ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের নির্বসন

১ম পর্ব

লেখক: মৃধা মৌনি

'আমার পছন্দের মানুষটা বিয়ে করে বউ নিয়ে এসেছে। আর তার বাসর ঘর সাজানোর দায়িত্ব কিনা পড়েছে আমার উপর। নাইস না ব্যাপারটা? আসলেই নাইস! আমার ভাগ্যে এরচেয়ে ভালো আর কীইবা থাকতে পারে!'

বলতে বলতে ভেউ ভেউ করে কেঁদে ফেলল বিকেল। তৃপ্তি হতবাক স্বরে শুধালো, 'তুই রোদ ভাইয়াকে ভালোবাসতিস? কই কোনোদিন তো বলিসনি!'

'বলতে হবে কেন? তুই বুঝে নিতে পারলি না? অবশ্য যে বোঝার সেই তো কোনোদিন বোঝেনি। কতবার আমার ভাগের লেগপিস আর চিংড়ি তার সঙ্গে শেয়ার করেছি। তুই-ই বল, আমি জীবনে এগুলো কাউকে দেই?'

তৃপ্তি অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে দু'পাশে মাথা নাড়ালো।

বিকেল কাঁদোকাঁদো কণ্ঠে বলল, 'অথচ তাকে দিতাম। তার সব কাজ আমি নিজের হাতে করতাম। বড় মা আমায় দিয়ে তার কম সেবা করিয়েছে হু? তার জন্য চুল বড় রাখলাম, অথচ আমার সবসময় ছোট চুল পছন্দ। কোনো ছেলে ফ্রেন্ড বানাইনি। সে পছন্দ করে না এসব তাই। স্কুল টু বাসা, বাসা টু স্কুল, আবার কলেজ টু বাসা, বাসা টু কলেজ করে করে জীবনের বারো থেকে তেরো বাজালাম। অথচ দ্যাখ না, যে বেয়াদবের জন্য এসব করেছি সে ঠিকই রঙ্গ - লীলা করে এখন বিয়ে করে নিয়েছে.....আয়ায়ায়ায়া....'

তৃপ্তির বুকের উপর ঝাপিয়ে পড়ল বিকেল। আর্তনাদের স্বরে আওড়ালো, 'কেউ আমাকে বুঝল না। আমার দুঃখটা বুঝল না। বড় মা আমাকেই পাঠাল এই ঘর ঝেড়েমুছে তার ছেলে আর ছেলের বউয়ের জন্য চিতা সাজাতে.. আল্লাহ গো..'

'থাক, কাঁদিস না। তুই তো আমাকে বলতে পারতি একটু! আমাকে বেস্ট ফ্রেন্ড বেস্ট ফ্রেন্ড বলিস, অথচ কাজের কথাটাই বললি না। এখন আর এত হাউমাউ করে কি হবে? যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে।' তৃপ্তি ওকে শান্ত করতে চাইলো।

তাতে আরও জ্বলে উঠল বিকেল, হঠাৎ কান্না থামিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, 'কক্ষনো না, আমি শান্তিতে থাকবো ভাবছিস? ইমপসিবল!! ওই ছেলের হাড় - মাংস জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে না খাওয়া অবধি আমার শান্তি হবে না রে তৃপ্তি। যদি আমি মরে যাই, তারপরও না। এই কষ্টের ফল তো তাকে দিতেই হবে।'

'তার কি দোষ? বেচারা কি জানত নাকি তারই আপন চাচাতো বোন তাকে লাইক করে?'

'জানবে না কেন? পুরুষ মানুষ কি এত ভোদাই নাকি কে তাকে পছন্দ করে, কে অপছন্দ তা বুঝবে না হুঁ? আর তুই তাকে বেচারা বলছিস কেন? তুই কি আমার পক্ষে নাকি তোর ওই হারামখোর ভাইয়ের পক্ষে? এই তৃপ্তি, উত্তর দে!'

তৃপ্তি হাত দুটো জড়ো করে বলল, 'আমায় ক্ষমা কর, তোদের মাঝখানে আমি ঢুকতে চাই না। যা খুশি করিস গে, এখন ঘরটর গুছা। বড় মা এলো বলে।'

'আসুক, পারব না আমি।'

'বিকেল!'

'কি? বুকে ছুঁড়ি গাঁথবে আর আমি তার জন্য ফুলের বিছানা সাজাবো? নো ওয়ে... পারব না। না মানে নাআয়ায়ায়া....'

তৃপ্তি মৃদু শ্বাস ফেলল। ভেতর দিয়ে হাসিতে পেট মুচড়ে উঠছে তার। বিকেলটা এরকমই, একটু অদ্ভুত। অল্পতেই অতি আবেগী। কাঁদতেও সময় নেয় না, হাসতেও না। ওর ক্রাশ লিস্টের তালিকা বিশাল বড়। তার ভেতর যারই বিয়ে হোক, তাকে নিয়েই এমন হাউ হাউ করবে মেয়েটা। তৃপ্তি এই আচরণের সঙ্গে অভ্যস্ত। কিন্তু এবার যে নিজেদের আপন কাজিন, মির্জা বাড়ির বড় ছেলে রোদ্দুরের দিকেও নজর দিবে পাগলি মেয়েটা, এটা সত্যিই বিস্ময়কর ব্যাপার ছিল তার জন্যে। একই সঙ্গে ভয়াবহ। রোদ্দুর ভাই জানলে মে'রে হাড্ডি গুড্ডি একত্র করে জড়ো করবে। সেগুলো দিয়ে এই ঠান্ডায় আ'গুন ও ধরাতে পারে। যে জল্লাদ ছেলে বাপরে বাপ...পাগলিটা বুঝতে চাইছে না। এভাবে কান্নাকাটি করার কোনো মানে হয়?

ওরা সবাই একই বাড়িতে হৈ হৈ করে বড় হওয়া, মেতে ওঠা ভাই-বোন দল। বাড়িটির নাম 'অশ্রুপাত'। এমন অদ্ভুত নাম করণের কারণ কেউই জানে না। এমনকি এ বাড়ির সিনিয়র কর্তা উমেদ মির্জাও না। বংশ সূত্রে পাওয়া এই দোতলা বাড়িতেই তারা চার ভাই-বোন মিলেমিশে বসবাস করছে। আজকালকার যুগে এমন দেখা মেলা ভার। কিন্তু উমেদ মির্জার এক কথা, যতদিন মা বেঁচে আছেন, ততদিন সব ভাই-বোন পরিবার নিয়ে একত্রে থাকব। তিনি যেন মনে বিন্দুমাত্র কষ্ট নিয়ে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে না যান। সেই মোতাবেকই নিচ তলার দুই ইউনিট বড় ভাই, মেজো ভাই, আর দোতলার দুই ইউনিট ছোট ভাই এবং একমাত্র বোন ভাগ বাটোয়ারা করে সুন্দর মতো থাকছেন। বড় ভাইয়ের ঘরে দুই ছেলে মেয়ে- রোদ্দুর এবং মিশি। মেজো জনের দুই মেয়ে, তৃপ্তি এবং স্বস্তি। ছোট ভাইয়ের একমাত্র মেয়ে বিকেল। আর ফুপুর দুই ছেলে সৌম্য, দীপ্র। এই সাত ভাই-বোন এ বাড়ির প্রাণ যেন। ওদের চঞ্চলতায়, মুখোরতায়, হৈ-হল্লায় মির্জা বাড়ি সরগরম হয়ে থাকে সবসময়।

তবে আজকের বিষয় ভিন্ন।

আজ এ বাড়ির বড় ছেলে এমন একটি কান্ড ঘটিয়ে এসেছে তা কেউ ঘূনাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেনি। সময়টা বিকেল বেলা ছিল। ভাতঘুম সেড়ে যে যার মতো উঠে ব্যস্ত হয়ে ছিল কাজে। সন্ধ্যের নাশতা, রাতের রান্না কি হবে তাই নিয়ে গুজগুজ চলছিল রান্নাঘরে। ছেলে মেয়েরা সবাই বসেছিল বাড়ির মধ্যখানের এক টুকরো উঠোনটায়। কুয়াশার চাদর নামছিল ঝুপ করে। ঠিক সেই সময়টায় কলিং বেল বাজলো মূল দরজায়। দীপ্র উঠে এলো দল ছেড়ে। দরজা খুলতেই আর্তচিৎকার ভেসে এলো মুখ থেকে তার। সজোরে চিৎকার করে বলে উঠল, 'ভাইয়ায়ায়ায়া...'

সেই আর্তনাদে পড়িমরি করে ছুটল সবাই। যে যেখানে ছিল। এমনকি বিকেলও। মেয়েটা সবেমাত্র তার আর্টের সরঞ্জাম নিয়ে বসেছিল। একটা সূর্যাস্ত ডোবা আকাশকে ফ্রেম বন্দী করার শখ অনেকদিন যাবত। আজ সেই ইচ্ছে নিয়েই আঁটসাঁট হয়ে বসেছিল, কিন্তু তাকেও উঠে ছুটতে হলো শেষমেশ। উঠবার সময় নীল রংটা ছলকে পড়ে হাত, জামা, পায়ের কিছুটা অংশে দাগ ফেলল। বিকেল পাত্তা দিলো না। রোদ্দুর ভাইয়ের কি হলো, তাই জানা মূখ্য বিষয়। দেখা গেল, মানুষটার কিছুই হয়নি। ছয় ফুট তিন ইঞ্চির সটান দেহখানা টান টান করে দাঁড়িয়ে আছে পাথুরে মুখ করে, তবে পাশে দাঁড়ানো পাঁচ ফিট নয় ইঞ্চির মেয়েটাকে চিনতে পারল না বিকেল। মেয়েটার চোখ ভরা কৌতূহল। কেমন ড্যাবড্যাব করে চেয়ে চেয়ে দেখছে সবাইকে। এমনকি বিকেলও। ওকে দেখে রোদ্দুরের হাতটা আঁকড়ে ধরল আরও শক্ত করে। বিকেল বিস্ফোরিত। তারপর পরই জানল সবচেয়ে অপ্রিয়কর সত্য কথা। মেয়েটা আর কেউ নয়, তারই পছন্দের মানুষটির সদ্য বিবাহিত স্ত্রী!

★★★

বিকেল এখনো কাঁদছে। চোখজোড়া লাল হয়ে ফুলে গিয়েছে তার। নিজে কিছু করছে না, তৃপ্তিকেও নড়তে দিচ্ছে না। তৃপ্তি হতাশ। কী বলে যে স্বান্তনা দেবে- ঠিক বুঝে আসছে না তার। একটা হাত পিঠের উপর রেখে ঘষে চলছিল, এমন সময়ে ভিড়িয়ে রাখা দরজাটা টান হয়ে খুলে গেল। তৃপ্তি চমকে উঠে দেখল, রোদ্দুর এসে দাঁড়িয়েছে। চোখমুখ নির্লিপ্ত, যেন কোথাও কিছু হয়নি।

তৃপ্তি কিছু একটা বলার জন্য ঠোঁট সামান্য ফাঁক করতেই চোখ ইশারায় তাকে থামতে নির্দেশ দিলো রোদ। ঘরের ভেতর ঢুকে তৃপ্তিকে বাইরে চলে যেতে ইশারা করল। বিকেল দেখল না কিছুই। তার পিঠ পিছনে রোদ্দুর দাঁড়িয়ে।

তৃপ্তি ভাইয়ের কথা মোতাবেক ঠেলে বিকেলকে সরালো বুকের উপর থেকে, আমতা আমতা স্বরে বলল, 'সব ঠিক হয়ে যাবে। আমায় একটু যেতে দে।'

'কই?' ভাঙা কণ্ঠস্বর।

'দুই মিনিট, তুই বোস, আমি আসছি।' বলেই উঠে ছুটল তৃপ্তি। তার যাওয়ার পানে অনুসরণ করেই পেছন ফিরে চাইল বিকেল আর চমকে উঠল। মানুষটা পাঞ্জাবির দু' পকেটে হাত ঢুকিয়ে দাঁড়িয়ে তার দিকেই চেয়ে আছে। ভাবভঙ্গিতে কোনো বিকার নেই। বাহ রে! এর জন্য কিনা কেঁদে কেঁদে ম'রছিল সে.. নিজেই নিজেকে ধিক্কার জানিয়ে উঠে পড়ল বসা থেকে। লাফ দিয়ে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই একটা হাত বাড়িয়ে টেনে নিজের বুকের পাটাতনে আছড়ে ফেলল রোদ্দুর। বিকেল আঁতকে ওঠে। এত কাছে এর আগে কোনোদিন আসা হয়নি।

'কোথায় যাচ্ছিস?' ফিসফিস করে জানতে চাইলো সে।

বিকেল মুচড়ে উঠতে উঠতে জানাল, 'জাহান্নামে।'

গলা দিয়ে কথা নয় যেন আ'গুনের হলকা বেরোচ্ছে তার। হাসল ছেলেটা, 'ওখানে যাওয়ার পারমিশন তোকে কে দিয়েছে?'

'আমার যেখানে খুশি আমি সেখানে যাবো। পারমিশন নেওয়ার কি আছে?'

'আমার পারমিশন ছাড়া এক পা এদিক ওদিক হলে ভেঙে হাতে ধরিয়ে দিতে দু সেকেন্ড লাগবে না যে, ভুলে গেছিস?'

'ওটা আগের হিসেব, এখন ভিন্ন!'

'কি ভিন্ন?'

'তোমায় বলতে পারব না রোদ ভাইয়া, ছাড়ো।'

'ছাড়বো না।'

'আমি কিন্তু চেঁচাবো।'

'চেঁচা।'

'বেশি করছ।'

'জানিসই তো বাড়াবাড়ি আমার র'ক্তে মিশে আছে।'

'ভালো হচ্ছে না কিন্তু।'

'কবে ভালো কিছু করেছিলাম আমি?'

'রোদ ভাইয়া?'

'কি?'

'আমার হাতে লাগছে।'

এইবার ছেড়ে দিলো রোদ্দুর। বিকেল সুযোগ পেয়েই সরে দাঁড়াল। হাতটা দেখল ভালো করে। লাল হয়ে গেছে জায়গাটা। এত শক্ত করে চেপে ধরে কেউ! পাঠার বাচ্চা একটা। দুনিয়ার আর কারো বেলায় কোনো মাথাব্যথা নেই, যত জোরজারি সব তার সঙ্গে! তোর বউটা যেন তোর চেয়েও ডাবল ত্যাড়া হয়, তুই যদি ডানে যাইতে বলিস, সে যেন বায়ে যায়। তোর জীবন যৌবন সব যেন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে। দোয়া করে দিলাম... বদদোয়া, ফুউউউউ....মনে মনে বিড়বিড় করে বিকেল। তার ফু শেষ হতেই হেসে ওঠে রোদ্দুর।

বিকেল ভ্রু কুঁচকে তার দিকে চেয়ে শুধাল, 'কি?'

রোদ্দুর দু'হাতে মুখ চেপে ধীর পায়ে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল, দু'ধারে মাথাটা নাড়তে নাড়তে বলল, 'কিছু না।'

তারপর ফট করে দরজাটা আঁটকে দিতেই লাফিয়ে উঠল বিকেল।

'কি হলো এটা...দরজা আঁটকাচ্ছ কেন?' বলতে বলতে এগিয়ে এল চপল পায়ে।

রোদ্দুর ঘুরে দাঁড়িয়ে আকস্মিক বিকেলের হাত দুটো মুঠোয় ভরে নিয়ে বলল, 'শান্ত হ। কিছু বলেই চলে যাবো। সিনক্রিয়েট করছিস কেন?'

'আমি সিনক্রিয়েট করছি, আমি? তুমি আসলেই একটা লুচু! বউ যদি দেখে বোনকে নিয়ে এক রুমে দরজা আঁটকে আছ, কি ভাববে কি, হুঁ?'

চোখ-মুখ শক্ত হয়ে গেল রোদ্দুরের। এমন কিছু বলতে পারে বিকেল, কল্পনাতেও ভাবেনি ছেলেটা। বিকেল ও কোনোদিন ভাবেনি রোদের সামনে এমন আচরণ করবে সে। সবসময় মাথানিচু করে চুপচাপ সব মেনে আসা বিকেলের আজ কি হলো। কিছুই পরোয়া করতে চাইছে না যেন।

সত্যি সত্যি, রোদ্দুরের এমন কাজ মানতে কষ্ট হচ্ছে তার। বুক জ্বলেপুড়ে ছাঁই হয়ে যাচ্ছে৷ না পারছে কাউকে বোঝাতে, না পারছে নিজেকে শান্ত করতে। তাই তো না চাইতেও উঠে আসছে এলোমেলো কথাবার্তা। সামনা সামনি থাকলে ভয়াবহ কান্ড হতে পারে ভেবেই বিকেল বাইরে বেরোনোর জন্য অস্থির হলো।

তাতে রোদ্দুরের মেজাজ চড়লো চটপট করে। গলার পারদ তুলে শুধালো, 'সমস্যা কি? আমার সঙ্গে এর আগে এক ঘরে থাকিসনি নাকি? এখন এত ঢং কেন?'

'ওই যে বললাম, এখন হিসেব আলাদা।'

'কিসের হিসেব আলাদা? আমার বউ হলেই তুই তোর ইচ্ছা স্বাধীন মতো যা খুশি তাই করতে পারবি?'

'আপনি যদি যা খুশি করতে পারেন, আমাদের করায় দোষ কিসের?'

'কি বললি, কি বললি, আবার বল...'

বলতে বলতে বিকেলকে দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড় করালো রোদ্দুর। চেপে ধরল হাত দুটো এক হাতে। অপর হাতের দু আঙুলে থুতনি চেঁপে চোখ গরম করে শুধালো, 'কি যেন বলছিলি, আবার বল এখন।'

'উমম...উমম...' কিছু একটা উত্তর দিতে মুখ খুললেও উচ্চারণ করতে পারল না। রোদ্দুর আরও জোরে চাপা দিয়ে ধরল, এবার ব্যথায় গুঙিয়ে উঠল মেয়েটা। রোদ্দুর ছেড়ে দিলো। গম্ভীর কণ্ঠে সাবধান করল, 'তোর ভন্ডামি দেখতে এ ঘরে আসিনি। একটা কথা বলতে চেয়েছিলাম বাট.. যাকগে; আমার ঘর থেকে বের হ। নেক্সট টাইম এ ঘরে তোকে যদি দেখি, তোর হাড় আস্তো থাকবে না একটাও! অসভ্য মেয়ে, ভুলেই গেছিস কীভাবে বড়দেরকে রেসপেক্ট দিয়ে কথা বলতে হয় তাই না?'

গজরাতে লাগল সে। বিকেল চোখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে এলো। মনে মনে আওড়ালো, 'পাঠার বাচ্চা পাঠা। আমায় এত দুঃখ দেওয়া। হাতে, গালে, হৃদয়ে...তোকে যদি এরচেয়ে অধিক দুঃখে দুঃখীত না করি তবে আমার নাম ও বিকেল মির্জা নয়। তোর ফুলসজ্জার সজ্জাকে আজ যদি না শুইয়েছি...তবে তোর একদিন কি আমার যতদিন লাগে! জাস্ট দ্যাখ তুই!'

_______

মেহেরজান আদিবার থুতনি ধরে বললেন, 'মাশা আল্লাহ। চান্দের টুকরা নাতিবউ আমার। ও রোদ, এইরম পরী তুই খুইজ্জা আনলি কোনহান থেইকা রে?'

আদিবা শরমে নাই। গদগদ হয়ে চিবুকের সঙ্গে বুক মিশিয়ে নিয়েছে। পারছে না মিশে যেতে সোফার ভেতর। বিকেল দাঁড়িয়ে আছে রাগ শূন্য মুখে। চোখজোড়া লাল তার। তাই দেখে মেজো চাচী লতা জানতে চেয়েছিলেন, 'তোর চোখে আবার কি পড়ল রে?'

'ছানি পড়ছে মেজো মা।' কাটকাট গলায় জবাব ছুঁড়ে দিয়ে সরে পড়েছে। লতা থতমত খেলেন। এর আবার কি হলো! সৌম্য চোখের ইশারায় জানাল, সে কিছুই জানে না।

স্বস্তি ফিসফিস করে বলল, 'এই নিয়ে চৌদ্দবার দাদী এই কথাটা বলল। একটা মানুষ এক কথা কতবার বলতে পারে রে আপা?'

বিকেল ভাবলেশহীন গলায় জবাব দিলো, 'যতবার মন চায়। এ বাড়িতে আজ থেকে যার যা খুশি তাই করবে।'

'তোমার আবার কি হলো আপা? তুমি এমন চেতে চেতে আছ কেন?'

'তোর কি তাই মনে হচ্ছে?'

'অবশ্যই। তোমার চোখেমুখে রাগ উপচে পড়ছে। এই রাগ দেখাবে বড় মা। সেই দেখো না, বউয়ের জন্য জমিয়ে রান্না করছে রাতের। শুধু বড় বাবাই নিশ্চুপ, বাদ বাকি সবাইকে দেখে মনে হচ্ছে, এগুলো ডাল-ভাত ব্যাপার। তাই না?'

'হবেই তো, এ বাড়ির সুপুরুষ তো সে। নিশ্চয়ই তুলে নিয়ে এসেছে কোনো রানী, মহারানী, তাই কারো কোনো মাথাব্যথা নেই। তুই আমি করলে এতক্ষণে ত্যাজ্য করে দিতো।'

'যা বলেছো, আসলেই। রোদ্দুর ভাইয়ার বেলায় সব মাফ, আমাদের বেলায় সব ভুল।'

'হাড়ে বজ্জাত শয়তান যে একটা। কয়জন চেনে ওর রগ!' দাঁতে দাঁত ঘষলো বিকেল। স্বস্তি হেসে ফেলল। মেহেরজান খেঁকিয়ে উঠলেন দু'জনের উপর, 'ওখানে দাঁড়াইয়া খিকখিক না কইরা ভাবিরে নিয়া তার ঘরে বসা। মাইয়াডা নয়া আইছে। ভয়ে কাঁপতাছে কেমুন। ওর লগে কথাবার্তা কইয়া হালকা কর। এই বিকাল, এই ছেড়ি আইয়া নিয়া যা তোগো ভাবিরে..'

'আমার বাল..' মনে মনে আওড়ে স্বস্তিকে ঠ্যালা দিয়ে সামনে এগিয়ে দিলো সে। পেছন থেকে বলল, 'নিয়ে আয় তোর ভাবিকে।'

তারপর নিজে গটগটিয়ে এগোলো দীপ্রর খোঁজে। রোদ্দুর ভাইয়া তার ঘরে আছে। আজকে তার ঘরেই নতুন বউ নিয়ে বাসর হবে। যা করার ওখানেই করতে হবে। দীপ্রকে পাওয়া গেল তার ঘরেই। খেলছিল ফোনে, ফুপি নেই, সৌম্য নিচে, এই সুযোগ।

বিকেল দীপ্রকে ডেকে নিলো।

'আয় না ভাই, প্লিজ প্লিজ..'

দীপ্র বিরক্ত হয়ে বলল, 'আমার গেমটা ধরলেই একটা না একটা জ্বালা হাজির হয়। একটু শান্তিতে খেলতে পারি না। তোমার কি চাই, হুঁ?'

'তুই আয় একবার, যা করতে বলব, জাস্ট চুপচাপ করবি। কাউকে বলবি না, কাউকে না। একদম সিক্রেট রাখবি, বিনিময়ে এক হাজার টাকা দেবো।'

চকচক করে উঠল দীপ্রর চোখজোড়া, 'সিরিয়াসলি?'

'আরে হ্যাঁ, তিন সত্যি! আচ্ছা অগ্রিম ৫০০ দিবো, আসবি?'

'আসব।'

দীপ্রকে নিয়ে চলে এলো সেই ঘরে, পা টিপে টিপে এগোলো তারা। দীপ্রকে দিয়ে দেখালো ভেতরে রাক্ষসটা বসে আছে কিনা এখনো। দীপ্র সাধারণ ভাবেই হেঁটে হেঁটে ঢুকে আবার বেরিয়ে এলো। নেই কেউ, বিকেলের বুকের উপর থেকে একটা বড় পাথর সরে গেল। তাড়াতাড়ি করে ভেতরে ঢুকেই দরজা দিলো আঁটকে। বজ্জাতটা কোথায় গেছে কে জানে। যাক যে চুলায়, তারই সুবিধা হলো, যা করতে এসেছে চুপচাপ করেই বেরিয়ে যাবে, কেউ কিছু টের পাওয়ার আগেই...

এরপর যা হলো, তা ঘটতে সর্বোচ্চ মিনিট দুই সময় লাগল বিকেলের। এটাচড বাথরুম এই ঘরটায়, বালতি ভরে পানি টেনে এনে দীপ্রকে নিয়ে মনের মাধুরি মিশিয়ে পুরো বিছানায় জুড়ে পানি ছড়িয়ে দিলো সে। প্রথমে অবাক হলেও পরে খুশি মনেই কাজটি করল দীপ্র। বিকেল আপু মানেই মজার কিছু। এর আগেও কত ক্রাইম ঘটিয়েছে তারা দু'জন একসাথে। এক বালতি পানি পুরোটা শেষ করল বিকেল, তারপর আরেক বালতির হাফ পানি এনে একদম মাঝখানে ঢালল। তোশক ভিজে শেষ। উপর দিয়ে চাদরটা বিছিয়ে দিলো যেন বোঝা না যায়। যেই বসতে যাবে অমনি টের পাবে... এই শীতের ভেতর, হা হা হা, বেচারা...তোর বাসর...শুয়ে পড়েছে রে!

মনে মনে খুশিতে বাগবাকম হলো সে। হৃষ্টচিত্তে বেরিয়ে এল পরে। ঈদের সালামি থেকে বাঁচানো এক হাজার টাকার নোটটা দীপ্রকে ধরিয়ে দিয়ে কসম কাটিয়ে নিলো, এ কথা যেন ঘুনাক্ষরেও ফাঁস না হয়। যেভাবে গেম খেলছিল, সেভাবেই গেম খেলতে থাকবে। আর বিকেল বসবে পড়তে। পড়াশোনার উপরে কিছু নাই। একমাত্র এইটাই মানুষের সাথে প্রতারণা করে না। বাদবাকি সব ছেড়ে যাওয়া পার্টি...

________

সত্যি সত্যি হল্লা পড়ে গেল রাত বাড়তেই। প্রথম টের পেল আদিবা। ওকে নিয়ে বসানোর সঙ্গে সঙ্গে ধপ করে দাঁড়িয়ে পড়ল মেয়েটা। পরনের সেলোয়ার কামিজ ভিজে গেছে সামান্যতেই। মেজো চাচী সন্দেহের জেরে বিছানায় হাত রেখেই চিৎকার করে বললেন, 'ও আল্লাহ রে, পুরা বিছানা ভিজা। এত্ত পানি কে ফালাইছে, আয় হায়।'

হৈ হল্লা শুনে ছুটে এলো সকলেই। বিকেলও ছুটে এলো সবার সঙ্গে। গলা মিলিয়ে বলল, 'হায় হায়, এগুলা কি!'

রোদ্দুর সবার শেষে ঘরে ঢুকল। সে গিয়েছিল ছাদে, সিগারেট টানতে। চিৎকার চেঁচামেচি শুনেই নিচে চলে আসা। বড় মা ছেলের দিকে তাকিয়ে উদ্বেগ জড়িত গলায় শুধালেন, 'দ্যাখ না বাবু, পানিতে ভিজে চুপচুপা পুরা। এসব কে করল!'

রোদ্দুর কিছুই বলল না। শুধু কেমন চোখে বিকেলের দিকে তাকাতেই বিকেল দাঁত গুলো বের করে হাসি দিয়ে বলে ফেলল, 'কেমন ভাবিগো আমাদের, হায় হায়, এসেই মুতু দিয়ে পুরো বিছানার সর্বনাশ করছে।'

তার কথায় উপস্থিত বাচ্চা দল হেসে উঠল খিলখিল করে। হাসল না কেবল রোদ্দুর মির্জা। চোখে-মুখে অমানিশার অন্ধকার তার।

(চলবে?)

#প্রেমের_নির্বাসন

#পর্ব_০১

লেখনীতে- #মৃধা_মৌনি

['আলিঙ্গনে দহন' গল্পের মূল টুইস্টটাই এই গল্পে রেখে নতুন থিমে নতুন আঙ্গিকে শুরু করলাম। সবাই পড়ে ভালো-মন্দ জানাবেন কিন্তু। এটা নির্দ্বিধায় পড়তে পারেন, চলবে ইনশা আল্লাহ।]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন