ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের নির্বসন

২য় পর্ব

লেখক: মৃধা মৌনি

#প্রেমের_নির্বাসন - (২)

লেখনীতে- #মৃধা_মৌনি

_____

বড় মা চোখ রাঙিয়ে তাকাতেই বাচ্চা দল চুপটি মেরে গেল। বিকেল গলা খাঁকারি দিয়ে কিছু একটা বলবে, তার আগেই মেহেরজান ধমকে উঠলেন, 'সবডি বিচ্ছুর দল বাইর হ। তোগো মধ্যেই কেউ না কেউ এই কাজটা করছোস। নতুন বউ আইছে বাড়িত, আর দুষ্টামি শেষ হয় না। সবডিরে বাইন্ধা পিডান লাগে। বজ্জাতের দল।'

বিকেল বিড়বিড় করল, 'বুড়ির বড় দয়া মায়া জাগছে নয়া বউয়ের উপর! তারেও দুটা ডোজ দিতে হবে। কটকটি বুড়ি..'

'কি বিড়বিড় করোস? ওই ছেড়ি....'

'বুড়ির চোখ রে!' মনে মনে বলল বিকেল, মুখে বলল, 'সূরা পড়ি। দেখো না কেমন জ্বিনের তান্ডব। এত্তবড় বিছানাটা ভিজে কি অবস্থা....'

'হ, এখন সব দোষ জ্বিন পরীর, তোগো কোনো দোষ নাই?'

'আমরা কি করছি? আজব তো! এই ঘরে যা হয় সবকিছু ঘুরে ফিরে আমাদের কাঁধের উপর পড়ে কেন?'

'তোদের না, তোর কান্ধের উপর। কারণ এই বাড়িত উল্টাপালটা করোনের মাইয়া একমাত্র তুই-ই...'

'ভাল্লাগে না দাদী। অযথাই না জেনে আমারে ব্লেম দিবা না খবরদার।'

'একশোবার দিমু। কি করবি তুই? আঁ?'

'বুড়িরে...'

'আহ!' আদিবা বলে উঠল দুই দাদী-নাতনির মাঝখানে এবার। নরম সুরে গলা ঝাড়ল, 'থাক দাদী, যা হওয়ার হয়ে গেছে। না জেনে কারো উপর আঙুল দেওয়া ঠিক না।'

মেহেরজান বললেন, 'ওরে তুমি চিনো না নাতিবউ। দুনিয়ার বান্দরনী এইটা। এই আকাম যদি কেউ কইরা থাকে তবে সেইটা ও-ই।'

'থাক দাদী। করলে করছে। এই বয়সেই ছেলে মেয়েরা একটু মজা মশকরা করে থাকে। এরপর বড় হয়ে গেলে কি আর এই দিন ফিরে আসবে? আপনি আর বকবেন না তো। বাদ দিন।'

'দেখছোস, দেখছোস কত্ত ভালা মাইয়া। এগুলা হচ্ছে বংশের শিক্ষা। তোগোরে দিতে পারলাম না। এই চলো সবাই, নয়া বউরে আমার ঘরে বসাও আর এই তোশক বিছানা সব পাল্টানোর ব্যবস্থা করো বড় বউ মা। এই তৃপ্তি, ধর তোর ভাবিরে, নিয়া চল।'

সবাই বেরোতেই বিকেল ধপ করে রকিং চেয়ারটার উপর বসে পড়ল। বসে বলতে শুয়েই পড়ল একপ্রকার। রকিং চেয়ারটা জোরে দুলে উঠল। বিকেল চিবিয়ে চিবিয়ে আওড়ালো একা একাই, 'শালার কপাল.. ঘরের শত্রু বিভীষণ! একজনে কি কম ছিল খোদা, এখন আরেকটারে পাঠাইলা তুমি। এতদিন বুড়ির যন্ত্রণা সইতে সইতে দেহ কয়লা, এখন এই নয়া বউয়ের ঢং সইতে সইতে কলিজা কয়লা হবে। কি নাটক বাবারে...' তারপর ভেঙচিয়ে বলল, 'থাক বাদ দিন, আপনি আর বকবেন না...হুহ!'

কথাটা শেষ করা মাত্রই মাথার উপর গাট্টা পড়ল একটা। বিকেল চমকে উঠে দাঁড়াল। ভ্রু জোড়া কুঁচকে গেছে তার। রোদ্দুর মির্জা পাথুরে মুখ করে দাঁড়িয়ে। চাটিটাও সেই মেরেছে।

বিকেল ভয় পেলেও প্রকাশ করল না। সাহস বজায় রেখেই হম্বিতম্বি গলায় শুধাল, 'সমস্যা কি? মারো ক্যান?'

রোদ্দুর বলল, 'তুই আমার বউকে ভেঙালি কেন?'

'তাতে কি হইছে? তোমার বউয়ের গায়ের গোশত এক কেজি কমে গেছে?'

'তারচেয়েও বেশি। ও আমার বউ! মাইন! ওর ওয়েট আছে একটা। যার তার মুখ দিয়ে তার নামে ভেংচি বের হবে আর আমি সেই মুখ আস্তো রাখব ভেবেছিস?'

'উরি..উরি..উরি.. মাইরি! কি ডায়লগ বাপ!

দেখো না, ভয়ের চোটে আমার কিডনি লক হয়ে গেছে। থরথর করে কাঁপতেছে। সিরিয়াস, বিরাট ভয় পাইছি, উঁহু উঁহু উঁহু...'

রোদ্দুর চেয়ে চেয়ে বিকেলের নাটকটা দেখল। তারপর হঠাৎ এগিয়ে এসে এক হাতে ওর গলার নিচ দিয়ে ঢুকিয়ে ক্যাজা করে চেপে ধরল। পিঠটা মিশলো বুক বরাবর। বিকেল হতভম্ব হয়ে চিৎকার করতে নিতেই অপর হাত দিয়ে মুখটা আঁকড়ে ধরল। বিকেল দু'চোখে এবার নিশ্চিত ভয়। রোদ্দুর মুখটা কানের কাছে নামিয়ে ফিসফিসিয়ে জানতে চাইলো, 'এখন কর, উঁহু উঁহু উঁহু, আহা আহা আহা...'

'উমম উমম...'

'কি উমম উমম? এখন ওই সাউন্ড গুলা কর। অসভ্য সাউন্ড গুলা।'

'উমমমম...' মোচড়ে চলেছে বিকেল, ছাড়া পাবার জন্য। যতই মোচড় দেয় ততই শক্ত করে চেপে ধরে রোদ্দুর। শেষ পর্যন্ত শক্তিতে না পেরে হাল ছেড়ে একদম নিথর হয়ে পড়ে। রোদ্দুর এবার ছেড়ে দিতেই ওর দেহটা ধপ করে রকিং চেয়ারের উপর পড়ল। রোদ্দুর এগিয়ে গেল বিছানার দিকে। যেতে যেতে বলল, 'নিজেকে বড্ড চালাক ভাবিস তো, তবে জেনে রাখ, অতি চালাকের গলায় দড়ি।'

গলার কাছটা জ্বলে যাচ্ছে। অত শক্ত করে চেপে ধরে কেউ। আরেকটু হলে হয়তো বুকের দম আঁটকে মরেই যেতো ও। অসভ্য পাজি লোক একটা! খালি পারে জ্বলুনি দিয়ে যেতে। নেভানোর যোগ্যতা তো নেই!

রোদ্দুর এক টানে চাদরটা ফেলে দিলো মেঝেতে। তোশকের রঙ নীল, ভিজে চুপচুপে হওয়ায় গাঢ় নীল দেখাচ্ছে এখন। অনেকটা ডার্ক নেভি ব্লু কালার- সেই দিকেই একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল সে। তারপর হঠাৎই পেছন ফিরে বিকেলের চোখে চোখ রেখে ঠান্ডা স্বরে শুধালো, 'আমার বাসরে তোর এত জ্বালা কীসের রে? নিভাতে দেড় বালতি পানি খরচ করেছিস!'

ঈষৎ কেঁপে উঠল বিকেল। চোখের তারায় ঢেউ খেলে গেল একটা। ধরা পড়ে যাওয়ার মতো মুখখানা করে সেকেন্ড তিনেক নিশ্চল রইল সে। রোদ্দুর ও স্থির, যেন উত্তর না জেনে এক পা-ও নড়বে না সে।

বিকেল ইতস্তত করল, হাসল ক্ষীণ, টলাতে না পেরে শেষমেশ আমতা আমতা করে বলে উঠল, 'আ..আমি...আমার...মানে আমার জ্ব..লবে কেন? তো...মার বউ, তোমার খাট, আমার তাতে কি?'

'তোতলাচ্ছিস কেন তাহলে?'

'এম...নি..এমনি আর কি। যে জোরে চাপ দিয়ে ধরলে গলায়, কথা আঁটকে আঁটকে আসছে।'

'তুই করিসনি?'

বিকেল দু'দিকে মাথা নাড়লো, 'উঁহুম, এত্ত জঘন্য একটা কাজ আমি করতে পারি বলো? রোদ ভাইয়া, আফটার অল সে তোমার ওয়াইফ, আজ তোমাদের বাসর রাত, আর আমি কিনা এ ধরনের একটা কাজ করব?'

'তার মানে আমার বাসরে তোর কোনো সমস্যা নেই, তাই বলতে চাইছিস?'

'হ্যাঁ, কোনো সমস্যা নেই।'

'যার সঙ্গে খুশি তার সঙ্গেই বাসরটা সাড়তে পারব নাকি?'

'হ্যাঁ হ্যাঁ, করো....এই না, এক মিনিট, যার সঙ্গে খুশি মানে? বিয়েটা যার সঙ্গে করেছ তার সঙ্গে করবে। এখানে অন্যের কথা এলো কোথা থেকে?'

'তুই-ই তো বললি, আমার বাসরে প্রবলেম নেই, যার সাথে খুশি করতেই পারি।'

'কথার প্যাঁচে ফেলবে না রোদ ভাইয়া! আমি সেটা মোটেই বলিনি। বলেছি, তোমার বাসরে আমার প্রবলেম নেই।'

'তাহলে যার সাথে খুশি করতেই পারি। আচ্ছা, ঠিক আছে।'

'আরে না, এটা বলিনি আমি...'

'তাহলে কি বলছিস তুই? আমার বাসরে তোর সমস্যা আছে, সেটাই মানছিস তো, নাকি?'

'হ্যাঁ, মানছি। তোমার বাসরে আমার অসুবিধা আছে। তুমি করবে বাসর আর আমি চেয়ে চেয়ে দেখব নাকি?'

'হুম, এর মানে যার সাথে খুশি তার সাথে করতে পারি না তাই তো?'

'একদম!'

'করতে গেলে তুই পানির বালতি উলটে ফেলে এরকম সব ভিজিয়ে দিবি, তাই তো?'

'একদম একদম! আবার জিগা....'

ফট করে দাঁত দিয়ে জিভটা কাটলো বিকেল। ভয়ার্ত চোখজোড়া মেলে দেখল রোদ্দুরের ঠোঁটের কোণে একটা নাই নাই হাসি ফুটে উঠেছে। শিট শিট শিট!! এই লোকটা সবসময় কথার খেলায় খেলে বিকেলকে হারিয়ে দিয়ে নিজে জিতে যায়। উদ্ধার করে নেয় সবকিছু যা লুকাতে আপ্রাণ চেষ্টা চালায় মেয়েটা। এর আগেও এমন বহুবার হয়েছে। আজকেও হলো! ধুর, বিকেলই বা কি! জানেই যখন রোদ্দুরের স্বভাব সম্পর্কে, তখন কেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথার খেলায় মাতলো? দৌড়ে ভেগে গেলেই পারতো। এখন কি হবে? যা হবে তা ইন্না-লিল্লাহ...

বিকেল মনে মনে বিপদ কাটানোর দোয়া পড়তে শুরু করতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে কি দোয়া পড়ল, কে জানে। তাতে বিপদ না কমে আরও বাড়ল বরং।

এগিয়ে এল রোদ্দুর। বিকেল পিছাতে গিয়ে রকিং চেয়ারটা পায়ের কাছে বাঁধা বাঁধলো তার। থমকে দাঁড়িয়ে সামনে চেয়ে একটু হাসার চেষ্টা করল। রোদ্দুর এগোতে এগোতে একেবারে তার সম্মুখপানে এসে দাঁড়িয়েছে। দু'জনের ভেতর ডিফারেন্স কেবল মাত্র এক হাতের।

বিকেল আমতা স্বরে শুধালো, 'সরি..রো...রোদ ভাইয়া...সরি।'

'শুনতে চাইনি।' জবাবটা এলো কাটকাট গলায়।

মিঁইয়ে গেল বিকেল, মাথানিচু করে দাঁড়াল এবার। যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। এবার যে শাস্তি ধার্য করা হবে, তাই সই। কিন্তু নিজের প্রতি রাগ লাগছে অনেক। কীভাবে জেনেবুঝেও এই পাগলের পাল্লায় পড়ে গেল, ছিঃ!

ওর হাত টেনে ধরল রোদ্দুর, 'আমার বিয়েতে, আমার বাসরে তোর এত আ'গুন ধরল কেন রে, এটাই বুঝলাম না। এটার উত্তরও আমার চাই..বুঝলি, চাই?'

বলতে বলতে টেনে নিয়ে চলল বাথরুমে।

বিকেল হাত মুচড়ে ছাড়ানোর চেষ্টা করল না। চুপচাপ গিয়ে দাঁড়াল তার পিছু পিছু।

'উত্তর দিবি নাকি যা করতে বলব তাই করবি? চুজ কর, চালু!' ধমকে উঠল এবার সে।

বিকেলের দু'চোখ টলমল করছে। উপচে পড়তে চাইছে জল কণারা। বহু কষ্টে নিজেকে সামলে সে কোনোরকমে বলল, 'যা করতে বলবে, করব।'

'সত্যি?'

'হুঁ।'

'কাঁদছিস কেন? কাঁদার মতো এখনো তো কিছু করলামই না। চোখ মোছ, চোখ মোছ বলছি...ব্ল্যাকমেইল করে লাভ নেই।'

'আমার চোখের পানিতে তোমার ব্ল্যাকমেইল হয়ও না রোদ ভাইয়া...' কথাটা জিভের আগায় এসে আঁটকে গেল, গিলে ফেলল বিকেল। নীরবে চোখ মুছে নিয়ে রোদের দিকে তাকাতেই সে ইশারা করল বাথটাবের দিকে, 'ওটায় উঠ, কুইক...'

চোখের দৃষ্টিতে অসহায়তা, রোদ্দুর দু'দিকে মাথা নাড়িয়ে শুধালো, 'লাভ নেই লাভ নেই, ওসব আমি দেখব না। আমার বাসর পন্ড করার দাম তোকে দিতে হবে না? আলবাত হবে! ওঠ, ওঠ বলছি...'

শেষের কথাটা ধমকে বলতেই সব ছেড়ে ছুঁড়ে এই কনকনে শীতের রাতে ঠান্ডা পানির ভেতর জামা-কাপড় সহই উঠে দাঁড়াল বিকেল। মনে হলো, পানির ভেতর অসংখ্য তীক্ষ্ণ ফলা ধরা ছুঁড়ি- সেগুলো ক্ষ'ত বিক্ষ'ত করছে তার হাত-পা, গোটা শরীরটা। কাঁপুনি দিলেও দাঁত দিয়ে জিভ কামড়ে নিজেকে সামলে নিলো বিকেল। ভেজা চোখে রোদের দিকে চাইলো। তার কোনো বিকার নেই। বরং বাথরুমের দেয়ালে ঠেস দিয়ে দু'হাত ভাঁজ করে বুকের পাড়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে মানুষটা। বিকেলের গা-পিত্তি জ্বলে গেল।

রোদ্দুর বলল, 'এবার কান ধর। কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকবি আধঘন্টা। এটাই তোর শাস্তি।'

'রোদ ভাইয়া...'

'উঁহুম, নো টক, অনলি পানিশমেন্ট। জীবনে এবার যদি তোর শিক্ষা হয়। ধর কানে, ধর...'

তেড়ে আসার ভঙ্গি করতেই বিকেল ঝটপট কান দু'খানা শক্ত করে চেপে ধরে ভেউভেউ শব্দে কেঁদে ফেলল। রোদ্দুরের তাতে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ হলো না। সে ফোন বের করে টাইমার সেট করছে। মিনিট পাঁচেকের ভেতর বাড়ির প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী চলে এলো বাথরুমের সামনে। সবাই জানল, বিছানায় পানি দিয়ে তোশক ভেজানোর মহার্ঘ্য কাজটা আসলে কার। কেউই কিছু বলল না। আহা উঁহু ও করল না। এমনকি বাচ্চা দল ও না। রোদ্দুরের কড়া হুকুম, যেই আহা উঁহু করবে তাকেও এই শাস্তি দেওয়া হবে। তাই সবাই চুপটি করে রইলো। এদিকে নাকের জলে, চোখের জলে ভেসে যেতে লাগল বিকেলের। পাষাণ মানবের হৃদয় গললো না মোটেই। ঘড়ির কাটায় ঠিক তিরিশ মিনিট পূর্ণ হওয়ার পরেই শাস্তি শেষ হলো।

________

ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে বিকেল। ঘরে ফিরে গরম পানিতে পুরোপুরি শাওয়ার নিয়ে এখন বিছানায় বসেছে সে। গা কাঁপছে থরথর করে। কী ঠান্ডা পানি, তাতে আধঘন্টা ভিজে দাঁড়িয়ে থাকা, পায়ের পাতা অসাড় প্রায়, সাদাশে হয়ে গেছে। নিজেই এক কাপ কফি বানিয়ে ফোন করল ওসমান মির্জাকে। তিনি কাজের সূত্রে আজ বাইরেই আছেন। রাতে ফেরার কথা থাকলেও সন্ধ্যের দিকেই জানিয়েছেন যে ফিরতে পারবেন না। আগামীকাল দুপুর বা বিকেল নাগাদ বাড়ি আসবেন। প্রায়ই এরকম রাত-বিরেত বাইরে কাটান তিনি। তাই ব্যাপারটা বিকেলের কাছেও একদম স্বাভাবিক।

দু'বার রিং হয়েই কেটে গেল ফোনটা। আবার কল করল বিকেল, এবার একটা রিং পড়তেই ধরলেন ওসমান, গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, 'আমি ব্যস্ত আছি মামনি।'

বিকেল হাউমাউ করে আর্তনাদ করে উঠল, 'তোমার মেয়ে এদিকে ম'রে যাচ্ছে আর তুমি ব্যস্ততা দেখাচ্ছ বাবা!'

'আবার কি হয়েছে?'

'রোদ ভাইয়া...আমাকে আধঘন্টা পানিতে দাঁড় করিয়ে রেখেছে জানো! এই ঠান্ডার ভেতর, কানে ধরিয়ে...'

'তুমি নিশ্চয়ই কিছু করেছ, নইলে ও এমন করার ছেলেই না।'

'বাবা তুমিও!'

'দেখো মামনি, তুমি বড় হলেও তোমার মনটায় যথেষ্ট বাচ্চামিতে ভর্তি। আমি তো জানি, রোদ এমনি এমনি এরকম করবে না। তুমি যদি দুষ্টুমি না করো, সেও শাস্তি দিবে না। আগে নিজে ঠিক হও।'

'তুমি আসলেই আমার সৎ বাবা! ধ্যাৎ!' বলেই ফোনটা কান থেকে নামিয়ে কাটলো বিকেল। তারপর ছুঁড়ে মা'রল মেঝের দিকে। ওটা পড়তেই শব্দ হলো একটা। আর ঠিক তখনই ঘরে ঢুকল তৃপ্তি, কপালে ভাঁজ, ভ্রুয়ের মাঝখানে বাঁকানো,

'কি হলো? ভাঙচুর করতেছিস ক্যান?'

বিকেল কিছু বলল না। মগ হাতে কম্ফোর্টারটা টেনে শরীরে আষ্টেপৃষ্টে জড়ালো। শীতে গায়ে কাঁপুনি দিচ্ছে তার।

তৃপ্তি বসল।

'কি দরকার ছিল এসব করার? অযথাই নিজের কাল ডেকে আনলি। জানিস তো, ভাইয়া কেমন!'

বিকেল তাকাল, জল ভরা দু চোখে, ভেজা কণ্ঠে শুধালো, 'সবাই শুধু ভাইয়া ভাইয়া করিস। ভাইয়াই বেস্ট। সে যা করবে ওটাই ঠিক, সে ভুল বললেও ঠিক। যদি ঘোষণা দেয় সূর্য পশ্চিম দিক দিয়ে ওঠে তবে তোরাও তাই স্বীকার করে নিবি। আচ্ছা, ওই লোকের ভেতর আছেটা কি এমন? এত আদর, সোহাগ, আহ্লাদ তাকে করার কারণটা কি রে ভাই? সেই ছোট থেকে দেখে আসতেছি...'

'উনি আমাদের সবার বড় ভাই না! আর বড় চাচার একমাত্র ছেলে, এ বাড়ির বড় ছেলে...'

'আর আমরা কি? বানের জলে ভেসে আসা? আমিও তো আমার বাবার একমাত্র মেয়ে। কই, সে তো আমায় অত ভালোবাসে না, যতটা ভালো ওই ফালতু লোকটাকে বাসে। নাকি আমার মা নেই দেখে আমার কোনো দামই নেই এ বাড়িতে।'

'বিকেল!' স্তব্ধ হলো তৃপ্তি।

বিকেল মন খারাপের চূড়ান্ত নিয়ে বলল, 'সত্যি বললে গায়ে লাগে, না? আমার যদি মা থাকত তাহলে কেউ আমায় এত হেলাফেলা করতে পারত না। আর সেও যখন যা ইচ্ছা তাই করতে পারত না। আজ যদি আমার জায়গায় তোকে এই শাস্তিটা দিতো, মেজো মা কি তা মেনে নিতো? আমার বেলায় কেউ কিচ্ছু বলেনি, বরং চুপ করে রইছে। এমনকি বাবাকে ফোন দিলাম, বাবাও উলটো তার সাপোর্ট নিলো। একদিন আমি এখাব থেকে চলে যাবো, অনেক অনেক দূরে.. তারপর আর কোনোদিন ফিরে আসবো না, কোনোদিন না!'

কথা শেষ করেই মুখ গুঁজলো হাঁটুতে। পাখির মতো ছোট্ট দেহখানা হাহাকারে কেঁপে উঠল ওর। তৃপ্তির বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। বিকেল আর তার বয়সের খুব একটা ব্যবধান নেই, বড়জোর বছর দুয়েকের ছোট হবে সে। কিন্তু শৈশব থেকেই ওরা একে অপরের হাত ধরে বেড়ে উঠেছে। রক্তের সম্পর্কের চেয়েও ওদের মাঝে এক নিবিড় বন্ধুর বাঁধন- যেখানে ‘তুই’ সম্বোধনেই সবটুকু নির্ভরতা লুকিয়ে থাকে। বিকেলের সব ছেলেমানুষি দুষ্টামি, সব গোপন ক্রাইম- এর খবর যেমন তৃপ্তির নখদর্পণে, তেমনি তৃপ্তির আকাশছোঁয়া স্বপ্ন আর আকাঙ্খার একমাত্র সাক্ষী এই বিকেল।

তৃপ্তি জানে, বিকেলের ওই উচ্ছ্বল হাসির আড়ালে এক বিশাল শূন্যতা প্রতিনিয়ত খাঁ খাঁ করে। যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল ওর জন্মের মাত্র চারদিন পরেই। মা-কে পাওয়ার আগেই মা-কে হারিয়েছিল ও। সেই থেকে মাতৃহীন ওইটুকু শিশুকে নিজের বুকে পিঠে আগলে নিয়েছিলেন ওদের বিধবা ফুপু আইরিন। নিজের দুই ছেলে সৌম্য আর দীপ্রর সঙ্গে পরম মমতায় তিনি বিকেলকে গড়ে তুলেছেন এক জননী হয়েই।

কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠটাও বিকেলের জন্য ছিল বিষাক্ত। দাদী মেহেরজানের চোখে বিকেল কোনোদিন শিশু হয়ে উঠতে পারেনি, পেরেছে কেবল 'অপয়া' তকমা পেতে। বিকেলের মা ছিলেন মেহেরজানের আপন বোনের মেয়ে, তাই বোনের মেয়ের মৃত্যুটাকে তিনি কোনোভাবেই সহজভাবে নিতে পারেননি। তার ওপর ছোট চাচ্চুর ব্যবসা যখন হঠাৎ করে মুখ থুবড়ে পড়ল, মেহেরজান বিকেলের গায়ে পাকাপোক্তভাবে ‘অলক্ষ্মী’র সিল মেরে দিলেন। ওই নিষ্পাপ শিশুটিকে তিনি বিষাক্ত শূলের মতো দেখতে লাগলেন।

সেই যে ভাঙন শুরু হয়েছিল সম্পর্কের, তা আজও জোড়া লাগেনি। মেহেরজানের সেই শীতলতা উপেক্ষা করে এই পরিবারে কেবলমাত্র বড় মা আর আইরিন ফুপুই বিকেলকে আগলে রাখেন ছায়ার মতো। তাদের অকৃত্রিম স্নেহটুকুই বিকেলের একমাত্র আশ্রয়, যেখানে ও নিজের অস্তিত্বের অধিকারটুকু খুঁজে পায়।

তৃপ্তি এগিয়ে এসে ওর পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বুঝাতে লাগল, 'কাঁদিস না পাগলি। তোকে আমরা সবাই ভালোবাসি, অনেক ভালোবাসি। দাদী একটু অন্যরকম, জানিসই তো, আগেরকালের মানুষ। কিন্তু বড় মা, আমি, ফুপি, সবাই কি তোকে অবহেলা করেছি কোনোদিন? সৌম্য তোকে চোখে হারায়, মিশিটা একটু গম্ভীর, তাছাড়া স্বস্তি, দীপ্র তোকে ছাড়া ওদের খাবার ও হজম হয় না ঠিক করে। যেখানে যা খাবে সব তোর জন্য নিয়ে আসবে। তুই বলতে ওরা অজ্ঞান...আর তুই যদি এভাবে কাঁদিস...'

বিকেল পালটা কিছু একটা বলতে নিতেই দরজা দিয়ে ধেয়ে এলো দীপ্র, স্বস্তি। দু'জনের হাত মিষ্টির রসে মাখামাখি। দীপ্র'র হাত গড়িয়ে কনুই অবধি ছুঁয়েছে তা। বিকেলের দেখেই গা ঘিনঘিন করে উঠল।

স্বস্তি বলল, 'আপা, মিষ্টি খাও।'

বিকেল ধমকাল, 'কিসের মিষ্টি, আর এই দীপ্র, সুন্দর করে ধরতে পারিস না। হাতে পাতে মেখে কি বিচ্ছিরি অবস্থা।'

'কাড়াকাড়ি করতে গিয়ে এমন হইছে।' দীপ্র অপরাধী কণ্ঠে জানাল।

'কিসের মিষ্টি যে এত কাড়াকাড়ি করে খেতে হবে?' বিকেল জানতে চাইতেই স্বস্তি জবাবটা দিলো, 'ভাইয়ার বিয়ের মিষ্টি। সৌম্য ভাইয়াকে দিয়ে আনালো। পাঁচ কেজি, তোমার জন্য কালোটা আনছি, তুমি তো কালো পছন্দ করো। এই নাও।'

'তোর মিষ্টির আমি...' বিকেল উঠে এসে একদলা থুতু ফেলল মিষ্টির উপর। স্বস্তি ইয়াক করে হাত থেকে ফেলে দিলো ওটা। বিকেল নিচে পড়া চ্যাপ্টা মিষ্টিটার উপর আরও এক দলা থুতু ছিটিয়ে তবেই শান্ত হলো।

হৃষ্টচিত্তে বলল, 'নে খা এবার রাক্ষসের বিয়ের মিষ্টি। রাক্ষসের সব যেমন ইউনিক, মিষ্টি ও হতে হবে ইউনিক। থুতু ওয়ালা মিষ্টি খা এবার। পারলে এটা ওর বউকে খাইয়ে দিয়ে আয় যা। বলবি ওর জামাইর থুতু, দেখবি সোনামুখ করে খেয়ে নেবে খাটাশ মেয়ে...'

তৃপ্তি ডাকল, 'বিকেল?'

বিকেল ঝামটা দিয়ে উঠল, 'কি? এখন প্লিজ তোর ওই লাভিং সুইটু ভাইকে নিয়ে কিছু বলিস না। প্লিজ! আই জাস্ট হেইট হিম! হেইট হিম! যদি পারতাম এই থুতু দেওয়া মিষ্টিটা তাকে গিলাইতাম। বুঝলি? মগজ ভর্তা বানিয়ে নিজে খেতাম। ছাদ থেকে ফেলে দিতাম। অথবা পিটিয়ে শরীরের হাড্ডি গুড়া গুড়া করতাম...কিলবিল করে কিছু একটা দৌড়ায় আমার শরীরে, ওই বদমাইশ হারামির নাম শুনলেই হাহ....'

'বিকেল! পেছনে দ্যাখ।' তৃপ্তি কটমট করে বলল।

শুনেই তাড়াতাড়ি মাথা ঘুরালো মেয়েটা আর সঙ্গে সঙ্গে জমে গেল। এই মানুষটা আবার দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। হাতে মিষ্টির প্যাকেট, হয়তো দিতে এসেছিল বা সামথিং, আচ্ছা সে কি সব শুনে নিয়েছে? যদি নেয়, তবে এবার কি করবে? বরফ পানিতে এক ঘন্টা কানে ধরে দাঁড়া করিয়ে রাখবে নাকি এই থুতু ওয়ালা মিষ্টিটা বিকেলকেই ধরে গেলাবে? ইয়া খোদা.. লুকাও তুমি আমাকে, লুকাও কোথাও! ভেতরে ভেতরে বিস্ফোরিত হলো বিকেল। বাহির দিয়ে উত্তাপহীন, শান্ত। শুনল তৃপ্তি ফিসফিসিয়ে আওড়াচ্ছে, 'আসলেই তোর মতো পোড়া কপালি এ দুনিয়াতে আর একটাও আছে কি-না সন্দেহ!'

বিকেল চাপা ঢোক গিলে ভয়টাকে খেতে চেষ্টা করল।

(চলবে)

[যারা পড়বেন একটু রেসপন্স করবেন।

আর হ্যাঁ, গল্পটি পছন্দ হচ্ছে কি-না তাও জানাবেন। হ্যাপি রিডিং ❤️]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন