#প্রেমের_নির্বাসন - (১৭)
লেখনীতে - #মৃধা_মৌনি
[নোটবার্তাটুকু পড়বেন অবশ্যই!]
_________
'এভাবে আর কত বেলা না খেয়ে থাকবি?'
'যতবেলা পারব।'
'আর তারপর?'
'মরে যাব।'
'মরণটা কি এতই সহজ আদু?'
আদিবা মায়ের দিকে উষ্মা মিশ্রিত চোখে চাইল, গলা উপচে অভিমান বেরিয়ে আসতে চাইছে তার, মেদুর মেঘে ডোবা চোখজোড়া দিয়ে তাকিয়ে বলে ওঠে, 'বেঁচে থাকাটাও কি সহজ করে রেখেছ তোমরা আমার জন্য?'
ভদ্রমহিলা বিছানার উপর বসলেন। আদিবা নিচে বসে আছে, বেডে পিঠ ঠেকিয়ে। একটা হাত তার মাথার উপর আলতো ভাবে রাখতেই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে সরে যায় আদিবা। ঘাড় ঘুরিয়ে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, 'খবরদার, তোমার এই মিথ্যে ইমোশন আমায় দেখাতে আসবে না তো মা।'
'এভাবে কথা বলছিস কেন আদু? এতকিছুর পরেও কি তোর বুঝ হবে না?'
'হয়েছে তো। যা চেয়েছিলে, আমি তাই করেছি। সৌম্যকে ডিভোর্স পেপার পাঠিয়ে দিয়েছি। ওর সঙ্গে আমার সব সম্পর্ক চুকেবুকে গেছে তো। আর কি চাও? আমি একা থাকতে চাই, একদম একা! বুঝতে পেরেছ? আর যদি ম'রে যাই, তবে তুমি বা তোমার হাজবেন্ড- কেউই যেন আমার লা'শ টাও দেখতে না আসে...মাইন্ড ইট!'
উনি ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিলেন আদিবার গালের উপরে। চড় খেয়ে বিন্দুমাত্র অবাক হলো না মেয়েটা। বরং জোরে জোরে তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে বোঝাতে চাইল, যদি মা না হতে, তবে তোমায় আমি ভস্ম করে দিতে দু'বার ভাবতাম কিনা সন্দেহ!
'বেজন্মা হয়েছিস! বেজন্মা...বাপ-মা, পরিবার - এসবের চেয়ে লাং আপন! লাং...দেখব, কতদিন না খেয়ে থাকতে পারিস। আর যদি মরে যাস তবে যা...ভুলে যাব, তোর মতো শয়তান, স্বার্থপর মেয়েকে আমি পেটে ধরেছিলাম।'
তিনি উঠে দাঁড়ালেন। আদিবা ঠোঁটের কোণ দিয়ে এক ফোটা হাসি বের করে বলল, 'স্বার্থের কথা বলো তুমি? হাহ!'
গটগট করে বেরিয়ে গেলেন উনি। আদিবা তার যাওয়ার পানে পানির বড় মগ টা ছুড়ে মারল। সেটা মেঝেতে পড়ে ঝংকার তুলল বড়। বার তিনেক গড়াগড়ি খেয়ে থামল। মেঝেটা পানিতে ভিজে গেছে। তার উপর জলছাপ পড়ল আসিফের। সে ভেতরে ঢুকেছে নিঃশব্দে।
আদিবা মুখ ঘুরিয়ে বসে রইল। কারো চেহারা দেখার ইচ্ছে করছে না। নাকি কথা বলার মুড আছে। বরং হাতের কাছে একটা ডিনামাইট থাকলে সবকিছু উড়িয়ে দিয়ে শান্তি পেতো মেয়েটা। হৃদয়ের দহনে ওর সব জ্বলেপুড়ে ছারখার....
আসিফ জড় পায়ে এগিয়ে এসে বিছানার উপর বসে। বসেই রয় মিনিট দুয়েক, নিশ্চুপে। কিছু একটা বলার প্রস্তুতি নিলো বুঝি। এ সময়ে সে দেয়াল দেখে,টাইলস গোণে, জানালার বাইরে তাকায়। আঁড়চোখে একবার মেয়েটাকেও পরখ করে নেয়। তারপর গলা খাঁকড়ে বলে, 'সইটা করলে কেন?'
আদিবা উত্তর দিলো না। এমনকি মুখও ঘুরালো না। যেভাবে বসে ছিল, সেভাবেই বসে রইল। ক্লান্ত পরাজিত সৈনকের মতো।
আসিফ আবারও বলল, 'ওরা মা'রতো, তুমি সয়ে নিতে। সয়েই তো ছিলে এতগুলো দিন, আর ক'টা দিন, তারপর ওরাই ক্লান্ত হয়ে থামত। নিজে থেকে কেন....?'
'কারণ, আমি চাইনি, একটা কাগজের পাতা সৌম্যকে মায়ায় বেঁধে রাখুক।' ধীরস্বরে বলল আদিবা। বসে যাওয়া দু'চোখ নিয়ে ফিরে চাইল। আসিফ চমকায়। কি হাল হয়েছে মেয়েটার! এ কি সেই আদিবা, যে নিত্যদিন মাতিয়ে তুলত এ বাড়িটাকে তার নিজস্ব পাগলামি আর চঞ্চলতা দিয়ে? নাহ, হতে পারে না তো....এ সেই আদিবা হতেই পারে না! ঘৃণা জন্মে এ বাড়ির প্রতিটি পুরুষের উপর, এমনকি নিজের উপরেও। কিছুই তো করতে পারছে না সে...কিচ্ছু না! সেদিন যদি ওই চিঠিটা নিয়ে সৌম্যর কাছে পৌঁছাতে পারত অন্তত, হয়তো ছেলেটা জানত আদিবা প্রতারক নয়। নাকি বিশ্বাসঘাতক। বরং ভালোবেসে মৃত্যুকে আপন করে নিয়েছে শুধুই তার নামে....
কি পরিমাণ মানসিক যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে ও। কেউ নেই পাশে, কেউ না। এই যুদ্ধ কেবল ওর একার! এই যাতনা কেবলই ওর ব্যক্তিগত! আসিফের মন খারাপ হয়, প্রচন্ড। চোখ ফিরিয়ে নিলো ও। শুনতে পেল, রুগ্ন কণ্ঠস্বরটা নাড়িয়ে থেমে থেমে বলছে মেয়েটা,
'জানিস, আমি কোনোদিন ভাবিনি আমার ভাগ্যের লিখন এত খারাপ! বিশ্বাস কর, ভাবতেই পারিনি। যদি জানতাম, তবে ওকে জড়াতাম না। তুই তো সৌম্যকে চিনিস না ব্যক্তিগত ভাবে, যদি চিনতি তবে ওকে আইডল মানতি। দেখতি, পুরুষ মানুষ ও কত মায়াকারা হয়। কি ভীষণ স্নিগ্ধ সুন্দর পবিত্র হয়। ওর কোনো বাজে অভ্যেস ছিল না জানিস। আর বিপদ আপদে যদি তুই কাউকেও পাশে না পাস, তবু চোখ বুঁজে দেখবি, ও আছে। ওর এই ব্যক্তিত্বই আমাকে টেনেছিল। আমি সব ভুলে ওকে পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলাম। পেলাম ও- বাট আমার নসীব....রাখতে পারলাম না।' গুঙিয়ে উঠল ও।
আসিফ ফিরে তাকাল, আদিবা ও ওর দিকেই চেয়ে ছিল, 'শেষ পর্যন্ত যা ছিল না, তা ধরে রাখতে চাওয়ার কোনো মানে নেই। মায়ার গিট্টুতে আঁটকা পড়লে তড়পে তড়পে মরে যাবে ও। আমি চাই না, তাই...সই করে দিয়েছি। নাহয় থাকলাম ওর জীবনে প্রতারক হয়ে....নাহয় আমার নামটা শুনে ওর ঘেন্নাই পেল দু'ফোঁটা। তবু, ভালো থাকবে ও, বেঁচে থাকবে।'
'আর তুমি?'
'আমি? ভালোবাসার মানুষটা ভালো আছে জানাই তো নিজের ভালো থাকা তাই না? হোক সেটা অন্য কারো সঙ্গে, তবু যে স্বপ্ন গুলো আমার ছিল, আমাদের ছিল, তার সবটাই তার হোক..একান্ত তার হোক!' মুচকি হেসে আদিবা কথা শেষ করে।
আসিফ কিছু বলতে পারে না। কেবল বোকার ন্যায় চেয়ে থাকে ওই মুখটির দিকে। ভালোবাসায় ত্যাগ- জীবনে সিনেমা কিংবা ছবিতেই তো দেখেছিল এমন। বাস্তবেও যে সম্ভব, আদিবা বুঝিয়ে দিলো। ভালোবাসলেই তাকে নিজের করে পেতে নেই। ছেড়ে দিয়েও ভালোবাসা যায়। দূরে থেকেও ভালোবাসা যায়। ভালোবাসা যায় বেঁচে থাকায় কিংবা মৃত্যুতে। ভালোবাসা যায় কেয়ামতেও....
আসিফ বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার মনের সব ভাষা আজ এক অতল স্তব্ধতায় গিয়ে মিশেছে। তবে এই নীরবতার আড়ালে বুকের ভেতর দাউদাউ করে জ্বলছে প্রতিশোধের আগুন। সে একবার দেয়ালের দিকে তাকাল; কোথাও কোনো সিসি ক্যামেরা প্রকাশ্যে চোখে পড়ে না, কিন্তু সে জানে এই ঘরের কোথাও না কোথাও লোনা চোখে তাকিয়ে আছে সেই গোপন লেন্স। যেখান থেকে প্রতিটি কথা, প্রতিটি নিঃশ্বাস রেকর্ড করা হয়।
সেদিন তো এভাবেই সব ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল। তার আর আদিবার একান্ত আলাপগুলো আড়ি পেতে শুনেছিলেন আশফাকুল রহমান। আদিবা তাকে যে মুক্তির কাগজটি দিয়েছিল, সেটি আসিফের হাত পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই দরজার নিচ দিয়ে ছোঁ মেরে নিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। এরপর শুরু হয়েছিল এক নারকীয় অধ্যায়। আশফাকুল রহমান আর আসিফের বাবা- দুজন মিলে তাকে যে ভাষায় অপমান করেছিলেন, তা মনে পড়লে এখনো আসিফের কান দিয়ে তপ্ত সীসা চুইয়ে পড়ে।
আদিবাকে সমর্থন করার অপরাধে, তার ব্যথায় ব্যথিত হওয়ার দায়ে তাকে শুনতে হয়েছিল- সে পুরুষ নামের কলঙ্ক। আশফাকুল তো ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে ঘৃণায় থুতু ছিটিয়ে বলেছিলেন, 'এমন অপদার্থ ছেলে জন্ম দিয়েছ? এর দুই হাতে চুড়ি পরিয়ে ঘরে বসিয়ে রাখো। এ তো ছেলে নয়, এ বাড়ির মান-ইজ্জত ডুবানোর জন্য জন্মানো এক বেজন্মা! একজন তো কুলাঙ্গার হয়েছেই, এটাও দেখি সেই পথেই নেমেছে। ছিঃ!'
সেই জঘন্য বাচনভঙ্গি আর নিষ্ঠুর শব্দগুলো আসিফের মগজে কামড় দেয়। নিজের জন্মের প্রতিই এক তীব্র ঘৃণা বিষের মতো ছড়িয়ে পড়ে রন্ধ্রে রন্ধ্রে। রাগে তার মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে, চোখের মণি রক্তাভ হয়ে যায়। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সে হয়তো বড় কোনো অঘটন ঘটিয়ে ফেলবে- এমন এক ঘোর তৈরি হয় তার ভেতরে। জীবনে কোনোদিন এতটা ক্রোধ তাকে গ্রাস করেনি।
দমাদম পা ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় আসিফ। তার চলে যাওয়ার শব্দের প্রতিধ্বনি বিলীন হওয়ার পরও আদিবা ওভাবেই বসে থাকে। নিথর, নিশ্চুপ আর অসহায়। যেন এক জিম্মি হওয়া জীবন তার, যার নিজের বলতে কিছুই নেই, কেবল তাকিয়ে থাকা ছাড়া।
★★★
আজকের খাবার ঘরটা এক নিরেট পাথরের স্তব্ধতায় জমে আছে। পরিবেশটা এতটাই থমথমে যে, বাতাসও খুব সাবধানে ঘরের ফাঁকফোকর গলিয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে যাচ্ছে। কারো মুখে কোনো রা নেই, কারো কণ্ঠে কোনো শব্দ নেই; কেবল চামচ আর বাটির যান্ত্রিক টুংটাং আওয়াজ সেই অসহ্য নীরবতাকে আরও প্রকট করে তুলছে।
মির্জা পরিবারের প্রায় সবাই আজ একত্রে দস্তরখানে বসেছে, কেবল বিকেল বাদে। সে ইচ্ছে করেই আসেনি। তৃপ্তি আর স্বস্তি বেশ কয়েকবার ওর ঘরে গিয়ে সাধাসাধি করেছে, কিন্তু লাভ হয়নি। মেয়েটা এক অজানা আতঙ্কে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে বিছানায় মূর্তির মতো পড়ে আছে। ডাইনিং টেবিলে আজ রোদ্দুর আছে, আছে খোদ ওসমান মির্জাও। তাঁদের সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর মতো মানসিক শক্তি বিকেলের নেই। সে কোনোভাবেই চায় না এই মুহূর্তে ওই মানুষগুলোর চোখের সামনে পড়তে।
বাপ আর মেয়ের মাঝখানে আজ যে যোজন যোজন দূরত্বের দেয়াল দাঁড়িয়েছে, তা কি কোনোদিন ঘুচবে? কোনো শ্রাবণের অবিরাম ধারা কি পারবে এই জমে থাকা তিক্ততার গ্লানি ধুয়েমুছে সাফ করে দিতে? উত্তরটা কারো জানা নেই। বিষণ্ণতা আর একরাশ অস্বস্তি নিয়ে বাকিরা খাওয়ায় মন দিলো।
রেহনুমা লতি ভাজির বাটিটা ছেলের দিকে বাড়িয়ে ধরে নিস্তব্ধতা ভেঙে বলে উঠলেন, 'এটা খেয়ে দ্যাখ। চিংড়ি দিয়ে করা।'
রোদ্দুর হাত উঁচু করে মা'কে থামবার ইশারা করে, 'না, নেবো না।' পরমুহূর্তে শুকনো পাতের ভাতে আঙুল চালায়।
রেহনুমা একটু অবাক কণ্ঠেই বলেন, 'কেন রে? তোর সবচেয়ে ফেবারিট বলেই তো...'
'ইচ্ছে করছে না।' জবাব দেয় রোদ্দুর।
রেহনুমা চুপ করে যান। চোখেমুখে একটা মেদুর রংয়ের ছায়া নেমে আসে তার। উমেদ মির্জা স্ত্রীর বিষন্নতাকে এড়িয়ে যেতে পারলেন না। ভাত চাবাতে চাবাতে গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলেন, 'একটু নিলে কি ক্ষতি হতো বাবা? তোমার মা অনেক শখ থেকেই রান্না করেছিলেন।'
রোদ্দুর উমেদ মির্জার দিকে স্পষ্ট সরাসরি চোখে তাকাল। উমেদ মির্জা এবং রোদ্দুরের চেয়ারটা একদম মুখোমুখি আসনে, সে বলল, 'ভালো না লাগলেও অনেক কিছুই করতে হয়। এক প্রকার বাধ্য করা হয় করার জন্য, বাট এটা কেন বাবা? ধরো, আমার একটা জিনিস ভালো লাগছে না, আমি সেটাতে কম্ফোর্ট ফিল করছি না, তখন তোমার কাছে কোনটা আগে? আমার কম্ফোর্ট নাকি ওই কাজটা?'
কি কথার কি জবাব! উমেদ মির্জা চমকে উঠলেন। ছেলের কণ্ঠস্বর এমন কেন! বুঝতে পারলেন না ঠিক করে। ছেলেটা তার এসেছে সকাল বেলায়, না বলে কয়ে হঠাৎ এসে হাজির হয়েছে। অথচ এদিকের ঝামেলা না মেটানো পর্যন্ত তাকে খালার বাসায় থাকবার কঠিন নির্দেশনা দিয়েছিলেন তিনি। সেটা রোদ্দুর মানেনি। জীবনে এই প্রথম রোদ্দুর নিজে থেকে একের পর এক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এবং তাই তামিল করছে। এমনকি কথার পৃষ্টে কথাও ছুঁড়ছে দৃঢ় স্বরে। উমেদ মির্জা শক্ত হয়ে উঠলেন ভেতরে ভেতরে। প্রকাশ করলেন না সঙ্গে সঙ্গে। একটু সময় নিয়ে চোখের কোণ দিয়ে রেহনুমার দিকে একটি দৃষ্টি ছুঁড়ে দিয়ে শুধালেন,
'অবশ্যই তোমার কম্ফোর্ট বেছে নেবো।' আবারও থেমে যোগ করলেন, 'তুমি জানো, তোমাদের উপর আমার কাছে অন্য কিছুই নাই।'
রোদ্দুর ঠোঁটের কোণ দিয়ে অল্প একটু হাসি ছুঁড়ে দিয়ে পুনরায় খাওয়ায় মন দিলো। উমেদ মির্জা ও থম ধরা হাতটা চালালেন ভাতের পাতে, তবে মনে একটা কামড় দিয়ে ধরে রইল কিছু, সেটাকে এড়াতে পারলেন না মোটেই।
ওসমান মির্জার এসবে অবশ্য মাথাব্যথা নেই কোনো। তিনি আজ বাসায় এসেছেন, বড়জোর রাতটা থাকবেন, তারপর আবার পাঁচ-সাত দিনের জন্য গায়েব হবেন। দিশা কক্সবাজার যাওয়ার প্ল্যান করেছে। না নিয়ে গেলে আবার আরেক যন্ত্রণা। আপাতত সেদিকেই তার সমস্ত ধ্যান-জ্ঞান। তাছাড়া বড় ভাই যখন বিকেলের বিয়ের ব্যাপারে সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেই, তখন আর ওসমানের বলার কি আছে? বিয়ে হয়ে চলে যাক, তারপর সে দিশার ব্যাপারে এ বাড়িতে কথা তুলবে। দিশা এবং তার সন্তানকে সে নিয়ে আসবে। নতুন ভাবে জীবন গোছাবে। কত কত পরিকল্পনা মাথার ভেতর। এর ভেতর রোদ্দুরের বলা কথাটি কানের পাশ ঘেঁষে বেরিয়েই গেল প্রায়। ওসমান মির্জা শুনতে পেলেন না বলে আবারও ডেকে উঠল তাকে রোদ্দুর, এবার বেশ কড়া ভাবেই ডাকল, 'ছোট চাচ্চু?'
ওসমান মির্জা খাওয়া থামিয়ে মাথা তুললেন, 'আমাকে ডাকো?'
'হ্যাঁ, আপনাকে। কোথায় থাকেন, কতবার ডাক দিলাম!'
'সরি বাবা, খেয়াল করিনি।'
'জানি। তাই ডাক দিলাম, আপনার উচিত ছিল এদিকে খেয়াল দেওয়া। দিলে দেখতে পেতেন, বিকেল খাবার টেবিলে আসেনি।'
ওসমান মির্জা সঙ্গে সঙ্গে ভ্রু কুঁচকে ফেললেন। উমেদ মির্জা ও থম ধরা চোখে ছেলের পানে তাকিয়ে আছে। রোদ্দুরের হাবভাব কিছুটা মাতাল মাতাল লাগছে তার। ছেলে তো কোনোদিন ড্রিংক করে না, তাহলে আজ এত অসংলগ্ন কেন তার আচরণ? এমন কিছু কি হয়েছে যা সে জানেন না? তার ঈগলের দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়ার কথা তো নয়....
রোদ্দুর পুনরায় বলে ওঠে, 'সবাই আনন্দ করে খাচ্ছে আপনার মেয়ে একা একা নিজের ঘরে দরজা আঁটকে বসে আছে। আপনার কি একবারও তাকে ডাকার খেয়াল আসেনি ছোট চাচ্চু?'
ওসমান মির্জা গম্ভীর কণ্ঠে শুধালেন, 'সেটা আমার ব্যক্তিগত বিষয় বাবা। তুমি ছোট মানুষ, বড়দের ব্যাপারে...'
'ঢুকতে হয়!' প্রায় কথা কেড়ে নিয়েই বলে রোদ্দুর, 'বড়দের ম্যাটারে ছোটদেরও ঢুকতে হয়। যখন দেখি, বড়রা অন্যায়ের সীমা পরিসীমা অতিক্রম করে ফেলছে..তখন!'
'রোদ্দুর!' উমেদ মির্জা চেঁচিয়ে উঠলেন।
'কার সঙ্গে কি বলছ তুমি, হুঁশ আছে?'
রোদ্দুর বাবার দিকে তাকাল, 'আমি তো অন্যায় কিছু বলিনি বাবা। তোমার কাছে আমি আগে, আমরা আগে, লতা চাচীর কাছেও তার মেয়েরা আগে, তবে ছোট চাচ্চুর কাছে কেন বিকেল আগে না? এই যে দাদী ওকে সবসময় কথায় কথায় ছোট করে, এগুলো তোমরা কেন আমলে নাও না? ওর মা নেই, ও অসহায়, আমরা নাহয় ওকে গুরুত্ব না দিতে পারি, কিন্তু তিনি আপন বাবা হয়েও কেন গুরুত্ব দেবেন না?'
'রোদ! তোমাকে আমি ভদ্র ছেলে হিসেবেই জানতাম এতদিন!'
'আমিও আপনাকে ভালো চাচ্চু হিসেবেই জানতাম। কিন্তু আপনি যে সবার আড়ালে অন্য সংসারে এতই মজে গেছেন, নিজের মেয়ের প্রতি এত অবহেলা দেখাচ্ছেন, এসব দেখার পর আপনার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখার কোনো অবকাশ নেই।'
ওসমান মির্জা টেবিল ছেড়েই উঠে দাঁড়ালেন এইবার।
মুখ থেকে ভয়াবহ শব্দের গা:লি বেরিয়ে আসতে চাইলো তার। উমেদ মির্জা সামনে দেখে তিনি নিজের লাগাম টেনে বড় ভাইয়ের দিকে তাকালেন, 'তুমি ওকে সামলাও বড় ভাই! আমার হাতে শেষে না চড় থাপ্পড় খায়!'
রোদ্দুর ও উঠে দাঁড়াল, সমান তেজ নিয়ে বলল, 'খেলে খাবো তবু অন্যায়ের পক্ষে নাই...
আপনি অস্বীকার করতে পারবেন, বাইরে আপনার আরেকটা সংসার নেই?'
উমেদ মির্জা স্তব্ধ, স্তব্ধ ঘরের প্রতিটি সদস্য!
এমনকি ঘরের প্রতিটি সদস্য নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেছে যেন। হা করে চেয়ে একবার ওসমান মির্জার রক্তাভ মুখখানা দেখছে, আরেকবার রোদ্দুরের ছোঁড়া প্রতিটি বিষ বাক্যবাণ গিলছে। কী ভীষণ বাজে আর অস্বস্তিকর পরিবেশ!
ওসমান মির্জা হতবিহ্বল হয়ে পড়েছেন। রাগে, ক্রোধে, অন্ধ হয়ে শূন্যতা বোধ করছেন। এ বাড়ির কারো জানার কথা নয়, বাইরে তার কি আছে না আছে। এই ছেলে জানল কীভাবে? বিচ্ছুর বাচ্চা! মাটি খুঁড়েও সব বের করে ফেলে....মনে মনে বিড়বিড় করেন তিনি। দাঁত কিড়মিড় করে জানান দিচ্ছেন, নেহাৎ সামনে বড় ভাই আছে বলেই আদবের সঙ্গে এখনো মুখে কুলুপ এঁটে রেখেছেন তিনি। নইলে রোদ্দুরকে বুঝিয়ে দিতেন, কোথায় কি কিভাবে বলতে হয়।
রোদ্দুর বাবার দিকে তাকাল, চোখে চোখ রেখে স্পষ্ট গলায় বলল, 'তোমরা তাকে খুব ভালো মানুষ মনে করো? সে অনেক কষ্টে আছে, তার ব্যথায় মর্মাহত হয়ে বিকেলকে যা নয় তাই বলো...অথচ জানোই না, এই লোকটা বাইরে বাইরে একটা পুরো দুনিয়া সাজিয়ে ফেলেছে। সেখানে তার একটা ছেলেও আছে! ছেলে! অথচ মজার বিষয় হচ্ছে, বিয়ে ছাড়াই তারা একটি সন্তান পয়দা করে ফেলেছে। এতবড় নির্লজ্জের মতো কাজ করে আবার তোমাদের সবার সামনে নিজেকে ভিকটিম সাজায়, ব্লেম দেয় ওই মেয়েটাকে...যে কিনা জানেও না ঠিক কোন দোষে ওর উপর আছড়ে পড়ে সবাই। দাদী খারাপ ভাষা করে। অথচ ওর মায়ের মৃত্যুতে ওর কোনো হাত ছিল? যার যার আয়ু, সে তার রিজিকেই লিখিয়ে নিয়ে আসে। এরপরেও তোমরা কেউ সহমর্মিতা প্রকাশ করোনি। ওই মেয়েটার দুঃখ গুলো বুঝতে পারোনি। উলটো নানান ভাবে ওকে ছোট করেছ, অপদস্ত করেছ...আর চাও, আমি মহান হই, আমি ভালো গুণাবলি সম্পন্ন মানুষ হই। যেখানে আমার বাপ-চাচারাই এসব নিকৃষ্ট কর্মকাণ্ড... ছিঃ!'
রেহনুমার দিকে তাকায় রোদ্দুর, মায়ের প্রতিও অভিমান নেহাৎ কম নয় তার। বিকেলকে তো সে একটু সাপোর্ট করতে পারত, করেনি বরং ছেলের শোকে নিজে মাথাপাগল হয়ে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছেন। রোদ্দুর বলল,
'তুমিও না মা...মেয়েটাকে কোলেপিঠে মানুষ করলে অথচ চিনতে পারলে না! ওর মনে জমানো দুঃখ-কষ্ট গুলো একটু মমতা দিয়ে গলাতে পারলে না! ও আমায় কেন বলেছিল জানো? আমি ওকে ফোর্স করেছিলাম তাই! আমি ওকে ভয় দেখিয়েছিলাম, আমাকে বলতেই হবে, তাই ও আমাকে সব খুলে বলতে বাধ্য হয়েছিল। ওই বুড়ো ভামটা, ও ব্যাড টাচ করেছিল বিকেলকে। লজ্জায়, ভয়ে ও কাউকে এ কথা বলেনি। কাউকে না। আমিই ওকে জোর করি, বাধ্য করি। ও আমায় ইচ্ছাকৃত ভাবে বলেনি।' একটু মিথ্যে করে বলল কথাগুলো রোদ্দুর, বাবা আর মা'কে অপরাধবোধে ডোবাতে... 'আমি অর্পণের বাবাকে ইচ্ছে করে মারিনি। বুড়ো বয়সেও যার এত ছুঁকছুঁকানি তাকে কি এমনি এমনি ছেড়ে দেওয়া যায়? আর এই মারার জন্য ওরা যে আমাকে এটা করবে, ওটা করবে, বা:ল ছিঁড়ে ফেলবে বলেছে, এগুলোও কিছু করতে পারত না। কারণ আমি প্রতিটা কথার রেকর্ড রেখেছি। ওই বুড়ো নিজের মুখে স্বীকার করেছে, ও কি করেছিল বিকেলকে, কি বলেছিল বিকেলকে। এমনকি বিকেলই প্রথম না, আরও অনেক অনেক মেয়েকে....আমি সবকিছু ভিডিও ক্লিপে নিয়ে নেই। তারপরই ওকে ইচ্ছেমতো পেটাই। এরপর আমি ওই মেয়েদের ভেতর খুঁজে ২-৩ জনের কাছেও যাই, এবং তাদের থেকেও কথার সত্যতা স্বরুপ মৌখিক নেই, সেগুলিও সব রেকর্ড করা আছে। যদি এগুলো ফাঁস করে দেই, থাকবে ওদের মান-সম্মান? উল্টো আমাকে সবাই বাহ্বা দেবে! আমি তোমাদের এ ব্যাপারটা কেন বলিনি জানো? কারণ চেয়েছিলাম, সময় মতো বোমা ফাটাতে। কিন্তু তা আর হতে দিলে কই! দু'দিন মাত্র বাড়িতে ঠিক করে ছিলাম না বলে তোমরা সব ক্ষোভ জড়ো করে গিয়ে ফাটলে বিকেলের উপর! হায়রে...
এই যদি হয় বড়দের আচরণ, তবে আমাদের থেকে কি আশা করো?'
রেহনুমা নিশ্চুপ, নিশ্চুপ উমেদ মির্জা ও, ওসমান মির্জা কেবল শূন্য চোখে চেয়ে- বাড়ির সকলেই স্থির। রোদ্দুর একটা নিঃশ্বাস ফেলে পরের কথাগুলো বলবার জন্য মুখ খুলতে নিতেই মেহেরজান নিস্তব্ধতাকে পায়ে পিষে ডাইনীদের মতো খ্যাঁকখ্যাঁক কণ্ঠে শুধালেন, 'ওই ছেমরির হইয়া তুই এত কতা কস ক্যান? ওই ছেমরি তোর কি লাগে?'
রোদ্দুর দাদীর শকুনি চেহারার দিকে তাকিয়ে একটা হাসি ছুঁড়ে দেয়। জবাবটা এড়িয়ে গেল। কারণ, সময় হয়নি। তবে হৃদয় থেকে ঠিকই জবাবটা বেরিয়ে এল তার, 'She is the one, my heart chose!'
একটা ছোট নিঃশ্বাস ও বেরিয়ে এলো উত্তরের সঙ্গে।
(চলবে)
_______
এই গল্পটা আমি লিখতে চেয়েছিলাম ৫ পর্বের ছোট গল্প হিসেবে। অথচ একা একাই এতবড় হয়ে গেছে। কতগুলো চরিত্র এসেছে, ডালপালা গজিয়েছে। জানি না কত পর্ব অবধি চলবে। তবে- আমি খুব শীঘ্রই সিজন-১ করে শেষ করব এটাকে। সিজন-২ আসবে বেশ খানিকটা পরে। মিস্ট্রি লিখার জন্য মাথাটাথা হ্যাং হয়ে যাচ্ছে আমার। যন্ত্রণা হচ্ছে। তাই এই পদ্ধতি অবলম্বন করব...
★নোট- এই পর্বে ৯০০ লাইক চাই। না হওয়া অবধি পরবর্তী পর্ব আসবে না। রিচ হঠাৎ করেই চাঁদের দেশে ঘুরতে গেছে। এখন আপনাদের একটিভনেসই আমার ভরসা।