#প্রেমের_নির্বাসন - (৪)
লেখনীতে- #মৃধা_মৌনি
দরজায় দু-তিনবার টোকা পড়তেই তৃপ্তি ঘুম ভাঙা চোখে উঠে এলো। দরজা খুলে রোদ্দুরকে দেখতে পেয়ে ভারী অবাক হলো। চোখ খচলে বলল, 'ভাই!' পেছন ফিরে ঘুমন্ত স্বস্তিকে এক নজর দেখে নিয়ে দরজাটা ভিড়িয়ে নিজে বাইরে বেরিয়ে এলো। শুধালো, 'এত রাতে তুমি! কিছু হয়েছে?'
মাথা নাড়লো রোদ্দুর, 'ওর অনেক জ্বর। একটু থাক ওর সঙ্গে।'
'কার?' বুঝতে না পেরে প্রশ্নটা করল তৃপ্তি।
রয়েসয়ে জবাব দিলো ছেলেটা, 'বিকেলের।'
তৃপ্তি এবার অসম্ভব রকমের বিস্ময় নিয়ে তাকাল রোদ্দুরের দিকে। চোখের পাপড়ি ঝাপটে দু-তিনবার পলক ফেলল। রোদ্দুর মিঁইয়ে গেল অস্বস্তির কাটায়। উশখুশ করে নিজেই যেন নিজেকে বলল, 'যাচ্ছিলাম ওপাশ দিয়ে, তখন গোঙানোর আওয়াজ শুনে ঢুকে দেখি জ্বরে কাতড়াচ্ছে। তাই তোকে ডাকতে এলাম।'
'আচ্ছা।' ঠিকঠাক বিশ্বাস করল কি না তৃপ্তি, বোঝা দায়। তবে আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। শান্ত মুখে জানাল, 'তুমি ঘুমুতে যাও, আমি ওর কাছে থাকব। চিন্তার কিছু নেই।'
'থ্যাংকিউ।' ছোট করে বলল রোদ্দুর। চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতে গেলে তৃপ্তি আবার বলে উঠল, 'তবে এভাবে এত রাতে হাঁটা হাঁটির অভ্যেসটা বদলে ফেলো ভাই। বড় বাবা জানলে খুব একটা পছন্দ করবেন না কিন্তু।'
রোদ্দুর শুনল, কিছুই বলল না। চুপ করে চলে গেল নিজের ঘরের দিক। তবে মন পড়ে রইল ওই ঘরে, বিকেলের কাছে- মেয়েটার পাশে বাকি রাতটুকু বসে থাকবার অধিকার কেন যে তার নেই! এই মেয়েটাকে নিজের করে, একান্তই নিজের করে পাবার যে গোপন স্বপ্নজাল নিজের বুকের মধ্যিখানে এঁকেছে সে, তা কি কোনোদিন আদৌও পূরণ হবে? রোদ্দুর মাথা ঝেড়ে ভাবনাটাকে ঠেলে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করল। বুকের ভেতরটা শুকিয়ে এতটুকুন, ঘরে গিয়েই আগে পানি গিললো গ্রোগাসে। তাতে যদি একটু তৃষ্ণা মেটে! মিটবে কেমনে! এ তৃষ্ণা যে অন্য কাউকে কাছে পাবার আজন্ম তৃষ্ণা...
★★★
শীতের ছোট দিনগুলো বড় দ্রুত ফুরিয়ে যায়। যখন বিকেলের ঘুম ভাঙল, তখন বাইরের আকাশজুড়ে ধূসর কুয়াশার এক নিরেট চাদর। সূর্যটা অনেক আগেই সেই মেঘের আড়ালে মুখ লুকিয়েছে। উত্তুরে হাওয়া ততক্ষণে তার ধারাল দাঁত বসাতে শুরু করেছে ধরণীর বুকে; জানালার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের শনশন শব্দে এক রুক্ষ, শুষ্ক হাহাকার।
বিকেল অনেকক্ষণ মূর্তির মতো বিছানায় বসে রইল। মাথাটা অসম্ভব ভারী হয়ে আছে, যেন ভেতরে কেউ পাথরের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। সারা শরীরে রাজ্যের অসহ্য ব্যথা; মনে হচ্ছে বিষপিঁপড়ের দল হাড়ের মজ্জার ভেতর কামড়ে ধরছে অবলীলায়। মগজের ভেতরটা ভোঁতা, অসাড়; নিজেকে খুব দিশেহারা আর শূন্য লাগছে ওর। ঘরের ভারী পর্দাগুলো টানা থাকায় বাইরের আলো ঠিক ধরা যাচ্ছে না। বিকেল কিছুতেই মেলাতে পারছে না এটা কোন বেলা- ভোর, নাকি সন্ধ্যা? কতক্ষণ ঘুমিয়েছে সে? কেউ কি একবারও তাকে ডাকতে আসেনি?
অজস্র প্রশ্ন আর নিজস্ব ভাবনায় যখন বিকেলের মস্তিষ্ক আরও ভারাক্রান্ত, ঠিক তখনই দরজার কবজা ঘুরে গেল। ঘরে ঢুকলেন আইরিন ফুপু। তাঁর হাতে এক থালা ধোঁয়া ওঠা ভাত। ফুপুকে দেখে বিকেল সব ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে একটা কাঁচুমাচু হাসি দেওয়ার চেষ্টা করল।
সহাস্য বদনে জিজ্ঞেস করল, 'এটা কোন বেলা গো ফুপ্পি? রাত হয়ে গেল নাকি?'
আইরিন ভ্রু কুঁচকে ওর দিকে তাকালেন। তারপর খাটের পাশে ভাতের থালাটা রেখে বললেন, 'বাপরে বাপ! কথা শুনে তো মনে হচ্ছে মহারানীর হুঁশ ফিরেছে। পুরোপুরি সুস্থ হয়েছিস তবে?'
বিকেল অবাক হয়ে শুধাল, 'কেন? আমার আবার কী হয়েছিল?'
'ওমা! মনে নেই? জ্বরে যে তুঘলকি কাণ্ডটা করলি কাল রাত থেকে! দুইবার বমি করে ভাসিয়ে দিলি সব। একবার তো আমার গায়ের ওপরেই...। আর সারাটা সময় কী সব আবোলতাবোল বকছিলি খোদা মালুম।' একটু থেমে বিকেলের চোখের দিকে তীক্ষ্ণ নজর দিলেন, 'আচ্ছা, এই উদয় ছেলেটা কে রে? সারা রাত উদয়... উদয় করে অস্থির হয়ে ছিলি। কার সাথে লটরপটর শুরু করলি সবার আড়ালে, বল তো?'
কথাটা শোনামাত্রই বিকেলের মেরুদণ্ড দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। লজ্জায় আর আতঙ্কে সে তড়িঘড়ি দাঁত দিয়ে নিজের জিভ কামড়ে ধরল। উদয় ওর ক্লাসমেট; গায়ের রঙ যেমন ধবধবে ফর্সা, চেহারাটাও মাশাআল্লাহ! বিকেলের ক্রাশ লিস্টের একদম শুরুর দিকেই ওর নাম। জ্বরের ঘোরে অবচেতন মনে ছেলেটার নামই তবে ফাঁস করে দিয়েছে সে! ইশ, ফুপু এখন কী না কী ভাবছেন!
বিকেল হড়বড় করে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল,
'উমম... না ফুপ্পি, তুমি যা ভাবছ তেমন কিছু না। ও আমার স্রেফ ফ্রেন্ড। আমরা একসাথে কোচিং ক্লাস করি তো, তাই হয়তো নামটা মুখ দিয়ে চলে এসেছে।'
আইরিন তবু বিশ্বাস করতে পারলেন না। ভ্রু কুঁচকে সন্দিহান গলায় বললেন, 'সত্যি তো? কথাবার্তায় তো তা মনে হলো না। যেভাবে উদয়কে ডাকছিলি... ছিঃ ছিঃ! আজকালকার ছেলেমেয়েরা সত্যিই সব আপডেট ভার্সন। আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে তোরা। আমার এক ছেলে কোথা থেকে কাকে ধরে এনে বিয়ে করে সংসার পেতেছে- ও নিয়েই আমি অস্থির। তুই আবার এমন কিছু করে বসিস না মা। তোকে আর দীপ্রকে নিয়েই আমার এখন শেষ ভরসা।'
বিকেল এগিয়ে এসে আইরিনের হাত ধরে তাকে বিছানায় বসিয়ে নিজে মাথাটা কোলের ভেতর ঢুকিয়ে শুয়ে পড়ল। আইরিন ওর চুলে বিলি কাটতে লাগলেন। ধীর গলায় জানতে চাইলেন, 'শরীরটা ভালো লাগে বাবু?'
'হুম।'
'উঠে হাত-মুখ ধুয়ে নে, ভাত খাবি না?'
'খাবো ফুপ্পি।'
হঠাৎ করেই অন্যমনস্ক হলেন আইরিন, বলতে লাগলেন, 'সৌম্যটা কি করল বল তো বাবু। আমার তো মাথায় ঢুকে না। ভালোই তো পড়ছিল, ওকে বাইরে পাঠাবো- এই নিয়ে কত স্বপ্ন দেখলাম আমি। এরকম একটা কিছু করতে পারে, আমার কল্পনাতেও আসেনি ঘুনাক্ষরে। কি যে করি আমি...'
বিকেল উঠে বসে মুখোমুখি হলো, 'মেনে নাও ফুপ্পি। তাহলে দু'পক্ষই ভালো থাকবে। সৌম্য ভাইয়া খুব ভালো ছেলে। আমার ভাই হিসেবে বলছি না, তার ভেতর ছেলে হিসেবেও গুণাবলী দারুণ কিন্তু। আজকাল সবাই মোবাইল, ফেসবুক এসবে মজে থাকে সেখানে ভাইয়া সবসময় পড়াশোনা নিয়ে সিরিয়াস, ফ্যামিলিকে টাইম দিতে সর্বদা প্রস্তুত, কোনো বাজে আড্ডা নেই, বাইরে অকারণে যাওয়াটাও পছন্দ করে না। সে যেহেতু এমন একটা কাজ করেছে তখন নিশ্চয়ই চাপটা অতিমাত্রায় ছিল। তুমি তো তার মা, তুমি না বুঝলে কে বুঝবে বলো? ওই মেয়েটাও সুন্দর তো। আদব কায়দাও দেখেছি ভালোই। মেনে নাও না ফুপ্পি...প্লিজ!'
আইরিন এক ভ্রু উঁচিয়ে বললেন, 'বাপরে, ভাইয়ের হয়ে এত দালালি করতেছিস! কি? ঘুষ টুষ খাওয়াইছে নাকি শয়তানটায়?'
'উম না, যা বলছি মন থেকে, ট্রাস্ট মি। এই মুহূর্তে ভাইয়ার কনফিডেন্স লেভেল একদম ডাউন। মানসিক ভাবেও ভেঙেচুরে আছে। ভাবছে, এরকম কিছু করার জন্য নিশ্চয়ই তোমরা সবাই তাকে পর করে দেবে। এখন যদি সত্যি সত্যি সবাই মিলে এক্সেপ্ট না করো, তাহলে ভাইয়ার ধারণা সত্যি প্রমাণিত হবে এবং ভাইয়া আরও মানসিক ভাবে ডাউন হয়ে যাবে। তুমি কি এটা চাও বলো? তখন দেখা যাবে, পড়াশোনা থেকে শুরু করে ক্যারিয়ার, সবদিকেই ভাইয়া পিছিয়ে পড়বে। তুমি নিশ্চয়ই এমন কিছু চাইবে না...তাই এটাই ভালো, মেনে নাও, সাপোর্ট দাও, সাহস দাও। দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে।'
আইরিন ভারী বিস্ময়ে পলক ঝাপটালেন, গলার পারদ স্তম্ভিত করে বললেন, 'বাপরে বাপ, তুই দেখি বিরাট বড় হয়ে গেছিস! আমি তোকে অযথাই এইটুকুনি ভাবছি...কত্ত জ্ঞানের জ্ঞানের কথা বললি..'
বিকেল লজ্জা পাওয়ার ঢং করে বলল, 'যাও তো ফুপ্পি..'
'না সত্যিইই, মেয়ে দেখি বিয়ে দেওয়ার সময় চলে এসেছে হুঁ?'
বিকেল মুখ ভেঙালো, 'উমম, আমি বিয়েই করব না কোনোদিন।'
'কেন?'
'এমনি। আমি চলে গেলে তোমাদের সবাইকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করবে কে?'
'সে তো তুই-ই করবি সবসময় কিন্তু বিয়ে তো করতেই হবে সোনামনি! জানিস তো, এই জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া কি? মনের মতো একটা মানুষ পাওয়া! নিজের মানুষ, আপন মানুষ! শেষ বয়সে তোর সঙ্গে কেউ থাকবে না, থাকবে শুধু তোর ওই একান্ত নিজের মানুষটা। সেই হবে তোর সুখ-দুঃখের সঙ্গী।'
বিকেল চুপ করে রইল। কিছু বলল না সঙ্গে সঙ্গে। হঠাৎ করেই কথাটা তার মস্তিষ্কে গিয়ে আঘাত করেছে। একটা নিজের মানুষ, আপন মানুষ, শেষ বয়সের সঙ্গী- এভাবে কখনো ভাবা হয়নি। আচ্ছা, এরকম কেউ কি সত্যি হয়? হবে কোনোদিন ওর জীবনে? নাকি সবটাই রূপকথার গল্পে সম্ভব? বাস্তবতা আসলে কি? আইরিনের স্পর্শে ধ্যান ভেঙে গেল ওর। ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তাকাল ফুপুর দিকে, আইরিন নরম সুরে বললেন, 'অত চিন্তা করিস না। জীবন যখন শুরু হয়েছে, একটা পথে গিয়ে শেষ ও হবে। তুই শুধু হালটা শক্ত করে ধরে থাকবি, সবসময়... আজ হয়তো বুঝতে পারছিস না, কিন্তু একদিন বুঝবি, ফুপু তোকে কোন হাল শক্ত করে ধরার জন্য বলেছি। এবার নে, ওঠ ঝটপট, ভাতটা খেয়ে আমায় উদ্ধার কর। মেডিসিন খাবি না? জ্বর সেড়ে যায়নি তো, আবার রাতে ওঠে যদি... ওঠ তাড়াতাড়ি।'
বিকেল হঠাৎ আইরিনকে দু'হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার গালে গাল ঘষে বলল, 'তুমি একটা চকলেট, সত্যি। এন্ড আই লাভ চকলেট ফুপ্পি।'
আইরিন হাসলেন প্রত্যুত্তরে।
★★★
ঘরটির গঠন কিছুটা অদ্ভুত, ত্রিকোণ আকৃতির। তার ঠিক মাঝামাঝি দখল করে আছে বিশাল এক পুরোনো আমলের খাট। খাটের চার কোণে চারটি কাঠের স্ট্যান্ড সগর্বে দাঁড়িয়ে, যেন কোনো প্রাচীন দুর্গের প্রহরী। এক কোণে দেয়ালের সাথে খুব টেনেটুনে গুঁজে দেওয়া হয়েছে ছোট একটি কাঠের টেবিল। তার ওপর অগোছালো অবস্থায় পড়ে থাকা কতগুলো বইয়ের স্তূপ, আর বইগুলোর ওপর ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে একটি একলা স্টাডি ল্যাম্প। বাম পাশের দেয়াল ঘেঁষে পাশাপাশি দুটি পড়ার টেবিল; একটি দীপ্রর, অন্যটি সৌম্যর। দুই ভাই ছোট থেকেই এই টেবিলে পাশাপাশি বসে শৈশব থেকে কৈশোরে পা রেখেছে। এছাড়া ঘরে একটি আলনা আর ছোট একখানা ওয়ারড্রব ছাড়া আর তেমন আসবাব নেই। ঘরের সাজসজ্জায় ছেলেদের রুক্ষ আর সাদামাটা একটা ছাপ স্পষ্ট।
এই ঘরেই আদিবার বাসর রাত কেটেছে। বিবাহিত জীবনের প্রথম রাত! তাও আবার সেই মানুষটির সঙ্গে, যাকে সে তার এক জীবনের সমস্ত আকাঙ্ক্ষা দিয়ে চেয়ে এসেছিল। এই রাতটিকে ঘিরে প্রতিটি মেয়ের মনে যে নীল স্বপ্নের বুনন থাকে, যে শিহরণ আর দমবন্ধ করা অনুভূতির পাহাড় জমা থাকে হৃদয়ের মণিকোঠায়- তার ছিটেফোঁটাও কাল রাতে স্পর্শ করেনি আদিবাকে। সৌম্যর ভেতর কেমন এক অদ্ভুত জড়তা, এক দুর্ভেদ্য দেয়াল গড়ে উঠেছিল। দু-চারটি অতি সাধারণ কথা সেরে সে কখন যে ঘুমের রাজ্যে পাড়ি দিয়েছিল, আদিবা টেরও পায়নি।
বিপরীতে আদিবার সারা রাত চোখের পাতা এক হয়নি। বুকের গহীন থেকে এক অজানা অস্বস্তি বারবার ঢেউ দিয়ে উঠছিল। খুব ইচ্ছে করছিল সৌম্যর হাতটা ধরে দীর্ঘদিনের জমানো সব কথা বলতে, কিন্তু তা আর সম্ভব হয়নি। দু-বার ক্ষীণ স্বরে ডাক দেওয়ার পরেও যখন ওপাশ থেকে কোনো সাড়া মিলল না, আদিবা শেষমেশ খাটের এক কোণে গুটিশুটি মেরে শুয়েই কাটিয়েছে বিভীষিকাময় রাতটি। ওর চোখে তন্দ্রা নেমেছে ভোরের আজানের পর।
সেই যে গভীর ঘুম, তা ভেঙেছে একেবারে দুপুরে, যোহরের আজানের সুর যখন কানে এল। আদিবা ধড়ফড় করে উঠে বসতেই লজ্জায় কুঁকড়ে গেল। শ্বশুরবাড়িতে তার আজ প্রথম দিন, অথচ লোকলজ্জার তোয়াক্কা না করে সে কি না বেশরমের মতো দুপুর পর্যন্ত হাত-পা ছড়িয়ে ঘুমাল! নিজেকে বড় অপরাধী মনে হলো তার। তবে আইরিন তাকে কিছুই বলেননি, বরং সৌম্যর মাধ্যমে খবর নিয়েছেন আদিবা খাবার কোথায় খাবে। আদিবা যখন কাঁচুমাচু মুখে জানাল সে আলাদাই বসতে চায়, আইরিন আর উচ্চবাচ্য করেননি। গোসল সেরে আদিবা রুমে ফিরতেই দেখল পড়ার টেবিলের ওপর পরিপাটি করে ভাত বাড়া রয়েছে। এক চিলতে স্বস্তি হয়তো পেল মেয়েটা, কিন্তু একটা সূক্ষ্ম কাঁটা তার বুকের ভেতর সারাক্ষণ বিঁধছে।
হঠাৎ করে সৌম্যর হলোটা কী? ছেলেটা স্বভাবত শান্ত হলেও আদিবার সাথে তো বরাবরই চঞ্চল আর প্রাণবন্ত ছিল। আজ যখন সে সৌম্যকে নিজের একচ্ছত্র অধিপতি হিসেবে পেল, তখন কেন এই নিস্তব্ধতা? কেন নেই কোনো অনুভূতির ছোঁয়া, কোনো চেনা উত্তেজনা? আদিবার মনে হচ্ছে সৌম্য যেন নিজের মধ্যে নেই, যেন ওর চেনা সত্তাটি কোনো এক গহীন অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়েছে। এই প্রশ্নটিই আদিবাকে বারবার কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে, অথচ এই নীরব হাহাকার সে কাউকে মুখ ফুটে বলতেও পারছে না।
'জানালা খুলে রেখেছ কেন এই ভর সন্ধ্যা বেলায়?' হঠাৎ সৌম্যর কথায় চেতনা ফিরে মেয়েটার, জানালা পান থেকে মুখ ফিরিয়ে সে তাকাল সৌম্যর দিকে। ছেলেটার চেহারা শুকিয়ে এইটুকুনি হয়ে আছে। ভীষণ মায়া হচ্ছে দেখে। কোনো সমস্যার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে কিনা, বুঝতে চেষ্টা করেও বুঝে আসছে না তার। উঠে জানালাটা বন্ধ করে দিলো। এগিয়ে এসে মুখোমুখি দাঁড়াল, বলল, 'এ ঘরে একটা ড্রেসিং টেবিলের ব্যবস্থা করা যায় সৌম্য? আয়না না দেখলে আমার দিন যায় না জানো?'
'পুরাতন অভ্যাস বদলে ফেলো আদু। আমাদের ঘরে একটাই ড্রেসিং টেবিল, তাও মায়ের ঘরে। আমার তো ইনকাম নেই যে কিনে দেবো আর মায়েরটাও চাওয়া সম্ভব না। বেকার ছেলের হাত ধরেছ, এডজাস্টমেন্ট তো তোমাকেই করতে হবে।'
আদিবা সৌম্যর একটা হাত আঁকড়ে ধরে বলল, 'এভাবে বলছ কেন? তোমার জন্য একটা না, একশোটা এডজাস্টমেন্ট সইতে রাজি আমি। তোমার কি হয়েছে হুম? এত মন ম'রা, চুপচাপ...'
হাত ছাড়িয়ে নিলো সৌম্য, দায়সারাভাবে বলল, 'তেমন কিছু না। হঠাৎ করে সব হলো তো, আস্তে ধীরে ঠিক হয়ে যাবে।'
'আমায় বিয়ে করে পস্তাচ্ছো বুঝি?'
আদিবার এমন কথার উত্তরে সৌম্য কপালে কয়েকটি ভাঁজ ফেলে বলে উঠল, 'আজেবাজে কথা বলবে না তো। এমনিতেই ভালো লাগছে না। আর শোনো, সারাদিন এমন ঘরে বসে না থেকে বাইরে বের হও, গল্প টল্প করো, সবার সঙ্গে মিশতে চেষ্টা করো। তোমায় এ বাড়ির একজন হয়েই থাকতে হবে। আর যেভাবে এই সংসারে এসেছ, তাতে কেউ যেচে পড়ে তোমার কাছে আসবে না বরং তোমাকেই সবার কাছে যেতে হবে।'
'তোমার বাড়িতে কেউ আমাকে পছন্দ করেনি ঠিকঠাক, তাই না?'
'না করাটাই কি স্বাভাবিক না আদু? কেউ আশাই করেনি আমি এমন কিছু একটা করে ফেলব।'
'তাহলে কেন বিয়েটা করলে সৌম্য?'
সৌম্য আদিবার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, 'তুমি জবাবটা জানো!'
আদিবা উত্তর দিতে পারল না আর। একটা ছোট নিঃশ্বাস ফেলে বেরিয়ে গেল ছেলেটা। আদিবা ধপ করে বিছানার উপর বসে পড়ল। সৌম্যকে বিয়ে করে সে কি জীবনের আরও একটা ভুল বাড়ালো? প্রশ্নটা কামড়ে ধরল হৃদমাঝার।
★★★
বিকেলের এক অদ্ভুত নেশা আছে। রাতবিরাতে ছাদে পায়চারি করার ভূত ওর দুই কাঁধে যেন স্থায়ী আস্তানা গেড়েছে। বিশেষ করে গরমকালে সন্ধ্যা নামলেই ওকে আর ঘরের চার দেয়ালের মাঝে আটকে রাখা দায়; তখন ওর আসল ঠিকানা হয়ে ওঠে এই ছাদ। এ নিয়ে বাবা ওসমান মির্জা কম চিৎকার-চেঁচামেচি করেননি, আইরিন ও হাজারবার বুঝিয়েছেন, কিন্তু বিকেলের এই ছাদ-বিলাসী অভ্যাসে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন কেউ আনতে পারেনি।
তবে বিকেলের এই ছাদ-দখলের রাজত্ব চলে ঠিক ততক্ষণ, যতক্ষণ রোদ্দুর বাড়িতে না ফেরে। ওই রাক্ষসটা বাড়ি ফেরার আগেভাগেই বিকেলের সব চটপটে ভাব উধাও হয়ে যায়। তখন সে একদম নিপাট ভদ্রলোক সেজে নিজের ঘরে সেঁধিয়ে থাকে; হয় পড়ার টেবিলে গভীর মনোযোগের ভান করে, নয়তো মোবাইলে ডুবে থাকে সিনেমার জগতে। রোদ্দুর বাড়িতে থাকলে বিকেল ভুলেও ছাদের সিঁড়িতে পা মাড়ায় না।
কিন্তু আজ পরিস্থিতি ভিন্ন। বিকেল আগেভাগেই নিশ্চিত হয়ে নিয়েছে যে রোদ্দুর বাড়িতে নেই। সেই সাতসকালে কোন কাজে বেরিয়েছে, এখনো ফেরার নামগন্ধ নেই। চুলোয় যাক সে, তাতে বিকেলের বয়েই গেল!
তৃপ্তি অবশ্য টিপ্পনী কাটতে ছাড়েনি, কুটিল হেসে জিজ্ঞেস করেছিল, 'কী রে, এখন শরীর কেমন লাগছে তোর? তোর ক্রাশ তো এখনো আনম্যারিড, হুঁ?'
তৃপ্তির কথা শুনে বিকেল নাক-মুখ কুঁচকে জুতসই একটা ভেংচি কেটেছে ঠিকই, কিন্তু সরাসরি কোনো উত্তর দেয়নি। মনের গহীনে একটা ভালো লাগার রেশ কাজ করছে- এ কথা সত্য, তবে সেই খবর কোনোভাবেই ওই পাষাণ লোকটার কান পর্যন্ত পৌঁছাতে দেওয়া যাবে না। কিছুতেই না। একবার যদি সে টের পায়, তবে বিকেলের সেই পছন্দকে দুর্বলতা ভেবে লোকটা আরও চোটপাট শুরু করবে। এমনিতেই তো তাকে বড় অসহায় মনে করে সে! যখন-তখন শাসনের নাম করে বিকেলের ওপর মানসিক অত্যাচার চালায়, অকারণে কাঁদায়, আর হৃদয়ে তুষের আগুন ধরিয়ে দেয়।
বিকেলের মনে হয়, সে বুঝি রোদ্দুরকে ঘৃণা করতে শুরু করেছে। হ্যাঁ, ঘৃণাই তো! মন থেকে ওকে চরম ঘৃণা করে সে। নিজের কাল্পনিক ক্রাশ লিস্ট থেকে ওর নামটা লাল কালি দিয়ে কেটে দিয়েছে ও। এই যে এক্ষুনি কাটলো, নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলল, 'কাট, কাট, কাট... ক্যান্সেল!' বড় করে চেঁচিয়ে যেন নিজেকেই শোনানোর চেষ্টা করল সে, রোদ্দুরের জন্য ওর মনে এক ফোঁটা জায়গা নেই।
কিন্তু অষ্টাদশী কিশোরীর অবাধ্য মন বড় কৌতূহলী। কখন যে কোন ছলে কার মায়ায় সে আষ্টেপৃষ্ঠে আটকে যায়, তা সে নিজেও জানে না। বিকেলের এই ঘৃণার আড়ালে কি সত্যিই কোনো অনুরাগের বীজ লুকিয়ে আছে, নাকি পুরোটাই স্রেফ এক জেদি মেয়ের আত্মরক্ষা?
বিকেল গম্ভীর নিঃশ্বাস ছাড়ল। ভূতের ন্যায় পায়চারি করতে করতে আকাশের দিকে তাকাল। গাঢ় অন্ধকার জায়গাটা, চাঁদ ও ডুব দিয়েছে কোথায় যেন। মিটমিটে জ্বলছে নিভছে কয়েকটি তারকারাজি, কুয়াশার ঘন চাদর ফুঁড়ে তাদের ও ঠিকঠাক দেখা যায় না। আজ একটু বেশিই উত্তুরে হাওয়া- বেশিক্ষণ থাকলে দাঁতে দাঁত লেগে পড়তে হবে নির্ঘাত, মনে মনে ভাবল বিকেল। নামবে, তার আগে আবারও চোখ বন্ধ করে বিড়বিড়িয়ে পড়ল, 'ইউ আর ব্লক, ব্লক, ব্লক ফ্রম মাই হার্ট লিস্ট...আ ডায়নোসর, আ মাংকি, আ....'
'জ্বিনে ধরল নাকি? এই মেয়ে!'
হুট করেই কথাখানা ভেসে এলো কর্ণকুহরে, একই সঙ্গে ধাক্কা পড়ল পিঠে, বিকেল তড়িঘড়ি চোখ মিলে প্রায় চিৎকার দিয়ে উঠছিলই, তার আগেই রোদ্দুর ওর মুখটা চেপে ধরল।
'আমি...!' ফটাফট বলল ও, 'ভয় পেলি নাকি?'
বিকেলের চোখে তখনো বিস্ময় লেপ্টে, চোখজোড়া গোল হয়ে বড় আকার ধারণ করেছে। কাইকুই করতেই রোদ্দুর হাত সরিয়ে নিলো। বিকেল তাড়াহুড়ো করে পড়ল, 'আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম।'
রোদ্দুরের ভ্রু কুঁচকে গেল, সন্দিহান গলায় শুধাল, 'তুই শয়তান তাড়ানোর দোয়া পড়লি কেন?'
ঢোক গিলে মেয়েটা ফ্যাকাশে হাসার চেষ্টা করে উত্তরে জানাল, 'এ...ম এমনি রোদ ভাইয়া।'
'সত্যি করে বল, তুই কাকে শয়তান মিন করলি এখানে?'
'কাউকে না! তোমাকে তো না-ই। তোমার মতো ভালো মানুষ পৃথিবীতে আর কয়টা হয় বলো? আমি এমনিতেই দোয়া দুরুদ পড়ি। সবসময় দোয়ার ভেতর থাকলে মন মাইন্ড ফ্রেশ থাকলে, একদম চাকা চাক.. বুঝলে?'
কি বুঝল কে জানে, তবে আর কিছু বলল না ছেলেটা। হেঁটে গিয়ে রেলিঙের গায়ে ভর করে দাঁড়াল, এদিক ফিরে। পকেট থেকে সিগারেট আর লাইটার বের করে এনেছে। একটা ধরালো। ধোঁয়া ছেড়ে বিকেলের দিকে চাইতেই বিকেল তড়িঘড়ি বলে উঠল, 'আমি নিচে যাই।'
'এসেছিলি কেন?'
প্রশ্ন থামতে হলো তাকে।
'ইয়ে মানে...' কিছু একটা খুঁজল তাড়াতাড়ি, নাহ, কাজের সময় মাথাটাও ঠিক করে কাজ করে না। একটা যুতসই বাহানা না পেয়ে রোদ্দুরের দিকে নিরুপায় চোখে তাকাতেই ও আবার জানতে চাইল, 'শরীর কেমন এখন?'
মৃদু শ্বাস ফেলে বলল, 'ভালো।'
'জ্বর কমেছে?'
'হুঁ।'
'এসেছিল কেন?'
'জানি না তো। আসার আগে টেলিফোন করেনি। আবার আসলে জিজ্ঞেস করব, এবার কেন এসেছিল।'
রোদ্দুর কটমট করে তাকাল, বিকেল জিভ কামড়াল, ঠোঁট উলটে আওড়াল, 'তো আর কি বলব আমি! জ্বর কেন এসেছিল, তা কি আমি জানি নাকি?'
'তুই না জানলে আর কে জানবে?'
'সব জানা কি আমার ডিপার্টমেন্ট নাকি?'
'তাছাড়া আর কি! উদয়ের কোথায় কোথায় তিল, কত ইঞ্চি লম্বা চুল, থুতনিতে কিসের দাগ- সব তো মুখস্থ করে বসে আছিস।'
বিকেল বিস্ফোরিত নয়নে চাইলো। রোদ্দুর টেনে নিলো লম্বা টানে নিকোটিন, মুখটা উঁচু করে আকাশের বুকে ছেড়ে দিলো ধোঁয়া গুলো। পুনরায় নিচে চাইলো, ওই ভীতু কম্পিত মেয়েটির পানে, হিঁসহিঁস করে জবাব চাইল, 'উদয়ের সঙ্গে কি তোর? কোচিংমেট কে লাইফমেট করার ধান্দা হুঁ?'
'রো...রোদ...ভা...'
'হইছে হইছে, এসব তোতলামির নাটক আমার সামনে করবি না। কানের ঠিক তিন আঙুল নিচে থাবড়া খাবি।'
বিকেল মাথানিচু করে ফেলল। অপরাধী কণ্ঠে বলে উঠল, 'সরি। তবে তুমি যা ভাবছ, তা কিন্তু না। উদয় আমার জাস্ট ফ্রেন্ড, এর বাইরে ওর সঙ্গে কিছু নেই।'
'জাস্ট ফ্রেন্ড হয়ে এই অবস্থা? জ্বরের ঘোরে তার উপর তলা, নিচ তলা- সব তলার গল্প বকিস?'
ছুঁড়ে ফেলে দিলো আধখাওয়া সিগারেটটা, এগিয়ে এল তরতর করে, প্রায় ক্যাঁক করে চেপে ধরল বিকেলের টুটি, 'একটা চাপা দিয়ে সব প্রেম বের করে দেবো তোর, খুব পেঁকেছিস তাই না? তোর পাঁকামো আমি বন্ধ করছি। আগামীকাল থেকে নো কোচিং, বাসায় স্যার আসবে, পড়বি।'
বিকেল ছলছল চোখে তাকাল, 'প্লিজ!' বিড়বিড় করে অনুনয়ের সুরে বলল।
তাতে হাতের বাঁধন আরও শক্ত করল রোদ্দুর, 'নো প্লিজ, মাই ডিসিশান ইজ ইউর লাইফ ফ্রম টু-ডে। এখন তুই বল, মরতে চাস নাকি বাঁচতে?'
উত্তর দিতে পারল না বোকা মেয়েটা। চোখে পানি চলে এসেছে তার। একে একে সবকিছু কেড়ে নিয়ে কোন সুখটা পায় এই জল্লাদ ছেলে, কে জানে!
(চলবে)
[আমি কিন্তু রেখেছি। ৫০০ লাইক পূর্ণ হওয়ায় গল্প নিয়ে এসেছি, মিস দেইনি। আজকের টার্গেট ও ৫০০, করে দিলেই গল্প চলে আসবে যথাসময়ে, ইনশা আল্লাহ। হ্যাপি রিডিং!]