#প্রেমের_নির্বাসন - (৩৬)
লেখনীতে - #মৃধা_মৌনি
(নোটটা পড়ে নিবেন সবাই)
_______________
ঘরভর্তি জমাটবদ্ধ নীরবতা চূর্ণবিচূর্ণ করে এগিয়ে এল দিশা। দু’হাতে ফ্রকটা সামান্য উঁচিয়ে ধরে গটগট পায়ে সামনে আসতেই তার কণ্ঠে ঝরে পড়ল তীব্র শ্লেষ মাখানো উক্তি, 'একলা পেয়ে জুলুম করা হচ্ছে! কী সাহস সবার! এই নাকি ফ্যামিলি?'
লতা তখনো বিকেলের চুল মুঠো করে খামচে ধরে আছেন। দিশা নিজের ধারালো নখ দিয়ে লতার হাতটা সজোরে চেপে ধরতেই তিনি ব্যথায় ককিয়ে উঠলেন।
'আহ্! লাগছে আমার!' লতা আর্তনাদ ছাড়েন।
দিশা দাঁত কিড়মিড় করে পালটা প্রশ্ন ছুড়ল, 'ওর লাগছিল না? অন্যকে আঘাত করার সময় খুব আমোদ হয়, আর নিজের বেলায় বুঝি খুব লাগছে? হু?'
লতা ঝামটা দিয়ে বলে উঠলেন, 'দুইদিন আগে এসে খুব তো দরদ উথলে পড়ছে! আমরা ওকে ছোটবেলা থেকে মানুষ করেছি। ভালোও যেমন বেসেছি, শাসন করার অধিকারও আমাদের আছে।'
'এই ডাইনি শাসন করার কোনো অধিকার তোমার নেই,' দিশার কণ্ঠে রীতিমতো আগুন ঝরে পড়ে, 'ওর বাপ বেঁচে আছে, সে বুঝবে। এখন সরো এখান থেকে!'
কথাটা বলেই এক ধাক্কায় লতাকে সরিয়ে দিল সে। লতা পুরোপুরি হতভম্ব, আইরিনের চোখে রাজ্যের মুগ্ধতা, কিন্তু বিকেল? সে পাথরের মতো নিরুত্তাপ। তার ভেতর কোনো অনুভূতির লেশমাত্র নেই। দিশা বিকেলের বাহু ধরে টেনে বলল, 'ওঠ, এই মেয়ে, ওঠ বলছি!'
বিকেল যান্ত্রিকভাবে উঠে দাঁড়াল। দিশা রুক্ষ দৃষ্টিতে লতার দিকে তাকিয়ে শেষ সতর্কবাণী দেওয়ার ভঙ্গিমায় ছোঁড়ে, 'ওসমানের পরিবারে এতদিন কেউ ছিল না বলে যা খুশি করেছ। এখন থেকে সেসব ভুলে যাও। আমাদের ঘরের কাহিনি আমরাই বুঝে নেব। নিজের সীমার মধ্যে থাকতে শেখো।'
আইরিনকে লক্ষ্য করে সে ঝংকার দিয়ে উঠল, 'আর তুমিও! চোখের সামনে মারছে অথচ হাবাভাতের মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছ!'
কথা শেষ করে বিকেলের বাহু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ঘর থেকে বেরিয়ে এল দিশা। পেছন থেকে লতার গর্জানি শোনা গেল, 'দুই দিনের বৈরাগী এসে ভাতের মার গালানো! তোকেও দেখে নেব আমি!'
যেতে যেতেই দিশা জবাব দিল, 'তোর সামনেই বসে থাকবনে সারাদিন, খুব ভালো করে দেখে নিস তখন!'
এরপর বিড়বিড় করে একটা ভয়ানক গালি ছুড়ে দিল সে। গালিটা বিকেলের কানে যেতেই মেয়েটা প্রথমবারের মতো মুখ তুলে দিশার দিকে দেখল। তাই দেখে দিশা ভ্রু কুঁচকে শুধায়, 'কী দেখছ? ওইরকম নিচ লোকেদের জন্য এই গালিই পাওনা। ভদ্রলোকের সঙ্গে ভদ্রতা মানায়, পিশাচের সঙ্গে নয়।'
বিকেলকে এক প্রকার টেনেই নিজের ঘরের ভেতর নিয়ে এল দিশা। পা রাখতেই দিশার মনে হয়, এ যেন কোনো বসতঘর নয়, বরং একটা ছোটখাটো রণক্ষেত্র। হাকলা ধূলো আর অযত্নের একটা আস্তরণ পড়ে আছে চারদিকে। ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে প্রসাধন সামগ্রীগুলো শ্রীহীনভাবে ছড়ানো-ছিটানো। ওয়ারড্রবের কয়েকটা ড্রয়ার আধখোলা হয়ে আছে, যেখান থেকে কাপড়ের কোণা ঝুলে থাকতে দেখা যাচ্ছে। বেডসাইড টেবিলের ওপর স্তূপ হয়ে আছে পুরোনো খবরের কাগজ আর দরকারি-অদরকারি কতগুলো জিনিস। বিছানার একপাশে এক গাদা জামাকাপড় দলা পাকিয়ে রাখা, আর পড়ার টেবিলটা তো রীতিমতো কুরুক্ষেত্র!
দিশা চারদিকে তীক্ষ্ণ নজরে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। তার চোখেমুখে বিরক্তি আর বিষাদ মিলেমিশে একাকার হয়।
'এটা তোমার ঘর নাকি কোনো ধ্বংসাবশেষ! কী হাল করে রেখেছ বলো তো নিজের?' দিশার কণ্ঠে প্রকাশ পায় চাপা ধমক।
বিকেল যেন নিজের অস্তিত্ব নিয়ে লজ্জিত। মেঝের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু স্বরে উত্তর দিল সে, 'আমি আসলে বরাবরই একটু অগোছালো স্বভাবের। তৃপ্তিই সবসময় সব টেনেটুনে গুছিয়ে রাখত।'
দিশা ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটিয়ে তুলে, আলতো শ্লেষ মিশিয়ে বলে, 'ঘর তো চমৎকার গুছিয়ে রাখত সে, কিন্তু তোমার জীবনটা একদম আষ্টেপৃষ্ঠে অগোছালো করে দিয়ে চলে গেছে। কী দারুণ ব্যাপার, তাই না?'
বিকেলের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। মেয়েটার ভেতরে একরাশ বিষণ্ণতা দলা পাকিয়ে উঠছে। দিশা গলার সিল্কের স্কার্ফটা আলগোছে খুলে চেয়ারের হাতলে রাখে। তারপর শক্ত করে বিকেলের হাত ধরে তাকে সেই চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে নিজেই লেগে পড়ল ঘরের কাজে। কোনো কথা না বাড়িয়ে বিছানার পুরোনো চাদরটা এক হ্যাঁচকায় টেনে তুলে সে। বালিশের কভারগুলো খুলে মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলতে ফেলতে কথা চালিয়ে যেতে লাগল।
'শোনো, দরজায় দাঁড়িয়ে যতটুকু শুনলাম, তাতে মোদ্দা কথা এই দাঁড়ায়- ওই লম্বা ছেলেটা তোমাকে মাঝরাস্তায় একা ফেলে দিয়েছে। ভালোবাসার দোহাই দিয়ে সে তোমার ওপর আধিপত্য বিস্তার করল, তোমার ব্যক্তিগত জীবনে ঢুকে পড়ল, আর কাজ হাসিল হতেই তোমার কাজিনকে বগলদাবা করে পগারপার হলো। হিসেবটা তো এই, নাকি অন্য কিছু?'
বিকেলের শরীরটা অস্বস্তিতে কাঁটা দিয়ে ওঠে। দিশার কথাগুলো তীরের মতো সরাসরি এসে বিঁধছে ওর বুকে। প্রতিবাদের কোনো ভাষা নেই তার কাছে। অবরুদ্ধ কান্নার চাপে গলাটা বুজে আসছে। চোখের কোণে জমে থাকা লোনা জলটুকু হাতের উল্টোপিঠে মুছে নিয়ে আবারও শান্ত হওয়ার চেষ্টা করল সে।
দিশা তার দিকে তাকিয়ে একটা গম্ভীর নিঃশ্বাস ফেলে। তারপর বিছানায় নতুন চাদর পাততে পাততে বলল, 'জানো, আমাদের মেয়েদের সবচেয়ে সুন্দর দিক কোনটা? আমরা চাইলে একদম অচেনা-অজানা একজনের কষ্টের জন্যেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা চোখের জল ফেলতে পারি। আমাদের হৃদয়টা মোমের মতো বিগলিত হতে জানে। আবার সবচেয়ে হতাশাজনক দিক কোনটা জানো? নিজের চোখে প্রতারণা দেখেও আমরা সেই প্রতারকের বিরুদ্ধে একটা শক্ত কথাও বলতে পারি না। আমরা অন্যকে ভালোবাসতে গিয়ে নিজেদের সম্মান করতে ভুলে যাই। নিজের চেয়ে অন্য কাউকে বড় করে ভাবাই আমাদের কাল হয়ে দাঁড়ায়।'
বিকেল ধরা গলায় বলল, 'আমার এখনো কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না। উনি আমার সাথে এতটা নিষ্ঠুর, এতটা অমানুষ কীভাবে হতে পারলেন?'
দিশা চাদরের কোণাগুলো ম্যাট্রেসের নিচে গুঁজতে গুঁজতে শান্ত স্বরে জবাবে বলে, 'কীভাবে এত নিশ্চিত হচ্ছ তুমি? তোমার বাবাকেই দেখো- আমার কাছে তোমার মা সম্পর্কে কতরকম জঘন্য কথা যে বলেছে! কত নিকৃষ্ট কথাবার্তা শুনিয়েছে আমাকে পটাতে। আমি সব বুঝতাম। অথচ তিনি একবারও ভাবলেন না যে, মানুষটা আজ আর নেই, সে মৃত। তার নামে অপবাদ গেয়ে আর লাভ কী?'
বিকেল আবারও স্তব্ধ হয়ে গেল।
দিশা বলল, 'একটা কথা মনে রেখো বিকেল, মেয়েমানুষের নিজের বলতে শুধুমাত্র তার নিঃশ্বাসটাই আছে। এই নগ্ন সত্যটা যত তাড়াতাড়ি স্বীকার করে নেবে, দেখবে জীবনের অর্ধেক জটিলতা এক নিমিষেই হালকা হয়ে গেছে।'
মেয়েটা পাথরের মতো বসে রয়। দিশা নতুন বালিশের কভারগুলো ঠিকঠাক করে গুঁজে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। বিকেলের চোখে চোখ রেখে বলে, 'আমার সাথে কি খুব অস্বস্তি হচ্ছে? আমাকে কি তোমার মায়ের মতো মনে হচ্ছে? শোনো, মা আসলে কারো বিকল্প হয় না। আমাকে জাস্ট একজন সাধারণ মানুষ ভাবো, যে তোমার ভালো চায়। একজন শুভাকাঙ্ক্ষীই ধরো আমাকে।'
বিকেল মুখ তুলে দিশার চোখের দিকে চাইল। দিশা ওর চোখে চোখ রেখে আলতো করে হাসে। পরক্ষণেই হাসিটা মুছে ফেলে বেশ সিরিয়াস হয়ে জিজ্ঞেস করল, 'এখন বলো, তুমি আসলে কী চাও?'
'কী চাইব?' বিকেলের কণ্ঠে জড়তা আর অসহায়ত্ব মাখানো। নিজের কোলের ওপর রাখা হাতদুটো সে অস্থিরভাবে মোচড়াচ্ছে।
'তোমার কি কিছুই চাওয়ার নেই? তোমার সাথে এত বড় একটা অন্যায় হয়ে গেল, সব হারিয়ে তুমি কি স্রেফ হাত গুটিয়ে বসে থাকবে? কিছু বলবে না? কিছু করতে ইচ্ছা করে না?'
এ কথায় মাথা নিচু করে গভীর ভাবনায় ডুব দিল সে। ঘর গোছানো শেষ করে দিশা তার ঠিক সামনে এসে দাঁড়াল। আবারও তাগাদা দিয়ে বলল, 'শান্ত হয়ে ভাবো। ভেবে বলো কী চাও তুমি। কথা দিচ্ছি, আমি তোমাকে সাহায্য করব।'
'কিন্তু আপনি কেন আমাকে হেল্প করবেন? কারণটা কি?' নিজের অজান্তেই, অবচেতনের তাড়নায় মুখ ফুঁটে এহেন প্রশ্ন করে বসল মেয়েটা।
দিশা এক মুহূর্তের জন্য পাথরের মূর্তির মতো থমকে গেল। ঘরের ভেতর নেমে এল নিস্তব্ধতা। পরমুহূর্তেই হো হো করে প্রাণখোলা হাসিতে ফেটে পড়ে সে। বিকেল অবাক চোখে চেয়ে।
হাসি থামিয়ে দিশা এগিয়ে এল বিকেলের দিকে। তার হাত দুটো আলতো করে ধরে টেনে নিয়ে বিছানার নরম গদিতে বসাল। এরপর জানালার ভারী পর্দাগুলো এক টানে সরিয়ে দিয়ে শার্সিগুলো হাট করে খুলে দিল সে। খোলা জানালা দিয়ে আসা ঝাপটা বাতাসে পর্দাগুলো যখন উড়ছে, তখন সেগুলো ঠিকঠাক করতে করতে দিশা উত্তরের ঝুলি খুলল।
'সৎ মা আর সন্তানের মধ্যকার ওই যে একটা পুরনো আমলের বিভীষিকাময় কনসেপ্ট আছে না? দয়া করে ওটা থেকে আগে বেরিয়ে আসো তুমি। আমি তোমার সৎ মা-ও নই, আবার আপন মা হওয়ার দাবিও রাখি না। আমি জাস্ট এমন একজন মানুষ যার এই মুহূর্তে মনে হয়েছে, তোমার পাশে থাকাটা খুব জরুরি।'
কথাটা বলেই হঠাৎ ভীষণ চুপ হয়ে গেল দিশা। তার চঞ্চল হাত দুটো স্থির হয়ে এল পর্দার কাপড়ে। ঘরের ভেতর আবারও নেমে আসে ভারী নীরবতা। বিকেল উৎসুক হয়ে কান পেতে রইল, সে বুঝতে পারছে ওর ভেতরে আরও অনেক কিছু বলার আছে। বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল সে।
বিকেলের দিকে না তাকিয়েই অস্ফুট স্বরে বলল, 'আজকের এই যে জায়গায় তুমি দাঁড়িয়ে আছ, ঠিক এই একই মোহনায় একদিন দিয়াশাও দাঁড়িয়ে ছিল।'
বিকেল ভ্রু কুঁচকে অবাক হয়ে আওড়ায়, 'দিয়াশা?'
বিকেলের প্রশ্নে দিশা জানালার দিক থেকে ঘুরে দাঁড়াল। তার ঠোঁটের কোণে একটা ম্লান হাসি, মেয়েটার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, 'আমার পুরনো নাম। পুরো নাম ছিল দিয়াশা হাওলাদার।'
বিকেলের বিস্ময় যেন বাঁধ মানছে না। সে নিজেকে সামলাতে না পেরে সরাসরিই প্রশ্ন করে বসল, 'আপনাকেও কি কেউ ঠিক এভাবেই ঠকিয়ে....?'
'হুম, ছিল... ঠকিয়েছিল! জীবনের বড় একটা ধাক্কা খেয়ে তারপর আমি এই দিয়াশা থেকে আজকের দিশা হয়েছি। এখন আমাকে দেখো তো একবার- এই যে আমি দাঁড়িয়ে আছি তোমার সামনে, আ'ম সেক্সি অর নট?'
এমন উদ্ভট কথা দিশার, না চাইতেও ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফোঁটে মেয়েটার। তাই দেখে অস্থির হয়ে ওঠে দিশা, বলে বসে, 'কি হলো, বলো না? হট অর নট?'
বিকেল কিছুটা লজ্জা পেয়ে সংক্ষেপে বিড়বিড় করে, 'সুন্দর আপনি।'
দিশা শব্দ করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে, 'হুম! শোনো, আমার জীবনে এখন একটা জিনিসই সবচেয়ে বেশি ম্যাটার করে—মানি! টাকা ছাড়া এই জীবনে আর কোনো হানি নেই। আজকেও এক ব্যাটার প্রেমে প্রায় পড়তে পড়তে শেষ মুহূর্তে নিজেকে টেনে হিঁচড়ে তুলে আনলাম। ওই লোক আমাকে প্রায় বোকা বানিয়েই দিচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই রিয়েলাইজ করলাম—যে মানুষটা এত বছরের পুরনো সম্পর্ক, নিজের সাজানো সংসার, স্ত্রী আর বাচ্চা থাকার পরেও বাইরের নারীতে মজে থাকে, তার কাছে আমি একটা মিস্ট্রেস ছাড়া আর কী? শরীরের নেশা কেটে গেলে আমার অস্তিত্ব কি আর থাকবে? না!'
একটু থেমে আবার বলতে শুরু করে সে, 'গা বেঁচে তো আর টাকা নেব না আমি! তবে সুযোগ বুঝে এই সমাজটাকে একটু ধান্দা করতে অসুবিধে কোথায় বলো? এই যে সব কামুক আর বোকাচোদা পুরুষগুলো চারদিকে ঘুরে বেড়ায়, এদের ট্র্যাপে ফেলে দু-পয়সা আদায় করাই যায়। ওই ব্যাটার একটা ভিডিও করে নিয়ে আসছি। আমাকে গ্রিট করে যখন গাড়িতে তুলছিল, তখন কেমন লেপটে আমার হাতটা চেপে ধরেছিল, দেখবে?'
বিকেলের চোখমুখ থেকে বিস্ময় সরছে না। সে যেন কোনো উপন্যাসের জীবন্ত চরিত্রের সামনে বসে আছে। তার চিরচেনা জগতের বাইরেও যে এমন একটা পৃথিবী আছে, আর সেখানে মানুষের চিন্তাধারা যে এমন বিচিত্র হতে পারে, তা তার কল্পনারও অতীত। সে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল দিশার দিকে।
দিশা আবারও তার ভুবন ভোলানো হাসিটা ছুঁড়ে দিল। হাসতে হাসতেই বিকেলের বিহ্বল চোখের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, 'খুব অবাক হচ্ছ, তাই না? নিশ্চয়ই ভাবছ আমি কেমন মেয়ে! আমার কোনো চারিত্রিক বালাই আছে কি না, এসবই তো ঘুরপাক খাচ্ছে মাথায়? শোনো বিকেল, আমাকে নিয়ে আপাতত মাথা না ঘামিয়ে বরং নিজেরটা নিয়ে একটু ভাবো। কী করবে ঠিক করেছ? কিছু কি চিন্তা করলে?'
শেষ প্রশ্নটা মেয়েটাকে আবারও সেই অসহ্য অন্ধকারের গহ্বরে ঠেলে ফেলে দেয়। ওর উজ্জ্বল মুখটা মুহূর্তেই ফ্যাকাশে আর পাংশুটে হয়ে গেল। আরও মিনিটখানেক সময় নিয়ে নিজের ভেতরের অস্থিরতাটুকু শান্ত করার চেষ্টা করল সে। তারপর খুব নিচু স্বরে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, 'আমি... আমি ওর সাথে একবার কথা বলতে চাই।'
'ওই ছেলের সাথে?' দিশার ভুরু জোড়া কপালে ওঠে। প্রশ্নটা সে ছুঁড়ে দিল বেশ তীক্ষ্ণভাবেই।
বিকেল কথা না বলে শুধু ওপর-নিচ মাথা দোলালো।
'নাম্বার আছে তোমার কাছে?'
'আমার তো ফোনটাই নেই। ফোনটা হারিয়ে গেছে।'
'হারিয়ে গেছে! কীভাবে?'
'জানি না। যে রাতে আপনারা এলেন, সে রাতেই ফোনটা বাসায় রেখে আমি ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলাম। পরে ফিরে এসে আর ওটা খুঁজে পাইনি। এরপর এত সব ঘটে গেল যে, ফোন খোঁজার মতো মন-মানসিকতা আমার ছিল না।'
'অন্য কোনো নাম্বার থেকে কি কল দেওয়ার চেষ্টা করেছিলে?'
'দিয়েছিলাম। কিন্তু নাম্বারটা বন্ধ বলছে,' মেয়েটা হতাশার সুর ধরে।
দিশা নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরল। কিছু একটা গভীর চিন্তা করতে করতে সে কয়েক মুহূর্ত পায়চারি করল ঘরের ভেতর। তারপর বিকেলের সামনে এসে দাঁড়িয়ে আচমকা প্রশ্ন করল, 'তোমার ঘরের দরজা কি সবসময় খোলাই থাকে, নাকি তুমি বন্ধ রাখো?'
'এমনিতে খোলাই থাকে। মাঝে মাঝে ডায়েরি লিখলে বা মন খারাপ থাকলে বন্ধ রাখি।'
'সেদিন রাতেও কি খোলাই ছিল?'
'হ্যাঁ।'
'তাহলে বুঝে নাও, তোমার ফোন এই বাড়িরই কেউ না কেউ সরিয়েছে।'
বিকেল আকাশ থেকে পড়ে, 'কে নেবে! এ বাড়ির মানুষ আমার ফোন নিয়ে কী করবে?'
'তুমি কি এখনো বুঝতে পারছ না বিকেল?' দিশা ওর পিঠের ওপর ঝুঁকে পড়ে প্রায় ফিসফিস করে বলে ওঠে, 'কে চায় না যে ওই ছেলের সাথে তোমার আর কোনো যোগাযোগ থাকুক? কে চায় তোমাকে পুরোপুরি নিঃসঙ্গ করে দিতে? এত বোকা হলে এই দুনিয়ায় টিকবে কীভাবে?'
বিকেল পলকহীন চোখে দিশার দিকে তাকিয়ে রয়। হঠাৎ করেই তার তপ্ত মস্তিষ্কে একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল। চোখের মণি দুটো বড় হয়ে এল তার। গলা চিরে খুব অস্ফুটে একটা নাম বেরিয়ে এল, 'তৃপ্তি?'
দিশা সাথে সাথে সজোরে মাথা নাড়াল, 'যাক! যতটা গোবর ভেবেছিলাম তোমার মাথায়, ততটাও না। ঠিক ধরেছ!'
'আমার বিশ্বাস হতে চায় না! ওরা দুজনই তো আমার সবচেয়ে কাছের ছিল। তৃপ্তি তো আমারই রক্ত...' কথা শেষ হওয়ার আগেই মেয়েটার চোখ থেকে আবার নামে নীরব নোনা নদীর জল।
দিশা এগিয়ে আসে। বিকেলের খুব কাছে বসে নিজের নরম আঙুল দিয়ে ওর চোখের জল মুছিয়ে দিতে দিতে গাঢ় স্বরে বলে, 'আমার যখন এই অবস্থা হয়েছিল, পাশে দাঁড়ানোর মতো কাউকে পাইনি। কাউকে পেলে হয়তো আজকের এই রূঢ় দিশা তৈরি হতো না। দিয়াশা ছিল এই দিশার ঠিক বিপরীত। নরম এক চিলতে মন, দুর্বল হৃদয়ের অধিকারী, অল্প আঘাতেই যে কান্নায় ভেঙে পড়ত। মানুষের কথার তীক্ষ্ণ বাণে বিদ্ধ হওয়া ছিল আমার প্রতিদিনের গল্প। আর আজকের এই দিশাকে দেখছো তো? মুখে কোনো লাগাম নেই, কারো কথার দু-পয়সা দাম দেই না। কে কী ভাবল তাতে আমার কিস্যু আসে যায় না। যা ভালো লাগে, স্রেফ সেটাই করি। কেউ আঘাত দিলে তাকে দুই-তিনগুণ ফিরিয়ে দেই।'
বলতে বলতে একটু থামে সে। বিকেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, 'কিন্তু মনের গহীনে দিয়াশা তো এখনো মরে যায়নি! তাই হয়তো এই হাতটা তোমার চোখের জল মুছিয়ে দিতে উঠল। কান্নাকাটি এবার থামাও। আমাদের সামনে অনেক কাজ...'
বিকেল অবুঝ শিশুর মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে শুধাল, 'কিসের কাজ?'
'তোমার এই তছনছ হয়ে যাওয়া জীবনটাকে নতুন করে সাজানোর কাজ! যারা তোমার সাজানো বাগান ভেঙে দিয়ে অট্টহাসি হাসছে, তাদের চোখেমুখে আফসোস দেখতে চাও না? তুমি কি চাও না তোমার সাফল্যে তারা পুড়ে ছারখার হয়ে যাক? নাকি তারা আজকে জিতেছে বলে আগামীকাল ও জিতবে—এটাই তোমার কাম্য?'
বিকেল প্রত্যুত্তরে কিছুই বলতে পারল না। তার বোবা দৃষ্টি জানালার বাইরে দিগন্তের দিকে নিবদ্ধ রইল।
★★★
'ওয়াফি ঘুমিয়ে পড়েছে?'
ওসমান মির্জা বিছানায় আধশোয়া হয়ে ছিলেন। হাতে সম্ভবত কোনো ম্যাগাজিন বা ফাইল, কিন্তু তার মন সেখানে নেই। স্ত্রীর এমন প্রশ্নে চশমার ওপর দিয়ে একবার তাকালেন তিনি। গম্ভীর গলায় জবাব দিলেন, 'তা জেনে তোমার কাজ কী? তুমি ফিরতে তো আরও সময় নিতে পারতে।'
দিশার বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। লোকটা তাকে কটাক্ষ করছে! সে-ও ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী নয়, চটপট উত্তর দিয়ে বসল, 'ফিরেছিলাম অনেক আগেই। আপনার মেয়ের কাছেই ছিলাম। সবাই মিলে যা শুরু করেছে না এই বাড়িতে...'
'ওর নিজের কর্মফলেই ওর সাথে এসব হচ্ছে,' ওসমান মির্জা কথার মাঝখানে বাধা দিলেন, 'কে বলেছিল এই বয়সে এসে প্রেম-পিরিতি করতে? তাও কি না বাড়ির ছেলের সাথে!'
দিশা ঝাঝাল স্বরে উত্তর করে, 'বাইরে তো যায়নি। করলে ঘরেই করেছে। আর এই বয়সে এসে ভালোবাসা হওয়াটা একদম স্বাভাবিক ওসমান! তোমার মতো বুড়ো মানুষের যদি নতুন করে প্রেমিকা দরকার হয়, তবে ওর কেন হবে না?'
'দিশা!' ওসমান মির্জা হতভম্ব!
দিশা একটু দমে। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুলগুলো পাঞ্চ ক্লিপ দিয়ে আঁটতে আঁটতে আয়নায় ওসমানের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাল, 'সরি। বাট অনেস্টলি স্পিকিং ওসমান, আমি চেয়েছিলাম তুমি অন্তত একবার মেয়েটার পাশে দাঁড়াবে। ইউ শুড টেক আ স্ট্যান্ড!'
'ওর হয়ে আমি প্রতিবাদ করব? কার বিরুদ্ধে করব শুনি? আমার নিজের বড় ভাইয়ের বিরুদ্ধে?'
'তাতে কি তোমার জাত যাবে? তুমি ওর বাবা! দায়িত্ব কি একদম নেই তোমার?' দিশার কণ্ঠে স্পষ্ট বিরক্তি।
'ঘরের ভেতর এমনিতেই যুদ্ধের কমতি নেই। আর ওটা নিয়ে বাড়িতে একদম অশান্তি বাড়াবে না দিশা। তুমি তোমার মতো থাকো। ওর ব্যাপারটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো,' ওসমান মির্জা আলোচনার ইতি টানতে চাইলেন।
'রিয়েলি? এত সহজে কথাগুলো বলছ তুমি? হাউ কুড ইউ!' দিশা ঘুরে দাঁড়িয়ে ওসমানের মুখোমুখি হলো।
'আজকে বিকেলের জন্য তোমার মনে এত নির্লিপ্ততা, কাল যদি একই পরিস্থিতি আমার ওয়াফির ক্ষেত্রে হয়, তখনও কি আমি সব মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলব?'
ওসমান মির্জা সরাসরি দিশার চোখে চোখ রেখে বললেন, 'ওয়াফি আর বিকেল এক নয়!'
'আলাদা কিসে? ওয়াফি তোমার রক্ত, বিকেলও তো তাই।'
কথায় না পেরে ওসমান মির্জা কঠোর স্বরে বললেন এইবার, 'তোমার সঙ্গে মাঝরাতে এই অর্থহীন তর্ক করতে একদম ভালো লাগছে না দিশা।'
দিশাও পালটা জবাব দিল, 'আমারও সেম! ভালো লাগছে না এত রাতে ঝগড়া করতে। কিন্তু ওসমান, তোমাকে বুঝতে হবে—সারাজীবন এভাবে সবার মুখ চেয়ে ঘর-সংসার হয় না। তোমাকে আলাদা হতে হবে। এই জয়েন্ট ফ্যামিলির বিষাক্ত পরিবেশ থেকে নিজের ছোট সংসারটাকে আলাদা করতে হবে। নিজের ভালো-মন্দ তোমাকেই বুঝে নিতে হবে।'
ওসমান মির্জা কণ্ঠের স্বর এক ধাপ চড়িয়ে বললেন, 'তুমি আমাকে আমার পরিবার থেকে আলাদা হতে বলো দিশা! দুইদিন হলো এই বাড়িতে এসেছ, আর এরই মধ্যে এসব ফন্দি আঁটতে শুরু করেছ?'
'ওসমান! ডোন্ট শাউট! গলা চড়ালেই ভুলটা ঠিক হয়ে যায় না।' দিশার আঙুল ওসমানের দিকে স্থির, 'তোমার উচিত ছিল আরও আগেই এই সংসার থেকে বেরিয়ে আসা। তাহলে হয়তো নিজের পরিবারের প্রতি তোমার দায়িত্ববোধ তৈরি হতো। মেয়েটা আজ এভাবে ঘরে গুমরে মরত না। চোখের সামনে এত বড় একটা অন্যায় দেখেও কীভাবে তুমি এত নির্লিপ্ত থাকো, সেটা ভেবেই আমার ব্লাড প্রেশার বেড়ে যাচ্ছে!'
'কিসের অন্যায়? ও গেছে কেন প্রেম মারাইতে? আমার মুখটা খারাপ করিয়ো না। মানলাম বড় ভাইয়ের ছেলে খারাপ, কিন্তু আমার মেয়ে কি একদম দুধে ধোয়া তুলসী পাতা?'
দিশা স্তব্ধ হলো। কিছুক্ষণ পলকহীন তাকিয়ে থেকে বলে উঠল, 'বিশ্বাস হচ্ছে না, নিজের মেয়ের ব্যাপারে এমন কথা বলছ তুমি! সত্যি ওসমান, বিশ্বাস হচ্ছে না। আই থট ইউ আর আ জেন্টেলম্যান!'
'দিশা, ডোন্ট থ্রেট মি! আমার কিন্তু মাথা বিগড়ে যাচ্ছে। এসব পারিবারিক কেচ্ছা কোনোকালেই আমার পছন্দ নয়, আজও না। প্লিজ... এসব থেকে দূরে থাকো। তোমার জন্যই ভালো হবে। না হলে আমাকে...'
'কী? বলো? থামলে কেন?'
ওসমান মির্জা কিছুই বলতে পারলেন না। চোয়াল শক্ত করে জানালার দিকে তাকালেন। দিশা অবজ্ঞার একটা হাসি হেসে ওয়াশরুমে চলে গেল ফ্রেশ হতে। তার হাসিতে মেশানো বিদ্রুপটা আর তীব্র টিটকারিটুকু ওসমান মির্জার চোখের তারায় বিঁধে রইল তারপরও অনেকক্ষণ।
★★★
বিকেলের ডায়েরি লেখার অভ্যাস কোনোকালেই ছিল না। তবুও মনের কোণে যখন বিষাদের মেঘ জমত, কিংবা মায়ের জন্য প্রাণটা আইঢাই করে উঠত, তখন সেই অব্যক্ত কথাগুলোই কালির আঁচড়ে সাদা পাতায় ঠাঁই পেত। আজ গভীর রাতে আবারও সেই পুরনো খাতাটি নিয়ে বসেছে সে।
রাতের মধ্যপ্রহর পেরিয়ে গেছে। ভোরের আলো ফুটতে আর খুব বেশি দেরি নেই, অথচ বিকেলের চোখের পাতায় এক ফোঁটা ঘুম নেই। ক্লান্ত হৃদয়ে যন্ত্রণার ভার বইতে বইতে সে অবসন্ন, তবু দুচোখ বুজে আসছে না এক মুহূর্তের জন্য। স্মৃতির আয়নায় বারবার ভেসে উঠছে ওই চেনা মুখটি। দিশার কথাটা বড্ড বেশি কানে বাজছে তার— 'প্রতারকের প্রতারণা জানার পরেও নারী মন তাকে ভুলতে পারে না!'
বিকেলও পারছে না। যে মানুষটা এত মমতা দিয়ে তার হৃদয়ে ঘর বেঁধেছিল, সে মানুষটাই কেন সেখানে এমন নির্দয় আঘাত করল? রোদ্দুর কি সত্যিই তাকে ঠকিয়েছে, নাকি এই কুয়াশার আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো সত্য যা বিকেলের অগোচরে?
পাতা উল্টে চলে সে। না লিখতে চেয়েও কত কী যে লেখা হয়ে গেছে এই ক'দিনে! একটি পাতায় এসে বিকেলের হাত থমকে গেল। সেখানে লেখা,
'মা, কতদিন ধরে ইলিশ ভাপা খেতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু কাকে বলব? বড় মায়ের শরীরে জ্বর, ফুপুর মেজাজ বোঝা ভার, আর চাচীর কাছে তো চাওয়াই দায়। তুমি থাকলে হয়তো মুখ ফুটে বলার আগেই পাতে তুলে দিতে। মা, তোমরা আসলে জাদুকর হও, তাই না?'
লেখার ওপর দিয়ে আঙুল বুলায় বিকেল। ঝাপসা হয়ে আসে চোখ, গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে নোনা জল। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চোখ মুছে সে আবারও পাতা ওল্টাতে শুরু করে। কিছুদূর গিয়ে আবারও থমকে দাঁড়ায় তার দৃষ্টি। এই পাতাটায় লেখা,
'এত কাছে ছিলে তুমি,
আমার আপনের চেয়েও আপন হয়ে।
তবু কেন চিনতে এত দেরি হলো বলো তো?'
লেখাটা পড়ামাত্রই বিকেলের বুকটা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। মনে পড়ে যায় সেই বিশেষ দিনটির কথা। মানুষটার বুকের ওমে নিজেকে সঁপে দিয়েছিল সে। সেদিন তার সামান্য চোখের জলে মানুষটা অস্থির হয়ে উঠেছিল। শাসানোর সুরে বলেছিল, 'বলেছি না, এই দু চোখে একদম জল নয়?'
কী অদ্ভুত পরিহাস! শেষমেশ আজন্মের কান্নার জলটুকু তো সেই মানুষটাই উপহার দিয়ে গেল।
হায়! যতন করে বুকে রাখা মানুষগুলিই কেন বুক বরাবর ছুরি চালায়?
বিকেল ডায়েরিটা চেপে ধরে। দেহটা ঠান্ডা ফ্লোরে আঁটা, মাথাটা রাখে বিছানার উপর, ভ্রমে ভেবে নেয়, এইতো তার পাশেই রোদ্দুর বসে, তার কাঁধেই মাথাটা ঠাঁই পেয়েছে আরও একবার।
একা একাই বিড়বিড় করে বিকেল, চোখ দিয়ে বয়ে চলা নোনা পানির স্রোত বাড়তে বাড়তে এক সময় বাঁধ ভেঙে উপচে আসে। গাল, ঠোঁট, চিবুক সব ভিজে অথৈ সাগর, বিকেলের ভাঙা স্বরটি তবু বুজে আসে না...
'আপনি আমায় কতবার কত অজুহাতে আঘাত করেছিলেন। কখনো শাসনের অধিকারে, কখনো নিছক মশকরায়, আবার কখনো কোনো কারণ ছাড়াই। আমি সেসব আঘাতের দাগ কোনোদিন মনে রাখিনি, সবটুকু অবলীলায় ক্ষমা করে দিয়েছি। অথচ আজ? আজ আপনি এই শরীরে স্পর্শটুকু না করেও মনের গহীন কোণে এমন এক বিষব্যথা গেঁথে দিয়েছেন, যা প্রতিটি নিঃশ্বাসে টের পাচ্ছি। এই পাহাড়সম হাহাকার আমি জাগরণে বা মরণে- কোনোভাবেই ভুলতে পারব না। কোনোভাবেই না। আপনি এখন কোথায় আছেন, কেমন আছেন, আমি জানি না। তবে অন্তর থেকে দোয়া করি, আপনি ভীষণ ভালো থাকুন। মিথ্যে করে হলেও আমাকে যেটুকু সুখে রাখতে চেয়েছিলেন, আমাদের দুজনকে নিয়ে যত স্বপ্ন সাজিয়েছিলেন- তার প্রতিটি অংশ যেন আপনার জীবনে সার্থক হয়। আমার সবটুকু প্রাপ্তি আপনারই হোক। কেবলমাত্র আপনার!'
বিকেলের কণ্ঠনালী শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসে। মনে হয়, অদৃশ্য কোনো হাত তার টুটি চেপে ধরেছে। নিঃশ্বাস নিতেও যেন বড্ড শ্রম হচ্ছে আজ। এত কষ্ট, এত নিদারুণ হাহাকার ভরা যন্ত্রণা কি একটা মানুষের পক্ষে সইবার কথা?
চেতনার সীমানা ঝাপসা হয়ে আসে তার। মাথাটা ঝিমঝিম করে ওঠে, অবশ হয়ে আসা শরীরটা ধীরে ধীরে অচেতনতার কোলে ঢলে পড়তে থাকে। আর ঠিক সেই মূহূর্তে, অস্ফুট স্বরে নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করে ওঠে সে,
'যা কিছু ভালো হবার কথা ছিল আমার, তোমার , আমাদের — তার সবটা তোমার হোক গো...তোমার হোক!'
অন্ধকার নেমে আসে দু'চোখে। ডায়েরির খোলা পাতাটার ওপর তার অবশ হাতটা পড়ে থাকে দীর্ঘক্ষণ। সকালের আলো এসে ছুঁয়ে যায় একসময়, রোদ পড়ে। সরেও যায়, বিকেলের ঘুম ছুটে না। ঠান্ডা মেঝের উপর গুটিশুটি দিয়ে ঘুমিয়ে থাকে।
★★★
দুপুরের খাবার টেবিলে আজ এক প্রকার মিলনমেলা বসেছে বলা চলে। বিকেলের অনুপস্থিতি ছাড়া বাড়ির প্রায় সবাই উপস্থিত। দিশাও আজ খেতে বসেছে, পরম মমতায় ওয়াফিকে লোকমা তুলে খাইয়ে দিচ্ছে সে। খাওয়ার ফাঁকেই নিস্তব্ধতা ভেঙে লতা খানিক কৌতুহলী হয়ে উমেদ মির্জাকে প্রশ্ন করলেন, 'ওদের ওখানের কী অবস্থা ভাইজান? ফোন-টোন করেছিল নাকি?'
উমেদ মির্জা শান্ত গলায় জানালেন, 'হ্যাঁ, রোদ্দুরের সাথে কথা হয়েছে। ওরা ঠিকঠাক আছে। বলেছে সব একটু গুছিয়ে নিয়ে তারপর ভালোমতো কল করবে।'
লতা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, 'যাক মাবুদ! শুনে নিশ্চিন্ত হলাম।'
ঠিক তখনই দিশা খাওয়া থামিয়ে সরাসরি উমেদ মির্জার দিকে তাকিয়ে অনেকটা আদেশের সুরে বলে উঠল, 'তা আপনার ছেলেকে বলবেন, আমার কিছু জরুরি কথা আছে তার সাথে। ফোন করলে আমাকে ধরিয়ে দেবেন।'
এমন সোজাসাপ্টা আর কিছুটা রূঢ় ভাব শুনে উমেদ মির্জাসহ টেবিলের সবাই থমকে গেল। বাড়ির প্রধান কর্তার সাথে এমন স্বরে কথা বলাটা যেন অকল্পনীয়। ওসমান সাহেব তৎক্ষণাৎ ধমকের সুরে বলে উঠলেন, 'বিনয়ীভাবে কথা বলতে কি তোমার খুব অসুবিধা হয় দিশা?'
দিশা ভ্রু কুঁচকে জবাব দিল, 'বাপরে! আমি তো স্বাভাবিকভাবেই বলেছি। এখন কি কথা বলার জন্য পা জড়িয়ে ধরে বলতে হবে নাকি?'
ভাইয়ের রাগকে সামাল দিতে উমেদ মির্জা মাঝপথে থামিয়ে দিলেন, 'ওসমান, বাদ দে তো। খাবার টেবিলটা অন্তত শান্ত থাকুক।'
বড় ভাইয়ের কথায় ওসমান চুপ হয়ে গেলেন ঠিকই, কিন্তু দিশার দিকে একদলা জ্বলন্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে ভুললেন না।
দিশা সেসবে থোড়াই কেয়ার করে আবারও খাওয়া শুরু করল। মেহেরজান বিবিও আজ সবার সাথে খেতে বসেছেন। তিনি সকাল সকাল এসেছেন, সন্ধ্যায় আবার হাসপাতালে বড় বউয়ের কাছে চলে যাবেন। মেহেরজান হঠাৎ তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বলে উঠলেন, 'তোর পোলা যে ওই মাইয়ার হাত থাইকা বাঁচছে, এইডাই বড় কথা। ওসমানের ঘরে কী এক অলক্ষ্মী পয়দা হইছে, যেখানে মুখ দেয় সেখানেই অশান্তি! বড় চিন্তায় আছিলাম রোদ ভাইরে নিয়া, এখন অন্তত চিন্তা থাইকা মুক্তি পাইলাম।'
কথাটা শোনামাত্র দিশার পিত্তি জ্বলে গেল। মুখের লাগাম টেনে ধরা তার স্বভাববিরুদ্ধ। সে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে উঠল, 'আপনার চিন্তা মুক্তি হলো সেটা তো বুঝলাম আম্মা, কিন্তু আপনি কবে দুনিয়া থেকে মুক্তি হবেন? না মানে, সবকিছুরই তো একটা এক্সপায়ারি ডেট থাকে, আপনারটা কবে ফেল হবে? ওপারে আব্বা বোধহয় আপনাকে খুব একটা ডাকছেন না। তিনি একা একাই শান্তিতে আছেন মনে হয়, আপনি গেলে আবার বেচারার দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে যাবে... ঠিক যেমনটা এখানে আমাদের সবাইকে নাচাচ্ছেন!'
বলেই দিশা নির্বিকার ভঙ্গিতে এক লোকমা খাবার মুখে পুরল। যেন খুব সাধারণ কোনো গল্প করেছে সে। অথচ ওদিকে পুরো টেবিল স্তব্ধ। সবার খাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে, প্রত্যেকে হাঁ করে দিশার মুখের দিকে চেয়ে আছে। কিন্তু দিশা? সে কি আর কাউকে দু-পয়সা পাত্তা দেওয়ার মেয়ে! মোটেই না! সে নিজের মনেই খেয়ে চলল বাকি সময়।
(চলবে)
________
আজকের পর্বটি ১০০০ লাইক পূর্ণ করে দিবেন। পরবর্তী পর্ব পেয়ে যাবেন তাহলে।
নোটঃ আমি আগামীকাল বইমেলায় যাব, দুপুর ২ টা থেকে থাকব নবকথন প্রকাশনীর স্টলে। স্টল নাম্বারঃ ২৩৮,২৩৯,২৪০ (মন্দির গেইট সংলগ্ন)
আপনারা কারা আগামীকাল ভিজিট করবেন? আমার সঙ্গে দেখা করতে আসবেন? 🥺