ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের নির্বসন

৩য় পর্ব

লেখক: মৃধা মৌনি

#প্রেমের_নির্বাসন - (৩)

লেখনীতে - #মৃধা_মৌনি

______

বিকেল চটপট নিজের পেট চেপে ধরে আর্তনাদ শুরু করল, 'উফরে... উফ! আল্লাহ্ গো... ধরল রে!'

তৃপ্তি একদম ভড়কে গেল। অস্থির গলায় শুধাল, 'কী হলো রে? বিকেল!'

ছুটে এল স্বস্তিও, 'আপা! কী হইছে তোমার?'

বিকেল নাক-মুখ কুঁচকে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাওয়ার মতো করে বলল, 'জানি না তো! হঠাৎ ধরল, একদম নাড়ি ছিঁড়ে আসছে... আল্লাহ রে! ও স্বস্তি, আমি বোধহয় আজ যাবো রে!'

তৃপ্তি বিরক্তি আর উৎকণ্ঠা মেশানো গলায় বলল, 'আরে ধুর, আজাইরা কথা রাখ। স্বস্তি, মিষ্টিটা সরা নিচ থেকে। আর মপ এনে জায়গাটা মুছে ফেল, পিঁপড়া ধরবে। বিকেল, তুই চুপচাপ শো। ব্যথা কমলে আমায় একটা কল করিস, এসে খাবার দিয়ে যাবো।'

'উফফফ... তৃপ্তি রে... মরে গেলাম!' বিকেলের চিৎকার তুঙ্গে।

তৃপ্তি পরম মমতায় ওর হাত ধরে বলল, 'নে, বিছানায় শো।' ওকে ধরে ধরে শুইয়ে দিল তৃপ্তি। পাশেই দাঁড়ানো দীপ্রকে হুকুম করল, 'দৌড় দিয়ে একটা গ্যাস্ট্রিকের ট্যাবলেট নিয়ে আয়, যা!'

দীপ্র কালবিলম্ব না করে তীরের বেগে বেরিয়ে গেল। রোদ্দুর দরজার কোণে দাঁড়িয়ে সবটা দেখছে গম্ভীর মুখে। স্বস্তি নিচটা পরিষ্কার করে বেরিয়ে যেতেই তৃপ্তি উঠল। বিকেলের গায়ের ওপর কম্বলটা বুক পর্যন্ত টেনে দিয়ে সে ঘরের বাতিটা নিভিয়ে দিল। বিকেল চোখ বন্ধ করে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে তখনো।

তৃপ্তি দরজায় এসে রোদ্দুরকে বলল, 'চলো ভাইয়া।' রোদ্দুর শুধু একটা সংক্ষিপ্ত ‘হুঁ’ বলে হাঁটা ধরল। তৃপ্তি শেষবার পেছন ফিরে বিকেলের নিথর শরীরের দিকে তাকিয়ে দরজাটা আলতো করে ভিড়িয়ে দিল।

কিন্তু বারান্দায় পা রাখতেই তৃপ্তির ফোনটা টুং করে বেজে ওঠে। হোয়াটসঅ্যাপে নোটিফিকেশন। স্ক্রিনে তাকিয়ে তৃপ্তির চোখ ছানাবড়া! বিকেলের মেসেজ এসেছে — 'কেমন দিলাম?'

তৃপ্তি অবাক হয়ে সাথে সাথেই কল করল। ওপাশ থেকে বিকেলের খিলখিল হাসি ভেসে এল।

'কী রে? তুই না ঘুমাচ্ছিলি?'

বিকেল হাসতে হাসতে প্রায় গড়াগড়ি খাচ্ছে, 'কেমন খেলা দেখাইলাম দেখলি? বেঁচে গেছি হাড়বজ্জাতটার হাত থেকে! নাইলে আজকে কপালে যে কী ঝাড় ছিল, খোদা জানে!'

তৃপ্তি স্তব্ধ হয়ে গেল, 'তুই... তুই এতক্ষণ অভিনয় করছিলি?'

'তো আবার কী? আমার পেট কি যেন তেন নাকি যে হুটহাট কামড় দিয়ে ধরবে? আরে বাবা, আমার মতোই আমার পেটটাও একদম ইনোসেন্ট, বুঝছিস? এবার শোন, ভাত-তরকারি যা আছে জলদি দিয়ে যা তো সোনা, পেটে ইঁদুর দৌড়াচ্ছে!'

তৃপ্তি লম্বা একটা শ্বাস ফেলে বলল, 'তুই না বিকেল... সত্যি একটা আপদ!'

'একটা জিনিয়াস, তাই তো? থ্যাংক ইউ! এবার জলদি আয়। বায়, উম্মাহ!'

ফোনটা রেখে তৃপ্তি নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল। এই মেয়েটা পেটে এত্ত শয়তানি আর মুখে এত্ত দুষ্টুমি নিয়ে রাতে কীভাবে যে ঘুমায়, তা কেবল বিধাতাই জানেন!

______

দোতলার বিশাল ছাদটার চারপাশে পুরোনো আমলের চওড়া সিমেন্টের রেলিং। থামগুলো মোটা আর শক্তপোক্ত। এই চওড়া রেলিংয়ে বসে নিচে পা ঝুলিয়ে দেওয়াটা এ বাড়ির ছোটদের এক চিরাচরিত অভ্যাস। সৌম্য এই মুহূর্তে ঠিক সেই ভঙ্গিতেই বসে আছে। শীতের ঝিরঝিরে হাওয়া বয়ে যাচ্ছে চারদিকে। এ বছরের শীত যেন একটু অকালেই দলবল নিয়ে হানা দিয়েছে। কপালে এসে পড়া অবাধ্য চুলের কয়েকটা গোছা মৃদু বাতাসে উড়ছে সৌম্যর, কিন্তু তার সেদিকে খেয়াল নেই। তার দৃষ্টি সুদূরে নিবদ্ধ, মুখখানা একদম ম্লান, নিথর।

পেছনে অনেকক্ষণ যাবত মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল রোদ্দুর। হাতের আঙুলের খাঁজে জ্বলন্ত সিগারেট। নিকোটিনের গাঢ় ধোঁয়াটা ফুসফুসে টেনে নিয়ে সে শূন্যে ছড়িয়ে দিল। শেষ টান দিয়ে ফিল্টারটুকু ছাদের এক কোণে ছুঁড়ে ফেলে সে সামনে এগিয়ে এল। পায়ের শব্দে সৌম্যর সম্বিৎ ফিরল। ঘাড় ফিরিয়ে রোদ্দুরকে দেখামাত্রই তার চোখদুটি আতঙ্কে বড় বড় হয়ে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে সৌম্যর মসৃণ কপালে ভাঁজ পড়ল, চোয়াল শক্ত হয়ে এল তার। সে তড়িৎবেগে রেলিং থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ধরা গলায় ডাকল, 'ভাই!'

'নেমে আয়,' রোদ্দুরের কণ্ঠস্বর বরফের মতো শীতল, কিন্তু তাতে একটা অমোঘ আদেশ মেশানো।

বিনা বাক্য ব্যয়ে সৌম্য রেলিং ছেড়ে নিচে নেমে এল। সামনে আসতেই রোদ্দুর দেখল, এই কনকনে শীতেও সৌম্যর কপালে মুক্তোর দানার মতো বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। ছেলেটা যে প্রচণ্ড মানসিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা বুঝতে বাকি রইল না রোদ্দুরের। মনে মনে ভাবল- থাকাই তো উচিত, আকাম ঘটানোর আগে পরিণতির কথা মনে থাকলে আজ এই পরিস্থিতি হতো না।

রোদ্দুর কিছু না বলে সপাটে সৌম্যর হাত টেনে ধরল। সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতেই সৌম্য মোচড়াতে শুরু করল। এক অজ্ঞাত আশঙ্কায় তার কণ্ঠস্বর কাঁপছে,

'না ভাই, আমি নিচে যাব না। আমায় ছেড়ে দাও। বড় বাবা আমাকে... আমাকে মে'রেই ফেলবে আজ!'

রোদ্দুর থমকে দাঁড়াল। তীক্ষ্ণ চোখে সৌম্যর দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় শুধাল, 'আমাকে কি মে'রে ফেলেছে?'

সৌম্য উশখুশ করে মাথা নাড়ল, বিড়বিড় করে বলল, 'তুমি তো তার...'

বাকিটুকু আর তাকে শেষ করতে দিল না রোদ্দুর। মাঝপথেই কথা কেড়ে নিয়ে বলল, 'হ্যাঁ, আমি তার আপন ছেলে, আর তুই তার ভাইয়ের ছেলে। সম্পর্কে তফাত থাকতে পারে সৌম্য, কিন্তু হৃদয়ের জায়গায় পার্থক্যটা কোথায়? আর যা করেছিস, তার মুখোমুখি তো তোকেই হতে হবে। আমি বাইরে থেকে কতটুকু আগলে রাখব তোকে?'

সৌম্য মাথা নিচু করে রইল। একটা নিঃশব্দ নিস্তব্ধতা নেমে এল তাদের মাঝে। রোদ্দুর এবার একটু নরম হলো। সৌম্যর কাঁধে হাত রেখে নিচু স্বরে বলল, 'ভয় পাস না, কিছু হবে না। যা করার আমি ম্যানেজ করে নেব। তুই শুধু নিচে আয় আর সত্যিটা স্বীকার করে নে। সেটুকুর হিম্মত অন্তত রাখ, ঠিক আছে?'

সৌম্য একবার কাঁপা চোখে রোদ্দুরের দিকে তাকাল। তার মৌনতায় সম্মতির আভাস ছিল কি না বোঝা গেল না, তবে সে আর জোর করল না। রোদ্দুরের পাশে দাঁড়িয়ে যন্ত্রচালিতের মতো সে নিচে নামার সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল।

এই বাড়ির নকশাটা বেশ অদ্ভুত। তিন দিক দিয়ে তিনটে দালান উঠে গেছে, আর তাদের বুক চিরে মাঝখানে পড়ে আছে এক চিলতে উঠান- যেটাকে এ বাড়ির অঘোষিত 'হলঘর' ও বলা চলে। দিনের বেলা সেখানে কাপড়ের মেলা বসে, বিকেলে পাটি বিছিয়ে গালগল্পে মেতে ওঠে বাড়ির নারী মহল। এমনকি ছোটখাটো সালিশ-বিচারও জমে ওঠে ঐ চত্বরেই।

কিন্তু আজ উত্তুরে হাওয়ার দাঁত বসানো কামড় থেকে বাঁচতে বিচারসভা বসল ঘরের ভেতরেই। বড় কর্তা উমেদ মির্জার বিশাল শয়নকক্ষেই আজ সবার ডাক পড়েছে। বেচারা উমেদ মির্জা! ছেলে হুট করে এক অচেনা-অজানা মেয়েকে বিয়ে করে ঘরে তুলে এনেছে, অথচ এতক্ষণ তিনি রা করার সময় পাননি। সারাদিন বাইরের কাজের চাপে মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হয়েছে। অবশেষে বিশ্রামের প্রাক্কালে তিনি আসর বসিয়েছেন; কোনো সমস্যা মাথার ওপর ঝুলিয়ে রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমানোর মানুষ তিনি নন। সব ঝামেলা আজ রাতের অন্ধকারেই মিটিয়ে ফেলতে চান তিনি, যেন ভোরের আলোটা অন্তত স্বচ্ছ হয়।

ঘরের ঠিক মাঝখানে আদিবাকে বসানো হয়েছে একলা একটা কাঠের চেয়ারে। মেহেরজানের হাতটা শক্ত করে ধরে রাখা সত্ত্বেও মেয়েটা থরথর করে কাঁপছে। প্রৌঢ়া মেহেরজান যদিও বারবার সাহস দিচ্ছেন, তবু আদিবার বুকের ভেতরকার তোলপাড় থামছে না। সে বারবার অবাধ্য চোখে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। রোদ্দুর আর সৌম্যকে খুঁজছে সে। ওরা না এলে কি এই বিচারকার্য এভাবেই চলবে?

উমেদ মির্জা পাথরের মতো স্থির হয়ে বসে রইলেন। তিনি তাদের জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। অবশেষে রোদ্দুর আর সৌম্য ঘরে ঢুকল। সৌম্যর ঘাড়টা অপরাধীর মতো নুয়ে আছে মাটির দিকে, আর তার বিপরীত মেরুতে রোদ্দুর- বুক চিতিয়ে অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে ভেতরে ঢুকল সে। যেন কিছুই হয়নি, এমন এক নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে সৌম্যর হাত ছেড়ে দিয়ে রোদ্দুর গিয়ে বসল ঠিক বাবার পাশের খালি জায়গাটিতে।

সেখানে বসে ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে ভারী গলায় রোদ্দুর ঘোষণা করল, 'বাবা, শুরু করুন।'

উমেদ মির্জা কিছুক্ষণ স্থির চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ঘরের প্রতিটি কোণ থেকে তখন এক অদ্ভুত নীরবতা চুইয়ে পড়ছে। মির্জা সাহেব প্রথম প্রশ্নটি করলেন অত্যন্ত সরাসরি, 'মেয়ের পরিচয় কী?'

রোদ্দুর বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে শান্ত স্বরে জানাল, 'ভালো বংশের মেয়ে বাবা। পরিবারে মা-বাবা আর দুই ভাই আছে। বড় ভাই টেলিকম কোম্পানিতে ভালো চাকরি করেন, ছোট ভাইটা এখনো পড়াশোনা করছে। আর আদিবা কিছুদিন আগেই ইন্টারমিডিয়েট কমপ্লিট করেছে।'

'ইন্টার?' মির্জা সাহেবের ভুরু কুঁচকে গেল। মুহূর্তের মধ্যে তার কণ্ঠের পারদ চড়ে গেল সপ্তমে, 'এত ছোট একটা মেয়ের সাথে তুমি জড়ালে কেমন করে রোদ্দুর? আমার অমতে আমার বাড়িতে এরকম বেশরম কাজ করার আস্পর্ধা তুমি পেলে কোথায়? এই শিক্ষায় তোমার বাবা তোমাকে বড় করেছিল? জবাব দাও!'

মির্জা সাহেবের সেই বজ্রগম্ভীর গর্জনে পুরো ঘর কেঁপে উঠল। আদিবা ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে পাশে বসে থাকা মেহেরজানের হাতটা হাড়ভাঙা জোড়ে চেপে ধরল। রেহনুমা বেগম মুখে আঁচল চেপে অঝোরে কাঁদছেন; স্বামী আর সন্তানের এই মুখোমুখি লড়াই তিনি সইতে পারছেন না। অথচ রোদ্দুর নির্বিকার, যেন এক পাথুরে মূর্তি।

উমেদ মির্জা আবারও চিৎকার করে জানতে চাইলেন, 'উত্তর দাও বেয়াদব! তোমায় কি এই আদব-কায়দা শিখিয়েছিলাম আমি?'

রোদ্দুর এবার মুখ তুলল। স্থির এবং জোরালো গলায় বলল, 'বিয়েটা আমি করিনি বাবা।'

কথাটা ঘরের প্রতিটি মানুষের কানে যেন কোনো বোমার মতো ফাটল। ঘরে উপস্থিত প্রতিটি সদস্য, এমনকি মেহেরজান ও স্তব্ধ হয়ে গেলেন। উমেদ মির্জা কপাল কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন ছেলের দিকে।

রোদ্দুর এবার সৌম্যর দিকে ইশারা করে বলল, 'হ্যাঁ, আমি বিয়ে করিনি। আদিবা আমার স্ত্রী নয়, ও সৌম্যর বিয়ে করা বউ। আমি ওকে আগলে রাখতে এতক্ষণ সব দায় নিজের ঘাড়ে টেনেছিলাম।'

সৌম্যর মা আইরিন এবার চিৎকার করে উঠলেন, 'এসব কী বলতেছ রোদ আব্বা? নিজের দোষ ঢাকতে তুমি আমার পোলার নামে বদনাম দিতেছ কেন?'

'কাউকে মিথ্যে অপবাদ দেওয়া আমার স্বভাবে নেই মেজো মা,' রোদ্দুর শীতল চোখে লতার দিকে তাকিয়ে বলল, 'আদিবাকে আমি বিয়ে করিনি, করেছে আপনার বড় ছেলে সৌম্য। ও আদিবার ব্যাচমেট। বিশ্বাস না হলে নিজের ছেলেকে জিজ্ঞেস করে দেখুন।'

আইরিন যেন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ছেলের দিকে তেড়ে গেলেন। কিন্তু উমেদ মির্জা হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলেন। গম্ভীর গলায় বললেন, 'আমার সামনে ছেলেমেয়েদের গায়ে হাত তোলার আস্পর্ধা এ বাড়িতে কারও নেই আইরিন!'

'কিন্তু ভাইজান...'

'রোদ যদি সত্যি বলে থাকে, তবে এর বিচার আমি করব, তুমি মা হিসেবে শাসন করতে পারো, কিন্তু আমার সামনে মারধর আমি পছন্দ করি না। সৌম্য, এদিকে আয়।'

সৌম্য স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ভয়ে তার শরীর কাঁপছে, ঘাড়টা এতটাই নুয়ে পড়েছে যে বুক পর্যন্ত ঠেকেছে। উমেদ মির্জা দ্বিতীয়বার ডাকলেন, 'কী হলো? তোকে ডাকলাম তো, এদিকে আয়।'

রোদ্দুর সৌম্যকে সাহস দিয়ে বলল, 'আয় এদিকে। কিচ্ছু হবে না।'

সৌম্য আড়চোখে একবার আদিবার দিকে তাকাল। তারপর ধীরপায়ে লতা বেগমকে পাশ কাটিয়ে উমেদ মির্জার মুখোমুখি দাঁড়াল।

উমেদ মির্জা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ভ্রাতুষ্পুত্রের দিকে তাকিয়ে শুধালেন, 'তুই কি ওকে বিয়ে করেছিস?'

সৌম্য নিরুত্তর। মির্জা সাহেব আবারও বললেন, 'উত্তর দে সৌম্য। এতগুলো মানুষ না ঘুমিয়ে তোর জন্য বসে আছে। ওই মেয়েটা কার স্ত্রী? তোর না রোদের?'

'আ... আমার!' কণ্ঠস্বর কাঁপছে তার।

উমেদ মির্জা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, 'এত তাড়াহুড়ো কেন করলি? পড়াশোনা করছিলি, আমাদের অন্তত জানাতি। আমরা বড়রা একটা সিদ্ধান্ত নিতাম। তোদের কি এখন ঘর-সংসার করার বয়স হয়েছে?'

সৌম্য এবার ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল। কান্নার মাঝেই সে বলতে লাগল, 'আসলে চাচ্চু, আদিবা আমার সাথেই পড়ত। এসএসসিতে টাইফয়েড হওয়ায় ও দুই বছর পরীক্ষা দিতে পারেনি, আমি ওর চেয়ে এগিয়ে গেলাম কিন্তু যোগাযোগটা ছিল। ওর এইচএসসি শেষ হওয়ার পরেই ওর পরিবার বিয়ের জন্য উঠেপড়ে লাগল। প্রবাসী এক ছেলের সাথে সামনের সপ্তাহেই বিয়ে ঠিক। এদিকে আদিবা আমাকে ছাড়া কাউকে বিয়ে করবে না, এমনকি ও কয়েকবার আত্মহত্যার হুমকিও দিয়েছিল। আমি আর কোনো উপায় না দেখে ওকে বিয়ে করে ফেলি।'

একটু দম নিয়ে সৌম্য আবার বলল, 'বিয়ে তো করলাম, কিন্তু ঘরে কীভাবে জানাব সেই ভয়ে রোদ ভাইকে সব বললাম। ভাইয়াই বাইরের থেকে ওকে নিয়ে এল। সবাই ধরে নিল আদিবা ভাইয়ার স্ত্রী। আমি যখন দেখলাম কেউ চিৎকার-চ্যাঁচামেচি করছে না, তখন ভাইয়াকে বলেছিলাম এখন চুপ থাকতে। আগে তোমার সাথে একা কথা বলে শান্ত করতে। কিন্তু ভাইয়া বলল, যা জানানো হবে সবার সামনেই জানানো হবে। আমিও ভেবে দেখলাম, যা করে ফেলেছি তা থেকে ফেরার পথ নেই। তুমি চাইলে মে'রে ফেলো চাচু, কিন্তু রাগ রেখো না। বাবা না থাকলেও তুমি তো আমাদের নিজের সন্তানের মতোই আগলে রেখেছ। তুমি রাগ করলে আমার খুব কষ্ট হবে চাচু, খুব কষ্ট হবে...'

সৌম্যর শেষ কথাগুলো কান্নায় ভেঙে পড়ল। ঘরের গুমোট ভাবটা এবার এক বুকচাপা দীর্ঘশ্বাসে পরিণত হলো। উমেদ মির্জা এক দৃষ্টে সৌম্যর দিকে তাকিয়ে রইলেন, তাঁর চোখে তখন রাগের বদলে এক বিষণ্ণ বিস্ময়।

আদিবা উঠে এল এ পর্যায়ে। হঠাৎ করেই একগাদা সাহস সঞ্চয় করেছে সে। সরাসরি গড়িয়ে পড়ল উমেদ মির্জার পায়ের উপর। দু'হাতে পা দুটো আঁকড়ে ধরে কেঁদে চলল অনবরত। ফোঁপানো সুরে বলতে লাগল, 'আমায় ক্ষমা করবেন। আপনার বাড়িতে আমি এভাবে আসতে চাইনি। বিশ্বাস করুন বড় চাচা, উপায় না পেয়ে আমরা এরকম একটা কাজ করতে বাধ্য হয়েছিলাম।'

মির্জা সাহেব ধরে তুললেন আদিবাকে, সোজা করে বললেন, 'তোমার বাসায় জানিয়েছিলে?'

আদিবা ঘাড় নাড়ল, 'হুম, জানিয়েছিলাম তো। তারা কিছুতেই মানলো না। আমার ফোন কেড়ে নিয়ে আমায় রুম লক করে ফেলেছিল এক প্রকার। জোর করেই বিয়েটা দিয়ে দিতো, বুঝতে পেরেই আমি উপায় না পেয়ে এভাবে বেরিয়ে আসি।'

'জটিল করলে তোমরা ব্যাপারটা! সৌম্য যদি আমাকে জানাত, আমি তোমার পরিবারে কথা বলতাম। আমার কথা নিশ্চয়ই তারা ফেলত না। সৌম্যকে তারা দেখেছে, ওর বংশ, ওর পরিবার তো দেখেনি...'

আদিবা মাথানত করে চুপ করে রইল। সৌম্য নাক টানছে দেখে উমেদ মির্জা বিরক্ত হয়ে বললেন, 'চোখ মুছে ঘরে যা। যা করার করেই ফেলছিস। এখন আর কেঁদে কি হবে?'

'তুমি আমার উপর...আমার উপর রেগে নেই তো চাচ্চু?'

'ঘরে যা বউকে নিয়ে।'

আইরিন আদিবাকে তুলে নিয়ে সৌম্যকে সাথে করে বেরিয়ে গেল ঘর ছেড়ে। লতা যাওয়ার সময় তাকে ডেকে জানিয়ে দিলেন উমেদ, 'ওমরকে জানানোর দরকার নেই এখন। চিন্তায় থাকবে এসব নিয়ে। ওই দেশে এমনিতেই ঝামেলায় আছে বেচারা। তুমি আবার এসব জানিয়ে অতিরিক্ত টেনশন দিও না লতা।'

লতা 'আচ্ছা ভাইজান' বলে তৃপ্তি, স্বস্তিকে নিয়ে বেরিয়ে গেল। রয়ে গেল রেহনুমা, রোদ্দুর আর উমেদ। বিকেল এসে উঁকি দিল এমন সময়ে। মেহেরজান তাকে দেখেই খেকিয়ে উঠলেন, 'কি রে ছেড়ি, তোর এইনে কি? এত রাইত হইছে, টইটই না কইরা যাইয়া ঘুমা যা...'

'উফ বুড়ি, যাইতেছি, একটু দেখতে আসছি।'

'দেখা লাগব না, ভাগ এখান থেইকা। একটা কথা বললে শুনোস না। অলক্ষীর ঘরের অলক্ষী। যেইনে মুখ দেয়, ওইনে অভিশাপ লাইগা যায়, যা ভাগ।'

বিকেল মুখ ভোঁতা করে বেরিয়ে গেলে তার পেছন পেছন মেহেরজান ও বেরোলেন। রোদ্দুর উমেদ মির্জাকে বলল, 'উনি সবসময় বিকেলকে আজেবাজে কথা শোনায় কেন বাবা? আপনি কিছু বলতে পারেন না?'

উমেদ মির্জা উঠে জানালা আঁটকাতে লাগলেন ঘরের, 'বাদ দে, বয়স্ক মানুষ, কয়দিনই বা বাঁচবে!'

'তাই বলে যা খুশি তাই বলবে সবসময়?'

'ওসব বাদ দিয়ে তুই নিজের ঘাড়ে এসব টানতে গেলি কেন আব্বা? তুই জানিস, আমি সন্ধ্যা থেকে কোনো একটা কাজে মন বসাইতে পারি নাই।'

রোদ্দুর একটু নরম হলো, বলল, 'আমার নাম জুড়লে বাড়ির সবাই চুপচাপ থাকবে বলেই আর কিছু বলি নাই। আর আমি ঘরে আসার সাথে সাথেই সবাই ধরে নিয়েছিল, ও আমার স্ত্রী, তাই আমিও চুপ করে ছিলাম।'

'এরপর থেকে এরকমটা করবা না আব্বা। আমি বয়স্ক মানুষ, আমার হার্টে কখন কি হয়..'

রোদ হেসে বলল, 'কিচ্ছু হবে না। আপনি এখনো অনেক শক্ত আছেন। এতবড় সংসারটার মাথা হয়ে আছেন। আপনার কিচ্ছু হবে না। আমাকে নিয়ে আপনার যত স্বপ্ন, যত ইচ্ছা সব পূরণ হওয়া দেখবেন আপনি।'

'সত্যি আব্বা?'

'হুম। আপনি যা চাইবেন আমি তাই করব সবসময়, কথা দিয়েছি না?'

'বুঝলে রেহনুমা, এরকম সোনার টুকরা ছেলে দিয়েছো আমাকে, তার জন্য তোমাকে শতবার ধন্যবাদ জানালেও কম হবে।'

রেহনুমা অল্প একটু হাসলেন। হঠাৎ করেই তার কপালে কয়েকটি চিন্তার রেখা পড়ল।

______

মায়ের গন্ধ কেমন হয়? জানে না বিকেল। খুব ইচ্ছে করে, মাঝে মাঝে আহ্লাদী হয়ে চিতিয়ে পড়তে মায়ের কোলে। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরেই ব্যাগ, মোজা, পানির বোতল সোফায় ছুঁড়ে ফেলে চিৎকার করে মা মা বলে ডাকতে। কলেজ থেকে এসে ক্লান্ত, দিশেহারা, অসহায় হয়ে মায়ের বুকের উপর ঝাপিয়ে পড়তে। জ্বর কিংবা অসুস্থে পাশে বসে সেই মানুষটা মাথায় পানি দিয়ে দিক- জিজ্ঞেস করুক, বাবু, কি খাবি, কি খেতে মনে চায়, বল মা কে, যা বলবি মা তাই বানিয়ে দিবো। অথবা হাজারটা নালিশ জমিয়ে মাকে জানাতে।

ওমা জানো, আজ ও আমাকে এটা বলেছে, ও আমার সঙ্গে এটা করেছে, জানো মা ও খুব খারাপ। তুমি কিন্তু ওকে বকে দেবে... ও মা সামনের শুক্রবার বিরিয়ানি রাঁধলে ওকে দেবে না, খবরদার!

বিকেল একা একাই বিছানায় শুয়ে গুটিশুটি দিয়ে যায়। কম্বলের নিচে ওর একটুখানি দেহটা কুঁকড়ে কেঁপে কেঁপে ওঠে। কাঁদে মেয়েটা। দু'হাতে খামচে ধরে পাশ বালিশ, একা একাই গুনগুনিয়ে ডাকে, 'মা, মা, কোথায় চলে গেলে...মা!'

ওই উত্তরে সাড়া দেয় না কেউ। জানে, কেউ দেবেও না কোনোদিন, কত রাত মায়ের সানিধ্য পাবার তৃষ্ণায় গুমরেছে ও...কত প্রহর কাটিয়েছে নীরবে নিভৃতে কেঁদেকেটে একাকী!

কান্নার বেগ বাড়ে, কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে, নাক দিয়েও পানি ঝরে মেয়েটার। দু'হাতে আরও শক্ত করে জড়িয়ে নেয় বালিশটাকে, ডুবে যায় ওর অতল গহ্বরে, জড়ানো গলায় কিছু একটা বিড়বিড় করতে করতে একসময় হারিয়ে যায় ঘুমের গহীন দেশে। সেখানেও যদি মায়ের সঙ্গে দেখা হতো..!

রাতের মধ্য প্রহর কাটছে। ঘড়ির কাটায় টিকটিক করে এগিয়ে চলছে সময়। চারদিক স্তব্ধ, অন্ধকার, নিগূঢ় রজনী। একটা পিন পড়ার শব্দ ও নেই কোথাও। এমন সময়ে একদম নিঃশব্দেই ভেড়ানো দরজাটা হা করে খুলে গেল এক চিলতে, ভেতর দিয়ে ছোঁ মেরে ঢুকল কেউ। আবার দরজাটা চাপিয়ে দিল ধীর হাতে। আস্তে হেঁটে এগিয়ে গিয়ে বসল বিছানার উপর। মেয়েটা ঘুমুচ্ছে জড়সড় হয়ে, বুকের উপর দিয়ে কম্বল সরে গেছে, নিচ দিয়ে পায়ের পাতা বেরিয়ে এসেছে। বেড সাইড টেবিল ল্যাম্পের হালকা নীল আলোয় তার ঘুমন্ত মুখখানাই দেখাচ্ছে কোনো স্বর্গের অপ্সরীর মতো। কোনো ভান নেই, কপটতা নেই, একগাদা সরলতায় স্নিগ্ধ তরল মুখখানি, হাতের আঁজলায় ভরে চুমু খেতে ইচ্ছে করে রোদ্দুরের। বুকের ছাতি শুকিয়ে যায় হঠাৎ। খেয়াল করে চোখের কার্নিশ ভেজা এখনো, কাঁদছিল মেয়েটা? অসহায় লাগে রোদ্দুরের, খালি খালি হয় মাঝখানটা। কেন কাঁদে বোকা মেয়েটা? ও কি জানে না, রোদ্দুর মির্জা ওর কান্না সহ্য করবার মতো শক্তিশালী হয়ে ওঠেনি এখনো! একটা হাত আলতো করে রাখে কপালে। চমকে ওঠে। বিকেল ঘুমের ঘোরেই গোঙালো। মেয়েটার গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে....

(চলবে)

[এই পর্বের লাইক টার্গেট ৫০০।

করে দিলেই পরবর্তী পর্ব পেয়ে যাবেন।]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন