ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের নির্বসন

২২তম পর্ব

লেখক: মৃধা মৌনি

#প্রেমের_নির্বাসন - (২২)

লেখনীতে - #মৃধা_মৌনি

(নোটটা পড়ে নিবেন)

___________

ধরণী উত্তপ্ত, গুমোট এক অস্থিরতা চারপাশের পরিবেশে। হলঘরের ভেতরকার থমথমে পরিস্থিতি যেন কোনো বড়সড় বিপদের পদধ্বনি দিচ্ছে। সেই বিষণ্ণ ঘরটির ঠিক মধ্যিখানে একটি চেয়ার টেনে বসানো হয়েছে নিস্তেজ আদিবাকে। মুহূর্তকাল আগে মেয়েটি যখন জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়তে নিচ্ছিল, ঠিক তখনই সৌম্যর অতন্দ্র হাত দুটো আগলে নেয় তাকে। আদিবাকে সামলে নিতে দেখে উমেদ মির্জা কিছুটা স্থির হলেন। অত্যন্ত গম্ভীর কণ্ঠে আদিবাকে থিতু হতে বলে তিনি নিজেও আসীন হলেন।

তৎক্ষণাৎ ওসমানকে ফোন করে জানিয়ে দেওয়া হলো, সব কাজ ফেলে যেন সে দ্রুত বাড়ির পথ ধরে। কারণ, বাইরের শান্ত মেঘে আজ প্রলয় লেগেছে, সব যেন বানের জলে ভেসে যাওয়ার উপক্রম।

এরপর শুরু হলো সেই কাঙ্ক্ষিত বিচারসভা তথা বৈঠক সমাচার। দীর্ঘক্ষণের জমে থাকা রহস্যের জট খোলার পালা। হলভর্তি মানুষের সেই পিনপতন নীরবতার মাঝে মুখ খুলল আসিফ। সে কারো দিকে তাকাল না, বরং দুই নেত্র নিবদ্ধ রাখল মেঝের দিকে। তপ্ত হাহাকার বুকে চেপে অত্যন্ত নিস্পৃহ ও সহজ কণ্ঠে সে উগরে দিতে লাগল সেই অন্ধকার সত্য—কে কাকে খুন করেছে, কার রক্তে রঞ্জিত হয়েছে তাদের আঙিনা। এক ভয়াবহ স্বীকারোক্তি যেন লাভার মতো বয়ে চলল সেই মজলিসে।

'আপার কোনো দোষ নেই। আপনারা যখন বড় মন নিয়ে আমাদের বাড়িতে আতিথেয়তা গ্রহণ করতে গিয়েছিলেন, ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে ও আপনাদের ওপর ভরসা করতে পারেনি। তার একমাত্র কারণ ছিল চাচীর সেই মরণাপন্ন দশা। মায়ের ওই কাতরতার কাছে ও নিজের আবেগ বিসর্জন দিয়েছিল। আপনারা দয়া করে ওর ওপর কোনো ক্ষোভ রাখবেন না। ও তখন নিতান্তই এক দিশেহারা কিশোরী ছাড়া আর কিছু ছিল না। চাচীর কান্না আর পারিপার্শ্বিক চাপ ওকে পিষ্ট করে ফেলেছিল। অথচ এরপর পর্দার আড়ালে যা যা ঘটেছে, তার বিন্দুমাত্র আপনারা জানতে পারেননি। হয়তো কোনোদিন জানতেনও না- যদি না ভাগ্য আজ ওকে টেনেটুনে আপনাদের এই উঠোনে এনে দাঁড় করাত।'

আসিফ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বলতে লাগল, 'আমার চাচা মানুষটা অন্য ধাতুতে গড়া। তাঁর কাছে মানবিক আবেগ, ভালোবাসা কিংবা অন্য কারো ব্যক্তিগত মতামতের কানাকড়িও মূল্য নেই। তাঁর জেদই শেষ কথা। সেই জেদ পূর্ণ করতে যদি কারো প্রাণও যায়, তাতে তাঁর কিছু আসে যায় না। তিনি সেই পাথর, যা মোমের তাপেও গলে না। এমন কঠিন আর নিষ্ঠুর মানুষ আমি এই পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি দেখিনি।'

এতক্ষণ নিশ্চুপ থাকা উমেদ মির্জা এবার মুখ খুললেন। তাঁর গুরুগম্ভীর কণ্ঠস্বর ঘরজুড়ে প্রতিধ্বনিত হলো, 'এমন হেডম কি আমাদের নেই? আমাদের বংশের ইতিহাসও কিন্তু ফেলনা নয়। তবুও আমরা শুধু ছেলের হাসিমুখটার দিকে তাকিয়ে তোমাদের আঙিনায় পা রেখেছিলাম।'

আসিফ মুখ তুলে তাকায়। তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ম্লান হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে বিনম্র কণ্ঠে বলল, 'আমি জানি। এখানেই চাচার সাথে আপনার আকাশ-পাতাল তফাৎ। আপনি আপনার বোনের ছেলের সুখের কথা ভেবেছেন, আর আমার চাচা ভেবেছেন নিজের মেকি আভিজাত্য আর সম্মানের কথা। আদিবাকে তিনি স্রেফ গৃহবন্দি করে ফেলেছিলেন। জোর করে অন্যের সাথে ওর বিয়ে ঠিক করে ফেলেন। বিশ্বাস করুন, ও হাজার বার চেষ্টা করেও আপনাদের সাথে কোনো যোগাযোগ করতে পারেনি।'

উমেদ মির্জার কুঁচকানো ভ্রু আরও সংকুচিত হলো। তিনি সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন, 'আর সেই বিচ্ছেদপত্র? ওই ডিভোর্সের কাগজে যে ও সই করল, সেটার ব্যাখ্যা কী?'

'ওটা স্রেফ আমার মঙ্গলের জন্য ছিল বড় বাবা!' এবার নীরবতা ভেঙে সৌম্য এগিয়ে আসে। তার চোখেমুখে এক গভীর কাতরতা। সে বড় মামার সামনে দাঁড়িয়ে কাতর কণ্ঠে বলতে লাগল, 'বিশ্বাস করো, ও কেবল আমাকে বাঁচাতেই ওই আত্মঘাতী কাজটা করেছিল। ও চায়নি আমার জীবনটা ওর জন্য একটা চোরাবালিতে আটকে যাক। নিজের ভালোবাসা বিসর্জন দিয়ে ও আমাকে সামনে এগিয়ে দিতে চেয়েছিল। ও স্বার্থপর সেজেছিল যাতে আমি নিঃস্ব না হয়ে পড়ি। ওর নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগকে আমরা ঘৃণা ভেবে ভুল করেছি।'

উমেদ মির্জা হিতাহিতজ্ঞানশূন্য ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন ক্ষণকাল। প্রেম জিনিসটা আসলে কি? এত ভয়ংকর? যে ছেলেটা কোনোদিন তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে হ্যাঁ-না এর বাইরে কোনো কথা বলবার সাহস করেনি, আজ সে কত কিছু বলছে...কীভাবে বলছে। কি বলছে, কোনো বিবেচনাই নেই। একটু স্তব্ধই হন তিনি। পরমুহূর্তেই চোখ ফিরিয়ে ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ছাড়েন। জানতে চাইলেন, 'ওর বাসায় গিয়ে কোন কান্ড ঘটিয়ে এসেছ তুমি?'

এবার আসিফ এগিয়ে এসে সৌম্যর কাঁধের পাশে দাঁড়ায় এক অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায়। জানাল, 'ভাই একা কিছু করেনি। আমি সবটা জানানোর পর সে আদিবাকে ওই নরক থেকে উদ্ধার করতে গিয়েছিল। কিন্তু চাচা পথ আগলে দাঁড়ালেন। তিনি কিছুতেই মেয়েকে বের হতে দেবেন না। ওদিকে আদিবাও ভাইকে দেখে প্রায় উন্মাদ দশা। সে বেরিয়ে আসবেই। এক হাত ধরে টানছিলেন চাচা, অন্য হাত ছিল ভাইয়ের মুঠোয়। সেই চরম মুহূর্তে... আমি আসলে ঠিক বুঝতে পারিনি আমি কী করে ফেললাম!'

নত হয় আসিফ, সৌম্যর পিঠের পিছনে নিজেকে লুকাতেই একটু সরল যেন। সবাই চেয়ে, আদিবার মাথায় একটা হাত রেখে দাঁড়িয়ে তৃপ্তি, আলগোছে তার চুলের ভিতর আঙুলের ভাঁজ চালাচ্ছে। আর এক দৃষ্টে দেখছে আসিফকে। ছেলেটা কাচুমাচু, অথচ চলন বলনে দৃঢ়তার ছাপ স্পষ্ট! আদিবা কাহিল, দুর্বল, মলিন হয়ে বসে, মাথার ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে ব্যথায়, গায়ের দুর্বলতায় সোজা হয়ে বসে থাকা দায়, তবু কণ্ঠস্বর ছাপিয়ে ভেঙেচুরে বেরিয়ে আসে তিক্ত কথার বাক্যবাণ,

'আসিফ ফুলদানি দিয়ে মাথায় আঘাত করলেও লোকটা মরেনি। তবে যদি মরে যেত...' কথাটি সে শেষ করল না, কিন্তু তার চোখের চাহনি আর দীর্ঘশ্বাসে স্পষ্ট - পিতার উপর কতখানি ক্ষোভ পোষা ওর ছোট্ট হৃদয়।

সৌম্য এবার উমেদ মির্জার হাত ধরে মিনতি করল, 'বড় বাবা, আসিফ ইচ্ছে করে কিছু করেনি। ও শুধু পরিস্থিতি সামলাতে চেয়েছিল। আজ ওর জন্যই আমি আমার স্ত্রীকে ওই জাহান্নাম থেকে ফিরিয়ে আনতে পেরেছি। আমি তোমার কাছে হাত জোড় করছি, তুমি আমাদের ছায়া হয়ে দাঁড়াও। আজ যদি আমার বাবা বেঁচে থাকতেন...'

সৌম্যর কথায় আইরিন ডুকরে কেঁদে উঠলেন। রেহনুমা তৎক্ষণাৎ আইরিনের হাত শক্ত করে চেপে ধরলেন, যেন বলতে চাইলেন- শান্ত হ। সবার চোখ এখন উমেদ মির্জার দিকে। তিনি কি এই ভেঙে যাওয়া সম্পর্কটাকে আবার জোড়া দেবেন? এই বিপন্ন দম্পতিকে আশ্রয় দেবেন নিজের ছাদে? পুরো হলঘর এক বিশাল উত্তরের অপেক্ষায় থমকে রইল।

★★★

সুবিশাল প্রসারিত আকাশটার দিকে নির্নিমেষ চেয়ে রইল বিকেল। নিচের তলায় ঘটে যাওয়া এতক্ষণের র*ক্তক্ষয়ী নাটক আর তিক্ত কথোপকথনগুলো এক ভারী পাথর হয়ে চেপে আছে ওর বুকে। অসহ্য এক একাকীত্বে আকাশকেই সাক্ষী মেনে সে অস্ফুটে প্রশ্ন ছুঁড়ল, 'কোথায় আপনি?'

'তোর ঠিক পেছনেই।'

হঠাৎ পরিচিত কণ্ঠস্বরটা কানে আসতেই বিকেল চমকে পেছন ফিরতে গেল। কিন্তু অন্যমনস্ক থাকায় শরীরের ভারসাম্য সামলাতে পারল না সে; আচমকা এই শব্দে কেঁপে উঠতেই হাতের ফোনটা ফসকে গেল। ঠিক যখন ফোনটা রেলিং গলে নিচে পড়তে যাচ্ছিল, তখনই রোদ্দুর ক্ষিপ্রগতিতে এগিয়ে আসে। এক ঝটকায় সে বিকেলকে সপাটে নিজের বলিষ্ঠ হাতের মুঠোয় আটকে ফেলল।

বিকেলের টালমাটাল অবস্থা দেখে রোদ্দুরের কণ্ঠস্বরে শাসন আর উদ্বেগের সংমিশ্রণ ফুটে উঠল। সে ধমকের সুরে বলে, রেলিংয়ের এত কাছে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? একটু এদিক-ওদিক হলেই তো বড় কোনো বিপদ ঘটে যেত!'

'আমার ফোন..' গুঙিয়ে উঠে বেচারি।

'গেছে ওটা।' বলতে বলতে নিচের দিকে তাকাল রোদ্দুর। একটা বিশ ওয়াটের শক্তিশালী লাইট লাগানো মেইন দরজার সামনে। সেটার সুস্পষ্ট আলোয় আলোকিত থেতলে ভেঙে যাওয়া ফোনখানা। ঠোঁট দিয়ে আফসোসের একটা সুর তোলে রোদ্দুর, মাথা নাড়তে নাড়তে বলে ওঠে, 'কি যে করিস তুই...'

বিকেল দেখতে চাইলো।

'একদম না, এদিকে আয়।' বলে টেনেহিঁচড়ে আনলো ওকে।

বিকেলের ভীষণ কান্না পেল।

ভীষণ! বড় শখের ফোন ওটা, এমনিতেই মনটা কেমন হাহা হু হু করছে। তার উপর এমন এক্সিডেন্ট! মুডের গুষ্টির শষ্টি...

ওকে দাঁড়া করিয়ে নিজে রেলিংয়ে ভর দিয়ে দু'হাত ভাঁজ করে দাঁড়ায় রোদ্দুর। নির্নিমেষ চোখে চেয়ে চেয়ে দেখতে থাকে সামনে দাঁড়ানো ভীষণ অশান্ত মেয়েটির অস্থির মুখখানির দিকে। এভাবেও সুন্দর লাগে ওকে। যখন কাঁদে, তখনও...যখন হাসে তখনও! আর রাগলে তো পুরাই মাখোওওওন!

বিকেলের চোখের টলটলে জলের দিকে তাকিয়ে রোদ্দুর মনে মনে একবার মাশা আল্লাহ পড়ে নিল। মেয়েটাকে এই সিক্ত মায়ায় বড্ড অপার্থিব লাগে। নিজেকে সামলে নিয়ে সে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, 'নিচে শেষমেশ কী সিদ্ধান্ত হলো?'

বিকেলের মন পড়ে আছে জানাযা হওয়া ফোনটার দিকে। তবু সে কিছুটা উশখুশ করে অস্থির কণ্ঠে জবাবে বলল, 'রাখবে বলেছে, তবে অল্প কয়েকদিনের জন্য।'

রোদ্দুর ভ্রু কুঁচকে শুধাল, 'কাকে?'

'ওই ছেলেটা, আসিফ। ওকে রাখবে।'

'ওহ।'

বিকেল আকাশের দিকে তাকিয়েই আবার বলল, 'আদিবার বাসা থেকে যদি কেউ চড়াও হয়, তখন কী করা হবে সেটা বড় বাবা এখনো স্পষ্ট করে জানাননি। তবে আপাতত ওদের আশ্রয় দিতে রাজি হয়েছেন তিনি।'

'সৌম্য আর ওর বউকেও তো রাখবেন, তাই না?'

'মনে হয়।'

'মনে হয় কেন?' রোদ্দুরের কণ্ঠে কৌতুক।

বিকেল একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, 'এ বাড়ির কর্তাদের মতিগতি কখন কোন দিকে ঘোরে, তা কি কেউ আগে থেকে বলতে পারে?'

রোদ্দুর মৃদু হাসল, 'তা অবশ্য ঠিক বলেছিস।'

পরক্ষণেই বিকেলের মুখের দিকে একটু ঝুঁকে পড়ে সে শুধাল, 'আর এ বাড়ির মেয়েদের কি নিয়ম করে ঘন ঘন মুড সুইং হয় না?'

বিকেল মুখ নামিয়ে সংক্ষেপে বলল, 'জানি না।'

রোদ্দুর ওর চোখের কোণে জমে থাকা জলের বিন্দুটা লক্ষ্য করে নরম গলায় জিজ্ঞেস করল, 'কাঁদছিস কেন?'

'জানি না।'

'কিছু কি হয়েছে?'

'জানি না।'

রোদ্দুর এবার একটু হেসেই ফেলল, 'জানিসটা কী তবে?'

বিকেল এবার ধরা গলায় আবারও সেই একই উত্তর দিল, 'তাও জানি না।'

বলতে বলতে ভ্যা করে কেঁদেই ফেলল মেয়েটা। রোদ্দুর চমকায়, আবার ভালোও লাগে। আদুরে গাল দুটো ফুলে উঠেছে। টসটস করছে। টেনে লাল করে দেওয়ার জন্য হাতটা নিশপিশ করছে তার। তবে তা না করে একটু কাছাকাছি টেনে নিলো মেয়েটাকে এবং লক্ষ্য করল, ওর শরীরটা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে এসেছে।

রোদ্দুর চোখ পাকাল সঙ্গে সঙ্গে, 'সোয়েটার ছাড়া ছাদে উঠছিস কেন?'

বিকেল ঠোঁট কামড়ে কান্না আঁটকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। এবং মনে মনে উত্তরটা গুছিয়েও নিচ্ছে বোধহয়। বুঝতে পেরে রোদ্দুর ফটাফট বলে উঠে আবারও, 'আবার জানি না বললে ধাক্কা দিয়ে এখান থেকে ফেলে দিবো।'

বিকেল মুচড়ে ওঠে। গোঙায়। একা একাই এগিয়ে এসে ভীষণ সাহসে রোদ্দুরের বুক পাজরে ছোট্ট খরগোশ ছানার ন্যায় ঢুকে যাওয়ার জন্য আপ্রাণ কসরত করে। রোদ্দুর অবাক হয়, ঠোঁটের কোণে ফুটেও উঠে একটা নাই নাই হাসি। মেকী রাগী স্বরে শুধায়, 'না নিবো না। তুই আমার একটা কথা শুনিস না। সর।' বলে মৃদু ধাক্কায় মেয়েটাকে সরিয়ে দিতেই ফুঁপিয়ে উঠে বিকেল।

'কোনটা শুনি না?' জানতে চাইলো ভাঙা স্বরে।

রোদ্দুর হাসি চেপে ফিচেল গলায় বলে, 'জানি না।'

'তাহলে বললে কেন, আমি তোমার কথা শুনি না?'

'তাও জানি না।'

'রোদ ভাইয়া!!'

'সেটা আবার কে? জানি না।'

'আয়ায়ায়ায়া...' করে কান্না জুড়ে দিলো মেয়েটা। রোদ্দুর হেসে ওঠে খলখল সুরে। টেনে নেয় বাহুডোরে, 'আয় এদিকে, কিউটের ডিব্বা।' তারপর শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ওকে। বিকেল মিশে যায়...বলিষ্ঠ পুরুষের শক্ত দেহখানির জমিনে, হৃদয়ের আঙিনায় মিশিয়ে দেয় নিজের সবটুকু উত্তাপ, শুষে নেয় ওঁম, ছড়িয়ে দেয় প্রেমের ঘ্রাণ.... ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে সে। রোদ্দুর ও নিশ্চুপ। শুধু অনুভব করছে এই মুহূর্তটাকে। ধীর লয়ে বাতাস বয়ে চলে। অথচ দু'জনার মধ্যিখানিতে ঢুকবার এক চিলতে ফাঁক ও নেই। হয়তো ব্যর্থ হয়েই বাতাস গতিপথ বদলে। উত্তরের বদলে এবার দক্ষিণে বইতে শুরু করে।

কিছু সময় কেটে যায় এই আবেশের জের ধরেই।

তারপর একসময় নীরবতাকে ভাঙতেই নড়েচড়ে ওঠে ছোট্ট প্রাণটা। রোদ্দুর হাতের বাঁধন হালকা করে। সরে না বিকেল, মাথাটা বুক থেকে তুলে কাঁধের উপর ফেলে, কানের কাছে মুখ নিয়ে বিড়বিড়ায়, 'ভালো লাগছে না জানো। কিছুই ভালো লাগছে না আমার।'

'ফোনের জন্য?' জানতে চাইলো রোদ্দুর, 'কিনে দিবো। আমি আছি।'

একদণ্ড চুপ থেকে শুধায় ও, 'সেটা না।'

'তবে?'

আবারও একখন্ড সময়কে মৌনতার নামে গ্রহণ করে ও। ইতস্তত করছে। বলবে কি না...কি রিয়েকশন হবে ওর? ভালো কি খারাপ? ঘর বাড়ি ভর্তি ঝামেলা, ঝঞ্চাল...ওর জন্য আরও না বেড়ে দাঁড়ায়।

অপেক্ষায় ক্লান্ত হয়ে রোদ্দুর বলে ওঠে ফের, 'কি হলো? বলো, কি বলতে চাইলে...?'

'কিছু না।'

মাথা তোলে বিকেল, দু'হাতে গলা জড়িয়ে ধরে আছে তখনো, হঠাৎ বলে ওঠে, 'এই সময় গুলো দীর্ঘ হোক।'

রোদ্দুর হাসে, 'আমিন।' বলে সেও।

বিকেল ও হাসল। কিছুটা সরে এল। রেলিংয়ে দুই হাত রেখে ভর দিয়ে দাঁড়াল। আকাশের বুকজুড়ে নিকষ কালো আঁধারের চাদর মোড়ানো। সেই কালচে নীলের গায়ে দু-একটা তারা রূপালি বিন্দুর মতো ফুটে উঠেছে। কোনো চাঁদ নেই তবুও এক অদ্ভুত প্রশান্তি মাখানো সেই শূন্যতায়।

বিকেল দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডাকল, 'শুনুন।'

রোদ্দুর ওর ঠিক পাশেই এসে দাঁড়াল। পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরিয়ে নিয়ে নির্লিপ্ত গলায় বলল, 'হুঁ?'

বিকেল আকাশের আঙুল তুলে বলল, 'চাঁদ ছাড়াও আকাশটা আজ কত সুন্দর, দেখেছেন? চারদিকে কোনো জোছনা নেই, রূপালি মায়া নেই, তবুও আকাশটা নিজের মতো করে কত পূর্ণ!'

রোদ্দুর ধোঁয়া ছেড়ে বিকেলের দিকে একবার দেখে। বিকেলের কণ্ঠে লুকিয়ে থাকা বিষণ্ণতাটুকু ওর নজর এড়ালো না। বিকেল আবার বলল, 'আসলে আমাদের জীবনে অনেক কিছু না থাকলেও জীবনটা সুন্দরই থাকে। একটা চাঁদ না থাকলে যেমন আকাশের খুব একটা ক্ষতি হয় না, তেমনি কোনো একজন মানুষ জীবনে না থাকলেও হয়তো বাকি সৌন্দর্যগুলো ঠিকই টিকে থাকে।'

রোদ্দুর সিগারেটটা ঠোঁটে চেপে ধরে হাসল। তারপর খুব নিচু স্বরে বলল, 'তোর ওই কাব্যিক হিসেবে একটা বড় ভুল আছে, বিকেল।'

বিকেল অবাক হয়ে তাকাল। রোদ্দুর আকাশের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করল, 'আকাশে কোটি কোটি তারা ফোটে, ভোরে সূর্য ওঠে, মেঘেরা পাল উড়ায়- সবই সত্যি। কিন্তু আকাশের সব সৌন্দর্যের অহংকার তো ওই একলা চাঁদটার কাছেই বাধা। চাঁদহীন আকাশ দেখতে হয়তো সুন্দর, কিন্তু তাতে কোনো মায়া থাকে না। সেখানে শুধু অন্ধকার থাকে।'

সে বিকেলের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে যোগ করল, 'জীবনটাও ঠিক তেমনি। হাজারটা প্রাপ্তি আর শত মানুষের ভিড়েও জীবনের সবটুকু রূপ আর লাবণ্য কেবল একজন মানুষের নামেই লেখা থাকে। সে পাশে না থাকলে জীবন চলে ঠিকই, কিন্তু সেই জীবনে আর মায়া থাকে না। কেবল এক অন্ধকার শূন্যতা বয়ে বেড়াতে হয়।'

বিকেল স্তব্ধ হয়ে শুনল। রোদ্দুর ওর দিকে আরেকটু ঝুঁকে বলল, 'আকাশ থেকে চাঁদ হারিয়ে গেলে সেটা যেমন স্রেফ একটা কালো ক্যানভাস হয়ে যায়, আমার জীবন থেকে তুই হারিয়ে গেলে এই রোদ্দুরও নিভে যাবে। মনে রাখিস, সব সৌন্দর্যের দাবিদার সবাই হয় না, বিকেল। আমার জীবনের সবটুকু সৌন্দর্যের দাবিদার শুধু তুই।'

গাঢ় টানে লম্বা ধোঁয়া ছাড়ে রোদ্দুর, স্তব্ধ বিকেলকে লক্ষ্য করে আবার উচ্চারণ করে, 'শুধুই...তুইইই...'

বাতাসে সিগারেটের নীলচে ধোঁয়া আর রোদ্দুরের কথার মায়া মিলেমিশে একাকার হয়ে ছড়িয়ে পড়ল। বিকেল আর আকাশ দেখল না, সে অপলক চেয়ে রইল সেই মানুষটার দিকে, যার আকাশে সে নিজেই এখন একমাত্র ধ্রুবতারা।

'কি দেখিস হা করে? মশা ঢুকবে।' বলে রোদ্দুর সিগারেটটা ফেলে দিয়ে খকখক শব্দে কেশে উঠল।

বিকেলের ভ্রম ভাঙে। ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠে ও, 'কি হলো?'

বুকে হাত চেপে রোদ্দুর শুধালো, 'ব্যথা করছে।'

'কোথায়?'

'এইখানে।' বলে ওর একটা হাত টেনে চেপে ধরল বুকের ঠিক মাঝখানটায়, যেখানে হৃদপিণ্ড ভালোবাসার ছন্দ তোলে নিয়মিত।

বিকেল ভ্রু কুঁচকে, অস্থির, ভয়ার্ত চোখ মেলে বোঝার চেষ্টা করতেই তাকে অবাক করে দিয়ে গাঢ় স্বরে গেয়ে ওঠে পাগল ছেলেটা,

'বুকের মাঝে চিনচিন করে

জানো না কি এমন পুড়ে।

এভাবে দূরে থেকো না...'

বিকেল থতমত খায়, ড্যাবড্যাবে চোখজোড়ায় নেমে আসে পূর্ণ বিস্ময়, পরমুহূর্তেই গ্রাস করে এক মুঠো লজ্জা রাঙা আভা....

হাত সরিয়ে নিতে চাইলে পারে না।

বুঝে যায়, সবটাই ভান তবে? অসভ্য ছেলে....

রোদ্দুর সব ক'টি দাঁত বের করে হেসে গেয়ে ওঠে পরের লাইন গুলি,

'তোমার মাঝে ডুবে ভাসি,

নিজের থেকে আরও বেশি,

ভালোবাসি কেন বুঝো না....'

তাজ্জব চোখে তাকিয়ে রয় বিকেল। জবাব নেই ঠোঁটে, ভালোবাসা এত সুন্দর, এত রঙে রাঙায় জীবনটাকে...অবিশ্বাস্য এবং অজানা ছিল। ভাগ্যিস, প্রেম এসেছিল...ওর জীবনেও! বসন্তের ঘ্রাণে ম ম করেছিল হৃদয় আঙিনা, জানালা খুলে সাদরে গ্রহণ করেছিল ও...মুঠোভরা ভালোবাসা...

আলো-আশা, এক গুচ্ছ নিরাশা;

কাছের আসা সন্ধিক্ষণ;

অল্পস্বল্প মিলন,

যদিও শেষটায় লেখা ছিল,

সেই প্রেমেরই নির্বাসন....!

_________

(বর্তমান)

'আপনার বয়সটা কত ছিল তখন?'

ফিচেল স্বরের ছেলেটা বড়ই অস্থির, একটার পর একটা প্রশ্ন করেই যাচ্ছে। ভাবনার গতিপথ থামাতে বাধ্য হলো শেষে। হারিয়ে গিয়েছিল ও, সোনালি অতীতে, যেখানে রোদ্দুর নামের এক ছটাক আলো ছিল তার জীবনে। র:ক্ত যেমন মিশে থাকে শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে...সেভাবেই! নেশা হয়ে উঠেছিল একসময়। তারপর?

গল্পটা করুণের থেকেও করুণ...

'বলুন না মিস বি...'

আবারও জিজ্ঞেস করে ছেলেটা।

বিকেল মৃদু শ্বাস ফেলে, 'মেয়েদের বয়স জানতে নেই।' বলে উঠে পড়ল চেয়ার থেকে। এ বছর স্নো-ফলটা পূর্বের সব রেকর্ড ভাঙবে বলেই মনে হয়। ফায়ারপ্লেসের আগুন কমে আসছে। আরও কিছু লাকড়ি দিতে হয়। সেটার বন্দোবস্ত করতেই বিকেল ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ওখান থেকেই শুধালো, 'আর একটা কথা বার বার ভুলে যাচ্ছ তুমি। আমি মিস বি নই, মিসেস বি...'

হালকা সবুজ রঙা চোখের উসকোখুসকো লালচে চুলের ছেলেটার দিকে তাকিয়ে শক্ত গলায় বলে ওঠে পুনরায়, 'মিসেস বি...গট ইট?'

ছেলেটা হাসল জবাবে। বিকেল মৃদু শ্বাস ফেলে নিজের কাজে মন দেয়। হিসেব কষে, কতদিন দেখা হয় না সেই মানুষটিকে, যাকে এক দন্ড না দেখতে পেলে হৃদজমিনে তোলপাড় শুরু হতো একদিন....

বিকেল চোখ বুঁজে বিড়বিড় করে আওড়ে, 'আট বছর সাত মাস সতেরো দিন প্রিয়তম...!'

(চলবে)

______

বলেছিলাম না, বি রেডি এভ্রিওয়ান।

অনেক উথান-পতন শুরু হবে? শুরু হয়েই গেল।

গল্পটা দু'ভাগে চলবে এখন। এক ভাগে অতীত চলবে, আরেক ভাগে বর্তমান...সবটাই বুঝবেন ধীরেসুস্থে ইনশাআল্লাহ। কারা কারা ইনজয় করছেন, জানাবেন, প্লিজ!

নোট- ৯০০ রিয়েক্ট, ২০০ কমেন্ট করে দিলেই নেক্সট পার্ট পেয়ে যাবেন।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন