দেখতে দেখতে সাদের এনগেজমেন্ট এর দিন চলে আসলো।
সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে পুরো বাড়িটাই যেন আলোয় ভেসে উঠলো।
বাড়ির সামনের বাগান জুড়ে ঝুলছে উষ্ণ হলুদ ফেয়ারি লাইট। সাদা আর গোলাপি তাজা ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে প্রবেশপথ। দূর থেকে ভেসে আসছে নরম বাদ্যযন্ত্রের সুর। অতিথিদের কোলাহলে বাড়িটা যেন মুহূর্তেই প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
বিদেশের অনুষ্ঠানগুলোর একটা আলাদা সৌন্দর্য থাকে।
অতিরিক্ত জাঁকজমকের চেয়ে পরিপাটি আয়োজন হাসিমুখে অতিথি আপ্যায়ন আর কাছের মানুষদের নিয়ে ছোট ছোট সুন্দর মুহূর্ত তৈরি করাতেই যেন তাদের আনন্দ।
আজও তার ব্যতিক্রম নয়
সাদের এনগেজমেন্ট উপলক্ষে দুই পরিবারের আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু আর পরিচিত মানুষদের নিয়ে আয়োজন করা হয়েছে ছোট্ট কিন্তু অভিজাত একটি অনুষ্ঠান
সকালের দিকেই আরশ সাহেব চলে এসেছিলেন।
প্রথমে ভেবেছিলেন বিকাল পর্যন্ত থেকে আয়োজন গুছিয়ে দিয়ে নিজের দাওয়াতে চলে যাবেন। কিন্তু এখানে এসে জানতে পারলেন, যে ডিলারের মেয়ের এনগেজমেন্টে তার যাওয়ার কথা ছিল,সেই মেয়েটিই আসলে সাদের হবু স্ত্রী
খবরটা শুনে তিনিও অবাক হয়েছিলেন
আসমা বেগম তো আনন্দে বলেই ফেলেছিলেন
"আল্লাহর কী সুন্দর মিল দেখেন ভাইজান!
আরশ সাহেব হেসে উত্তর দিয়েছিলেন
"তাহলে তো আর দুশ্চিন্তার কিছু নেই। আজ দুই জায়গায় যাওয়ার চিন্তাটাও শেষ।
তারপর পর থেকে পুরো আয়োজনটাই যেন নিজের দায়িত্ব ভেবে দেখছিলেন তিনি।
আসমা বেগম কয়েকবার বলেও ফেললেন
"আপনি না থাকলে আমি আজ সত্যিই হিমশিম খেয়ে যেতাম।"
রাহা আর তনুজা উপস্থিত হতেই কয়েকজন অতিথি তাকিয়ে রইলো তাদের দিকে।
আজ তনুজার পরনে গাঢ় ম্যাজেন্টা রঙের লম্বা ভারতীয় গাউন। একই রঙের হালকা ওড়নাটা এক কাঁধ বেয়ে নেমে এসেছে। খোলা চুলগুলো আলতো কার্ল করা, কানে ছোট ঝুমকা দুল, হাতে তার পারমানেন্ট ব্রেসলেট টা সাজে বাড়াবাড়ি কিছু নেই, অথচ চোখ সরিয়ে নেওয়াও কঠিন।
রাহা আজ পরেছে হালকা প্যাস্টেল ব্লু রঙের আনরকালি। চুল উঁচু করে বাঁধা তাকেও দারুন লাগছে।
রুবি বেগম গাঢ় সবুজ জামদানি শাড়িতে যথারীতি মার্জিত।
আসমা বেগমের পরনে অফ-হোয়াইট সিল্ক শাড়ি, লাল বর্ডার। মুখভর্তি প্রশান্তি।
স্টেজে দাঁড়িয়ে আছে সাদ
কফি রঙের থ্রি-পিস স্যুটে আজ তাকে সত্যিই আলাদা লাগছে। চোখেমুখে তেমন প্রফুল্লতা নেই৷ সে অতি ব্যস্ত হয়ে কাউকে খুঁজছে যেন। তবে কাঙ্খিত ব্যক্তির খোঁজ বোধহয় মিলছে না।
---
"এই যে অবশেষে রাজকন্যারা আসলেন।
কথাটা শুনেই রাহা চোখ ঘুরিয়ে তাকালো।
সামনেই দাঁড়িয়ে আছে সাইফ আর আবির।
দুজনের মুখেই সেই চিরচেনা দুষ্টু হাসি।
রাহা ভ্রু কুঁচকে বললো,
"তোমরা এখানে কি ভাবে?
আবির নাটকীয় ভঙ্গিতে বুকের ওপর হাত রেখে বললো,
"কী ভাবলি? শুধু তোরাই দাওয়াত খেয়ে বেড়াবি?
রাহা ভ্রু কুঁচকে বলল
আচ্ছা, ফাজলামো বন্ধ করো তো। সত্যি করে বলো তোমরা এখানে কীভাবে?
আবির হেসে বলল
"এই ফাংশনের বরের বাবা আমাদের অফিসের ক্লায়েন্ট। আঙ্কেলের ইনভাইটেশন ছিল।
সাইফ সঙ্গে সঙ্গে যোগ করল
"এসে ভালোই হলে নয়তো এতো সুন্দর দুইটা পড়ি দেখা মিসস হয়ে যেতো?
রাহা চোখ উল্টে বলল
"নাটক কম করো।
কিন্তু আবিরের দৃষ্টি তখন তনুজার দিকে।
হালকা হেসে বলল
"তনু আজ তোমাকে সত্যিই অসাধারণ লাগছে। এই রঙটা তোকে ভীষণ মানিয়েছে।
প্রশংসাটা শুনে তনুজার গাল দুটো অজান্তেই লাল হয়ে উঠলো।
সে অস্বস্তি লুকিয়ে বলল
"ধুর কী শুরু করলে আবির ভাই! যাও তো
রাহা বলল আর আমি?
আবির সাইফ বলল
তোকে সব সময়ের মতো পেতনি লাগছে রে
তাদের মাঝে হঠাৎ আগমন হলো সাদ
আবির সাইফ তাকে শুভকামনা জানালে সাদ ভদ্রতা বজিয়ে হালকা হেসলো।
তারপর তনুজার দিকে তাকিয়ে বলল
"তনু একটু আসবে?
তনুজা তাকালো সাদ এর দিকে।তার মুখে আজ অদ্ভুত এক গাম্ভীর্য। সে কোনো প্রশ্ন ছাড়াই তার সঙ্গে একটু নিরিবিলি জায়গায় চলে গেল।
সাদ কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলো। তনুজার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো মুগ্ধকর নয়নে।
মনে হলো কোথা থেকে শুরু করবে বুঝে উঠতে পারছে না।
তনুজা নিজেই বলল
"কিছু বলবেন সাদ ভাই?
সাদ গভীর শ্বাস নিয়ে বলল
"তনু আমি তোমাকে একটা কথা বলতে চাচ্ছিলাম বিগত কয়দিন ধরেই। তবে বলতে পারছিলাম না
তনুজা মাথা নাড়লো।
"বলে ফেলেন।
সাদ ঠোঁট ভিজিয়ে ধীরে বলল,
"আসলে তনু আমি
তনুজা দেখলো সাদ আমতা আমতা করছে কথা টা ঠিক করে বলতে পারছে না সে চিন্তায় পরলো কি এমন বলবে সাদ ভাই যার কারনে তার কথা জড়িয়ে যাচ্ছে?
তনুজা বলল
" সাদ ভাই আপনি কোনো দ্বিধা ছাড়াই আমাকে কথাটা বলতে পারেন কি বলবেন বলুন আমি শুনছি"
সাদ আবারো জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিলো।
"আসলে আমি তোমাকে—
ঠিক তখনই সামনের হলঘরে হালকা গুঞ্জন উঠলো।
সবাই একসাথে প্রবেশদ্বারের দিকে তাকালো।
মেয়েপক্ষ এসে গেছে। তনুজা আর সাদও একসাথে ঘুরে তাকালো। প্রথম মুহূর্তে তনুজার ঠোঁটে হালকা একটা হাসি ফুটে উঠেছিল।
কিন্তু পরের মুহূর্তেই হাসিটা যেন নিভে গেল। তার চোখ বিস্ফারিত হয়ে রইলো। ভ্রু দুটো ধীরে ধীরে কুঁচকে এলো।
মেয়েটা গোল্ডেন রংঙের গাউনে আজ তাকে সাজানো হয়েছে রাজকন্যার মতো। সূক্ষ্ম পাথরের কারুকাজে ঝলমল করছে পুরো পোশাকটা। কানের লম্বা ডায়মন্ড ইয়াররিং, গলায় হালকা নেকলেস, মুখে নিখুঁত মেকআপ।
দূর থেকে দেখলে যে কেউ বলবে অসাধারণ সুন্দর।
কিন্তু তনুজার চোখে সেই সৌন্দর্যের আড়ালে ভেসে উঠছে ইউনিভার্সিটির অসংখ্য স্মৃতি। সাদ একবার জুমানার দিকে তাকালো। আবার তাকালো তনুজার দিকে। তার মুখে মুহূর্তেই অসহায়তা ফুটে উঠলো
এই কয়েকদিন ধরে সে বহুবার চেষ্টা করেছে তনুজার সঙ্গে কথাটা বলার। প্রতিবারই কিছু না কিছু হয়ে গেছে।
যার কারনে সে তার কথা টা তনুজা কে বলতে পারেনি।আজও ভেবেছিল বলে ফেলবে
ঠিক শেষ মুহূর্তে সব এলোমেলো হয়ে গেল।
তনুজা ঘাড় ঘুরিয়ে সাদের দিকে তাকালো। সাদ তার দিকে তাকিয়ে থাকার কারনে তাদের দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিল্য
"উনি আপনার হবু স্ত্রী?"
সাদ অসহায় চোখে তাকিয়ে ধীরে মাথা নাড়লো হ্যাঁ সূচক।
তনুজার গলা কেমন শক্ত হয়ে গেল।
"আপনি ওর সম্পর্কে কিছু জানেন, সাদ ভাই?"
সাদ ভ্রু কুঁচকে বলল
"মানে?"
তনুজা ধীরে বলল,
"ও আমাদের ইউনিভার্সিটির।
"সাদ!"
আসমা বেগমের ডাকে সাদ পিছু ফিরে তাকালো
"তুই এখানে দাঁড়িয়ে কী করছিস? সবাই অপেক্ষা করছে। যা, স্টেজে ওঠ।"
সাদ আর কিছু বলতে পারলো না। শুধু একবার তনুজার দিকে অসহায় ভাবে তাকালো। আর অপূর্ণ একটা কথার ভার। নিয়ে সাদ স্টেজে উঠে দাঁড়ালো।
তনুজা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
তার অসমাপ্ত কথাটাও বুকের ভেতর আটকে গেল।
রাহা কখন যে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, সে খেয়ালই করেনি।
রাহা ফিসফিস করে বলল,
"সিরিয়াসলি জুমানার সঙ্গে সাদ ভাইয়ের বিয়ে হবে?আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।আব্বু বলেছিল ডিলারের মেয়ে তাহলে সেদিন তুষার ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করার কারণও কি এটা ছিল?
তনুজা ধীরে বলল
"আমি কিছুতেই মানতে পারছি না।"সাদ ভাইয়ের জন্য এই মেয়েটা ঠিক না।
রাহা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল
"ধুর!কত এক্সাইটেড ছিলাম সাদ ভাইয়ের বউ কে দেখবো বলে।
তনুজা তাকিয়ে বলল
"মিটেছে তোর শখ?
রাহা মুখ বাঁকিয়ে বলল
"পুরোই
তারপর খুব আস্তে বিড়বিড় করল
"কে জানতো সাদ ভাইয়ের কপালে এই সচ্চুন্নিটাই লেখা আছে!
তনুজা কিছু বললো না।
তার চোখ আবার স্টেজের দিকে চলে গেল।
জুমানা ভারী গাউন সামলাতে গিয়ে একটু হোঁচট খেল।
সাদ স্বভাবসুলভ ভদ্রতায় হাত বাড়িয়ে তাকে উঠিয়ে দিল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই। সাদের চোখ এক পলকের জন্য তনুজার চোখে এসে থামলো। সেই দৃষ্টিতে আনন্দ ছিল না। ছিল অদ্ভুত এক ক্লান্তি।
রাহা নিচু গলায় বলল
"এই লোক বুঝি সব জেনে শুনেই বিয়ের পিরিতে বসছে।এখন বুঝতে পারছি। বিয়ের কথা শোনার পর থেকেই লোকটার মুখ এমন শুকনো কেন ছিল।
তনুজা ধীরে বলল
"যদি সব জেনেশুনেও এই বিয়েটা করে তাহলে কারণটা নিশ্চয়ই খুব বড়।আর উনি ছেলেমানুষ উনি এসব জেনে শুনে কিভাবে বিয়ে করছেন সে না করে দিলেই পারে অদ্ভুত।
রাহা বলল
"সাদ ভাই টা ঠকলো বুঝি রে। সালি কিভাবে সাদ ভাইয়ের কপালে জুটে গেলো।
তনুজা কিছু বলল না। তার জুমানাকে মোটেই সহ্য হচ্ছে না। সেইদিন তুষারের সাথে দেখার পর থেকে তো আরো না। তার প্রচুর রাগ কাজ করে জুমানার উপর।
তনুজা ভাবলো ঠোঁটের কনে একটু কানি অজান্তেই হাসির দেখা মিলল। তুষার এই বিয়ে তে থাকবে না ভালোই হয়েছে।
হঠাৎ তার মনে পড়লো একটু আগে সাদ কী বলতে যাচ্ছিল?
আর সেই অসমাপ্ত কথাটাই এখন তনুজার মাথার ভেতর বারবার ঘুরপাক খেতে লাগলো।
তনুজা এখনও স্টেজের দিকেই তাকিয়ে ছিল।
"কিরে দুই পেত্নী!এখানে দাঁড়িয়ে কী করছিস তোরা?
হামজার গলায় দুজনেই চমকে পেছনে তাকালো।
হামজা দুহাত পকেটে ঢুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঠোঁটে চিরচেনা দুষ্টু হাসি।
"সবাই ওদিকে ফটোশুট করছে। আর তোরা এখানে দাঁড়িয়ে গম্ভীর মুখ করে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে মিটিং করছিস নাকি?
রাহা মুখ বাঁকিয়ে বললো
"যাও তো তোমাকে কে ডাকছে?
হামজা নাটকীয় ভঙ্গিতে বুক চেপে ধরলো।
"দেখেছিস?এত কষ্ট করে এতক্ষণ ধরে সবার ফটোগ্রাফার হয়ে ঘুরলাম,এখন আমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছে!
তনুজার মুখেও হালকা হাসি ফুটে উঠলো
হামজা আবার বললো
"চল চল সবাই ডাকছে।
তিনজনই স্টেজের সামনে এগিয়ে গেল।
জুমানার পরিবারের সবাই ততক্ষণে এসে গেছে।
জুমানা মাথা তুলে সামনে তাকাতেই তনুজার সাথে চোখাচোখি হলো। জুমানা একটু কপাল কুঁচকালো কিন্তু মুহুর্তেই মুখে শয়তানি হাসি টা ফুটে উঠলো। তনুজা মুখ ফিরিয়ে নিলো। বিড়বিড় করে বলল
"ওকে জাস্ট নেওয়া যায় না"
এক এক করে দুই পরিবারের সবাই মিলে ছবি তুলছে।
ক্যামেরার ফ্ল্যাশে পুরো হলঘর বারবার আলোকিত হয়ে উঠছে।
হামজাই ক্যামেরা হাতে সবাইকে একের পর এক দাঁড় করিয়ে ছবি তুলছে।
হলজুড়ে হাসির রোল পড়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর উপস্থাপক মাইক্রোফোন হাতে বললেন
"নাউ ইটস টাইম ফর দ্য রিং সেরিমনি।
চারদিকে মুহূর্তেই করতালির শব্দ ছড়িয়ে পড়লো।
একজন স্টাফ মখমলের ছোট্ট বাক্সটা এনে সাদের হাতে দিল। সাদ বাক্সটা নিয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে আস্তে বললো
"আম্মু তুমি পরিয়ে দাও না?"
আসমা বেগম অবাক হয়ে ছেলের দিকে তাকালেন।
"পাগল ছেলে। আমি পরাবো কেন।
আসমা বেগম মাথা নেড়ে হেসে বললেন
"এটা বাংলাদেশ হলে হয়তো আমি পরিয়ে দিতাম। কিন্তু এখানে সবাই তোদের জন্যই অপেক্ষা করছে।
তিনি আরও নিচু গলায় বললেন
"যা বাবা নিজের হাতে পরিয়ে দে।
সাদ আর কিছু আর বলতে পারলো না। শুধু চুপচাপ মাথা নাড়লো।
স্টেজের একপাশে দাঁড়িয়ে আছে রাহা আর তনুজা।
রাহা ফোন দিয়ে ছবি তুলছে। আর তনুজা ছোট ছোট ভিডিও করছে। ভাবছে
পরে একটা সুন্দর স্টোরি দেবে। সাদ ধীরে ধীরে রিংয়ের বাক্সটা খুললো। ছোট্ট হীরের আংটিটা তুলে নিতেই
তার হাত কেঁপে উঠলো। এতটাই
যে পাশে দাঁড়ানো জুমানাও একবার অবাক হয়ে তাকালো। সাদ নিজের আঙুল শক্ত করে মুঠো করলো।
তবুও কাঁপুনি থামলো না।
কয়েক সেকেন্ড
পুরো হলঘর যেন ঝাপসা হয়ে গেল তার চোখে।
অদ্ভুত এক শূন্যতা বুকের ভেতর চেপে বসেছে।
ঠিক তখনই সে খুব কষ্ট করে মাথাটা সামান্য ঘুরিয়ে পাশে তাকালো।
তার দৃষ্টি গিয়ে থামলো তনুজার ওপর। তনুজা তখনও ফোন হাতে দাঁড়িয়ে। সাদকে নিজের দিকে তাকাতে দেখে সে কিছুই বুঝলো না। বরং খুব স্বাভাবিক একটা ছোট্ট হাসি দিল।
সেই হাসিটুকুও সাদের বুকের ভেতর কেমন ছুরি হয়ে বিঁধলো। তার চোখের গভীরে যে অসহায়তা জমে আছে
যে নীরব আর্তনাদ লুকিয়ে আছে সেটা কেউ দেখলো না।
তনুজা সাদের মন মরা চেহরা দেখলো আর সেই মুহূর্তে তার বহুদিনের সন্দেহটা যেন আরও দৃঢ় হয়ে উঠলো।
সাদ এই বিয়েটা চাইছে না।
কারন টা নিশ্চয়ই বড় হবে
সাদ দৃষ্টি সরিয়ে নিলো সামনে হাতের দিকে তাকালো তার সমস্ত দৃষ্টি আটকে রিলো নিজের ডান হাতের দিকে।
তার গলা ভারী হয়ে এলো। অদ্ভুতভাবে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো
কারণ এই আংটিটাই আজকের আগে সে আরেকজনের হাতে পরিয়েছিল।তনুজার হাতে
সাদের কাছে সেই কয়েকটা সেকেন্ড যেন একটা জীবনের সমান ছিল।
সে আজও ভুলতে পারেনি আংটিটা তনুজার অনামিকায় একদম নিখুঁতভাবে মানিয়ে গিয়েছিল।
একই সাইজ।একই আংটি।
কিন্তু
দুইজন মানুষ।একজনকে সে ভালোবাসে।
আরেকজনকে বিয়ে করতে যাচ্ছে।
চোখ দুটো বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেললো সাদ।
বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্টটা যেন আর ধরে রাখা যাচ্ছে না।
রিং পরানোর আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছে বেশ কিছুক্ষণ।
চারদিকে এখনও হাসির রেশ।
কিন্তু এই ভিড়ের মাঝেও একজন মানুষ নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে বেরিয়ে এসেছে হলঘরের পেছনের খোলা বারান্দায় সাদ।
দু'হাত রেলিংয়ের ওপর রেখে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে সে।
সামনের রাতটা অদ্ভুত শান্ত। হালকা ঠান্ডা বাতাস মুখে এসে লাগছে। আকাশজুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য তারা।
কিন্তু সাদের চোখে সেই আকাশের কোনো সৌন্দর্য ধরা পড়ছে না।
তনুজাকে প্রথম যেদিন দেখেছিল
আজও সেই দিনটার প্রতিটা মুহূর্ত তার স্পষ্ট মনে আছে।
সাদ ছোটবেলা থেকেই ভদ্র,শান্ত স্বভাবের ছেলে।
মায়ের বাধ্য সন্তান। কখনও খারাপ কোনো বন্ধুর সঙ্গে মেশেনি। কখনও কোনো বাজে অভ্যাসে জড়ায়নি।
এই এলাকায় সবাই তাকে ভালো ছেলে বলেই চিনে।
তবে
লন্ডনে আসার পর এই বাড়িটা কিনেছিলেন তার বাবা।
স্বপ্ন ছিল নিজের পরিবারের সঙ্গে নতুন করে জীবন শুরু করবেন। নিজের জীবনের সব জমানো পুঁজি দিয়ে এই বাড়িটা কিনা।
সাদ তখন মাত্র বারো বছরের। বাংলাদেশ থেকে তাকে আর তার মাকে নিয়ে আসার পর কত আনন্দই না ছিল তাদের।
নতুন বাড়ি জন্য কিনা কাটায় তারা ব্যস্ত হয়ে পরিছিলেন।
নতুন শহর নতুন জীবন সব মিলিয়ে দারুণ কাটছিলো তাদের জীবন। কিছু দিনের মধ্যেই তারা বাড়ি উঠবে বলে চিন্তা করেচিলেন।
কিন্তু সেই সুখ বেশিদিন টিকেনি।
একটা ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা তিনজনই আহত হয়েছিল।
তবে সবচেয়ে বেশি আঘাত পেয়েছিলেন তার বাবা।
পঁয়তাল্লিশ দিন কোমায় থাকার পর।
চিরদিনের মতো চোখ বন্ধ করে ফেলেন তিনি। সেদিন থেকেই বদলে যায় সাদের পৃথিবী। এক মুহূর্তেই যেন বড় হয়ে যেতে হয় তাকে। তারপর খুব কস্টে কাটে তাদের জীবন। তার চাচা যতটুকু সম্ভব পারতেন তাদোর জন্য করতেন।
সাদ আস্তে আস্তে বড় হলে গেলো।
পড়াশোনার পাশাপাশি ছোটখাটো কাজ করা শুরু করলো
মায়ের পাশে দাঁড়ানো সংসারের দায়িত্ব বুঝে নেওয়া।
সবকিছুই খুব অল্প বয়সেই শিখে গিয়েছিল সে।
বাবার শূন্যতা কেউ পূরণ করতে পারেনি।
এই এলাকায় অনেক বাংলাদেশি পরিবার থাকলেও কারও সঙ্গে তাদের খুব একটা ওঠাবসা ছিল না।
একদিন বাজারে গিয়ে আসমা বেগমের সঙ্গে রুবি বেগমের পরিচয় হয়।
কথায় কথায় জানা গেল তারা একই এলাকার মানুষ।
সেই পরিচয় থেকেই ধীরে ধীরে দুই পরিবারের সম্পর্ক গভীর হতে থাকে।
হামজা আর সাদ সমবয়সী হওয়ায় দুজন খুব ভালো বন্ধু হয়ে যায়। প্রায় প্রতিদিনই একসঙ্গে আড্ডা ঘোরাঘুরি সবকিছু শুরু হলো।
তারপর
রুবি বেগমরা সবাই বাংলাদেশ বেরাতে গিয়েছিলো। তারা ফিরা মাএই সাদ হামজার খোঁজে সেদিন প্রথম তাদের বাড়িতে গিয়েছিল সাদ।
ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই তার পা যেন থেমে গিয়েছিল
ড্রয়িং রুমে এক মুগ্ধকর রমণী বসে আছে।
মেয়েটার গায়ের রঙ দুধে-আলতা অদ্ভুত এক কোমল উজ্জ্বলতা ছিল। বড় বড় কালো মনির হরিণের মতো চোখদুটোতে মিশে ছিল মায়া আর গভীর শান্তি। কপালের ওপর এলোমেলো কয়েক গোছা চুল বারবার মুখে পড়ছিল আর সে অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে সেগুলো কানের পেছনে সরিয়ে নিচ্ছিল
এমন এক সৌন্দর্য,যেটা দেখে বারবার তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে
তরুণের মনে প্রথম ভালবাসার অনুভূতি জেগে উঠেছিলো সেইদিনই
সাদের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা টান তৈরি করেছিল।
সেই প্রথমবার সাদ বুঝেছিল
তার তরুণ মনের সর্বনাশ হলো বুঝি
সাদ দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল
চোখ ফেরাতে পারছিল না। ঠিক তখনই হামজা এসে ডাক দিয়েছিল তাকে। হুঁশ ফিরেছিল সাদের।
হামজা পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল
এই হচ্ছে তনুজা আমাদের চাচাতো ওরফে খালাতো বোন
সাদ তখনও পুরো ব্যাপারটা বুঝতে পারেনি
হামজাই হেসে বুঝিয়েছিল
কীভাবে চাচাতো আর খালাতো দুই সম্পর্কই হয়ে গেছে
তনুজা ভদ্রতাসোলুব মিষ্টি একটা হাসি দিয়েছিল ছাদের দিকে তাকিয়ে
সেদিনের পর থেকে
প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো অজুহাতে সে তুষারদের বাড়িতে যেত।
তনুজা তখন তেমন কথা বলতো না।সে বেশির ভাগ সময়ই নিজের রুম এ থাকতো ভাগ্য করে হলে এক কি দুইবার দেখা পেতো।
এই পাঁচ বছরে তাদের সম্পর্ক টা আস্তে আস্তে অনেক গভীর হয়েছে।একদিনের জন্যও তনুজার প্রতি ভালোবাসা কমেনি।
বরং দিনের পর দিন আরও গভীর হয়েছে
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো সাদের বুক থেকে
আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললো
"তোমাকে আর বলা হবে না হয়তো তনু। এই হৃদয়ের বিশেষ জায়গায় তোমার ঠাঁই হয়েছিল। কত বার জানো তোমাকে বলতে চেয়েছি পারি নি বলতে আমার ভয় হতো। তুমি খুব রাগি মানুষ পাখি আমার এই ভালোবাসা প্রকাশ করার মাধ্যমেই যদি আমি তোমাকে হারিয়ে ফেলি।তাহলে সেই প্রকাশ করার আনন্দ দিয়ে কি হবে আমার। যদি তুমিই না থাকো। রাতের পর রাত আমি তোমার বারান্দায় দৃষ্টি বোঝিয়ে রেখে তোমাকে দেখেছি লুকিয়ে লুকিয়ে।যেখানে যাও না কেনো এক নজর হলেও
দীর্ঘ পথ পারি দিয়ে যেয়ে দেখে আসতাম
তোমাকে আর বলা হলো না তনু।
শুধু একবার তেমাকে নিজের মনের কথাটা বলতে পারতাম যদি। আজও সুযোগ খুঁজছি। আজও বলতে চেয়েছি।
"তনু আমি তোমাকে ভালোবাসি
আমার এই কথা জানার পর যদি তুমি ঘৃণা করো!যদি আর কোনোদিন কথাই না বলো?
এই ভয়টাই পাঁচ বছর ধরে চুপ করিয়ে রেখেছে
সাদ তার মাকে বলেছিল।এই বিয়ে সে করতে পারবে না তার পছন্দের একজন আছে। কিন্তু আসমা বেগম যেন শুনেই শুনলেন না শেষ পর্যন্ত যখন সাদ জেদ ধরলো
কিন্তু আসমা বেগম ছেলের কথা মানার বদলে উল্টো তিনি নিজের কসম দিয়ে বলেছিলেন
"আমার মুখের দিকে তাকিয়ে এই বিয়েটা করো বাবা
সাদ সেই দিন অসহায় হয়ে তার মার দিকে তাকিয়ে ছিলো
এই পৃথিবীতে মা ছাড়া তার আর কেউ নেই
নিজের ভালোবাসাকে বুকের ভেতর কবর দিয়েই
সে এমন একটা জীবনের দিকে হাঁটছে।যেটা সে কখনও চায়নি। সে তো তনুজার সাথে তাদের একটা সুন্দর সংসার হবে ভেবেছিল।সে তো তনুজার সাথে এই এক জীবনটা পাড়ি দিতে চেয়েছিল
আর আজ
তনুজাকে সামনে দেখলেই তার বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে। ইচ্ছে করে সবাইকে উপেক্ষা করে
চিৎকার করে বলতে
"তনু আমি তোমাকে অনেক অনেক অনেক ভালোবাসি পাখি"
কিন্তু
ভালোবাসা সবসময় উচ্চস্বরে বলা যায় না
কিছু ভালোবাসা সারা জীবন শুধু নীরবতাতেই বেঁচে থাকে
"তুমি কেনো আমার বাঁ পাজরের মানুষটা হলে না পাখি কেনো তুমি আমার হলে না তনু?
বারান্দার রেলিংয়ে দু'হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে সাদ
একফোঁটা —দুই ফোঁটা
চোখের কোণ বেয়ে নেমে আসা জলগুলো সে মুছে ফেলতেও পারলো না
আজ এতগুলো মানুষের সামনে দাঁড়িয়েও নিজেকে তার পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় মানুষ মনে হচ্ছে
নিজেকে আর স্বাভাবিক রাখতে পারছে না সাদ।
নিজের জীবনের প্রথম ভালোবাসাটাকে কিছুতেই ভুলতে পারছে না।
পারছে না
নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে চোখের সামনে রেখে অন্য কারও হয়ে যেতে।
"আজ যে জায়গায় তার কল্পনা করা দৃশ্যগুলো সত্যি হওয়ার কথা ছিল তনুজাকে নিয়ে। সেই জায়গায় আজ সে অন্য একজনের নামে নিজেকে লিখে দিচ্ছে।
যেখানে তার পাশে থাকার কথা ছিল তনুজার,যেখানে তার হাতেই তনুজার আঙুলে নিজের নামের আংটি পরানোর কথা ছিল,সেই একই জায়গায় আজ সে অন্য একজনের নামে নিজেকে সমর্পণ করে দিচ্ছে।
আজকের দিনটা তো এমন হওয়ার কথা ছিল না
এই স্টেজে এই আলোয় এই আংটিটা
সবকিছুতে সে কল্পনা করেছিল তনুজাকে
যার হাত ধরে একদিন এই পথটা হাঁটার স্বপ্ন দেখেছিল আজ সেই একই পথে অন্য একজনের নামের সঙ্গে নিজের নাম জুড়ে দিচ্ছে
ভাগ্য এত নির্মমও হয়!
সাদ মাথাটা নিচু করে চোখ বন্ধ করলো
তার মনে হলো,বুকের ভেতর কেউ যেন মুঠো করে তার হৃদয়টা চেপে ধরে আছে
নিশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে
তনুজার প্রতিটা হাসি,প্রতিটা চোখের চাহনি তাকে আরও বেশি মনে করিয়ে দিচ্ছে এই মেয়েটা কোনোদিনই তার হবে না
তবু সে অসহায়
কারণ সে তার মাকেও কষ্ট দিতে পারে না
এই পৃথিবীতে মা-ই তো তার শেষ আশ্রয়,শেষ আপন মানুষ।
দু'দিকেই সে হেরে যাচ্ছে।সাদ বুঝতে পারছে না
সে আসলে কি করবে?
চলবে!!
পর্ব সংখ্যা —৩০
লেখিকা — তাসনিয়া জাহান
অচেনা প্রনয়ের চিরকুট