ফন্ট সাইজ:
থিম:
অচেনা প্রনয়ের চিরকুট

৩৮তম পর্ব

লেখক: তাসনিয়া জাহান

অচেনা প্রনয়ের চিরকুট

লেখিকা— তাসনিয়া জাহান
পর্ব সংখ্যা—৩৮
সাল ১৯৯৫ 
পুরোনো জমিদারবাড়িটা তখন দুপুরের নরম রোদে নিস্তব্ধ হয়ে আছে। বিশাল বাড়িটার চারপাশে ঘন সবুজ গাছপালা, পুরোনো আম-কাঁঠালের ছায়া আর সামনের পুকুরের পানিতে রোদের ঝিলিক। লম্বা বারান্দার কাঠের খুঁটি আর কারুকার্য করা পুরোনো দরজা-জানালাগুলো বাড়িটাকে এখনও সেই জমিদারি আমলের গাম্ভীর্য ধরে রেখেছে। চারপাশ এতটাই শান্ত যে দূরে পাখির ডাক আর পাতার মৃদু শব্দ ছাড়া তেমন কোনো আওয়াজ নেই।
 
এটার মধ্যে শুধু একটা ঘরের সামনেই সব জড়ো হয়ে আছে। ঘরটার ভেতর অস্বাভাবিক নীরবতা।
সেই নীরবতার মাঝেই মেঝেতে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে এক যুবক। বয়স তেইশ কি চব্বিশ হবে। উঠতি বয়সের ছেলেটার চুলগুলো এলোমেলো করে রাখা। পরনে সাদা শার্ট আর নীল রঙের প্যান্ট। গায়ের রং খুব একটা ফর্সাও নয়, আবার চাপাও নয়।
মাথার একপাশ বেয়ে গড়িয়ে পড়া রক্ত শুকিয়ে শক্ত হয়ে লেগে আছে কপালের পাশে। শরীরটা নিস্তেজ। জ্ঞান নেই।
আর ঘরের বাইরে একটার পর একটা জোরে আঘাত পড়েই চলেছে দরজায়। সেই কখন থেকে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিটির তো কোনো হুঁশই নেই। দরজা খুলবে কে?
বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর মধ্যে অস্থির হয়ে ছুটে বেড়াচ্ছেন এই বাড়ির কর্তা আজিজুল মির্জা।
পুরোনো জমিদার বাড়িটা আজ যেন মানুষের কোলাহলে ভারী হয়ে উঠেছে। অথচ এই মুহূর্তে সেই বিশাল বাড়ির একটিমাত্র ঘরকে ঘিরেই সবার দুশ্চিন্তা।
আজিজুল মির্জার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন তার স্ত্রী ফাতেমা খাতুন। ছেলের কথা ভাবতে ভাবতে কান্নায় তার কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছে।
"আজমল আব্বা ও আব্বা দরজাটা খোলো! আব্বা, শোনো আম্মার কথাটা"
কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়া নেই। বাড়ির কাজের লোকেরা একপর্যায়ে দরজা ভাঙার চেষ্টা শুরু করল।
অবশেষে প্রচণ্ড আঘাতে দরজাটা খুলে গেল। আর দরজা খুলতেই। ফাতেমা খাতুনের বুকটা যেন ধক করে উঠল।
ঘরের ভেতর পড়ে থাকা ছেলেকে দেখে তিনি আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। তিনি ছেলের দিকে ছুটে গেলেন।
আজিজুল মির্জাও এক মুহূর্ত দেরি না করে ছেলের কাছে গিয়ে বসে পড়লেন। আজমলের মাথার একপাশ রক্তে ভেসে গেছে। কতটা রক্ত বেরিয়েছে, দেখে বোঝার উপায় নেই।
"আজমল!
আজিজুল মির্জার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
কাজের লোকদের সাহায্যে কোনোভাবে আজমলকে তুলে বিছানায় শোয়ানো হলো। ঠিক তখনই বাইরে থেকে কারও দৌড়ে আসার শব্দ শোনা গেল। পরক্ষণেই ঘরে ছুটে ঢুকল আরোশ। ভাইকে এই অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে তার মুখের রং মুহূর্তেই বদলে গেল।
সে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। এমন কিছু একটা হবে জানা ছিলো।
আজ সকালের ঘটনাটা যেন একের পর এক সবকিছু এলোমেলো করে দিয়েছে। আয়শা।
এই মেয়েটার সঙ্গেই আজমলের দীর্ঘদিনের ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল। গভীর ভালোবাসা। কিন্তু সেই সম্পর্কের আজ ইতি টেনেছে আয়শার বাবা-মা। গ্রামে গিয়ে মেয়েটাকে জোর করে বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন তারা।
আরশ গত তিন-চার দিন ধরেই বিষয়টা নিয়ে খোঁজখবর করছিল ভাইয়ের সাথে। কিন্তু কোনোভাবেই সঠিক খবর পাচ্ছিল না। আজ সকালে আরশের এক পরিচিত মানুষ এসে তাকে খবরটা দেয়। আয়শার বিয়ে হয়ে গেছে।
খবরটা শোনার পর থেকেই আজমল যেন নিজের মধ্যে ছিল না।
বাড়িতে ফিরে এসে রাগে-দুঃখে ঘরের জিনিসপত্র ভাঙচুর করতে শুরু করে। কাউকে কিছু বলতে দেয়নি। কাউকে নিজের কাছে আসতেও দেয়নি।
আর শেষ পর্যন্ত নিজেকেও আঘাত করেছে। তার ফলেই এখন এই অবস্থা। ডাক্তারকে তড়িঘড়ি করে বাড়িতে নিয়ে আসা হলো।
ডাক্তার আজমলের মাথার ক্ষত পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ করে দিলেন। তারপর তাকে ঘুমের ওষুধ দিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রামে রাখার পরামর্শ দিয়ে চলে গেলেন।
কিন্তু ছেলের এই অবস্থা দেখে আজিজুল মির্জার বুকটা যেন পাথর হয়ে গেল। সারা বেলা হতে রাতটা তিনি কোনোভাবে পার করলেন। চোখে ঘুম নেই। মনে শান্তি নেই। ছেলেটাকে কীভাবে এই অবস্থা থেকে বের করবেন?
পরের দিনও আজমল ঠিকমতো কিছু খেল না। কারও সঙ্গে কথা বলল না। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলেও কোনো উত্তর দিল না। নিজের ঘরেই চুপচাপ পড়ে রইল।
ছেলের এই অবস্থা আজিজুল মির্জা আর সহ্য করতে পারছিলেন না। তিনি বুঝতে পারছিলেন,শুধু সময় দিলেই হয়তো সব ঠিক হবে না। কিছু একটা তাকে করতেই হবে।
সেটাই যেন তিনি বুঝে উঠতে পারছিলেন না। অনেকক্ষণ ছেলের ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে অবশেষে তিনি ধীরে ধীরে সরে এলেন।
ফাতেমা খাতুনকে সংক্ষেপে কিছু একটা বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লেন। 
আয়শা মেয়েটা তাদের পরিবারের সবারই পছন্দ ছিলে। তাদের ইচ্ছে ছিলো সময় মতো তারা মেয়েটাকে ঘরের বউ করেও আনবেন। কিন্তু কি থেকে কি হলো। বুঝে উঠার আগেই সব নিমিষেই শেষ হয়ে গেলো। ছেলেটা তার উপর রেগে আছে সে বুঝতে পারছে হয়তো দোষ টা তারই। আজমল বেশ কয়েকদিন ধরেই বলছিল।তাকে আয়শার বাড়ি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যেতে। কিন্তু কোনো আয়োজন ছাড়াই কি সব মুহূর্তেই করা যায় নাকি?
নিস্তব্ধ বড় বাড়িটার মধ্যে চারপাশে শুধু দু'জন মানুষের কণ্ঠই শোনা যাচ্ছে।
"আমি বললাম তো, আমি এই বিয়ে কোনো মতেই করবো না! আব্বা আপনি আমার ওপর এভাবে জোর করতে পারেন না!
একজন ষোলো বছরের রমণী চোখে অশ্রু নিয়ে মেঝেতে বসে নিজের পিতার কাছে মিনতি করছে।
পরনে নীল রঙের শাড়ি। চোখেমুখে কান্নার ছাপ। রাগে, জেদে আর কষ্টে কাঁপছে তার কণ্ঠ।
সে না চাইতেও বাবার কথাটা মেনে না নেওয়ার জন্য শেষবারের মতো চেষ্টা করে যাচ্ছে।
অশ্রুসিক্ত সেই মেয়েটি তোমা।
আর তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন আশরাফ চৌধুরী।
রাগে হুংকার ছেড়ে নিজের শেষ সিদ্ধান্ত মেয়ের ওপর চাপিয়ে দিয়ে তিনি বললেন।
"আমি কথা দিয়ে ফেলেছি তমা। আর সেই কথা কোনোভাবেই আমি ভঙ্গ করতে পারবো না। তোমাকে যা করতে বলা হয়েছে, তাই করবে।
"আব্বা
তমার কণ্ঠ কেঁপে উঠলো।
আমি আপনার সব কথা শুনবো, এই বিয়েটাও করে নেবো। কিন্তু আর কয়েকটা বছর যাক, আব্বা। আমার স্বপ্নটা ভেঙে দেবেন না।
আশরাফ চৌধুরী কঠিন মুখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন।
"মেয়ে মানুষের সাথে এইসব যায় না এত পড়ালেখা করেও বা কও হবে। তুমি বিয়েটা করে নাও, তমা। ওরা যদি বিয়ের পর তোমাকে পড়াতে চায়,তাহলে আমার কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু আমি আমার বন্ধুকে দেওয়া কথা ফেলতে পারবো না।
কথাটা বলেই আশরাফ চৌধুরী ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন। যেতে যেতে নিজের স্ত্রীকে বলে গেলেন
"জেসমিন,ওকে বোঝাও। মানুষের সামনে যেন আমার মাথা নিচু না হয়।
দরজা বন্ধ হয়ে গেল। মেঝেতে পড়ে রইলো তমা।
কিশোরী মেয়েটার মনের মধ্যে তখন একটাই স্বপ্ন সে ডাক্তার হবে। পড়াশোনায় সে বেশ ভালো। আর এই স্বপ্ন দেখার অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন তারই স্কুলের এক শিক্ষিকা।
সেই কথাটা থেকেই স্বপ্ন বুনতে শুরু করেছিল তমা।
কিন্তু আজ সেই স্বপ্নটাই যেন চোখের সামনে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।
তোমার পাশে এসে বসলো তার ছোট বোন রুবি। সে তোমার থেকে মাত্র এক বছরের ছোট। কিন্তু বোনের প্রতি তার টান এতটাই বেশি যে,তোমাকে ছাড়া যেন সে কিছুই বুঝতে পারে না।
রুবি তমার বাহুতে হাত রেখে শান্ত করার চেষ্টা করলো।
"আপা,তুমি কেঁদো না। আব্বা তো এমনই। নিজের মান-সম্মানের জন্য উনি সবকিছু করতে পারেন।
তোমা চোখের পানি মুছতে মুছতে বললো।
"তাই বলে নিজের মেয়েকেও এভাবে সওদা করে আসবেন?যার না তার ছেলের সঙ্গে?
রুবি একটু থেমে বললো
যার না তার না,আপা। তোমার বিয়ে আব্বার বন্ধু আজিজুল কাকার ছেলে আজমল ভাইয়ের সঙ্গে হবে।
তমা কান্না থামিয়ে তাকালো বোনের দিকে। তারপর চোখ চলে গেল মায়ের দিকে।
জেসমিন বানু এতক্ষণ শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ চেপে নীরবে কাঁদছিলেন। তমা হুরমুড় করে মায়ের কাছে গিয়ে বসলো।
"আম্মা,সত্যি বলেন! রুবি যা বলেছে,সেটা কি সত্যি? আজমল ভাইয়ের সঙ্গে আমার বিয়ে দেবে আব্বা?
এক মুহূর্ত থেমে সে কাঁদতে কাঁদতে বললো
"কখনোই না,আম্মা! আমি এই বিয়ে করবো না। আমি মরে যাবো,তাও না!
"তমা!
জেসমিন বানু ধমক দিলেন মেয়েকে।
মা,আমি তোর আব্বার সিদ্ধান্তের উপরে কিছু বলতে পারবো না,তা তুই জানিস। আজমল তো খুব ভালো ছেলে। ওর সঙ্গে বিয়ে হতে কী সমস্যা বল?আজ না হয় কাল তোকে বিয়ে দিতেই হতো। ওরা যদি তোকে ডাক্তারি পড়তে দেয়,তাহলে তুই পড়িস। না হলে.
জেসমিন বানু বাকিটা আর বললেন না।
তমা মায়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো
"আম্মা,আজমল ভাই কি জানেন আমার সঙ্গে ওনার বিয়ে?
জেসমিন বানু মাথা নাড়লেন।
আমি তো জানি না সেই কথা। কাল সন্ধ্যায় যখন তোর আজিজুল কাকা এসেছিল,তখন বাগানে বসে তারা এই সিদ্ধান্ত নেয়। আমি চা দিতে গিয়ে শুনেছি। বাকি তোর আব্বা আমাকে তেমন কিছু বলেনি।
তমা কান্না থামিয়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো।
চোখ মুছে দৃঢ় গলায় বললো
"এই বিয়ে হবে না। নিশ্চিত থাকো তোমরা।
জেসমিন বানু মেয়ের কথার মানে পুরোপুরি বুঝতে পারলেন না।
তবে আর কোনো কথা বাড়ালেন না।
---
দেখতে দেখতে বিয়ের দিন চলে এলো।
ঘরের মধ্যে পায়চারি করছে তমা।
বধূর সাজে বাঙালিয়ান লাল বেনারসি পরে আছে। অথচ মুখে একটুও আনন্দ নেই।
বারবার নিজের বোনের দিকে তাকিয়ে বলছে
 এই বিয়ে কীভাবে হচ্ছে,রুবি? তুই যা তো আজমল ভাইয়ের কাছে। ওনি নিশ্চয়ই জানেন না এইসব।
রুবি অসহায় চোখে বোনের দিকে তাকালো।
কেন আপা?আমাকে এটা তো বলো,তুমি সেদিনও বললে এই বিয়ে হবে না। কাল থেকে তুমি এমন পাগলামি করছো কেন?
তমা কাঁপা গলায় বললো
কারণ আজমল ভাইয়ের পছন্দের মানুষ আছে। আমি দেখেছি সেই মেয়ের জন্য তাকে কীভাবে পাগলামি করতে। সেই মানুষকে ছেড়ে আজমল ভাই আমাকে কীভাবে বিয়ে করবেন?
রুবি হতভম্ব হয়ে গেল।
তাহলে উনি বিয়েতে না করলেন না কেন?
"আমার কথাও তো তাই। আমি তো এই আশাতেই রয়েছি যে,ওনি নিজে থেকেই না করে দিবেন ভেবে।ওনার ভালোবাসার মানুষ থাকা অবস্থায় উনি আমাকে বিয়ে করতে আসবেন না। কিন্তু কাল যখন তাদের বাসা থেকে হলুদ আর বিয়ের সামগ্রী এলো,তখন তো আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না।
রুবি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো
তাহলে আপা, তুমি আজমল ভাইয়েকে কীভাবে বিয়ে করবে,যদি তার মনে অন্য কেউ থেকেই থাকে?তুমি কও পালাবে আপা?
তমার চোখ আবার ভিজে উঠলো।
আমি কিছুই জানি না। কী করবো আমি? ঘরের বাইরে পাঁচজন মানুষ দাঁড় করানো। বাড়ির পেছনে, সামনে ডানে,বামে সব জায়গায় পাহারাদার দাঁড় করানো। আমি পালাতেও পারবো না। তার করার কিছুই নেই।
ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়লো। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলেন আশরাফ চৌধুরী। সঙ্গে জেসমিন বানু,এবং কাজী। আরও কয়েকজন মানুষ যদের মধ্যে ফাতেমা খাতুন আর তার স্বামী আজিজুল মির্জাও আছেন।
তমার বুকটা ধক করে উঠলো। সে কি সত্যিই অন্য কারও ভালোবাসার মানুষকে নিজের স্বামী হিসেবে মেনে নেবে?
আশরাফ চৌধুরী কঠিন চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন। আজিজুল মির্জা এগিয়ে এসে তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
"কাঁদে না,বোকা মেয়ে। আমি আছি তো। এক বাবার ঘর ছেড়ে আরেক বাবার ঘরে উঠবে বলে মন খারাপ করছিস?তোর পড়ালেখার সমস্ত দায়িত্ব আমি নিলাম। কিছুই আটকে থাকবে না। আমি কথা দিচ্ছি।
তমা তবুও স্বস্তি পেলো না।
তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন খালি হয়ে আছে।
কাজী বিয়ে পড়ানো শুরু করলেন।
তিনি বললেন
মোছাম্মৎ তমা আশরাফ চৌধুরীর। পিতা,আশরাফ চৌধুরী। আপনার বিবাহ আজিজুল মির্জার পুত্র আজমল মির্জার সঙ্গে,মোহরানা ধার্য করা হয়েছে বিশ হাজার টাকা। আপনি কি এই বিবাহে রাজি আছেন?”
তমা কোনো উত্তর দিলো না।
তার ডান হাত শক্ত করে ধরে আছে রুবি।
আশরাফ চৌধুরী গলা খাঁকারি দিলপন। মেয়েকে বুঝিয়ে দিলেন,তাকে কবুল বলতে হবে।
কাজী আবারও জিজ্ঞেস করলেন।
"আপনি কি আজমল মির্জা কে স্বামী হিসেবে কবুল করলেন?
কয়েকবার জিজ্ঞেস করার পরও তোমার মুখ থেকে কোনো উত্তর এলো না।
ঠিক তখন ফাতেমা খাতুন। তমার পাশে এসে বসলেন।ছোট মেয়ে বিয়ে নামক জিনিস টা তো প্রথম তার ভয় পাচ্ছে বুঝে সে নিজের মতো করে বুঝালেন।
অবশেষে তমা চোখের পানি মুছে খুব ক্ষীণ স্বরে বললো
কাজী আবারো একই লাইন আওড়াতে তমা বলল
“জি, রাজি আছি।
“আপনি কি আজমল মির্জাকে স্বামী হিসেবে কবুল করলেন?
“কবুল করলাম।”
“কবুল করলেন?
“জি, কবুল করলাম।
“কবুল করলেন?
“জি, কবুল করলাম।
চারপাশ থেকে একসঙ্গে ভেসে এলো
আলহামদুলিল্লাহ।
 
এরপর বর কে সেই একি ভাবে জিজ্ঞেস করলেন।
“আজমল মির্জা, পিতা আজিজুল মির্জা। মোহরানা বিশ হাজার টাকা ধার্য করে আপনি কি তমা আশরাফ চৌধুরীকে স্ত্রী হিসেবে কবুল করলেন?
আজমল সময় নিলো না সে বলল
“জি, কবুল করলাম।
কাজী আবারো বললেন
“কবুল করলেন?
“জি, কবুল করলাম।
“কবুল করলেন?
“জি, কবুল করলাম।
“আলহামদুলিল্লাহ। সাক্ষীগণের উপস্থিতিতে তমা আশরাফ চৌধুরী ও আজমল মির্জার বিবাহ সম্পন্ন হলো।
চারপাশে মিষ্টি বিতরণ শুরু হলো।
কিন্তু সেই মিষ্টির ভিড়ের মাঝেও ষোলো বছরের তমার চোখের পানি থামলো না।
তার স্বপ্নটা আজ থেকে অন্য এক জীবনের হাতে তুলে দেওয়া হলো। আজমল নিজের ভালোবাসা না পেয়ে ব্যর্থ হলো এবং না চাইতেও অন্য একজন মানুষ কে নিজের জীবনের অংশ বানিয়ে নিলো।
★
একটা নীরব ঘরে বসে আছে তমা। তার চেহারার ওপরে লম্বা করে ঘুমটা টানা। গায়ে জড়িয়ে আছে সোনার অলংকার। জমিদার বাড়ির বউ বলে কথা কোনো কমতি নেই। লাল বেনারসিতে তার ফর্সা ত্বকটা যেন চাঁদের মতো ফুটে আছে।কপালে লাল-সাদা চন্দনের ফোঁটার নকশা। তার চোখজোড়া টান করে কালো কাজল টানা। দেখতে বেশ সুন্দর লাগছে তাকে। চেহারায় কী মায়া,কী কোমলতা!
ঘরটায় আলো কম। চারপাশ ফুল দিয়ে সাজানো। বিছানার মধ্যখানে শাড়িটা সামান্য গোল করে বসে আছে তমা। অপেক্ষার প্রহর গুনছে,অতৃপ্ত আগ্রহ,ভয় আর দ্বিধা মিলেমিশে আছে তার মনে।
কারণ,সে যার নামে নিজেকে লিখে দিয়েছে,সে তাকে এখানে দেখে কী প্রতিক্রিয়া দেখাবে? কারন বিয়ে পড়া শেষ করে সে বের হয়ে পরেছিলো আসার সময় তাদের সাথে আসেনি এই পর্যন্ত আর তাদের দেখা হয়নি। কী-ই বা হতে যাচ্ছে,সে কিছুই জানে না।
আজমল ভাইয়ের সঙ্গে সে তেমন কোনোদিন কথাই বলেনি। আসা-যাওয়ার পথে যতটুকু প্রয়োজন হয়েছে, শুধু ততটুকুই কথা হয়েছে।
ভাবনার মাঝেই দরজার বাইরে শোরগোল শোনা গেল।
তমা ঠিকঠাকভাবে বসে গেল। বুকটা ধড়ফড় করছে। কান্নাও আসছে। ভয় লাগছে তার।
বেশ কিছুক্ষণ পর দরজাটা আস্তে করে খুলে গেল।
তমা বড় ঘোমটার নিচে মাথা নিচু করে বসে আছে।
দরজা থেকে পায়ের শব্দ ভেসে আসছে। ধীরে ধীরে সেই শব্দ এগিয়ে আসছে তার দিকে।
তমার গলা শুকিয়ে কাঠ। সে খুব জোর করে সালাম দিল। তারপর আস্তে করে উঠে দাঁড়ালো।
বিছানা থেকে নামতেই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তির পা ধরে সালাম করতে চাইলে সামনের পা দুটো পেছনে সরে গেল।
তমা মাথা তুলে তাকালো। ঘোমটার জন্য তার চেহারা দেখা গেল না।
আজমল জিজ্ঞেস করলো,
"কী করছো এগুলো?এসব করার লাগবে না।বসো"
তমা দ্বিধা নিয়ে বললো
আপনার আম্মা...মানে আম্মা বলেছেন,আপনি এলেই যেন পা ধরে সালাম করি।
আজমল শান্ত গলায় বললো
"এখন তো আম্মা নেই। আর আমি গিয়ে কাউকে বলবোও না তুমি কী করেছো না করেছো
তমা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো বুকটা অস্বাভাবিকভাবে ধড়ফড় করছে তার। পাশের টেবিলে রাখা দুধের গ্লাসটা হাতে নিয়ে আজমলের সামনে বাড়িয়ে দিল।
আজমল বেশ সময় নিয়ে গ্লাসটা নিল। পুরোটা খেয়ে পাশে রেখে দিল।
তমা দাঁড়িয়েই রইলো। কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না।
সে কি আজমল ভাইকে জিজ্ঞেস করবে,তিনি কেন তার ভালোবাসার মানুষের জায়গায় তাকে বিয়ে করলেন?
আজমল নীরবতা ভেঙে হাত বাড়িয়ে একটা বাক্স দিল তমার দিকে।
"এটা আম্মা দিতে বলেছে তোমাকে"
তমা কাঁপা কাঁপা হাতে বাক্সটা নিল। তবে খুললো না।
শুনেছে,বাসর রাতে স্বামী কিছু উপহার হিসেবে দেয় তার বউকে। তাই হয়তো দিয়েছে।
কিন্তু তার তেমন কোনো ভাবান্তর হলো না। হবে কী করে?
এক তো নিজের ইচ্ছায় বিয়ে হয়নি,একপ্রকার জোর করেই হয়েছে। তার ওপর যার সঙ্গে বিয়ে হলো,সে অন্য একজনকে পছন্দ করে। কী কারণে তাকে বিয়ে করেছে, সেটাও জানা নেই।
আজমল পা বাড়িয়ে বারান্দার দিকে যেতে লাগলো।
তমা সেইভাবেই বড় ঘোমটা নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তার উপস্থিতি বুঝতে পারলো আজমল কোথায় যাচ্ছে।
সে কী বলবে বুঝতে পারছে না।
তমা যথেষ্ট কঠিন মানুষ। সাথে জেদিও তাকে কেউ সহজে ভয় দেখাতে পারে না, আর না কান্না করাতে পারে। কিন্তু এই যাত্রায় তা সম্ভব হয়েছে।
হবেই বা না কেন?
একটা বিয়ে নিয়ে মানুষের কতই না আশা থাকে। তার বেলায় কিছুই হলো না। উল্টো বিয়ে নামের শব্দটাই তার জীবনে হয়তো সবকিছু বদলে দিল।
যাকে স্বামী বলে লিখিতভাবে নিজেকে তার করে দিল, সেই মানুষটা একবার ঘোমটাটা উঠিয়ে নিজের নতুন বউয়ের চেহারাটাও দেখলো না পর্যন্ত।
তমার ভেতরটা হু হু করে উঠছে।
সে টিপটিপ পায়ে এগিয়ে গিয়ে বারান্দার দরজার সামনে দাঁড়ালো।
খুব সাহস সঞ্চয় করে আজমলকে জিজ্ঞেস করলো,
"আপনি কি জানেন আমি কে?
আজমল বিড়ির ধোঁয়া উড়িয়ে যাচ্ছিল। তমার কথায় সে ঘুরে তাকালো না। বরং রাতের অন্ধকারের দিকে তাকিয়েই বললো,
"জানবো না কেন?তুমি আশরাফ কাকার বড় মেয়ে তমা।
তমা নড়েচড়ে একটু দাঁড়ালো।
কিছুক্ষণ দ্বিধা করে বললো,
"কিছু মনে না করলে একটা কথা জিজ্ঞেস করতাম। করবো?
"বলে ফেলো। এত দ্বিধার কিছু নেই। আমি বাঘ ও না ভাল্লুকও না যে তোমার কথা শুনামাত্র তোমাকে খেয়ে ফেলবো।
তমা ঢোক গিললো। তারপর বললো,
"আপনি তো অন্য কাউকে পছন্দ করতেন। তার জায়গায় আমাকে...
আজমল এবার তমার দিকে তাকালো।
"কেন তোমাকে বিয়ে করলাম জানতে চাও?
আজমল খানিকটা গভীর স্বরে কথাটা বললো।
তমার মনে হলো,সে হয়তো ভুল কিছু বলে ফেলেছে।
আজমল সিগারেটটা ছুড়ে ফেলে পিছু ঘুরে তমার মুখোমুখি হলো।
লম্বা ঘোমটার আড়ালে ছোটখাটো একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে।
আজমল না চাইলেও চোখের সামনে ভেসে উঠলো তার প্রিয়শী আয়শার মুখ।
বুকটা চিনচিন করে উঠলো। এই জায়গায় তো তার আয়শার থাকার কথা ছিল। আজমলের না চাইলেও মন-মেজাজ দুটোই খারাপ হয়ে গেল।
সে তমাকে ধমকের সুরে বললো,
"আমার ব্যাপারে মাথা না ঘামালেই খুশি হব। এখন বরং গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। অনেক রাত হয়েছে।
তমা তাড়াতাড়ি বললো
"আ... আপনি যাবেন না?
আজমল থেমে গেল। তারপর কঠিন গলায় বললো
"তুমি তোমারটা বুঝে নাও তমা,দুঃখিত। কিন্তু তুমি কোনোভাবেই ভেবো না। তোমার-আমার মধ্যে কখনো স্বামী-স্ত্রীর একটা পুরোপুরি স্বাভাবিক সম্পর্ক হবে। এই আশায় ঘুম নষ্ট করো না। না পারতেই আমি বিয়েটা করেছি। আমি তোমাকে বা এই বিয়ে কোনোটাই মেনে পারবো না। যাও এখান থেকে।
তমার মাথায় মুহূর্তেই রক্ত চড়ে বসলো। সে এবার ঘোমটা তুলে আজমলের দিকে তাকালো। ঘোমটা উঠা মাএই উমুক্ত হলো তার চেহারাটা মেয়েলি কোনো আলাদা সাজের প্রলেপ নেই তার চেহারায়। চোখের কাজলে ফর্সা চেহারায় এমনিতেই একটা অভিজাত্য ফুটে উঠেছে। চেহারাটা বেশ মোহনীয় লাগলেও আজমলের সেদিকে খেয়াল করার মতো মানসিকতা নেই।
তমা রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললো
"আপনি যেহেতু স্বামী-স্ত্রীর কোনো বালাইই মানবেন না, তাহলে কোন সাহসে আপনি আমার জীবনটা নরক করতে নেমেছেন?
"তমা...
" চুপ করুন!আপনার জন্য, শুধু মাত্র আপনার জন্য আজকে আমার জীবনটা এখানে এসে দাঁড়িয়েছে। আপনি যেহেতু কিছুই মানবেন না,তাহলে বিয়ে করেছেন কাকে দেখাতে?বলুন। জবাব দিন!
"খেলনা পেয়েছেন একটা মেয়ের জীবন, এমনিই শেষ করে বলছেন আমাকে এই আশায় ঘুম নষ্ট না করতে যে আপনার আর আমার একটা স্বাভাবিক স্বামী-স্ত্রীর সংসার হবে না?
আজমল এবার রেগে গেল।
"তমা,এখন বেশি বাড়াবাড়ি করো না।
তমা থামলো না।
"চুপ করে আমি আফত ডেকে এনেছি!তখন চুপ না থেকে যদি আব্বাকে বলতেন আপনার পছন্দের মানুষ আছে,আপনি এই বিয়ে কোনো কালেই করতে চাইবেন না। আমি শুধু আপনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম যা আপনি না করে দিবেন। এই পাড়া মহল্লায় মেয়েদের কোন কথার মূল্য নেই আমি চাইলেও আব্বাকে কিছু বলতে পারতাম না কিন্তু আপনি তো বলতে পারতেন!আপনি না করলেন না কেন?তাহলে হয়তো এই বালাই আসতোই না!
আজমলও রেগে গেল।
তুমি চাইলে চলে যেতে পারো তমা তোমাকে কেউ আটকাবে না।
শুধু এই দুই লাইনের কথা টা বলেই আর কোনো কথা না বাড়িয়ে সোজা ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
পিছনে রেখে গেলো এক অসহায় রমণীকে। সত্যি কি আজমলের কথাটা শুধু দুই লাইনের ছিলো?সে যতটা না সহজে বলে গেলো তা মানা ততটাই কঠিন। এই কেশরী বয়সের প্রপ্রথম পুরুষ সে না চাইতেও তো স্বামী হয়েছে তার। তমা মেঝেতে বসে কেঁদে ফেলল।
চলবে!!

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন