লন্ডনের রাতগুলো বরাবরই অন্যরকম।
ব্যস্ত শহরটা রাত গভীর হলেই যেন নিঃশব্দ সৌন্দর্যে নিজেকে মুড়ে ফেলে। বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। দূরের সোনালি স্ট্রিটলাইটগুলোর আলো কাঁচের জানালা ভেদ করে ঘরের ভেতরে এসে ছড়িয়ে পড়েছে।
ঘোরটা বেশ নিরব হয়ে আছে। ঘোরে জালানো হলদেটে ঝাড়বাতি গুলো অতিরিক্ত কোনো আলো জ্বালানোর প্রয়োজন পড়েনি। সেই ম্লান সোনালি আভাতেই আলোকিত হয়ে আছে পুরো ঘর।
ঘরটা ভীষণ পরিপাটি। মেয়েদের ঘর বলে কথা।
একপাশে বড়সড় বুকশেলফ, যেখানে সারি সারি বই সাজানো। তার পাশেই পড়ার টেবিল। অপর পাশে একটি সাদা ভ্যানিটি আর বিশাল আলমারি। সবকিছুতেই যেন এক ধরনের শান্ত সৌন্দর্য লেগে আছে।
পড়ার টেবিলের উপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে এক রমণী।
তার দীর্ঘ কালো সিল্কি চুলগুলো এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে হেলে পড়ে রয়েছে টেবিলের কোন বেয়ে। সামনে খোলা ল্যাপটপের আলো নিঃশব্দে জ্বলছে। হয়তো পড়তে পড়তেই ঘুমিয়ে পড়েছে সে।
নাম তার তনুজা আয়রা।
কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডনে সদ্য প্রথম বর্ষে পা রেখেছে সে। নতুন পরিবেশ, নতুন চাপ সব মিলিয়ে দিনরাত এক করে পরিশ্রম করছে। লন্ডনের বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্নটা তার বহুদিনের।
হঠাৎই ধীরে দরজাটা খুলে গেল।
এক দীর্ঘদেহী পুরুষ ভেতরে প্রবেশ করল নিঃশব্দ পায়ে। এমনভাবে হাঁটছে যেন তার উপস্থিতি কেউ টের না পায়। ধীর পায়ে এগিয়ে এসে দাঁড়াল তনুজার টেবিলের সামনে।
কালো টি-শার্টে মোড়া সুঠাম দেহ। জিম করা প্রশস্ত বুকের পেশিগুলো স্পষ্ট ফুটে আছে। মাথার চুলগুলো সামান্য এলোমেলো। ফর্সা মুখে রাত জাগার ক্লান্তি, আর রক্তিম চোখজোড়া বলে দিচ্ছে মানুষটা ঘুমায়নি ভালো করে।
যে কোনো মেয়ে এই মুহূর্তে মানুষটাকে দেখলে নির্দ্বিধায় মুগ্ধ হয়ে যেত।
এই সুদর্শন পুরুষটির নাম তুষার মির্জা। তনুজার চাচাতো, উর্ফে খালাতো ভাই।
তনুজার চাচার সাথে বিয়ে হয়েছে তার খালার। সেই সুবাদেই এক তিরে দুই সম্পর্ক হয়েছে তার।
তুষার ধীরে ধীরে হাঁটু মুড়ে তনুজার মুখোমুখি বসল। কেমন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দিকে। যেন চোখ সরাতে পারছে না।
তনুজা একটি হালকা রঙের পাজামা সেট পরে আছে। জানালা ভেদ করে আসা নরম ঠান্ডা বাতাস এসে তার চুল গুলো কে উড়িয়ে দিয়ে গেলো। কপালে পরে থাকলো অবাধ্য ছোট ছোট চুল গুলা। তাকে যেনো আরও মায়াবী করে তুলে দিয়ে গেলো। তুষার আলতো হাতে সরিয়ে দিল।কপালের উপর পড়ে থাকা চুলগুলো।
তারপর অনেকক্ষণ ধরে চুপচাপ তাকিয়ে রইল মেয়েটার দিকে।
একসময় নিচু স্বরে বলল
“এত সুন্দর হতে কে বলেছে তোকে...?
তোর কি একটুও মায়া হয় না মানুষকে নিজের সৌন্দর্যে কষ্ট দেওয়ার...?”
কোনো উত্তর আসার আগেই তুষার ধীরে তনুজাকে কোলে তুলে নিল। সাবধানে বিছানার দিকে এগিয়ে গেল সে।
বিছানায় শুইয়ে উঠে আসার সময় ঘুমের ঘোরেই তনুজা তুষারের হাত চেপে ধরল।
তুষারের বুকটা কেঁপে উঠল।
সে ভেবেছিল মেয়েটা বুঝি জেগে গেছে।
কিছুক্ষণ স্থির হয়ে থেকে ধীরে নিচের দিকে তাকাল সে। তনুজার চোখ এখনও বন্ধ। কিন্তু ঘন পাপড়িগুলো ভেজা। খুব স্পষ্টভাবেই বোঝা যাচ্ছে সে কেঁদেছে।
তুষারের ভ্রু কুঁচকে গেল।
ধীরে নিজের আঙুলটা তনুজার চোখের নিচে ছোঁয়াতেই একফোঁটা জল তার আঙুলে এসে লাগল।
কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে রইল সে।
তারপর সেই ভেজা আঙুলের উপর নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে নিল নিঃশব্দে।
মুহূর্তটা এতটাই নীরব ছিল, যেন পুরো পৃথিবী থেমে গেছে।
তুষার আলতো করে তনুজার গায়ে কম্বল টেনে দিল। তারপর টেবিলের কাছে গিয়ে খোলা ল্যাপটপ আর বইগুলো গুছিয়ে বন্ধ করল।
দরজার কাছে গিয়ে আবারও একবার ফিরে তাকাল তনুজার দিকে।
কিছু অনুভূতি শব্দে প্রকাশ করা যায় না।
শুধু দূর থেকে নিঃশব্দে বাঁচিয়ে রাখতে হয়।
তুষারও ঠিক সেটাই করছে।
তারপর ধীরে দরজাটা বন্ধ করে নিজের ঘরের দিকে হাঁটতে শুরু করল।
চলবে;
পর্ব সংখ্যা —১
#লেখিকা—তাসনিয়া_জাহান
#অচেনা_প্রনয়ের_চিরকুট