ফন্ট সাইজ:
থিম:
অচেনা প্রনয়ের চিরকুট

২৯তম পর্ব

লেখক: তাসনিয়া জাহান

বিকেলের কোমল রোদটা ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে। পশ্চিম আকাশটা কমলা আর হালকা গোলাপি রঙে রঙিন হয়ে উঠেছে। লন্ডনের ঠান্ডা বাতাসে গাছের পাতাগুলো দুলে দুলে এক অদ্ভুত প্রশান্তি ছড়িয়ে দিচ্ছে চারদিকে। দূরে কোথাও পাখির ডাক, আবার কোথাও শিশুদের হাসির শব্দ ভেসে আসছে।

সাদের গাড়িটা ধীরে ধীরে বাড়ির সামনে এসে থামলো।

রাহা আর তনুজা নেমে পড়তেই সাদ জানালার কাঁচ নামিয়ে হালকা হেসে বললো

"বাই"

রাহা হাত নেড়ে বিদায় জানালো।

তনুজাও ভদ্রতার হাসি দিলো। তারপর গাড়িটা ধীরে ধীরে রাস্তা পেরিয়ে চোখের আড়াল হয়ে গেল।

বাড়ির ভেতরে ঢুকেই দুই বোন যে যার রুমে চলে গেল ফ্রেশ হতে।

ফ্রেশ হয়ে তনুজা সবার আগে ফোনটা হাতে নিলো।

স্ক্রিন অন করতেই তার চোখ দুটো অজান্তেই নোটিফিকেশন বারে চলে গেল।

কিছুই নেই। না কোনো মেসেজ। না কোনো কল।

না সেই মানুষটার কোনো চিহ্ন।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা বিছানায় রেখে দরজা খুলে নিচে নামার জন্য বের হলো সে। হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল পাশের দরজাটায়।

দুই দিন হয়ে গেল তুষার নেই।

কেমন যেন খালি খালি লাগলো পুরো করিডোরটা।

তনুজা কিছুক্ষণ দরজাটার দিকে তাকিয়ে রইলো।

তারপর না বুঝেই এগিয়ে গিয়ে হাত রাখলো ডোরনবের ওপর।

দরজাটা খুলে গেল।

রুমটার ভেতর সবকিছু আগের মতোই গোছানো।

বড় কাঁচের জানালার পর্দাগুলো অর্ধেক সরানো। বিকেলের শেষ আলো এসে বিছানার একপাশে পড়েছে। ধূসর রঙের বড় বিছানাটা নিখুঁত করে গুছিয়ে রাখা। একটা ল্যাপটপ, আর কয়েকটা ফাইল।দেয়ালের পাশে ছোট্ট একটা বুকশেলফ।

সবকিছু ঠিক আগের মতোই আছে। শুধু মানুষটা নেই।

তনুজা কিছুক্ষণ নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকলো।

পরক্ষণেই নিজের কাণ্ড বুঝতে পেরে বিরক্ত হয়ে গেল।

"আমি এসব কী করছি!"

বিড়বিড় করে বলেই তাড়াতাড়ি দরজাটা টেনে বন্ধ করে দিল।

তারপর দ্রুত নিচে নেমে এলো।

ড্রইংরুমে এসে দেখলো রুবি বেগম আর রাহা বসে আছে।

রাহা একের পর এক নতুন ড্রেস বের করে দেখাচ্ছে।

তনুজাও গিয়ে তাদের পাশে বসলো।

রাহা খুশি হয়ে বললো

"দেখো মা এইটা কেমন!"

তনুজা হাসিমুখে দেখতে লাগলো।

কিছুক্ষণ পর কথার মাঝেই হঠাৎ বিরক্ত হয়ে বলে উঠলো

"উনি নিজে একদিনও নিজের বিয়ের শপিং এ যায়নি আর না বউ নিয়ে শপিংয়ে গেলেন।"

রাহা তাকালো।

তনুজা মুখ বাঁকিয়ে আবার বললো

"আর না উনার বউ ছিল কোনো শপিং এর সময়। আর সে উল্টা আমাদের নিয়ে মেতে আচ্ছে মানুষটা সত্যিই অদ্ভুত।"

রাহা হেসে ফেললো।

ঠিক তখনই

কলিংবেলের শব্দে তনুজা উঠে দরজার দিকে গেল।

দরজা খুলতেই সে অবাক হয়ে গেল। দাঁড়িয়ে আছেন আসমা বেগম। আর তার হাতে সেই শপিং ব্যাগগুলো। যে গুলো শপিংমল এ সাদ এর হাতে দেখেছিল।

তনুজার চোখ দুটো ছোট হয়ে এলো।

আসমা বেগম মিষ্টি হেসে ভেতরে ঢুকলেন।

"দেখো তো তোমাদের মেয়েদের কাণ্ড!"

রুবি বেগম হেসে বললেন

"কী হয়েছে?"

আসমা বেগম ব্যাগগুলো টেবিলের ওপর রেখে বললেন

"আমি তো ওখান থেকেই বলে দিয়েছিলাম, যার যেটা পছন্দ হবে সেটাই নেবে। এখনকার মেয়েদের পছন্দ তো আর আমাদের মতো না। তাই ভাবলাম ওদেরই পাঠাই।"

তারপর তনুজার দিকে তাকিয়ে বললেন

"কিন্তু দেখো কাণ্ড! তনুজা নাকি কিছুতেই সাদকে বিল দিতে দেয়নি। উল্টা নিজের পছন্দের দুইটা ড্রেস বাদ দিয়ে নিজের টাকায় বিল দিয়েছে। বলো তো, এসব কি মানা যায়?"

রুবি বেগম হেসে ফেললেন।

"ওকে তো তুমি চেনোই।ও এমনই । কারও কাছ থেকে কিছু নিতে চায় না।"

আসমা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন

"তাই আমার বুদ্ধিমান ছেলে কী করেছে জানো?"

তিনি ব্যাগ দুটো সামনে এগিয়ে দিলেন।

"ও বাদ দেওয়া ড্রেস দুটো আবার কিনে নিয়ে এসেছে।"

তনুজার সন্দেহ একদম সত্যি হলো।

সে আস্তে বললো

"আন্টি আসলে ড্রেসগুলোর দাম অনেক বেশি ছিল। এত দামী ড্রেস আমার নিতে অস্বস্তি লাগছিল। তাই কমিয়ে নিয়েছি। আমিতো নিয়েছি এইসবের আর দরকার নেই।

আসমা বেগম এবার ভান করে রাগ দেখালেন।

"দামি ছিল তাই নিজের টাকায় কিনে ফেললি?"

"কিরে মা, আন্টির দেওয়া জিনিস নিতে ভালো লাগে না?"

তনুজা তাড়াতাড়ি মাথা নাড়লো।

"না না কী যে বলেন!"

"তাহলে আর কথা নয়। নে।"

রাহা পাশেই বসে মিটিমিটি হাসছে।

শেষ পর্যন্ত না চাইলেও তনুজাকে ব্যাগগুলো নিতে হলো।

আসমা বেগম আর রুবি বেগম গল্পে মেতে উঠলেন।

এর মাঝেই বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল।

আরোশ সাহেব অফিস থেকে ফিরেছেন।

ঘরে ঢুকেই আসমা বেগমকে দেখে হাসলেন।

"আসসালামু আলাইকুম,আপা। কেমন আছেন?"

"ওয়ালাইকুম সালাম, ভাইজান। ভালো আছি।"

আরোশ সাহেব মজা করে বললেন

"তা কী খবর? শাশুড়ি হচ্ছেন অনুভূতিটা কেমন?"

আসমা বেগম হেসে ফেললেন।

"ভাইজান, খুব ভালো।"

"ভালো হওয়ারই কথা।"

তারপর একটু গম্ভীর হয়ে বললেন

"আসলে আপনাকেই খুঁজছিলাম। কাল বাদে পরশু সাদের এনগেজমেন্ট। আপনি কিন্তু থাকবেন। ওর মামা-চাচারা বিয়ের একদিন আগে আসবে। তাই আপনার সাহায্যটা খুব দরকার।"

আরোশ সাহেব কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে বললেন

"আসমা আপা আমারও সেদিন একটা বড় ডিলারের মেয়ের এনগেজমেন্টে দাওয়াত আছে। অনেক অনুরোধ করেছে।"

আসমা বেগমের মুখটা একটু মলিন হয়ে গেল।

"ওহ তাহলে তো আর কিছু করার নেই।

আরোশ সাহেব দ্রুত বললেন

"আরে শুনো। অনুষ্ঠান তো রাতে। আমি সারাদিন তোমাদের সব আয়োজনেই থাকবো। যতটুকু পারি সাহায্য করবো। শুধু রাতে একটু বের হতে হবে।"

আসমা বেগম আবার হেসে উঠলেন।

"আচ্ছা, তাতেই হবে।"

তারপর মজা করে বললেন

"তবে তনু, রাহা আর ভাবিকে কিন্তু নিয়ে যাবেন না। ওরা না থাকলে আমার পাশে থাকবে কে?"

আরোশ সাহেব হেসে বললেন

"আচ্ছা, আমি একাই যাবো। যদি তাড়াতাড়ি শেষ করতে পারি, তাহলে আবার তোমাদের অনুষ্ঠানেই চলে আসবো।"

"ঠিক আছে।"

তাদের কথোপকথন চলতেই তনুজা উঠে রান্নাঘরে গেল।

চা বানানোর জন্য।

কিচেনে ঢুকেই অভ্যাসবশত সবার আগে কফির জারটা তুলে নিল। কাপে কফি ঢাললো। গরম পানি। সবকিছু মিশিয়ে ফেললো।

তারপর কাপ হাতে নিয়ে সোজা সিঁড়ির দিকে হাঁটতে লাগলো।

পিছন থেকে রাহা ডাক দিলো।

"কিরে! কোথায় যাচ্ছিস?চা হয়েছে?"

তনুজা থমকে দাঁড়ালো। মনে হলো যেন হঠাৎ কোনো ঘোর থেকে বের হয়ে এসেছে। সে ধীরে ধীরে কাপটার দিকে তাকালো। এটা তো চা না! মনে পড়লো।

প্রতিদিন

সে তুষারের জন্য কফি বানায়।

সেই অভ্যাসেই আজও না বুঝে কফি বানিয়ে ফেলেছে।

তনুজা নিজের জিভে আলতো কামড় বসিয়ে লজ্জায় হেসে বললো

"এক মিনিট!"

তারপর আবার রান্নাঘরে ফিরে গিয়ে তিন কাপ চা বানিয়ে আনলো।

আর সেই কফির কাপটা নিজের কাছেই রেখে দিল।

সবার হাতে চা দিয়ে নিজের কফিতে এক চুমুক দিতেই

মুখ থেকে যতটুকু কফি চুমুকে নিয়েছিল সব ফেলে দিল

রাহা চমকে উঠে বললো

"কী হলো?"

রুবি বেগম ও চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন

"তনু কি হয়েছে?

তনুজা মুখ কুঁচকে কফির কাপটার দিকে তাকিয়ে রইলো।

তারপর বিরক্ত গলায় বললো

"তোর ভাইয়ের জন্য আমার মাথাটা একদম গেছে!"

রাহা ভুরু কুঁচকে বললো

"কেন? আমার ভাই আবার কী করলো?"

তনুজা কফির কাপটা টেবিলে রেখে বিরক্ত মুখে বললো

"এই দেখ! চিনিই দিইনি।রোজ রোজ ওই লোকটার জন্য চিনিবিহীন কফি বানাতে বানাতে নিজের কফিতেও চিনি দিতে ভুলে গেছি!"

কথাটা শেষ হতেই রাহা হো হো করে হেসে উঠলো।

রুবি বেগমও না হেসে থাকতে পারলেন না।

আর তনুজা

বিরক্ত মুখ করে কাপটার দিকে তাকিয়ে রইলো,

*

সেন্টার টেবিলে রাখা ফোনটা কেঁপে উঠলো।

স্ক্রিনে ভেসে উঠলো

রোজ—

তনুজার। কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কোনো সুযোগ না দিয়েই রোজের চেনা চিৎকার

"তনুজা!!"

তনুজা ফোনটা কানের থেকে একটু দূরে সরিয়ে বললো

"আল্লাহ! কী হয়েছে?"

রোজ যেন ফেটে পড়লো।

"কী হয়েছে মানে?পুরো দুই দিন হয়ে গেছে!একটা কল দেওয়ার সময় হলো না তোর?"ইউনিভার্সিটিতে ও আসিস না"মেসেজের রিপ্লাই দিস না।

তনুজা ঠোঁট চেপে হাসলো।

"রাগ করেছিস নাকি?

রোজ সঙ্গে সঙ্গে বললো

"না! ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি তোকে বরণ করার জন্য!"

তনুজা হেসে ফেললো।

"আরে আমি তো শুধু একটু রেস্ট নিচ্ছিলাম।"তাই কাউর মেসেজ কল দেওয়ার ইচ্ছে হয়নি।

রোজ দীর্ঘশ্বাস ফেললো।

"রেস্ট নিবি, ঠিক আছে।"তাই বলে আমাদেরও রেস্ট দিয়ে দিবি?"

তনুজা এবার একটু নরম গলায় বললো

"সরি তোদের সাথে কথা বলার মতো মুডই হচ্ছিল না।"

রোজের রাগটাও যেন একটু কমে গেল।

কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে বললো

"আচ্ছা, একটা খবর দিব?"জ্যাক আর অ্যালেক্স"

তনুজার মুখের হাসিটা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।

সে চুপ করে রইলো।

রোজ বললো

"আব্বু আম্মু তো অনেক চেষ্টা করেছিল ওদের বের করার। প্রায় ছাড়িয়েই ফেলেছিল।কিন্তু কী যেন হলো

আবার এক মাসের জেল হয়েছে দুজনেরই।"

তনুজা কিছুক্ষণ কোনো উত্তর দিল না।

ওপাশে নীরবতা।

তারপর খুব শান্ত গলায় বললো "হুম..."

এর বেশি কিছু বললো না।

তার কাছে. ওরা একদিন জেলেও থাকলে যথেষ্ট ছিল।

রোজ বুঝতে পারলো তনুজা আর বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে চাইছে না।

তাই প্রসঙ্গ বদলে বললো

"আচ্ছা শুন যে জন্য কল কটা রাতে তো রেস আছে"কয়টায় বের হবি?"

তনুজা মাথা নাড়লো।

"আমি যাচ্ছি না।এই কয়দিন কোথাও যেতে ইচ্ছা করছে না।আরও দুই-তিন দিন রেস্ট নিতে চাই।

রোজ হতাশ গলায় বললো

ধুর!তুই না গেলে আমি গিয়ে কী করবো?"

তনুজা মুচকি হাসলো।

"তুই যা।আমি পরে আসবো।"

রোজ সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করলো।

"না।তুই না গেলে আমিও যাচ্ছি না।"

তনুজা ভুরু কুঁচকে বললো

"কেন?তুই তো রেস ছাড়া বাঁচিস না।"

রোজ হেসে বললো

তনুজা কথা শেষ করে করিডর এ হাঁটতে লাগলো সাথে তার মুলান। কি মনে করে যেনো তুষারের রুম টায় ঢুকে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে রইলো পিছু পিছু আসলো মুলান ও। তুষার থাকলে নিশ্চয়ই এমন করাটা সম্ভব ছিলো না।

বেলকনি থেকে ফিরে রুম টা পায়চারি করে টুকটাক জিনিস গুছিয়ে রেখে খাটে বসলো। ঘরটা তার বেশ পছন্দের। কিন্তু তুষার থাকলে সে আসে না।

তনুজা বসে বসে ফোন স্ক্রল করতে করতে কখন ঘুমিয়ে পরেছে সে নিজেও যানে না। তার সাথে মুলান ও তনুজার সাথে ঘেঁসে ঘুমিয়ে পরেছে।

প্যারিস

সন্ধ্যা নামতেই ভালোবাসার শহরটা যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে।

আইফেল টাওয়ারের গায়ে একে একে জ্বলে উঠেছে হাজারো সোনালি আলো। চারপাশে ভিড় জমিয়েছে অসংখ্য মানুষ।এত মানুষের ভিড়েও

একজন মানুষ যেন সম্পূর্ণ আলাদা।

আইফেল টাওয়ারের পাশের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে।

পরনে তার গাঢ় কালো রঙের একটি প্রিমিয়াম নিটেড জিপ-কলার টিশার্ট। বুক আর দুই হাত জুড়ে থাকা সরু সাদা স্ট্রাইপগুলো কালো পোশাকটার গাম্ভীর্যের মাঝেও আলাদা একটা অভিজাত সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলেছে।টিশার্ট টার সামনের ছোট্ট সিলভার জিপটা গলার কাছে সামান্য খোলা,নিচে পরা চারকোল ব্ল্যাক ডেনিম জিন্স।

বাম হাতে সবসময়ের মতো চকচকে স্টিল স্ট্র্যাপের ঘড়ি,

ডান হাতের দুই আঙুলের ফাঁকে ধরা আধখাওয়া একটা সিগারেট। ধোঁয়ার কুণ্ডলীগুলো ধীরে ধীরে মিশে যাচ্ছে ঠান্ডা প্যারিসের বাতাসে।

তার দৃষ্টি অন্য কোথাও।

সামনেই দাঁড়িয়ে আছে পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর স্থাপত্য—আইফেল টাওয়ার।

তবুও যেন সেদিকে তার বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই।

তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে এই শহরে নয়।

নিজের ভাবনার দুনিয়ায় কোনো শহরে হারিয়ে গেছে।

"ভাই"

তন্ময়ের ডাকে তুষারের ভাবান্তর হলো না।

সে এখনও নিজের ভাবনায় ডুবে আছে। তন্ময় ধীরে ধীরে পাশে এসে দাঁড়ালো। হাতে ধরা কফির কাপটা বাড়িয়ে দিয়ে বললো

"নাও"

তুষার বাম হাত দিয়ে কাপটা আলতো করে সরিয়ে দিল।

"এসব আমি খাই না।"

তন্ময় ভুরু কুঁচকে বললো,

"সুগার নেই তো।"

তুষার ধীর গলায় বললো,

"তাহলে মিষ্টিটা পাবো কোথায় আমি?"

তন্ময় কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো।

তুষার চিনি খায় না—এটা সে জানে।

তাহলে মিষ্টির কথা বলছে কেন?

সে মাথা চুলকে বললো

"চিনি ছাড়া কফি মিষ্টি হবে কী করে?"তুমি তো সুগার খাও না।"তাহলে আর কী দেব?

তুষারের ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক হাসি ফুটে উঠলো।

খুব ক্ষীণ। চোখে পৌঁছালো না।

"কিছু না সেই মিষ্টি দুনিয়ার কোথাও পাওয়া যায় না।

তন্ময় দীর্ঘশ্বাস ফেলে পাশের পাথরের বেদিটায় বসে পড়লো

কোলের ওপর রাখা কালো রঙের হাতে বোনা ক্রোশের সোয়েটারটার দিকে একবার তাকালো সে।

এপ্রিলের প্যারিসে এখনও হালকা শীতের আমেজ রয়েছে।হোটেল থেকে বের হওয়ার সময় তুসার পরেই ছিলো কিন্তু এখানে আসার পর থেকে এটা খুলে রেখেছে। তার নাকি স্মেল পাচ্ছে এটা থেকে। সেটা নাকি তাকে জ্বালাচ্ছে। তন্ময় ও ক্রোশেরি সোয়েটার পরে আছে এগুলো তনুজার হাতের বুনা সোয়েটার।

তন্ময় একবার তুষারের মুখের দিকে তাকালো।

তারপর হাতের সিগারেটটার দিকে।

মুখটা পড়ার চেষ্টা করলো।

"এটা নিয়ে পাঁচটা হয়ে গেল,ভাই।

তুষার ভ্রু তুললো।

কী?

"তোমার এই ছাইপাঁশ।

তুষার মুচকি হাসলো।

"গুনে রাখিস বুঝি?

"হ্যাঁ"

"রাখতেই হয়।

হতুষার বললো

"রাখ। পরে হিসাব চাইলে যেন দিতে পারিস।

তন্ময় অবাক

"কে হিসাব চাইবে?

তুষার কাঁধ ঝাঁকালো।

"বউ —এই জিনিস একদম পছন্দ করে না।

তুষার সিগারেটটার দিকে তাকিয়ে খুব স্বাভাবিক গলায় বললো

"আর বেশি দিন না।

তন্ময় অবাক হয়ে বললো

"কেন?

তুষার হালকা হেসে বললো

"বউ হলে এগুলো খাওয়া মুশকিল হয়ে যাবে।"মেয়েরা এসব একদম সহ্য করতে পারে না।

তন্ময় চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বললো

"বউ!তুমি বিয়ের কথাও ভাবো নাকি?

তুষার আর কিছু না বলে শুধু সামনে তাকিয়ে মুচকি হাসলো

'বউ'শব্দটা শুনে তন্ময় অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।

তুষার

মেয়েলী জড়িত কথা বার্তা কখনো বলে না মজা করে?

এটা তো প্রায় অসম্ভব!

কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে বললো তুষার

"কাজটা শেষ কর,তন্ময়।ওরা এত দেরি করছে কেন?

তন্ময় মাথা নাড়লো

"ভাই.তুমি জানো না?তাড়াহুড়োর কাজ শয়তানের হয়।প্রজেক্টটা অনেক বড়।এখানে উনিশ-বিশ হলেই কোটি টাকার ক্ষতি হবে।

তুষার শুধু বললো

"হুম"

তন্ময় এবার সোজা হয়ে দাঁড়ালো।

তোমার কি লন্ডনে খুব জরুরি কোনো কাজ আছে?

তুষার হাতে থাকা সিগারেটটা মাটিতে ফেলে পায়ের নিচে পিষে দিল

তারপর একদৃষ্টে সামনে তাকিয়ে বললো

"খুব"

একটা মাত্র শব্দ।

কিন্তু সেই শব্দটার ভার যেন কয়েকটা বাক্যের সমান।

তন্ময় আবার বললো

"তাহলে তোমাকে তো বললামই তুমি চলে যাও।আমি এখানকার সব দেখে নেব। শেষ করেই চলে আসবো।

তুষার মাথা নাড়লো।

"না শেষ কর একসাথেই ফিরবো।

তন্ময় এবারও হাল ছাড়লো না।

আরে,যাবো তো আমিও।তুমি আগে যাও। আমি শেষ করে চলে আসবো। তুমি যেয়ে রেস্ট নেও আমি গেলে টুর এ বের হবো সবাই তখন আর আরাম করার সুযুগই মিলবে না।

তুষার আরেকবার 'না' বলতেই তন্ময় বুঝে গেল

এই মানুষটাকে জোর করে কিছু করানো সম্ভব নয়।

সে আর কথা বাড়ালো না।

তুষার পকেট থেকে ফোনটা বের করলো

স্ক্রিন অন হতেই তার কপাল কুঁচকে গেল

দশটার বেশি মিসড কল।

সাইফ,আবিরের

তুষারের চোখে এক ঝলক বিস্ময় ফুটে উঠলো।

তন্ময়কে সেখানেই রেখে কয়েক কদম দূরে গিয়ে নম্বরটায় কল ব্যাক করলো।

"হোয়াটস রং?কি হয়েছে?

ওপাশের ব্যক্তি কি বলল শুনা গেলো না

তুষারের কপালে বাজ পরেছে কয়টা। হাতের আঙ্গুল দিয়ে কপাল চুলকালো তারপর বলল।

"ঠিক আছে আরেকটু ম্যানেজ করে নে"

চলবে!!

পর্ব সংখ্যা —২৯

লেখিকা — তাসনিয়া জাহান

অচেনা প্রনয়ের চিরকুট

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন