দরজায় টোকা পড়ল।
তনুজা তাড়াতাড়ি ফোনটা বালিশের নিচে ঢুকিয়ে ফেলল।
“তনু।”
তুষারের গলা।
তনুজার বুক কেঁপে উঠল।এই রাতে আবার কি হলো?সে ধীরে দরজা খুলল।
দরজার সামনে তুষার দাঁড়িয়ে আছে।
চুলগুলো এলোমেলো হয়ে গেছে। কালো খুডি পরে আছে। মুখটা আগের মতোই গম্ভীর। তুষার কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ তাকিয়ে রইল ওর দিকে।
তারপর নিচু গলায় বলল
“রাতে না খেয়ে ঘুমাতে কে বলেছে তোকে?”
তনুজা চোখ নামিয়ে ফেলল
“খিদে ছিল না…”
তুষার ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে বলল
“খিদে কোথায় গিয়েছিল..?
তনুজা কিচ্ছু বললো না।
তুষার এবার হাতে ধরা প্লেট টা ওর দিকে এগিয়ে দিল।
“খেয়ে নিস।”
তনুজা অবাক হয়ে তাকাল।
প্লেট-এ তার পছন্দের পাস্তা রান্না করা।
রুবি বেগম বানালেও উপরে চিজ দিয়ে মাইক্রোওভেন -এ গরম করেছে তুষার নিজে। এটা বুঝতে বাকি রইল না তার।
তুষার বিরক্ত গলায় বলল
“এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন? নে।”
তনুজা প্লেট টা হাতে নিল। তুষার ঘুরে চলে যাচ্ছিল। হঠাৎ কি মনে করে তনুজা ডাকল
“তুষার ভাই…”
তুষার থেমে পিছনে তাকাল।
তনুজা কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে আস্তে বলল
“থ্যাঙ্ক ইউ…”
তুষার কিছু বলল না। শুধু কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে আবার হাঁটতে শুরু করল।
তুষার ঘুরে নিজের রুমের দিকে কয়েক কদম এগিয়েও আবার থেমে গেল।
মুখটা আগের চেয়েও শক্ত হয়ে উঠেছে।
কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে থেকে হঠাৎ আবার ফিরে এলো তনুজার দরজার সামনে।
তনুজা তখনও প্লেট হাতে দাঁড়িয়ে ছিল।
তুষারকে আবার ফিরে আসতে দেখে তার বুক ধক করে উঠল।
“আল্লাহ… আবার কী হলো?” থ্যাংক ইউ বলা কি অপরাধ হয়ে গেল..?
তুষার এবার দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো। চোয়াল শক্ত। চোখমুখ ভয়ংকর রকম গম্ভীর।
“তনু।”
তনুজা কেঁপে উঠে তাকালো।
“জি?”
তুষার ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এলো।
“তোর বয়স কত?”
তনুজা হতভম্ব হয়ে গেল।
সে কয়েক সেকেন্ড পিটপিট করে তাকিয়ে থেকে আমতা আমতা করে বলল—
উনিশ বছর......
গু-গুনতে হবে তো দিন সময় মাস কেন ভাইয়া…?”
তুষারের চোখ আরও সরু হয়ে এলো।
পরের মুহূর্তেই বেশ রাগী গলায় বলল
“এখনো বয়স গুনে বলতে হয় তোর? আর তুই লাফাংগা ছেলে মেয়েদেরসাথে বাইক রেস-এ যাস?”
তনুজার বুক ধড়াস করে উঠল।
মুখের রংই বদলে গেল।সে বুঝে গেল কেউ না কেউ সব বলে দিয়েছে।
তুষার এবার একদম সামনে এসে দাঁড়ালো।
“কার অনুমতি নিয়ে এসব করছিস হ্যাঁ? এত বড় কলিজা হয়ে গেছে তোর?”
তনুজা ভয় পেয়ে গেলেও মুখ ফুলিয়ে মিনমিন করে বলল
“সব কথাই কি আপনার কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে নাকি…? মামণি বলেছে আমার যখন যা খুশি করতে পারব…”
তারপর ছোট করে যোগ করল
“আমার ভালো লাগে বাইক চালাতে… রেস করতেও ভালো লাগে…”
তুষার যেন আরও ক্ষেপে গেল। নিচু কিন্তু ভয়ংকর গলায় বলল
"আমার থেকে জিজ্ঞেস করবি না মানে?”
তনুজা চুপ। তুষার আঙুল তুলে বলল
“এই বাড়ি আমার। আমার থেকে কিছু না জিজ্ঞেস করে কিছু করলে খবর আছে তোর।”
তনুজা এবার সত্যিই ঘাবড়ে গেল।
তুষার থামল না।
“আর যদি আবার শুনেছি এসব রেস-টেস করছিস ”
তনুজার যেনো ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল।
"চিল্লাচ্ছেন কেন আপনি? আর কি করবেন আবার রেস এ গেলে। বেস করেছি আরো করবো দেখবো আপনি কি করেন..
সে ঝুঁকে তনুজার চোখের দিকে তাকালো।
“তাহলে তোকে আমি জিন্দা কবর দিয়ে আসব। দেখে নিস।”
কথাটা বলেই তুষার আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ালো না।
সোজা নিজের রুমের দিকে চলে গেল।
তনুজা বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর কয়েক সেকেন্ড পর ফুঁস করে উঠল
“উফফ! কি জ্বালাময় লোক একটা!”
আবার একটু পরেই মুখটা কেমন ছোট হয়ে গেল।
“কিন্তু… কে বলল ওনাকে?”
তনুজা ঘরে এসে আর কান্না থামাতে পারল না।
সে রেগে যায় খুব তাড়াতাড়ি, কিন্তু সেই রাগ বেশিক্ষণ তার ভেতরে থাকে না। কিছুক্ষণ পরই সেটা কেমন যেন গলা বেয়ে চোখে নেমে আসে।
রাগ উঠলে তার হিতাহিত জ্ঞানও থাকে না। যা মনে আসে তাই বলে দেয়।
বিছানার কোণায় গুটিসুটি মেরে বসে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতেই ভাবতে লাগল সে
সে কি বেশি বলে ফেলেছে তুষারকে? ভাইয়া কি কষ্ট পেয়েছে?
“আমি কি করব… তুমি-ই বা আমার সাথে এমন করো কেন?
সবসময় শুধু আমাকেই বকো… রাহার সাথে তো এমন করো না, হামজা ভাইয়ার সাথেও না। তারা তোমার আপন ভাইবোন বলেই না… তাই আমার সাথেই এত রাগ…”
অভিমান জমে জমে বুকটা ভারী হয়ে উঠল তার।
তোমাকে কে বলেছে আমার বিষয়ে খোঁজ খবর নিতে।?
“আর কথা বলব না তোমার সাথে… দেখো। তোমাকে আর জ্বালানোর কারণই হব না আমি…”
আপনমনে কথাগুলো বলতে বলতেই ফোনটা কেঁপে উঠল।
স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নামটা দেখতেই মনটা কেমন শান্ত হয়ে এলো তার। ইনকামিং ভিডিও কল -
"তন্ময় ভাই "
তার নিজেরও তো একটা ভাই আছে।
শুধু কাছে নেই। বহু দূরে, বাংলাদেশে।
কলটা রিসিভ করার আগে তাড়াতাড়ি চোখের পানি মুছে নিল তনুজা।
তবুও অবাক হলো। এত সকালে ভাইয়া কল দিল কেন?
ঘড়ির দিকে তাকাল সে।
এখানে তখন রাত বারোটা চল্লিশ।
মানে বাংলাদেশে ভোর প্রায় পাঁচটা চল্লিশ।
সে কলটা রিসিভ করল।
"হ্যালো প্রিন্সেস"
চলবে ;
পর্ব সংখ্যা —৭
#লেখিকা-তাসনিয়া_জাহান
#অচেনা_প্রনয়ের_চিরকুট