ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের নির্বসন

১৮তম পর্ব

লেখক: মৃধা মৌনি

#প্রেমের_নির্বাসন - (১৮ - প্রথম অংশ)

লেখনীতে- #মৃধা_মৌনি

[নোট পড়বেন]

_________

মেহেরজানের মুখের রেখাগুলো কুঁচকে এক বিচিত্র মানচিত্রের আকার নিল। নিজের অভিজ্ঞ চোখের শ্লেষ উগড়ে দিয়ে তিনি ছ উমেদ মির্জার দিকে চাইলেন। কণ্ঠে ঝরল তীক্ষ্ণ হুঁশিয়ারি, 'তোর ছাওয়ালের মতিগতি তো ভালা ঠেকতাছে না উমেইদ। সামলা অরে, সব ভাইস্যা যাওনের আগেই সামলা!'

উমেদ নিজেও ততোক্ষণে পাথরের মতো জমে গেছেন। রোদ্দুর, যার ওপর ভিত্তি করে সে তার সারা জীবনের স্বপ্ন আর আকাঙ্ক্ষার ইমারত গড়েছে, আজ তাকে বড় অচেনা ঠেকছে। মায়ের কণ্ঠের এই সংশয় উমেদের ভেতরের দ্বিধাকে যেন আরও গাঢ় করে দিল। অথচ রোদ্দুর নির্বিকার! ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে সে মেহেরজানের কথার পিঠে টেক্কা দিচ্ছে। অবলীলায় পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ল, 'বন্যা তো আসেনি দাদি। ভাসবে কী?'

মেহেরজানের পিত্তি জ্বলে উঠল। কার বিষে ছেলেটা এমন নীল হয়েছে, তা বুঝতে তার বাকি নেই। দুনিয়ার কত ঘাটের জল খেয়ে তিনি চুলে পাক ধরিয়েছেন, অভিজ্ঞতার সেই পুটলিটা বড় ভারি। রোদ্দুরের কথার জবাব না দিয়ে তিনি আবারও উমেদকে বিঁধলেন, 'তোর সংসারটা পুইড়া ছাই হইয়া যাইতাছে আব্বা। আমার বড় ডর করতাছে রে!' এরপর চোখের মণি নাচিয়ে মেজ বউয়ের দিকে ফিরে ফিসফিস করে বিষ ঢাললেন, 'চিন্তায় বুকটা ফাইড্যা যায়... ও বড় বউ, পেটের মধ্যে এসব কী ধইরা রাখছিলা?'

রেহনুমা আক্ষরিক অর্থেই দিশেহারা। বিব্রত আর হকচকিত হয়ে ছেলের দিকে সকরুণ চোখে চাইলেন। মৌন মিনতি জানালেন যেন এই ঝড় থামায়। কিন্তু রোদ্দুর সেদিকে ভ্রূক্ষেপও করল না। মায়ের ওপর জমে থাকা অভিমান তাকে আজ নিষ্ঠুর করে তুলেছে।

মেহেরজানের দিকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে তপ্ত গলায় রোদ্দুর বলল, 'দাদি, কথাবার্তা একটু সামলে বলো। মুরুব্বি বলে যা ইচ্ছা তাই বলে দেবেন না। অনেক সহ্য করেছি, আর কত?'

মেহেরজানের চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। চিৎকার করে উঠলেন, 'এই ছ্যামড়া! তোরে তো ভালো জানতাম, আইজকা তোর কী হইলো? এত্ত মাইনষের সামনে তুই মুখে মুখে তক্ক করস? ওই উমেইদ্যা, ওসমাইন্না! তোরা কি চোখে ঠুলি লাগাইছোস? তোগোরে কি বোবায় ধরলো?'

ওসমান মির্জা আগের মতোই পাথরের মূর্তির ন্যায় নিরুত্তর রইলেন। তবে উমেদ মির্জা আর স্থির থাকতে পারলেন না। পাতের ভাতে জল ঢেলে উঠে দাঁড়ালেন। গলার নলি দিয়ে অন্ন আর নামবে না আজ। বড় নির্লিপ্ত চোখে ছেলের মুখটা পড়ার চেষ্টা করে শুধু বললেন, 'রোদ্দুর! থামো!'

'কেন থামব? আমি কি অন্যায় কিছু বলেছি বাবা?' রোদ্দুরের কণ্ঠে প্রতিবাদের সুর।

উমেদ চাপা কণ্ঠে শাসন করলেন, 'এটা ন্যায়-অন্যায়ের বিচার না। উনি তোমার মুরুব্বি, এ বাড়ির মাথা।'

'তাই বলে উনি বিষ পান করতে বললে আমি হাসিমুখে তা-ই করব?'

'রোদ্দুর!' এবার গর্জে উঠলেন উমেদ।

রোদ্দুর ধীর পায়ে বাবার একদম সামনে এসে দাঁড়ালো। গলার স্বর নামিয়ে একদম খাঁদে নিয়ে নরম অথচ ইস্পাত-কঠিন সুরে বলল, 'বাবা, তোমাকে আমি আদর্শ মানি। সেই জায়গাটা নষ্ট হতে দিও না। কখনো যেন এমন সময় না আসে যে, তোমার বাবার পরিচয় থেকেই নিজেকে মুক্ত করার জন্য লড়াই করতে হয়!'

কথাটা ঘরে রাখা বারুদের স্তূপে একটা জলন্ত দিয়াশলাইয়ের কাঠি যেন! কারো উত্তরের অপেক্ষা না করেই রোদ্দুর গটগট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। পেছনের ঘরজুড়ে রেখে গেল শ্মশানের নিস্তব্ধতা। রোদ্দুরের শেষ কথাটি বোমার মতো ফেটেছে সবার কানে। উমেদ মির্জা হতভম্ব চোখে একবার মেহেরজান, একবার রেহনুমার দিকে তাকাচ্ছেন। তার কণ্ঠ দিয়ে কেবল অস্ফুট স্বরে বেরোলো, 'এই, ও কী বলে গেল? রেনু... ও কী বলল আমাকে?'

★★★

পিচ ঢালা রাস্তার উপর সূর্যের কিরণ গলে গলে পড়ছে। চিকচিক করছে আলোর প্রতিফলন। তার উপর আঁছড়ে পড়ল সিগারেটের ফিল্টারটা। আজ এই নিয়ে দু নাম্বার সিগারেটটি সফলতার সঙ্গে গ্রহণ করতে পারল সৌম্য! যে ছেলে জীবনে কোনোদিন এসবের পাশ মাড়ায়নি, আজ একটু বাদে বাদে তার তৃষ্ণা জেগে ওঠে। সিগারেটের টান লাগে। গতকাল রাতেই সে এক প্যাকেট গোল্ড লিফ সুইচ সিগারেট কিনে পকেটে রেখে দিয়েছে৷ আরেকটা ধরাবে কি ধরাবে না, ভাবতে ভাবতে একবার হাত রাখল পকেটের উপর, আলগা ভাবে স্পর্শ করে। চোখ ঘুরিয়ে চায় সামনে মাথা তুলে সগৌরবে দাঁড়িয়ে থাকা সদ্য চুনকাম রঙ করা নতুন সাদা বাড়িটির দিকে। মনে হচ্ছে, মণকে মণ দুধ দিয়ে গোসল করানো হয়েছে ওটাকে। কি যে সুন্দর লাগছে। এই সুন্দরের ভেতরই লুকিয়ে আছে সবচেয়ে ভয়ংকর হিংস্রতা...এই বাড়িটির ভেতরই চলে সম্পর্কে সম্পর্কে দ্বন্দ্ব, লড়াই আর কাউকে জীবনের তরে শেষ করে দেবার মানসিক যন্ত্রণা।

অনেকক্ষণ হবে, এখানে এসে দাঁড়িয়ে আছে সৌম্য। হাতঘড়িটায় একবার চোখ বুলিয়ে নেয় আবারও, তিন ঘন্টা পেরিয়ে গেছে। অথচ একবারও ঢোকার চেষ্টা করেনি। পেছনের পকেটে এখনো দুমড়ে মুচড়ে আছে কাগজখান। এটাকে সামনে ধরে আদিবাকে শুধু একটা প্রশ্নই করতে ইচ্ছে করছে সৌম্যর, তা হলো, কেন?

এই কেনতেই সব জড়িয়ে...

কেন জীবনে এলে?

কেন দু'চোখে জল ভরে দিয়ে আবার চলেও গেলে?

কেন সেদিন বিশ্বাস করে আমার হাতটা ধরলে না তুমি?

কেন বুঝলে না, ভালো না বাসতে চেয়েও তোমায় ভালোবেসে ফেলেছিলাম আমি...

কেন লেখা হলো না তোমার আমার মিলন?

তবু কেন নেমে এসেছিল কাছে আসার সন্ধিক্ষণ?

কেন নিয়ে গেলে তুমি হৃদয়ের সবটুকু সুখ, পূর্ণতা, শান্তি;

দিয়ে গেলে কেন প্রেমেরই এই নির্বাসন?

কেন, কেন, কেন?

সৌন্য চোখ বুঁজে আবারও বিড়বিড় করে ওঠে, কেন আদু, কেন?

'কপাল খারাপ, তাই।'

উত্তর দিলো কেউ একজন। সৌম্য তড়িঘড়ি চোখ মেলে তাকাল। কোন ফাঁকে তার সামনে এই ছেলেটা এসে দাঁড়িয়েছে? এ কি চেনে একে? হ্যাঁ চেনেই তো, ওই যে দেখেছিল সেদিন, ওই রূঢ় লোকটার হুকুম তালিমেই ছুটে এসেছিল এই ছোট্ট ছিপছিপে গড়নের পাতলা পুতলা ছেলেটা, চোখের সামনে আদিবার মা'কে কোলে তুলে নিয়েছিল ছোঁ করে....এই তো সেই ছেলেটা! কি নাম তার?

সৌম্য ফট করেই জানতে চেয়ে বসল, 'তোমার নাম কি?'

বিব্রত হয় আসিফ, অথচ ভেবেছিল বিব্রত হবে সামনে দাঁড়ানো মানুষটা। সত্যি, ভীষণ অন্যরকম সৌম্য! ঝড় বয়ে যাচ্ছে, বোঝা যায় না বোঝালেও, তবু কেমন এক শান্ত ভাবও ভর করে আছে ওর উপর।

আসিফ ঝেড়ে কাঁশে। জবাব দেয় বিনয়ের সঙ্গে, 'আমি আসিফ। আসিফ রহমান। দুর্ভাগ্যবশত এ বাড়ির ছেলে।'

সৌম্য ভ্রু কুঁচকে জানতে চায়, 'দুর্ভাগ্যবশত বললে কেন?'

'দুর্ভাগ্যই, তাই...' বলেই হাসল ছেলেটা, তারপর ঘাড় ফিরিয়ে ভীষণ আতংকিত চোখে একবার তাকাল মাথা উঁচিয়ে দাঁড়ানো ওই বাড়িটির পানে। আবার ফিরলো, সৌম্যর চোখে চোখ রেখে গলার কণ্ঠস্বর খাঁদে নামিয়ে ফিসফিসালো, 'চলুন।'

'কোথায়?' সৌম্য একটু অবাকই!

আসিফ ওর হাতটা টেনে ধরে, 'চলুনই না, প্লিজ!'

তারপর সাহস খাটিয়ে নিজেই টেনে নিয়ে চলে। সৌম্য হতবাক হলেও শুধায় না কিছু। চুপচাপ একবার বাড়িটার নির্লিপ্ত দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গিটাকে গিলে খেয়ে এগিয়ে চলে অজানার উদ্দেশ্যে।

দিনের তৃতীয় সিগারেটটা ধরালো সৌম্য। কয়েক টান দিয়েই ফেলে দিলো। পায়ের তলায় জুতোর নিচে পিষলো জ্বলে থাকা ফিল্টারটা, নিজেই নিজের পরিবর্তনে কেমন বিমূঢ় হয়ে পড়ছে। আদিবা তাকে কতখানি প্রভাবিত করে ফেলেছে!

আসিফ পাশেই চুপ করে বসে। দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার মনের অশান্তি দেখছে, আর সাজিয়ে নিচ্ছে যা বলতেই এখানে এসেছে ওরা। আছে, একটা খোলামেলা মাঠের পার্শ্ববর্তী বটগাছের নিচে বাঁধানো বেঞ্চির উপর। রোদের তাপ কমছে, বিকেলের দিকে এগোচ্ছে সময়। কুয়াশার পাতলা চাদর মাকড়সার জালের ন্যায় থাবা বসাচ্ছে চারদিকে, খুব ধীরে, আর ঘন্টাখানেক পরেই ঠান্ডা হাওয়া বইবে।

সৌম্য হঠাৎ খেয়াল করে। আসিফকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে একটু অপ্রস্তুত হয়। পাশে এসে বসে পড়ে ধপ করে, অস্ফুটে বলে ওঠে, 'সরি।'

আসিফ সে কথার ধার ধারে না, বরং পাল্টা প্রশ্নে জর্জরিত করে আসিফকে, 'আপনি নাকি সিগারেট বিড়ি কিছুই খান না।'

সৌম্য ওর দিকে প্রশ্নবিদ্ধ চোখে তাকালে আসিফ পুনরায় বলে ওঠে, 'আদিবা আপুই বলেছে আমাকে। আপনার মধ্যে নেশাপানি বা অন্য কিছুই নেই। তাই জানতে চাওয়া...'

'ওহ।' সৌম্য মুখ কালো করল, 'নতুন... বলতে পারো!'

'আচ্ছা।' যেন সবটা বুঝে নিলো আসিফ। কিছু সেকেন্ড মৌনতাকে গ্রহণ করে বলে উঠল ফের, 'আপনাকে এখানে এভাবে টেনে তো আনলাম, আসলে কি যে বলব, সেটাই বুঝতে পারছি না।'

সৌম্য অবাক হয়, একই সঙ্গে বিরক্ত।

একটু রেগেই উঠল যেন, কণ্ঠের স্বরে কাঠিন্য যুগিয়ে বলল, 'আমার হাতে এত সময় নেই। যা বলতে চাও, বলো। তারপর আমি চলে যাবো।'

'কোথায়?' ফট করে মুখ দিয়ে প্রশ্নখানা বেরোতেই গিলে নিলো আসিফ, 'সরি, অযাচিত কথা বলে ফেলছি। আসলে, বলার মতো কিছু নেই, আবার অনেক কিছুই আছে।'

'মানে?'

'সইটা আপু মন থেকে করেনি।'

সৌম্য কেমন জমে গেল কথাটা শোনা মাত্রই। পরপর কঠিন হয়ে গেল মুখটা ওর, খুব অভিমানে আওড়ায় পরের কথাগুলি, 'ভালো। জোর করে করিয়েছে, এটাই তো বুঝাতে চাও? খুব ভালো। যেয়ে বলিও, তার কাজে আমি বাহবা দিয়েছি।'

আসিফ বলল, 'আপনি তার উপর রেগে আছেন, আমি জা...'

সৌম্য নিজের দিকে কথা টেনে নেয়, 'না, না, রাগ করব কেন? সে কি রাগ করার মতো কিছু করেছে নাকি? কি ভালো কাজ তার...! আমার জীবনটাকে এত সুন্দর মোড়ে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে যে আমি...' সৌম্য ইচ্ছে করে টেনেটুনে সবগুলি দাঁত বের করে হাসে, 'দেখো না, আমার হাসি ধরে না মুখে। পারলে এত হাসি আলমারিতে তুলে রাখতাম।' পরমুহূর্তেই দাঁত খিঁচিয়ে একরাশ বিরক্তিতে উচ্চারণ করে, 'যত্তসব।'

আসিফ ছোট করে একটা নিঃশ্বাস টেনে নিলো। থম ধরা কণ্ঠে পরবর্তী আলাপ চালালো।

'ইটস ফাইন! আপনার রেগে থাকাটাই স্বাভাবিক। অন্য কেউ হলেও একই অনুভূতি প্রকাশ করত। তবে আপু চায় আপনি তাকে প্রতারক হিসেবেই জানেন, আর আমি চাই আপনি জেনে রাখুন- আদিবা নামের মেয়েটা সত্যিকার অর্থেই আপনাকে ভালোবেসে ক্ষয়ে গেছে। একটা নিঃসঙ্গ, একাকী তারার ন্যায়...'

মুখ তোলে আসিফ, সৌম্য চেয়েই ছিল, দু'জনের চোখে চোখ পড়তেই সৌম্যকে কেমন শুকনো দেখাল।

'আপু আপনাকে সত্যি ভালোবাসে! খুব! আমি আমার পরিবারে কাউকে কারো জন্য এত ডেসপারেট হতে দেখিনি। সেদিন আপু বোকার ন্যায় হয়ে গিয়েছিল। একদিকে চাচীর ওরকম অসুস্থতার নাটক, আরেকদিকে চাচার রাগী দৃষ্টি আর ত্যাজ্য করে দেওয়ার কথা শুনে...'

'এক মিনিট, এক মিনিট, কিসের নাটক?'

'অসুস্থতার নাটক। উনি মাথা ঘুরে পড়ে যাননি, বরং নাটক করেছিলেন, যেন আদিবা আপু দুর্বল হয়ে পড়ে। আর হলোও তাই...'

সৌম্য নির্বাক, রা নেই মুখে।

এতবড় ছলচাতুরি করতে পারে, তাও কিনা কোনো পরিবার! বিশ্বাস করাটা কষ্টকর তার জন্য।

আসিফ বলে চলে, 'আপনি চেনেন না এদের। আমার পরিবার হয়েছে তাতে কি? এরা সব পারে, সব! বিশ্বাস করুন, সব! এরা নিজেদের স্বার্থ ছাড়া আর কিচ্ছু বুঝে না। আপনারা চলে যাওয়ার সাথে সাথে আপুকে এক ঘরে আঁটকে দেয়। এরপর উনি অনেক চেয়েও আপনার সাথে যোগাযোগ করতে পারেনি। আমার মাধ্যমে চিঠিও পাঠাতে চেয়েছিল, পারেনি। এমনকি এই ডিভোর্স পেপারে সই করে পাঠানো, এটাও তাদের কারসাজি। তবে...আপু ডিভোর্সটা আরও একটা কারণে দিয়েছে। উনি চায়, আপনি এগিয়ে যান। যা ক্ষতি হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সাধ্য তার নেই, তবে আপনি যেন আর আঁটকে না থাকেন, থেমে না যান, এটা চাইতেই আপু সই করে। আপনি রাগ জেদ থেকে হলেও আগাবেন জীবনে, এই ভেবে। বিশ্বাস করুন সৌম্য ভাই, আমি বলছি আপনাকে, আদিবা আপু তা নয় যা আপনি ভাবছেন। সেদিন আপুর জায়গায় নিজেকে কল্পনা করুন, তাহলেই বুঝবেন, পরিবার আর প্রিয় মানুষটার মাঝখানে যেকোনো একজনকে চুজ করে নেওয়া কতটা কঠিন! আপু ভাবেওনি এত কিছু হবে। বরং বিয়ে হলে তো মেনেই নেয়- এমনটা ভেবেই অত জোরজার করে আপনাকে বিয়ে করেছিল। যদি জানত, তার পাথর হৃদয়ের বাবাকে গলানো যাবে না কোনোমতেই, তবে আপনার জীবনটা তছনছ করত না। ঠিকমতো খায় না, ঘুমায় না, কাঁদতে কাঁদতে নিজেকে কেমন যে করে ফেলেছে...আপনি না দেখলে বিশ্বাস করতে পারবেন না! আপু....জ্যান্ত নির্বাসন নিয়েছে।'

আসিফ কেঁদে ফেলে হঠাৎ করেই।

সৌম্য নড়চড় ও ভুলে গেছে যেন। সময় থমকে আঁটকে আছে এখানেই। কি এক পাথর সরে যাচ্ছে হৃদয়ের উপর থেকে...অভিমানের পারদ নেমে শূন্যের কোঠায়। আসিফকে স্বান্তনা স্বরুপ কিছু যে বলবে, তাও মাথায় থাকে না তার, বারবার আদিবার মুখটা মনে পড়ে। ছোট্ট, একটুখানি, পানপাতার মতোই। থুতনিতে আপেক কাঁটা খাঁজ, তার ঠিক বাম পাশেই একটা ছোট তিল...কালো কুচকুচে, কি সুন্দর দেখায়!

সৌম্য বুক ভরে শ্বাস টেনে নেয়। আসিফ নিজেকে সামলে নিয়েছে। দু'চোখের কোণে মুছে নিতে নিতে বলে ওঠে ফের, 'চোখের সামনে এসব আর সহ্য হচ্ছে না। তাই যখন আপনাকে বাড়ির সামনে দেখতে পেয়েছি, এক মুহূর্ত কালবিলম্ব না করে চলে এসেছি। প্রেম-ভালোবাসা কি জিনিস, আমি জানা নেই, আমার জানা নেই। তবে এখন বুঝতে পারছি, প্রেম-ভালোবাসায় পৃথিবী টিকে থাকে। টিকে থাকে বিশ্বাসে। যার জীবনে ভঙ্গ হয় এগুলো, তার জন্য পৃথিবীটা নরক সমান..আর আমি চাই না, ওর জীবনটায় জাহান্নাম নেমে আসুক! এমনিতেই কম তো পাচ্ছে না। এবার একটু ভালোবাসা ওর ও পাওয়া উচিত।'

আসিফ সৌম্যর হাতজোড়া মুঠোয় চেপে ধরে, 'সৌম্য ভাইয়া।' অনুনয়ের সুর তুলে বলে, 'ও আপনার বউ, আপনার বিয়ে করা স্ত্রী। যদি মনে হয় এ কথা ধ্রুব সত্য, তবে নিয়ে যান ওকে। সব কিছুর বিনিময়ে, সব ভেঙে, সব ছেড়েছুড়ে...ভালোবাসার চেয়ে বড় শক্তি এ পৃথিবীতে আর কিছু নেই, হতেই পারে না। আপনি পারবেন না, যত দুঃখ, কষ্ট, বিষাদের মেঘ উড়ে এসে জুড়েছে ওর আকাশটা, আপনি সেখানে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়বেন....পারবেন না সৌম্য ভাইয়া? বলুন!'

উত্তর দিতে পারে না সৌম্য, আসিফ আরও গাঢ় হয়, কণ্ঠের ঔদ্ধত্য প্রকট করে বলতে থাকে, 'আর আপনি নামক বৃষ্টি ভিজে আমার বোনের যত দুঃখ-কষ্ট-যাতনা....সব ধুয়েমুছে সাফ হবে। ফুটে ওঠবে রঙিন রামধনু, একটা নির্মল আকাশ। আমি ওকে বলব আমার বোনকে, আর একটু অপেক্ষা কর? ঝড়ের অবসান হলো বলে? বলুন না ভাইয়া, বলব?'

'বলো...' খুব নিচুস্বরে ঘোরগ্রস্তের ন্যায় উচ্চারণ করে সৌম্য, 'বলো, আমি রামধনুর সাত রংয়ের উজ্জ্বলতা এখনই দেখতে পাচ্ছি..ওই তো...আকাশ জুড়ে কিসের যেন দামামা বাজে। আমাদের বিজয়ের বুঝি....'

(চলবে)

#প্রেমের_নির্বাসন - (১৮ - দ্বিতীয় অংশ)

লেখনীতে - #মৃধা_মৌনি

_________

উবু হয়ে শুয়ে আছে বিকেল। গায়ের উপর কম্বল টানা, পা দুটো তবু বেরিয়ে, চোখের সামনে বই মেলে ধরা। যদিও পড়ার 'প' টাও মাথায় ঢুকছে না তার। একটা হাঁসফাঁস করা খারাপ লাগা কাজ করছে হৃদয়ে। রোদ্দুরের কথাগুলো ছাড়া ছাড়া ভাবে শুনেছে সেও। চিৎকার চেঁচামেচির আওয়াজ তার কান অবধিও এসেছিল তখন। বিকেল দৌড়ে গিয়ে সিড়ি ধরে দাঁড়িয়েছিল। কান পেতে যতটুকু শোনা যায়, শুনেছে আর তা থেকেই হতবাক হয়ে আছে সে...এখনো! সবচেয়ে বেশি আশ্চর্যজনক লেগেছে, রোদ্দুরের তার পক্ষ ধরে ডিফেন্ড করাটা। এ বাড়ির কেউ যা করেনি, কেউ তাকে বোঝেনি, তার অনুভূতি গুলোর পাত্তা দেয়নি, মর্যাদা শূন্য রেখেছে- অথচ যে মানুষটাকে সে রাক্ষস হিসেবেই জানত আপাদমস্তক, সে আজ তার হয়ে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর তুলেছে। নিজের বাবা, চাচা এমনকি দাদী- কাউকে ছাড় দিয়ে কথা বলেনি...কাউকে না!

বিকেল কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না,

কীভাবে সম্ভব? আর কেনই বা রোদ্দুর অত কথা তুলতে গেল? এমনকি বাবার অপর পক্ষের ঘরের কথাগুলোও....ইশ, তার অবস্থা এখন কি হবে? নিশ্চয়ই সব টুটে পড়বে ওর উপর? এই ভয়েই ঘরের দরজা আঁটকে চুপচাপ শুয়ে আছে সে। ভান করছে তুমুল পড়াশোনার। আসলে সব ছাই...। ঘুরেফিরে বারবার কথাগুলো কানে বেজে উঠছে তার।

এমনই সময় দরজায় আওয়াজ হলো। বিকেল ঘাবড়ে উঠে বসল চটপট করে। ভ্রু জোড়া কুঁচকে গেছে ইতিমধ্যেই। কে এলো?

ওপাশ থেকে ভেসে এল তৃপ্তির গলার স্বর, 'কিরে, দিন দুপুরে দরজা আঁটকে রেখেছিস কেন?'

বিকেল স্বস্তি ফিরে পায়।

'খুলছি।' বলে উঠে আসে ঝটপট। দোর মেলতেই তৃপ্তি, দীপ্র, স্বস্তির দলটা ঢোকে। আজ সঙ্গে মিশিও আছে। চিরচেনা মুখ গম্ভীর চেহারা তার...বিকেল একটু হেসেই ওঠে, 'আরে বাপরে, তুই?'

গা করে না মিশি, ঢুকে পড়ে সকলের সঙ্গে। বিছানার এক কোণে চুপটি করে জায়গা দখলে নেয়। তার সামনে স্বস্তি, পাশে দীপ্র। তৃপ্তি বসে না। বিকেল পুনরায় দরজা আঁটকে দিতে চাইলে সে বলল, 'খোলা থাক?'

মন থেকে খোলা রাখার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে না থাকলেও কথা বাড়ায় না বিকেল, তবে দরজা ভিড়িয়ে দিয়ে আসে। সকলকে উদ্দেশ্য করে শুধাল, 'কি ব্যাপার? এমন হন্তদন্ত হয়ে সবাই যে? কিছু হয়েছে?'

হয়েছে তো অনেক কিছুই,

আমিও জানি সবটা- মনে মনে ভাবে বিকেল, বাহির থেকে শান্ত, চুপচাপ, যেন শোনেইনি কিছু...এমন একটা ভাব তার।

তৃপ্তি বিস্ময় নিয়ে জানতে চায়, 'তুই কিছু শুনিসনি?'

'কি শুনব?' চিরায়ত ঢংটা করে যায় ও।

'সত্যি শুনিসনি? এত হাউকাউ হলো...' তৃপ্তি অবাক। বিকেল ঢোক গিলে শুকনো গলাটা ভেজানোর ব্যর্থ চেষ্টা সামলে দু'ধারে মাথা নাড়িয়ে বলল, 'না। কি হইছে?'

ছোট একটা নিঃশ্বাস ফেলে তৃপ্তি। তার আগেই স্বস্তি বলে ওঠে, 'পুরাই টর্নেডো গেল এতক্ষণ, তুমি খেতে যাওনি, মিস করে গেছ।'

'কিসের টর্নেডো?' বিকেল প্রশ্ন করে।

তৃপ্তি বলে ওঠে জবাবে, 'রোদ ভাইয়া আজকে ফুল বোম... কি হইছে উনার আল্লাহ জানে। বড় বাবার মুখে মুখে তর্ক করছে। দাদীকে অসম্মান করছে। আর ছোট বাবাকে...'

'তার সোজা মুখ ভোঁতা করে দিছে...' স্বস্তি কথা কেড়ে নিয়ে নিজে শেষ করে। তৃপ্তি বিরক্ত নিয়ে ওর দিকে তাকালে দীপ্র মাথায় গাট্টা দিয়ে উঠল, বিরক্তি নিয়ে বলল, 'একটু চুপ থাকতে পারিস না? ছোট মানুষ ছোটদের মতো থাক।'

গাট্টা মারা জায়গাটা হাত দিয়ে ডলে নেয় স্বস্তি, মুখ ভেংচে জবাব কাটে, 'কিসের ছোট? তোমাদের চেয়ে আমার বুদ্ধিশুদ্ধি ভালো আছে, এটলিস্ট!'

'হইছে, তোর সাথে এখন মুখ লাগাতে চাই না। চুপ থাক।' তৃপ্তি জবাব দেয়। স্বস্তি মুখ বাঁকিয়ে ভোঁতা করে রাখল পরে।

বিকেল অবাক হওয়ার নাটকটা প্লে করে আবারও।

ঠোঁট দুটোকে চিঁড়ে হালকা হা করে বলে ওঠে, 'কি বলছিস কি! রোদ ভাইয়া এসব করছে?'

'হ্যাঁ, তোর হয়ে অনেক প্রতিবাদ করছিল। তোকে কেউ বোঝে না, হুদাই সবাই খারাপ আচরণ করে, দাদী উল্টাপাল্টা বলে। এমনকি ওই যে তুই ভাইয়াকে বলে ওই বুড়োটাকে মাই'র খাওয়াইছিস না, ওটা নিয়েও ভাইয়া ডিফেন্ডিং রিপ্লাই দিয়েছে। বলেছে, তুই ইচ্ছে করে না বরং তোকে জোর করে কথাগুলো ভাইয়া বের করে নিয়েছিল। এমনকি বড় মাকেও ভাইয়া কথা শোনাতে ছাড়েনি। সে মা হয়েও তোকে বুঝতে পারল না, তোর উপর ভরসা রাখল না- অনেক অনেক কথা! ইশ...তুই সব মিস করে গেলি...

যদি থাকতিস, ড্যাম শিউর তুই ও ভয়ে কাঁপতি। আমরা তো সব্বাই অবাক! রোদ ভাইয়ার এই রূপ কেউ কোনোদিন দেখিনি..'

দম নেয় তৃপ্তি। বিকেল হা হয়ে শুনছে। কেমন বিমূঢ় হয়ে পড়ল শুনতে শুনতে। কিছু বলল না জবাবে...

তৃপ্তি ওর মুখভঙ্গি দেখে পুনরায় বলে ওঠে, তবে এবার গলার স্বর অনেকটা খাঁদে নামিয়ে নেয়, চাপা স্বরে বলতে থাকে, 'ছোট বাবা সত্যিই অন্য কোথাও?'

বিকেল শিরশির অনুভুতি অনুভব করল। চাইলো, আবার চোখ ফিরিয়ে নিতেই তৃপ্তি উত্তরখান পেয়ে চুপ করে গেল।

'আশা করিনি।' বলল সময় নিয়ে।

বিকেল দীর্ঘশ্বাস ফেলে, 'বাদ দে।'

পরক্ষণেই জানতে চায়, 'উনি কোথায়?'

'রোদ ভাইয়া?'

বিকেল হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো।

'জানি না। বেরিয়ে গেছে তখনই, জিদ করে...'

'আর বড় বাবা? বড় মা?'

'সবাই বড় বাবার ঘরে, দাদী, তোর বাবা, মেজো মা, বড় মা- সবাই...মিটিং করছে কিছু একটা।'

'এবার সত্যিই আমাকে এ বাড়িতে আর রাখবে বলে মনে হয় না রে...' বিকেল হাসে অল্প একটু।

তৃপ্তির ভীষণ মায়া হয়। ওর কাঁধে একটা হাত রেখে আশ্বস্ত করে, 'কিচ্ছু হবে না। তোর এখানে ফল্ট কি? ভাইয়া বলেছে, এটা তার ব্যাপার, যা হবে তার সঙ্গে হবে। তুই মাঝখানে নিজেকে জড়াস না আর ভাবিস না কিছু। নরমাল থাক। যা হবে, আমরা সবাই মিলেমিশে দেখব।'

বিকেল কিছু বলে না। উদাসীন লাগছে তার।

ইচ্ছে করছে কোথাও গিয়ে একটু হাউমাউ করে কাঁদে। এত একা একা লাগছে কেন? ইশ...পায়ের মাটি শক্ত না থাকলে ভাসা ভাসা পায়ে কত পথ হাঁটা যায়? মুখ থুবড়ে পড়ার সম্ভাবনা কীভাবেই বা এড়ানো যায়?

দলটা নীরবতাকে বরণ করেছে আজ যেন। কেউ কোনো কথা বলছে না। সবার চোখমুখ জুড়েই কিছু একটা খেলা করে যাচ্ছে....

সবচেয়ে বেশি মন মরা দেখাচ্ছে মিশিকে। স্বাভাবিক, তার বাবা আর ভাইয়ের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব লেগেছে, তাতে তার মন খারাপ হওয়াটা অস্বাভাবিক নয় মোটেই...

তৃপ্তি একটু এগিয়ে গিয়ে মিশির পাশে জায়গা করে নিলো। মিশি ফিরেও তাকাল না, চুপ করে দু' হাঁটু তুলে বসে আছে জুবুথুবু ভঙ্গিতে। তৃপ্তি ওর কাঁধে একটা হাত রেখে ভরসার গলায় বলল, 'তুই এত চুপচাপ কেন? টেনশন করিস না, সব ঠিক হয়ে যাবে।'

মিশি চোখ ফিরিয়ে তৃপ্তিকে দেখে। তৃপ্তি চাউনিতে আশ্বাসবাণী ছুঁড়ে দিতেই মিশি প্রশ্ন করে বসে, 'সৌম্য ভাইয়া কোথায়, জানিস?'

দীপ্র ফিরে তাকায়, 'সকালে বেরিয়েছিল, ফেরেনি এখনো।'

মিশি গুমোট হয়ে পড়ে আরও, 'অনেকবার কল দিয়েছি, ধরল ও না।'

'ভাইয়াকে কোনো দরকার আপু?'

'না দীপ্র, এমনি।'

তৃপ্তি অবাক চোখে মিশিকে দেখছে আপাদমস্তক। বাতাসে অন্যকিছুর সুর...

'মিশি..?' তৃপ্তির ডাকে মেয়েটা আবার ফিরে চাইল,

'ইজ এভ্রিথিং ওকে?'

জবাবে ঘাড় দুলিয়ে হ্যাঁ বলল নাকি না বলল- ঠিক বুঝতে পারে না তৃপ্তি। তবে আর ঘাটায় না ওকে। ওর মতোই থাকতে দেয়। নিজেও সরে আসে। বিকেল বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, কি করছে কে জানে?

★★★

'কোথায় আপনি?'

'আগে বল, তুই কোথায়?'

'জাহান্নামে।'

'বিকেল!'

'জাহান্নামেই তো রেখে গেছেন আপনি!'

'বাসার কেউ কিছু বলেছে?'

'না।'

'তো নাটক করিস না। আর বলবেও না। মুখ ভেঙে দিবো আমি।'

'কেন? আপনি ভাঙবেন কেন? অযথাই কেন সবার সঙ্গে ঝামেলা করছেন?'

'অযথা? তোকে যা নয় তাই শোনায়, আর তুই সেসব শুনে কান্নাকাটি করিস, এগুলো অযথা?'

'শোনালে আমায় শোনায়, আপনার কি তাতে? আপনি কেন এত ডিফেন্ড করছেন রোদ ভাইয়া?'

এবারে ওপাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে রিপ্লাই এলো না। বরং ম্যাসেজটা সিন হয়ে রইল, রোদ্দুরকে অনলাইন ও দেখাচ্ছে, তবু এক মিনিট, দু মিনিট, তিন মিনিট কেটে যায়, রিপ্লাই আসে না....অস্থির হয়ে বিকেলই আবার আঙুল চালাল। ফটফট করে লিখে, 'কি হলো? উত্তর দিচ্ছেন না কেন? বলুন, কেন আমার হয়ে আপনার এত লড়াই করতে হবে? আমি তো আপনাকে বলিনি এত বুঝতে, আমার পাশে দাঁড়াতে....'

ম্যাসেজটা সিন হয়। জবাব আসে, তবে এ কথার প্রেক্ষিতে নয়, বরং উলটো প্রশ্ন লেখে ছেলেটা, 'আমাকে আপনি আপনি করছিস কোন দুঃখে?'

মেজাজ খিঁচে যায় বিকেলের, কি-বোর্ডে ঝড় তুলে টাইপিং চালায় আবারও, 'কথা না পেঁচিয়ে উত্তর দিন।'

'কিসের উত্তর? তুই কে যে এত কৈফিয়ত দিতে যাব তোকে?'

'আমি কেউ নই?'

'একদম না!'

'তবে আমার হয়ে এত যুদ্ধ কেন?'

'কারণ, লড়াই ছাড়া কিছু পাওয়ায় আনন্দ নেই।'

'কিসের লড়াই? কিসের পাওয়া? কিসের আনন্দ?' ভ্রু কুঁচকে ওঠে বিকেলের।

ওপাশ থেকে কল উঠে এল এবারে, একবার পাশ ফিরে চেয়ে দেখে ফোনটা কানে তুলে নেয়। ধীরস্থির গলায় বলে, 'হ্যালো?'

রোদ্দুর জবাব দিলো না সঙ্গে সঙ্গেই। কি ভীষণ আরাম লাগছে ওর, মনের যত ক্লান্তি, যাতনা, দুঃসহ কামড়ানি ছিল, সব নেমে গেছে ওই একটা 'হ্যালো' তেই...

কোথায় একটা পড়েছিল,

ভালোবাসার মানুষটি হয় প্রিয় অসুখ

আবার সব সুখ; আজ বুঝল কথাখানের মানে কতখানি!

জবাব না পেয়ে বিকেল আবারও শুধাল, 'ওও হ্যালো?'

'শুনছি।' শান্ত স্বর ছেলেটার, বিকেল থম ধরা গলায় শুধাল, 'আপনি এমন কেন?'

'কেমন?'

একটু থেমে ছোট একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, 'জানি না।'

হাসল ছেলেটা, চঞ্চল হাসি, বিকেল শুনতে না পেলেও বুঝল, ওপাশের মানুষটার ঠোঁট চিঁড়ে এক ফালি সূক্ষ্ণ হাসি ফুটে ওঠেছে। অদ্ভুত ভাবে ওর ঠোঁটেও হাসি ফুটল।

'বিকেইইইল?' টেনে টেনে ডাকল রোদ্দুর।

বিকেল অস্ফুটে সাড়া প্রদানে বলে ওঠে, 'হুঁ?'

'তোর মুখ থেকে আপনি শুনতে বেশ লাগে, জানিস?'

'তাহলে অমন বকা দেন কেন? ধমকান কেন?'

'তুই বুঝবি না।'

হৈহৈ করে উঠল বিকেল, 'কেন বুঝব না? আমি বড় হয়ে গেছি!'

'কচু হয়েছিস! হলে আজ আমার কথাগুলি তুই বলতি...পারিস তো চোখের ট্যাপ খুলে বুক ভেজানো খালি।'

'অপমান করলে?'

'না, ইনসাল্ট করলাম।'

বিকেল কথা বলল না কিছু।

ওপাশ থেকে হাসল ছেলেটা। মনের দর্পণে দেখে নিল, কেমন রাগে চোখ-মুখ ফুলিয়ে রেখেছে মেয়েটা, কি ভীষণ অসহায় দেখাচ্ছে তাকে...যেন এক্ষুনি বর্ষণ নামবে অবিরাম ধারায়...

তারপর আবার ডাকল, টানা সুরে, 'বিকেইইইইইললল....'

বিকেল ও এবার অনুকরণ করে বলল, 'কিইইইইই...?'

রোদ্দুর ও টেনে টেনে শুধাল, 'চল যাইইইইইই....'

বিকেলও কপি করে বলে, 'কোথায়য়য়য়য়য়..?'

'যেখানে তুই আর আমি ছাড়া কেউ নাইইইইইইই....'

'কেনোওওওওওওওও.....?'

'কারণ, আমি তোকে ভালো রাখতে চাই....'

'আর?'

'ভালোবাসতে চাইইইইই....' কথাটা হৃদয় থেকে উচ্চারিত হলেও মুখ ফুটে বেরিয়ে এলো না। একটা জড়তায় আঁটকে গেল। সময় কি এখনো হয়নি? কবে হবে? রোদ্দুর নিজেও জানে না ঠিক! তবে যেদিন জড়তাহীন ভাবে উচ্চারণ করতে পারবে, 'আমি তোমায় ভালোবাসি' সেদিন সময় হবে! সময়ই চুজ করে নেবে, কাছের আসার সন্ধিক্ষণ;

নাকি প্রেমের নির্বাসন!?

'কার সাথে কথা বলছিস?'

হঠাৎ করেই ভূতের ন্যায় উদয় হলো তৃপ্তি।

বিকেল চমকে ওঠে। হারিয়ে গেছিল, সময়ের স্রোতে, কোথাও একটা, যেখানে দিগন্ত মিশে রামধনুদের সীমানায়...সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা কান থেকে নামিয়ে নরমাল হওয়ার চেষ্টা করে জানায়, 'কারো সাথে না।'

'কানে ধরে ছিলি।' তৃপ্তি ফের জানতে চায়।

বিকেল অপ্রস্তুত হেসে ওঠে, 'এমনি। একটা রিলসের ভয়েস শুনছিলাম।'

'আচ্ছা।' বোধহয় বিশ্বাস করল ও, বোধহয় করল না। তবে একটা হাত কাঁধে রেখে বলল পরে, 'বাড়িতে একফোঁটা শান্তি নেই। ফুপুর ঘরে, বড় মায়ের ঘরে, ছোট বাবার ঘরে....সবার ঘরেই ঝামেলা! কারোটা চেয়ে কারোটা ছোট না, এর মধ্যে আবার এমন কিছুতে জড়াস না, যেটায় আলগা হওয়া সুতোর পুরোটাই ছিঁড়ে পড়ে...আই হোপ, তুই বুঝেছিস?'

বিকেল জবাব দেয় না।

আস্তে করে ফোনটা কাটে এক আঙুলে চাপ দিয়ে।

সামনে তাকাল, বিস্তীর্ণ খোলা আকাশটা কি ভীষণ সুন্দর লাগছে! কি আছে কপালে? জানা নেই ওর।

তবু মাঝে মাঝে মনে হয়, এই আকাশটা একা দেখার চাইতে কারো কাঁধে মাথা রেখে দেখার মধ্যে সুখ অন্য, আনন্দ অন্য! তবে সেই কেউটা কে? তাও বুঝি বিকেলের জানা নেই। নাকি অবচেতন হৃদয় জানে?

(চলবে)

_______

এটা গত পর্বের পরবর্তী অংশটুকু।

এই পর্বে ৯০০ লাইক হলে পরবর্তী পর্ব পেয়ে যাবেন, ইনশা আল্লাহ। এবার টার্গেট পূরণ করে দিন...🥹❤️🙏

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন