সকালের স্নিগ্ধ নরম রোদের আলো সোজা এসে পড়ল তনুজার মুখে। জানালার পর্দা ভেদ করে আসা সেই মোলায়েম আলোয় ঘরটা আরও শান্ত লাগছে।
ঠিক তখনই দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলেন রুবি বেগম।এই বাড়ির সবচেয়ে স্নিগ্ধ মানুষ তিনি।
তার কথার মাধুর্যেই যেন সবাই অজান্তে আপন হয়ে যায়। তবে সবাই তাকে খানিকটা ভয়ও পায়।ভালোবাসার আড়ালে লুকিয়ে থাকা কঠোরতাটুকু তিনি প্রয়োজন ছাড়া প্রকাশ করেন না।
তনুজাকে তিনি নিজের বোনের মেয়ে বলে নয় বরং নিজের মেয়ের মতোই মানুষ করেছেন।তাই মেয়েটার প্রতি তার মায়াটাও একটু বেশি।
রুবি বেগম বিছানার পাশে এসে নরম গলায় ডাকলেন;
“তনু এই তনু উঠ মা। তোর ক্লাসের সময় হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন তোকে সময়মতো ডাকি, আর তুই উঠতে উঠতেই ইউনিভার্সিটির ঘণ্টা বেজে যায়। উঠ বলছি রাহা উঠে গেছে। আয় নিচে ফ্রেশ হয়ে নাম, নাস্তা করে বের হবি।
কথাগুলো বলে তিনি নিচে নেমে গেলেন।
তনুজা আধখোলা চোখে একটু নড়েচড়ে আবারও কম্বলের ভেতরে গুটিশুটি মেরে ঘুমিয়ে পড়ল।
এটাই তার নিত্যদিনের অভ্যাস।
এক ডাকে সে কোনোদিনও ওঠে না।তুষার এসে গরিলার মতো গলা ছেড়ে ডাক না দেওয়া পর্যন্ত তার ঘুম ভাঙার প্রশ্নই ওঠে না।
আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। কালো রংয়ের শার্ট পেইন্ট ব্লেজার পড়ে পরিপাটি হয়ে শার্টের হাতা ভাজ করতে করতে সিড়ি দিয়ে নিচে নামতে নামতে তুষার একবার ডেকে গেলো।কিন্তু তাতে হলো না কিছু।হঠাৎ গম্ভীর পুরুষালী কণ্ঠ ভেসে এলো।
“তনু! এই তনু! তুই উঠবি, নাকি আমি উপরে আসব?
তনুজার যেন সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান ফিরে এলো।
ধড়মড় করে উঠে বসে দেয়ালে ঝোলানো ঘড়িটার দিকে তাকাতেই তার চোখ বড় বড় হয়ে গেল।
“ইয়া আল্লাহ!
ইশশশ কেনো যে এলার্ম লাগাই আমাদের ঘরে এমন আস্ত একটা গরিলা থাকতো।ভালো করে ডাকতেও পারে না।
পরক্ষণেই পাগলা ঘোড়ার মতো দৌড় দিল ওয়াশরুমের দিকে।ডাইনিং টেবিলে তখন সবাই উপস্থিত।
রাহা,হামজা,তুষার, আরওশ সাহেব সবাই নাস্তা করছে। আর রুবি বেগম ব্যস্ত হাতে সবার প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছেন।
ঠিক তখনই ওপরতলা থেকে তাড়াহুড়ো করে নামতে লাগল তনুজা।
মেয়েটার আগমনের শব্দ যেন পাঁচ হাত দূর থেকেই টের পাওয়া যায় প্রতিদিন সকালে।
নীল জিন্স পেন্টের সাথে একটি হালকা আকাশি রঙের কুর্তি পরোনে সাথে গলায় ঝুলিয়েছে একটি স্কার্ফ। বাম হাতে সবসময়ের মতো জড়িয়ে আছে সোনালী রংয়ের তার পছন্দের ব্রেস লাইটা । এটা তুষার দিয়েছিল তার পনেরো বছর জন্মদিন উপলক্ষে। তার ভিষণ পছন্দ হয়েছিল এবং সেই যে তুষার পরিয়ে দিয়ে ছিলো আর এই পর্যন্ত খোলেনি তনুজা। বড় হওয়ার সাথে সাথে তার এই জিনিসটাও সাইজে ছোট হয়ে যাচ্ছে । কিন্তু তাও তনুজা এটাকে কখনো খোলে না। এটা যেনো তার শরীরেরই একটা অংশ হিসেবে জড়িয়ে আছে তার সাথে। কানে এক জোরা দুল পরতে পরতে নিচে নামছে সে।
সিঁড়ির শেষ ধাপে পা রাখতেই হঠাৎ নিজের ভারসাম্য হারিয়ে ধপাস করে পড়ে গেল সে।
“উফফ আল্লাহ! মরে গেলাম! কেউ আমাকে বাঁচাও… আর ভালো লাগে না আমার! এইসব প্রতিদিনের কাহিনী।
রুবি বেগম তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে তাকে উঠাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
টেবিলে বসে থাকা সবাই খাওয়া থামিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
আরোশ সাহেব মেয়ে লজ্জা পাবে বলে মাথা ঘুরিয়ে ফোনে মনোযোগ দিলো। তুষার বভ্রু জোড়া কুচকে তাকিয়ে থাকলো। তারপর রুবি বেগমের উদ্দেশ্য নিয়ে বললো;
"ওকে শুধু শুধু খেতে দেও তুমি। দিন দুপুরে খালি জায়গায় উস্টা খেয়ে পড়ে।
বলেই খাওয়ায় মন দিলো।
হামজা নিজের হাসি আটকাতে না পেরে হেসে ফেলল। তার সাথে যোগ দিল রাহাও। তনুজা তুষারের দিকে এতোক্ষণ তাকিয়ে থাকলেও দুই ভাইবোনের হাসি দেখে চোখ কুঁচকে তাকাল।
“তোমরা হাসছো? মনে রেখো আজকের পর আমি কারও সাথে কথা বলব না! তবে তুষার কে পাল্টা উওর দিলো না৷
গজগজ করতে করতে সে টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। তুষারের পাশের চেয়ারটা টেনে বসতে নিয়েও থমকে গেল।
গোমড়া মুখের মানুষটার পাশে বসার ইচ্ছেটা মুহূর্তেই উবে গেল তার।
তাই আর না বসে টেবিল থেকে একটা ব্রেড তুলে নিয়ে তাতে তাড়াহুড়ো করে নুটেলা মাখাতে মাখাতে ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে বলল ;
“যাই মামণি। দেরি হয়ে যাচ্ছে!
তার সাথে সাথে রাহাও উঠে দাঁড়াল।
“এই দাঁড়া! আমিও যাব। কী আজব মেয়ে রে বাবা! আসছি দাঁড়া!
রুবি বেগম জোর গলায় বললেন;
“একলা যাবি নাকি? আরও লেট হয়ে যাবে। তুষার যাওয়ার সময় তোদের নামিয়ে দিয়ে যাবে।
তারপর তুষারের দিকে তাকিয়ে বললেন;
“এই তুষার, ওঠ! আর খেতে হবে না। মেয়েগুলোকে নামিয়ে দিয়ে আয়। দেরি হয়ে যাচ্ছে।
তুষার কোনো কথা না বলে ধীরে উঠে দাঁড়াল। টিস্যু দিয়ে হাত মুছতে মুছতে বাড়ির বাইরে চলে গেল।
রুবি বেগম ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন;
"তুই কখন ফিরবি..?
তুষার বাড়ি থেকে বের হতে হতে গভীর মুখে বললো ;
"ঠিক নেই..
রুবি বেগম হামজার দিকে তাকালে ;
" তুই কি করবি..?
হামজার আজকে ক্লাস নেই। তাই সে আজ বাবার সাথে অফিস যাবে ভেবেছে।
"আমার আজ ক্লাস নেই" বাবার সাথে বের হবো।"
রুবি বেগম আচ্ছা বলে রান্না ঘরের দিকে গেলেন;
আরশ সাহেব ও উঠে দাড়ালেন অফিস এ যাওয়ার উদ্দেশ্যে। কিন্তু যাওয়া আগে সে রান্না ঘরে গেলেন রুবি বেগম এর পিছু পিছু।
আরশ সাহেব রুবি বেগম কে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে বল্লেন;
"আমার সোনা বউ গেলাম অফিস এ। নিজের খেয়াল রেখো। এসে কথা হবে। বলেই গালে একটা টুপ করে চুমু দিয়ে বসলো।
আরশ সাহেবের রোজকার অভ্যাস। রুবি বেগম কে না বলে অফিস গেলে নাকি তার দিন ভালো যায় না। তার কথা হচ্ছে। বউ, বউই সত্যিকারের ভালোবাসা থাকলে - বউ কখনো পুরাতন হয় না। বউের মন ভালো তো সব ভালো।
ভীষণ মনোযোগ দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে তুষার।
পেছনের সিটে পাশাপাশি বসে আছে রাহা আর তনুজা।
তনুজা গোমড়া মুখ করে জানালার দিকে তাকিয়ে আছে। তুষার মাঝেমধ্যে গাড়ির মিররে তাকিয়ে সেটা লক্ষ করছে।
রাহা অনেকক্ষণ ধরে তাকে মানানোর চেষ্টা করছে।
কারণ কিছুক্ষণ আগে পড়ে যাওয়ার সময় হামজা আর সে হেসেছিল। আর সেই কারণেই এখন তনুজার এই অভিমান।
কিন্তু তনুজা ভীষণ জেদি।সে কিছুতেই মানবে না।
শেষমেশ রাহাও হাল ছেড়ে দিল।
ক্লাস শুরু হওয়ার পাঁচ মিনিট আগেই ইউনিভার্সিতে পৌঁছাল তারা।
রাহা আর তনুজা দৌড়ে আসতে আসতে বেল বেজে গেছে। ক্লাসরুমের সামনে এসে দাঁড়াল।
হাপাতে হাপাতে তনুজা বলল ;
“May I come in, sir…?”
ক্লাসে উপস্থিত শিক্ষক ভ্রু কুঁচকে তাকালেন তাদের দিকে।
কারণ প্রায় প্রতিদিনই তারা দেরি করে আসে। চেহরা চিনা হয়ে গিয়েছে তাদের।
ঠান্ডা গলায় বললেন ;
“No. You both come late every day. No class for today.”
রাহা তাড়াতাড়ি অনুরোধ করে বলল ;
“Please sir! Today won’t happen again. Please let us attend the class…”
কিন্তু কোনো লাভ হলো না।
অনেক অনুরোধের পরও আর ক্লাসে ঢোকার অনুমতি পেল না তারা।
অগত্যা দুই বোনই মুখ গোমড়া করে করিডোর ধরে হাঁটতে শুরু করল।
_____________________
কুইনমেরি ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডন। এর পরিবেশটা ঠিক এমন, যেন ব্যস্ত শহরের মাঝখানে লুকিয়ে থাকা শান্ত একটা ছোট জগৎ।
চারপাশে পুরোনো লাল ইটের ভবন সবুজে ঢাকা পরিবেশ।
সকালের দিকে ক্যাম্পাস টা খুব প্রাণবন্ত লাগে। কারও হাতে কফি কেউ ক্লাস এ দৌড়াচ্ছে, কেউ লাইব্রেরীর সামনে দাঁড়িয়ে গল্প করছে। আবার সন্ধ্যা নামলে জায়গাটা অদ্ভুত শান্ত হয়ে যায়।
গাছের শুকনো পাতা বাতাসে উড়তে উড়তে রাস্তার উপর পড়ে থাকে, আর সেই পথে হাঁটলে মনে হয়
শহরের ভিড়ের মাঝেও কেউ একজন নিজের মতো করে স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখছে
ইউনিভার্সিটির ক্যান্টিনের এক কোণে পাশাপাশি বসে আছে রাহা আর তনুজা।
দু’জনের সামনে ধোঁয়া ওঠা কফির কাপ।
রাহা নিজের হাতে কফি এগিয়ে দিচ্ছে তনুজার দিকে। সকালবেলার অভিমান ভাঙানোর জন্য কত কিছুই না বলে যাচ্ছে সে। কিন্তু তনুজা এখনও গোমড়া মুখ করে বসে আছে। একটাও কথা বলছে না।
রাহা একাই বকবক করে চলেছে।
ঠিক তখনই তনুজার জিন্সের পকেটে থাকা ফোনটা টুং করে বেজে উঠল।
তনুজা কফির কাপটা পাশে রেখে ফোন বের করল। স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নামটা দেখে তার কপালে ভাঁজ পড়ে গেল।
অপরিচিত নাম্বার ;
সে কিছুটা দ্বিধা নিয়েই ইনবক্সে ঢুকল।
মেসেজটা পড়তেই ভ্রু দুটো আরও কুঁচকে গেল।
“Excuse me, কী সমস্যা আপনার?
তনুজা বিস্মিত হয়ে গেল।
চলবে;
পর্ব সংখ্যা —২
#লেকিকা—তাসনিয়া_জাহান
#অচেনা_প্রনয়ের_চিরকুট