#প্রেমের_নির্বাসন - (২১)
লেখনীতে - #মৃধা_মৌনি
__________
বিকেল প্রস্থানের জন্য ঘুরে দাঁড়াল, তার পৃথিবীটা এই মুহূর্তে ঝাপসা হয়ে আসছে। চোখের কার্নিশে জমে থাকা জলটুকু বাঁধ মানার অপেক্ষায়। সে কোনোদিন ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি, তার আর তৃপ্তির মাঝে এমন এক অদ্ভুত এবং কদর্য দ্বন্দ্বের দেয়াল এসে দাঁড়াবে। ভাবতেই ঘেন্নায় নিজের ভেতরটা কুঁকড়ে যাচ্ছে। ছিঃ! এক বোন যাকে নিজের হৃদয়ে স্থান দিয়েছে, পরিবার কি না তার সঙ্গেই অন্য বোনের বিয়ের পিঁড়ি সাজিয়ে রেখেছে! নিজের অস্তিত্বের ওপর এক তীব্র ধিক্কার জন্ম নিল বিকেলের। একটা অসহ্য লজ্জা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে, অথচ এই লজ্জার কোনো যৌক্তিক উত্তর তার জানা নেই।
বিকেলের শরীরটা যেন প্রাণহীন এক পাথরের টুকরো। সেই অসাড় শরীরটাকে টেনে নিয়ে যখন সে দু-পা বাড়াল, ঠিক তখনই পেছন থেকে এক জোড়া হাত তার কবজি শক্ত করে চেপে ধরে।
'শোন!' তৃপ্তির কণ্ঠে এক ধরনের তাড়া।
বিকেল সজোরে একটা ঝাড়া দিয়ে হাতটা ছাড়িয়ে নিলো। র:ক্তবর্ণ চোখে তাকিয়ে তীব্র গলায় গর্জে ওঠে, 'কিছু শুনতে চাই না আমি!'
'বিকেল, কথা শোন!' তৃপ্তিও নাছোড়বান্দা। সে আবারও বিকেলের হাত টেনে ধরতেই বিকেলের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে পড়ে। মুহূর্তেই তার শান্ত চাউনি অগ্নিমূর্তিতে রূপ নিলো।
অদ্ভুতভাবে বিকেলের এই রুদ্ররূপ দেখে তৃপ্তির মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে সঙ্গে সঙ্গে। সে বিকেলের দুই কাঁধ ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে শাসন করার সুরে বলল, 'তুই আসলেই একটা যা-তা! আগে কথাটা তো পুরো শুনবি, তারপর না হয় যা খুশি বলিস...'
বিকেল কথা বাড়াল না ঠিকই, কিন্তু তার শরীরী ভাষা জানান দেয় ভেতরের আগ্নেয়গিরি একটুও শান্ত হয়নি। তৃপ্তি গলার সুরটাকে এবার নরম করে আনে, বলে, 'বাবা-মা আমার সঙ্গে ওর বিয়ে দিতে চায়- এ কথা আমি তোর অনেক আগেই জানতাম। কিন্তু কোনোদিন তোকে বলিনি, বুঝতেও দিইনি। কেন জানিস?'
বিকেলের চোখের ক্রোধ কিছুটা স্তিমিত হয়ে সেখানে বিস্ময় ভিড় করল। সে নিরুত্তর হয়ে তৃপ্তির চোখের দিকে তাকিয়ে রইল প্রশ্ন নিয়ে...
তৃপ্তির ঠোঁটের কোণে এবার রহস্যময় এক মুচকি হাসি ফুটে ওঠে। জবাবে বলে, 'কারণ আমি জানি, ইউ লাভ হিম... অ্যান্ড হি অলসো লাভস ইউ।'
মুহূর্তের মধ্যে বিকেলের সব ক্ষোভ কর্পূরের মতো উড়ে গেল। বিমূঢ়ের ন্যায় সে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি কি বাইরের মানুষ শুনতে পাচ্ছে? বিকেলের মনে হলো তার গাল, চোখের পাতা আর ঠোঁটের কোণে অজস্র লজ্জার আভা এসে খেলা করছে।
বিকেলের এই অপ্রস্তুত অবস্থা দেখে তৃপ্তি শব্দ করেই হেসে উঠল। মাথা দুলিয়ে কৌতুকের স্বরে আবার বলল, 'হুম, আমি সব জানি! গত রাতে সিঁড়ির ওই দিকটায়...' বলেই তৃপ্তি কৃত্রিমভাবে একটু কাশল।
বিকেল এবার পুরোপুরি জমে বরফ হয়ে গেল যেন। তার গোল গোল চোখ দুটো বিস্ময়ে স্থির। তৃপ্তির হাসি এবার আরও চওড়া হয়। বিকেলের কানের কাছে মুখ নিয়ে আলতো করে ফিসফিসিয়ে বলল, 'সব দেখে ফেলেছি কিন্তু!'
বলেই তৃপ্তি দুষ্টুমিভরা ভঙ্গিতে দুই হাতে নিজের মুখ ঢাকল। বিকেল পুরোপুরি নির্বাক, ভাষাহীন। লজ্জার এক তীব্র স্রোত তার সারা শরীরে বয়ে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে হৃৎপিণ্ডটা সংকুচিত হয়ে একবিন্দু হয়ে যাবে এখনই। চোখের সামনে গতরাতের দৃশ্যগুলো কোনো সিনেমার রিল বা বইয়ের পাতার মতো দ্রুত উল্টে চলেছে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে এসে স্থির হলো ছবিটা- যেখানে তার অধর মিশেছিল প্রিয় মানুষটির অধরে। কী অদ্ভুত সেই শিহরণ, ইশ!
ভাবতেই বিকেলের শরীরটা আরও একবার কেঁপে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই মস্তিষ্কের এক কোণ থেকে বিদ্রূপের সুরে কেউ যেন মনে করিয়ে দেয়, 'ওরে ভাগ্যবতী, এ দৃশ্যের সাক্ষী কেবল তুই একাই নোস, তোর পিঠোপিঠি বোনটিও সব দেখে ফেলেছে!'
ইশ, কী লজ্জা! কী ভয়ানক লজ্জা! বিকেলের মনে হয়, এই মুহূর্তে যদি পায়ের তলার মাটি দুই ভাগ হয়ে যেত, তবে সে অনায়াসে পাতালপুরীতে সেঁধিয়ে যেতে পারত।
পালাবার পথ খুঁজতে সে আবারও পা বাড়ায়। বলা ভালো, এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে সে এখন জানপ্রাণ দিয়ে পালাতে চাইছে। কিন্তু তৃপ্তি কি আর অত সহজে ছাড়ার পাত্রী? সে আবারও খপ করে বিকেলের হাতটা চেপে ধরল। কৌতুকমাখা গলায় শুধাল, 'কোথায় যাচ্ছো জানেমান? একটু আগের সেই রণচণ্ডী রূপটা এখন কোথায় গেল? সব তেজ বুঝি ফুঁউউউউশ?'
বিকেল ছটফট করে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে। অস্পষ্ট গলায় গোঙানির মতো করে বলল, 'ছাড় তো তৃপ্তি... যেতে দে আমাকে।'
'আহারে! দেখো দেখো, লজ্জায় মেয়েটা একদম পাকা টমেটো হয়ে গেছে। বলি, তখন এই লজ্জাটা কোথায় ছিল, হুঁ?'
বিকেলের মুখ দিয়ে কোনো কথা সরল না। সে কেবল অসহায়ভাবে হাত মোচড়াতে থাকে। তৃপ্তি এই মোক্ষম সুযোগে মজা লুটতে একচুলও ছাড় দিতে রাজি নয়। সে আরও একটু ঘেঁষে এসে ফিচেল গলায় জানতে চাইল, 'এই বিকেল, একটা কথা বল তো। চুমু খেতে কেমন লাগে রে? আমি তো কোনোদিন খাইনি, তুই যদি গ্রিন সিগন্যাল দিস, তবে আমিও না হয় একটা ট্রাই করে দেখতাম...'
বিকেল রাগে আর লজ্জায় চোখ পাকিয়ে তাকাতেই তৃপ্তি সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হওয়ার ভান করে বলল, 'আরে না না, ভয় নেই! তোর রোদ ভাইয়ার সঙ্গে না, আমি অন্য কারোর কথা বলছি। তুই শুধু বল, ফিলিংসটা কেমন? সেই না?'
বিকেল সজোরে একটা ঝামটা দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নেয় এবার। মেকি রাগের চড়া গলায় বলল, 'তৃপ্তি, একদম ফাজলামো করবি না! একটা থাপ্পড় দেব একদম।'
তৃপ্তি ও দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। সে গালটা বিকেলের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল, 'দে, থাপ্পড়ই দে। একটু আগে তো আমি তোকে একটা বসিয়ে দিয়েছি, ওটাই না হয় শোধ করে নে। আমি কিচ্ছু মনে করব না। এই নে, মার...'
গুমোট হলো মেয়েটা। লজ্জার সঙ্গে একধরনের বিমূঢ়তা তাকে গ্রাস করেছে। সে ধরা গলায় বলল, 'একদম ভালো হচ্ছে না তৃপ্তি। তুই বেশি ফাজলামো করছিস।'
'আচ্ছা ঠিক আছে, এখন থেকে একটু কম কম ফাজলামো করব, কেমন?' তৃপ্তির ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমির ঝিলিক।
'তৃপ্তি!?' বিকেলের কণ্ঠে এবার প্রায় কান্নার সুর।
বোনের কাঁদোকাঁদো মুখ দেখে তৃপ্তি অবশেষে তার ঠাট্টা-তামাশার ইতি টানে। বিকেলের কাঁধে হাত রেখে গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করে বলল, 'ওকে বাবা ওকে, ফাইন! আর মজা করব না। তবে এবার যেটা বলব, সেটা কিন্তু একদম সিরিয়াস।'
বিকেল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে একটু ধাতস্থ করার চেষ্টা করল। ধুকপুক করা হৃদপিণ্ডটাকে শান্ত করে তৃপ্তির চোখের দিকে চেয়ে প্রশ্ন করে, 'কী বলবি?'
তৃপ্তির কণ্ঠস্বর হঠাৎ নরম হয়ে আসে, তাতে মিশে যায় গাঢ় মমতা। সে ধীরস্থির কণ্ঠে উচ্চারণ করে, 'আমি কাউকে কিছু বলিনি রে, আর কোনোদিন বলবও না। আমি জানি তুই ছোটবেলা থেকেই কতটা কষ্ট পেয়ে বড় হয়েছিস। তাই আমি মন থেকে চাই- তুই ভালো থাক, একটু মানসিক প্রশান্তি নিয়ে বাঁচ। আর সেই শান্তির জন্য রোদ ভাইয়াকে তোর খুব প্রয়োজন। আমার না হলেও চলবে। কারণ, আমার জীবনে ভালোবাসা না থাকলেও আমাকে ভালোবাসার মতো একটা গোটা পরিবার আছে, যা তোর নেই। সুতরাং, আমি মন থেকেই চাই তোরা দুজন একসাথে থাক। তোর আকাশের নীল বিষাদের মেঘগুলো সব বৃষ্টি হয়ে ঝরে যাক, তারপর সেখানে রৌদ্রস্নাত এক ঝকঝকে রোদের উদয় হোক...'
এক নিমেষে বিকেলের হৃদয়ে কৃতজ্ঞতার জোয়ার বয়ে যায়। ঠিক পরক্ষণেই একরাশ লজ্জা আর অপরাধবোধ এসে ঘিরে ধরল তাকে। একটু আগে কী কুৎসিতভাবেই না সে ভুল বুঝেছিল নিজের এই বোনটিকে!
বিকেলের মনের মেঘলা ভাবটুকু তৃপ্তির নজর এড়াল না। সে বিকেলের হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে সহজ গলায় বলে ওঠে, 'ইটস ওকে! আমি কিচ্ছু মনে করিনি। তবে... তোর সতীন হতে পারলে কিন্তু মন্দ হতো না ব্যাপারটা! দুজনে মিলে সারাদিন চুল ছিঁড়াছিঁড়ি করতাম। কী বলিস?'
বিকেলের ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটে উঠে, তৃপ্তিও খিলখিল করে হেসে উঠল। কিন্তু এই খুনসুটির মাঝে হঠাৎ করেই এক টুকরো কালচে মেঘ এসে হানা দেয় যেন। বিকেলের হাসিমাখা মুখটা মুহূর্তেই চুপসে যায়। তার মনে পড়ে গেল এক রূঢ় বাস্তব। আতঙ্কিত স্বরে সে বলে উঠল, 'কিন্তু কী হবে তৃপ্তি? বড় বাবা তো আমায় দু-চোখে দেখতে পারেন না। আর... তিনি তো অন্য জায়গায় আমার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছেন!'
বিকেলের চোখেমুখে স্পষ্ট ভয়ের ছাপ। তৃপ্তি ওর কাঁধে হাত রেখে অভয় দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল, 'রোদ ভাইয়ার ওপর তোর বিশ্বাস আছে তো?'
বিকেল দৃঢ়ভাবে মাথা ঝাঁকাল, 'আছে।'
'তাহলে আর ভয় কিসের? প্রেমে একটু বাধা না এলে তার পূর্ণতায় কোনো মজা নেই রে। তুই শুধু প্রস্তুত থাক। যত ঝড়-তুফানই আসুক, ভাইয়ার হাতটা শক্ত করে ধরে থাকবি। দেখবি, উনিই তোকে সাঁতরে পার করে দেবেন সাত সমুদ্র তেরো নদী...'
বিকেল বিস্ময় আর আশা নিয়ে অস্ফুট স্বরে শুধাল, 'সত্যি বলছিস?'
তৃপ্তি বিকেলের চোখের দিকে তাকিয়ে অবিচল গলায় উত্তর করে, 'আমি তোকে কোনোদিন মিথ্যে বলিনি, আজও বলছি না।'
★★★
পাঁচবার রিং হওয়ার পর ফোনটা তুলল ওপাশ থেকে। নবাবজাদা...মনে মনে শব্দটা আওড়ে বিকেল।
গলার স্বর মোটা করে বলে, 'হ্যালো?'
ঘুম জড়ানো কণ্ঠস্বরে রোদ্দুরকে তখন অসম্ভব মাদকীয় মনে হয়। মনে হয়, এই কণ্ঠ শুনলেই নেশা হয়ে যেতে পারে যে কারো..ছলকে ওঠে হৃদপিণ্ডের র:ক্ত। মানুষটা ঘুমুচ্ছে?
'হ্যালো...মর্নিং জান!'
এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল বিকেলের অধরে।
যত রাগ, ক্ষোভ ছিল নিমিষেই হাওয়া হয়ে যায়।
ফোন ধরছিল না দেখে ভেবেছিল একটা বকাই দিয়ে দিবে ভালো রকমের, কিন্তু এখন...অদ্ভুত ভাবে অশ্লীল একটা কাজ করতে ইচ্ছে করছে ওর। বেশরমের মতো আরও একবার ওই অধর জোড়ার ছোঁয়া পেতে খুব করে মন চাইছে তার...চোখের সামনে আবারও দৃশ্যটি ভেসে ওঠে। বিকেল চোখ বুঁজে ঠোঁট কামড়ায়।
তাকে নীরব থাকতে দেখে ওপাশের গম্ভীর কণ্ঠস্বরটি বলে ওঠে আবারও, 'কি? চুপ কেন মহারানী?'
বিকেল মনে মনে তিনবার মাশা আল্লাহ পড়ে।
প্রিয় মানুষের প্রতি প্রিয় মানুষেরই নজর লাগে সবচেয়ে বেশি....তারপর ফুঁ দেয়, যেন ফোনের ওপাশে থাকা মানুষটার গায়ে গিয়ে পড়বে তা।
আওড়ায় ধীরস্থির স্বরে, 'কোথায় আপনি?'
গুঙিয়ে ওঠে রোদ্দুর, আড়মোড়া ভাঙার শব্দে উচ্চারণ করে, 'কেন? মিস করছেন নাকি?'
আবারও ঘোর লেগে যায় বিকেলের, থেমে থেমে বিড়বিড়ায়, 'বয়েই গেছে।'
'তাই?' সরব হলো গলা, 'তাহলে রেখে দিলাম।'
'এই না...' ছটফট করে ওঠে মেয়েটা।
হাসল রোদ্দুর, অস্পষ্টভাবে, ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন ছোঁড়ে, 'কেন? মিস তো করছেন না, তাহলে ফোন কেন?'
লজ্জায় চিবুক নত করে আওড়ায় বিকেল, 'মিস না করলে বুঝি ফোন দেওয়া যাবে না?'
'উঁহুম, না। যাবে না।'
'সবাই বুঝি মিস করলেই ফোন করে আপনাকে?'
'করে তো! জেরিন, তারিন, ফারিন, আরহিন...'
'এরা কারা?'
'আমার ফ্রেন্ড!'
'কেমন ফ্রেন্ড?'
'ক্রাশ টাইপ ফ্রেন্ড।'
'মানে?' ভ্রু কুঁচকে যায় বিকেলের। এবার একটু নড়েচড়ে শক্ত হয়ে ওঠে ও।
ওপাশের মানুষটা যে হেসে কুটিকুটি হচ্ছে, তা বোঝে না ওর ছোট্ট মস্তিষ্কখান।
'মানে, ওরা আমার প্রতি ক্রাশড, এন্ড আমি ওদের ফ্রেন্ড ভাবি...সো দুটো মিলিয়ে ক্রাশ টাইপ ফ্রেন্ড।'
'আপনার সঙ্গে দারুণ যোগাযোগ?'
পোড়া পোড়া গন্ধ টের পায় রোদ্দুর, তবুও আরেকটু পুড়িয়ে দিতেই ঠোঁট কামড়ে জবাব করে, 'হুম।'
'ফোন করে কি বলে? আপনাকে মিস করছে?'
'হ্যাঁ, বলে মাঝে মাঝে।'
'কে বেশি বলে?'
'ওরা সবাই-ই।'
'কি যেন নাম বললেন?'
'জেরিন, তারিন, ফারিন...'
'আর আরহিন? তাই তো?'
'বাহ, দারুণ ইন্টিলিজেন্ট তো তুমি। একবার শুনতেই মুখস্থ হয়ে গেল।'
বিকেলের রাগে শরীরটা কিড়মিড় করছে এই মুহূর্তে।
ইচ্ছে করছে, ওই জেরিন, তারিন, ফারিন, আরহিন- সব ক'টাকে ফেঁড়ে ফুঁড়ে গুঁম করে দেয় কোথাও....
বিকেল গলার স্বর গমগমে করে তুলল। বলল, 'রাখছি।'
'কেন?' ঠোঁট চেপে হাসি আঁটকায় রোদ্দুর,
'এমনি। আমি তো মিস করছি না, তাই আমি ফোন ধরে রাখব কেন? তাই বায় বায়।'
'তাহলে কে ফোন করবে আমায়?'
'যারা মিস করে।'
'কারা করে?'
'আপনার ক্রাশ টাইপ ফ্রেন্ডস!'
'নাম কি ওদের?'
'জেরিন, তারিন, ফারিন, আরহিন...'
'গ্রেট! এত্ত অল্পতে কেমনে কেউ হুবুহু মুখস্থ করতে পারে ভাই!! নাহ, আমার ডিব্বার ট্যালেন্ট আছে!!'
'ডিব্বা?' আরও ভ্রু কুঁচকে যায় বিকেলের, মানুষ ভালোবেসে জান, সোনা, পাখি, বেবি, কত কি নামে ডাকে। আর তাকে কিনা ডাকছে, ডিব্বা!
রোদ্দুরের পেট ফেটে যাচ্ছে হাসির দমকে।
কিন্তু মেয়েটাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার হতে দেখতে দারুণ লাগছে তার। তীব্র পৈশাচিক শান্তিও পাচ্ছে। অনেক জ্বালিয়েছে সে রোদ্দুরকে, এই ফ্রেন্ড, ওই ক্রাশ, এই ছেলে, ওই উদয়- ভুলে যায়নি ও!
এখন তার পালা...দেখুক, কেমন লাগে হৃদয় ঝুরঝুরা হওয়া!
রোদ্দুর বলল, 'ইউনিক নাম দিলাম- ডিব্বা। কেন পছন্দ হয়নি?'
'কিসের ডিব্বা?'
'একেক সময় একেক জিনিসের। এই যেমন এখন, বোমার ডিব্বা...'
থমকাল বিকেল, তারপর চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, 'ভাগ্যিস ওটা হাতের কাছে নেই।'
'থাকলে দু-তিনটা এলাকা যে উড়িয়ে দিতি, আমি জানি।'
'জানলে গুড!
আর একবার তুই, একবার তুমি....যেকোনো একটায় আসুন!'
'আমার যখন যেটা ভাল্লাগবে আমি বলব, তুই কে যে তোর কথা শোনা লাগবে?'
'হ্যাঁ, তাই তো!
আমি কে! শুনবেন তো ওই ক্রাশ টাইপ ফ্রেন্ডসদের কথা...আচ্ছা, রাখছি...'
'এই শোন...'
'কি?'
'তোকে দেখতে ইচ্ছে করছে।'
আবারও থমকায় মেয়েটা।
অদ্ভুত অনুভূতি, এই জ্বলছে, এই পুড়ছে, আবার এই ভালোও লাগছে....
কিন্তু তাকে জ্বালিয়ে নিজে শান্তিতে থাকবে? বিকেল তা হতে দেবে? কক্ষনো না...
তাই বলল, 'আমাকে দেখা লাগবে কেন?'
'আমার ইচ্ছা।'
'আপনার ইচ্ছা আমি মানতে যাব কেন?'
'কারণ ইচ্ছাটা আমার আর তুই-ও আমার!'
এত সুন্দর করে বলল, তবু পাত্তাই পেল না কথাটা।
বিকেল পালটা জবাবে ছুঁড়ে দিলো, 'আর ওই জেরিন, তারিন, ফারিন, আরহিন ও আপনার...'
'হইছে তো! বাদ দে না...'
'একদম না।'
'বিকেল?'
'জেরিন?'
'বিকেএএল?'
'তারিইইন।'
'বিকেএএইইল?'
'ফারিইইইইন।'
'বিকেইইইইইইইইইইল?'
'আরহিইইইইইইইইইন.....'
হেসে ফেলল রোদ্দুর।
হেসে ওঠে বিকেল নিজেও। দুই হৃদয়ের ছন্দময় হাসিতে বিকেলের মনের আকাশে জমে থাকা সব বিষাদের মেঘ মুহূর্তেই কেটে গেল। কিন্তু হাসির রেশটুকু মিলিয়ে যেতেই তার চোখের কোণ দুটো ভিজে উঠল অবাধ্য জলে।
বিকেলের মনে পড়ে যায়- বুঝ হওয়ার পর থেকে তার জীবনের খেরোখাতা জুড়ে আনন্দঘন মুহূর্তের বড্ড আকাল ছিল। স্কুলজীবনে সহপাঠীরা যখন হইচই করে বনভোজনে যেত, সে তখন ঘরে একা জানালার গ্রিল ধরে তাকিয়ে থাকত। সবার সঙ্গে অভিভাবক থাকলেও তার সাথে যাওয়ার মতো কেউ ছিল না। প্যারেন্টস মিটিংয়ে বাবা যেতেন সবার শেষে, তাও যদি খুব জরুরি কিছু হতো তবেই। বাবার এই উদাসীনতা আর অবহেলার দেয়ালটুকু দেখেই সে বড় হয়েছে। আর ধীরে ধীরে জেনেছে, এই পৃথিবীতে মায়ের মতো কেউ হয় না। আর সেই অমূল্য রত্নটিই যখন তার নেই, তখন অন্য কারো কাছে সুখের আবদার করা বিলাসিতা ছাড়া আর কিছু নয়। তাই একসময় সে একা একাই হাসতে শিখল, রাগকে কন্ট্রোল করতে জানল, কান্না গুলোকেও গোপন সিন্দুকে জমা করতে বুঝল।
অথচ আজ... তার সমস্ত সত্তা যেন এক আশ্চর্য মায়ায় এই মানুষটির সঙ্গে মিশে গেছে। তার হাসিতে হাসতে ইচ্ছে করে, তার রাগে রাগতে ইচ্ছে করে, এমনকি তার সামান্য ব্যথায় বিকেলের মনবাড়িতে হাহাকার শুরু হয়। সবকিছুর মাঝেও রবের কাছে অজান্তেই এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে বিকেলের- যদি শেষ পর্যন্ত মানুষটি তার ভাগ্যে না-ই থাকে, তবে সূচনায় কেন এত রঙিন স্বপ্ন বুনবার অধিকার পেল সে?
ফোনের ওপাশে বিকেলকে হঠাৎ নিশ্চুপ হতে দেখে রোদ্দুরের বুকের ভেতরটাও একটু মোচড় দিয়ে ওঠে। সামনে নেই, তবু মেয়েটার নিঃশ্বাসের ওঠানামা সে দিব্যি অনুভব করতে পারে। ভালোবাসায় দূরত্ব বলতে কোনো শব্দ নেই, হতে পারে না! কারণ প্রিয় মানুষটার বসবাসই হয় হৃদয়ের সিংহাসনে...
রোদ্দুর ধীর স্বরে ডাকল, 'কান্নার ডিব্বা?'
বিকেল ভেজা গলায় সংক্ষেপে সাড়া দেয়, 'উঁ?'
'চোখ দুটো আগে মোছো।'
বিকেল অবাক হয়ে হালকা হাসল, 'আপনি বুঝলেন কী করে?'
রোদ্দুরের হাসির ঝংকার ভেসে এল ফোনের ওপার থেকে, 'বুঝব না কেন? তোমার বসবাস যে আমার হৃদপিণ্ডের ঠিক মধ্যিখানে। শারীরিকভাবে হয়তো দূরে আছো, কিন্তু মানসিকভাবে আমি তোমার প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস অনুভব করতে পারি।'
বিকেল আবেগজড়িত কণ্ঠে শুধাল, 'এত ভালোবাসা? যদি কোনোদিন ফুরিয়ে যায়?'
রোদ্দুর খানিকক্ষণ নীরব রইল এ কথায়। তারপর এক অতল গভীরতা থেকে তার কণ্ঠস্বরে ভেসে এল শব্দ ক'খানি,
'জানিস, ভালোবাসা কখনো শেষ হয় না; কেবল সময়ের সাথে সাথে তার ব্যাকরণটা বদলে যায়। মানুষের মুগ্ধতার ধরন পাল্টে যায়। আজ যেমন তোর এই ঝরঝরে হাসিতে আমি বিমোহিত হই, কাল হয়তো তোর অন্য কোনো সাধারণ অভ্যাসের মাঝেই নতুন করে বেঁচে থাকার স্বাদ খুঁজে পাব। আজ তোর শরীরের নরম মাখনের মতো ঘ্রাণ আমায় টানে, কাল হয়তো মশলাদার গন্ধটাই ভালো লাগবে বেশি।
আসলে জীবনের একেকটা ধাপে ভালোবাসার একেকটা রূপ। এখনকার এই না-পাওয়া আর আকুলতা মাখানো জীবন, আর আগামীর সেই এক ছাদের তলার সাংসারিক জীবন- দুটো কোনোদিন এক হবে না। বিয়ের পর হয়তো এই ফোনালাপের উন্মাদনা থাকবে না, কিন্তু তার বদলে আসবে একে অপরের প্রতি গভীর নির্ভরতা। যে এই বদলটা বুঝতে পারে, সেই জীবনভর প্রশান্তি নিয়ে টিকে থাকে। আর যারা বোঝে না, যারা কেবল শুরুর সেই তীব্র আবেগটাকেই আঁকড়ে ধরে থাকতে চায়, তারাই অহেতুক অশান্তি আর শূন্যতা সৃষ্টি করে। ভালোবাসা তো ঋতু পরিবর্তনের মতো রে বিকেল- বসন্তের কোকিল কুজন যেমন সুন্দর, বর্ষার ঝমঝম বৃষ্টির সুরও তেমনি তৃপ্তিদায়ক। ধরন বদলাবে, কিন্তু সুরটা তো একই থেকে যায়।'
বিকেল মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনে যাচ্ছিল। গলার স্বর গাঢ় করে তুলে ফের বলে ওঠে রোদ্দুর, 'আমি তোকে শুধু আজকের জন্য ভালোবাসিনি রে বিকেল, আমি তোকে ভালোবেসেছি আমাদের প্রতিদিনের বদলে যাওয়া রূপগুলোকে চিনে নেব বলে।'
বিকেলের সারা শরীর দিয়ে বিদ্যুতের এক মৃদু স্রোত বয়ে যায়। আবেশে আর লজ্জায় সে একদম পাথর হয়ে গেছে। ফোনের অপরপ্রান্তে মানুষটি নেই, কিন্তু তার কণ্ঠের রেশ যেন পুরো ঘরে ম ম করছে। আড়ষ্ট স্বরটাকে কোনোমতে গুছিয়ে নিয়ে বিকেল মৃদুস্বরে বলল, 'জানেন, আপনাকে আগে আমি আস্ত একটা রাক্ষস হিসেবেই জানতাম...'
রোদ্দুরের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল, সেটার ছটা যেন ফোনের এপার থেকেও অনুভব করা যায়। সে প্রশ্ন করল, 'আর এখন?'
বিকেল জানালার ওপাশে গড়াগড়ি খেতে থাকা এক চিলতে রোদের দিকে তাকিয়ে জবাব দিল, 'এখন মনে হয়- জীবনে পাওয়া সবচেয়ে বিশেষ কিছু... যা আমি কোনোদিন হারাতে চাই না।'
'হারাতে হবেও না।' রোদ্দুরের গলায় এক আশ্চর্য নিশ্চয়তা।
'প্রমিস?'
'হুম। তবে একটা শর্ত আছে এর পেছনে...'
বিকেল কৌতূহলী হয়ে শুধাল, 'কী শর্ত?'
'আর কোনোদিন ওই দুচোখে কান্না আনা যাবে না।'
বিকেল একটু দুষ্টুমি করে পালটা প্রশ্ন ছোঁড়ে, 'আপনি মারলেও না?'
রোদ্দুর গভীর গলায় হাসল, 'আমার মারায় কেবল আদুরে অনুভূতি হবে রে বোকা, কেউ কি তাতে কাঁদে? বিশ্বাস না হলে একবার সামনে আয়, দেখাব আদর-মার কাকে বলে... দেব নাকি আরও একটা গতরাতের মতো?'
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই বিকেল লজ্জায় নাক-মুখ কুঁচকে বলে উঠল, 'ইশ, ছিঃ! আপনি বড্ড অশ্লীল।'
রোদ্দুর এবার হো হো করে হেসে ওঠে, 'অশ্লীলতার কী দেখলি প্রিয়তমা? একবার রেজিস্ট্রার খাতায় সই করে তোর নামটা আমার দখলে নিয়ে নিই, তারপর বুঝিয়ে দেব- কত প্রকার ভেদ আর কত ঢঙে আদরে আদরে পাগল করে ফেলা যায়...'
বিকেল আর সহ্য করতে পারল না, তীব্র লজ্জায় ধমক দিয়ে বলল, 'চুপ করবেন আপনি?'
'করব, তবে একটা শর্তে।'
'আবার কি?'
'একটা চুমু দাও!'
'উমম... না!' বিকেলের গলায় অভিমানী সুর।
'তাহলে কিন্তু আমি থামছি না, বলতেই থাকব...'
'ভালো হচ্ছে না কিন্তু।'
'না হোক ভালো, তাতে কার কী!'
রোদ্দুর ছোট বাচ্চার মতো জেদ ধরে বলল, 'চুমুউউউউ...'
বিকেল আর পেরে উঠল না। নিজের সমস্ত ভালোবাসা যেন একবিন্দু করে ফোনের ওপ্রান্তে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য ফোনের কাঁচের ওপর দুটো ঠোঁটের শব্দের প্রতিধ্বনি করল। শব্দটা করেই সে তড়িৎবেগে ফোনটা কেটে দিয়ে বুকের ওপর চেপে ধরল।
তার হৃদপিণ্ড এক অশান্ত ঘোড়ার ন্যায় দৌড়াচ্ছে। গাল দুটো টকটকে লাল হয়ে জ্বলে উঠছে। ভালোবাসা কি সত্যিই এত সুন্দর হয়? এই মুহূর্তের এই মোহনীয় অনুভূতিগুলো তাকে এক অলৌকিক জগতের বাসিন্দা করে দিয়েছে যেন। ফোনের কালো স্ক্রিনটার দিকে তাকিয়ে সে আনমনেই হাসে ক্ষণ।
বাইরে রোদের প্রখর তেজ, চারপাশ ঝকঝক করছে তপ্ত দুপুরে। আকাশের সেই একলা মেঘটা কখন যে মিলিয়ে গেছে, আর জানালার কপাটে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে একরাশ সোনালী রোদ্দুর। বিকেলের মনে হলো, জীবনের হাজারো অবহেলা আর রিক্ততার ভিড়ে এই একটা মানুষই হয়তো তার ঈশ্বরপ্রদত্ত পুরস্কার। যে মানুষটা তার কান্নার ডিব্বা হওয়ার অধিকার কেড়ে নিয়ে তাকে হাসাতে জানে, তার জন্যই তো আগুনের পথ অনায়াসেই পাড়ি দেওয়া যায়।
বিকেল আলতো করে নিজের ঠোঁটে আঙুল ছোঁয়ালো। উজ্জ্বল আলোয় মাখামাখি ঘরটাতে তার দুচোখ দিয়ে আবারও জল নেমে আসে, তবে এবারের জলটা বিষাদের নয়, পরম তৃপ্তির। তপ্ত দুপুরের এই স্নিগ্ধ উপলব্ধি তাকে বুঝিয়ে দিল, জীবনের সব ধূসর বিকেলগুলো এবার সত্যিই রাঙিয়ে ওঠার সময় হয়েছে।
★★★
বিকেলের তন্দ্রাচ্ছন্ন ঘোরটা ভাঙল এক তীব্র আর্তনাদে। খুব সুন্দর, আদুরে একটা স্বপ্নের ভেতরে ডুবে ছিল সে; এক লহমায় সেই স্বপ্নের সুতোগুলো কেউ ধারালো কাঁচিতে কেটে দিল মনে হয়। স্বপ্নের ছন্দময় সুর ছাপিয়ে কোনো এক পুরুষের চওড়া কণ্ঠের গর্জনে কেঁপে উঠল ঘর। পরক্ষণেই ভেসে এল একটা কান্নার রোল।
ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসল বিকেল। অবিন্যস্ত চুলের জট ছাড়ানোর সময় নেই। পাশে ফোনটা নিথর পড়ে আছে; কখন যে ক্লান্তি এসে ওর চোখের পাতা জুড়ে দিয়েছিল, টেরই পায়নি। জানালার ওপাশে বিকেলের সোনালি রোদের তেজ মরে গিয়ে বিষণ্ণ এক গোধূলি নামছে। সময়টা থমকে আছে- ঠিক যেভাবে থমকে গেছে বিকেলের হৃদস্পন্দন। নিচে কিসের এত শোরগোল? কেইবা এভাবে ডুকরে কাঁদছে?
হঠাৎ নিচতলা থেকে কিছু একটা আছাড় দিয়ে পড়ার শব্দ এল। ঝনঝন করে কাঁচ ভাঙার সেই শব্দে পুরো বাড়িটার আত্মা কেঁপে উঠল বোধহয়। বিকেল আর বসে থাকতে পারল না। তড়িঘড়ি করে ওড়না খুঁজতে গিয়েও পেল না; শেষে হাতের কাছে থাকা গামছাটাই কোনোমতে গায়ে জড়িয়ে নিল। আলুথালু বেশে, খালি পায়েই সে ছুটল সিঁড়ির দিকে।
নিচের হলঘরে পা রাখতেই বিকেলের পা যেন মেঝেতে গেঁথে গেল। এ এক অবাস্তব দৃশ্য! ড্রয়িং রুমের মাঝখানে এক ভয়াবহ থমথমে পরিবেশ। সৌম্য ভাইয়া পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে, পাশে আদিবা ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে ডুকরে কাঁদছে। কিন্তু বিকেলের দৃষ্টি আটকে গেল তৃতীয় মানুষটির ওপর। আদিবাদের বাড়িতে দেখা সেই ছেলেটা এখানে কেন? ওর গায়ে আসমানী রঙের শার্ট, কিন্তু বুকের কাছে ওগুলো কিসের ছোপ? কালচে লাল রঙের দাগগুলো কি তবে... র:ক্ত?
শঙ্কায় শিউরে উঠল বিকেলের শরীর। ফুপু আর মেহেরজান সমানে চিৎকার করছেন, তাঁদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে ঘরের বাতাস। ঠিক তখনই উমেদ মির্জার বজ্রকণ্ঠ শোনা যায়। রাগে আর আতঙ্কে তাঁর গলার শিরাগুলো ফুলে উঠেছে। তিনি সৌম্যর দিকে আঙুল উঁচিয়ে গর্জে উঠলেন,
'ওকে এই বাড়িতে ঢোকালি কেন তুই? ও খু:ন করেছে সৌম্য, ও খু:নি! তুই কি কাণ্ডজ্ঞান হারিয়েছিস? জবাব দে সৌম্য!!!'
'খু:ন!'
শব্দটা তপ্ত সীসার মতো বিকেলের কানে ঢুকে মগজ অব্দি অবশ করে দিল। চারপাশের কোলাহল হঠাৎ করেই বিকেলের কাছে ঝাপসা হয়ে এল। সৌম্য ভাইয়া নিশ্চুপ, আদিবা কান্নায় ভেঙে পড়েছে, আর সেই আগন্তুক ছেলেটা... সেও কেমন পাথরের মতো স্থির। বিকেলের মাথাটা ভোঁ ভোঁ করে ঘুরতে লাগে। মনের ভেতর অজস্র প্রশ্নের হাহাকার- কে প্রাণ হারাল? কেন এই ছেলেটার শার্টে র:ক্তের দাগ? বড় বাবা কিসের খু:নের কথা বলছেন? এক শান্ত অপরাহ্ণ মুহূর্তেই যেন বিভীষিকায় পরিণত হয়।
(চলবে)
_______
টার্গেট- ৯০০ লাইক, ২০০ কমেন্ট।
হয়ে গেলেই পরের পর্ব, ইনশা আল্লাহ ❤️🌻