সন্ধ্যা নামতেই পুরো বাড়িটা যেন আলোয় জেগে উঠলো। বাড়িটার বাইরের দেয়ালজুড়ে ঝুলছিল উষ্ণ হলুদ রঙের ফেয়ারি লাইট। দূর থেকে দেখলেই বোঝা যাচ্ছিল আজ এই বাড়িতে উৎসব।
কানাডা থেকে আসা সাদের মামা,মামী,চাচা ফুপাতো-মামাতো ভাইবোনেরা পুরো বাড়িটাকেই মাথায় তুলে ফেলেছে।তাদের হাসি-ঠাট্টায় বাড়িটা সরগরম হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে জুমানাদের বাড়ির লোকজনও একে একে এসে পৌঁছেছে কিন্তু তাদের সঙ্গে উপস্থিত নেই জুমানা আর তার ফ্রেন্ডরা আসমা বেগম ও তার ভাবিরা কারণ জানতে চাইলে জুমানাদের বাড়ির মানুষ জানালো
জুমানার সাজ এখনো শেষ হয়নি পার্লারে আছে আসতে একটু দেরি হবে
আসমা বেগম আর কিছু বললেন না মেয়ে মানুষ,বিয়ের সময় মনমতো সাজবে এটাই তো স্বাভাবিক
অন্য দিকে সবাই আনন্দে ব্যস্ত থাকলেও একজন মানুষের মনে আনন্দের লেশমাত্রও নেই
নরমাল একটা টি-শার্ট পরে নিজের ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে সাদ দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।অথচ তার চোখ অন্য কোথাও।
আসমা বেগম থেকে শুরু করে সবাই এক এক করে বহুবার এসে বলে গেছে তাকে রেডি হতে।কিন্তু সাদের কোনো হেলদোলই নেই যেন শরীরের সমস্ত শক্তি অবশ হয়ে এসেছে সে কিছুই পারছেনা
মনের মধ্যে কত প্রার্থনা করছে
প্রতিদিনের মতো কালকেও এত করে চাইল,তবুও মেয়েটাকে নিজের মনের কথাটা বলতে পারলো না নিজের ওপর ভীষণ রাগ হচ্ছে তার।অথচ কিছুই করতে পারছে না।চোখ দুটো লাল হয়ে আছে।অনেকদিন ধরেই ঠিকমতো ঘুম হয় না তার
দরজায় কয়েকবার টোকা পড়লো
সাদ কোনো উত্তর দিল না
ভেতর থেকে কোনো আওয়াজ না পেয়ে হামজা নিজেই দরজা খুলে ঢুকে পড়লো
সাদকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মজার সুরে বললো
"কী ভাই,টেনশন হচ্ছে নাকি হুম?
সাদ কিছু বললো না
হামজা আবার হেসে বললো
"বাসর ঘরের টেনশন নাকি রে?
সাদ মুখটা ঘুরাতেই দরজা দিয়ে ঢুকে পড়লো তার আরও কয়েকজন মামাতো আর চাচাতো ভাই
তাদের দেখে সাদ আর হামজাকে কিছু বললো না
সাদের মুখটা একদম চুপসে আছে দেখে হামজা কপাল কুঁচকালো
মজা বাদ দিয়ে এবার সিরিয়াস হয়ে জিজ্ঞেস করলো
"কিরে,কী হয়েছে?আসলেই টেনশন করছিস?
সাদ মাথাটা নিচু করে বললো
"না তোরা যা।আমাকে একটু একা থাকতে দে কিছুক্ষণ
সাদের চাচাতো ভাই মিরাজ বলে উঠলো
"সে কী রে!কিছুক্ষণ পরেই তো সব শুরু হবে।তুই এখনো রেডিই হসনি,আবার বলছিস একা থাকবি!কাকিমা যে নিচে যাওয়ার জন্য তাড়া দিচ্ছে
সাদের গলা দিয়ে কথা বের হচ্ছে না
সে আবারও খুব সামান্য স্বরে বললো
"সময় হলে আমি নিজেই নিচে চলে যাব যা তোরা
কেউ আর কিছু বলল না সবাই একএক করে ঘর থেকে বের হয়ে গেল
সাদ আবারও সেই নীরব,নিঃশব্দ রুমটাতেই বন্দি হয়ে রইলো
---
রাহা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল বাঁধছে পরনে সাদের কিনে দেওয়া লেহেঙ্গা হলুদ,কমলা,গোলাপি আর সবুজ রঙের মিশেলে তৈরি রঙিন লেহেঙ্গাটায় সূক্ষ্ম সোনালি কারুকাজ,হাতে রঙিন চুড়ির ঝনঝন আর হালকা সাজে তাকে ভীষণ প্রাণবন্ত লাগছে
সম্পূর্ণ রেডি হয়ে রাহা নিজের ফোনটা নিয়ে একটা ছবি তুলে ইনবক্সে ঢুকে কাউকে ছবিটা পাঠালো
তারপর হাঁটা ধরলো তনুজার রুমের দিকে
"তনু!তোর হয়েছে?
তনুজার কোনো সাড়া না পেয়ে রাহা তার রুমে ঢুকতেই দেখলো
তনুজা সম্পূর্ণ রেডি হয়ে বসে আছে।তারও পরনে লেহেঙ্গা হালকা প্যাস্টেল গোলাপি সোনালি আর হালকা পিস্তাচিও রঙের ঝলমলে লেহেঙ্গাটায় পাথরের সূক্ষ্ম কাজ তার সঙ্গে মানানসই ওড়না সব মিলিয়ে যেন কোমল এক রাজকন্যা
তনুজার মুখটা মলিন
হাতে ফোন নিয়ে বসে আছে
রাহা তনুজার দিকে তাকিয়ে বললো
"আল্লাহ হে রূপসী রমণী স্নিগ্ধময়ী অপরূপা নারী
কী তোমার নাম?তুমি আকাশে থাকার বদলে এখানে কী করছেন?
হালকা সাজে তনুজার মুখটা যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।কপালের ওপর পাথরের টিকলি কানে পাথরের দুল ঠোঁটে হালকা রঙ সব মিলিয়ে চোখ ফেরানো দায়
তনুজা মুখ তুলে তাকালো
রাহা আবার বললো
"হায়!আমি ছেলে হলে নিশ্চিত প্রেমে পড়ে আজকেই বিয়ে করে তোকে লুকিয়ে রাখতাম
তনুজা ভেংচি কাটলো
"হয়েছে তোর পাম দেওয়া
রাহা বললো
"সে কী রে!আমি কী পাম দিচ্ছি নাকি?সত্যি বলছি তোকে খুব সুন্দর লাগছে
তনুজা ছোট্ট করে বললো
"হুম তোকে আমার থেকে বেশি সুন্দর লাগছে
রাহা ভাব নিয়ে বললো
"সে কারণে কী মুখ ফুলিয়ে বসে আছিস,ময়না?
তনুজা বললো
ধুর
রাহা এবার একটু কাছে এসে বললো
"আচ্ছা,কী হয়েছে তা বল
তনুজা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটার দিকে তাকিয়ে বললো
"কিছু মানুষ আমাদের জীবনে হুট করে আসে,মায়া লাগিয়ে আবার হারিয়ে যায় কেন বল তো?
"কার কথা বলছিস?
"সেই অচেনা মানুষটার কথা মানুষটা হুট করে আসলো,নিজেই এসে কত জ্বালালো!মানুষটা তো থেকেও ছিল না কিন্তু এখন তো আরও পুড়ছে রে।থাকলে কী জ্বালাতো কে জানে!গত কয়েক দিনে আমার ঘুম শেষ কোথায় গায়েব হলো লোকটা?প্রতিদিন ইনবক্সটা চেক করি আমি
রাহা এতক্ষণ সব কথাগুলো শুনে গলা খাঁকারি দিয়ে কয়েকটা হিন্দি গানের লাইন গেয়ে উঠলো
উহুম উহুম
হো গয়া হ্যায় তুঝকো তো পেয়ার সাজনা
লাখ কর লে তু ইনকার সাজনা
হ্যায় ইয়ে পেয়ার সাজনা
বলেই হেসে উঠলো।
তনুজা বিরক্ত মুখে তাকালো।
"বললেই হলো?তুই প্রেম না ছাই কীভাবে বুঝলি?
রাহা মুচকি হেসে বললো
"আমার তো এক্সপেরিয়েন্স আছে রে ময়না। সেই এক্সপেরিয়েন্স থেকেই বললাম
কথাটা বলেই রাহা একদম চুপ মেরে গেল। তার মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল মুহূর্তেই। তনুজা কপাল কুঁচকে তাকিয়ে রইলো রাহার দিকে
"কী বললি তুই?তুই প্রেম করিস?
রাহা ঢোক গিললো। মনে মনে নিজেকেই বকতে লাগলো।
রাহা আমতা আমতা করে বললো
"যা কী বলছিস!আমি তো...আমি...
"আমি আমি করছিস কেন,চোর?চোর যেভাবে ধরা পড়লে আমতা আমতা করে,তুইও তাই করছিস। ভালোয় ভালোয় বল—কবে থেকে চলছে?আর ছেলে টা কে?
রাহা একদম ঘাবড়ে গেল। তনুজা ধরে ফেললে আর রক্ষা নেই
সে তাড়াতাড়ি বললো
"আরে তুই ভুল বুঝছিস। আমি বললাম যে আমি মুভিতে, আবার আমাদের ইউনিভার্সিটির মেয়েদের থেকেও এসব লক্ষণ দেখেছি। প্রেমে পড়লে ওরা এমনই বলে। তাই বললাম।
তনুজা কি আর বিশ্বাস করার মানুষ!সে তো একদম চেপে ধরতে যাচ্ছিল।
ঠিক তখনই নিচ থেকে রুবি বেগমের ডাক ভেসে এলো
"রাহা!তনু! তোরা রেডি হলে নিচে আয় সবাই অপেক্ষা করছে!
দুজনেই একে অপরের দিকে তাকালো।
তনুজার প্রশ্নটা আপাতত উত্তরহীনই রয়ে গেল।
রুবি বেগমের ডাকে অবশেষে রাহা আর তনুজা নিচে নেমে এলো
সিঁড়ি বেয়ে নামতেই দেখতে পেল,রুবি বেগম ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে কারও সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলছেন। পরনে হালকা চন্দন রঙের শাড়ি,মুখে ব্যস্ততার ছাপ থাকলেও চোখেমুখে আনন্দ স্পষ্ট
রাহা আর তনুজাকে দেখেই রুবি বেগম ফোনের ক্যামেরাটা উল্টে তাদের দিকে ধরলেন।
হেসে বললেন
"এই যে, দেখ এসে গেছে আমার দুই পরী। দেখ তো তুষার কেমন লাগছে।
ওপাশে তুষার ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলো।
কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে নির্বিকার গলায় বললো
"এমন ডাইনি সেজে দুইটা যাচ্ছে সবাই ভয় পাবে না?
তনুজার মুহূর্তেই মুড খারাপ হয়ে গেল। কিছু বলার আগেই রুবি বেগম ধমকে উঠলেন
"এই চুপ কর তো! খালি উল্টাপাল্টা কথা।
রুবি বেগম আবার বললেন
"রাখ এখন। ওই বাসায় যেতে হবে। আসমা ভাবিকে এক ঘণ্টার কথা বলে এসেছিলাম,এখানে তিন ঘণ্টা হয়ে গেছে। তোর বাবা সেই সকাল থেকে কাজে লেগে আছেন। আমি গেলে সে রেডি হতে আসবেন।
কল কেটে তিনি দুই বোনকে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
সাদ যেন নিজের সাথেই যুদ্ধ করছে। মনের ভেতরটা অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করছে। আজ একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে চায় সে। কিন্তু সাহস হচ্ছে না।
আসমা বেগম নিজ হাতে ছেলেকে তৈরি করিয়ে নিয়ে নিচে নামছেন। তার ঠিক পেছনেই নিঃশব্দে হাঁটছে সাদ।
লিভিং রুমের দরজা দিয়ে ঢুকলো তনুজা আর রাহা।
সামনেই দাঁড়িয়ে থাকা সাদের মামি তনুজাকে দেখে হেসে বলে উঠলেন
"তোকে দেখে তো আমার মনে হচ্ছে বিয়েটা তোরই। বিশ্বাস কর!
তনুজা তখন ফোনে কিছু একটা দেখছিল।
কথাটা শুনেও বিশেষ কোনো হেলদোল করলো না শুধু মাতা তুলে হাসলো একটু।
সাদের পা দুটো মুহূর্তেই থেমে গেল। তার সমস্ত চিন্তা এসে আটকে গেল তনুজার ওপর। মাথার ভেতর হাজারো চিন্তা ঘুরপাক খেতে লাগলো। সে আর পারছে না।
মনে হচ্ছে বুকের ভেতরটা কেউ ছিঁড়ে ফেলছে। শুধু তার সাথেই কেন এমন হচ্ছে?লিভিং রুমে আত্মীয়-স্বজন ভরা। এত মানুষের সামনে তনুজাকে কীভাবে ডাকবে?
আজ আর না বলে সে থাকতে পারবে না। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আসমা বেগম অবাক হয়ে বললেন
"কিরে?দাঁড়িয়ে পড়লি কেন?
সাদ ধীরে তনুজার দিক থেকে চোখ সরিয়ে মায়ের দিকে তাকালো। চোখে স্পষ্ট অসহায়ত্ব। শুকনো একটা ঢোক গিলে সে বললো
"মা আমার সাথে একটু আসো কথা আছে।
আসমা বেগম বিরক্ত হলেন।
"আবার কিসের কথা?সব কথা পরে শুনবো আয়
সাদ এবার আরও অনুনয়ের সুরে বললো
"না,আম্মু আসো প্লিজ। বেশি সময় নেব না।
কথাটা বলেই আর কারও জন্য অপেক্ষা না করে নিজের রুমের দিকে হাঁটা দিল।
আসমা বেগম না চাইলেও শেষ পর্যন্ত ছেলের পিছু নিলেন।
"হাই,বিউটিফুলস!
পেছন থেকে ভেসে আসা পরিচিত কণ্ঠ শুনে তনুজা আর রাহা একসাথে ঘুরে তাকালো।
দেখলো হলুদ পাঞ্জাবি পরে দাঁড়িয়ে আছে সাইফ আর আবির।
তনুজার দিকে তাকিয়ে আবির মুচকি হেসে বললো
"তোমাকে তো আজ একদম হলুদ পরী লাগছে,প্রিটি গার্ল!
কথাটা শেষ হতেই সাইফ আবিরের মাথায় হালকা একটা চাপড় মারলো
সাইফ আর আবিরের কানে থাকা ব্লুটুথ থেকে ওপাশের কারও গলা ভেসে এলো
"কানের নিচে একটা মারবো,সব ফ্লার্টিং বের হয়ে যাবে। তোকে এখানে ফ্লার্টিং করতে পাঠিয়েছি আমি?
অবির গলাটা খাঁকারি দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। সাইফ মুচকি হেসে তার দিকে তাকালো। দু'জনের কানেই ছোট্ট দুটো ব্লুটুথ লাগানো।
তনুজা হেসে বললো
"আবির ভাই আপনার মনে হয় না আপনার একটা ফ্লার্টিং ক্লাস খোলার দরকার?
আবির হেসে মাথা চুলকালো।
এতো টাকা নেই তো সুন্দরী তাই খুলতে পারছি না।
তনুজা হাসলো।
রাহা মুখ ফুলিয়ে বললো
"আমাকে তোমার চোখে পড়ে না বুঝি ভাইয়া?
সাইফ আদুরে গলায় বললো
"আরে সোনা আমার!তুই তো আমার কলিজার বোন। তোকে তো রাজকুমারীর মতো লাগছে রে। রাগ করছিস কেন?দেখ,ভাই তোকে সুন্দর বলেছে,এবার হাস।
রাহা একটু ভাব নিয়ে চুলগুলো ঝাঁকিয়ে বললো,
"আমি জানি আমাকে সুন্দর লাগছে।
সাইফ হাতে থাকা একটা প্যাকেট তনুজার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল
"এগুলো তোমাদের জন্য"
তনুজা প্যাকেট টা নিতে নিতে বলল।
"কি আছে এতে সাইফ ভাই?
সাইফ বলল খুলেই দেখো"
তনুজা খুললো প্যাকেট টা। ভিতরে চারটা গোলাপ ফুলের কাঁকন।দুইটা সাদা রঙের আর দুইটা লাল রঙের।
তনুজার, রাহা চোখ গুলো চিকচিক করে উঠলো।
"সাইফ ভাই আপনি সত্যি আমাদের জন্য এগুলো এনেছেন?
"না পাশের বাড়ির আন্টির মেয়ের জন্য এনেছি।
তনুজা মুখ বাকালো
"অনেক সুন্দর হয়েছে থ্যাঙ্ক ইউ"
রাহা বলল লাল গুলো আমার কিন্তু"
সাইফ হেসে বলল
"হ্যাঁ লাল গুলো তোর আর সাদা গুলো তনুজার"
দুইবোন নিজেদের হাতে পরে নিলো।দুজনের সাজে যেনো এই একটা জিনিসই পরিপূর্ণ করে তুলেছে
তনুজা কাঁকন গুলো পরে সাইফ আবির রাহা কে জিজ্ঞেস করলো।
"কেমন লাগছে?
আবির বলল
"একদম পারফেক্ট"
আসো একটা ছবি তুলে দেই তোমাদের
তনুজা রাহা এক সাথে দাঁড়িয়ে কাঁকন গুলো সামনে ধরে ছবি তুল্লো!
ছবি তোলা শেষ করে সাইফ আর অবির দু'জনই একটু পরপর আশেপাশে তাকালো।
কিছুক্ষণ পর সাইফ বললো
"তোমরা থাকো,আমরা আসছি।
তনুজা মাথা নাড়লো।
অবির আর সাইফ বাড়ির ভেতরের দিকে হাঁটা ধরলো।
এদিকে
★
সাদ নিজের মাকে নিয়ে নিজের রুমে ঢুকলো।
খাটের ওপর আস্তে করে আসমা বেগমকে বসিয়ে নিজে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসল। দু'হাতে মায়ের হাত দুটো শক্ত করে ধরে রইলো।
কাঁপা গলায় বললো
"মা শুনো আমার কথাটা। আমি না তোমার ছেলে আমাকে তোমার কষ্টে দেখতে ভালো লাগে বলো?
আসমা বেগমের কপালে ভাঁজ পড়লো।
ছেলে কী বলতে চাইছে কিছুই বুঝতে পারছেন না।
তিনি অবাক হয়ে বললেন
"কি বলছিস তুই?কষ্ট পাচ্ছিস মানে?
সাদ চোখের পানি আটকে রাখতে না পেরে বললো
"মা,মা আমার কথাটা শোনো মা। আমি এই বিয়ে করতে পারবো না মা। তুমি তোমার এই হাত দিয়ে আমাকে মেরে ফেলো তাও এমন সারাজীবনের বয়ে বেড়ানো কষ্টে বেঁধে দিও না মা
আসমা বেগম বিচলিত হয়ে উঠলেন
"এই সাদ!কী বলছিস এসব?তোর মাথা ঠিক আছে?তুই আমার কসম কেটেছিলি তোর মনে নেই?তুই আবার সেই কথা নিয়ে বসেছিস?বাড়ি ভরা মেহমান,বাবা আমার। তুই এমন পাগলামি করিস না সাদ।
সাদের দু'চোখ বেয়ে নোনাজল গড়িয়ে পড়ছে।
"মা শোনো না মা। আমি জানি,আমি ভুল করেছি। তোমার কসম নেওয়ার পরও এসব বলতে হচ্ছে আমাকে। আমাকে মাফ করে দাও মা। কিন্তু আমি যে পারছি না মা। তোমার ছেলের ওপর একটু দয়া করো মা। আমি যাকে ভালোবাসি তাকে ছাড়া আর কিছুই বুঝতে পারছি না
আসমা বেগমও কাঁদতে কাঁদতে বললেন
"সাদ অনেক হয়েছে। তোর বাবা নেই। তোর একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ হোক,এটাই আমার চাওয়া। আমি মরে গেলেও তুই যেন একটা সুন্দর জীবন নিয়ে বাঁচতে পারিস,সেই আশায়ই এই বিয়ে করাচ্ছি তোকে"
কথাগুলো বলতে বলতেই তিনি কেঁদে ফেললেন
সাদ তাড়াতাড়ি মাকে জড়িয়ে ধরলো
"মা, এমন বলো না। তোমার কিছু হবে না। তোমার কিছু হলে আমার কী হবে বলো
"তাহলে চুপ কর তুই আর যেনো এইসব বিষয় নিয়ে কথা না শুনি আমি
সাদ রেগে গিয়ে জোর গলায় বলল
"তাহলে কেনো তুমি আমাকে বুঝো না বলো?ছোট বেলা থেকে যা বলেছো তাই করেছি তাই শুনেছি এই একটা বার আমার কথাটা রাখো
আসমা বেগম এবার রাগ মেশানো কণ্ঠে বললেন
"কার জন্য তুই এত পাগলামি করছিস সাদ?কে সে?যার জন্য তুই আমার কথাও ভাবছিস না?কে সে বল
সাদ চোখ বন্ধ করে এক নিঃশ্বাসে বলে ফেললো
"মা আমি, আমি তনুজাকে অনেক ভালোবাসি মা। ওকে ছাড়া কিছুই বুঝতে পারছি না। মা,আমার কথাটা বুঝো। এভাবে অন্য কারও সাথে আমাকে বিয়ে দিয়ে তার জীবনটাও নষ্ট করছো!
আসমা বেগম যেন জমে গেলেন
তনুজা
নামটা শুনে তিনি স্তব্ধ হয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
সাদ তাড়াতাড়ি বললো
"তুমি মা আমাকে তনুজাকে এনে দাও। আমি তোমাকে নিয়ে ওকে নিয়ে অনেক দূরে চলে যাবো। তোমার ভাবনা অনুযায়ীই একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবো আমি মা
আসমা বেগম নির্বাক। মুখ দিয়ে কোনো কথাই বের হচ্ছে না।
সাদ মাকে চুপ থাকতে দেখে ডেকে উঠলো
"মা কিছু বলো না মা"
কিছুক্ষণ পর আসমা বেগম ফিসফিস করে বললেন,
"তনুজা?
সাদ ব্যাকুল হয়ে উঠলো
"হ্যাঁ হ্যাঁ মা তনুজা। ওকে,ওকে আমি অনেক অনেক ভালোবাসি মা। ওকে ছাড়া আমি কিছুই ভাবতে পারছি না। মা, তুমি ওকে আমার করে দাও আমার খুব কষ্ট হচ্ছে"
আসমা বেগম বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন
"তনুজাকে তুই ভালোবাসিস?এই কথা আগে কেন বললি না তুই?
সাদ মাথা নিচু করে চুপ করে রইলো।আগে কীভাবে বলতো?সে তো তনুজাকেই কিছু বলতে পারেনি।
আর তার মা-ও কখনো তাকে কিছু বলার সুযোগ দেননি।
আসমা বেগম ভাঙা গলায় বললেন
"তনুজাকে তো আমি কখনো ওই নজরে দেখিনি সাদ। ওকে আর রাহাকে নিজের মেয়ের মতোই দেখে এসেছি সবসময়। আর তুই বলছিস"
সাদ মায়ের হাত শক্ত করে ধরে বললো,
"মা মেয়ে মনে করেই তো অনেকে ছেলের বউ বানিয়ে আনে না মা?প্লিজ মা"
কথাটা শেষ হতেই আসমা বেগমের হঠাৎ শ্বাসপ্রশ্বাস ভারী হয়ে এলো। তিনি বড় বড় করে শ্বাস নিতে লাগলেন।
সাদের মুখ মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল।সে কী করে ফেললো!
আসমা বেগমের হাঁপানির সমস্যা ছিল অতিরিক্ত টেনশন বা প্যানিক হলেই তার শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়
সাদ আতঙ্কে মাকে জড়িয়ে ধরলো
"মা, মা কী হয়েছে?দেখো আমার দিকে তাকাও আমি এক মিনিট।তুমি বসো,আমি তোমার ইনহেলার নিয়ে আসছি এক মিনিট
সাদ তাড়াতাড়ি মাকে বিছানায় শুইয়ে দিল।দরজার বাইরে বের হতেই তার কাকিকে দেখতে পেল
হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,
"কাকি!তাড়াতাড়ি আম্মুর কাছে যান
মুহূর্তের মধ্যেই রুম ভরে গেল মানুষে রুবি বেগম আসমা বেগমের মাথাটা নিজের উরুর ওপর নিয়ে আস্তে আস্তে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন পায়ের কাছে বসে আছেন সাদের কাকি আর মামিরা
আর রুমের এক কোণায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে সাদ
তনুজা দ্রুত আসমা বেগমের প্রেসার মাপলো মেশিনের দিকে তাকিয়ে কপাল কুঁচকে বললো
"আন্টির প্রেসার অনেক হাই হয়েছে উনাকে এখন একদম টেনশন দেওয়া যাবে না। আপাতত বিশ্রাম দরকার।
ঘরে উপস্থিত সবাই চিন্তায় পড়ে গেলেন। সাদের কাকা বললেন
"কয়েকদিন ধরে অনেক কাজ করছেন। ঠিকমতো ঘুমও হয়নি বোধহয় তাই এমন হয়েছে।
কিন্তু সাদের মামা বলে উঠলেন
"কিন্তু আপার যে শ্বাসকষ্ট উঠলো ওইটা তো এমনি এমনি উঠে না কখনো খুব প্যানিক করলে চিন্তা করলে হয়
সাদ শুকনো একটা ঢোক গিললো
তার জন্যই
তার জন্যই তো আজ তার মায়ের এই অবস্থা
সাদের কাকি আর মামিরা মাঝখান থেকে বললেন
"এগুলো তো চিন্তাই ছেলের বিয়ে সব এক হাতে সামলানো কম ব্যাপার নাকি ভাইজান এর জন্য নিশ্চয়ই মন খারাপ করেছিলো তাই হয়তো এমন হয়েছে।এখন ঘরটা খালি করুন আপনারা আপাকে একটু রেস্ট নিতে দিন। পরে যা হওয়ার হবে"
সাদের কাকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন
"আর কিছুই হবে না আজকে আপার থেকে বড় আর কী?
এরপর তিনি নিজে গিয়ে জুমানার পরিবারের কাছে ক্ষমা চাইলেন আসমা বেগম অসুস্থ হয়ে পড়েছেন,তাই আজকের হলুদের অনুষ্ঠান আর করা সম্ভব নয়।
জুমানার পরিবারের মানুষজনও চিন্তিত হয়ে পড়েছেন।
এ অবস্থায় অনুষ্ঠান চালিয়ে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
তাই তারাও সমঝোতা করে বিদায় নিলেন।
কিন্তু তখনও জুমানা এসে উপস্থিত ছিল না। এই বিষয় টা কেউ খেয়াল ও করলো না।
সাদ তার মায়ের বিছানার পাশেই চুপচাপ বসে আছে।
তনুজার অভিজ্ঞতা থেকে সে প্রেসারের ওষুধের সঙ্গে হালকা ঘুমের ওষুধও দিয়েছে ওষুধের প্রভাবে আসমা বেগম এখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
সাদ ধীরে ধীরে মায়ের হাতটা নিজের দু'হাতের মুঠোয় নিল। কাঁপতে থাকা ঠোঁট জোড়া খুলে ফিসফিস করে বললো
"আমি আর তোমাকে কষ্ট দিবো না আম্মু সরি
কথাটা বলেই মায়ের হাতের পিঠে আলতো করে চুমু খেল।তারপর ধীরে ধীরে উঠে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল
নিজের রুমের বারান্দায় এসে দাঁড়ালো সাদ।দূরের কালো আকাশটার দিকে নির্বাক চোখে তাকিয়ে রইলো চারপাশটা অদ্ভুত নীরব
ভাঙা,অসহায় গলায় আস্তে আস্তে গেয়ে উঠলো
"কি থেকে হয়ে যাবো আমি
যদি তোমায় না পাই
একটু খানি মায়া তোমার
আমায় দিও গো ঠাঁই
তুমি আমার শেষ ঠিকানা
যেন তোমাকেই পাই
লাইনগুলো বলেই ফোনটা অন করলো।গ্যালারি খুলে তনুজার একটা ছবি বের করলো হাসোজ্জ্বল একটা ছবি। অনেক আগের
একদিন হামজা,রাহা,তনুজা আর সাদ একসাথে ঘুরতে বের হয়েছিল।সেদিন লুকিয়ে লুকিয়েই ছবিটা তুলেছিল সে
সাদ চোখ দুটো বন্ধ করে ফোনটা বুকের বাঁ পাশে চেপে ধরলো। অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে তার
সে কিছুই করতে পারলো না এটাই বুঝি ছিল তার শেষ চেষ্টা
হঠাৎ ফোনে শব্দ হলো কয়েকটা মেসেজ একসাথে ঢুকে পড়লো ফোনে কয়েকদিন পর ফোনটা অন করায় একসাথে অনেক নোটিফিকেশন আসতে শুরু করেছে।
সেগুলোর মাঝেই সাদের চোখ আটকে গেল। এক ঘণ্টা আগে একটা নতুন মেসেজ এসেছে।
মেসেজ না বরং একটা ভিডিও। সাদ বারান্দার মেঝেতেই বসে পড়লো। ইনবক্সে ঢুকে ভিডিওটা প্লে করলো।
কয়েকটা দৃশ্য দেখতেই
রাগে ফোনটা ছুঁড়ে মারলো সে
আজ রাহা আর তনুজা একসাথেই শুয়েছে
কাল সেই অবয়বটা দেখার পর থেকে নিজের ঘরে একা থাকতে ইচ্ছে করছে না তনুজার রাহা তনুজার দিকে তাকিয়ে বললো
"আসমা আন্টির জন্য খুব খারাপ লাগছে রে আঙ্কেলকে সে এখনও মনে করে"
তনুজা মন খারাপ করে বললো
"হুম ভালোবাসা কী অদ্ভুত জিনিস তাই না রাহা?
"হ্যাঁ রে ভালোবাসা ভয়ঙ্কর জিনিস আঙ্কেলের দেখা পায় না কথা বলতে পারে না,তাও আন্টি এখনও তাকে মনে করেন।
"হুম আমারও সাদ ভাইয়েরও নিশ্চয়ই খুব খারাপ লাগছে
কিছুক্ষণ চুপ থেকে তনুজা আবার বললো
"তুই কি খেয়াল করেছিস আজকে জুমানা আসেনি প্রোগ্রামে?
রাহা মুখ বাঁকিয়ে বললো
"হ্যাঁ রে,আমিও তোকে বলবো ভাবছিলাম। শালি এমন একটা সিচুয়েশনে ও আসলো না!কোন দেশে গিয়েছে সেজছে যে এত সময় লাগে?
তনুজা ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেললো
"কি জানি ধুর,বাদ দে ঘুমা"
"হুম ওকে গুড নাইট
দু'জনেই চুপ হয়ে গেল কিন্তু রাহা ঘুমায়নি
সে এক চোখ খুলে তনুজার দিকে তাকিয়ে রইলো
দেখলো
তনুজা কী করছে
রাহা প্রায় ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করলো তনুজার ঘুমানোর অবশেষে
তনুজার ভারী নিশ্বাসে নিশ্চিত হলো সে ঘুমিয়ে পড়েছে
রাহা আস্তে করে মাথার কাছ থেকে নিজের ফোনটা তুলে নিল তারপর নিঃশব্দে রুম থেকে বের হয়ে পড়লো
চলবে!
পর্ব সংখ্যা —৩৪
অচেনা প্রনয়ের চিরকুট লেখিকা— তাসনিয়া জাহান