পর্ব সংখ্যা—৩৭
অচেনা প্রনয়ের চিরকুট
লেখিকা— তাসনিয়া জাহান
তুষার গলায় তোয়ালে ঝুলিয়ে,তোয়ালের এক কোণা দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে ওয়াশরুম থেকে বের হলো মাথার চুল থেকে এখনও টুপটাপ করে পানি ঝরছে শরীরের এখনো বিন্দু বিন্দু পানির অস্তিত্ব রয়েছে
বের হয়েই তার চোখ আটকে গেল বিছানার এক কোণে
সেখানে তনুজা ঘুমিয়ে আছে।বেশ অগোছালোভাবে
তবুও তাকে দেখাচ্ছে অসম্ভব মুগ্ধকর।
ঘুমের ঘোরে পাতলা কোমরটা একটু বাঁকিয়ে শুয়ে থাকার কারণে শাড়ির আঁচল খানিকটা সরে গেছে।কপালের ওপর কয়েকগাছি অবাধ্য চুল এসে পড়ে আছে। মুখটা ঘুমের শান্তিতে আরও কোমল দেখাচ্ছে।পায়ের কাছেও শাড়ি খানিকটা উঠে আছে।
তুষার একবার পুরো দৃশ্যটার দিকে তাকিয়ে বড় একটা ঢোক গিলল।তার দৃষ্টি আটকে গেল সেই ঘুমন্ত ললনার ওপর।
কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন সে নিজেই ভুলে গেল কী করছিল
তার মনোযোগে দেখার ঘটিয়ে। দরজায় শব্দ হলো
বাইর থেকে রাহার কণ্ঠ ভেসে এলো
"ভাই..ভাই
"দরজা খোলো তনু কোথায়?
তুষারের মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল মুহূর্তেই দরজার দিকে যাওয়ার আগে আরেকবার তনুজার দিকে তাকিয়ে নিল সে। তনুজা শব্দের কারণে একটু নড়েচড়ে উঠলো কিন্তু ঘুম ভাঙলো না তার। তুষার তা দেখে বিরক্ত নিয়ে বড় বড় পা ফেলে দরজার কাছে গিয়ে দরজা খুলে দিল।
দরজা খুলতেই সামনে রাহাকে দেখা গেল।
হঠাৎ দরজা খুলে যাওয়ায় সে খানিকটা ভড়কে গেল।
তবে দরজা খোলার কারণে যতটা না,তার চেয়েও বেশি ভয় পেল ভাইয়ের মুখ দেখে
সাদের বাড়িতে আজ যে রাগী চেহারা দেখেছিল,তাতে তার ভাই যে এখনও পুরোপুরি শান্ত হয়নি সেটা সে ভালোভাবেই বুঝতে পারছে
রাহা একটু নড়েচড়ে দাঁড়িলো
তুষার বিরক্ত মুখে তাকিয়ে গলার স্বর নামিয়ে বলল
"আর ইউ ম্যাট?হোয়াটস রং?কী সমস্যা?এমন আজরাইলের মতো দরজায় টোকা মারছিস কেন?ম্যানার কোথায়?
রাহা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নিচু করে ফেলল
আর ছোটবেলা থেকেই ভাইয়ের এমন কথা শোনার অভ্যাস তার আছে। তাই সে কিছু মনে করল না
"সরি ভাই"
"কী প্রবলেম?কথা আস্তে বলা যায় না?কী জন্য এসেছিস?
তুষার ফিসফিস করেই বলল
রাহাও এবার আস্তে গলায় বলল
"তনু কোথাও তো?
"আছে কী করবি ওকে দিয়ে?
"উমম..আম্মু বলছিল ও কিছু খায়নি খাওয়ার জন্য ওকে নিয়ে যেতে নিচে"
তুষার সাফ সাফ বলল
"ও ঘুমোচ্ছে উঠলে পাঠাব"
রাহা বিস্মিত চোখে তাকাল
"তনু তোমার রুম-এ?
তুষার ভ্রু কুঁচকে তাকাল
"সো ওয়াট?এমন রিয়েক্ট করার কী আছে?
"না মানে ওকে আমার সাথে দিয়ে দেও আমি ওর সাথে থাকতাম"
"নো নিড আউট"
"মানে ভাই"
"নাথিং আউট"
রাহা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল
"ওকে সরি"
বলে চলে যেতে নিতেই তুষার আবার ডাক দিল
"নেক্সট টাইম এভাবে দরজায় টোকা মারবি না। তাহলে আঙুল কেটে দেব।
"আচ্ছা,ঠিক আছে।
এক ছুটে সরে গেল রাহা।
সে মোটেই বাঘের খাঁচায় থাকতে চায় না।
তুষার দরজা বন্ধ করে আবার রুম-এর ভেতরে ঢুকল।
চোখ গেল বিছানার দিকে। তনুজা নড়েচড়ে শোয়ার কারনে। মুখের ওপর পড়ে থাকা চুলগুলো আরও এলোমেলো হয়ে পুরো মুখটাই ঢেকে দিয়েছে।
তুষার ঠোঁট বাঁকিয়ে মৃদু একটা অভিব্যক্তি দিল।
মনে মনে কিছু একটা ভেবে মাথা নিচু করে কয়েক মুহূর্ত সামান্য ঠোঁট প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে তনুজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। খানিকটা ঝুকে তার মুখের ওপর পড়ে থাকা চুলগুলো এক আঙুল দিয়ে সরিয়ে দিল। উন্মুক্ত হলো তনুজার মুখ।
তুষারের চোখ গিয়ে থামল তার ঠোঁটের ওপর।
হালকা নুড লিপস্টিক-এর প্রলেপ এখনও লেগে আছে।
তুষার ভ্রু কুঁচকাল। বুড়ো আঙুল তুলে ঠোঁটের ওপর আলতো করে ছুঁইয়ে দিল। হালকা ঘষেও লিপস্টিক এর দাগ উঠল না।
সে বিরক্ত মুখে হাত সরিয়ে নিল।
তারপর চোখ তুলে ভালো করে তনুজার মুখের দিকে তাকাল। আর একবার পুরো মানুষটার দিকে তাকাতেই তার নিঃশ্বাসটা কেমন যেন ভারী হয়ে এলো। পরপর কয়েকটা গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে তুষার সরে গেল।
তারপর লক করা ড্রয়ার-এর কাছে গিয়ে ভেতর থেকে একটা সিগারেটের প্যাকেট বের করে নিয়ে বারান্দায় চলে গেল।
প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করল। জ্বালিয়ে কয়েকটা বড় টান দিল। কিন্তু ভালো লাগছে না তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে।
সিগারেটের ধোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মাথায় আবার ভেসে উঠল সাদের সঙ্গে তনুজাকে সেই অবস্থায় দেখার দৃশ্য।
রাগে তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ চোখ পড়ল বাড়ির পাশের মাঠটার দিকে। দূরে,গাছের আড়ালে কেউ একজন বসে আছে। তুষার ভালো করে তাকাল। তার কপালে ভাঁজ পড়ল।
কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর যেন মানুষটাকে চিনতে পারল সে। তার চোখ মুহূর্তেই কঠিন হয়ে গেল।
মনে মনে বলল
"ডোন্ট ডেয়ার লুক অ্যাট হার অ্যাগেইন। ইফ ইউ হ্যাভ এনি সেন্স,কিপ ইয়োর আইজ অ্যাওয়ে ফ্রম হার”
এদিকে ঘুমের মধ্যে নড়াচড়া করতে করতে তনুজার ঘুম ভেঙে গেল। নাকে অদ্ভুত একটা গন্ধ আসছে। চোখ মেলে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল সে।
তারপর বোঝার চেষ্টা করল সে আসলে কোথায় চারপাশে তাকিয়ে বুঝতে পারল। এটা তো তুষারের রুম!
সে অবাক হয়ে আরও একবার চারপাশে তাকাল।
রুম-এ তুষার নেই।
মাথায় হাত দিয়ে ভাবতে লাগল।
আমি কখন ঘুমিয়ে পড়লাম?তবে পুরো ঘরটা অদ্ভুত একটা গন্ধে ভরে আছে।
তনুজা দুই-তিনবার শুকনো কাশল।
তারপর শাড়ির আঁচল দিয়ে নাকটা চেপে ধরল।
গন্ধটা কোথা থেকে আসছে বোঝার জন্য বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল।
ধীরে ধীরে বারান্দার দিকে এগিয়ে যেতেই তার চোখ আটকে গেল। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে তুষার।
উর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত,কোমরে এখনও সাদা তোয়ালে জড়ানো। এক হাত কোমরে রাখা,অন্য হাতে জ্বলন্ত সিগারেটে।
তনুজা কপাল কুঁচকাল।
"আপনি সিগারেট খান?
তুষার ঝটকা মেরে পিছনে তার দিকে তাকাল।
তনুজাকে দেখেই সঙ্গে সঙ্গে সিগারেট-টা হাত থেকে ফেলে দিল।
খালি পায়েই সেটার ওপর পা দিয়ে নিভিয়ে দিল।
তনুজা সেটা দেখে বিস্মিত চোখে তাকিয়ে বলল,
"আরে আরে!কী করছেন?
তনুজা দ্রুত সামনে এগিয়ে এসে তুষারের পায়ের কাছে বসে পড়ল।
"দেখি কী করেছেন?পাগল আপনি?"
তুষার সঙ্গে সঙ্গে দুই কদম পিছিয়ে গেল।
মুখ হা করে সিগারেট এর ধুয়া সরানোর চেষ্টা করলো
তারপর তনুজার মুখোমুখি হয়ে নিচু হয়ে বসল।
দুজনের চোখাচোখি হলো। কয়েক সেকেন্ড তারা কেউ কোনো কথা বলল না। শুধু একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।
তনুজার চোখ অনিচ্ছা সত্ত্বেও তুষারের দিকে চলে গেল।
এভাবে তাকে আগে কখনো দেখেনি সে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর নিজের অজান্তেই একটা ঢোক গিলল।
তুষার তনুজার চোখের সেই দৃষ্টি লক্ষ্য করল।
তারপর ঠোঁটের কোণে সামান্য বাঁকা অভিব্যক্তি এনে বলল,
"কী দেখছিস এভাবে?
তনুজা সঙ্গে সঙ্গে চোখ সরিয়ে নিল।
লজ্জা আর অস্বস্তি মিশে থাকা চোখে আবারও একবার তুষারের দিকে তাকাল।
তারপর নিচু হয়ে গেল তার দৃষ্টি। চোখ খিঁচে বন্ধ করে ভাবলো।
নিজের উপরে রাগ লাগছে কি হয়েছে তার?তখনও সে না চাইতেও তুষারের শার্ট এর ফাক দিয়ে বুকের দিকে তাকিয়ে ছিলো। এখন তো শরম লজ্জার মাথা খেয়ে সে এই ভাবে বেশরমের মতো তাকিয়ে ছিলো। আর লোক টাও তাকে ছেড়ে কথা বলে না। ছিঃ কি লজ্জা।
তুষারও তাকিয়ে রইল তার দিকে।
কিছুক্ষণ পর দুজনেই প্রায় একই সঙ্গে উঠে দাঁড়াল।দুজন একসঙ্গে উঠে দাঁড়াতেই তুষার ধীরে ধীরে তনুজার দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করল।
এক পা এক পা করে।
আর তনুজাও যেন অজান্তেই এক পা এক পা করে পিছিয়ে যেতে লাগল।
তুষারের কণ্ঠটা ছিল গভীর,ভারী কেমন যেন মাদকতা মিশানো স্বর।
"আপনি এগোচ্ছেন কেন?"
তনুজার গলা কাঁপল।
তুষার থামল না।
"তুই পিছাচ্ছিস কেন?”
তনুজা এলোমেলো দৃষ্টি ফেললো।কেমন হাসপাস লাগছে।
"শাড়ি পরেছিস কেন?"
তনুজা পেছাতে পেছাতে একটু তোতলাতে তোতলাতে বলল,
"আ...আমার মন চেয়েছে তাই।
তুষারের ভ্রু কুঁচকে গেল।
"তোর মন চাইলেই হবে?
তনুজা একটা ঢোক গিলল।
"সেই কৈফিয়ত কি আপনাকে দিতে হবে নাকি?
"হ্যাঁ,হবে শুধু নিজের মনের চিন্তা করলেই হবে?তোর মনের জন্য তো অন্য জনের অসুবিধা হচ্ছে"
"ক..কার"
তনুজা কথাটা বলেই আরও এক পা পিছিয়ে গেল।
কিন্তু পরের মুহূর্তেই তার শাড়ীর সঙ্গে তার পা আটকে গেল। বারান্দার এক কোণে রাখা র্যাটান এগ চেয়ারে
ধপ করে বসে পড়ল সে।
তুষার তনুজাকে পড়ে যেতে দেখে দ্রুত তাকে ধরতে এগিয়ে গেল।
কিন্তু একই মুহূর্তে তার নিজের পাটাও পিছলে গেল।
ফলে।
এক ঝটকায় তুষার তনুজার ওপর পড়ে গেল।
আর সেই আকস্মিক ধাক্কায়।
তুষারের ঠান্ডা,সদ্য সিগারেটের গন্ধ লেগে থাকা ঠোঁট এসে ছুঁয়ে গেল তনুজার নরম ঠোঁটে।
মুহূর্তটা এতটাই আকস্মিক ছিল যে দুজনের কেউই কিছু বুঝে ওঠার সুযোগ পেল না
তনুজার চোখ মুহূর্তেই বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
পরক্ষণেই সে চোখ বন্ধ করে ফেলল। তনুজার পুরো শরীর যেন শিহরিত হয়ে উঠল। তনুজার পুরো শরীরের ভোর ছেড়ে দিলো। তার দুটো হাত অনিচ্ছায় তুষারের বুকের ওপর এসে ঠেকেছে
তুষারের শরীরও সদ্য ঠান্ডা পানিতে গোসল করার কারণে এখনও শীতল
হঠাৎ ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় কয়েক সেকেন্ডের জন্য দুজনেই স্থির হয়ে রইলো
তুষারও যেন কী করবে বুঝে উঠতে পারছিল না।কিন্তু সে সরে গেলো না সে তনুজার ঠোঁটে ঠোঁট রেখেই শুকনো ঢক গিলছে।গলা শুখিয়ে আসছে তার।
তারপর তনুজা অস্বস্তিতে দম বন্ধ হয়ে আসছে।হালকা নড়েচড়ে উঠলসে।
"উম..উম"
তুষারকে সরানোর চেষ্টা করল সে। কিন্তু তুষার যেন মুহূর্তের জন্য নিজের হুঁশই হারিয়ে ফেলেছিল।
তনুজার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছিল।
সে আবারও নড়েচড়ে তুষারকে সরানোর চেষ্টা করল
এবার তুষারও নড়ে উঠল। তনুজার সেই নড়াচড়ায় বিরক্ত হয়ে তুষার চোখ খুলল
আর ঠিক তখনই দুজনের চোখে চোখ পড়ল
তনুজার গাল দুটো লজ্জায় টকটকে লাল হয়ে আছে।
চোখে বিস্ময়,মুখে অস্বস্তি।
তুষারের দৃষ্টি তার চোখে আটকে গেল। তনুজা লজ্জায় সঙ্গে সঙ্গে চোখ বন্ধ করে ফেলল
তুষারও যেন হঠাৎ বাস্তবে ফিরে এলো।সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল সে। তনুজার ওপর থেকে সরে গিয়ে কোনো কথা না বলেই দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তনুজা তখনও বারান্দার সেই জায়গাতেই বসে রইল। বুক ওঠানামা করছে দ্রুত।বড় বড় কয়েকটা নিঃশ্বাস নিল সে
কী হলো একটু আগেও সেটাই যেন ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারছে না।হাত দুটো এখনও কাঁপছে।
তনুজা থম মেরে বসেই রইল
আর তার মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগল
এইমাত্র কী হয়ে গেল?
★★★★
একটি ঘরে বউ সেজে বসে আছে জুমানা।
গায়ে ভারী লেহেঙ্গা,গলায়-কানে-হাতে ঝলমলে গয়না। বিয়ের সাজে তাকে দেখে মনে হচ্ছে, যেন কিছুক্ষণ আগেও এখানে কোনো ঝড় বয়ে যায়নি।
প্রায় ঘণ্টাখানেক আগেই তারা বাড়িতে ফিরেছে।
হলরুমে তখন প্রায় সবাই উপস্থিত ছিল। সাদের কাকা সবার সামনে জুমানার চরিত্র আর বিয়ের দিনের সেই ভিডিওর কথা বলে তাকে অপমান করে, সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে যখন সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন, তখন হলরুমের প্রায় প্রত্যেকটা চোখ ছিল জুমানার দিকে।
চারপাশে সবাই শুধু তাকে ধিক্কার জানাচ্ছিলো।
কিন্তু কে জানত, সেই বউ সেজে বসে থাকা জুমানার মনে তখন যেন উৎসবের আনন্দে আতশবাজি ফুটছে!
মানুষের কথায় তার বিন্দুমাত্র যায়-আসে না।
বরং ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি নিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছিল সে।
তার সেই হাসি দেখে মনে হচ্ছিল, এমন কিছু একটা হবে সে যেন আগেই জানত।
এই মুহূর্তে আয়নার সামনে বসে আপনমনে গুনগুন করে গান গাইছে জুমানা। এক হাতে লিপস্টিক,অন্য হাতে আয়না। নিজের সাজসজ্জার প্রতিটি খুঁটিনাটি নিখুঁতভাবে দেখে নিচ্ছে। জীবনের প্রথম বার বউ সেজেছে তবে জামাই বিহীন। তার ভাবনার মাঝেই
দরজাটা বিকট শব্দে খুলে গেল। জুমানা নির্বিকার।
কে এসেছে,সেটা সে জানে।
তাই দরজার দিকে তাকানোরও প্রয়োজন বোধ করল না। নিজের ঠোঁটে লিপস্টিক দেওয়াতেই ব্যস্ত রইল। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন নাজমুল হোসাইন।
মুখটা প্রচণ্ড রাগে থমথমে। কয়েক মুহূর্ত মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকার পর তিনি গর্জে উঠলেন,
তোমার কোনো আইডিয়া আছে,জুমানা, তুমি কী কাণ্ড করে এসেছো?"
জুমানা এবার আয়নায় বাবার প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকাল।
"ওহ্,ড্যাড!বাচ্চাদের মতো কথা বলো না। আমি কী করেছি?
"কী করেছো তুমি?
নাজমুল হোসাইনের গলার স্বর আরও চড়ে গেল।
"সবার সামনে তুমি আমার মান-সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছো। শুধু তাই না, আমার পুরো প্ল্যানে পানি ঢেলে দিয়ে তুমি এখানে শান্তিতে বসে আছো!
জুমানা চোখ উল্টে আবার নিজের ঠোঁটের দিকে তাকাল।
তার যেন কিছুতেই যায়-আসে না।
এমন সময় জুমানার মা এগিয়ে এসে স্বামীকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন।
"এত রাগ করে কী হবে? যা হওয়ার হয়ে গেছে"
"তুমি চুপ করো!"
নাজমুল হোসাইন বিরক্ত হয়ে স্ত্রীর কথার মাঝেই থামিয়ে দিলেন।
"ওর কোনো কমন সেন্স নেই নাকি? সারাবছর যা ইচ্ছে করেছে,আমি কখনো কিছু বলিনি। ওকে সামান্য একটা কাজ দিয়েছিলাম করতে ও তাও পারলো না। আজকের দিনেই কেন এমন একটা কাণ্ড ঘটাতে হলোওর ওকে জিজ্ঞেস করো আর মাএ কয়টা দিন কি ও সহ্য করে থাকতে পারলো না?
তিনি রাগে কয়েক পা এদিক-ওদিক হাঁটলেন।
"কত কিছু পরিকল্পনা করে আমি এই বিয়ের ব্যবস্থা করেছিলাম। আর সবকিছু এক মুহূর্তে শেষ!"
জুমানা এবার ধীরে ধীরে বাবার দিকে ফিরল। মুখে এখনও সেই নির্বিকার ভাব।
নাজমুল হোসাইন দাঁত চেপে বললেন,
"সাদের নামে যে জমিটা আছে, সেটা কত মূল্যবান বুঝতে পারছো তুমি?আমি তোমাকে কতবার বলেছিলাম, বিয়ের আগে এমন কোনো কাণ্ড করো না যাতে আমার সবকিছু পানির সঙ্গে মিশে যায়!"
জুমানা চুপচাপ শুনছিল।
"সাদের সঙ্গে বিয়েটা কোনোভাবে হয়ে যেতে দিতেই। তাহলেই আমার কাজ হয়ে যেত।"
নাজমুল হোসাইন এবার ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন,
"সাদের বাবার রেখে যাওয়া ওই জমিটা কোনো সাধারণ জমি নয়। ওটা একটা সোনার খনি। শহরের এমন একটা জায়গায় জমিটা পড়ে আছে যার কাছে সেই জায়গার এক টুকরো যদি থালে সে এমনি কোটিপতি আর আমার হাতে তো সেটার পুরো খনিটাই ছিলো।
তিনি একটু থামলেন।
"আমি যখন সোফিউলের সঙ্গে প্রথম বাংলাদেশে গিয়ে জমিটা দেখেছিলাম, তখনই একটা বিশাল অঙ্কের দাম উঠেছিল। সেদিনই আমি ওকে বলেছিলাম, জমিটা আমাকে দিয়ে দিতে। আমি ওকে টাকা দিয়ে দিতাম, সে চাইলে অন্য কোথাও জমি কিনে নিত।"
নাজমুল হোসাইনের মুখে এবার পুরোনো ক্ষোভ ফুটে উঠল।
এটা নাকি তার ছেলের ভবিষ্যতের জন্য। এখানে জমিটা থাকলে ভবিষ্যতে এর দাম আরও দ্বিগুণ হবে। তখন এখানে কোনো একটা কিছু করতে পারলে তার পরিবারের জীবন চলে যাবে।"
তিনি তাচ্ছিল্যের হাসি দিলেন।
"আমাকে দিল না। তখন থেকেই ও আমার টার্গেটে ছিল। কত বললাম, দাম দিলেও দেবে না। শেষে নিজেই মরে গেল। রেখে গেলো ছেলেটাকে দেখতে যতই বোকাসোকা মনে হোক,জায়গামতো ঠিকই ঠায় মেরে বসে আছে। সাদকে সরাসরি বললে সে কখনোই জমিটা আমার হাতে দিত না। নিজের বাবার সম্পত্তির ব্যাপারে বোকা নয়। তাই অন্য পথ নিতে হয়েছে।"
সোফিউল মারা যাওয়ার পর থেকেই আমি ওদের বাড়িতে যাওয়া-আসা শুরু করলাম। সাদের সঙ্গে,ওর মায়ের সঙ্গে একটা ভালো সম্পর্ক তৈরি করলাম। আর আমার টার্গেট ছিল সাদ। কারণ জমিটা ওর নামেই ছিল। ওর আঠারো বছর হতেই সেটা পুরোপুরি ওর নামে পুরোপুরি হয়ে গিয়েছিল।"
জুমানা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল
"ওহ্ ড্যাড,এইটুকু একটা জমির জন্য এত ওভাররিঅ্যাক্ট করার কী আছে?তোমার কাছে কম কিছু আছে নাকি?
নাজমুল হোসাইন এবার বিরক্ত চোখে মেয়ের দিকে তাকালেন।
তুমি বুঝবে না। জমিটা যেখানে পড়ে আছে,তার আশেপাশে এখন বড় বড় কোম্পানি তৈরি হয়ে গেছে। আমার চারটা কোম্পানি থাকার পরও আমার এমন কোনো নাম-ডাক নেই যে সবাই শুধু আমার নামেই আমাকে চিনবে।"
তার কণ্ঠে এবার উচ্চাকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট।
"আমি ওই জায়গায় একটা বড় কিছু দাঁড় করাতে পারলে নিশ্চিতভাবে শহরের নামীদামি কোম্পানিগুলোর মধ্যে একটা হয়ে যেতাম। এখানে আমার যা আছে, মানুষ শুধু পরিচিত মহলে সেটা চেনে। আরশ মির্জার কোম্পানির জন্য আমাকে চিনে ।
জুমানা বলল
"কিন্তু সাদ এই বিয়ে করলেও তোমার প্ল্যান অনুযায়ী কিছু হতো না।
নাজমুল ভ্রু কুঁচকে তাকালেন।
জুমানা এবার গুনগুন করতে করতে বলল
"ওর বোকামি শুধু ওর চেহারায়ই প্রকাশ পায়। আমার পছন্দও ছিল না। তবে ছেলে ভালো আছে,সেটা মানতেই হবে।"
সে আয়নায় নিজের চেহারা দেখতে দেখতে বলল
"ওর মনে অন্য কেউ আছে এটা আমি প্রথমেই বুঝেছিলাম কিন্তু ওর হাবভাব দেখে এতটুক বুঝতে পারছিলাম ও কোনো ঝামেলা করতে পারবে না। আর আমাদের সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি চিলো ওর মা। বেচারা যা যা বুঝিয়েছি ঠিক তাই করেছ।
তারপর হঠাৎ হেসে উঠল।
"কিন্তু ও যে বিয়ের দিনেই ছক্কা মেরে দেবে,সেটা কে জানত!
নাজমুল হোসাইন ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন
"তুমি কী বলতে চাইছো?ও এমন করবে সেটা তুমি আগে থেকেই জানতে?
জুমানা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল
"হ্যাঁ আর নইলে কী?ওর মনে অন্য মানুষ আছে
জুমানা বিরক্ত মুখে চোখ ঘুরিয়ে বলল
"ওর সঙ্গে বিয়ে হলে আমি আমার লাইফটা এনজয়ই করতে পারতাম না তার ওপর ওর মা সারাক্ষণ এত বকবক করত!খুব বেঁচে গিয়েছি আমি।
নাজমুল হোসাইন হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন
"তোমার ভিডিওটা ওকে কে দিয়েছে?
জুমানা কাঁধ ঝাঁকাল।
"কে জানে!যেই দিয়েছে দিক।আমার কী?
তার ঠোঁটে আবার সেই রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল।
"ভালোই হয়েছে তুষারকে পাওয়ার রাস্তা আরেকটু ক্লিয়ার হয়েছে।
নাজমুল হোসাইন থমকে গেলেন।
"আবার তুষার কে?
জুমানা এবার বাবার দিকে তাকিয়ে এমনভাবে হাসল যেন প্রশ্নটার উত্তর খুবই স্বাভাবিক।
"সন অফ আরশ মির্জা
"হোয়াট!
জুমানা ঠোঁটে আবার লিপস্টিকের শেষ টাচ দিতে দিতে বলল
"এখন যাও তো আমাকে একটু একা ছাড়ো। এইসব হাবিজাবি পরে নাটক করতে আমার ভালো লাগছে না
"নাজমুল হোসাইন কয়েক মুহূর্ত মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তার মাথায় যেন কিছুই ঢুকছে না
এতদিন ধরে করা পরিকল্পনা,এত হিসাব-নিকাশ
সবকিছু এভাবে এক মুহূর্তে ভেস্তে যাবে,সেটা তিনি ভাবতেই পারেননি। আর এখন তার মেয়ে আবার নতুন করে তুষারকে নিয়ে বসেছে!তিনি আর কিছু না বলে রাগে গজগজ করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
পেছনে জুমানা আবার আয়নার দিকে তাকাল
ঠোঁটের কোণে সেই একই হাসি।
★
তনুজা লজ্জায় হাসফাঁস করতে করতে ভাবছিল।সেই দৃশ্যটা ভাবতে ভাবতেই তার আঙুল চলে গেল নিজের ঠোঁটের কাছে। গাল দুটো তখনও লজ্জায় টকটকে লাল হয়ে আছে। ঠোঁটে আঙুল ছোঁয়াতেই সে একটু বমি করার মতো মুখ করে শব্দ করে বলল
"নেশাখোর কোথাকার সিগারেটের গন্ধ
ওয়াক্ ছিঃ
কি বাজে গন্ধ।
তনুজা বিরক্তিতে ঠোঁটের ওপর আঙুলগুলো একটু ঘষে নিল। যেন তুষারের ছোঁয়ার সঙ্গে লেগে থাকা সেই সিগারেটের গন্ধটাও মুছে ফেলতে চাইছে।
কিন্তু যতই ঘষুক,গন্ধটা যেন কিছুতেই যাচ্ছে না।
বরং মনে হচ্ছে,অনাকাঙ্ক্ষিত সেই মুহূর্তটার একটা চিহ্ন হিসেবেই গন্ধটা তার ঠোঁটে লেগে থাকা তুষারের ছোঁয়া জোর করে থাকতে চাইছে।
তনুজা সিগারেটের গন্ধ একদম সহ্য করতে পারে না। তার কাছে গন্ধটা ভীষণ বাজে লাগছে। সে ঠোঁটে আঙুল চালাতে চালাতেই হঠাৎ চোখ গেলো দরজায়।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই অবুঝ প্রাণীটা। গোল গোল চোখে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তনুজার দিকে
মুলান
তনুজা যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য আহাম্মক হয়ে গেল। চোখের পলক পড়ল না। হঠাৎ মাথায় একটা চিন্তা আসতেই বুক ধক করে উঠল
এই মুলানের বাচ্চাটা কখন এলো?ও কিছু দেখে ফেলেনি তো?
ইশশ!যদি দেখে ফেলে থাকে কী হবে তখন
আবার নিজেকেই বোঝাল
ধুর!ও তো একটা প্রাণী মাত্র। কথা বলতেও পারে না।
কিন্তু পরক্ষণেই আবার সন্দেহটা মাথায় চেপে বসল
কিন্তু ও যদি সত্যিই দেখে থাকে?
লজ্জায় তনুজার মুখ আরও লাল হয়ে উঠল
এদিকে মুলান তনুজার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই এমন একটা ভাব করল,যেন সে কিছুই জানে না
নির্বিকার ভঙ্গিতে হেঁটে এসে তনুজার কাছে দাঁড়াল তারপর এক লাফে তার কোলে উঠে বসল।
তনুজা সুযোগ বুঝে মুলানের মুখটা দুহাতের মাঝে নিয়ে তার চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল
"কিরে?তুই কখন এলি?
মুলান পলক ফেলল
তনুজা চোখ দুটো সরু করে আবার জিজ্ঞেস করল
"এইইই তুই কিছু দেখিসনি তো?
মুলান চুপ
অবলা প্রাণীটার কাছ থেকে উত্তর পাওয়ার আশায় তনুজা যে এভাবে প্রশ্ন করে যাচ্ছে বিষয়টা সত্যিই অদ্ভুত।
শেষ পর্যন্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুলানকে র্যাটান এগ চেয়ারে বসিয়ে দিল সে
তারপর উঠে দাঁড়িয়ে ঘরের দরজার দিকে গেল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে একবার হাতলটা নেড়ে দেখল। তারপর পাসওয়ার্ড দেওয়ার জায়গাটার দিকে তাকাল।
কী দিলো এই অসহ্য লোকটা।কেনই বা আটকে রেখেছে!
এই লোকটা আসার আগেই আমাকে বের হতে হবে।
কও একটা বিরক্তিকর পরিস্থিতি ধ্যাত! ওনার সামনে এখন আগামী এক বছরেও পড়া যাবে না!
বিরক্তিতে কথাগুলো বিড়বিড় করতে করতে তনুজা দরজার হাতল ধরে টান দিতেই
দরজা খুলে গেল! তনুজা মুহূর্ত হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর মুখে ফুটে উঠল বিশাল একটা হাসি।
আর এক মুহূর্তও দেরি না করে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই
শক্তপোক্ত কিছুর সাথে ধাক্কা লাগলো!
"উফ!
তনুজার কপাল গিয়ে ঠেকল তুষারের শক্ত বুকের সঙ্গে।
তনুজা ব্যথায় শব্দ করে মাথা তুলে তাকাতেই তুষারকে দেখে থমকে গেল।
তার মানে এতক্ষণ দরজা খোলা ছিল না। বরং তুষারই দরজা খুলে ভেতরে ঢুকছিল।
আর তাতেই আবার তাদের এই আকস্মিক ধাক্কা!
তনুজা মনে মনে আফসোস করে উঠল,
"আজকেই আমার দিনটা এত খারাপ কেন!
তুষার বিরক্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে গভীর গলায় বলল,
"বলেছিলাম না,পালানোর চিন্তাটাও মাথায় আনবি না?
তনুজা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নিচু করে ফেলল। তুষারের দিকে তাকালেই কেমন যেন হাসফাঁস লাগছে তার।
এর আগে কখনো তুষারের সামনে এভাবে লজ্জায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়নি তাকে।
পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে মেঝে খুঁটতে লাগল সে।
ইচ্ছে করছে মেঝেটা ফাঁক হয়ে যাক আর সে তার ভেতর ঢুকে যাক!
তুষারের হাতে খাবারের প্লেট। সে আদেশের সুরে বলল,
"বিছানায় গিয়ে বস।
তনুজা না চাইতেও মিনমিন করে বলল,
"আপনি সরুন আমি আমার রুমে যাব।
তুষার শান্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর একই শান্ত গলায় বলল,
"কী বলেছি আমি?একটা কথা দ্বিতীয়বার বলতে হয় কেন?
তনুজা হাত কচলাতে লাগল। কোনোভাবেই মাথা তুলতে পারছে না। পায়ের জোর যেন হারিয়ে গেছে। মনে হচ্ছে সেখানেই মাটির সঙ্গে আটকে আছে।
তুষার শেষ পর্যন্ত আর কিছু না বলে তার বাহু ধরে বিছানার দিকে নিয়ে যেতে লাগল।
তখনই মুলান ছুটে এসে তুষারকে জড়িয়ে ধরল। এবার তুষার আর তাকে ফিরিয়ে দিল না। বরং তনুজার হাতে খাবারের প্লেটটা ধরিয়ে দিয়ে মুলানকে কোলে তুলে নিল।
মুলান তুষারকে পেয়ে খুশিতে তাকে চাটতে লাগল।
তুষার মুলানের মাথায় হাত বুলিয়ে দুষ্টুমি মেশানো গলায় বলল,
"টাইগার বেবি লুকিয়ে লুকিয়ে কারও রোমান্স দেখা ভালো না। এটা ব্যাট ম্যানার্স ওকে?নেক্সটাইম আর এমনটা করবে না।
"তারপর ফিসফিস করে যেনোআরো কি বলল তনুজা তা শুনলো না।
তনুজার মাথা তর করে উঠে গেল। সে বিস্ফোরিত চোখে তাকাল দুজনের দিকে।
তার মানে মুলান এই ঘরেই আগে থেকেই ছিল!আর সবকিছু দেখে ফেলেছে! আর এই লোকটার কোনো লাজ লজ্জা নেই কী বলছে?রোমান্স? ওটা রোমান্স ছিল?
তনুজা আর না পেরে তুষারের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,
"আপনি কীসব বলছেন অসভ্যের মতো!
তুষার এবার তার দিকে তাকাল।
একেবারে না বোঝার ভান করে জিজ্ঞেস করল
"কী বলেছি?
তনুজা থমকে গেল।
"এই যে ওকে বললেন মাত্র!
"কী বললাম?"
"আপনি জানেন না?"
"না। তুই বল।
তনুজা বিরক্তিতে মুখ বাঁকিয়ে বলল,
"কিছু না।
মনে মনে বলল,
এই লোকটা ইচ্ছে করেই আমাকে লজ্জায় ফেলছে!
তুষার ভ্রু তুলে তাকাল।
"ওহ
একটু থেমে ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি টেনে বলল,
"রোমান্স-এর কথাটা?
তনুজা আর কিছু বলল না। চোখ-মুখ কুঁচকে মাথা নিচু করে রইল।
তুষার ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকে রাখল।
তারপর মুলানের দিকে তাকিয়ে বলল,
"টাইগার সব দেখে ফেলেছে। ওকে বললেই কি কাউকে বলে দেবে?
তনুজা এবারও চুপ।
তার লজ্জায় সত্যিই মাটির নিচে ঢুকে যেতে ইচ্ছে করছে।
উফ! এই লোকটা শুধু তাকে লজ্জাই দেয়!
তুষার মুলানকে নিয়ে বিছানার আরেক পাশে গিয়ে বসল।
তারপর তনুজার দিকে তাকিয়ে আদেশ করল,
"তুি কি ভয় পাচ্ছিস? যে কাউকে বলে দিবে তোর আমার চুমু খাওয়ার কথা..
তনুজা এবার রেগে বলল
"চুপ করুন আপনি অসভ্য লোক কিসব আজেবাজে কথা বলছেন তখন থেকে।
তুষারের এর সাথে আাবরো চোখাচোখি হতেই মাথা নামিয়ে নিলো। তুষার আবারও ঠোঁট কামড়ে হাসলো।
কিছুক্ষণ নিরবতা রইলো।
তুষার বলল
"খাবার নিয়ে বসে থাকতে বলেছি?"
তনুজা চমকে তাকাল। কিন্তু খেলো।বসে রইলো বেশ সময় গেলেও তবুজা প্লেট নিয়ে সেই ভাবেই বসে রইলো।
তুষারের ধৈর্য এবার শেষের দিকে। এবার ধমক দিয়ে বলল,
"কি বলছি কানে যাচ্ছে না। একটা কথা কয়বার বলতে হয়? ফার্স্ট ফিনিশীট।
তনুজা ধমকে কেঁপে উঠল। এইবার কাঁপা কাঁপা হাতে কয়েক লোকমা মুখে তুলল। তারপর আর পারল না।
প্লেটটা বিছানার ওপর রেখে বলল,
"আর খাব না।
তুষার মুলানকে পাশে নামিয়ে দিয়ে প্লেটটা নিজের দিকে টেনে নিল।
তারপর অনায়াসে খাওয়া শুরু করল। তনুজার চোখ কপালে উঠে গেল।
"আরে আপনি কী করছেন?ওটা তো আমার জুঠো খাবার!
তুষার খাওয়া থামিয়ে তার দিকে তাকাল।
"সো হোয়াট?
তনুজা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
তুষার আবার বলল,
"এমন ভাব করছিস যেন কুকুর-বিড়াল মুখ দিয়েছে। তাই বলে কি খেতে নিষেধ করছিস?
"ধুর! আমি কি সেটা বলেছি?আপনি রাখুন তো ওটা!
"তুই কি চাস আমি না খেয়ে মরে যাই?নিজের খিদে মিটেছে বলে ভাবছিস,আমার খিদেটাও বুঝি মিটে গেছে? খেতে তো ইচ্ছে করছে না আমারও খিদেটা যে আমার অন্য কিছুর জন্য লেগেছে। সব খিদে তো আর খাবার দিয়ে মেটে না। তাও খেতে হচ্ছে।একটি ঘরে বউ সেজে বসে আছে জুমানা।
গায়ে ভারী লেহেঙ্গা,গলায়-কানে-হাতে ঝলমলে গয়না। বিয়ের সাজে তাকে দেখে মনে হচ্ছে, যেন কিছুক্ষণ আগেও এখানে কোনো ঝড় বয়ে যায়নি।
প্রায় ঘণ্টাখানেক আগেই তারা বাড়িতে ফিরেছে।
হলরুমে তখন প্রায় সবাই উপস্থিত ছিল। সাদের কাকা সবার সামনে জুমানার চরিত্র আর বিয়ের দিনের সেই ভিডিওর কথা বলে তাকে অপমান করে, সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে যখন সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন, তখন হলরুমের প্রায় প্রত্যেকটা চোখ ছিল জুমানার দিকে।
চারপাশে সবাই শুধু তাকে ধিক্কার জানাচ্ছিলো।
কিন্তু কে জানত, সেই বউ সেজে বসে থাকা জুমানার মনে তখন যেন উৎসবের আনন্দে আতশবাজি ফুটছে!
মানুষের কথায় তার বিন্দুমাত্র যায়-আসে না।
বরং ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি নিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছিল সে।
তার সেই হাসি দেখে মনে হচ্ছিল, এমন কিছু একটা হবে সে যেন আগেই জানত।
এই মুহূর্তে আয়নার সামনে বসে আপনমনে গুনগুন করে গান গাইছে জুমানা। এক হাতে লিপস্টিক,অন্য হাতে আয়না। নিজের সাজসজ্জার প্রতিটি খুঁটিনাটি নিখুঁতভাবে দেখে নিচ্ছে। জীবনের প্রথম বার বউ সেজেছে তবে জামাই বিহীন। তার ভাবনার মাঝেই
দরজাটা বিকট শব্দে খুলে গেল। জুমানা নির্বিকার।
কে এসেছে,সেটা সে জানে।
তাই দরজার দিকে তাকানোরও প্রয়োজন বোধ করল না। নিজের ঠোঁটে লিপস্টিক দেওয়াতেই ব্যস্ত রইল। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন নাজমুল হোসাইন।
মুখটা প্রচণ্ড রাগে থমথমে। কয়েক মুহূর্ত মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকার পর তিনি গর্জে উঠলেন,
তোমার কোনো আইডিয়া আছে,জুমানা, তুমি কী কাণ্ড করে এসেছো?"
জুমানা এবার আয়নায় বাবার প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকাল।
"ওহ্,ড্যাড!বাচ্চাদের মতো কথা বলো না। আমি কী করেছি?
"কী করেছো তুমি?
নাজমুল হোসাইনের গলার স্বর আরও চড়ে গেল।
"সবার সামনে তুমি আমার মান-সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছো। শুধু তাই না, আমার পুরো প্ল্যানে পানি ঢেলে দিয়ে তুমি এখানে শান্তিতে বসে আছো!
জুমানা চোখ উল্টে আবার নিজের ঠোঁটের দিকে তাকাল।
তার যেন কিছুতেই যায়-আসে না।
এমন সময় জুমানার মা এগিয়ে এসে স্বামীকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন।
"এত রাগ করে কী হবে? যা হওয়ার হয়ে গেছে"
"তুমি চুপ করো!"
নাজমুল হোসাইন বিরক্ত হয়ে স্ত্রীর কথার মাঝেই থামিয়ে দিলেন।
"ওর কোনো কমন সেন্স নেই নাকি? সারাবছর যা ইচ্ছে করেছে,আমি কখনো কিছু বলিনি। ওকে সামান্য একটা কাজ দিয়েছিলাম করতে ও তাও পারলো না। আজকের দিনেই কেন এমন একটা কাণ্ড ঘটাতে হলোওর ওকে জিজ্ঞেস করো আর মাএ কয়টা দিন কি ও সহ্য করে থাকতে পারলো না?
তিনি রাগে কয়েক পা এদিক-ওদিক হাঁটলেন।
"কত কিছু পরিকল্পনা করে আমি এই বিয়ের ব্যবস্থা করেছিলাম। আর সবকিছু এক মুহূর্তে শেষ!"
জুমানা এবার ধীরে ধীরে বাবার দিকে ফিরল। মুখে এখনও সেই নির্বিকার ভাব।
নাজমুল হোসাইন দাঁত চেপে বললেন,
"সাদের নামে যে জমিটা আছে, সেটা কত মূল্যবান বুঝতে পারছো তুমি?আমি তোমাকে কতবার বলেছিলাম, বিয়ের আগে এমন কোনো কাণ্ড করো না যাতে আমার সবকিছু পানির সঙ্গে মিশে যায়!"
জুমানা চুপচাপ শুনছিল।
"সাদের সঙ্গে বিয়েটা কোনোভাবে হয়ে যেতে দিতেই। তাহলেই আমার কাজ হয়ে যেত।"
নাজমুল হোসাইন এবার ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন,
"সাদের বাবার রেখে যাওয়া ওই জমিটা কোনো সাধারণ জমি নয়। ওটা একটা সোনার খনি। শহরের এমন একটা জায়গায় জমিটা পড়ে আছে যার কাছে সেই জায়গার এক টুকরো যদি থালে সে এমনি কোটিপতি আর আমার হাতে তো সেটার পুরো খনিটাই ছিলো।
তিনি একটু থামলেন।
"আমি যখন সোফিউলের সঙ্গে প্রথম বাংলাদেশে গিয়ে জমিটা দেখেছিলাম, তখনই একটা বিশাল অঙ্কের দাম উঠেছিল। সেদিনই আমি ওকে বলেছিলাম, জমিটা আমাকে দিয়ে দিতে। আমি ওকে টাকা দিয়ে দিতাম, সে চাইলে অন্য কোথাও জমি কিনে নিত।"
নাজমুল হোসাইনের মুখে এবার পুরোনো ক্ষোভ ফুটে উঠল।
এটা নাকি তার ছেলের ভবিষ্যতের জন্য। এখানে জমিটা থাকলে ভবিষ্যতে এর দাম আরও দ্বিগুণ হবে। তখন এখানে কোনো একটা কিছু করতে পারলে তার পরিবারের জীবন চলে যাবে।"
তিনি তাচ্ছিল্যের হাসি দিলেন।
"আমাকে দিল না। তখন থেকেই ও আমার টার্গেটে ছিল। কত বললাম, দাম দিলেও দেবে না। শেষে নিজেই মরে গেল। রেখে গেলো ছেলেটাকে দেখতে যতই বোকাসোকা মনে হোক,জায়গামতো ঠিকই ঠায় মেরে বসে আছে। সাদকে সরাসরি বললে সে কখনোই জমিটা আমার হাতে দিত না। নিজের বাবার সম্পত্তির ব্যাপারে বোকা নয়। তাই অন্য পথ নিতে হয়েছে।"
সোফিউল মারা যাওয়ার পর থেকেই আমি ওদের বাড়িতে যাওয়া-আসা শুরু করলাম। সাদের সঙ্গে,ওর মায়ের সঙ্গে একটা ভালো সম্পর্ক তৈরি করলাম। আর আমার টার্গেট ছিল সাদ। কারণ জমিটা ওর নামেই ছিল। ওর আঠারো বছর হতেই সেটা পুরোপুরি ওর নামে পুরোপুরি হয়ে গিয়েছিল।"
জুমানা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল
"ওহ্ ড্যাড,এইটুকু একটা জমির জন্য এত ওভাররিঅ্যাক্ট করার কী আছে?তোমার কাছে কম কিছু আছে নাকি?
নাজমুল হোসাইন এবার বিরক্ত চোখে মেয়ের দিকে তাকালেন।
তুমি বুঝবে না। জমিটা যেখানে পড়ে আছে,তার আশেপাশে এখন বড় বড় কোম্পানি তৈরি হয়ে গেছে। আমার চারটা কোম্পানি থাকার পরও আমার এমন কোনো নাম-ডাক নেই যে সবাই শুধু আমার নামেই আমাকে চিনবে।"
তার কণ্ঠে এবার উচ্চাকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট।
"আমি ওই জায়গায় একটা বড় কিছু দাঁড় করাতে পারলে নিশ্চিতভাবে শহরের নামীদামি কোম্পানিগুলোর মধ্যে একটা হয়ে যেতাম। এখানে আমার যা আছে, মানুষ শুধু পরিচিত মহলে সেটা চেনে। আরশ মির্জার কোম্পানির জন্য আমাকে চিনে ।
জুমানা বলল
"কিন্তু সাদ এই বিয়ে করলেও তোমার প্ল্যান অনুযায়ী কিছু হতো না।
নাজমুল ভ্রু কুঁচকে তাকালেন।
জুমানা এবার গুনগুন করতে করতে বলল
"ওর বোকামি শুধু ওর চেহারায়ই প্রকাশ পায়। আমার পছন্দও ছিল না। তবে ছেলে ভালো আছে,সেটা মানতেই হবে।"
সে আয়নায় নিজের চেহারা দেখতে দেখতে বলল
"ওর মনে অন্য কেউ আছে এটা আমি প্রথমেই বুঝেছিলাম কিন্তু ওর হাবভাব দেখে এতটুক বুঝতে পারছিলাম ও কোনো ঝামেলা করতে পারবে না। আর আমাদের সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি চিলো ওর মা। বেচারা যা যা বুঝিয়েছি ঠিক তাই করেছ।
তারপর হঠাৎ হেসে উঠল।
"কিন্তু ও যে বিয়ের দিনেই ছক্কা মেরে দেবে,সেটা কে জানত!
নাজমুল হোসাইন ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন
"তুমি কী বলতে চাইছো?ও এমন করবে সেটা তুমি আগে থেকেই জানতে?
জুমানা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল
"হ্যাঁ আর নইলে কী?ওর মনে অন্য মানুষ আছে
জুমানা বিরক্ত মুখে চোখ ঘুরিয়ে বলল
"ওর সঙ্গে বিয়ে হলে আমি আমার লাইফটা এনজয়ই করতে পারতাম না তার ওপর ওর মা সারাক্ষণ এত বকবক করত!খুব বেঁচে গিয়েছি আমি।
নাজমুল হোসাইন হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন
"তোমার ভিডিওটা ওকে কে দিয়েছে?
জুমানা কাঁধ ঝাঁকাল।
"কে জানে!যেই দিয়েছে দিক।আমার কী?
তার ঠোঁটে আবার সেই রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল।
"ভালোই হয়েছে তুষারকে পাওয়ার রাস্তা আরেকটু ক্লিয়ার হয়েছে।
নাজমুল হোসাইন থমকে গেলেন।
"আবার তুষার কে?
জুমানা এবার বাবার দিকে তাকিয়ে এমনভাবে হাসল যেন প্রশ্নটার উত্তর খুবই স্বাভাবিক।
"সন অফ আরশ মির্জা
"হোয়াট!
জুমানা ঠোঁটে আবার লিপস্টিকের শেষ টাচ দিতে দিতে বলল
"এখন যাও তো আমাকে একটু একা ছাড়ো। এইসব হাবিজাবি পরে নাটক করতে আমার ভালো লাগছে না
"নাজমুল হোসাইন কয়েক মুহূর্ত মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তার মাথায় যেন কিছুই ঢুকছে না
এতদিন ধরে করা পরিকল্পনা,এত হিসাব-নিকাশ
সবকিছু এভাবে এক মুহূর্তে ভেস্তে যাবে,সেটা তিনি ভাবতেই পারেননি। আর এখন তার মেয়ে আবার নতুন করে তুষারকে নিয়ে বসেছে!তিনি আর কিছু না বলে রাগে গজগজ করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
পেছনে জুমানা আবার আয়নার দিকে তাকাল
ঠোঁটের কোণে সেই একই হাসি।
★
তনুজা লজ্জায় হাসফাঁস করতে করতে ভাবছিল।সেই দৃশ্যটা ভাবতে ভাবতেই তার আঙুল চলে গেল নিজের ঠোঁটের কাছে। গাল দুটো তখনও লজ্জায় টকটকে লাল হয়ে আছে। ঠোঁটে আঙুল ছোঁয়াতেই সে একটু বমি করার মতো মুখ করে শব্দ করে বলল
"নেশাখোর কোথাকার সিগারেটের গন্ধ
ওয়াক্ ছিঃ
কি বাজে গন্ধ।
তনুজা বিরক্তিতে ঠোঁটের ওপর আঙুলগুলো একটু ঘষে নিল। যেন তুষারের ছোঁয়ার সঙ্গে লেগে থাকা সেই সিগারেটের গন্ধটাও মুছে ফেলতে চাইছে।
কিন্তু যতই ঘষুক,গন্ধটা যেন কিছুতেই যাচ্ছে না।
বরং মনে হচ্ছে,অনাকাঙ্ক্ষিত সেই মুহূর্তটার একটা চিহ্ন হিসেবেই গন্ধটা তার ঠোঁটে লেগে থাকা তুষারের ছোঁয়া জোর করে থাকতে চাইছে।
তনুজা সিগারেটের গন্ধ একদম সহ্য করতে পারে না। তার কাছে গন্ধটা ভীষণ বাজে লাগছে। সে ঠোঁটে আঙুল চালাতে চালাতেই হঠাৎ চোখ গেলো দরজায়।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই অবুঝ প্রাণীটা। গোল গোল চোখে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তনুজার দিকে
মুলান
তনুজা যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য আহাম্মক হয়ে গেল। চোখের পলক পড়ল না। হঠাৎ মাথায় একটা চিন্তা আসতেই বুক ধক করে উঠল
এই মুলানের বাচ্চাটা কখন এলো?ও কিছু দেখে ফেলেনি তো?
ইশশ!যদি দেখে ফেলে থাকে কী হবে তখন
আবার নিজেকেই বোঝাল
ধুর!ও তো একটা প্রাণী মাত্র। কথা বলতেও পারে না।
কিন্তু পরক্ষণেই আবার সন্দেহটা মাথায় চেপে বসল
কিন্তু ও যদি সত্যিই দেখে থাকে?
লজ্জায় তনুজার মুখ আরও লাল হয়ে উঠল
এদিকে মুলান তনুজার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই এমন একটা ভাব করল,যেন সে কিছুই জানে না
নির্বিকার ভঙ্গিতে হেঁটে এসে তনুজার কাছে দাঁড়াল তারপর এক লাফে তার কোলে উঠে বসল।
তনুজা সুযোগ বুঝে মুলানের মুখটা দুহাতের মাঝে নিয়ে তার চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল
"কিরে?তুই কখন এলি?
মুলান পলক ফেলল
তনুজা চোখ দুটো সরু করে আবার জিজ্ঞেস করল
"এইইই তুই কিছু দেখিসনি তো?
মুলান চুপ
অবলা প্রাণীটার কাছ থেকে উত্তর পাওয়ার আশায় তনুজা যে এভাবে প্রশ্ন করে যাচ্ছে বিষয়টা সত্যিই অদ্ভুত।
শেষ পর্যন্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুলানকে র্যাটান এগ চেয়ারে বসিয়ে দিল সে
তারপর উঠে দাঁড়িয়ে ঘরের দরজার দিকে গেল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে একবার হাতলটা নেড়ে দেখল। তারপর পাসওয়ার্ড দেওয়ার জায়গাটার দিকে তাকাল।
কী দিলো এই অসহ্য লোকটা।কেনই বা আটকে রেখেছে!
এই লোকটা আসার আগেই আমাকে বের হতে হবে।
কও একটা বিরক্তিকর পরিস্থিতি ধ্যাত! ওনার সামনে এখন আগামী এক বছরেও পড়া যাবে না!
বিরক্তিতে কথাগুলো বিড়বিড় করতে করতে তনুজা দরজার হাতল ধরে টান দিতেই
দরজা খুলে গেল! তনুজা মুহূর্ত হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর মুখে ফুটে উঠল বিশাল একটা হাসি।
আর এক মুহূর্তও দেরি না করে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই
শক্তপোক্ত কিছুর সাথে ধাক্কা লাগলো!
"উফ!
তনুজার কপাল গিয়ে ঠেকল তুষারের শক্ত বুকের সঙ্গে।
তনুজা ব্যথায় শব্দ করে মাথা তুলে তাকাতেই তুষারকে দেখে থমকে গেল।
তার মানে এতক্ষণ দরজা খোলা ছিল না। বরং তুষারই দরজা খুলে ভেতরে ঢুকছিল।
আর তাতেই আবার তাদের এই আকস্মিক ধাক্কা!
তনুজা মনে মনে আফসোস করে উঠল,
"আজকেই আমার দিনটা এত খারাপ কেন!
তুষার বিরক্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে গভীর গলায় বলল,
"বলেছিলাম না,পালানোর চিন্তাটাও মাথায় আনবি না?
তনুজা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নিচু করে ফেলল। তুষারের দিকে তাকালেই কেমন যেন হাসফাঁস লাগছে তার।
এর আগে কখনো তুষারের সামনে এভাবে লজ্জায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়নি তাকে।
পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে মেঝে খুঁটতে লাগল সে।
ইচ্ছে করছে মেঝেটা ফাঁক হয়ে যাক আর সে তার ভেতর ঢুকে যাক!
তুষারের হাতে খাবারের প্লেট। সে আদেশের সুরে বলল,
"বিছানায় গিয়ে বস।
তনুজা না চাইতেও মিনমিন করে বলল,
"আপনি সরুন আমি আমার রুমে যাব।
তুষার শান্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর একই শান্ত গলায় বলল,
"কী বলেছি আমি?একটা কথা দ্বিতীয়বার বলতে হয় কেন?
তনুজা হাত কচলাতে লাগল। কোনোভাবেই মাথা তুলতে পারছে না। পায়ের জোর যেন হারিয়ে গেছে। মনে হচ্ছে সেখানেই মাটির সঙ্গে আটকে আছে।
তুষার শেষ পর্যন্ত আর কিছু না বলে তার বাহু ধরে বিছানার দিকে নিয়ে যেতে লাগল।
তখনই মুলান ছুটে এসে তুষারকে জড়িয়ে ধরল। এবার তুষার আর তাকে ফিরিয়ে দিল না। বরং তনুজার হাতে খাবারের প্লেটটা ধরিয়ে দিয়ে মুলানকে কোলে তুলে নিল।
মুলান তুষারকে পেয়ে খুশিতে তাকে চাটতে লাগল।
তুষার মুলানের মাথায় হাত বুলিয়ে দুষ্টুমি মেশানো গলায় বলল,
"টাইগার বেবি লুকিয়ে লুকিয়ে কারও রোমান্স দেখা ভালো না। এটা ব্যাট ম্যানার্স ওকে?নেক্সটাইম আর এমনটা করবে না।
"তারপর ফিসফিস করে যেনোআরো কি বলল তনুজা তা শুনলো না।
তনুজার মাথা তর করে উঠে গেল। সে বিস্ফোরিত চোখে তাকাল দুজনের দিকে।
তার মানে মুলান এই ঘরেই আগে থেকেই ছিল!আর সবকিছু দেখে ফেলেছে! আর এই লোকটার কোনো লাজ লজ্জা নেই কী বলছে?রোমান্স? ওটা রোমান্স ছিল?
তনুজা আর না পেরে তুষারের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,
"আপনি কীসব বলছেন অসভ্যের মতো!
তুষার এবার তার দিকে তাকাল।
একেবারে না বোঝার ভান করে জিজ্ঞেস করল
"কী বলেছি?
তনুজা থমকে গেল।
"এই যে ওকে বললেন মাত্র!
"কী বললাম?"
"আপনি জানেন না?"
"না। তুই বল।
তনুজা বিরক্তিতে মুখ বাঁকিয়ে বলল,
"কিছু না।
মনে মনে বলল,
এই লোকটা ইচ্ছে করেই আমাকে লজ্জায় ফেলছে!
তুষার ভ্রু তুলে তাকাল।
"ওহ
একটু থেমে ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি টেনে বলল,
"রোমান্স-এর কথাটা?
তনুজা আর কিছু বলল না। চোখ-মুখ কুঁচকে মাথা নিচু করে রইল।
তুষার ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকে রাখল।
তারপর মুলানের দিকে তাকিয়ে বলল,
"টাইগার সব দেখে ফেলেছে। ওকে বললেই কি কাউকে বলে দেবে?
তনুজা এবারও চুপ।
তার লজ্জায় সত্যিই মাটির নিচে ঢুকে যেতে ইচ্ছে করছে।
উফ! এই লোকটা শুধু তাকে লজ্জাই দেয়!
তুষার মুলানকে নিয়ে বিছানার আরেক পাশে গিয়ে বসল।
তারপর তনুজার দিকে তাকিয়ে আদেশ করল,
"তুি কি ভয় পাচ্ছিস? যে কাউকে বলে দিবে তোর আমার চুমু খাওয়ার কথা..
তনুজা এবার রেগে বলল
"চুপ করুন আপনি অসভ্য লোক কিসব আজেবাজে কথা বলছেন তখন থেকে।
তুষারের এর সাথে আাবরো চোখাচোখি হতেই মাথা নামিয়ে নিলো। তুষার আবারও ঠোঁট কামড়ে হাসলো।
কিছুক্ষণ নিরবতা রইলো।
তুষার বলল
"খাবার নিয়ে বসে থাকতে বলেছি?"
তনুজা চমকে তাকাল। কিন্তু খেলো।বসে রইলো বেশ সময় গেলেও তবুজা প্লেট নিয়ে সেই ভাবেই বসে রইলো।
তুষারের ধৈর্য এবার শেষের দিকে। এবার ধমক দিয়ে বলল,
"কি বলছি কানে যাচ্ছে না। একটা কথা কয়বার বলতে হয়? ফার্স্ট ফিনিশীট।
তনুজা ধমকে কেঁপে উঠল। এইবার কাঁপা কাঁপা হাতে কয়েক লোকমা মুখে তুলল। তারপর আর পারল না।
প্লেটটা বিছানার ওপর রেখে বলল,
"আর খাব না।
তুষার মুলানকে পাশে নামিয়ে দিয়ে প্লেটটা নিজের দিকে টেনে নিল।
তারপর অনায়াসে খাওয়া শুরু করল। তনুজার চোখ কপালে উঠে গেল।
"আরে আপনি কী করছেন?ওটা তো আমার জুঠো খাবার!
তুষার খাওয়া থামিয়ে তার দিকে তাকাল।
"সো হোয়াট?
তনুজা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
তুষার আবার বলল,
"এমন ভাব করছিস যেন কুকুর-বিড়াল মুখ দিয়েছে। তাই বলে কি খেতে নিষেধ করছিস?
"ধুর! আমি কি সেটা বলেছি?আপনি রাখুন তো ওটা!
"তুই কি চাস আমি না খেয়ে মরে যাই?নিজের খিদে মিটেছে বলে ভাবছিস,আমার খিদেটাও বুঝি মিটে গেছে? খেতে তো ইচ্ছে করছে না আমারও খিদেটা যে আমার অন্য কিছুর জন্য লেগেছে। সব খিদে তো আর খাবার দিয়ে মেটে না। তাও খেতে হচ্ছে।
তনুজা তুষারের কথা শুনে মানে বুঝলো না। ততটা গভীরভাবে ভাবেও নিলো না সে। সে বললো
আচ্ছা,আমি বুঝতে পেরেছি। আপনার আলসেমি লাগছে তো! নিচে গিয়ে আবার নতুন করে খাবার আনতে সমস্যা নেই। আমি এনে দিচ্ছি। আপনি ওটা আর খাবেন না।
তুষার আবার খাওয়া থামিয়ে তনুজার দিকে তাকালো।
আর একটা কথাও না। চুপ! একদম চুপ।
তনুজা আর কিছু বললো না।
কিন্তু তুষারের খাওয়া দেখে ভাবতে লাগলো এই লোক কখনো কারও ব্যবহার করা জিনিস ব্যবহার করে না। বেশি খুঁতখুঁতে টাইপের। আর সেই জায়গায় তার জুঠো খাবার খাচ্ছে!
কী হয়েছে ওনার?
উনি তো এমন না!
প্যারিসে থাকতে কি মাথায় টাথায় ব্যথা পেয়েছে?
তুষার খাওয়া শেষ করে পানি নিতে গিয়ে দেখলো পানির জারটা খালি।
সে তনুজার দিকে তাকালো।
তনুজা ভাবনা থেকে বের হয়ে তুষারের দৃষ্টি লক্ষ্য করলো। মাথায় বুদ্ধি আসলো এই সুযোগে পালানো যাবে।
"দিন,আমি এনে দিই। আর প্লেটও রেখে আসছি। আমারও পানি খাওয়া লাগবে"
তুষার ভ্রু উঁচু করে তাকালো। তারপর সে উঠে দাঁড়ালো।
তনুজা ঠোঁট উল্টালো। মনে মনে ভাবলো এই লোকের সাথে কি আমি এই রুমে থাকবো নাকি! জীবনে না!
তারপর কিছু একটা ভেবে তুষারের পিছু পিছু গেল।
তুষার দরজা বন্ধ করে চলে যেতেেই তনুজা দরজার হাতলটা ধরে রাখলো,যাতে দরজাটা লক না হয়ে যায়। তুষারও আর ততটা খেয়াল করলো না।
সে নিচে চলে গেল। তনুজা কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করলো।
যখন বুঝলো তুষার চলে গেছে,তখনই সুযোগ বুঝে এক দৌড়ে নিজের রুমে ঢুকে গেল। ঢুকেই একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে বিজয়ী হাসি দিলো।
তারপর তাড়াতাড়ি করে একটা চেয়ার টেনে এনে দরজায় ঠেকিয়ে দিলো,যাতে তুষার এসে আর খুলতে না পারে।
তার রুমে সে কখনো লক করেনি। প্রয়োজনও হয়নি।
তাই এসব সে বুঝে কম। লক মনে রাখা ভীষণ ঝামেলার মনে হলেও তুষারের দরজার লকটা সে মনে রাখতো সবসময়।
চেয়ার দিয়ে ঠেক লাগিয়ে বিছানায় উঠে ধপ করে শুয়ে পড়লো। বালিশে মাথাটা গুঁজে দিয়ে খাটের বাইরে অর্ধেক শরীর।
তার চোখের সামনে তখন শুধু ভাসছে সেই অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্যটা লজ্জায় তাকে পুরো ঘিরে ধরেছে। লজ্জায় সে তার পা দুটো ঝাপটালো।
তুষার পানি নিয়ে উপরে আসতেই দেখলো তার রুমের দরজা খোলা। সে যা বোঝার বুঝে গেল। তারপর তনুজার রুমের দিকে তাকালো। পা বাড়ালো নিজের রুমের দিকে। রুমে ঢুকেই সে ঠোঁট কামড়ে হাসলো। সে জানতো
এই বেয়াদপ সুযোগ পেলেই পালাবে।
চলবে।
গল্পটা টিকটক এ রেগুলার দেওয়া হয়। সাথে ফেসবুকেও—( তাসনিয়া জাহান)
নামের আইডি তে।