ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের নির্বসন

৪২তম পর্ব

লেখক: মৃধা মৌনি

#প্রেমের_নির্বাসন - (৪২)

লেখনীতে - #মৃধা_মৌনি

_________________

চেম্বারটা সুন্দর। ছিমছাম, সাজানো গোছানো, তবে গাছ প্রচুর। ইনডোর প্ল্যান্টের এমন সমারোহ দেখে কেউ না বললেও বোঝা যাবে ডাক্তার ভদ্রলোক ঘোরতর বৃক্ষপ্রেমিক। জানালার ধার ঘেঁষে রাখা মনস্টেরা আর স্নেক প্ল্যান্টের সবুজ আভা বিকেলের বিষণ্ণ মনটাকে মুহূর্তেই ভালো করে দিল।

বিকেল আর এলবার্ট বসে আছে ডাক্তার জো-এর কেবিনে। পুরো শহরে চাইল্ড স্পেশালিস্ট হিসেবে উনার বেশ সুনাম। নিজস্ব ভবনের নিচ তলাটাকেই রুচিশীলভাবে চেম্বার বানিয়ে নিয়েছেন তিনি। বিকেলের পর থেকে এখানেই বসেন। বিকেলের বাড়ি থেকেও খুব একটা দূরে নয়, ড্রাইভ করলে মিনিট পনেরোর রাস্তা। শ্যামাকে চেকআপ করানোর জন্য এলবার্টই জোর করে এখানে নিয়ে এসেছে তাই।

'বিউটিফুল…' এলবার্টের ফিসফিসে স্বরে বিকেল ঘাড় ফিরিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। এলবার্ট মৃদু হেসে কথা শেষ করল, 'দিস প্লেস, রাইট?'

বিকেল মাথা নেড়ে সায় দেয়।

'ডোন্ট ওরি, শী উইল বি ফাইন…'এলবার্ট অভয় দেওয়ার সুরে বলল। এবারেও শব্দ না করে স্রেফ ঘাড় নাড়িয়ে ‘হ্যাঁ’ বলে সে। পরক্ষণেই নিজের ওপর নিজের হাসি পেয়ে গেল। শ্যামার সাথে থাকতে থাকতে সেও দেখি কথা বলা কমিয়ে দিয়ে শুধু মাথা নেড়েই কাজ সারা শুরু করে দিয়েছে!

ভেতর থেকে একটি কম বয়সী যুবক বেরিয়ে এসে ডাকল তখুনি, 'মিস…?'

বিকেল উঠে দাঁড়িয়ে বিনয়ের সাথে ভুল ভাঙাল, 'মিসেস বি।'

'ওহ সরি। কাম ইনসাইড, প্লিজ।'

এলবার্টকে ওয়েটিং রুমে রেখে বিকেল ভেতরে এগিয়ে গেল। শ্যামা শুয়ে আছে ভেতরের ছোট্ট তুলতুলে একটা বিছানায়। ওর মুখটা একদম বিকারহীন, নির্লিপ্ত চোখের মণি দুটো ছাদের দিকে স্থির। বিকেলকে ঢুকতে দেখে ডাক্তার ভদ্রলোক চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে সৌজন্যতার হাসি দিলেন। তারপর বেশ লম্বা টানে বললেন, 'আসসালামু আলাইকুম।'

বিকেল থমকে গেল। সুদূর কানাডায় একজন নামকরা ডাক্তারের মুখে পরিষ্কার বাংলা সম্ভাষণ শুনে এক চিলতে নরম হাসি তার ঠোঁটের কোণে জায়গা করে নেয়। সে উত্তর করে, 'ওয়া আলাইকুমুস সালাম। আপনি বাঙালি?'

ভদ্রলোক হাসলেন, 'ইয়েস ইয়ং লেডি! জোভান থেকে ডাক্তার জো হয়েছি। আর তুমি?'

বিকেলও লাজুক হাসে, 'আমি বিকেল থেকে বি হয়েছি…'

'বিকেল! সো নাইস নেইম… বাঙালি নামগুলোর স্নিগ্ধতাই অন্যরকম। অথচ এই সাদা চামড়ার মানুষগুলো… এদের উচ্চারণে এত কী কষ্ট হয়, বুঝি না আমি।'

বিকেল মৃদু হেসে আলগোছে, 'এক দেশের বুলি, অন্য দেশের গালি। ওদের কাছে হয়তো নামটা কঠিনই লাগে।'

'তা ঠিক। কত বছর ধরে আছ এখানে?'

'আট বছর। আপনি?'

'হিসেব নেই। বিবাহের পরেই দেশ ছেড়েছিলাম।'

'আপনার ওয়াইফ বাঙালি?' বিকেলের কৌতূহল একটু বাড়ল।

'না ডিয়ার। পিউর কানাডিয়ান।' ভদ্রলোক হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়ে গেছে এমন ভঙ্গিতে গলার স্বর নিচু করলেন। চেয়ারটা টেনে একটু কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বললেন, 'তুমি বিরিয়ানি রান্না করতে জানো, হ্যাঁ?'

বিকেল অবাক হলেও ওপর-নিচ মাথা দোলালো।

'মাই ওয়াইফ কান্ট! মানে হয়, বাট সেই দেশি টেস্টটা পাই না। একদিন রেঁধে নিয়ে আসবে তো? প্লিজ, তুমি করে বলছি দেখে মাইন্ড করো না। তুমি আমার বড় মেয়ের চেয়ে একটু বড় হবে বয়সে। ছোটটাও বিশ ক্রস করল।'

বিকেল হাসল।

'ইটস ওকে। আমি একদম মাইন্ড করিনি। এই ভিনদেশে নিজের দেশের মানুষ দেখতে পেলে মনে অদ্ভুত একটা শান্তি লাগে।'

'একদম ঠিক কথা! ঠিক আছে, ওই কথাই রইল। এবার তবে প্রফেশনাল কথাবার্তায় ফিরি।' ডাক্তার জো হাতের ফাইলটা খুললেন।

'বাচ্চাটা কি তোমার?'

বিকেল এক মুহূর্ত চুপ করে রয়। নিজের বলবে কি না বুঝতে পারছে না। সত্যটা বলতে গেলে অনেক দীর্ঘ এক কাহিনি ফেঁদে বসতে হবে। শেষমেশ অনিশ্চিত ভাবেই ঘাড় নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বলল সে।

ভদ্রলোক রহস্যময় একটা হাসি ছুঁড়ে দিলেন।

'তোমার বেবি, অথচ তুমি জানো না যে ও টমেটোতে এলার্জিক?'

বিকেল প্রচণ্ড ধাক্কা খেল। ধরা পড়ে যাওয়া চোরের মতো কয়েকবার চোখের পাতা পিটপিট করল সে। ভদ্রলোক ওর অস্বস্তিটা বুঝতে পারলেন।

তিনি গম্ভীর স্বরে বলতে শুরু করলেন, 'ওর ব্লাডে এলার্জিক সিম্পটম আছে। টমেটো, গার্লিক, মাশরুম, বেগুন—এসব একদম দূরে রাখবে ওর থেকে। পুরোপুরি আউট অফ হার রিচ। মুখটা ফুলে কী অবস্থা হয়েছে দেখেছ? আর হ্যাঁ, আরেকটা কথা… ও যে একটা স্পেশাল চাইল্ড, সেটা কি তুমি জানো? নাকি এটাও তোমার অজানা?'

বিকেলের বিস্ময়ের সীমা রইল না। অস্ফুট স্বরে বলল, 'স্পেশাল চাইল্ড বলতে? ও তো দেখতে একদম সাধারণ বাচ্চাদের মতোই। একটু চুপচাপ হয়তো… কিন্তু নরমালই তো লাগছে।'

'সবকিছুই কি নরমাল? অনেস্টলি বলো তো।' ডাক্তার জো সরাসরি বিকেলের চোখে চোখ রাখলেন।

বিকেল দু-দণ্ড থামল। শ্যামার অদ্ভুত সব আচরণগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠছে। আবারও ঘাড় নেড়ে না করল সে। মৃদু স্বরে বলতে থাকে, 'কম কথা বলে। ওর আচার-আচরণ বয়সের চেয়ে বেশি পরিপক্ব। ভীষণ চুপচাপ স্বভাবের, তবে খুব অরগানাইজড। খাবার খাচ্ছিল, এলোমেলো না করে। যেটা অন্যসব বাচ্চাদের ভেতর দেখা যায় না বললেই চলে।'

ডাক্তার জো দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

'ধারণা তবে ভুল না আমার। এগুলো সবই Autism Spectrum Disorder বা অটিজমের লক্ষণ, বিকেল।'

বিকেল হাঁ হয়ে তাকিয়ে রইল। অটিজম শব্দটা সে শুনেছে, কিন্তু শ্যামার শান্ত চেহারার সাথে ওটা মেলাতে পারছে না। ডাক্তার জো বুঝিয়ে বলতে শুরু করলেন এবারে,

'দেখো, আমাদের মস্তিষ্ক একেকজনের একেকভাবে কাজ করে। কিন্তু অটিজম যাদের থাকে, তাদের ব্রেইন ওয়ারিংটা একটু অন্যরকম হয়। একে কোনো রোগ ভেবো না, এটা বরং একটা কন্ডিশন। শ্যামার মতো বাচ্চারা পৃথিবীকে একটু ভিন্নভাবে দেখে, শোনে এবং অনুভব করে। তুমি যে বললে ও খুব অরগানাইজড—এটা আসলে অটিজমের একটা বড় লক্ষণ। ওরা একটা নির্দিষ্ট রুটিন বা প্যাটার্ন ফলো করতে পছন্দ করে। সেই প্যাটার্নে একটু এদিক-সেদিক হলে ওরা খুব ডিসটার্বড হয়ে যায়।'

বিকেল বিড়বিড় করল, 'তাই তো দেখি ও কেমন শো-পিসের মতো না নড়ে না চড়ে স্ট্রেইট বসে। আবার কথাবার্তা একদমই কম বলে!'

'এটাকে বলে Social Communication Challenge।' ডাক্তার জো কলম দিয়ে শ্যামার ফাইলের ওপর টোকা দিতে দিতে বললেন, 'ওরা মানুষের সাথে আই-কন্টাক্ট করতে ভয় পায় বা অস্বস্তি বোধ করে। আমরা যেভাবে আকার-ইঙ্গিত বা ইমোশন বুঝি, ওরা সেটা সবসময় ধরতে পারে না। অনেকে ভাবে ওরা অসামাজিক, কিন্তু আসলে ওরা শুধু বুঝতে পারে না কীভাবে অন্যের সাথে রিলেট করবে। ওদের নিজেদের একটা ছোট জগত থাকে, আর সেই জগতে ওরা খুব সুখী।'

বিকেল স্তব্ধ হয়ে শুনছে। ডাক্তার জো থামলেন না, 'অনেকে মনে করে অটিস্টিক বাচ্চারা বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। এদের অনেকের আইকিউ সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি হয়। হয়তো শ্যামা কোনো বিশেষ বিষয়ে এক্সট্রা অর্ডিনারি ট্যালেন্টেড, যা আমরা এখনো জানি না। তবে ওদের সেন্সরি ইস্যু থাকে। যেমন, কোনো নির্দিষ্ট শব্দ, আলো বা খাবারের স্বাদ ওদের কাছে অসহ্য মনে হতে পারে। এই যে টমেটো বা গার্লিক খেলে ওর সমস্যা হয়, এগুলো শুধু ওর শরীরে রিঅ্যাকশন দিচ্ছে না, হয়তো ওর টেস্ট বা গন্ধেও প্রবল অস্বস্তি হয় যা ও বলতে পারছে না।'

বিকেল ছলছল চোখে শ্যামার দিকে তাকাল। যে বাচ্চাটাকে সে শুধু একগুঁয়ে’ বা ‘শান্ত ভেবেছিল, তার ভেতরে এত জটিল একটা জগত বইছে?

ডাক্তার জো নরম স্বরে বললেন, 'ভয় পেয়ো না। অটিজম মানেই জীবনের শেষ নয়। একটু বাড়তি যত্ন, থেরাপি আর প্রচুর ধৈর্য থাকলে এই বাচ্চারাও অনেক দূরে যায়। শ্যামা স্পেশাল, আর তাই ওর জন্য স্পেশাল ভালোবাসার প্রয়োজন। পারবে তো ওকে সেই সময়টা দিতে?'

বিকেলের মুখে রা নেই। স্তব্ধ হয়ে সে তাকিয়ে রইল চুপচাপ শুয়ে থাকা শিশুটির দিকে। বুকের ভেতরটা বিষণ্ণতায় ছেয়ে গেছে। আহারে! এইটুকু একটা বাচ্চা, তার ওপর এই বিশেষ মানসিক অবস্থা—না জানি কতটা কঠিন হচ্ছে ওর জন্য সবটা সামলানো। নিজের চেনা পরিবেশ, পরিবার আর আপনজনদের ছেড়ে একদম অচেনা একটা জায়গায় এসে কীভাবে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে ও?

বিকেলের মনে পড়ল, সে নিজেও বেশ কয়েকবার শ্যামাকে ধমকের সুরে কথা বলেছে। অথচ একবারও বোঝার চেষ্টা করেনি, এই বাচ্চাটার জন্য ঠোঁট ভেঙে একটা শব্দ উচ্চারণ করা কতটা দুঃসাধ্য! নিজের অজান্তেই বিকেলের চোখ দুটো ভিজে এল।

ডাক্তার জো দীর্ঘক্ষণ বিকেলের অপরাধবোধে মাখা মুখটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর চশমাটা টেবিলের ওপর রেখে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, 'ও কি পথ ভুলে তোমার কাছে এসেছে বাই দ্য ওয়ে?'

বিকেল স্রেফ ঘাড় নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বলল।

ভদ্রলোক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হেলান দিয়ে বসলেন।

'বুঝতে পেরেছিলাম। আমারও তেমনটাই মনে হচ্ছিল। বাচ্চাটা তোমাকে ঠিক সহজভাবে গ্রহণ করতে পারছে না, এক ধরণের ভয় কাজ করছে ওর ভেতর। ও যদি তোমার আপনজন বা চেনা কেউ হতো, তবে তোমার সান্নিধ্যে ও অনেক বেশি কমফোর্ট ফিল করত। আমি বলি কী, তুমি ওকে ওর পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করো। দেরি না করে পুলিশকে ইনফর্ম করো, একটা জিডি লিখে রাখো। এই মুহূর্তে ওর নিজের মানুষগুলোকে পাশে পাওয়া ভীষণ প্রয়োজন।'

ডাক্তার জো-র সাথে আরও কিছু প্রয়োজনীয় আলাপ সেরে শ্যামাকে নিয়ে বেরিয়ে এল বিকেল। কিন্তু বাসার পথে না গিয়ে সে গাড়ি ছোটাল থানার দিকে। সেখানে গিয়ে আদ্যোপান্ত সব জানিয়ে একটা সাধারণ ডায়েরি করল। আইনি সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে যখন সে ফিরতি পথ ধরে, ততক্ষণে পাইন গাছের সারির ওপর গাঢ় রাত নেমেছে। বাইরের হিমেল হাওয়া আর গাড়ির মৃদু দুলুনিতে বিকেলের কোলেই একসময় গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল ছোট্ট মেয়েটা।

মেয়েটির নিষ্পাপ ঘুমের দিকে তাকিয়ে বিকেলের কঠিন হৃদয়টা মুহূর্তেই বিগলিত হয়ে পড়ে। এতদিন নিজেকে বড্ড অভাগী আর ভাগ্যবঞ্চিত ভেবে এসেছে সে; সারাক্ষণ ললাট লিখন নিয়ে বিধাতার কাছে অভিযোগের পাহাড় জমিয়েছে। কিন্তু আজ কেন যেন বুক চিরে স্রষ্টার প্রতি এক গভীর কৃতজ্ঞতা বেরিয়ে এল। নিজের সুস্থতা, নিজের অস্তিত্বের জন্য মনে মনে শুকরিয়া জানাল সে। এই দুনিয়ায় তার চাইতেও কত বেশি অসহায় আর অভাগী মানুষ ছড়িয়ে আছে, আজ এই শিশুটির সান্নিধ্যে না এলে হয়তো অজানাই থেকে যেত।

বিকেল খুব শক্ত করে, পরম মমতায় মেয়েটাকে নিজের বুকের সাথে আঁকড়ে ধরে। যেন একটু আলগা হলেই হারিয়ে যাবে বুক থেকে....

★★★

'রোদ্দুর উঠেছে?'

মিশি গুমোট স্বরে জবাব দেয়, 'জানি না।'

আইরিন অবাক হয়ে মিশিকে নিজের দিকে ঘোরাতেই থমকে গেলেন। মেয়েটার চোখ টলমল করছে, গাল বেয়ে নামছে নোনাজল।

'কী হলো রে? কাঁদছিস কেন তুই?' আইরিনের কণ্ঠে রাজ্যের উদ্বেগ।

মিশি বিরক্ত স্বরে ঝেঁঝিয়ে ওঠে, 'কই কাঁদি?' পরক্ষণেই ওড়নার কোণ দিয়ে ব্যস্ত হাতে চোখের কোণা মুছে নিয়ে কৈফিয়ত দেয়, 'পেঁয়াজের ঝাঁঝ ফুপি, চোখে লেগেছে।'

আইরিন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

'এত বড় হয়ে গেছিস, এখন নিজের ফুপির কাছেও কথা লুকাতে শিখেছিস!'

মিশি জবাব দিল না। চপল হাতে আবার পেঁয়াজ কুচোতে শুরু করল। দুপুরের আজান পড়তে এখনো ঘণ্টাখানেক বাকি। এর মধ্যেই আলু ভাজা, ডাল আর ডিম দিয়ে দুপুরের আয়োজন সারতে হবে। চুলায় ভাতের চাল ফুটছে টগবগ করে। এই বয়সেই মিশি এখন পুরোদস্তুর গৃহিণী।

আইরিন বুঝতে পারলেন, কোন গোপন যাতনায় মেয়েটার চোখে মেঘ জমেছে। তিনি পরম মমতায় মিশির পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, 'কাঁদিস না মা। কেঁদে কী হবে? কপালে থাকলে তোরও একদিন ঘর-সংসার হবে।'

'আর কপাল...!' মিশি হাতের চাকুটা সশব্দে ছুড়ে মারে বেসিনের ওপর, 'মাঝে মাঝে মনে হয় কিছু একটা করে ফেলি ফুপি। আর সহ্য হয় না। বাইরে বেরোতে পারি না, সবাই এমনভাবে নাক-মুখ কুঁচকায় যেন আমি কোনো পাপী। আমার সাথে যারা পড়ত, সবাই আজ অন্যের ঘর সামলাচ্ছে। আমি কি দেখতে খুব অসুন্দর? কিসে কমতি আমার?'

আইরিন ম্লান হাসলেন, 'সৌন্দর্যে নয় রে মা, তোর একটা ভালো পরিবারের কমতি। তা ছাড়া মেজো ভাবি যা সব কাণ্ড করে রেখেছেন, এরপর কার সাহস এই বাড়ির সাথে আত্মীয়তা করার?'

মিশি তিক্ত গলায় বলল, 'দুনিয়াতে কত মানুষের মরণ হয়, আর আমার...'

আইরিন দ্রুত মিশির মুখ চেপে ধরেন, 'ছিঃ! ওসব বলতে নেই মা। দেখিস, একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।'

'কবে আসবে সেই দিন? আমার যে আর ধৈর্য ধরে থাকতে মন চায় না ফুপি। বাবার দিকে তাকালে ঘৃণা হয়, মায়ের দিকে তাকালে প্রবল রাগ লাগে আর ভাইয়ের মুখটা দেখলে কলিজা ফেটে যায়। নিজের জীবনের কী হাল হবে জানা নেই। কত দিক সামলাবো আমি?'

মিশির কান্না থামে না। আইরিনের মনটা দ্রবীভূত হলো, তাঁর নিজের চোখের কোণেও এক ফোঁটা জল চিকচিক করে ওঠে। কিছু একটা বলে সান্ত্বনা দেবেন, তার আগেই ঠুকঠুক শব্দে কুঁজো হয়ে রান্নাঘরে ঢুকলেন মেহেরজান। বুড়ির পান খাওয়া কুচকুচে লাল ঠোঁট; মির্জা বাড়িতে এত ঝড় বয়ে গেলেও তাঁর স্বভাবের বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি। বরং বয়স বাড়ার সাথে সাথে মেজাজটা আরও বেশি ক্যাটক্যাটে হয়ে উঠেছে যেন।

ঘরে ঢুকেই কর্কশ স্বরে বলে উঠলেন, 'ভাতারের লাইগা কাইন্দা দুয়ার ভাসাইতাছস! বিয়া না হইলে কী অয়? খিচ মাইরা থাকতে পারস না?'

মিশি চট করে চোখ মুছে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল, 'আমার মরণের আগে তোমার মরণ হয় না কেন রে বুড়ি! আর কতদিন বাঁচতে চাও? মির্জা বাড়ির উন্নতি, ধ্বংস সব তো দেখলে। এখন চোখ দুইটা বোজো...'

'ছেমড়ি এমন করস দেইখাই তোর কপালে বিয়াশাদী নাই, আর হইবও না!' মেহেরজান অভিশাপের সুরে বললেন।

'না হইলে নাই। তোমার কপালে মরণ নাই কেন, সেইটা জিগাও আল্লাহর কাছে। তুমিই তো সব নাটের গুরু। তোমার কারণেই আজকে আমাদের সবার পরিবার শেষ। মানুষের ঘরে মুরুব্বি থাকলে সে সুপরামর্শ দেয়, ভালো কথা শোনায়। আর তুমি... তুমি একটা কুটনী ডাইনি!'

মেহেরজান আর্তনাদ করে উঠলেন, 'তোর ভাতিজিরে চুপ করতে ক আইরিন!'

আইরিন ও ভ্রু কুঁচকে মায়ের দিকে তাকালেন, 'আম্মা, তুমি এখন এখানে আসছ কেন? ঘরে যাও, ক্যাচাল করো না তো'’

'ধ্বংসের দেখলি কী? বড় মাইনষের লগে যে ব্যবহার করস, তোর কপালে কী জোটে দেখিস!' মেহেরজান বিড়বিড় করতে করতে বের হতে চাইলেন।

:আমারটা আমি বুঝে নেব। তোর অভিশাপ কপচানো লাগবে না!' গজগজ করতে করতে মিশিই রান্নাঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।

আইরিন কড়া চোখে মেহেরজানের দিকে চাইলেন। রাগত স্বরে বললেন, 'চোখের সামনে এত কিছু দেখেও কি তোমার মরার ভয় জাগে না আম্মা? একটু নরম হতে ইচ্ছে করে না? শরীরের বল-শক্তি সব খুইয়েছ, এখন তো অন্তত সবার সাথে খ্যাঁকখ্যাঁক করা বন্ধ করো!'

মেহেরজান এবার নিজের মেয়েকেই শাপশাপান্ত করতে বসলেন। আইরিন আর কথা বাড়ালেন না, না শোনার ভান করে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। এই বাড়িতে বুঝি এক ফোঁটা শান্তিরও ঠাঁই নেই।

★★★

দুই রুমের ছোট্ট এই ফ্ল্যাটটার ভাড়া মাস দুয়েক ধরে বাকি। লতা কোনোভাবেই টাকার ব্যবস্থা করতে পারছেন না। বাড়িওয়ালা গত সপ্তাহে এসে একবার বেশ চিল্লাচিল্লি করে গেছেন। তবে তার স্ত্রী মানুষটা যথেষ্ট অমায়িক; মূলত তার কারণেই লতা এখনো মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু হারাননি। তিনি মাঝেমধ্যে তার স্বামীকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে ঠাণ্ডা রাখেন। কিন্তু এই মাসের খরচের টাকাটা এখনো আসেনি। না এলে লতাকে হয়তো পথে বসতে হবে। তার ওপর মেয়েটার ওষুধের যা খরচ! লতা কিছুতেই কূলকিনারা খুঁজে পাচ্ছেন না। জায়নামাজে বসে কত যে চোখের পানি ফেলেন, কত ক্ষমা চান—তবু রবের মন গলে না। লতা জানেন, অতীতে তিনি যে ভুল করেছেন, তার জন্য হয়তো এত সহজে ক্ষমা পাওয়া যায় না। তবু তিনি ক্ষমা চেয়েই চলেন। মাঝেমধ্যে বিধাতার ওপরই রাগ করে বসেন ভীষণ - ভঙ্গিমাটা এমন যেন তিনি ক্ষমা চেয়ে বড্ড উদ্ধার করছেন!

লতা মেয়ের ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালেন। তৃপ্তিকে হঠাৎ দেখলে মনে হবে কোনো এক কঙ্কালসার তরুণী। জীর্ণ শরীরে এক ফোঁটা রক্তমাংস আছে কি না সন্দেহ। টাইফয়েড হওয়ার পর মেয়েটা এমনভাবে শুকাল যে এখন আর ওর চোখেমুখের দিকে তাকানো যায় না। তার ওপর মরার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো চেপে বসেছে স্ক্যাবিস। সারা শরীরে চুলকানি আর পাঁচড়া হয়ে চামড়ার শ্রী পুরোই নষ্ট হয়ে গেছে। বিশেষ করে পায়ের দিকে তাকালে ভয় লাগে। গুটি গুটি লাল বর্ণের র‍্যাশগুলো সারাক্ষণ আগুনের মতো জ্বলছে ওর শরীরে। এই প্রচণ্ড অস্বস্তিতে মেয়েটা দিনরাত ছটফট করে।

লতা দ্বিধা নিয়ে ঘরে ঢুকে নরম স্বরে বললেন, 'তোর বাবাকে একটা ফোন করবি?'

তৃপ্তি দেয়ালের দিকে মুখ ফিরে শুয়ে ছিল, গোমড়া মুখেই জবাব দিল, 'টাকা শেষ?'

'তিন মাস ধরে অর্ধেক টাকা পাঠায়। তা দিয়ে চলি কীভাবে বল? তোর এই রোগ সারাতে কত ওষুধ-পথ্য কিনতে হচ্ছে...'

'আর কিনো না মা। সারবে না এই রোগ আমার। এগুলো পাপের শাস্তি, মরণ পর্যন্ত সাথেই থাকবে।' তৃপ্তির স্বরে নির্লিপ্ততা।

লতা চমকে উঠলেন, 'এভাবে বলছিস কেন?'

'সহজভাবে কঠিন কথা বলছি। শুনতে খারাপ লাগলে কান বন্ধ করে রাখো।'

ক্ষণকাল চুপ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারও শুধালেন লতা, 'ফোন করবি না?'

'পারব না। তোমার জামাইকে তুমিই ফোন করে নাও। যদি দুটো গালমন্দ দেয়, তুমিই নাহয় হজম করে নিও।'

'আমার গলা শুনলে ও ফোন কেটে দেয়।'

তৃপ্তি করুণ স্বরে হাসল, 'কাটবেই তো। তার নতুন ঘর, নতুন বউ, নতুন সব আয়োজন। তোমার সাথে তার সম্পর্কটা কীসের?'

লতা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হড়বড় করে বলে উঠলেন, 'জাদু করেছে তোর বাপকে! ডাইনিটা কোনো জাদু করেছে, নইলে মানুষটা এত বছর পর হঠাৎ এভাবে বদলে গেল?'

তৃপ্তি দাঁতে দাঁত চেপে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে, 'তুমি পারলে না কেন জাদু করতে? নাকি এতদিন জাদু করেই ধরে রেখেছিলে, তারপর মেয়াদ ফুরিয়ে গেল আর সে নতুনে মজল?'

লতা কোনো জবাব দিতে পারলেন না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন।

তৃপ্তি বলে চলল, 'আমার মাঝে মাঝে কী মনে হয় জানো মা? আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল তোমার মেয়ে হয়ে জন্মানো। আর দ্বিতীয় ভুল হচ্ছে তোমার কথামতো সব কাজ করা। যদি তোমার কথা না শুনতাম, আজ জীবনটা অন্যরকম হতো।'

লতা নিজেকে বাঁচাতে মাঝপথেই বলে উঠলেন, 'সব তো তোর ঘর বসাতেই করেছিলাম!'

'হ্যাঁ, খুব ঘর বসেছে আমার!' মেয়েটার স্বরে তাচ্ছিল্য ঝরে পড়ে।

লতা আবারও পাথর হয়ে গেলেন। তৃপ্তি শান্ত গলায় বলল পরে, 'শোনো মা, অন্যায় সবসময়ই অন্যায়। অন্যায়কে ন্যায় ভাবাটা তোমার বোকামি ছিল, আর সেই দোষটা তোমার একার। অন্তত নিজের ভুলটা এখন স্বীকার করো।'

লতা চুপ করে রইলেন।

'যাও মা, ঘর থেকে যাও। আমি গায়ের জামাকাপড় খুলব। গা জ্বালা করছে ভীষণ।'

নিঃশব্দে বেরিয়ে গেলেন তিনি। তৃপ্তি গায়ের কাপড়গুলো ছুড়ে ফেলে দিয়ে হিমশীতল মেঝের ওপর হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল। মেঝের ঠাণ্ডা পরশে শরীরের জ্বালাটা সামান্য কমলেও বুকের ভেতরের আগুনটা কিছুতেই নিভল না।

(চলবে)

________

সবাই রেসপন্স করবেন। আমি কিন্তু নিয়মিত লিখছি!!

আর এই পোস্টে একটা লাভ দিয়েন প্লিজ? 🥹

লিংক- https://www.facebook.com/share/p/1CSFtF65C1/

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন