেছে। দুটো সাদা আর একটা ব্ল‍্যাক। শেরাজ আইয়ুবদের ফোনে ভিডিওটা দেখিয়ে সবকিছু বুঝিয়ে দিল। তারপর সকলে একসাথে গাড়িতে উঠে পড়ল। শেরাজ সুমুকে নিয়ে নিজের ব্ল‍্যাক রোলস-রয়েসে উঠে ছাদ খুলে দিল। সে গাড়ি স্টার্ট দিতেই সুমু উঠে দাঁড়িয়ে দু'হাত মুক্ত পাখির ডানার মতো মেলে দিল। শেরাজ গাড়ি স্টার্ট দিতেই আইয়ুবরা গাড়ি স্টার্ট দিল। শেরাজ সুমুর দিকে একপলক তাকিয়ে বলল,

“সুইটহার্ট, ভিডিও স্টার্ট করো।”

সুমু ফোনে ব‍্যাকসাইড ক‍্যামেরা ওন করে ভিডিও স্টার্ট করল। চারটা গাড়ি লাইন দিয়ে চলছে। প্রথমে এলো সাদা মার্সিডিজ। সুমু তার আঙুলের ইশারায় গাড়িটিকে নিজের কাছে আসতে বলল। গাড়িটি কাছে আসতেই সুমু গাড়িটিকে চলে যেতে বলল। তার হাতের ইশারায় বেরিয়ে গেল একটা গাড়ি শেরাজের গাড়ি ওভারটেক করে। এরপরের ব্ল‍্যাক মার্সিডিজটিকে সুমু আঙুলের ইশারায় কাছে আসতে বলল। গাড়িটি একটু কাছে আসতেই সুমু আবারও আঙুলের ইশারায় গাড়িটিকে চলে যেতে বলল। ব্ল‍্যাক মার্সিডিজটিও শেরাজের গাড়ি ওভারটেক করে বেরিয়ে গেল। এরপর এলো আবারও সাদা মার্সিডিজ। গাড়িটিকে সুমু আঙুলের ইশারায় একটু কাছে আসতে বলল। গাড়িটি কাছে আসতেই সুমুকে তার হাতের আঙুল একবার ডানে একবার বামে ঘোরাল। গাড়িটিও সুমুর আঙুলের ইশারা মতো একবার ডানে একবার বামে গেল। তারপর সুমু আঙুলের ইশারায় গাড়িটিকে চলে যেতে বলল। এই গাড়িটিও শেরাজের গাড়ি ওভারটেক করে বেরিয়ে গেল। ভিডিও শেষে ক‍্যামেরা অফ করে সুমুর ঠোঁটে এক চিলেতে হাসি নিয়ে শেরাজের পাশের সিটে বসল। ড্রাইভিংয়ের ফাঁকে সুমুর হাসি দেখে শেরাজ বলল,

“হ‍্যাপি সুইটহার্ট?”

“ইয়েস!”

সুমু ভিডিওটা শেরাজকে দেখিয়ে বলল,

“দেখুন, একদম পারফেক্ট। এইটা তো আমি ইনস্টাগ্রামে বাসায় গিয়েই পোস্ট করব।”

শেরাজ আলতো হেসে ড্রাইভিং মন দিল। সুমু ফোন রেখে শেরাজের কাঁধে মাথা রেখে প্রকৃতি দেখায় মন দিল।

•

সমুদ্রের ধারে পৌঁছাতেই নরম বাতাস ওদের চুল উড়িয়ে দিল। ঢেউয়ের গর্জন যেন গান হয়ে বাজছিল, আর সেই গানের প্রতিটি সুরে বাজছিল দুজনার অদৃশ্য ভালোবাসার সুর।

সুমু খালি পায়ে বালির ওপর দৌড়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে পেছনে তাকিয়ে বলল,

“খান সাহেব, আপনি আসুন?”

শেরাজ ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে ওর পাশে দাঁড়াল। হঠাৎ একটা ঢেউ এসে দুজনার পায়ের পাতা ছুঁয়ে গেল। সুমু একটু লাফ দিয়ে পেছনে সরে গেল। ঢেউ চলে যেতেই আবার সে শেরাজের পাশে এসে দাঁড়াল।

“এই ঢেউটাও বুঝি আপনাকে স্পর্শ করতে চাইল?”

শেরাজ মৃদু হাসল। তবে কোনো কথা বলল;না। সুমু মৃদু হাসল, চোখ নামিয়ে বলল,

“তবে আমার মতো করে তো ছুঁতে পারবেনা।”

শেরাজ সুমুর দিকে ঘুরে দাঁড়াল।

“তোমার ছোঁয়ার মতো কিছুই নেই দুনিয়ায়।”

তারপর ধীরে হাত বাড়িয়ে সুমুর হাত ধরে দৌড়াতে লাগাল। দৌড়াতে দৌড়াতে দুজন হাঁপিয়ে উঠল। দুজন একসাথে হাঁটতে লাগল বালির ওপর পা রেখে রেখে। ঢেউয়ের ভেজা চিহ্নের পাশে ওদের ছায়া গলে যাচ্ছিল। সুমু হাত বাড়িয়ে শেরাজের বাহু আকঁড়ে ধরল। শেরাজ তাকাল। সুমু বলল,

“সমুদ্র আপনার খুব পছন্দের, তাইনা?”

“হুম! তবে, বিডি’তে কক্সবাজারের ওই ঘটানাতে আমার পছন্দের সমুদ্রকে তোমার জন‍্য অভিশপ্ত ঘোষনা করেছিলাম।”

সুমু অবাক হয়ে তাকাল। শেরাজ সুমুর দিকে তাকিয়ে আলতো হেসে সুমুকে নিজের বুকে টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরল। ঢেউ গর্জন করল। সূর্য একটু একটু করে ডুবতে থাকল, আর সুমুরাজ দাঁড়িয়ে রইল। সমুদ্রের নীরবতা আর ওদের হৃদয়ের শব্দে এক হয়ে গেল সেই বিকেল।

•

ঘরটা আধা-আলো আর বড় কাচের জানালার ওপাশে শহরের নীরব রাস্তাগুলো ঝলমল করছে। রায়য়ান চৌধুরী তার কেবিনের চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে, হাতে এক গ্লাস হুইস্কি, চোখে চিন্তার ছায়া। কেবিনের দরজা ধীরে ধীরে খুলে গেল। প্রবেশ করল একজন সুইটেড লোক। তার নাম মাহিন, রায়য়ানের খুব বিশ্বস্ত একজন।

মাহিন গম্ভীর গলায় বলল,

“বস! খুঁজে পাইনি ওকে। লোকটা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।”

রায়য়ান চোখ সরিয়ে তাকায়।

“আমি বলছিলাম না, ওইটা এত সহজ হবে না।”

মাহিন ঝুঁকে এসে বলল,

“আর একটা খবর আছে। সিআইডি ডিপার্টমেন্টের এসিপি প্রশান্ত ঘোষ, উনি আপনার ওপর নজর রেখেছেন।”

রায়য়ান চোখ সংকুচিত করল।

“প্রশান্ত ঘোষ?”

“জি বস! ওমান শহরে গত এক মাসে যতগুলো খুন হয়েছে, সবগুলোর পেছনে আপনার নাম জড়িয়ে পড়েছে। তিনি লুকিয়ে লুকিয়ে ইনভেস্টিগেশন চালাচ্ছেন। সরাসরি কিছু করছেন না, কিন্তু ছায়ার মতো পেছনে লেগে আছেন।”

রায়য়ান ঠোঁট হালকা হাসল।

“খেলা জমে উঠেছে। ওনার ছায়া আমার পায়ের নিচে পড়বে সময়মতো।”

রায়য়ান ধীরে ধীরে হুইস্কির গ্লাসটা টেবিলে নামিয়ে রাখল। চোখে তার আগুনের ঝিলিক। ঠোঁটের কোনে এক ধরণের ঠান্ডা, অশুভ হাসি। সে আবারও গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

“গাড়ি বের কর, মাহিন। এই শশুরবাড়ির জামাই আদরটা আজ না খেলে চলবে না।”

মাহিনের চোখে চমক।

“প্রশান্ত ঘোষের বাড়ি?”

রায়য়ান চেয়ারে ঠেলে উঠে দাঁড়িয়ে, কোট পরতে পরতে বলল,

“হুম! আমার নামটা নিয়ে খুনের সাথে খেলতে চায় না? ভদ্রভাবে খেলাটা শেখাব। আর ওনার চোখে একটু রঙ লাগানো দরকার।”

কথাটা বলে বেরিয়ে গেল রায়য়ান। তার পিছু পিছু ছুটল মাহিন। রায়য়ান তার চারজন সিক্রেট এনফোর্সার নিয়ে বেরিয়ে পড়ল ওমানের প্রান্তে অবস্থিত প্রশান্ত ঘোষের প্রাসাদের দিকে। শহরের আলো গায়ে মেখে কালো গাড়িগুলোর ছায়া ছুটে চললো, যেন রাতের অন্ধকারে এক শিকারি, যার চোখে শিকার ধরার লাল জ্বালা।

•

শান্ত, নির্জন এলাকায় দাঁড়িয়ে রাজপ্রাসাদের মতো এক বিলাসবহুল ভিলা। চারপাশে হালকা কুয়াশা, গেটে লাগানো সিসিটিভি আর ভারী দারোয়ান। দারোয়ান কপালে ভাঁজ ফেলে এগিয়ে আসে।

“এই রাতের বেলা গেট বন্ধ। অনুমতি ছাড়া কেউ ঢুকতে পারবে না।”

গাড়ির দরজা ধীরে খুলে যায়। কালো কোটে রায়য়ান নেমে আসে। তার চোখে আগুন। সে ঠান্ডা গলায় বলল,

“তুই আমাকে চিনিস না, তাই না?”

দারোয়ান একটু থেমে রায়য়ানকে ভালো করে দেখল। তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে কাঁপা গলায় বল,

“র… রায়য়ান চৌধুরী স্যার?”

রায়য়ান এগিয়ে এসে তার চোখে তাকাল, তার গলা নিচু কিন্তু ভয়ানক স্পষ্ট।

“গেটটা খুলে দে। না খুললে তোর খোলা মুখটাই বন্ধ করে দিব।”

দারোয়ান ভয়ে গেটের বাটন টিপে দিল। গেট খুলে গেল। গাড়ি ভেতরে ঢুকে পড়ল।

ভিলার ভেতরটা রাজকীয়। দেয়ালে দামি পেইন্টিং, ঝাড়বাতিতে মৃদু আলো। সব ঘরে নিস্তব্ধতা, শুধু ঘড়ির টিকটিক শব্দ।

রায়য়ান হেঁটে ঢুকল। তার সঙ্গে চার জন লোক। সবার হাতে সাইলেন্সার লাগানো গান। কেউ কোনো কথা বলছে না, শুধু জুতোর টুকটুক শব্দ উঠছে মার্বেলে। ফ্লোরে পড়া কাফলা জুতোর আওয়াজে যেন প্রাসাদ কেঁপে উঠল। রায়য়ান গিয়ে সোফার পায়ে ওপর পা তুলে বসল। হাতে ওয়াইনের বোতল।

একজন সার্ভেন্ট ছুটে এসে ভয় পেয়ে বলল,

“কে... কে আপনি? আপনি এভাবে…”

মাহিন ঠান্ডা গলায় বলল,

“চুপচাপ থাকো, বস এসেছেন!”

চেঁচামেচির শব্দে প্রশান্ত ঘোষ আর তার স্ত্রী ছুটে এলেন। তারা দেখে অবাক। সোফায় এক অপরিচিত ভয়ংকর পুরুষ বসে মদ

প্রশান্ত ঘোষ চেঁচিয়ে বললেন,

“এই কী হচ্ছে এখানে? তুমি কে? আমার বাড়িতে কীভাবে ঢুকলে?”

রায়য়ান এক দৃষ্টিতে তাকাল, ক্লান্তভাবে মাথা ঘোরাল। তারপর ঠান্ডা কন্ঠে বলল,

“আপনার দরজার তালা আমার নামে ছিল না। তাই ভেঙে ঢুকতে হলো না, শ্বশুর মশাই।”

“রায়য়ান তুমি? এখানে কেনো এসেছ?”

“আপনি তো বড়লোক মানুষ। বড় বড় কেস নিয়ে ইনভেস্টিগেশন করেন। তাই ভাবলাম রাতে এক কাপ চা খেতে আসি। দুধ-চিনি লাগবে না। শুধু একটা খুন দিবেন।”

প্রশান্ত ঘোষ চিৎকার করতে গেল, ঠিক তখনই রায়য়ানের এক লোক সামনে এগিয়ে এসে তার দিকে বন্দুক তাক করে কঠিন গলায় বলল,

‘শান্তভাবে বসুন, স্যার। না হলে এই রাতই শেষ রাত হবে।”

প্রশান্ত ঘোষ আর তার স্ত্রী থমকে গেলেন। রায়য়ান এবার হালকা হেসে উঠে দাঁড়াল, ধীরে ধীরে সামনে গিয়ে বসে পড়ল।

“আপনাকে কেসটা হাতছাড়া করতে বলতেই এসেছি। এই লড়াইয়ে আপনি হারবেন, মিস্টার ঘোষ। আমার রাস্তার ছায়ায় যারা হাঁটে, তারা বেশিদূর যায় না।”

প্রশান্ত ঘোষ রাগে ফেটে পড়লেন,

“তুমি একজন মাফিয়া, খুনি, শহরের কলঙ্ক। আমি তোমার মতো অপরাধীর সামনে মাথা নত করব না।”

“এই তো আসল মুখ। তবে আপনার মুখ আর মেয়ে, দুটোই উলঙ্গ হয়ে গেছে দেখছি।”

রায়য়ান সামনে তাকিয়ে, সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আবারও বলল

“আপনার মেয়ে কখন ঘরে ফেরে?”

ঠিক তখনই মিলি বাড়ির ভিতরে ঢুকল। মাথা ঘুরছে, শরীর দুলছে, শর্ট ওয়েস্টার্ন ড্রেস পরে মাতাল অবস্থায় হাঁটছে। এক হাতে মদের বোতল।”

রায়য়ান চোখ সরিয়ে তাকায়, ঠোঁট বাঁকায়, নাক সিঁটকায়।

“এই আপনার আদরের মেয়ে? বাবার সামনে এরকম পোশাকে? যার মেয়ের লজ্জা নেই, শিক্ষা নেই, সে এসেছে দেশ শোধরাতে। আমি সব মেয়েদের খারাপ বলি না। তবে আপনাদের মেয়ের মতো ধনীদের মেয়েরা নিজের বাবার অপমানই সবচেয়ে বড় উপহার দেয় সমাজকে।”

প্রশান্ত ঘোষ মেয়েকে টেনে ধরতে গেলে, রায়য়ান হাত তুলে থামিয়ে বলল,

কেস থেকে সরুন, না হলে আপনার মেয়ে আর এই রাতের চাঁদ, কেউই দেখতে পাবেন না।”

প্রশান্ত ঘোষ কিছু বলার আগেই, রায়য়ান চোখে ইশারা করল। দুজন লোক মিলির মাথায় রিভলভার তাক করল। মিলি থমকে যেন গেল, সে প্রচণ্ড ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠল,

“ড্যাড…”

প্রশান্ত ঘোষের স্ত্রী কেঁদে উঠলেন।

“প্রশান্ত, কেস ছেড়ে দাও। ওদের যা চাই দাও।”

“না! আমি এমন অপরাধ করতে পারব না।”

রায়য়ান পায়ের ওপর পা তুলে বসল।

“আপনাকে পাঁচমিনিট সময় দিলাম। তার মধ্যে নিজের মতামত পরিবর্তন না করলে, বাকিটা আমরা করব।”

“কিছুতেই না। যা খুশি করো, আমি সরবো না। তুমি ভাবো, তুমি যা ইচ্ছা তাই করে যেতে পারো? ওমানের সব রাস্তায় শুধু তোমারই ছায়া থাকবে? সেইসব আর চলবেনা, রায়য়ান।”

এক মুহূর্ত নিস্তব্ধতা। রায়য়ান ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো। তার চোখ সরাসরি প্রশান্ত ঘোষের চোখে।

“বুড়ো হাড়ে এখনো অনেক আগুন দেখছি। কিন্তু ভুলে গেছেন, আগুনের কাছেই পুড়ে মরে সবাই।”

সে প্রশান্ত ঘোষের কাঁধে হাত রাখল, খুব আস্তে চেপে ধরল বলল,

“আপনার জামাই আমি নই, কিন্তু আপনাকে শশুর আদর করতে পারব। তবে সেটা খুনসুটি নয়, হাড় গরম করে দেয় এমন আদর।”

প্রশান্ত ঘোষ চিৎকার করতে চায়, কিন্তু রায়য়ানের চোখে এমন শীতল দৃষ্টি যে, শব্দ গলা দিয়েই বেরোয় না তার।

“আপনার সময় শেষ, শুট।”

“ঠিক আছে! আমি সরে যাব।”

রায়য়ান নিঃসাড় কণ্ঠে বলল,

“না! সময়তো শেষ। এখন শুধু সরলেই হবে না। আপনার আত্মা নোংরা করতে এসেছি। একটা খুন করুন, এখনই!”

“খুন? খুন কেনো করব?”

“কৈয়ফিয়ত চাইছেন?”

“না, না! করব।”

“তাহলে আপনার রিভলবারটা নিয়ে আসুন।”

প্রশান্ত ঘোষ কাঁপা পায়ে উঠে যায়। ঘরে গিয়ে নিজের রিভলভার নিয়ে আসে। রায়য়ানের লোকেরা এক বৃদ্ধ সার্ভেন্টকে ধরে আনে। তার চোখে মুখে কান্না, অনুরোধ।

প্রশান্ত ঘোষ কাঁদে, হাত কাঁপে। কিন্তু রায়য়ান কিছু বলে না, একদৃষ্টিতে শুধু তাকিয়ে থাকে। বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। ঘড়ির কাঁটা এক সেকেন্ডের জন্যও এগোয় না। দেরী দেখে রায়য়ান উঠতে যেতেই, গুলির শব্দ। বৃদ্ধ লুটিয়ে পড়ল, রক্ত ছিটকে দেয়ালে লাগল।

রায়য়ানের লোক ভিডিও করে নিল। রায়য়ান এবার এগিয়ে এসে দাঁড়াল প্রশান্ত ঘোষের পাশে। কাঁধে হাত রেখে ফিসফিস করে বলল,

“আজ থেকে আমি আপনি সমান। আপনি একটা খুনি। আমি যেমন, আপনিও এখন সমাজের চোখে নিচে। আজ থেকে আপনিও খুনি, আমি যেমন। আপনিও পশু, আমি যেমন।”

প্রশান্ত ঘোষ মেঝের ওপর বসে পড়ল। তার স্ত্রী কান্নায় ভেঙে পড়ল। মিলি ভয়ে গুটিশুটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে। মিলির ভাই বাড়িতে নেই, তাই সে এখানে উপস্থিত নেই।

রায়য়ান ঠান্ডা হাসি দিয়ে আবারও বলল,

“আহা শশুরমশাই! আমাকে তো আপনি বারবার ‘শশুর বাড়ি’ পাঠাতে চাইছিলেন, তাই না? আপনি ভেবেছিলেন কোর্টে কেস করে আমাকে শিক্ষা দিবেন। আজ আমি শেখালাম, রায়য়ান চৌধুরীর পিছনে লাগলে কি হয়।”

রায়য়ানের লোকেরা মিলিকে ছেড়ে দিল। রায়য়ান বোতলটা হাতে নিল, শেষ চুমুক দিল, তারপর পেছন ফিরে হেঁটে যেতে যেতে বলল,

“বেশি বাড়াবাড়ি করলে ভিডিও ফুটেজটা এই শহরে থাকা আমার সবগুলো শশুর বাড়িতে পাঠিয়ে দিব। শুভরাত্রি, খুনি বাবু।”

চলবে..?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন