ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের নির্বসন

৩৯তম পর্ব

লেখক: মৃধা মৌনি

#প্রেমের_নির্বাসন - (৩৯)

লেখনীতে - #মৃধা_মৌনি

(নোট পড়ে নেবেন সকলেই)

______________

ফোনের ওপাশ থেকে গর্জে উঠলেন তিনি, 'কেন ফোন করেছ? কী চাও তুমি? লুকিয়ে আমার ছবি তুলেও কি তোমার শান্তি হয়নি?'

দিশা নিজেকে সংবরণ করে। শান্ত, পাথুরে স্বরে জবাব দেয়, 'এত খেঁকিও না ইকবাল। আমি একটা প্রয়োজনে তোমাকে ফোন করেছি।'

কিন্তু ইকবালের বিশ্বাস যে তলানিতে। অবজ্ঞার হাসিতে ফেটে পড়েন তিনি, 'প্রয়োজন? নাকি ব্ল্যাকমেইল করে টাকা হাতানোর ফন্দি? বলো, কত টাকা দিলে তুমি আমার জীবন থেকে চিরতরে বিদায় নেবে?'

মুহূর্তেই দিশার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। ঘৃণার লাভা স্রোতে ভাসিয়ে নিতে মনে চায়, এই অভদ্র অসভ্য লোককে। চড়া গলায় সে শাসন করে ওঠে ইকবালের দম্ভকে, 'তোর টাকার অহংকার আমি ধুলোয় মিশিয়ে দেবো রে শালা! তোর টাকার ওপর আমি থুতু ফেলি। কথা না শুনেই ভাব নিচ্ছিস? শোন শুয়োর...'

ওপাশে ইকবাল স্তব্ধ। যার চোখের মায়া আর চেহারার স্নিগ্ধতায় তিনি এক সময় বিভোর হয়েছিলেন, সেই মেয়ের কণ্ঠে আজ আগুনের হলকা। ভাষার এ কী ভয়ঙ্কর রূপ! সামলে নিয়ে ধীর গলায় শুধালেন, 'বলো, কী বলবে?'

দিশার কণ্ঠে হাসি ফুটে উঠল। পরিহাস করে বলল, 'শক্তের ভক্ত আর নরমের যম তোমরা। অথচ দোষ কেবল আমাদের ওপর চাপিয়ে দাও!' পরক্ষণেই ঘৃণায় থুতু ফেলে সে।

'শোন, তোর তো অনেক জায়গায় জানাশোনা আছে। আমাকে বিদেশের একটা টিকিটের ব্যবস্থা করে দিতে পারবি?'

'কেন?' ইকবালের সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন।

'এ দেশের ব্যাডা দিয়ে আমার পোষাচ্ছে না। তাই বাহিরের দেশের ব্যাডাদের হাতাতে চাই। শুনলি?'

ইকবাল নিরুত্তর। জীবনের দীর্ঘ পথচলায় এমন অপমান তিনি বোধহয় আগে কখনও হননি। মনে মনে নিজেকেই ধিক্কার দিয়ে ওঠেব, কোন অভিশপ্ত লগ্নে এই মেয়ের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল! শিট!

দিশা আবার তাগাদা দিয়ে উঠল, 'কী হলো? চুপ করে আছ কেন? আমার হাতে সময় খুব কম। বল, কত টাকা আর কতদিন লাগবে? দূরের কোনো দেশে আমার একজনকে পাঠাতে চাই।'

'তো আমাকে বলছ কেন? আমাকে কি দালাল মনে হয়? টাকাপয়সা লাগলে...' পরমুহূর্তেই চুপ করে যান তিনি, মনে নাড়া দেয় গালি গুলো, মিনমিন করে প্রসঙ্গ বদলাতে বলে ওঠেন চটপট, 'মানে আর্থিক সাহায্য দরকার হলে নাহয় আমি একটা হেল্প করে দিতাম...'

এক মুহূর্তের জন্য দিশার কণ্ঠ থেকে উত্তাপ উবে গেল। সেখানে স্থান পায় এক সমুদ্র হাহাকার আর অসহায়ত্ব। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, 'মেয়েটা বড্ড দুঃখী ইকবাল। এই পৃথিবী তাকে দু-হাত ভরে কেবল কষ্টই দিয়েছে। যেখানে সে আছে, সেখানে থাকলে ও অকালেই শেষ হয়ে যাবে। আমি সেটা নিজের চোখে সইতে পারব না। তাই তোমাকে বলছি, যদি পারো ওকে কোথাও থিতু হওয়ার ব্যবস্থা করে দাও। একটু কাজের বিনিময়ে হলেও... এই সুন্দর পৃথিবীটাকে দেখার অধিকার ওরও আছে।'

ইকবাল অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন, 'মেয়েটা তোমার কী হয়?'

'আমার মেয়ে।'

'কিন্তু সেদিন তো বললে তোমার শুধু একটি ছেলেই আছে...'

'রক্তের সম্পর্ক না হলে কি কাউকে মেয়ে বলা যায় না?' দিশার পাল্ট প্রশ্ন।

ইকবাল ক্ষণকাল ভেবে মৃদুস্বরে বললেন, 'যায়।'

'তাহলে বলো, করবে কিছু?'

'দেখছি... কিন্তু ছবিগুলো?'

দিশা আশ্বস্ত করে, 'ওগুলো দিয়ে আমি তোমাকে ব্ল্যাকমেইল করিনি, আর করবও না।'

ইকবালের কণ্ঠে কিছুটা নম্রতা নেমে আসে তাই শুনে, 'দেখা করো একবার।'

'করব। তুমি আগে ওর ব্যবস্থাটা করো।'

'দেখছি আমি...'

ফোনটা কেটে যায়। দিশা জানলার বাইরে তাকিয়ে শূন্যে দৃষ্টি মেলে দেয়। সময়ের নদী কোন মোহনায় গিয়ে মিশবে, কার জন্য কোন কূল লেখা আছে—তা বিধাতা ছাড়া আর কে-ই বা জানে!

★★★

রেহনুমা ফিরে এসেছেন। সাদা হাসপাতালের দেয়াল আর ওষুধের কটু গন্ধ পেছনে ফেলে চিরচেনা অন্দরে তাঁর প্রত্যাবর্তন ঘটেছে ঠিকই, কিন্তু আগের সেই চঞ্চলতা আর কর্তৃত্ব যেন হাসপাতালের করিডোরেই কোথাও হারিয়ে গেছে। শরীরের এক পাশ এখন এক অবাধ্য ভার, যা তাঁর ইচ্ছের শাসন মানে না। একমুঠো ওষুধ আর নিয়মিত থেরাপির কঠোর নিয়মই এখন তাঁর আগামীর ধ্রুবতারা। হয়তো এই পঙ্গুত্ব আর যন্ত্রণার সঙ্গেই গড়ে নিতে হবে এক জীবনের মিতালি।

বড় গিন্নি বাড়ি ফিরেছেন—এই খুশিতে লতা আর আইরিন মিলে হেঁশেলে নানা পদের আয়োজন করেছে। অথচ সেই সুস্বাদু পদের ঘ্রাণ ছাপিয়ে পুরো বাড়িতে আজ এক অখণ্ড বিষাদ রাজত্ব করছে। কারো মুখে হাসির রেখা নেই, নেই কোনো প্রাণের স্পন্দন। বিশেষ করে উমেদ মির্জা; তিনি যেন এক জীবন্ত প্রস্তরখণ্ডের মতো থমকে আছেন। সকাল গড়িয়ে বিকেল হয়, অফিস যাওয়ার তাড়া নেই, খাবারের প্রতি নেই কোনো রুচি। এক গভীর স্তব্ধতায় তিনি নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। বাড়ির সবাই তাঁর এই মৌনতার কারণ জানে, তাই কেউ আগ বাড়িয়ে সেই ক্ষতে হাত দিতে সাহস পায় না।

শয়নকক্ষে আধশোয়া হয়ে শুয়ে আছেন রেহনুমা। তাঁর শিয়রে উমেদ মির্জা বসে আছেন পাথরের মতো নিশ্চুপ হয়ে। পাশে মেহেরজান আর ওসমান মির্জাও উপস্থিত। অনেকদিন পর রেহনুমার সঙ্গে জমে থাকা ছোটখাটো সুখ-দুঃখের আলাপ সারছেন তাঁরা।

রেহনুমা ক্ষীণ স্বরে শুধালেন, 'রোদরা কেমন আছে?'

ওসমান মির্জা সস্নেহে জবাব দেন, 'ভালো আছে ভাবি। প্রতিদিন নিয়ম করে ফোন দেয়। আজকেও করবে, তখন তুমি নিজের কানেই ওর সঙ্গে কথা বোলো।'

রেহনুমার মনে বিষাদের মেঘ আরও ঘনীভূত হয়। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, 'তোমরা থাকতেও তোমার বড় ভাইয়ের গায়ে হাত তোলার সাহস পায় কীভাবে ওইটুকু মেয়ে? ওসমান, আমি স্বপ্নেও ভাবিনি যে এতটা অধঃপতন দেখব!'

এতক্ষণ চুপ করে থাকা উমেদ মির্জা এবার ত্যক্ত ও বিষণ্ণ কণ্ঠে বাধা দিলেন। ঘরের ভারী বাতাস আরও কিছুটা গুমোট করে দিয়ে তিনি বললেন, 'বাদ দাও এসব... ওসব নিয়ে আর নতুন করে ভাবতে চাচ্ছি না আমি।'

দেয়ালের ঘড়ির টিকটিক শব্দটা কানে লাগছে বড্ড। রেহনুমা কপালে ভাঁজ ফেলে কুণ্ঠিত কণ্ঠে বললেন, 'ভাবতে হবে তো। আপনার সঙ্গে এতবড় একটা কান্ড ঘটালো, আপনি সাজা দেবেন না?'

'আমি ওকে ছেড়ে দেবো ভাবি।' ওসমান মির্জা বললেন মাঝখানে, 'তুমি এসব নিয়ে ভেবে মাথাব্যথা করো না। ওকে এখানে নিয়ে আসাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল।'

রেহনুমা কিছু একটা বলার জন্য মুখ খুলতেই আবার থমকে গেলেন, দরজায় বিকেলের ছোট্ট ছিপছিপে গড়নের দেহটা এসে দাঁড়িয়েছে। রেহনুমা চোখ ভরে মেয়েটাকে দেখেন। কী ভীষণ রোগা আর অসুখী চেহারা৷ চোখের নিচে গাঢ় কালির দাগ, গালজোড়া দেবে বসে গেছে।

তার দৃষ্টি অনুসরণ করে বাকিরাও ফিরল বিকেলের দিকে। ওসমান মির্জা কণ্ঠে উষ্মা মিশিয়ে বলে উঠলেন সঙ্গে সঙ্গে, 'এখানে কি? কি চাই?'

বিকেল ঘরে ঢোকে বিনা অনুমতিতে, 'তোমার সঙ্গে কথা আছে বাবা। আসবে?'

'বাপের মর্যাদা রাখছোস, আবার বাপ বইলা ডাক দেস!' মেহেরজান আক্রোশপ্রসূত হয়ে বলেন চিবিয়ে চিবিয়ে, বিকেল স্বভাব সুলভ মুখে কুলুপ এঁটে রইল না আজ। সরাসরি জবাব দিয়ে বসল তীক্ষ্ণ স্বরে, 'সেও তো আমাকে মেয়ে হওয়ার কোনো মর্যাদা, ভালোবাসা, স্নেহ, মমতা কিছুই দেয়নি। সম্মান পেতে হলে দিতেও জানতে হয়। এই কথাটা তোমাকে শেখায়নি? এত জ্ঞান তোমার!'

'খা★নকির বাচ্চা... মুখে বুলি ফুটছে তোর...'

বিকেল তেড়ে এগোয়, 'খবরদার বুড়ি, মুখ খারাপ করে একটা গালি দিবি, তোরে আজকে এইখানে পুতে দিতে বলব। হ্যারাসমেন্ট বহুত সহ্য করছি, আর না। দরকার পড়লে বাকি জীবন ভিক্ষা করে খাবো, তাও এই পরিবারে থাকব না।'

'তো বেরিয়ে যা। কেন অশান্তি দিচ্ছিস আমাদের?'

বিকেল ওসমানের দিকে তাকাল। এই মানুষটাকে দেখলে আগে ওর কষ্ট লাগত, মায়া বোধ তৈরি হতো, তার থেকে একটুখানি যত্ন, স্নেহ পাওয়ার জন্য ছটফট করত হৃদয়। আর আজ তৈরি হয় করুণা!! একই সঙ্গে আফসোস...এর চেয়ে এতিম হলেও ভালো হতো বোধহয়।

হৃদয় চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়েই আসে ওর, ঘাড় নেড়ে বলে, 'যাবো তো, সব হিসাব বুঝে তারপর যাবো। এই বাড়ির অংশে আমার ও হক আছে৷ সেটা আমাকে বুঝিয়ে দাও, আমি চলে যাবো।'

সকলেই অবাক হলেন। ভীষণ রকমের! এ কোন বিকেলকে দেখছে তারা! কথায় কথায় নাকে চোখে কেঁদেকেটে একাকার করা সেই বিকেল এতগুলো পাহাড়ের সমান মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে জায়গা জমির ভাগ চাওয়ার কথা বলছে!

মেহেরজান বলে উঠলেন খ্যাঁক খ্যাঁক করে, 'দেখলি, দেইখা ল, এই যে তোর মাইয়া...তোর জন্ম...'

'তুমি মাঝখানে কথা বলতে আসবে না দাদী।'

'বিকেল...'

'তুমিও না বড় মা! এখানে কথা যা হওয়ার আমার আর তার সঙ্গে হবে।'

সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়ে বিকেল ডেকে ওঠে, 'বলুন ওসমান মির্জা, আমার হক আমাকে প্রাপ্যভাবে দিয়ে দিবেন? নাকি এখানেও আমাকে ঠকাবেন সবাই মিলে? যেভাবে ঠকিয়ে আসতেছেন জন্মের পর থেকে...'

ওসমান মির্জা বাকরুদ্ধ!!

উমেদ মির্জা নিজেও বড় বড় চোখে সব দেখছে। তার বিশ্বাস হতে চায় না, তাদের সম্মান আজ এতোটাই নিচে যে বিকেলের মতো পুঁচকে মেয়ে এসে বাপের নাম ধরে কথা বলছে! তার অসুস্থ স্ত্রী কে চুপ করিয়ে দিচ্ছে ধমকে! তার মায়ের গায়ে একজন হাত তুলেছে, আরেকজন পুঁতে ফেলার হুমকি ধামকি দিচ্ছে! আর এতসব কিছু তাকে দুই চোখ মেলে দেখতে হচ্ছে! এই দিন দেখানোর জন্যেই কি বিধাতা বাঁচিয়ে রেখেছিলেন তাকে?

বিকেলের ভেতরটা ভেঙেচুরে যেতে চায়। কান্না ঠিকরে বেরোনোর পথ খোঁজে। কিন্তু বিকেল যেন সেই ভোঁতা হৃদয়ের বিকেল নেই, অন্য কিছুই ভর করেছে আজ এই মেয়েটার উপরে। বিন্দুমাত্র ভয় না পেয়ে, কণ্ঠে কাঠিন্য মিশিয়ে বলে চলে একের পর এক কথা,

'এতই যখন আমায় অসহ্য লাগে, ঘৃণা করো, তখন জন্মের পর টুটি চেপে মেরেই ফেলতে। বিশ্বাস করো, আমি হাশরের ময়দানে তোমাকে ক্ষমা করে দিতাম। কিন্থ বাঁচিয়ে রেখে যে নরক যন্ত্রণায় জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করলে না, তাতে ক্ষমা করা মানে নিজের উপর নিজেরই জুলুম করা হয়ে যাবে।'

তর্জনী তোলে বিকেল, 'তোমাকে...' তারপর তাঁক করে উমেদ মির্জার দিকে, 'আপনাকে...' মেহেরজানের দিকেও আঙুল নির্দেশ করে বলে, 'আর তোমাকে...আমি ক্ষমা করব না। ইহ জগতে না, পর জগতেও না...'

রেহনুমা স্থির চোখে চেয়ে আছেন। বিকেলের সঙ্গে তার চোখাচোখি হতেই বিকেল বলে ওঠে, 'তোমাকে করলাম। কোলেপিঠে নিয়ে কম করোনি...'

রেহনুমা হাত ইশারায় কাছে ডাকলেন, 'আমার পাশে এসে একটু বয়, কথা শোন...'

'না বড় মা। ক্ষমা পর্যন্তই শেষ। বাকি কিছু আর আশা রেখো না। সম্মান আর দিতে পারছি না। তোমাকেও না। কোথায় কোথায় আঘাত করেছ এই আমাকে, কোথায় কোথায় ভেঙেছ সবাই মিলে... সুদে আসলে একদিন টের পাবে সবাই...মনে রাখিও!'

তারপর ওসমান মির্জা থমথমে মুখটার দিকে চেয়ে শুধাল, 'এবার বলো, আমার হক আমি পাব নাকি পাব না?'

ওসমান মির্জা পারছেন না, বিকেলকে মারতে আসেন।

কিন্তু কেন যেন মারতে পারছেন না। একটা জড়তা কাজ করছে মনের মধ্যে। কিন্তু কেন? তিনি কি মনে মনে ভয় করছেন বিকেলকে? নাকি বিকেলের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা দিশাকে? নাকি অবচেতন মন তাকে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে অলরেডি! তা বুঝতে পেরেই এই জড়তা - কোনটা?

বিকেল হাসল, হঠাৎ করেই।

ওসমান মির্জাকে কাঠপুতুলির মতো এমন দাঁড়িয়ে চিন্তিত মুখে থাকতে দেখে বলে উঠল, 'ওহ, তোমার তো কিছু নেই। যা আছে, সবই তোমার বড় ভাইজানের। সে তোমাকেই দেয় কিনা, আর তো আমি পাবো! যাকগে, দান করে দিয়ে গেলাম সেসব...যদি পেয়ে থাকো, বিক্রি করে যদ্দিন পারো খেয়ো, কেমন? আমি অপেক্ষা করব, তোমার ধ্বংস দেখার।'

'বিকেল!!' এতক্ষণ চুপ করে বসে থাকলেও আর হাত গুটিয়ে থাকতে পারলেন না তিনি, এগিয়ে এলেন চিৎকার করে। বিকেল ওসমান মির্জার পেছনে থাকা উমেদ মির্জার মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিলো।

'আস্তে...' বলল নির্লিপ্ত স্বরে, 'আমি বয়রা না, আস্তে বললেও শুনি।'

'তোমার এতবড় আস্পর্ধা!!' উমেদ মির্জা হাত তুলে মারতে নিতেই আবার গুটিয়ে ফেললেন আচানক, বিকেল হেসে কুটিকুটি হলো তাই দেখে। পেট চেপে ধরে হাসির দমক সামলে বলতে লাগল, 'ওররেএএএ! যাক, আমার মায়ের থাপ্পড় টা বৃথা যায়নি। ভাবছেন, আমিও না দিয়ে বসি...হা হা হা! ভালো ভালো...'

উমেদ মির্জা দাঁত কিড়মিড় করেন। ওসমান এসে ওর বাহু ধরে ঝাঁকি দিতেই বিকেল কণ্ঠস্বর কঠিন করে শুধাল, 'আমার হাত ছাড়ো। খবরদার, একটা স্পর্শ ও করবে না, কেউ না।'

'ওই মা★গীরে আমি দেখে নেবো, সঙ্গে তোকেও! তোরা দুইজনে জোড়া বাঁধছোস...'

'তোমরা যেন জোড়া বেঁধে ছিলে সবসময়, আমরাও বেঁধেছি, দোষ কি তাতে? পার্থক্য তোমাদেরটা শয়তানের জোড়া, আমাদের টা ভালো মানুষির জোড়া...'

হাত ঝামটা দিয়ে ছাড়িয়ে নিল বিকেল, 'এই পরিবারটার একদিন ধ্বংস হোক, ধ্বংস হোক, ধ্বংস হোক...তোমরা দু ভাই যেন ম★রার সময় পানিটাও না পাও। আমি দোয়া করলাম...দোয়া...'

ওসমান চড় বসাবেন করেই হাত তুলতে বিকেল সবাইকে আরও স্তম্ভিত করে দিয়ে তার হাত কামড়ে দিল। এত জোরে, ওসমান ভয়ংকর চিৎকারে ফেটে পড়লেন।

বিকেল সরল, হাত দিয়ে দাঁত মুছে নিল, এক দলা থুতু ছুঁড়ে দিল সবাইকে উদ্দেশ্য করে। দরজায় এসে দাঁড়াল দিশা, চোখেমুখে অবাক চাউনি,

বিকেল তার দিকে তাকিয়ে জানাল, 'দিছি কামড়ে মা। মনটায় বড়ই শান্তি লাগতেছে।'

দিশা হাত বাড়িয়ে বিকেলকে টেনে নিল, 'আসো।'

তারপর দুইজনে চম্পট হলো এ ঘর থেকে।

ওসমান মির্জা ব্যথায় কাতর, উমেদ মির্জা অপমানে পাথর। মাঝখান থেকে রেহনুমার মনে হয়, যে ঝড়ের আশংকায় তিনি এতগুলো বছর তিল তিল করে বেঁচে ছিলেন, সেই ঝড় অসম্ভব প্রলয়ঙ্কারী রূপে মির্জা পরিবার তছনছ করতে এসেছে। শেষমেশ কাউকে আস্তো রাখলেই হয়!

★★★

'এত সাহসী হয়ে উঠলি কবে থেকে?' দিশার প্রশ্নে ঝরে পড়ে বিস্ময়। মনে হয়, প্রচ্ছন্ন গর্ব ও মিশে আছে লুকিয়ে।

বিকেল শান্ত গলায় জবাব দিল, 'তোমার থেকেই মা। তুমিই তো শিখিয়েছ - নরম হতে নেই, নিজের সত্তার সঙ্গে আপোষ করতে নেই।'

দিশা ম্লান হাসল। মেয়ের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে সে পুনরায় কাজে মন দেয়। বিছানার ওপর রাখা বড় লাগেজটায় দ্রুত হাতে কাপড় গোছাতে শুরু করে সে। বিকেল বিছানায় পা দুলিয়ে বসে, কৌতূহলী চোখে চেয়ে জিজ্ঞেস করল, 'আমরা কি কোথাও যাচ্ছি?'

দিশা মুখ তুলে চায়। চোখের কোণে দৃঢ়তা মেখে বলল, 'তুই-ই না সেদিন যেতে চেয়েছিলি? অনেক দূরে?'

বিকেলের চোখে-মুখে এক পলকে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল, 'সত্যি বলছ?'

দিশা মাথা নেড়ে সায় দিল। তারপর আলমারির গভীর থেকে একটি পুরনো কাঁসার বাক্স বের করে আনে। বাক্সের ডালাটা খুলতেই বিকেলের চোখ ছানাবড়া! দিশা ভেতর থেকে একটি ভারী হার তুলে ধরল। কারুকাজ করা নকশার ওপর আঙুল বুলিয়ে বলল, 'সুন্দর না?'

বিকেল বিমুগ্ধ কণ্ঠে বলল, 'দারুণ কাজ তো!'

'জানিস, এটাতে কত ভরি সোনা আছে?'

'কত?'

'সাড়ে চার ভরি।'

বিকেল অবাক হয়ে বলল, 'বাপরে! অনেক তো!'

দিশা হাসে। তারপর একজোড়া কঙ্কন বের করে দেখাল, 'এই বালা জোড়া দেখ, এতেও দুই ভরির ওপরে আছে। আমার খুব শখের জিনিস, নকশাটা আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে করিয়েছিলাম।'

বিকেল বিস্ময়ভরা গলায় বলল, 'তোমার কাছে তো অনেক সম্পদ মা! তুমি তো দেখি বেশ বড়লোক!'

দিশার অধরে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটে উঠল, 'বড় অংকের টাকাপয়সা কম দেখিনি এ জন্মে। কেন যেন উল্টাপাল্টা খরচের বদলে সবসময় জমানোর হিসেবটা আসতো মাথায়। তাই আজ এতকিছু। ভাগ্যিস করেছিলাম..নাহয় আজকের এই দিনে কি যে হতো!'

হাতরে হাতরে একজোড়া ছোট কানের দুল ও বের করে আনল সে। এটাতেও পাঁচ, ছ আনার কম হবে না সোনা। বলে, 'এগুলো সব বিক্রি করে দেবো।'

বিকেল যেন আকাশ থেকে পড়ল এই শুনে, 'মানে? বিক্রি করবে কেন? এত সুন্দর জিনিসগুলো...'

'দরকার আছে।'

'কী দরকার?'

দিশা মেয়ের চিবুক ছুঁয়ে বলে, 'তোকে বিদেশে পাঠাতে হবে না, বোকা মেয়ে!'

বিকেলের চোখে জল চিকচিক করে ওঠে। তাই দেখে দিশা ভ্রু কুঁচকে চোখ পাঁকাল সঙ্গে সঙ্গে, 'আরে পাগল, এসব অলঙ্কার তো আরও কত বানানো যাবে। মানুষ কেন গয়না বানায়? যাতে বিপদের সময় ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। আজ আমাদের লড়াইয়ের দিন, আজ যদি এগুলো কাজেই না লাগে তবে এর আর মূল্য কী? চোখ মোছ। কান্নাকাটির দিন শেষ। এখন থেকে আমরা আর ট্রমা নেব না, ট্রমা দেব! যারা আমাদের কষ্ট দিয়েছে, তাদের প্রত্যেককে দেখে নেব, বুঝেছিস?'

বিকেল দিশার হাত দুটো জড়িয়ে ধরে কাঁপা গলায় বলল, 'কেউ কোনোদিন একটা চকলেটও আমায় বিনা স্বার্থে দেয়নি মা, আর সেখানে তুমি এতগুলো টাকা খরচ করে আমায় বাইরে পাঠানোর ব্যবস্থা করছ... আমি তোমার এই ঋণ কীভাবে শোধ করব?'

দিশা শব্দ করে হাসল, 'মা-ও বলছিস, আবার ঋণ শোধের কথাও বলছিস! মায়ের ঋণ কোনোদিন শোধ করা যায় না বোকা। যেদিন তুই নিজে মা হবি, সেদিন বুঝবি।'

আবেগের বাঁধ ভেঙে যায় বিকেলের। দিশার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে, 'আমি কোনোদিন বিয়েই করব না।'

দিশা তার চুলে বিলি কেটে দিতে লাগলে, 'তাতে কী? তুই একদিন চমৎকার মা হবি।'

'বিয়ে ছাড়া?'

'মা হওয়ার জন্য বিয়ে জরুরি নয়। রক্তের সম্পর্ক ছাড়াও মা হওয়া যায়। বিশ্বাস হয় না?'

বিকেল মাথা নাড়ল, 'হয়... যেমন তুমি আমার মা।'

গুমোট ঘরের ভেতর এক টুকরো প্রশান্তির হাসি খেলে গেল দিশার ঠোঁটে জুড়ে।

★★★

'এটাই কি তোমার শেষ সিদ্ধান্ত?'

চোখের কাজলটা আরেকটু গাঢ় করে টানতে টানতে নির্লিপ্ত স্বরে দিশা জবাব দেয়, 'হ্যাঁ।'

'সুন্দর জীবনটাকে নিজের হাতে বিষিয়ে দিলে তুমি!' ওসমানের এমন হাহাকার পূর্ণ কথা দিশার কানে বিদ্রুপের মতো শোনায়।

ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল তার। আয়নার প্রতিবিম্বে ওসমানের চোখে চোখ রেখে সে শুধাল, 'এটাকে তুমি জীবন বলছ ওসমান?'

'নয় বলছ?'

'বলছি!' ঝট করে ঘুরে ওসমানের মুখোমুখি দাঁড়াল সে, 'যেটাকে তুমি জীবন বলে আঁকড়ে আছ, সেটা আদতে একটা চোরাবালি। আজ বুঝতে পারছ না, কিন্তু যেদিন দেখবে চারপাশে কেউ নেই—একদম কেউ নেই—সেদিন হাড়হাড়িয়ে টের পাবে জীবন কাকে বলে।'

ওসমান মির্জা নির্বাক হয়ে রইলেন। দিশা টিস্যুর কোণ দিয়ে আলতো করে চোখের কাজল মুছে নিল। সে কি কাজল ঠিক করছিল, নাকি নোনা জলের দাগ লুকোতে চাইল, তা অজানাই রয়।

ফ্যাকাশে ঠোঁটজোড়া লিপস্টিকের গাঢ় রঙে রাঙাতে রাঙাতে আবারও বলে ওঠে, 'আমার প্রতি তোমার কোনো দাবি থাকবে না জানি, তবে ওয়াফির প্রতিও কোনো অধিকার রেখো না। ও তো নিষ্পাপ শিশু। ওর সামনে গোটা আকাশটা সমান উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ পড়ে আছে। আমি চাই না মির্জা পরিবারের কোনো কালো ছায়া ওর ওই সুন্দর জীবনে তিলমাত্র আঁচড় কাটুক।'

ওসমান মির্জা এবারও কোনো প্রতিবাদ করলেন না। পাথরের মতো স্থির হয়ে শুধু বিদায়ের দৃশ্যটুকু দেখে গেলেন। বুকের ভেতরটা কেন যেন হঠাৎ মোচড় কেটে উঠল। তীব্র ইচ্ছে হলো চিৎকার করে বলতে—'থেকে যাও!' কিন্তু অদৃশ্য কোনো জড়তাবোধ তার কণ্ঠরোধ করে রেখেছে। হয়তো একেই বলে বিবেকের দংশন। জীবনের এক পর্যায়ে এসে প্রত্যেককেই নিজের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়, ওসমানও তার ব্যতিক্রম নন।

সন্ধ্যা নামার ঠিক আগ মুহূর্তে ওরা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল। নিস্তব্ধ, খাঁ খাঁ করা ঘরটায় ওসমান মির্জা যখন এক বুক তৃষ্ণা সমেত একা একা বসে রইলেন, উপলব্ধি করলেন — এক গ্লাস জল নিয়ে এগিয়ে আসার মতো কেউ নেই আর এ ঘরে। তার স্ত্রী, সন্তান, এমনকি যে মেয়েটাকে জন্ম থেকে অবহেলা আর অনাদরে বড় করেছেন, সবাই আজ তাকে অতল শূন্যতার গভীরে ডুবিয়ে দিয়ে চলে গেছে।

★★★

ফুটপাতের উপর একটা ছোট্ট বাচ্চা হঠাৎ করে পড়ে গেছে। হাতের আইসক্রিমটা গড়িয়ে ধুলো মাখা রাস্তায় চলে গেছে অনেকটা দূর। কী কান্না বাচ্চাটার, গলা ছেড়ে সমানতালে চিৎকার করছে সে।

তবু এতটুকু ধৈর্য না হারিয়ে একজন ভদ্রলোক ভীষণ যত্ন নিয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছেন বাচ্চাটির কান্না থামাতে। একটু পরেই তিনি ফিরে এলেন, একটির বদলে দুটো আইসক্রিম হাতে করে। দুটোই বাচ্চাটির পছন্দের ফ্লেবার। মিষ্টি স্বরে বললেন,

'আব্বু, এই দেখো- দুটো আইসক্রিম কিনে এনেছি পাপ্পা। কান্না থামাও, আমরা আইসক্রিম খেয়ে শক্তি অর্জন করে রাস্তাটাকে খুব করে মেরে দিবো, ঠিক আছে? এই তো আমার লক্ষ্মী আব্বু! বলো তো, কোনটা খাবে আগে? চকলেট নাকি স্ট্রবেরি?'

বাচ্চাটি চোখ মুছে হাত বাড়িয়ে চকলেট আইসক্রিমটা ধরল। এক কামড় মুখে দিতেই ফোকলা দাঁতে ফুটে উঠল ছোট্ট হাসি। তারপর বাবার হাত ধরে গুটিগুটি পায়ে হাঁটতে লাগল সামনের পথে।

দৃশ্যটা মনোযোগ দিয়ে দেখছিল বিকেল। অজান্তেই তার চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসে। দৃষ্টি সীমানার বাইরে যেতেই সে মাথা নিচু করে ফেলে। এক ফোঁটা জল টুপ করে পড়ে গেল হাতে ধরা ভূট্টার ঠোঙার উপর।

ওরা বসে আছে জিয়া উদ্যানের সামনের সেই জায়গাটাতেই— যেখানে সেই রাতে এসেছিল তারা। তখন আকাশ থেকে একের পর এক তারা খসে পড়ছিল, আর বিমুগ্ধ নয়নে রাতের নগরী দেখছিল বিকেল।

আজ চলে যাওয়ার আগে নিজে থেকেই একবার এখানে বসার আবদার করল মেয়েটা। কে জানে, আর কোনোদিন এখানে আসা হবে কি না!

কে জানে, এই ছোট্ট আবদারটা অপূর্ণ রয়ে গেলে কোনো একদিন পিছুটান হয়ে তার পথ আটকে দাঁড়াত কি না....

দিশা ধীর স্বরে বলে, 'ফিরে যাবে? এখনো পথ খোলা আছে।'

বিকেল হাতের উল্টো পিঠে গাল মুছে নেয়।

'আমরা এখন কোথায় যাবো?'

'আমার এক বন্ধুর বাসায়। নাম জুনি। একটু উশৃঙ্খল লাগবে তোমার চোখে... বাট মনটা খুব ভালো। ট্রাস্ট মি!'

'আচ্ছা।'

তারপর আবার দু’জনেই চুপ করে রইল। দিশা ভুট্টা চাবাতে চাবাতে বলল, 'পরে কখনো যদি অনুশোচনা হয়?'

বিকেল ভাবুক হয় এই শুনে,

'আজ যদি ফিরে যাই, তবে একদিন অনুশোচনা হবেই। সেদিন রাস্তা খোলা ছিল, গন্তব্য জানা ছিল, একটা উপায়ও ছিল- তবু আমি হেলায় সেই সুযোগটা হারিয়ে নিজেকেই নির্বাসনে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম...ওই অনুশোচনাটা না হোক অন্তত।'

দিশা তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর মৃদু হেসে বলে ওঠে, 'হঠাৎ করেই খুব বড় হয়ে গেছ।'

বিকেল শান্ত স্বরে জবাব দেয়, 'মায়ের শাসনেই মেয়েরা নারী হয়ে ওঠে।'

দিশা কিছু বলে না। শুধু খুব আস্তে একটা হাসি ফুটে উঠল তার ঠোঁট জুড়ে।

কিছুক্ষণ পর নীরবতাকে সরিয়ে বিকেলই ডেকে উঠল পুনরায়, 'মা?'

দিশা তাকায়, বিকেল ধীর স্বরে বলে, 'আমি তোমাকে মিস করব।'

দিশার হাত থেমে পড়ে মুহূর্তে। অদ্ভুত চাউনিতে তাকিয়ে রয় বিকেলের দিকে।

বিরতি শেষে মেয়েটা পুনরায় যোগ করে, 'ভীষণ..'

দিশার চোখ হঠাৎ করেই ছলছল হয়ে উঠল। সে চাউনি সরিয়ে নিল দ্রুত। এই কথাটা অনেকক্ষণ ধরেই বলতে চাইছিল সে। কিন্তু বলতে পারেনি। হয়তো চায়নি- মেয়েটা তার মায়ায় আটকে থাকুক। জীবন কত সুন্দর। পৃথিবী কত বিস্তৃত। মেয়েটার দেখার এখনো কত কিছু যে বাকি…

জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে ধীরস্বরে বলল কেবল,

'ডানা মেলে আকাশ ছুঁতে শেখো,

কোনো এক নীড়কে আকাশ ভেবো না।

মায়ার সুতো বড় নরম হলেও -

একদিন দেখবে, তাতেই জড়িয়ে বন্দী হয়ে গেছ।'

বিকেল আবার চোখ মুছে নিল। ভেজা গলায় জিজ্ঞেস করল, 'তোমার সঙ্গে আমার আবার কবে দেখা হবে, মা?'

এ প্রশ্নে এক মুহূর্ত থামল দিশা। পরমুহূর্তেই স্বাভাবিক স্বরে বলে উঠল, 'আসো, উঠি। অনেকটা পথ বাকি।'

বিকেলের হাত ধরে উঠে দাঁড়াল সে। মাটিতে পড়ে রইল আধখানা ভুট্টা আর কাগজের ঠোঙা। কিছুক্ষণ পরে হয়তো বাতাসে উড়ে যাবে। তারপর ধুলো-মাটির সঙ্গেই একসময় মিশে যাবে নিঃশব্দে। কেউ কোনোদিন জানবে না- ওটাও একদিন সাক্ষী ছিল। দুটি হৃদয়ের গভীর টানাপোড়েনের। কিছু বিদায় থাকে, যেগুলোকে বিদায় বলেও মনে হয় না। মানুষ ভাবে, পথ লম্বা, সময় অনেক… আবার দেখা হবেই। কিন্তু পৃথিবীর সব পথ কি আবার এক জায়গায় এসে মেশে?

____________________________________________________

(বর্তমান)

'যদি আবার, দেখা হয় তোমার - আমার;

মনে করো সেই মন ভাঙা গল্প - গান...

আহা, আছি আজও, আমি শুধুই তোমার;

জানি তুমি অন্যকারো; আমি দিশাহীন....'

সুরে সুরে গেয়ে ওঠে বিকেল ও। ভলিউমটা বাড়িয়ে দু পয়েন্ট বাড়ায় আরও। বাইরে কঠিন তুষারপাত, চোখে দেখা যায় না কিছু। একটা হট চকোলেট খাওয়ার ক্রেভিং হচ্ছে ভীষণ। বিকেল কিচেনে পা রাখার আগে একবার ছোট রুমটার দরজায় গিয়ে দাঁড়ায়। কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে খুব ধীরস্থির ভাবে নব ঘুরাল। অল্প আলোয় বিছানায় ঘুমন্ত মেয়েটার মায়া মায়া মুখ দেখে স্বস্তি হয় ওর। তারপর আবার দরজা লাগিয়ে এসে দাঁড়াল কাউন্টারে।

নীল চোখের ছেলেটা বসে ছিল ছোট্ট কফি টেবিলে। ওকে দেখেই উঠে দাঁড়াল চটপট করে। বিকেল ফিরেও চায় না। যেন, কেউ নেই এখানটায়। নিজের মনে কাজ করতে লাগে। ঠোঁট জোড়া বিড়বিড় করছে গান ভেজে যাচ্ছে।

'মিস বি?' ডেকে ওঠে যুবা।

বিকেলের এত রাগ হয়! সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে দাঁড়িয়ে কর্কশ স্বরে চেঁচিয়ে জবাব ছাড়ে, 'মিসেস বি! আ'ম মিসেস বি! হাউ মেনি টাইম, আই টোল্ড ইউ হা? ইউ উইল কল মি মিস বি ওয়ান মোর টাইম, আই উইল স্ল্যাপ ইউ, আই প্রমিস!'

তাতে সবুজ চোখা পুরুষটির বিন্দুমাত্র ভাবোদয় হলো না। বরং ফোঁকলা দাঁত কয়টি বের করে হাসি ছুঁড়ে দেয়। বিকেল হতাশ হয়। হট চকোলেট ভুলে বেরিয়ে পড়ে ঝটপট...

(চলবে)

________

নোটঃ অতীত সমাপ্ত। আগামী পর্ব থেকে কেবলই বর্তমান চলবে। সবাই বেশি বেশি রেসপন্স করুন। ১০০০ হলেই পরবর্তী পর্ব পেয়ে যাবেন। হ্যাপি রিডিং ❤️

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন