ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের নির্বসন

৩৮তম পর্ব

লেখক: মৃধা মৌনি

#প্রেমের_নির্বাসন - (৩৮)

লেখনীতে - #মৃধা_মৌনি

(কিছু বাজে ভাষা ব্যবহারের জন্য শুরুতেই ক্ষমাপ্রার্থী। গল্পের খাতিরে ব্যবহার করতে হয়েছে)

_______________

ফোনের ওপ্রান্তে নিস্তব্ধতা। বিকেলের মনে হয়, সময় বুঝি থমকে দাঁড়িয়েছে। হৃৎপিণ্ডের প্রতিটি ধকধকানি নিজের কানেই শুনতে পাচ্ছে সে। কাঁপা গলায় আবারও ডেকে উঠল মেয়েটা, 'হ্যালো, হ্যালো! আপনি কি ফোনটা কেটে দিলেন? শুনতে পাচ্ছেন?'

দীর্ঘ কয়েক সেকেন্ডের অসহ্য নীরবতা পার হয়ে ওপাশ থেকে ভেসে এল অতি পরিচিত, গম্ভীর কণ্ঠস্বর - যেন পাথর কুঁদে বের করা শব্দ, 'আমি শুনছি।'

বিকেল দু’চোখ জোরে বুজে ফেলল। মনে হলো, এক যুগ তৃষ্ণার্ত থাকার পর এক ফোঁটা জলের সন্ধান পেয়েছে সে। বুকের ভেতর হাতুড়ির পিটুনিটা আরও বাড়ে। চোখ বোজা অবস্থাতেই তার কণ্ঠনালি বেয়ে অনুনয় ঝরে পড়তে থাকে, 'আমার সঙ্গে একটু কথা বলবেন? প্লিজ?'

সে আশা করেনি কোনো উত্তর আসবে, কিন্তু রোদ্দুর খুব ছোট করে যখন বলল, 'বলো।'

ততক্ষণে বিকেল আর স্থির থাকতে পারে না। ফোনটা কানে চেপে ধরে সে পাগলের মতো ছুটে নিজের ঘরে চলে এল। সিঁড়ি ভাঙার ধপাধপ শব্দে নিজের উত্তেজনাই জানান দিচ্ছিল মেয়েটা। ঘরে ঢুকেই ধরাম করে দরজাটা বন্ধ করে ওটার সাথেই পিঠ ঠেকিয়ে মেঝেতে বসে পড়ল সে। হাঁটু দুটো বুকের কাছে টেনে এনে থুতনিটা ঠেকাল সেখানে। জোরে জোরে নিঃশ্বাস নেওয়ায় ঘরে এক ধরণের ফোঁস ফোঁস শব্দ হচ্ছে।

হাঁপাতে থাকা কণ্ঠে সে আবার জিজ্ঞেস করল, 'আছেন?'

'আছি।' ওপাশ থেকে ছোট উত্তর।

রোদ্দুরের কণ্ঠস্বর এত ভারি কেন? বিকেলের চোখের কোণে আবার নোনা জল চিকচিক করে ওঠে। অবরুদ্ধ গলায় সে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, 'আপনি কেন এমন করলেন? আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না।'

'কী করেছি?' রোদ্দুরের নির্লিপ্ত কণ্ঠস্বর।

'আপনি নাকি বিয়ে করেছেন...'

'করেছি তো... তোমাকেই তো করলাম!'

বিকেলের কান্না বাঁধ মানে না, 'না, আপনি ওই তৃপ্তিকে বিয়ে করেছেন! আমার সাথে বিয়েতে কোনো কাগজ করেননি আপনি।'

ওপাশ থেকে একটু কঠিন স্বরে ভেসে এল পরের কথাখানি, 'এসব কে বলেছে তোমাকে?'

'আপনার বাবা!'

রোদ্দুর একটু চুপ থেকে জানতে চাইল, 'তোমার বিশ্বাস হয়?'

'হয় না তো! হয় না বলেই তো নিজেকে নিয়ে এত যুদ্ধ করছি! আপনি পৌঁছানোর পর একবার ফোনও করলেন না আমায়।'

'কীভাবে করতাম? তোমার তো ফোন নেই।'

বিকেল মুহূর্তের জন্য থমকে পড়ে। বলার মতো কোনো যুক্তি খুঁজে পেল না সে। ঘরজুড়ে বিষণ্ণ নিস্তব্ধতা নেমে আসে অকস্মাৎ। সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে রোদ্দুর প্রশ্ন ছুঁড়ে, 'শুনেছি তুমি নাকি মেজো চাচীর গায়ে হাত তুলেছ?'

বিকেলের ভেতরটা অভিমানে ফেটে পড়ে, 'উনি আগে আমাকে মেরেছেন!'

'তাই বলে তুমিও পাল্টা মারবে? তিনি বড় না?'

বিকেল কথা বাড়াল না। বুকের ভেতর জমানো পাহাড় সমান প্রশ্নগুলো সব ওলটপালট হয়ে গেছে। কী বলতে চেয়েছিল আর কী বলছে- কিছুই মাথায় ঢুকছে না। রোদ্দুরের এমন অযাচিত কঠোর শাসন তাকে আরও একা করে দিচ্ছে যেন।

রোদ্দুর একটু নরম গলায় বলল, 'এমন পাগল হলে কি চলে?'

বিকেল ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল নরম স্বর শুনে, 'তৃপ্তি কেন আপনার সঙ্গে গেল?'

একটা দীর্ঘশ্বাস ভেসে এল ওপাশ থেকে। রোদ্দুর শান্ত স্বরে বোঝানোর চেষ্টা করে, 'আমি জানতাম না বিকেল। এয়ারপোর্টে যাওয়ার পর জানানো হলো ও আমার সাথে যাচ্ছে। ওই মুহূর্তে আমার কী-ই বা করার ছিল? বাবা সব ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন, অ্যাপার্টমেন্ট রেডি ছিল। এত টাকা খরচ করেছেন তিনি, মুখের ওপর না বলা যায় না।'

বিকেল কাতর স্বরে অনুনয় করে, 'আপনি ফিরে আসুন। আমার এখানে একদম ভালো লাগছে না।'

'ফিরতে চাইলেই কি ফেরা যায়? তুমি কি এখনো ছোট আছ? কিছু বোঝো না?'

'আমি কিচ্ছু বুঝতে চাই না!' বিকেলের গলায় জেদ আর আকুলতা মিলেমিশে একাকার, 'আমি শুধু চাই আপনি ফিরে আসুন। আপনার সঙ্গে আমি থাকব, আমাদের ছোট্ট একটা ঘর হবে...'

'সব হবে, তুমি শুধু ভরসা রাখো।'

'কিসের ওপর ভরসা রাখব? আমি একা আর পারছি না। কেউ আমাকে বিশ্বাস করে না। আমাদের বিয়েটা পর্যন্ত কেউ মানছে না...'

রোদ্দুর কথার মাঝখানেই বিকেলকে থামিয়ে দিল, 'সবাইকে মানাতে যাচ্ছ কেন? তুমি তোমার মতো থাকো, চুপচাপ থাকো। ব্যস! কে বিশ্বাস করল আর কে করল না, সেটা নিয়ে এত কৈফিয়ত দেওয়ার দরকার নেই।'

বিকেল স্তম্ভিত হয়ে গেল, 'আপনি বলছেন এই কথা?'

'হ্যাঁ, আমিই বলছি। স্টে স্ট্রং। আমি মরে যাইনি। ফিরব, সময় হলেই ফিরব। শুধু তোমার হয়েই ফিরব।'

বিকেল চুপ করে রইল। ওপ্রান্তে রোদ্দুরও নিস্তব্ধ। কয়েক মুহূর্ত পর রোদ্দুর গভীর আবেশে ছুঁড়ে দিল, 'তোমাকে ছুঁয়ে ‘ভালোবাসি’ বলেছিলাম... সেটা অন্তত অবিশ্বাস কোরো না।'

বিকেলের মুখ দিয়ে কোনো কথা সরল না। পাথর হয়ে বসে রইল মেয়েটা।

'কথা বলো?' রোদ্দুর ডাকল।

বিকেল কাঁপা গলায় শেষ প্রশ্নটা ছোঁড়ে, 'আপনি কি ওর সঙ্গেই একত্রে থাকবেন?'

'আলাদা রুমে থাকব। ও ওর মতো, আমি আমার মতো। বিশ্বাস হয় না?'

বিকেলের দম বন্ধ হয়ে আসতে চায়। অস্ফুট স্বরে ‘রাখছি’ বলেই সে লাইনটা কেটে দিতে চাইল। কিন্তু রোদ্দুরের শেষ কথাগুলো কানে এল পরপর, 'ঠিকঠাক থেকো। কারো সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করো না। আর পারলে মেজো চাচীর কাছে ক্ষমা চেয়ো। ক্ষমা চাইলে কেউ ছোট হয় না বিকেল, শুনছ?'

বিকেল আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করে না। ‘খট’ করে ফোনের লাইনটা কেটে দিল। হাতের ফোনটা তীব্র আক্রোশে মেঝেতে আছাড় মারল তারপর। কাঁচ ভাঙার ঝনঝন শব্দে ডিসপ্লেটা চৌচির হয়ে গেল। বিকেল সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করে না। দু’হাতে মুখ ঢেকে অঝোরে কাঁদতে শুরু করে মেয়েটা। নির্জন ঘরে তার কান্নার শব্দগুলো দেয়ালে লেগে ফিরে আসতে লাগল পরপর।

পরমুহূর্তে নিজেই আবার এগিয়ে যায়। পাগলের মতো ফোনটা তুলে মেঝে থেকে। ভাঙা ডিসপ্লের ওপর কাঁপাকাঁপা আঙুল চালিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ খুলে। ঝাপসা চোখে দেখে, স্ক্রিনে ভেসে ওঠা অপরিচিত সংখ্যাগুলো। নতুন দেশের নতুন নম্বর! কয়েক পলক তাকিয়ে থাকতেই মুখস্থ হয়ে গেল অংকগুলো।

সে আর এক মুহূর্ত দেরি করে না। চোখের জল মুছতে মুছতে কাঁপাকাঁপা হাতে কল বাটনটা টিপল। ওপাশে রিং হচ্ছে... একটানা গম্ভীর সেই শব্দ। কিন্তু কেউ ধরছে না। সময় শেষ হয়ে কলটা কেটে গেল।

বিকেল আবার চেষ্টা করে। ডুকরে কেঁদে উঠে সে মনে মনে রবের কাছে আকুতি জানাতে বসে, 'আল্লাহ, দয়া করো। ফোনটা রিসিভ করাও, প্লিজ... আমি আর পারছি না।' প্রতিটি রিংয়ের সাথে মেয়েটার হৃৎপিণ্ড একবার একবার করে থমকে যাচ্ছে বুঝি।

হঠাৎই খুট করে একটা শব্দ হয়। সংযোগ স্থাপিত হয়েছে। আবারও ওই চিরচেনা, গাম্ভীর্যপূর্ণ কণ্ঠস্বর ওপার থেকে ভেসে আসে, 'হ্যালো?'

মেঝেতে বসে থাকা বিকেলের কান্নার বেগ আরও বেড়ে যায়। প্রতিটি শব্দ বেরোয় বুক চিরে চিরে, 'সবাই আমারে দুঃখ দিল! ছোটবেলা থেকে সবাই শুধু ফিরিয়েই দিল... আপনিও শেষে সেই দলেই নাম লেখালেন? আপনার হৃদয়টা এত পাষাণ হলো কেমন করে?'

বিকেলের হাহাকার রোদ্দুরকে স্পর্শ করার বদলে আরও বিরক্ত করে তুলল বোধহয়। ওপাশ থেকে তার কণ্ঠে ঝরে পড়ে উত্তাপ, 'আবার সেই উল্টাপাল্টা কথা! আমি ঠিক কী করেছি শুনি? শুধু সঙ্গে তৃপ্তি এসেছে এটাই তো সমস্যা? আমি সেই মুহূর্তে তোমাকে জানাতাম কীভাবে, বলো? তোমার তো ফোনটাও নেই। বেখেয়ালে কোথায় যে ওটা হারিয়ে বসে আছ, তারও তো ঠিক নেই!'

'রোদ্দুর!' আর্তনাদ ঠিকরে বেরোয় বিকেলের গলা চিরে।

ওপাশে ছেলেটা আচমকা চুপ হয়ে যায়। কয়েক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা কাটে এমনি এমনি। তারপর যখন কথা বলল, কণ্ঠস্বরটা অনেকখানি নমনীয় হয়ে এল, 'দেখো, আমি আবারও বলছি- যেচে সম্পর্কটা নষ্ট করো না। আমাদের মাঝে যা ছিল, তা আজও আছে। আমি তোমাকে ছাড়িনি বিকেল, আর কোনোদিন ছাড়বও না। তুমি আমার ভালোবাসা ছিলে, আছ আর সারাজীবন থাকবে। এখন যা হচ্ছে, তা সাময়িক একটা ঝড় মাত্র। কয়েকটা দিন যেতে দাও, সব ঠিক হয়ে যাবে। মা একটু সুস্থ হয়ে উঠলেই আমি তৃপ্তিকে দেশে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করব। আর শোনো, আমি শীঘ্রই তোমার জন্য একটা ফোন পাঠাচ্ছি।'

বিকেল ধরা গলায় উত্তর দিল, 'আমার ফোন লাগবে না রোদ্দুর, আমার শুধু আপনাকে চাই।'

'আমি চাইলেই কি এখন আসতে পারি?' রোদ্দুরের গলায় অসহায়ত্ব, 'সবকিছু কি এতই সহজ? বাবা কত টাকা খরচ করে আমাকে পাঠিয়েছেন, তার কোনো হিসেব আছে তোমার কাছে?'

বিকেলের কান্নার তোড়ে গলা বুজে আসে। মেয়েটার অবাধ্য মন বোঝে না, আবেগ বড় নাকি বাস্তবতা!

রোদ্দুর খানিকটা শান্ত হয়ে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করে, 'পাগলামি করো না। আমি কাছে নেই, এখন তোমাকে আরও পরিণত হতে হবে বিকেল। একা সব সামলানো শিখতে হবে। সবার সাথে মিলেমিশে থাকতে হবে। বিশেষ করে মেজো চাচীর কাছে তুমি যে ক্ষমা—'

'আপনার এই জ্ঞানগুলো এখন নিজের কাছেই রাখুন!' কেন যেন ঝাঁঝিয়ে উঠল ও, 'এটা জ্ঞানের কথা শোনার সময় না রোদ্দুর! আমার জীবনটা এখন ঠিক কোন নরকে দাঁড়িয়ে আছে, আপনার কোনো ধারণা আছে? চুপিচুপি বিয়ে করলেন, কোনো কাগজ নেই, সাক্ষী নেই! আমি কাউকে এই সম্পর্কের কথা বলতেও পারছি না, বললেও কেউ বিশ্বাস করবে না। তার ওপর আপনার বাবা বলছেন আপনি তৃপ্তিকে বিয়ে করেছেন! ওকে নিয়ে আপনি বিদেশে সংসার করছেন, আর আমাকে বলছেন শান্ত হতে? আজ যদি আমি অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গে এক বেডরুম শেয়ার করতাম, আপনি কি এত শান্ত থাকতে পারতেন রোদ্দুর? মেনে নিতেন আপনি?'

'বিকে-এ-এল!' রোদ্দুর ও তেঁতে ওঠে খানিক। নামটা ডাকে এমন ভাবে যেন বড্ড দুঃসাহস করছে সে।

'চিল্লাবেন না একদম!' বিকেলের গলাও চড়ে আরও এক ধাপ, 'চিৎকার করলেই ভুল কথা সঠিক হয়ে যায় না! আমাকে এই অবস্থায় দাঁড় করিয়ে আপনি শান্ত থাকার উপদেশ দিচ্ছেন?'

রণ-ক্লান্ত যোদ্ধার মতো হার মানে রোদ্দুর, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ক্লান্ত স্বরে বলে ওঠে, 'ফাইন! সব দোষ আমার, সব ভুলও আমার। বড় ভুল করে ফেলেছি আমি! আমার আসলে নিজের মায়ের আগে তোকে রাখা উচিত ছিল। মায়ের সুস্থতা বা শারীরিক উন্নতির কথা না ভেবে আমার উচিত ছিল তোর মানসিক শান্তির কথা ভাবা। তোর সুখের কাছে আমার মা-বাবা সব ভেসে যেত, তাতে কার কী আসত যেত, তাই না?'

বিকেল পাল্টা আক্রমণ করে বলল, 'এই কথাগুলো আগে কেন ভাবেননি? তখন কেন মনে ছিল না যে আপনার বাবা-মা আছে?'

'বিকেল, তুই কিন্তু সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিস এবার! মায়ের অসুস্থতা কি আমি আগে থেকে জানতাম? কে জানত যে হঠাৎ উনার এই অবস্থা হবে? উনিও তো তোকে কম আদর-যত্ন করেনি রে, উনার জন্য কি তোর একটুও পরাণ পুড়ছে না?'

বিকেল ফুঁপিয়ে উঠে বলল, 'আপনার কি আমার জন্য পরাণ পোড়ে না রোদ্দুর?'

রোদ্দুর থমকায়, পরমুহূর্তেই বিষণ্ণ হাসি হেসে ওঠে বলে, 'পোড়ে বলেই এখনো কথা বলছি! যদি বিশ্বাসঘাতকতাই করার ইচ্ছা থাকত, তবে তোর ছায়াও মাড়াতাম না আমি।'

বিকেল মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল। এই একটি বাক্য তাসের ঘরের মতো তার সব তর্কের পাহাড় ভেঙে দিল যেন। রোদ্দুর ওপাশ থেকে ম্লান হেসে শুধাল, 'আমার পরিস্থিতিটা যদি একবারও বুঝতি বিকেল, তবে এই নিষ্ঠুর কথাগুলো বলার আগে অন্তত একশোবার ভাবতি।'

কয়েক সেকেন্ডের নীরব বিরতি দিয়ে পুনরায় হাঁপ ধরা স্বরে বলে ওঠে ছেলেটা, 'মায়ের এই অবস্থা, আমায় দেশ ছাড়তেই হবে। মিশিটা তো এখনও বাচ্চাই রয়ে গেল, কোনো দায়-দায়িত্ব নেওয়ার মতো ঘিলু ওর মাথায় হয়নি। এই অবস্থায় বাবাকে একা ফেলে আমি অত দূরের দেশে শান্তিতে পড়াশোনা করব কী করে? অথচ আমাকে বিদেশে পাঠাতে বাবা তাঁর জীবনের সবটুকু সঞ্চয় ঢেলে দিয়েছেন। যেন আমার এতটুকু কষ্ট না হয়, সেই চিন্তাতেই মানুষটা দিনরাত এক করেছেন। এখন এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আমি বলিই বা কী করে যে আমি যাব না, সব ক্যানসেল? তুই-ই বল, আমার জায়গায় তুই থাকলে কী করতি? পারতি চাচার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাঁর তিল তিল করে জমানো অর্থের এমন শ্রাদ্ধ করতে?'

বিকেল কোনো উত্তর করতে পারল না। ফোনের এপাশে সে পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে রইল। তার নীরবতা রোদ্দুরকে আরও অস্থির করে তুলে।

'আমি চেয়েছিলাম সবটা একটু গুছিয়ে নিয়ে তোকে ফোন করব। বাবাকে রিকোয়েস্ট করতাম দরকারে। কিন্তু সেই সময়টুকু তুই আমায় দিলি না। তৃপ্তির সাথে আমার বিয়ে ঠিক হয়ে আছে আগে থেকেই— খবরটা আমি জানতাম। তবুও আমি তোর সাথে জড়িয়েছি, সবার বিরুদ্ধে গিয়ে তোকে চেয়েছি। পেয়েও নিতাম রে, বিশ্বাস কর! শুধু আমার পরিকল্পনায় মায়ের এই হঠাৎ অসুস্থতাটা ছিল না। ঠিক এই একটা জায়গায় আমি ভীষণভাবে আটকে গিয়েছি বিকেল। খুব ভয় হচ্ছে জানিস, মা-কে যদি চিরতরে হারিয়ে ফেলি? তাহলে সেই অপরাধবোধ কি কোনোদিন ঘুচবে আমার? কথাগুলো একটু মাথা দিয়ে ভেবে দেখিস প্লিজ! তারপর তোর আমাকে যত ব্লেইম দেওয়ার দিস, আমি কিচ্ছু মনে করব না।'

বিকেলের ঠোঁট দুটো ঈষৎ কেঁপে ওঠে। অনেক কষ্টে নিজের গলার স্বর স্বাভাবিক রেখে সে শুধু শুধাল, 'ও কোথায়?'

'ঘুমিয়ে।' সংক্ষেপে উত্তর সারে রোদ্দুর।

বিকেলের মনের গহিনে এক সমুদ্র হাহাকার জমে, তবু সে ক্ষীণ স্বরে বলতে চায়, 'আমি কি আপনাকে একবার দেখতে পারব?'

রোদ্দুর একটু ইতস্তত করে বলল, 'পরে ব্যাক করি?'

মেয়েটা আর কথা বাড়াল না। বুকের ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাসটা বেরিয়ে আসার আগেই ছোট করে বলে, 'রাখছি।'

'হুম।'

লাইনটা কেটে গেল। হাতের মুঠোয় ধরা নিস্প্রাণ ফোনটার দিকে তাকিয়ে বিকেল দীর্ঘক্ষণ মেঝের দিকে চেয়ে রইল। তার ছোট্ট মস্তিষ্কে তখন কত সহস্র হিসেব নিকেশ, কত না-বলা অভিমানের পাহাড়। কী ভাবল সে? কেউ জানল না।

ধীরে ধীরে রুমের বাইরে বেরিয়ে এল ও। সিঁড়ি দিয়ে নিচে তাকাতেই দেখল সেখানে যেন কুরুক্ষেত্র চলছে। ওসমান মির্জা আর দিশার তীক্ষ্ণ বাক্যবাণ বিষাক্ত তীরের মতো একে অপরকে বিঁধছে। মির্জা বাড়ির গুমোট পরিবেশে হঠাৎ করেই যেন বারুদে আগুন লাগল। ওসমান মির্জার কণ্ঠের গর্জন দেয়াল চিরে বেরিয়ে আসে, 'বের হ তুই! এক্ষুনি বের হবি! অনেক সহ্য করেছি তোর এই নোংরা নাটক। আমার মা, আমার ভাই—পুরো পরিবারের সাথে তোর এই দুঃসাহস আমি আর এক মুহূর্তও সইব না!'

প্রত্যুত্তর না করে চুপ থাকার মেয়ে তো দিশা নয়। ছোবল দিতে চাওয়া সাপের ন্যায় ফোঁসফোঁস করে সেও জবাব দিয়ে ওঠে, 'তোর বাপের সাধ্য আছে আমাকে বের করার? ভেবেছিস আমি চলে গেলেই তুই শান্তিতে থাকবি? তোর চৌদ্দ গুষ্টির ভাত আমি জেলের ঘানিতে পেষাব, মনে রাখিস!'

ওসমানের পৌরুষে আঘাত লাগে। কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে তিনি চিৎকার করে উঠেন, 'বা★ল করবি তুই আমার! ক্ষমতা থাকলে একটা বা★ল ছিঁড়ে দেখাস!'

দিশার অবয়বে ঘৃণার চরম বহিঃপ্রকাশ। তীক্ষ্ণ স্বরে সে বিদ্রূপ করে উঠে, 'যোগ্যতা লাগে রে, যোগ্যতা লাগে! যে পুরুষ বিছানায় দু-মিনিট টিকতে পারে না, তার মুখে এত চ্যাটাং চ্যাটাং কথা মানায় না!'

'দিশা!'

মুহূর্তের স্তব্ধতা ভেঙে উমেদ মির্জা সজোরে চড় মারার জন্য হাত তুলেন। কিন্তু উপস্থিত সবাইকে পাথরের মতো স্থির করে দিয়ে দিশা ঝাপটে ধরল সেই হাত। শরীরের পেশিগুলো ইস্পাত দৃঢ় কঠিন! পরক্ষণেই হিতাহিতজ্ঞান হারিয়ে সে উমেদ মির্জার গালে কষিয়ে বসিয়ে দিল এক চড়। সেই চড়ের শব্দের প্রতিধ্বনি থামার আগেই মেহেরজান চিৎকার করে উঠলেন, 'ওরে আমার পোলারে মারল রে! এই খা★নকি...'

কথা শেষ করার সুযোগ পেলেন না মেহেরজান। দিশা যেন আজ সাক্ষাৎ রণচণ্ডী। মেহেরজানকেও সপাটে দু-ঘা বসিয়ে দিল সে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে না সে কোনো সাধারণ মানবী; বরং মনে হচ্ছে কোনো এক আহত বাঘিনী, যার ক্ষতের ওপর কেউ বড্ড নিষ্ঠুরভাবে খোঁচা দিয়েছে। তার এই উন্মত্ত রূপ দেখে বাড়ির কেউ আর এক পা এগোনোর সাহস পেল না।

দিশা উদ্ভ্রান্ত। হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গেল রান্নাঘরের দিকে। মাছ কাটার বড় বঁটিটা হাতে তুলে নিয়ে ফিরে এল চটপট, তারপর সেটাকে উঁচিয়ে ধরে চিৎকার করে বলতে লাগল সে, 'যে আসবি, একদম কুচি কুচি করে কাটব! কী ভেবেছিস তোরা? মগের মুল্লুক? জা★নোয়ারের দল, সবার সাথে অন্যায় করতে করতে তোদের হাত অনেক লম্বা হয়ে গেছে, তাই না? আজ তোদের সেই হাত আমি গোড়া থেকে কেটে দেব। কান খুলে শুনে রাখ, সবাই সব সহ্য করলেও দিশা করবে না। তোদের একেকটার ভণ্ডামি উপড়ে ফেলে তবেই এই বাড়ি থেকে আমি বিদায় নেব!'

বাড়ির বিশাল আঙিনা শ্মশানের মতো নিথর। দিশার রণমূর্তি দেখে কারো টুঁ শব্দ করার সাহস নেই; সবাই যেন পাথর হয়ে গেছে। তবে, জমাট বাঁধা স্তব্ধতা চিরে দিয়ে বিকেলের কণ্ঠস্বর ভেসে এল সেই মুহূর্তে। দিশার ঠিক বিপরীত দিকে দাঁড়িয়ে সে খুব অস্ফুট স্বরে, প্রায় ফিসফিস করে উচ্চারণ করে, 'মা?'

শব্দটা এক মুহূর্তের জন্য সময়কে থামিয়ে দিতে বাধ্য করে। দিশার হাত থেকে ঝনঝন শব্দে মেঝেতে আছড়ে পড়ল বঁটিটা। থমকে গেল সে। তার উত্তপ্ত রক্তচক্ষু নিমেষেই ভিজে কোনো এক অজানা কারণে। অবিশ্বাস্য গলায় সে পাল্টা প্রশ্ন করল, 'কী... কী বললে তুমি আমাকে?'

বিকেল কাঁপতে থাকা ঠোঁট জোড়া দাঁত দিয়ে চেপে ধরে। অশ্রুভেজা চোখে পুনরায় আওড়াল, 'মা?'

মুহূর্তের ব্যবধানে সব ক্রোধ ধূলিসাৎ হয়ে যায়। দিশা হিতাহিতজ্ঞান ভুলে ছুটে গিয়ে বিকেলেকে জড়িয়ে ধরে বুকে। ভেঙে পড়ে বিকেল, শরীরের অবশিষ্ট শক্তিটুকুও খুঁইয়ে বসেছে যেন। বাঁধভাঙা নদীর মতো তার কান্না আছড়ে পড়ে দিশার কাঁধে। সে হু হু করে কেঁদে উঠল।

দিশা দিশেহারা হয়ে পড়ল। বাঘিনীর মতো যে গর্জন করছিল একটু আগে, সে এখন একজন মমতাময়ী জননীই শুধু। বিকেলের মুখটা দু-হাতে আগলে ধরে আকুল হয়ে জিজ্ঞেস করতে লাগে, 'কী হয়েছে রে? ওই ছেলে কী বলেছে তোকে? বল আমাকে! কাঁদছিস কেন পাগল মেয়ে? আমি তো আছি... ও কি তোকে পরিচয় দেবে না বলেছে? তোকে ঠকিয়েছে? তুই শুধু একবার বল, ওর বাপের কল্লা নামিয়ে দেব আমি এখানেই!'

উমেদ মির্জার হতবিহ্বল, ফ্যাকাসে মুখের দিকে একবার ঘৃণাভরে চাইল দিশা। কিন্তু বিকেল মাথা নেড়ে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করে। অস্ফুট স্বরে বলল, 'না, কিছু না। তুমি আসো আমার সাথে...'

'কোথায় যাবি?'

'যেখানে একটু মুক্ত বাতাস আছে। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে মা। বড্ড দম বন্ধ লাগছে এই নরকে।'

দিশা কথা বাড়ায় না। মেয়েটাকে বুকের সঙ্গে মিশিয়ে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে চলে সিড়ি ঘরের দিকে। রেখে যায় অপমানে থমথমে হওয়া এক গাদা মুখ। উমেদ মির্জা চোখ তুলেই তাকাতে পারছেন না। তার বাড়িতে তাকে চড় খেতে হবে এরকম হাঁটুর বয়সী একটা মেয়ের থেকে, ভাবতেই শরীরের সব রক্ত ছলকে উঠছে যেন। এই মেয়েকে ভেঙেচুরে মাটির সঙ্গে গুড়িয়ে না দেওয়া পর্যন্ত তার শান্তি হবে না - মনে মনে আওড়ালেন তিনি। হাতড়ে পাতড়ে ফোনটা খুঁজতেই দেখলেন সোফার উপর পড়ে আছে অবহেলায়। কাছে গিয়ে হাতে তুলে নিতেই আরেক দফা মাথা গরম হয়ে উঠল তার। এ কি হাল করেছে ফোনের! ডিসপ্লে'র একাংশ অন্ধকার হয়ে গেছে প্রায়...দাঁত কিড়মিড় করে তিনি উচ্চারণ করলেন একটি নাম কেবল, 'বিকেল!'

যেন সব নষ্টের মূলে ও ছাড়া পৃথিবীর আর কেউই দায়ী নেই।

★★★

আকাশটা চাঁদশূন্য, তারকাখচিত। বাতাস বইছে দক্ষিণে। গায়ে লাগলে মনে হয়, শরীর শুধু নয়, মন ছুঁয়ে ফেলে। গা জুড়িয়ে হৃদয়ের ক্ষতও শীতল হয়। দিশা আনমনেই গুনগুনিয়ে ওঠে, 'এ হাওয়া....আমায় নেবে বহুদূর?'

তারপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে রেলিং ঘেঁষে দাঁড়ানো মেয়েটার দিকে। দিশা এগিয়ে নিজেও পার্শ্ববর্তী জায়গাটা দখল করে। নিচে তাকায়। জনমানবহীন শূন্য রাস্তাটা পেট মোটা বড় একটা অজগরের মতো দেখাচ্ছে।

দিশা বলে, 'তুমি কি আমার উপর রাগ করছ বাই দ্য ওয়ে?'

বিকেল ঘাড় ফেরায়, 'কেন? রাগ করব কেন?'

'তোমার বাবাকে কত আজেবাজে কথা বললাম, তোমার চাচাকে চড় মারলাম, তোমার দাদীকেও চ...'

বিকেল তাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বলল, 'সম্পর্কে মেয়ে হই দেখে পারিনি। নইলে এই চড়টা আমার হাত থেকে তারা ডিজার্ভ করে।'

দিশা খুশি হলো।

'মাথায় আক্কেল জ্ঞান হচ্ছে তাহলে। মন্দ না ব্যাপারটা। আসলে ধাক্কা খেলে সবাই-ই শেখে। যেমন আমি...আচ্ছা, এই কথা থাকুক, তুমি বলো তো, ওই ছেলে কি বলল? নাম কি যেন..রোদ না?'

'রোদ্দুর, রোদ বলে সংক্ষেপে ডাকে সবাই।'

'ওহ। আই সি! কি বলল সে? কোন পট্টি বাঁধলো আবার তোমার দু'চোখে?'

ম্লান হাসে বিকেল, মাথা নেড়ে আকাশের দিকে চাইল, 'মানুষকে বোকা বানানো কত সহজ, তাই না মা? একটু ভালোবেসে কাছে টেনে হাসি মুখে বিষও পান করানো যায়। বোকা হৃদয়, টেরই পায় না!'

দিশা জবাব প্রদান করল না। সেও তাকাল আকাশের গায়ে, বিকেলই বলে চলে নিভৃতে, 'তার সিচুয়েশন বোঝানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। কিন্তু মনটা কেন যেন মিছিল করে বসল, কিছুতেই মানতে চাইল না। কিছু বলিনি অবশ্য, চুপ করে ফোন রেখে দিয়েছি। যে আমার নীরবতার ভাষা বোঝে না, তাকে আর্তচিৎকারে আর্তনাদ বোঝানোর মানে আছে?'

দিশা মায়া মায়া চোখে ফিরল বিকেলের দিকে, 'কি করবে এখন?'

বিকেল ও ফিরল তার দিকে, 'আমায় অনেক দূরে কোথাও পাঠিয়ে দিতে পারবে মা? অনেক দূরে!'

'কতদূরে?'

'যত দূরে গেলে পিছুটান পথ ভুলে আর আমার পিছু নিতে পারবে না।'

দিশা তাকিয়ে রয়। বিকেল ও।

অনেকক্ষণ পর অবাক চোখে দেখে, দিশার চোখের কার্নিশ ঘেঁষে কয়েক ফোঁটা পানি এসে জমল। খুব সন্তর্পণে শাড়ির আঁচলে চোখ মুছে গুনগুনিয়ে ওঠে,

'মন তুই করলি একি ইতরপনা

বন্ধুকে করলি অচেনা,

ভজলি জনারে জনা...'

(চলবে)

_________

আগামী পর্বে অতীত কালের সমাপ্তি ঘটবে। তারপর আমরা প্রবেশ করব বর্তমানে। পরবর্তী পর্বটি দ্রুত চাইলে তাড়াতাড়ি ১০০০ রিয়েক্ট সম্পন্ন করে দিন। হ্যাপি রিডিং ❤️

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন