হঠাৎ ফোনে টুং করে মেসেজ আসার শব্দ হলো।
তনুজা ফোনটা হাতে নিয়ে ইনবক্স খুলল।
অপরিচিত মানুষটার মেসেজ।
সে খুলতেই চোখে পড়ল ;
“মিথ্যে কথা এত বলো না
রাত্রি জাগা এত ভালো?
মিথ্যে কথা এত বলো না
রাত্রি জাগা এত ভালো?
জেগে যখন
তবে আসো তাড়াতাড়ি
ঝড় উঠেছে আকাশে…
শন শন শন শন শন শন
হাওয়াতে মন মন মন
উড়েছে বন বন বন বন
উড়ে সারাক্ষণ”
তনুজা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল স্ক্রিনের দিকে।
কথাগুলো কেমন যেন চেনা লাগছে
কিন্তু ঠিক ধরতে পারল না।
বাংলা গান সে খুব একটা শোনে না। তাই বুঝতেও পারল না এটা আসলে একটা গানের লাইন।
কিন্তু একটা কথায় তার বুক ধক করে উঠল।
“রাত্রি জাগা”
মানে লোকটা কি জানে সে জেগে আছে?
তাকে কি কেউ দেখছে?
তনুজা তড়িঘড়ি চারপাশে তাকালো।
বারান্দার সামনে ফাঁকা রাস্তা।
তাদের বাড়ির সামনের বড় মাঠটাও শুনশান।
কোথাও কেউ নেই।
তবুও বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত লাগতে থাকল।
আবার ফোনের দিকে তাকালো সে।
“হাওয়াতে মন উড়ে”
তনুজা ঠোঁট বাঁকিয়ে ফিসফিস করল
“আমাকে খোঁচা মারল নাকি লোকটা?”
তারপর বিরক্ত মুখে বিছানায় গিয়ে ধপ করে বসে পড়ল।
“এই লোক কি সারাদিন এসব আজাইরা কথাই ভাবে?”
আরেকবার মেসেজটার দিকে তাকিয়ে নাক সিটকালো সে।
“উফ! ধুর ঘুম পেয়েছে আমার।”
বলেই কম্বল টেনে মাথা ঢেকে শুয়ে পড়ল তনুজা।
তবুও ঘুম আসার আগে পর্যন্ত মাথার ভেতর ঘুরতেই থাকল
“শন শন শন হাওয়াতে মন"
---------------------
রুবি বেগম আজ সকালে ডাক দিতেই তনুজা উঠে গিয়েছিল।
গোসল সেরে শুভ্র রঙের একটি কুর্তির সঙ্গে জিন্স পরে নিল সে। গলায় হালকা রঙের একটি স্কার্ফ জড়িয়ে চুলগুলো খোলা রেখে দিল। বাঁ হাতের কবজিতে কালো রঙের একটি হেয়ার ব্যান্ড পরে আয়নায় নিজেকে একবার দেখে নিয়ে নিচে নেমে এলো।
ডাইনিং টেবিলে তুষার, হামজা, রাহা, আরশ সাহেব আর রুবি বেগম- সবাই উপস্থিত।
তনুজা নিচে নেমেই টেবিল থেকে একটা আপেল তুলে নিল। তারপর বের হতে হতে রাহার দিকে তাকিয়ে বলল,
যাবি নাকি? দেরি হয়ে যাচ্ছে চলে যাবো ;
কথা শেষ করেই আর দাঁড়াল না। সোজা দরজার দিকে হাঁটল।
রাহা ও উঠে পুরে দৌড় -
আরে খেয়ে তো যা এই তনু ;
রুবি বেগম রান্না ঘর থেকে তনুজাকে খাওয়ার জন্য বল্লেন তবে লাভ হলো না।
হামজা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তনুজাকে খোচা মেরে বলল;
"বাব্বাহ! আজ কোন দিক দিয়ে সূর্য উঠেছে? তনুজা ম্যাডাম সময়মতো ঘুম থেকে উঠে আবার ইউনিভার্সিটিতেও চলে যাচ্ছে! কী ব্যাপার টনু ম্যাডাম? শরীর-টরির ঠিক আছে তো?
আরশ সাহেব সঙ্গে সঙ্গেই বললেন,
আহাহ! মেয়েটাকে না খোঁচালে তোমার হয় না? ওকে যেতে দাও। এটা তো ভালো কথা। আমার মেয়ে সময়মতো সবকিছু করা শিখছে। বড় হচ্ছে না?
তারপর তনুজার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বললেন,
যাও আম্মু। টাকা আছে নাকি লাগবে ?
তনুজা হামজাকে উত্তর দেওয়ার জন্য পেছন ফিরেছিল। আরোশ সাহেবের কথা শুনে হালকা হাসল।
"না ছোট আব্বু, লাগবে না। আছে"
বলেই বেরিয়ে গেল। তার পেছন পেছন রাহাও।
পেছন থেকে হামজা জোরে চিৎকার করে বলল,
এমন ঝগড়া তাহলে প্রতিদিন হওয়া উচিত! এইভাবে অন্তত সময়মতো সব করতে পারবি!
তনুজা বিরক্ত মুখে একবার ঘুরে তাকালেও কিছু বলল না।
তুষার এতক্ষন মাথা নিচু করে ভুরু জুগল কুঁচকে খাবার শেষ করে কোনো রকম উঠে দাড়ালো।
"আব্বু বের হবে এখন..? নাকি আমি আগে যাবো..?"
আরোশ সাহেব পেপার থেকে নজর সরিয়ে তুষারের দিকে তাকালো।
"হ্যাঁ হ্যাঁ যাবো তো এক সাথেই যাি দাঁড়াও তোমার মাকে বলে আসছি তুমি গাড়ি বের করো গিয়ে। হামজা যাও তুমিও আসছি আমি "
হামজা আর তুষার বাড়ি থেকে বের হলো এক সাথে.।
"ভাই এই সপ্তায় তো তোমার খেলা আছে না..?
"হামজার প্রশ্নের উত্তরে শুধু ছোট করে বলল তুষার ;
"হুম"
আরোশ সাহেব দুই ছেলের যাওয়া দেখে দৌড় লাগালেন রান্না ঘরের দিকে ;
সব সময়ের মতো পিছন থেকে রুবি বেগম কে জোরিয়ে ধরলেন ;
রুবি বেগম হঠাৎ এমনটা হওয়ায় ভয় পেয়ে গিয়েছেন ;
"দূর কিজে করো তুমি "ছেলে গুলো বসে আছে ডাইনিং এ কি ভাব্বে ওরা বড় হয়েছে না " ছাড়তো ;
"আরে তোমার দুই রাজপুত্র বের হয়ে গিয়েছে গিন্নি" এতো ভয় পাওয়ার কি আছে শুনি? আর আমি কি পরপুরুষ যে তোমার রাজপুত্ররা এই ভাবে আমাকে দেখলে সমস্যা হবে তোমার রাজপুত্ররা কি এখনো ফিটার খায় নাকি ওরা সব বুঝে বুঝলে এখন তাড়াতাড়ি সুন্দর করে জোরিয়ে ধরে দোয়া করে দেওতো দেরি হয়ে যাচ্ছে ;
কিছুক্ষণ পর রাহাকে নিয়ে বাসস্ট্যান্ডে এসে পৌঁছাল সে।
বাসে উঠে জানালার পাশের সিটে বসতেই ফোনটা হাতে নিল।
সকাল থেকে ফোন চেক করাই হয়নি।
স্ক্রিন অন করতেই দেখতে পেল রাতের একটা আর সকালের একটা মেসেজ পড়ে আছে। তনুজা ভ্রু কুঁচকে ইনবক্সে ঢুকল। প্রথম মেসেজটা রাতের;
"আপনি মিথ্যেও বলেন, ম্যাডাম। হাহ! কী লাভ এমন মিথ্যে বলে, যা আমাকে বিশ্বাস করাতে পারবে না? যাই হোক, এত রাতে বারান্দায় কী করেন? মনটা খারাপ মনে হচ্ছে। কিছু হয়েছে নাকি?"
তনুজার বুক ধক করে উঠল।
চলবে;
পর্ব সংখ্যা —৯
#লেখিকা-তাসনিয়া_জাহান
#অচেনা_প্রনয়ের_চিরকুট