তনুজা রান্নাঘরে ঢুকেই বিরক্ত মুখে কফির মগটা টেনে নিল।
মুখে মুখে মিনমিন করে বলছে
“সারাদিন গোমড়া মুখ করে থাকবে যেন পুরো লন্ডন শহরটার দায়িত্ব একাই ওনার কাঁধে। মানুষটা ঠিকমতো হাসতেও পারে না"
কফির জার খুলতেই আবার মনে পড়ে গেল আনোন নাম্বারের কথা।
লোকটা কে হতে পারে?
বাংলা জানে আমাকে চেনে ভালো করে নিশ্চয়ই। “আয়রা” নামটাও জানে তাহলে কি পরিচিত কেউ?
কিন্তু পরিচিত হলে এমন অদ্ভুত ব্যবহার করবে কেন? ডিরেক্ট কথা বললেই হয়। পরিচিত হলে নামহীন হয়ে থাকতো না অবশ্য।"
তনুজা বেশ ভাবনায় পড়ে গেল।
ঠিক তখনই ফোনটা আবারও কেঁপে উঠল।
সে তাড়াতাড়ি ফোনটা হাতে নিল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল
“কি করছেন ? এখনও কি আমার উপর রাগ করে আছেন?”
মেসেজটা দেখেই তনুজার ভ্রু একটু নরম হলো।
লোকটার কথাবার্তায় অদ্ভুত এক কোমলতা আছে। বিরক্ত লাগলেও কেন যেন সে ইগনোর করতে পারছে না।
তনুজা ছোট্ট করে রিপ্লে দিল;
“কফি বানাচ্ছি।” আপনার উপরে রাগ করে থাকার আমি কে??
সাথে সাথেই রিপ্লে এলো;
আপনিই তো সব… তো যার জন্য বানাচ্ছেন সে নিশ্চয়ই বেশ ভাগ্যবান।”
তনুজা ভ্রু কুঁচকে লিখল;
“মানে?”
“কারণ আপনার হাতে বানানো জিনিস নিশ্চয়ই অনেক ভালো হয়।”
অজান্তেই তনুজার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল।
সে দ্রুত সেটা চাপা দিয়ে লিখল
“আপনার এত জানতে হবে কেন?”
ওপাশের মানুষটা যেন হাসল।
“কারণ আপনার ব্যাপারে জানতে ভালো লাগে…”
তনুজার বুকের ভেতরটা হালকা ধক করে উঠল।
ঠিক তখনই পিছন থেকে গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো;
“কফি বানাতে এত সময় লাগে?”
চমকে উঠে প্রায় ফোনটাই ফেলে দিচ্ছিল তনুজা।
পেছনে ঘুরতেই দেখল তুষার রান্না ঘরের দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ঘামে ভেজা কালো টিশার্ট টা শরীরের সাথে লেপ্টে আছে। চুলগুলো এলোমেলো, চোখেমুখে বিরক্তি স্পষ্ট।
তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে আছে তনুজার ফোনের দিকে।
তনুজা তাড়াতাড়ি ফোনটা উল্টো করে ফেলল।
আপনি এখনো ফ্রেশ হননি..?
তুষারের চোখ সরু হয়ে এলো।
“কার সাথে কথা বলছিলি?”
“ক-কাউর সাথে না তো…”
তুষার ঠান্ডা চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল ওর দিকে।
তারপর কপাল কুঁচকে রুক্ষ গলায় বলল
“ ইডিয়ট কোথাকার! যেটা করতে পারিস না সেটা করতে আসিস কে। অন্তত মিথ্যে বলায় কেউ এতো কাচা হয়।..?
তনুজা থতমত খেয়ে গেল।
তুষার এবার আরও গম্ভীর গলায় বল
"কফি নিয়ে আয় তাড়াতাড়ি আমার রুম-এ।”
..............................
রাত প্রায় গভীর।
পুরো বাড়িটা নিস্তব্ধ হয়ে আছে। বাইরে লন্ডন শহরের আলো এখনো জানালার কাঁচে চিকচিক করছে। দূরে কোথাও গাড়ির ক্ষীণ শব্দ ভেসে আসছে মাঝেমধ্যে।
কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে তনুজা।
কিন্তু ঘুম তার চোখে নেই।
বারবার ফোনটার দিকেই চোখ চলে যাচ্ছে।
শেষ রিপ্লে টার পর আর কোনো মেসেজ আসেনি।
তনুজা ঠোঁট ফুলিয়ে মনে মনে বলল;
“ভালোই হয়েছে। আর মেসেজ না দিলেই বাঁচি।”
কিন্তু কথাটা বলার পরই বুকের ভেতর কেমন যেন খচখচ করতে লাগল।
সত্যিই কি সে চাচ্ছে লোকটা আর মেসেজ না দিক?
ভাবতে ভাবতেই ফোনটা আবারও কেঁপে উঠল।
তনুজা ধড়ফড় করে উঠে বসল।
স্ক্রিন-এ ভেসে উঠল
“ঘুমিয়ে গেছেন ?”
তনুজা কয়েক সেকেন্ড স্কিন-এর দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর নিজেকেই বকা দিল মনে মনে
“না রিপ্লে দিলেই হয়! কথা বাড়ালে আবার প্রেম-ট্রেম শুরু করে দিলে।”
তবুও আঙুল থামল না। সে লিখল
“না।” আপনি কি করেন..?
সাথে সাথেই রিপ্লে এলো;
“জানতাম।” আমি তো আপনাকে ভাবছি...
তনুজা ভ্রু কুঁচকে লিখল;
“কিভাবে জানতেন.?
" কারন এখনো যে আমি আপনাকে ভাবা বন্ধ করে ক্লান্ত হয়নি তাই।" আপনিও নিশ্চয়ই আমাকে নিয়েই ভাবছিলেন তাই না..?
তনুজা এবার সত্যিই অবাক হলো।
লোকটাযেন তাকে দেখছে?
এমন অনুভব হচ্ছে কেন?
বিছানার উপর উঠে বসলো। তারপর রুম-এর চারপাশে তাকালো।
না, কেউ নেই। জানালার পর্দাও টানা। তবুও বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত লাগছে।
সে দ্রুত লিখল
“আপনি কি আমাকে ফলো করেন নাকি?”
ওপাশের মানুষটা কয়েক মুহূর্ত রিপ্লে দিল না।
তারপর ধীরে একটা মেসেজ এলো;
“করলে কি খুব রাগ করবেন?”
তনুজার বুক ধক করে উঠল।
সে তাড়াতাড়ি লিখল
“জি! অনেক রাগ করব। এটা খারাপ।”
ওপাশ থেকে ছোট্ট রিপ্লে এলো;
“তাহলে করি না"
অদ্ভুতভাবে কথাটা পড়ে তনুজার ভেতরটা নরম হয়ে গেল।
ঠিক তখনই দরজার বাইরে কারও পায়ের শব্দ পেল সে।
চলবে!
পর্ব সংখ্যা —৬
#লেখিকা-তাসনিয়া_জাহান
#অচেনা_প্রনয়ের_চিরকুট